হিন্দুত্বের ক্রোনোলজি ও স্বাতন্ত্র্যবীর সাভারকার : দ্বাদশ কিস্তি


  • July 18, 2020
  • (0 Comments)
  • 728 Views

বিনায়ক দামোদর সাভারকারের ‘হিন্দুত্ব’ তত্ত্বের উপর গড়ে উঠেছে আজকের আরএসএস-বিজেপি-র সাম্প্রদায়িকতা, বিদ্বেষ ও ঘৃণার রাজনীতি। গোহত্যা, জাতিভেদ, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি বিষয়ে সাভারকারের মত থেকে বর্তমান মৌলবাদী হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শাসকশক্তি আজ অনেকটাই সরে এসেছে। বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদীর হিন্দুত্ব আসলে একদিকে সাভারকার আর অন্যদিকে হেডগেওয়ার আর গোলওয়াকারের ধর্মভাবনার এক খিচুড়ি তত্ত্ব। এই প্রেক্ষিতে সাভারকারের মতবাদ ও জীবন নিয়ে কয়েকটি কিস্তিতে দীর্ঘ আলোচনা রাখলেন পার্থ প্রতিম মৈত্র

 

প্রথম কিস্তি : গো-পূজন বিরোধিতা ও বর্তমান স্বীকৃতি পর্ব  

দ্বিতীয় কিস্তি : স্বাধীনতা সংগ্রাম ও নির্বাচনী পরাজয় পর্ব

তৃতীয় কিস্তি : হিন্দুধর্ম ও হিন্দুত্ব পর্ব 

চতুর্থ কিস্তি : হিন্দু উত্থান ও নির্বাচনী বিজয় পর্ব 

পঞ্চম কিস্তি : কংগ্রেস রাজনীতি ও সাম্প্রতিক সাভারকার পুনর্বাসন পর্ব 

ষষ্ঠ কিস্তি : হিন্দুরাষ্ট্রের তত্ত্বনির্মাণ পর্ব 

সপ্তম কিস্তি : বিবেকানন্দ, হিন্দুত্ব ও দেশভাগ পর্ব 

অষ্টম কিস্তি : হিন্দু রাষ্ট্র ও ঘৃণার রাজনীতি পর্ব 

নবম কিস্তি : ধর্ম ও রাজনীতির ককটেল পর্ব 

দশম কিস্তি : হিংস্র হিন্দুত্ব, স্টেইনস, পুনর্ধর্মান্তরকরণ পর্ব 

একাদশ কিস্তি : নাগরিকত্ব, বিদেশী ও চিহ্নিতকরণ পর্ব 

 

দ্বাদশ কিস্তি : হিন্দু অর্থশাস্ত্র ও সঙ্ঘপরিবারের বিজয় পর্ব

 

স্বামী বিবেকানন্দ উনিশ শতকের শেষদিকে বলেছিলেন যে আমরা খালি পেটে আধ্যাত্মিকতার প্রচার করতে পারি না। পাশাপাশি ‘স্বদেশী’ [আদিবাসী] বা হিন্দুত্ব বিকাশের তত্ত্বটি বিশ্বাস করে, যে সত্য বা অভ্যন্তরীণ সুখ অর্জনের ভিত্তি হ’ল অর্থনৈতিক সুস্থতার সাথে নিজের আত্মার আধ্যাত্মিক অগ্রগতি। স্বাধীনতা-পূর্ব যুগে ভারতের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলি রাজা রামমোহন রায়, দাদাভাই নওরোজি, মহাদেব গোবিন্দ রাণাডে, রমেশ সি দত্ত এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো চিন্তাবিদ এবং পণ্ডিতদের লেখায় বারবার উঠে এসেছে। দেশের অর্থনৈতিক বিকাশের বিষয়ে স্বামী বিবেকানন্দ দারিদ্র্য দূরীকরণ, কৃষি ও শিল্প বিকাশ, শ্রমজীবী ​​মানুষের অবস্থা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মতো অর্থনৈতিক বিষয়ে নিজস্ব মতামত রেখেছিলেন। স্বাধীনতার সাত দশক পরেও, মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে ভারত এখনও দরিদ্রতম দেশগুলির মধ্যে রয়ে গেছে এবং মানব উন্নয়ন সূচকে সবচেয়ে নীচের দিকে রয়েছে।

