হিন্দুত্বের ক্রোনোলজি ও স্বাতন্ত্র্যবীর সাভারকার : তৃতীয় কিস্তি


  • June 25, 2020
  • (2 Comments)
  • 723 Views

বিনায়ক দামোদর সাভারকারের ‘হিন্দুত্ব’ তত্ত্বের উপর গড়ে উঠেছে আজকের আরএসএস-বিজেপি-র সাম্প্রদায়িকতা, বিদ্বেষ ও ঘৃণার রাজনীতি। গোহত্যা, জাতিভেদ, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি বিষয়ে সাভারকারের মত থেকে বর্তমান মৌলবাদী হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শাসকশক্তি আজ অনেকটাই সরে এসেছে। বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদীর হিন্দুত্ব আসলে একদিকে সাভারকার আর অন্যদিকে হেডগেওয়ার আর গোলওয়াকারের ধর্মভাবনার এক খিচুড়ি তত্ত্ব। এই প্রেক্ষিতে সাভারকারের মতবাদ ও জীবন নিয়ে কয়েকটি কিস্তিতে দীর্ঘ আলোচনা রাখলেন পার্থ প্রতিম মৈত্র

 

প্রথম কিস্তি : গো-পূজন বিরোধিতা ও বর্তমান স্বীকৃতি পর্ব

দ্বিতীয় কিস্তি : স্বাধীনতা সংগ্রাম ও নির্বাচনী পরাজয় পর্ব 

 

তৃতীয় কিস্তি : হিন্দুধর্ম ও হিন্দুত্ব পর্ব

 

এই ধারাবাহিকে আমরা মাঝে মাঝে খতিয়ে দেখতে চেষ্টা করবো হিন্দুধর্মের আরও কিছু প্রধান চরিত্রে বিষয়ভাবনা, যা হিন্দুধর্মের সামাজিক দৃষ্টিকোণকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে। তাদের মধ্যে প্রথম নামটি একজন বাঙালী ধর্মবেত্তার। ব্রাহ্ম সমাজ থেকে আর্য সমাজে রূপান্তরের এই পর্বে প্রধান চরিত্র ছিলেন শ্রী চন্দ্রনাথ বসু, যিনি প্রথম “হিন্দুত্ব” বা “হিন্দু-নেস” শব্দটি আবিষ্কার ও ব্যবহার করেছিলেন। বসু হিন্দু জাতীয়তাবাদ কে নিশ্চিতভাবে একটি নির্ধারিত ভাবে গোঁড়া ও প্রতিক্রিয়াশীল অভিমুখে চলতে বাধ্য করেছিলেন। ১৮৯২ সালে তাঁর প্রকাশিত “হিন্দুত্ব: দা অথেন্টিক হিস্ট্রি অফ দ্য হিন্দুজ” প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি হিন্দু ঐতিহ্যবাহী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে আচারপালন, জাত-পাত প্রথা, মহিলাদের শিক্ষার বাধাকেও সমর্থন করতেন। তিনি সমাজে পুরুষ কর্তৃত্বকেও সমর্থন করতেন। হিন্দুধর্ম যে খ্রিস্টান ধর্ম থেকে উচ্চমানের, তা প্রমাণ করার জন্য তিনি বদ্ধপরিকর ছিলেন। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে বিপুল সংখ্যায়, বিশেষ করে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে, খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরকরণ বেড়ে চলেছিল এবং এই নিয়ে উদ্বিগ্নতাও বেড়ে চলেছিল। বসু এই ধারণায় অনড় এবং দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন যে হিন্দুদের মাতৃভূমি ভারতবর্ষে মুসলিমদের অথবা খ্রিস্টানদের কোনও স্থান থাকতে পারেনা, কেননা তারা ধর্মত বিদেশী। তাঁর ধারণায় ধর্মীয় উদ্দেশ্যে দাঙ্গা বা হিংসার ঘটনা ভারতীয় উপমহাদেশে খুবই বিরল ছিল, যতক্ষণ না পর্যন্ত দ্বাদশ শতাব্দীতে মুসলিমরা এদেশে আসে এবং ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগিজরা ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, হিন্দুরা মুসলিম অথবা খ্রিস্টানদের আক্রমণ করেনি, যতক্ষণ না শতাব্দীর পর শতাব্দী অসন্তোষ বহন করতে করতে ফুটন্ত ক্ষোভের চাপে তারা মুসলিম এবং খ্রিস্টান মৌলবাদীদের মতোই চিন্তা করতে শুরু করে। চন্দ্রনাথ বসুর এই তত্ত্বের পাশাপাশি সাভারকারের তত্ত্ব মিলিয়ে পড়ুন। সাযুজ্য সহজেই প্রতীয়মান হবে।

