হিন্দুত্বের ক্রোনোলজি ও স্বাতন্ত্র্যবীর সাভারকার : প্রথম কিস্তি


  • June 21, 2020
  • (1 Comments)
  • 1955 Views

বিনায়ক দামোদর সাভারকারের ‘হিন্দুত্ব’ তত্ত্বের উপর গড়ে উঠেছে আজকের আরএসএস-বিজেপি-র সাম্প্রদায়িকতা, বিদ্বেষ ও ঘৃণার রাজনীতি। গোহত্যা, জাতিভেদ, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি বিষয়ে সাভারকারের মত থেকে বর্তমান মৌলবাদী হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শাসকশক্তি আজ অনেকটাই সরে এসেছে। বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদীর হিন্দুত্ব আসলে একদিকে সাভারকার আর অন্যদিকে হেডগেওয়ার আর গোলওয়াকারের ধর্মভাবনার এক খিচুড়ি তত্ত্ব। এই প্রেক্ষিতে সাভারকারের মতবাদ ও জীবন নিয়ে কয়েকটি কিস্তিতে দীর্ঘ আলোচনা রাখলেন পার্থ প্রতিম মৈত্র

 

প্রথম কিস্তি : গো-পূজন বিরোধিতা ও বর্তমান স্বীকৃতি পর্ব

 

প্রকৃত হিন্দু কে? এই প্রশ্নের উত্তরে বর্তমান ভারতবর্ষে বেশিরভাগ হিন্দু এই ধারণা পোষণ করেন যে হিন্দু হবার আবশ্যিক শর্ত হলো গোমাতাকে নিজের মাতার স্থান দেওয়া এবং গো-পূজন করা। ১৯২৩ সালে বিনায়ক দামোদর সাভারকার ভারতবর্ষে হিন্দু জাতীয়তাবাদের সূচনা করেন। যে গ্রন্থটি হিন্দুত্বের আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয় সেই ‘হিন্দুত্ব’ নামক বইয়ের রচয়িতা সাভারকার তাঁর বিজ্ঞাননিষ্ঠ নিবন্ধ সংকলনে “গোপালান হেভে, গোপুজান নাভেহে” শিরোনামে বারবার বলেছেন, গরু যদি কারো মাতা হয়ে থাকে তবে তা বলদের। মানুষের গো-পূজনের কোন কারণ নেই, কারণ মানুষ তারই পূজা করে যে তার থেকে শ্রেয়তর এবং যার মধ্যে সুপারহিউম্যান কোয়ালিটি রয়েছে এবং গরুর মত মনুষ্যেতর প্রাণী কখনোই মানুষের আরাধ্য হতে পারেনা। বিজ্ঞান বিষয়ক একটি প্রবন্ধে সাভারকার লিখেছিলেন: ভারতের মতো দেশে গরুকে মাতৃজ্ঞানে বিশ্বাস করা স্বাভাবিক। মানুষ গরুর কাছ থেকে দুধ এবং অনেক কিছু পান যা আমাদের প্রয়োজন। অনেক পরিবারের জন্য গাভী পরিবারের অংশ হয়ে যায়। সুতরাং এটি আমাদের জন্য দরকারী। আমাদের কৃতজ্ঞতাই গরুকে ঈশ্বরপ্রতিম করেছে। তবে যদি আপনি মানুষকে গরুর ঈশ্বরত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন তবে মানুষ কেবল তার কার্যকারিতাই বলতে পারে। গরু এমন একটি প্রাণী, যার বুদ্ধি বোকা লোকের চেয়েও কম। আমরা যদি গরুকে ঈশ্বর হিসাবে বিবেচনা করি তবে তা মানুষের জন্য অপমান হবে।

 

