হিন্দুত্বের ক্রোনোলজি ও স্বাতন্ত্র্যবীর সাভারকার : অষ্টম কিস্তি


  • July 6, 2020
  • (0 Comments)
  • 829 Views

বিনায়ক দামোদর সাভারকারের ‘হিন্দুত্ব’ তত্ত্বের উপর গড়ে উঠেছে আজকের আরএসএস-বিজেপি-র সাম্প্রদায়িকতা, বিদ্বেষ ও ঘৃণার রাজনীতি। গোহত্যা, জাতিভেদ, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি বিষয়ে সাভারকারের মত থেকে বর্তমান মৌলবাদী হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শাসকশক্তি আজ অনেকটাই সরে এসেছে। বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদীর হিন্দুত্ব আসলে একদিকে সাভারকার আর অন্যদিকে হেডগেওয়ার আর গোলওয়াকারের ধর্মভাবনার এক খিচুড়ি তত্ত্ব। এই প্রেক্ষিতে সাভারকারের মতবাদ ও জীবন নিয়ে কয়েকটি কিস্তিতে দীর্ঘ আলোচনা রাখলেন পার্থ প্রতিম মৈত্র

 

প্রথম কিস্তি : গো-পূজন বিরোধিতা ও বর্তমান স্বীকৃতি পর্ব  

দ্বিতীয় কিস্তি : স্বাধীনতা সংগ্রাম ও নির্বাচনী পরাজয় পর্ব

তৃতীয় কিস্তি : হিন্দুধর্ম ও হিন্দুত্ব পর্ব 

চতুর্থ কিস্তি : হিন্দু উত্থান ও নির্বাচনী বিজয় পর্ব 

পঞ্চম কিস্তি : কংগ্রেস রাজনীতি ও সাম্প্রতিক সাভারকার পুনর্বাসন পর্ব 

ষষ্ঠ কিস্তি : হিন্দুরাষ্ট্রের তত্ত্বনির্মাণ পর্ব 

সপ্তম কিস্তি : বিবেকানন্দ, হিন্দুত্ব ও দেশভাগ পর্ব 

 

অষ্টম কিস্তি : হিন্দু রাষ্ট্র ও ঘৃণার রাজনীতি পর্ব

 

ভারতের মত সুবিশাল দেশে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীকে দলের পিছনে সারিবদ্ধ করতে হয়। যে ক্ষমতা একসময় কংগ্রেসের ছিল, আজ বিজেপির আছে। সীমিত ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টিরও এই ক্ষমতা ছিল, আজ তা বিলীয়মান। ভারতবর্ষের মত একটি সুবিশাল ভৌগোলিক অঞ্চলের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন কাজ। বিশেষ করে গণতন্ত্রের শর্ত অনুযায়ী ১৩০ কোটির দেশে প্রত্যেকে যদি নিজেদের বক্তব্য বলতে শুরু করে তবে যে ক্যাওসের সৃষ্টি হবে, পৃথিবীর কোনও গণতন্ত্রের পক্ষে তাকে সামাল দেওয়া মুশকিল। অতএব পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রে শিক্ষা বলতে ব্যাঙ্কিং কনসেপ্ট অব এডুকেশন অর্থাৎ সাধারণ মানুষের মস্তিষ্কের ডাটাব্যাংকে দলীয় তত্ত্ব আমানত রাখা, এবং তাদের প্রশ্ন না করতে শেখানো। কিন্তু এখানেই একটি রহস্য প্রকট হয়ে ওঠে যে, এক দীর্ঘ সময় হিন্দুত্ববাদীরা তো ভারতের জনতার আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে কোনওক্রমে অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রেখেছিল। তারা কোন জাদুমন্ত্রে এই দানবিক চেহারা ধারণ করতে সক্ষম হলো?