 

বিবেকানন্দ জানতেন যে মানুষই অর্থ সৃষ্টি করে এবং এর উল্টোটা কখনও হয়না। তিনি ভেবেছিলেন যে, সমস্ত অর্থনৈতিক সমস্যা মানুষের সাথে সম্পর্কিত, এবং অর্থনীতিবিদদের প্রস্তাবিত সমাধানগুলি মানুষের ধারণার উপর নির্ভর করে। হিন্দু ধর্মে মানুষ বিষয়ে চারটি প্রধান মতামত রয়েছে।

১. একত্ববাদ: এই দৃষ্টিভঙ্গিটিই একমাত্র বাস্তবতাবাদী; মানুষের ব্যক্তিত্ব শুধুমাত্র দৈহিক শরীর নিয়ে গঠিত; এবং যাকে মন বলা হয় তা কেবল শরীরের কার্যক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট উপায়। বেশিরভাগ আধুনিক বিজ্ঞানী এবং মার্কসবাদীরা এই মত পোষণ করেন।

২. দ্বৈতবাদ: ব্যক্তি দেহ (যা পদার্থ দিয়ে তৈরি) এবং মন (যা মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকে) নিয়ে গঠিত। এই দৃষ্টিভঙ্গি জুডো-খ্রিস্টান এবং ইসলামী ঐতিহ্যগুলিতে অনুসৃত হয়।

৩. ত্রিত্ব: এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষ শরীর, মন এবং আত্মার যোগফল। এই দৃষ্টিভঙ্গি হিন্দু দর্শনের সমস্ত বিদ্যালয় – বিশেষত বেদান্ত স্কুলকে ধারণ করে।

৪. অদ্বৈতবাদ: এটি তৃতীয় দৃষ্টিভঙ্গী অর্থাৎ ট্রাইকোটমির একটি পরিবর্তিত রূপ। বিবেকানন্দ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই মতামত অনুসরণ করেছিলেন।

 

যদিও স্বামীজী অদ্বৈতবাদী ছিলেন, তবে ঐতিহ্যবাহী অদ্বৈতবাদ এবং স্বামীজির দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে তিনটি মূল পার্থক্য রয়েছে। স্বামীজির কাছে আত্মা হ’ল আমরা জীবনে যে সমস্ত শক্তি, জ্ঞান এবং আনন্দের সন্ধান করি তার উপলব্ধি। কোনও ব্যক্তির সমস্ত দক্ষতা একটি সম্ভাব্য আকারে আত্মায় অন্তর্নিহিত। আমরা কার্ল মার্কসের সাথে মানুষের সম্পর্কে বিবেকানন্দের দৃষ্টিভঙ্গির তুলনা করতে পারি। মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে, মার্কস পদার্থের একত্ববাদকে সমর্থন করেছেন; স্বামীজী দ্বৈতবাদকে সমর্থন করেছেন। সুতরাং তাঁদের পদ্ধতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বিবেকানন্দের আর্থ-সামাজিক চিন্তার ভিতর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দরিদ্র শ্রমজীবী ​​মানুষের প্রতি সহানুভূতি। তাঁর মতামত মার্কসবাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়নি। তবে তিনি অর্থনীতির প্রথাগত বা অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে সামন্ত শাসক, জমিদার বা নিয়োগকারীদের শ্রমজীবীদের পারিশ্রমিকের চেয়ে কম মজুরি প্রদান করে উদ্বৃত্ত মূল্যকে বিবেচনা করেছিলেন। এই কারণেই স্বামীজীকে ভারতের প্রথম সমাজতান্ত্রিক হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। তবে সমাজতন্ত্র সম্পর্কে স্বামীজীর দৃষ্টিভঙ্গির মার্কসবাদের সাথে গুণগত পার্থক্য রয়েছে।