সাভারকার গরুর পূজা না করে বরং গরুর যত্নের জন্য অনুরোধ করতেন। তিনি গোমূত্র ও গোবর খাওয়ার বিরুদ্ধেও তার বিরোধিতা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি গোমাংস ভক্ষণ আসক্ত ছিলেন এ বিষয়ে তেমন জোরালো প্রমাণ না থাকলেও তিনি যে গো-ভক্ষণ বিরোধী ছিলেন না তার অসংখ্য উক্তি রয়েছে। গরু একপাশে খায় এবং অন্যদিকে তার নিজস্ব প্রস্রাব এবং গোবর থাকে। লেজটা মুড়িয়ে সে নোংরা করে নিজের সমস্ত শরীর। এমন একটি প্রাণী যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বোঝে না, কীভাবে সে ঈশ্বর হিসাবে বিবেচিত হতে পারে? তাছাড়া গরুর প্রস্রাব এবং গোবরকে কীভাবে পবিত্র বিবেচনা করা যায়, যেখানে আম্বেদকারের মতো মানুষের ছায়াকে অপবিত্র বলে মনে করা হয়। এটি দেখায় যে কীভাবে মানব বুদ্ধি দূষিত হয়েছে। গরুকে খাদ্য হিসেবেও পরিবেশন করুন, কারণ এটি কার্যকর। এর অর্থ হ’ল লড়াইয়ের বা দুর্ভিক্ষের দিনগুলিতে বা যখন এটি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, তখন কেন একে হত্যা করা হবে না তার কোনও কারণ নেই।

 

তাঁর হিন্দুত্ববাদী দর্শনের জন্য পরিচিত সাভারকারের বিখ্যাত উক্তি ছিল। আমাদের গরুর যত্ন করা উচিত, পূজা করা নয়। তিনি গোমূত্র সেবন এবং গোবর ভক্ষণকে ঘৃণা করতেন এবং বিশ্বাস করতেন যে প্রাচীন ভারতে এইগুলি পাপীদের শাস্তি বিধানের জন্যই ব্যবহার করা হতো।

 

আগেই বলা হয়েছে গরু ছিল সাভারকারের কাছে ব্যবহার্য জন্তু, এবং তার পুজো তিনি অর্থহীন মনে করতেন। সুপারহিউম্যান কোয়ালিটির মানুষ গরুকে পূজা করতে পারে এই ধরনের হাস্যকর প্রক্রিয়া তাঁর মতে বুদ্ধিহত্যা করে থাকে। তাঁর এই অত্যুগ্র অবস্থানের জন্য সাভারকার দীর্ঘকাল হিন্দুত্ববাদীদের কাছেও প্রত্যাখ্যাত ছিলেন।

 

দ্বিতীয়ত যে কারণে সাভারকার সাধারণভাবে প্রত্যাখ্যাত তা হলো আন্দামান সেলুলার জেলে থাকাকালীন সময়ে তাঁর একের পর এক ক্লিমেন্সি পিটিশান বা ক্ষমাভিক্ষা পত্র প্রদান। বলা হয়ে থাকে, যে হিন্দুত্ব বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের পথে দেশকে পুনর্নির্মাণের ইচ্ছায় চালিত হয়েই সাভারকার বৃটিশ কারাগার থেকে মুক্তি আদায়ের জন্য ক্ষমাভিক্ষা ও শেষ পর্যন্ত মুক্তি আদায় করেছিলেন। সাভারকার অনুভব করেছিলেন যে হিন্দুরা ঐক্যবদ্ধ নয়। এমনকি তিনি আন্দামানে আর্য সমাজের ধারণাকে ধাক্কা দেওয়ার সাথে সাথে মানুষকে পুনরায় হিন্দু সমাজের অন্তর্ভুক্ত করতে প্রস্তুত ছিলেন। হিন্দুত্ববাদীরা এই প্রধান পার্থক্যকে বর্ণনা করেন এইভাবে যে, সাভারকার তাঁর হিন্দু পুনরুত্থানের ধারণাকে রাজনৈতিক দিক থেকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, ধর্মীয় কারণে নয়। তিনি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। তাঁর মতে এটি ছিল হিন্দু সভ্যতা এবং হিন্দু জীবনযাপন। সাভারকার মুসলিম এবং খৃষ্টান বিদ্বেষী ছিলেন। কিন্তু সবার আগে তিনি ছিলেন আদ্যোপান্ত নাস্তিক এবং বর্ণভেদ বিরোধী। বীর সাভারকার হিন্দুত্ববাদীদের একমাত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের মুখ, যিনি মার্সাই-এ ব্রিটিশ বন্দিত্ব থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং যার ফলশ্রুতিতে ১০ বছর আন্দামান সেলুলার জেলে বন্দী জীবন কাটান । বৃটিশের কাছে তিনি একাধিক ক্ষমাভিক্ষা পত্র পাঠান, যাতে তিনি জানিয়েছিলেন যে এরপর থেকে তিনি ব্রিটিশ উচ্ছেদ নয়, স্বাধীনতা আন্দোলন নয় বরং সাংস্কৃতিক হিন্দুত্ববাদ নিয়ে তার প্রচার ও প্রসারকল্পে জীবন অতিবাহিত করবেন।