 

যে কোনও রাজনীতির কতকগুলি বৈশিষ্ট্য থাকে। ভালবাসার রাজনীতি অথবা ঘৃণার রাজনীতি। হিংসার রাজনীতি অথবা অহিংসার রাজনীতি। ইনক্লুশনের রাজনীতি অথবা এক্সক্লুশনের রাজনীতি। তা ছাড়া প্রত্যেক রাজনীতি এক অনাগত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায়। যে ভবিষ্যতের একটা বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে। কংগ্রেসের রাজনীতি ছিল স্বাধীনতা অর্জনের, বৃটিশ অধীনতা মুক্তির রাজনীতি। তার পিছনে একদিন সারা ভারতবর্ষ সামিল হয়েছিল। পাশাপাশি সাভারকার শ্যামাপ্রসাদদের রাজনীতি ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রকাশ্য বিরোধিতা, প্রতি পদক্ষেপে বৃটিশের সঙ্গে সহযোগিতা, তাদের জনবিচ্ছিন্ন করেছে। দেশভাগের, বাংলাভাগের পক্ষে তাদের ভূমিকা, স্বাধীনতার পর গান্ধী হত্যা, তাদের বহু বছরের জন্য পিছিয়ে দেয়। নেহেরুর সমাজতান্ত্রিক ভাবনার ঘোরে দীর্ঘদিনের জন্য মানুষ ক্ষমতার রাশ কংগ্রেসের হাতেই তুলে দিয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে তারা বুঝতে পারে সেই স্বপ্নের ভবিষ্যৎ স্বপ্নেই মিলিয়ে গেছে। তাদেরও মোহভঙ্গ হলো। কংগ্রেসী নেতারা সে সময় হিন্দু মুসলমান দু’পক্ষের হয়েই খেলছে। ইন্দিরার জরুরি অবস্থা, দেশজোড়া উৎপীড়ন, মানুষের মুখ ফিরিয়ে নেবার শুরু।

 

কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষেত্রেও তাই। তাদের সমর্থকেরা ভবিষ্যত সাম্যসমাজের স্বপ্নে বিভোর ছিল। বিশ্বাস করতো, একদিন এই রাষ্ট্রব্যবস্থা উবে যাবে। উইদারিং অ্যাওয়ে অব স্টেটস। তারা খেয়ালও করে নি কোন যুগে স্তালিন ঘোষণা করেছিলেন যে রাষ্ট্র তো একদিন উবে যাবেই। কিন্তু সেই বিলয় ত্বরাণ্বিত করার জন্য সোভিয়েত রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। ফলে রাষ্ট্রের বিলুপ্তির কোনও সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে নেই। চিনের ধনতান্ত্রিক মোড়, রাশিয়ার ধনতান্ত্রিক মোড়, সারা পৃথিবী থেকে কমিউনিজমের উবে যাওয়া দেখে দেখে মানুষের মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার শুরু। মতাদর্শ মুছে যাওয়ায়, যা পড়ে রইলো তা হলো সংসদীয় গণতন্ত্রের পাঁক ঘাঁটা। তিনটি প্রধান মতাদর্শ, ধর্মনিরপেক্ষতা, হিন্দুত্ববাদ আর কমিউনিজম জনগণের আস্থা হারিয়েছে। মতাদর্শগুলি তাদের কাল্পনিক স্বর্গরাজ্যের ভেদশক্তি হারিয়ে কেবলমাত্র নামে পর্যবসিত হয়েছে। এখন  ভারতের নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে মতাদর্শ নয়, নেতা বা নেতৃমণ্ডলীর ব্যক্তিগত ক্যারিশ্মা, প্রচার, প্রতিশ্রুতি ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে, তারা কাকে ক্ষমতায় বসাবে।

 

বর্তমান ভারতের দুটি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল কংগ্রেস এবং বিজেপি। এদের দুজনের সঙ্গেই জোট বাঁধে পরস্পর বিরোধী আঞ্চলিক দলগুলি। এদের মধ্যেই ক্ষমতার হাতবদল হয়। কংগ্রেস ধর্মনিরপেক্ষ, বিজেপি হিন্দুত্ববাদী। হিন্দুত্ববাদী দলগুলি প্রথমাবধি নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষতার অ্যান্টি থিসিস হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে এসেছে। তাদের টার্গেট ছিল দেশের সংখ্যাগুরু হিন্দু জনতা। ঘৃণার রাজনীতি, হিংসার রাজনীতি অথবা এক্সক্লুশনের রাজনীতি। তা ছাড়া প্রত্যেক রাজনীতি এক অনাগত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায়। হিন্দুত্ববাদীরা ভবিষ্যতের হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্ন ফেরী করতে শুরু করে। যদিও সে সময়ে সে স্বপ্নের কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা ছিলনা। কেননা প্রতিপক্ষ ছিলেন স্বয়ং গান্ধী।