 

বিবেকানন্দ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে সামাজিক বিকাশের চূড়ান্ত পর্বে শূদ্র বিধি প্রতিষ্ঠা ঘটবে। বিবেকানন্দ উল্লেখ করেছিলেন যে, বিভিন্ন পর্যায়ে সমাজের ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় (যোদ্ধা ও রাজাদের শ্রেণি) এবং বৈশ্য (বা বণিক) আধিপত্য ছিল। এমন এক দিন আসবে যখন শূদ্র (শ্রমজীবী) শক্তিশালী, সামাজিক শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হবে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানবের সহজাত প্রবণতার চালিকা শক্তিই তাদের অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিকতার প্রকাশ ঘটায়, অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য নয়। যদিও বিবেকানন্দ ইতিহাসে অর্থনৈতিক শক্তির ভূমিকা পুরোপুরি অস্বীকার করেননি। দ্বিতীয়ত, কার্ল মার্ক্সের বিপরীতে স্বামীজী উচ্চবিত্তকে ধ্বংস ও পিষ্ট করার পক্ষে ছিলেন না। তৃতীয়ত, স্বামীজির কাছে ধর্ম “জনগণের আফিম” ছিল না। ধর্মই মানুষের জীবনের ভিত্তি।

 

হিন্দুত্ববাদ শব্দটি প্রথমত বীর সাভারকর জাতীয়তাবাদ সংজ্ঞায়িত করার জন্য ব্যবহার করেছিলেন। শব্দটি নিজেই উনিশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে আবিষ্কৃত শব্দ যার অর্থ “হিন্দুনেস”। হিন্দুত্ব অনুপ্রেরণা ছিল প্রথম বড় জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের ভিত্তি – স্বদেশী [স্বনির্ভরতা] আন্দোলন, যার মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ছিলেন প্রধান সঞ্চালক। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে এই শব্দটি অনুসৃত হয়েছিল। সময়কাল হিসেব করলে দেখা যাবে তা সাভারকারের রচনার অনেক আগে। তবে আজ ইন্টিগ্রেটেড হিন্দুত্ব হল একটি পরিচয়, সামাজিক সাংবিধানিক শৃঙ্খলা, আধুনিকতা, সভ্যতার ইতিহাস, অর্থনৈতিক দর্শন এবং শাসন পরিচালনার বহু-মুখী ধারণা। ইদানীং হিন্দুত্ববাদীরা বিবেকানন্দ গান্ধীর সঙ্গে শ্রী অরবিন্দকেও দখল করার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। শ্রী অরবিন্দের যে সূত্রটি তাঁরা মূলত অনুসরণ করছেন, তা সাভারকারের মতো একই ভিত্তিযুক্ত হলেও আরও বিস্তৃত। উপরন্তু অধার্মিক, নাস্তিক্যবাদী, গোপূজন বিরোধী এবং গান্ধী হত্যায় অভিযোগে কলঙ্কিত সাভারকারের পিছনের সারিতে চলে যাওয়া শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা। মনে রাখতে হবে কেন্দ্রীয় সরকারের এক এবং দুই নম্বর ব্যক্তি মোদী এবং অমিত শাহ দুজনেই গান্ধীর উৎস রাজ্য গুজরাট থেকে আগত। আর সাভারকার মহারাষ্ট্র-সন্তান। আরএসএসও মূলত মহারাষ্ট্রীয়ান ব্রাহ্মণদের সংগঠন। ফলে সাভারকারকে মুছে ফেলা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হচ্ছে।

 

হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের প্রথম ধাপ অবশ্যই হিন্দু অর্থনীতি। হিন্দু অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার দুটি ধাপ। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বলতে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র। হিন্দুধর্মের আধারে লিখিত এই অর্থনীতিকে প্রতিষ্ঠা করার অর্থ নেহেরুর সমাজতান্ত্রিকতা ঘেঁষা অর্থনীতি এবং গান্ধীর পঞ্চায়েতকেন্দ্রিক অর্থনীতি আর তত্বগতভাবে ক্যাপিটালিজম ও কমিউনিজম দুয়েরই বিরোধিতা করা। স্বদেশী জাগরণ মঞ্চের পক্ষ থেকে হিন্দু অর্থশাস্ত্র নামের যে পুস্তকটি প্রকাশিত হয়েছিল, সেই সময় কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার সেক্রেটারি ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত বলেছিলেন, এই রাম মন্দিরওয়ালারা হঠাৎ আর্থিক ক্ষেত্রে প্রবেশ করছে কেন? এরা রাম মন্দির নিয়ে কথা বলছিল ঠিক ছিল, কিন্তু আর্থিক ক্ষেত্রের বিষয়টি তো আমাদের জন্য। উনি আরো বলেছিলেন যে ওখানে তো সব সাধুসন্তরা একত্রিত হয়েছে। ওদের ডাংকেল প্রস্তাব নিয়ে কিসের উৎসাহ?

 

সংঘপরিবারের পরম পূজ্য গুরুজী গোলওয়ালকার বলেছিলেন যে হিন্দু আর পাশ্চাত্য বিচারে আর ব্যবহারে জায়গায় জায়গায় প্রচুর পার্থক্য দেখা যায়। তার কারণ তাদের আর আমাদের বিশ্বদর্শন আলাদা। ওদের বিশ্ব দর্শন ভৌতিকতা প্রধান, আমাদের বিশ্ব দর্শন চৈতন্যময়। আমাদের ঋষিরা সত্যের সাক্ষাৎ করেছেন আর নিজের অনুভূতি ‘অহম ব্রহ্মাস্মি’ বলে প্রকট করেছেন। অথবা তত্ত্বমসি, অর্থাৎ তুমিই সেই (ব্রহ্ম)। তবে দেশের সুখ-সমৃদ্ধির জন্য দেশের সম্পত্তির পরিমাণ বিপুল মাত্রায় হওয়া আবশ্যক। সবার সুখের জন্য আবশ্যক হল বিপুল পরিমাণ উৎপাদন। জীবনের উপযোগী এবং প্রয়োজনীয় বস্তুগুলি যখন অধিকমাত্রায় উৎপাদিত হবে, অধিক লোকের সুখের কারণ হবে। এটি আমাদের বৈদিক অর্থশাস্ত্র। এটি পাশ্চাত্য লোকেরা বুঝতে পারে না, কারণ যখন বস্তু বাজারে অধিক পরিমাণে আসে তখন তার মূল্য কমে যায়, আর মূল্য কমে গেলে মুনাফা কমে যায় – এই অবস্থা তাদের পছন্দ নয়। তাদের চিন্তায় তো শুধুমাত্র আমার মুনাফা কিভাবে বাড়বে তারই চিন্তা। মুনাফা বাড়ানোর জন্য বস্তুর মূল্য বাড়ানো প্রয়োজন, আর বস্তুর মূল্য বাড়াতে হলে বাজারে তার যোগান কম হতে হয়। গ্রেট ডিপ্রেশনের সময় আমেরিকায় উৎপাদন প্রচুর মাত্রায় হয়ে যাওয়ার ফলে বিপুল পরিমাণ বস্তু সমুদ্রে ফেলে দিতে হয়েছিল। এদিকে সাম্প্রতিক হিন্দুত্ববাদীরা মুখে যাই বলুক না কেন হিন্দু অর্থশাস্ত্রের বদলে মুনাফাভিত্তিক বিশ্ব অর্থনীতির ধারাকেই তারা পদ্ধতিগতভাবে অনুসরণ করে চলেছে।

 