 

১৯৩৮ সালে, লাহোরে সাংবাদিকরা যখন সাভারকারকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে কেন তিনি এবং জিন্না সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে জাতিকে বিভক্ত করতে চেয়েছিলেন? তখন উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “আমি নিজে এবং জিন্না একই পাখির পালক নয়। আমি সাম্য এবং ক্ষেত্রবিশেষে ছাড়ের পক্ষে দাঁড়ালেও, জিন্না সমতার পক্ষে ছিলেন না এবং সর্বদা মুসলমানদের জন্য আরও বেশি ছাড়ের জন্য বলে এসেছেন।” সুতরাং, এর থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান যে সাভারকার পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছিলেন, তিনি হিন্দুদের জন্য বিশেষ অধিকারের দাবি করছেন না। বরং হিন্দু অধিকারের মূল্যে মুসলমানদের বিশেষ অধিকারের বিরোধিতা করছেন। এবং তিনিও সমঅধিকারের লড়াইয়ে সামিল ছিলেন। ১৯৪২ সালে, যখন কতিপয় মুসলমান একত্রিত হয়ে এই প্রস্তাবটি পাস করে যে, গরু জবাইয়ে লিপ্ত মুসলমানরা হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের শত্রু হিসাবে বিবেচিত হবে, তখন সাভারকার তৎক্ষণাৎ মুসলমানদের আচরণের প্রশংসা করে এক বিবৃতি জারি করে বলেছিলেন, “মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে যদি এই ধরনের আচরণ অব্যাহত থাকে তবে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য সম্ভব।”

 

১৯২৩ সালে সাভারকারও হিন্দুধর্মের একটি জঙ্গি-রূপ এবং বহিরাগতদের (মুসলিম, খ্রিস্টান ও কমিউনিস্টদের) বিরুদ্ধে হিন্দু প্রতিরোধের পক্ষে যুক্তি দিয়ে, তাঁর মূল গ্রন্থ “হিন্দুত্ব” রচনা করেন। এই হিন্দুত্বকে সাভারকার তাঁর নিজস্ব মেধায় একটি দর্শনের রূপ দেন। সাভারকার ১৯২৩ সালে “হিন্দুত্ব” নামে যে গ্রন্থটি রচনা করেন তা সাম্প্রতিক সময়েও হিন্দুত্ব, হিন্দুধর্ম ও হিন্দুরাষ্ট্র পরিকল্পনার আকরগ্রন্থ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এই গ্রন্থে সাভারকার অভিযোগ করেছেন যে মুসলিম ও খ্রিস্টানরা নিজেদের এমন একটি সংস্কৃতিগত বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত মনে করে যা হিন্দুদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ভারতবর্ষ তাদের ‘পিতৃভূ’ (পিতৃভূমি/ফাদারল্যান্ড) হলেও ধর্ম ও সংস্কৃতিগতভাবে অবশ্যই ‘পুণ্যভূ’ (পুণ্যভূমি) নয়। প্রত্যেক হিন্দুর কাছে, সাঁওতাল থেকে সাধু পর্যন্ত প্রত্যেকের কাছে, এই ভারতভূমি, এই সিন্ধুস্তান, একাধারে পিতৃভূ এবং পুণ্যভূ। পিতৃভূমি এবং পুণ্যভূমি। তিনি বলেছিলেন, ‘হিন্দুত্ববাদ’ হিন্দুধর্মের প্রতি ভক্তিকে বোঝায়। এটি ছিল ‘হিন্দু’ এবং ‘তত্ত্ব’ এই দুটি শব্দের একটি সন্ধি, যার অর্থ হিন্দুধর্মের সারাংশ। এর উদ্দেশ্য ছিল হিন্দুধর্ম রক্ষা। তিনি বলেছিলেন যে হিন্দুত্ববাদী জানবে, বাস্তবে হিন্দু জীবন যাপনের জন্য কার কী করণীয় ছিল, যা তাঁরা করেন নি। খেলাফত আন্দোলন এবং অসহযোগ আন্দোলনও হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান নঞর্থক ভূমিকা রেখেছিল। অন্যদিকে ১৯২২-১৯২২-এর মোপলা দাঙ্গা, যেখানে মালাবারের মোপলা মুসলমানরা প্রচুর নিরীহ হিন্দুদের হত্যা করেছিল, তা বিনায়ক দামোদর সাভারকার, কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার এবং মাধব সাদশিব গোলওয়ালকারের মতো হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের ক্ষিপ্ত করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস (আইএনসি), যা প্রথমদিকে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের বিরোধী ছিল, তা পরবর্তী সময়ে তাদের কাছাকাছি চলে আসছিল। ক্রমশ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতারা রক্ষণশীল এবং গোঁড়া হিন্দুদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলেন।