 

‘দ্য গান্ধিয়ান কনফিউশন’ গ্রন্থে সাভারকার গান্ধীকে তীব্র আক্রমণ করে লিখেছেন:

 

যথেষ্ট হয়েছে। নেশনের হতাশার পক্ষে যথেষ্ট এই আত্মত্যাগ, আত্মবল, সত্যাগ্রহ, অহিংসা, সত্য ইত্যাদি শব্দ। রাজনীতির এই মকারি যথেষ্ট। যথেষ্ট এই গান্ধীয়ান বিভ্রান্তি! …হ্যাঁ, আপনি যদি সত্যিই আপনার দেশের জন্য উপযুক্ত কিছু করতে চান তবে এই শিশুসুলভ দর্শন এবং এই বিজ্ঞানকে পদদলিত করুন! এবং কোনও বৃদ্ধা ঠাকুমার মত জিজ্ঞাসা করবেন না, এটি কি ‘সত্যগ্রহ’র সাথে খাপ খায়? শিবাজির মতো জিজ্ঞাসা করুন, আমাদের ন্যূনতম ক্ষতির সাথে এটি কি দুষ্ট শত্রুর সর্বাধিক ক্ষতি করতে পারে? এটিকে সত্যাগ্রহ (নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ) বা শস্ত্রাগ্রহ (সক্রিয় সশস্ত্র প্রতিরোধ) যাই বলা হোক না কেন, পাত্তা দেবেন না।

 

মুসোলিনিকে দেখুন, যার পরিকল্পনা ছিল পুরো ইতালি জুড়ে ফাইটার প্লেন উড়িয়ে ছাদের মতো রৌদ্রকেও ঢেকে দেওয়া। লেনিন এবং ট্রটস্কির দিকে তাকান। জারের শাসনকে সাবভার্ট করে পুরো জাতিকেই রেড গার্ড হিসাবে তৈরী করেন, যারা ইউরোপীয় শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সক্ষম। চীনকে দেখুন; এটি কয়েক মিলিয়ন সুসজ্জিত সৈন্য নিয়ে বিদেশী হানাদারদের তাড়িয়ে দিচ্ছে। আর ইংল্যান্ডের দিকে তাকান! এমনকি ট্যাঙ্ক, সাবমেরিন, বিমান এবং বোমা ছাড়াই এটি একটি ঘড়ির মতো কার্যকরভাবে নীরবে সাম্রাজ্য চালাচ্ছে। প্রতিটি ব্রিটিশ নাগরিক কার্যত একজন মুসোলিনি। আর এই বিশাল অশান্ত যুদ্ধের ময়দানে এই …দেখুন আপনি কার হাতে ভারতের ভাগ্য অর্পণ করেছেন! তারা প্রকৃতপক্ষে চরকা ঘুরিয়ে ভারতকে চক্রবর্তী তৈরি করতে চলেছে। …আমরা স্বীকার করি যে গান্ধীজী হলেন একজন মহাত্মা এবং যতক্ষণ না তিনি তাঁর নিজস্ব অঞ্চলের বাইরের বিষয়গুলিতে মাথা ঘামান না, তিনি শ্রদ্ধেয়। তবুও তাঁর মতো ব্যক্তিরা যারা স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম বিস্ফোরণেই হতবাক হন এবং থরথরিয়ে কাঁপেন, যারা রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি অপরিপক্ক, তাঁরা আমাদের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা হতে পারেন না। এখানে আপনার দরকার একজন চাণক্য, একজন সমর্থ রামদাস। এটি গান্ধিজির বিষয় নয়।

 

মনে রাখতে হবে এই কথাগুলি এমন একজন বলছেন, যাঁর বিরুদ্ধে বৃটিশের কাছে আত্মসমর্পণ, ক্ষমাভিক্ষা এবং স্বাধীনতা আন্দোলনকে সাবভার্ট করার অভিযোগ রয়েছে।

 

মানুষের মনোজগতেই শুভ আর অশুভ শক্তির দ্বন্দ্ব চলে, অহিংসা ও হিংসার দ্বন্দ্ব চলে। হিন্দুত্ববাদীরা প্রথম থেকে চেষ্টা করে চলেছে হিন্দুদের ভিতরের অশুভশক্তিকে জাগিয়ে তুলতে। তাদের কাছে সবটাই ফিজিকাল, সবটাই জান্তব ও মাংসল। সারাক্ষণ অস্ত্রের ঝনঝনাৎ, যুদ্ধ হত্যা রক্তস্রোত ছাড়া তাঁদের অন্য কোনও আত্মোপলব্ধি নেই। গুরুজী গোলওয়ালকার তাঁর ‘বাঞ্চ অব থটস’ বইতে লিখেছেন:

 

প্রথম প্রয়োজন অজেয় শারীরিক শক্তি। আমাদের এতটা শক্তিশালী হতে হবে যে পুরো পৃথিবীতে কেউই আমাদেরকে দাবিয়ে রাখতে সক্ষম হবে না। তার জন্য, আমাদের শক্তিশালী এবং স্বাস্থ্যকর শরীরের প্রয়োজন। … কাপুরুষদের দ্বারা কিছুই অর্জন করা যায় না, এই পৃথিবীতে বা অন্য কোথাও। স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন, ‘আমি লোহার পেশী এবং স্টিলের স্নায়ুযুক্ত পুরুষদের চাই’। তিনি নিজেও এমন ছিলেন। কিছু সহ-শিষ্য সর্বদা বসে বসে অশ্রু বর্ষণ করছিলেন জানতে পেরে তিনি বজ্রগর্জন করতেন, ‘এটি ভক্তি নয়। এটি নার্ভের দুর্বলতা। বসে বসে ছোট মেয়েদের মতো কাঁদবেন না’।

 

সঙ্ঘপরিবারের পৌরুষ চর্চায় স্বাভাবিকভাবেই মহিলাদের স্থান ছিল না। মনুস্মৃতিকে যাঁরা ভারতের সংবিধান হিসেবে মেনে নেওয়ার দাবী করতেন তাঁদের কাছে এটাই স্বাভাবিক।

 

মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত নেহেরু, জিন্নার মতো বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সাভারকারের কোনও সখ্যতা ছিল না। তিনি ইসলাম ও খৃষ্টান ও কমিউনিজমের মতো সম্প্রদায়গুলিকে এমনভাবে সুসংগঠিত প্রচারের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যেন এই সম্প্রদায়ের মানুষেরা নৃশংস, এবং তারা হিন্দুধর্ম এবং হিন্দুত্ববাদকে আক্রমণ করার চেষ্টা করছে। সাভারকার হিন্দু জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে তাঁর মতামত এমনভাবে ছড়িয়ে দিয়েছেন, যেন হিন্দুত্ব আক্রান্ত এবং তাকে বাঁচাতে হবে। সাভারকার প্রভাবিত গোলওয়ালকার ‘বাঞ্চ অব থটস’-এ আরও লিখেছেন যে, “ভারতের আভ্যন্তরীণ বিপদ সম্ভাবনা হচ্ছে ইসলাম, খৃস্টধর্ম আর কমিউনিজম।” এই তিন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর জন্য তিনি যা যা লিখেছেন সেগুলিই আজ বিভিন্ন মাধ্যমে বাহিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে হিন্দু জনতার মস্তিষ্কের ডাটা ব্যাংকে। আজও তারা যেই যুক্তিগুলিই আউড়ে চলছে তাদের পক্ষে মানুষকে মোবিলাইজ করার জন্য। কমিউনিজম সম্পর্কে গোলওয়ালকার বলছেন:

 

ভারতের আভ্যন্তরীণ বিপদ সম্ভাবনা হচ্ছে ইসলাম, খৃস্টধর্ম আর কমিউনিজম। …আমাদের দেশে গণতন্ত্রের মারাত্মক ব্যর্থতা হ’ল কমিউনিজমের ক্রমবর্ধমান বিপত্তি, যে কমিউনিজম গণতান্ত্রিক পদ্ধতির বিরুদ্ধে শপথবদ্ধ শত্রু। জনগণের কাছে তাদের অর্থনৈতিক আবেদনে কমিউনিস্টদের কাছে যাতে পিছিয়ে পড়তে না হয় সে জন্য, আমাদের নেতারা কেবলমাত্র কমিউনিস্ট জার্গন এবং কমিউনিস্ট কর্মসূচি হাতে নিয়ে কমিউনিজমকে আরও সম্মানজনক করে তুলছেন। নেতারা যদি ধারণা করেন যে তারা এই জাতীয় কৌশল দিয়ে কমিউনিস্টদের পাল থেকে হাওয়া কেড়ে নেবেন, তবে তারা দুঃখজনকভাবে ভুল করে চলেছেন। তাঁরা আরও মনে করেন যে অর্থনৈতিক বিকাশই কমিউনিজমের বিরুদ্ধে একমাত্র প্রতিরক্ষা। …কোথাও আমরা দেশপ্রেম, চরিত্র এবং জ্ঞানের মতো উচ্চতর অনুভূতির প্রতি অ্যাপিল করা হচ্ছে দেখতে পাইনা; বা সাংস্কৃতিক, বৌদ্ধিক এবং নৈতিক বিকাশের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে, দেখতে পাইনা। কেবল এইরকম দুর্বোধ্য এবং হতাশ মনেই কমিউনিজমের বীজ শিকড় চাড়ায়।