 

তৃতীয়ত তিনি ছিলেন হিন্দুধর্মের অন্তর্লীন অস্পৃশ্যতা ও বর্ণভেদ বিরোধী। অস্পৃশ্যতাবিষয়ে তিনি বলেছিলেন, আমাদের দেশ ও সমাজের কপালে একটি কলঙ্ক রয়েছে – অস্পৃশ্যতা। কোটি কোটি হিন্দুর ধর্ম এবং রাষ্ট্র এই কলঙ্কে অভিশপ্ত। আমাদের এভাবেই তৈরি করা হয় আর আমাদের শত্রুরা একদলকে অন্যদলের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিয়ে, আমাদের মধ্যে বিভাজন এনে সফল হতে থাকে। আমাদের অবশ্যই এই মারাত্মক অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে  হবে।এই বর্ণ-অহংকারটি ব্রাহ্মণ থেকে চন্ডাল পর্যন্ত সমস্ত হিন্দু সমাজের হাড় চুষছে, এবং বর্ণ-অহংকারের ঘৃণার কারণে গোটা হিন্দু সমাজ বর্ণ-বিভেদ-আধিপত্যে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।

 

কথিত আছে সাভারকার গরুর মাংস ভক্ষণও করেছিলেন। গরুর মাংসের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে হিন্দু চরমপন্থীদের অনুভূতি আহত হয় এবং এ তারা ক্ষুব্ধ হয়। তারা গরুর উপাসনা করে কিন্তু গরুর মাংস রফতানিতে নীরব থাকে। এমনকি যখন কেন্দ্রে একটি আপাতদৃষ্টিতে হিন্দুত্ববাদী সরকার রয়েছে, তখনও গরুর মাংস রাজনীতিবিদদের পক্ষে একটি ভোট ব্যাংক এবং স্ব-ঘোষিত ‘গো-রক্ষক’ এবং ঈশ্বরের রক্ষাকারীদের আয়ের উৎস। গরু দীর্ঘকাল ধরে ভারতে হিন্দু ধর্মের প্রতীক এবং তাই পবিত্রতার প্রতীক হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। হিন্দুদের মধ্যে সাধারণ ধারণা হ’ল ভারতে মুসলিম বিজয়ের মাধ্যমে খাদ্যের জন্য গোহত্যার সূচনা হয়েছিল। অথচ হিন্দুশাস্ত্রে এমনকি মনুস্মৃতিও গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করে না। চরক সংহিতায় গরুর মাংসকে বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

 

প্রশ্ন হচ্ছে আজ এতদিন পর একজন, আদ্যোপান্ত নাস্তিক, পরধর্ম বিরোধী এবং একই সঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী মানুষের ইতিহাসের পাতা থেকে পুনরুত্থান ঘটছে কেন? কেন নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহ বা নাগপুর ব্র্যাণ্ড হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীরা সাভারকারকে স্বীকৃতি দিতে মরিয়া? বিশেষতঃ যখন সাভারকারের নাম গান্ধীহত্যার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, যে গান্ধীর উত্তরাধিকার হাইজ্যাক করার জন্য গুজরাটি অমিত শক্তিধরেরা প্রাণপণ চেষ্টা করছে?