 

সাভারকার বলেছিলেন যারা জাতি দ্বারা, রক্ত ​​দ্বারা, সংস্কৃতি দ্বারা, জাতীয়তার দ্বারা, হিন্দুত্বের প্রায় সমস্ত প্রয়োজনীয় গুণের অধিকারী, তোমাদের মেনে নিতে হবে যে এই ভূখণ্ড তোমাদের কাছে শুধু পিতৃভূমি (পিতৃভূ) হিসেবে নয়, একটি পবিত্রভূমি (পুণ্যভূ) হিসাবেও স্বীকৃত। আমাদের পুরাতন আত্মীয়-স্বজন, বোহরা, খোজা, মেমনস এবং অন্যান্য মুসলিম বা খ্রিস্টান দেশবাসীরাও, বিশেষত যাদের মূলত জোর করে এক-একটি অ-হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল, সেই সব ধর্মান্তরিত হিন্দুর কাছে হিন্দুস্তান ফাদারল্যান্ড হলেও এটি তাদের কাছে পবিত্রভূমি বা হোলি ল্যাণ্ড নয়। তাদের পবিত্রভূমি অনেক দূরে। তাদের পৌরাণিক কাহিনী এবং গডম্যানরা এই মাটি থেকে উদ্ভূত নয়। তবে মুসলমান ও খ্রিস্টানরা হিন্দু বিশ্বাস মেনে নিলে তারা হিন্দু হয়ে যাবে। সিন্ধুস্তান একটি সাধারণ রাষ্ট্র, একটি সাধারণ জাতি, এবং একটি সাধারণ সভ্যতায় (সংস্কৃতি) সম্বলিত হবে যা হিন্দুত্বের জন্য প্রয়োজনীয়। তিনিই একজন হিন্দু, যার কাছে সিন্ধুস্তান কেবল পিতৃভূই নয়, পুণ্যভূও বটে। এটিই হিন্দুত্বের উপর ভিত্তি করে হিন্দু রাষ্ট্রের বাস্তবতা।

 

এই তত্ত্ব হিন্দুধর্মের প্রাচীন দর্শন এবং বিশ্বাসের পুনঃস্থাপন নয়। এ এক নতুন রাজনৈতিক আদর্শ – হিন্দুত্ববাদ। অন্য যে কোনও কারও চেয়ে সাভারকার নিজে তাঁর আদর্শের অভিনবত্ব বিষয়ে সচেতন ছিলেন। হিন্দুত্ব সাংস্কৃতিক এবং হিন্দুধর্ম ধার্মিক। দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ধারণা, হিন্দুত্ব এবং হিন্দুধর্মের ভুল ব্যবহারের বিরুদ্ধে সঠিক তত্ত্বটি বোঝাতে পারে একা সনাতন ধর্ম। বইটিতে সাভারকারের সেই বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে তিনি হিন্দুস্তানকে হিন্দু জাতির পিতৃভূ (পিতৃভূমি) এবং পুণ্যভূ (পবিত্র ভূমি) হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। শিখ, বৌদ্ধ এবং জৈনরা তাঁর দৃষ্টিতে উভয় শর্ত পূরণ করেছিল এবং তাই তারা হিন্দু। সাভারকারের তিনটি মূল আক্রমণ লক্ষ্য, প্যান-ইসলামিক, প্যান-খ্রিস্টান এবং কমিউনিস্টরা, যারা ভারতকে বিভক্ত রাখতে চায়। এই তিনটি বাহিনী ভোট-ব্যাঙ্কের রাজনীতিকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে সিউডো-ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির মাধ্যমে হিন্দুত্ববিরোধী প্রচার চালাচ্ছে। বিজেপি এবং সঙ্ঘপরিবারভুক্ত সংগঠনগুলি সাভারকারকে সম্মান করে এবং তাঁকে একজন মহান দেশপ্রেমিক হিসাবে বিবেচনা করে। হিন্দুত্ববাদের জনক হিসাবে তিনি উচ্চপ্রশংসিত। তবে বিজেপির কাছে হেডগেওয়ার, শ্যামাপ্রসাদ এবং দীনদয়াল উপাধ্যায় অনেক বড় আইকন।