একটা সময় ছিল যখন  বামদিকে ঝোঁকা প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী অর্থদপ্তরটি অবধি নিজের হাতে রেখেছিলেন। জনতা পার্টির সুব্রহ্মনিয়ান স্বামী দাবী করেছিলেন যে, ভারতে প্রতি বছর ৩.৫%-এর পরিবর্তে ১০% বৃদ্ধি হতে পারে, ভারত স্বনির্ভরতা অর্জন করতে পারে এবং তার প্রতিরক্ষার জন্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে, যদি দেশ সোভিয়েত মডেলের সমাজতন্ত্র ছেড়ে দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক বাজার অর্থনীতি অনুসরণ করে। এই ব্যবস্থাটি সনাতন ধর্ম থেকে প্রাপ্ত মূল্যবোধের সাথে মিলিত, যা কিনা মহাত্মা গান্ধী স্বাধীনতা অর্জনের আগে প্রচার করেছিলেন রামরাজ্যের স্লোগান তুলে ধরে। এখানে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ প্রচারক দত্তোপান্ত বাপুরাও ঠেঙ্গাড়ির প্রসঙ্গ উত্থাপন জরুরী। জন্মসূত্রে মহারাষ্ট্রের ওয়ারধা জেলার আরভি গ্রামের দত্তোপান্ত বাপুরাও ঠেঙ্গাড়ি (১৯২০-২০০৪) ছিলেন একজন আদর্শ ভারতীয় হিন্দু অর্থনীতির প্রচারক, ট্রেড ইউনিয়ন নেতা এবং স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ, ভারতীয় মজদুর সংঘ এবং ভারতীয় কিষাণ সংঘের প্রতিষ্ঠাতা। হিন্দু অর্থনীতি সম্পর্কে গুরু গোলওয়ালকারের এবং পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের (যিনি ‘ইন্টিগ্রাল হিউম্যানিজম’ – এই শব্দবন্ধটি তৈরি করে বিশ্ব মানবতাকে সংকেত দিয়েছেন) পরেই তাঁর স্থান নির্ধারণ করা হয়। তিনি বলেছিলেন –

 

১. পশ্চিমের অগ্রগতি ও বিকাশের সর্বজনীন মডেলকে আমরা উজ্বল দৃষ্টান্ত হিসাবে গ্রহণ করি না। আমরা ভাবি না যে আধুনিকায়ন মানেই পশ্চিমীকরণ।

২. ইউরোপীয় চিন্তাবিদ এবং তাদের ভারতীয় শিষ্যরা ধারণা করেন যে, বিশ্বের প্রতিটি সমাজকে ইউরোপীয় সমাজগুলির মতো উন্নয়নের একই ধাপ পার হতে হয়েছে, বা হতে হবে। তবে এটি সত্য থেকে দূরে। সুতরাং, এটি অনুমান করা ভুল যে পাশ্চাত্য ব্যাধি নিরাময়ে যা কার্যকরী ছিল সেই একই প্রতিকারগুলি প্রাচ্যের দেশগুলিতেও সমান কার্যকর হবে। তথাকথিত উন্নত দেশগুলির অন্ধ অনুকরণ কোনও কাজে আসবে না। গুরুজী লক্ষ্য করেছিলেন যে, ঈশ্বর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন প্রশ্নপত্র দিয়েছেন।

৩. জ্ঞান এবং সত্য চারিত্রিকভাবে সর্বজনীন। সত্য কোন শ্রেণি, বর্ণ বা জাতি জানে না। অবশ্যই সবকিছুকে আমাদের অতীত ঐতিহ্য এবং বর্তমান প্রয়োজনীয়তার আলোকে যাচাই করতে হবে এবং তারপরে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে এর কতটুকু গ্রহণ করা হবে, কতটা অভিযোজিত হবে এবং কতটা প্রত্যাখাত হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যা বৈধ, তা দর্শন, ধর্ম, নৈতিকতা এবং আদর্শের ক্ষেত্রে সমানভাবে বৈধ হিসাবে গ্রহণ করা যায় না।