 

চেষ্টা করছে কারণ:

 

১. হিন্দুত্ববাদের তাত্ত্বিক পটভূমি রচনার কৃতিত্ব বিনায়ক দামোদর সাভারকারের উপরই বর্তায়। তাঁর ‘হিন্দুত্ব’ নামের বইটিই সেই পটভূমি।

২. তিনি ছিলেন মুসলিম ও খৃস্টান বিরোধী। ভারতীয়ত্ব ও হিন্দুত্ব সমার্থক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করায় তাঁর অবদানই তাঁকে ইতিহাসের অন্ধকার থেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা দিয়েছে।

৩. গান্ধীর অহিংসা নীতি ও নেহেরুর সমাজতান্ত্রিক উদারমনস্কতার তিনি আজীবন বিরোধিতা করেছেন এবং ভারতভাগের জন্য জাতীয় কংগ্রেসেরও বিরোধিতা করেছেন। একবিংশ শতকের ভারতে এই ঐতিহাসিক ভিত্তিভূমি রাজনৈতিকভাবে অতি প্রয়োজনীয়।

৪. হিন্দু ধর্ম ও হিন্দুত্ববাদ যে এক নয়, মুসলিম এবং খৃষ্টানদের বাদ দিয়ে বৃহত্তর হিন্দু সমাজ গড়ে তোলা যে আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতাদখলের জন্য অতীব প্রয়োজনীয়, তা সাভারকারের তত্ত্বেই নিহিত রয়েছে।

৫. আন্দামান সেলুলার জেলে বারবার বৃটিশের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা এবং শেষে মুক্তি – তার যুক্তি হিসাবে বলা হয় স্পষ্টতই, তিনি ছত্রপতি শিবাজির বিপ্লবী ও অনুসারী ছিলেন, তার পটভূমিতেই ঘটনাটিকে দেখতে হবে। শিবাজি ১৬৬৬ সালে আগ্রায় কৌশলে আওরঙ্গজেবের বন্দীশিবির থেকে পালিয়ে যান; তার সাযুজ্য রয়েছে ১৯১০ সালে সাভারকারের ব্রিটিশ জাহাজ এসএস মোরিয়া থেকে সমুদ্রে ঝাঁপানো এবং ফরাসী বন্দর মার্সাই-এর কাছে ধরা পড়ার সঙ্গে। তাঁকে যখন ভারতে আনা হয়েছিল তখনও তিনি ব্রিটিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। শিবাজী তাঁর বন্দীদশাকালে আওরঙ্গজেবের কাছে চারটি ক্ষেত্রে ক্ষমা চেয়েছিলেন। চারটি ক্ষমার ভিত্তিতে মোগল এবং শিবাজির মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল। এবং ছত্রপতি শিবাজী কূটনৈতিক এবং সামরিক কৌশলের অংশ হিসাবে ক্ষমা চেয়েছিলেন বলে নিজেই পরে এই চুক্তিগুলির মধ্যে তিনটি ভেঙেছিলেন।

 