 

নব্বইয়ের দশকের মধ্যে, লালকৃষ্ণ আদবাণীর সভাপতিত্বে বিজেপি সাভারকারের হিন্দুত্বকে আত্মস্থ করে। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার মধ্য দিয়ে হিন্দুত্বর বিজয়ধ্বজা উড়তে শুরু করে এবং পরবর্তী দিনগুলিতে ভারতবর্ষ তার ইতিহাসের কুৎসিততম ধর্মদাঙ্গায় জড়িয়ে পড়ে। তারপর থেকে হিন্দুত্বের বিজয়পর্ব। মনে রাখতে হবে বিজেপির পিতা আরএসএস-এর শুরুর অ্যাজেন্ডা হিন্দুরাষ্ট্র। বাবাসাহেব রচিত সংবিধানের বদলে মনুস্মৃতি আশ্রিত সংবিধানের প্রয়োগে তারা হিন্দু তালিবানি রাজ কায়েম করতে চাইছে প্রথমাবধি। আরএসএস ভারতের তেরঙ্গা জাতীয় পতাকা মানেনি। প্রথম থেকে তারা তেরঙ্গার বদলে ভগোয়া ধ্বজাকে জাতীয় পতাকা করার দাবী তুলেছিল। কিন্তু হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীদের মৃত্যুভীতি ছাড়া ইসলামবিরোধী, খৃস্টানবিরোধী এবং কমিউনিস্ট বিরোধী মানসিকতা এতটাই প্রবল ছিল যে তার কাছে ভারতের স্বাধীনতার প্রসঙ্গটিও মূল্যহীন হয়ে পড়ে। আজকাল সাভারকারকে ছাড়া হিন্দুত্ববাদীদের চলে না তার কারণ এই হিন্দুধর্মের স্বঘোষিত রক্ষাকর্তারা তাঁদের সহিংস গোষ্ঠিতে সাভারকার ছাড়া এমন কারও নাম করতে পারে না যার সামান্য হলেও ব্রিটিশবিরোধী অতীত রয়েছে। সেই সাভারকারও আবার ব্রিটিশের কাছে বারবার ক্ষমাভিক্ষার কলঙ্কে কলঙ্কিত। অতএব সাভারকারের নাস্তিক মানসিকতা, সাভারকারের গো-পূজনবিরোধী অবস্থান, সাভারকারের কাঁধে গান্ধী হত্যা ষড়যন্ত্রের দায় এবং সর্বোপরি সাভারকারের নিজস্ব দর্শন যা হিন্দুত্ব থেকে হিন্দুধর্মকে আলাদা করে ফেলে, এ সব সহ্য করেও বিনায়ক দামোদর সাভারকার এবং তাঁর তত্ত্বকে উর্দ্ধে‌ তুলে ধরা ছাড়া বিজেপির গত্যন্তর নেই।

 