৪. এটি সর্বজনবিদিত যে পুঁজিবাদ তার ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পাদনের পরেই সমাজতন্ত্রের কল্পনা এসেছিল। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রবর্তকরা দরিদ্র দেশগুলিতে সমাজতন্ত্রের আগমনের পূর্বাভাস দেননি। এমনকি মার্কসও স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, সমৃদ্ধ নয় এমন সমাজগুলির জন্য সমাজতন্ত্র অপ্রাসঙ্গিক। তৃতীয় বিশ্বের সমস্ত দেশ এই বিভাগে রয়েছে। এই দেশগুলিতে সমাজতন্ত্রের অর্থ কেবল দারিদ্র্যের সমান বন্টন।

৫. বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানবতার সমস্যা সমাধানে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির কার্যকারিতা সম্পর্কে আমাদের গভীর বিশ্বাস রয়েছে। আমরা এই সম্ভাবনাটিকে অস্বীকার করি না যে অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের সমস্ত জাতি তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য দিকনির্দেশ চেয়ে সনাতন ধর্ম এবং হিন্দু সংস্কৃতিতে ফিরে আসবে।

 

মনে রাখতে হবে যে মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, ধনী ব্যক্তিদের অবশ্যই তাদেরকে দেশের সম্পদের ট্রাস্টি হিসাবে বিবেচনা করা উচিত। এখানে মনে করে দেখুন নরেন্দ্র মোদী ও নিজেকে দেশের সম্পদের অছি বা ট্রাস্টি এমনকি চৌকিদার হিসাবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। একজন ট্রাস্টি হিসাবে, প্রতিটি ব্যক্তির স্বাস্থ্যহানি এবং পরিবেশ দূষণের জন্যও তিনি যত্নশীল। তিনি প্রাণীর সঙ্গেও মানবিকভাবে আচরণ করেন। বিশেষত যে প্রাণী মানব সভ্যতার সম্পদ, সেখানে ট্রাস্টি প্রাণীটিকে লালন-পালন ও শ্রদ্ধার জন্য ঐশী হিসাবে বিবেচনা করবেন। গরু এমনই একটি প্রাণী। ঐতিহ্যবাহী হিন্দু বিশ্বাসে, গরু মাতৃজ্ঞানে পূজ্য। এবং এখানেই সাভারকারের সঙ্গে গোলওয়ালকারের মতদ্বৈধতা। সাভারকারের মতে গরু পালনযোগ্য এবং গোদুগ্ধ ব্যবসা যোগ্য। অন্য দিকে সঙঘপরিবারের কাছে গরু পরমপূজ্য। গো-অর্থনীতি অবশ্য দুজনের কাছেই প্রহণযোগ্য। ভারতীয় জাতের গরুর নিম্ন দুধের ফলন উন্নত করার জন্য, ইউরোপীয় উচ্চ ফলনশীল গাভীর সাথে ক্রস প্রজননের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। ভারতীয় সমাজ গরুকে ‘মা’ সম্বোধন করেছে। “তিলাম না ধনয়াম, পশুভাহ না গাভঃ” (তিল শস্য নয়, গরু প্রাণী নয়)।

 