সাভারকার হিন্দু পরিচয়, হিন্দু সংহতি এবং হিন্দু ঐক্যের উপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি মৌর্য, গুপ্ত, চোল, মারাঠা প্রভৃতি হিন্দু নেতাদের প্রতিমূর্তি পুনর্নিমাণ করেছিলেন। সাভারকারের মতে, এঁরা এবং আরও অনেক রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক যেমন পুরু, পৃথ্বীরাজ চৌহান, রানা প্রতাপ, শিবাজী, মহারাণী লক্ষ্মীবাঈ প্রমুখ, যাঁরা বিদেশী হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের কাহিনীই জনগণকে অনুপ্রাণিত করবে। তাঁর মতে বৈদিক যুগ থেকে পৃথ্বীরাজ চৌহানের শাসনের শেষ অবধি হিন্দু রাজাদের শাসন ছিল ভারতের হিন্দুদের স্বর্ণযুগ। ১৫৫৭ সালে দিল্লির সুলতানি আমলের সময় থেকে ব্রিটিশদের আগমন পর্যন্ত ইসলামিক বিজয়ীদের যুগ, যা ছিল হিন্দুদের অন্ধকার যুগ। তিনি অনুভব করেন যে, ব্রিটিশরা হিন্দুদের পক্ষে অনেক কিছু করতে পারত, কিন্তু তা করেনি। তিনি বলেছিলেন, হিন্দুদের উপর অত্যাচারে মুসলমানরা যতটা নির্মম ছিল, ব্রিটিশরাও তাই।

 

গান্ধী অহিংসার বিষয়ে কথা বলেন এবং সাভারকার হিংসার প্রচারক। এটা সত্য যে গান্ধী মৃত্যুভয়ে ভীত ছিলেন না, কিন্তু সাভারকার কি ছিলেন? মনে হয় না। গান্ধী যেমন কংগ্রেসের পক্ষে অহিংস বীর সাহসী, সাভারকার তেমনি হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষের বীর ছিলেন। মনে রাখতে হবে, গডসে গান্ধীহত্যার ষড়যন্ত্রের শিকার। গডসে সাভারকারের শিষ্য ছিলেন। তিনি একটি আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। গডসেকে গান্ধীহত্যার জন্য মানব বোমার মতো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। তিনি একটি আদর্শ দ্বারা পরিচালিত ছিলেন। সেই মতাদর্শগত লড়াই আজও চলছে।

 

গান্ধী দ্বারা প্রচারিত সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ দেশকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর ছিল, আর সাভারকারের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ছিল ধ্বংসাত্মক উস্কানিমূলক, বিভাজনের রাজনীতির জন্মদাতা। গান্ধীর জাতীয়তাবাদ অহিংস, ফলতঃ ‘ইনক্লুসিভ’। সাভারকারের জাতীয়তাবাদ উত্তেজক ও বিপজ্জনক, ‘এক্সক্লুসিভ’। সেই জাতীয়তাবাদে জীবনের কোনও সম্মান নেই। হেডগেওয়ার, গোলওয়ারকার মোহন ভাগবত থেকে শুরু করে, বাজপেয়ী, আদবানী অমিত শাহ পর্যন্ত এই বিভাজনের রাজনীতির প্রচারক। এই জাতীয়তাবাদের শিকড় এই দেশে নেই, এটি আমদানিকৃত। জার্মানিতে এই জাতীয়তার শিকড় রয়েছে এবং ইতালিতে মুসোলিনি দ্বারা প্রভাবিত, যা বিরোধী শক্তিকে চূর্ণ করার কথা বলে।

 

সাভারকার ও গান্ধীর  প্রতিতুলনা সাম্প্রতিক সময় আসতে বাধ্য, নইলে বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ হয় না। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মৃদু ও সাত্ত্বিক মুখভাবের পরিবর্তে আমরা দেখতে পাই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মোদীর কৃপণ ও রাজসিক মুখ, বলেছেন শ্রী অনন্তমূর্তি যিনি সাভারকারের হিন্দুত্ব আর গান্ধীর হিন্দু স্বরাজের তুলনা করেছেন খোলাখুলিভাবে। দুই প্রধানমন্ত্রীর মুখভাবের এই তফাৎ মোদী দ্বারা চালিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অবদমিত লোভের বহিঃপ্রকাশ। নির্বাচনের সময় এই মুখটি মিডিয়ার প্রিয় হয়ে ওঠে এবং তাঁর হাজার হাজার ভক্ত এটিকে মুখোশ জেনেও উদ্বেল হন। সমগ্র মানব ইতিহাসে মানুষ বিজয়ীর বিজয়কে অনিবার্য হিসাবে গ্রহণ করেছে। এই গ্রহণযোগ্যতা আত্মতুষ্টির মধ্যে থেকেই জন্মগ্রহণ করে, একটি আরামদায়ক জীবনের নিশ্চয়তার জন্ম দেয়।