ভারতীয় রাজনীতিতে আরো একটি বিষয় নিকট অতীতেই অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে তা হল তীব্র মরিয়া ভাব। যে মূল উদ্দেশ্যকে প্রচ্ছন্ন রাখা হতো সম্ভাব্যতার শিল্পের বাগাড়ম্বরে, তা পাল্টে গিয়ে এখন কিন্তু এক অদ্ভুত মাস্তানি তার উদ্ধত হাতের ছায়া ফেলেছে রাজনীতির শরীরে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানে এখন শাসক এবং বিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বুঝে গেছে যে ইতর জনের কোনও আন্দোলনে ভয় পাবার কোনও কারণ নেই। একটা প্রলম্বিত সময় ধরে মানুষকে শেখানো হয়েছে গোষ্ঠীবদ্ধ হওয়া, আন্দোলনমুখর হওয়া, প্রতিবাদে প্রতিরোধে সক্রিয় হওয়া, সব আসলে পিছিয়ে যাওয়া। গভর্নমেন্টকে চোখের মণির মতো রক্ষা করতে হবে – এটাই নাগরিকদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। যে কোনও ধরনের আন্দোলন, লড়াই, সংগ্রাম দৃঢ়হাতে যে সরকার গুঁড়িয়ে দিতে পারে সেই সরকারই নাকি প্রকৃত দক্ষ সরকার। এই অদক্ষ, অযোগ্য, অসার্থক গভর্নমেন্ট ইদানীং আর কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্যই দ্বিতীয় বার ভাবে না। কারণ তারা জানে, পুকুরে ঢিল ছুঁড়ে যে ঢেউ তৈরি হয়, তার চাইতে বড় ঢেউ উঠবে না সমাজে। মানুষ নিষ্ক্রিয়, মানুষ অলস। নিষ্ক্রিয়তা বশ্যতা এবং আলস্য এই নিয়ে হচ্ছে নাগরিক জীবন। ভুল বা মিথ্যে যুক্তি সাজানো থেকে শুরু করে অবরোধ উৎপীড়ন হত্যা কয়েদ একের পর পদক্ষেপ গ্রহণ করার পর, পোস্ট-ট্রুথ দিয়ে পোস্ট-লজিক নির্মাণ। তার সঙ্গে যুক্ত হয় সেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করার আগে সর্বস্তরে যে আলোচনার প্রক্রিয়া, তাকে অগ্রাহ্য করা। অন্যদিকে চলে তাকে যুক্তিসিদ্ধ করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা, তার যেকোনো ধরনের বিরোধিতাকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করা, প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলা। চলে প্রতিপক্ষকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ জ্ঞান করা, নাগরিকদের আশাআকাঙ্ক্ষাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া, তাদের মতামত গ্রহণকে অগ্রাহ্য করা। যদি বিরোধী কন্ঠস্বর শোনা যায়, গভর্ণমেন্টের পদক্ষেপের বিরুদ্ধাচারণ অনুরণিত হয়, তবে মদগর্বে গর্বিত শাসক দলের হিংস্রতার প্রয়োগ তাকে স্তব্ধ করে দেয়। এসব আগেও ছিল, কিন্তু বর্তমানের মতো এতো নগ্ন অবস্থায় কখনো ছিল না। দেশ এখন হিন্দু রাষ্ট্র হওয়ার পথে।

 

নবম কিস্তি : ধর্ম ও রাজনীতির ককটেল পর্ব 

 

গ্রন্থসূত্র ও তথ্য সূত্র:

  1. The Origins of Religious Violence : An Asian Perspective by Nicholas F. Gier
  2. Hindutva. Who is Hindu? by V.D. Savarkar
  3. The Hindu Mahasabha and the Indian National Congress, 1915 to 1926, by Richard  Gordon
  4. Demons in Hindutva: Writing a Theology for Hindu Nationalism, by M. Reza Pirbhai
  5. Country First? Vinayak Damodar Savarkar (1883–1966) and the Writing of Essentials of Hindutva, by Janaki Bakhle
  6. Patriots and Partisans: From Nehru to Hindutva and Beyond, by Ramchandra Guha
  7. The History of Hindu India, by Satguru Bodhinatha Veylanswami
  8. Uproot Hinditva: The Fiery Voice of the Liberation Paathers, by Thirumaaialavan, translated from the Tamil by Meenakandasamy
  9. The Saffron Wave: Democracy And Hindu Nationalism In Modern India, by Thomas Blom Hansen
  10. Savarkar: Echoes from a Forgotten Past, by Sampath, Vikram.
  11. The Brotherhood in Saffron: The Rashtriya Swayamsevak Sangh and Hindu Revivalism, by Walter Anderson & Shridhar D. Damle
  12. Savarkar’s views on Hindu Nationalism, by Sauro Dasgupta
  13. Swami Vivekananda : The Friend of All, by Swami Lokeswarananda

 

লেখক প্রাবন্ধিক ও কবি। মতামত লেখকের নিজস্ব।

Share this
Leave a Comment