সনাতন ধর্ম চিরন্তন, কারণ এটি কোনও অবতার বা একজন নির্বাচিত ভাববাদীর শিক্ষার উপর ভিত্তি বিস্তৃত নয়।  কিন্তু হিন্দুত্ববাদের দুটি ধারা। এক সাভারকারের রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক হিন্দুত্ববাদ, অন্যটি বিবেকানন্দ, ঋষি অরবিন্দ, গোলওয়ালকার, ঠেঙ্গরী, উপাধ্যায়ের আধ্যাত্মিক হিন্দুত্ববাদ। বিজেপি এঁদের প্রত্যেককে (অ-মুসলিম, অ-খৃস্টান) আত্মসাৎ করতে উদগ্রীব। বিবেকানন্দ ও শ্রী অরবিন্দের উপর দখলদারিত্ব কায়েম করা তার আরেকটি উদাহরণ। ঋগবেদে আছে ‘একম স্যাৎ, বিপ্র বহুধা বদন্তি,’ অর্থাৎ “মহাজাগতিক সত্য এক, তবে জ্ঞানী লোকেরা তা বহুভাবে প্রকাশ করে।” হিন্দুত্ববাদ হ’ল সনাতন ধর্মের ব্যবহারিক ও রাজনৈতিক প্রকাশ। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন যে এই পৃথিবী প্রত্যেকের প্রয়োজনের জন্য যথেষ্ট কিন্তু প্রত্যেকের লোভের জন্য নয়। আমাদের দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর হুমকির কারণ হ’ল এদেশে বিদেশী মূলধনের ক্রমবর্ধমান বিস্তৃতি এবং একচেটিয়া পুঁজি যা ক্রমবর্ধমান। মেক ইন ইন্ডিয়ার নামে নরেন্দ্র মোদীরা বিদেশী পুঁজিকে স্বাগত জানাচ্ছে। বিশ্বের বহুজাতিক সংস্থাগুলির মৃগয়াক্ষেত্র ভারতবর্ষ। অতএব, এই মুহুর্তে আমাদের দেশের প্রধান সমস্যা হ’ল বিদেশী অর্থনৈতিক আক্রমণগুলির আধিপত্যের পাশে দেশজ লাভজনক সংস্থাগুলিকে দেশীয় পুঁজিপতি আর বিদেশী পুঁজির কোলাবরেশনের কাছে বিক্রি করে দেওয়া। আজ মহারাষ্ট্রের বদলে গুজরাট দেশের অর্থনীতি কেন্দ্র হতে চলেছে। হিন্দুত্ববাদীরা ইদানীং শ্রী অরবিন্দের আবিষ্কৃত সূত্রকে বিস্তৃত এবং সাভারকারের সূত্রগুলিকে সংকীর্ণ বলে অভিহিত করতে শুরু করেছেন। আমার ধারণা এটি হিন্দুত্ববাদ থেকে সাভারকারকে প্রান্তিক করে দেওয়ার সঙ্ঘপরিবারের দীর্ঘকালীন ছক।

 

[আগামী কিস্তিতে সমাপ্য]

 

গ্রন্থসূত্র ও তথ্য সূত্র:

  1. The Origins of Religious Violence : An Asian Perspectiveby Nicholas F. Gier
  2. Who is Hindu?by V.D. Savarkar
  3. The Hindu Mahasabha and the Indian National Congress, 1915 to 1926, by Richard  Gordon
  4. The Gandhian Confusion by D. Savarkar
  5. Hindu Rastro Darshan D. Savarkar
  6. Country First? Vinayak Damodar Savarkar (1883–1966) and the Writing of Essentials of Hindutva, by Janaki Bakhle
  7. Third Way by Dattopant Thengadi
  8. Savarkar: Echoes from a Forgotten Past, by Sampath, Vikram.
  9. The Brotherhood in Saffron: The Rashtriya Swayamsevak Sangh and Hindu Revivalism, by Walter Anderson & Shridhar D. Damle
  10. Marathi – Gandhi Hatya Abhiyogatil Savarkaranche Nivedan
  11. Economic Thoughts of Swami Vivekananda by Sebak Kumar Jana
  12. Bunch of Thoughts by Golwalkar
  13. भावी भारत का निर्माण – दत्तोपंत ठेंगड़ी
  14. Global Economic System-A Hindu View
  15. Mohan Bhagwat’s Speech Reflects Concerns About Prime Minister Narendra Modi – By Mani Shankar Aiyar
  16. small is beautiful by E.F. Shumakher
  17. Full Text of speech by RSS Sarasanghachalak Mohan Bhagwat’s RSSVijayadashami Speech-2015
Share this
Leave a Comment