 

মনে রাখতে হবে গডসের পুরুষত্ব বা নিজেকে বিজয়ী প্রমাণ করার আকাঙ্ক্ষা ছিল না। গডসে প্রথমে তার হাত জোড় করে প্রণাম করে এবং তারপরে জাতির পিতাকে – এক উন্মুক্ত বক্ষের বৃদ্ধকে – গুলি করেছিল। গান্ধীর এমনকি পুলিশ সুরক্ষাও ছিল না। চূড়ান্ত বিচ্ছিন্নতাকামী ঠাণ্ডা মাথায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হিন্দুত্ববাদী গডসের এই পদক্ষেপ ছিল দেশ গঠনের যজ্ঞে উৎসর্গীকৃত নৈবেদ্য। আর এই যজ্ঞের পাঠ্য ছিল সাভারকার আদর্শ। গণতান্ত্রিক ভারতে, আমাদের সকলের মধ্যে সুপ্ত এই শীতল নৃশংস অনুভূতিই পবিত্র গঙ্গায় আরতি উৎসর্গ করার সময় মোদী এবং ভক্তদের মধ্যে প্রকাশ পায়।

 

দ্বিতীয় কিস্তি : স্বাধীনতা সংগ্রাম ও নির্বাচনী পরাজয় পর্ব

 

গ্রন্থসূত্র ও তথ্য সূত্র:

  1. The Origins of Religious Violence : An Asian Perspective by Nicholas F. Gier
  2. Hindutva. Who is Hindu? by V.D. Savarkar
  3. The Hindu Mahasabha and the Indian National Congress, 1915 to 1926, by Richard  Gordon
  4. Demons in Hindutva: Writing a Theology for Hindu Nationalism, by M. Reza Pirbhai
  5. Country First? Vinayak Damodar Savarkar (1883–1966) and the Writing of Essentials of Hindutva, by Janaki Bakhle
  6. Patriots and Partisans: From Nehru to Hindutva and Beyond, by Ramchandra Guha
  7. The History of Hindu India, by Satguru Bodhinatha Veylanswami
  8. Uproot Hinditva: The Fiery Voice of the Liberation Paathers, by Thirumaaialavan, translated from the Tamil by Meenakandasamy
  9. The Saffron Wave: Democracy And Hindu Nationalism In Modern India, by Thomas Blom Hansen
  10. Savarkar: Echoes from a Forgotten Past, by Sampath, Vikram.
  11. The Brotherhood in Saffron: The Rashtriya Swayamsevak Sangh and Hindu Revivalism, by Walter Anderson & Shridhar D. Damle
  12. Savarkar’s views on Hindu Nationalism, by Sauro Dasgupta
  13. Swami Vivekananda : The Friend of All, by Swami Lokeswarananda

 

লেখক প্রাবন্ধিক ও কবি। মতামত লেখকের নিজস্ব।

Share this
Recent Comments
1
  • ভারতবর্ষের ” বেশিরভাগ ” হিন্দু গোমাতাকে নিজের ” মাতার স্থান ” দেন বা “গোপূজন” করেন, এই তথ্য কোথা থেকে পাওয়া গেল বুঝলাম না। গোবলয়ের হিন্দুদের একটা বড় অংশ বলা হলে তাও বোঝা যেতো। তবে গোবলয়ের হিন্দুদের একাংশ কিন্তু গোটা ভারতের হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব করে না।
    এমন বেশ কিছু জায়গায় , সম্পাদনার দরকার হলেও , সামগ্রিক ভাবে লেখাটা জরুরি ও তথ্যসমৃদ্ধ। সবগুলো অংশ নিয়ে অনায়াসে একটা বই হতে পারে।

Leave a Comment