 

আরএসএস এর গোলওয়ালকর তাঁর নিজস্ব ধারণার হিন্দু রাষ্ট্রের দাবিতে কট্টর এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। জিন্নার পাকিস্তানের দাবী কিন্তু ততটা জটিল ছিল না। তবে ১৯৩০-এর দশকে তিনিও খুব রক্ষণশীল এবং কট্টরপন্থী হয়ে ওঠেন। ব্রিটিশরাও জিন্নার পক্ষে ছিলেন, কারণ তিনি তাদের সামান্য হলেও কাছের ছিলেন। এই প্রসঙ্গেই সাভারকারের স্থিরবিশ্বাস জন্মায় যে, একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্রই হিন্দুদের সুবিচার দিতে পারে। গোলওয়ালকারের পাশাপাশি তিনি আরও অনুভব করেছিলেন যে মুসলমান ও খ্রিস্টানদের অবশ্যই ভারত ত্যাগ করতে হবে বা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসাবে বাঁচতে হবে। গোলওয়ালকর কংগ্রেসকে মুসলিম, খ্রিস্টান এবং কমিউনিস্টদের পক্ষ নেওয়ার জন্য সমালোচনা করেছিলেন, কারণ এরাই ছিল মহারাষ্ট্রিয়ান ব্রাহ্মণদের কাছে সবচেয়ে বড় শত্রু। ১৯২৫ সালে নাগপুরে ‘হিন্দুত্বের জনক’ সাভারকারের আশীর্বাদে ডাঃ কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের দ্বারা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) গঠিত হয়। বিনায়ক দামোদর সাভারকার ছিলেন সেরা হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ, দার্শনিক ও তাত্ত্বিকদের মধ্যে একজন। হিন্দুদের শক্তিশালী করতে তাঁর যে রাজনীতি, তাতে দরিদ্র নিরীহ মুসলমান এবং খৃস্টানরা ক্রমাগত হিংস্রতার বলি হয়ে উঠেছে। তাঁর হিন্দুত্ববাদ হ’ল সেই রাজনৈতিক মতাদর্শ যা ভারতে হিন্দু জাতিকে প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং যা ভারতে অন্ধকার যুগের বীজ বপন করেছে। সাভারকারের পাশাপাশি হেডগেওয়ার (আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা) গান্ধী ও কংগ্রেসের সম্মিলিত জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শ প্রচার করেছিলেন। তবে দুজনের মতাদর্শগুলি একে অপরের থেকে যথেষ্ট আলাদা।

 

তাঁদের মধ্যে ধর্মভিত্তিক সামাজিক মতাদর্শের পার্থক্যও প্রকট ছিল। সাভারকার জাতিভেদকে বিভেদমূলক বলে নিন্দা করেছিলেন এবং কুসংস্কারমূলক আচরণ, নারীদের উপর নিপীড়নেরও সমালোচনা করেছিলেন। অন্যদিকে গোলওয়ালকর জাতিগত ব্যবস্থাকে কার্যকরী মনে করতেন এবং এই প্রথাকে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই কর্মসংস্থানের বীমা প্রকল্প হিসাবে অভিহিত করেছিলেন। সুতরাং সাভারকার যখন আধুনিকতার এজেন্ডায় কাজ করছেন তখন আরএসএস একটি পাশ্চাত্যবিরোধী সমাজ গড়ার আদর্শে ব্রতী। এছাড়াও, সাভারকার ছিলেন রাজনৈতিক শক্তির উপাসক এবং পরিবর্তনের জন্য রাজনীতির গুরুত্ব তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। গোলওয়ালকর খুব শক্তিশালী জাতিরাষ্ট্রের বিকাশ ঘটাতে চেয়েছিলেন, তবে একই সাথে তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিলেন। পন্থার পাশাপাশি লক্ষ্যের মধ্যে এই পার্থক্যগুলি এই দুটি সংস্থার সংযুক্তিকরণে বাধা দেয়। গোলওয়ালকর ইতিবাচক এবং নেতিবাচক হিন্দুত্ববাদের ধারণার জন্ম দিয়েছেন। তাঁর মতে, মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা বা কংগ্রেসের মেকী ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতিক্রিয়া থেকে জন্মানো হিন্দুত্ব, নেতিবাচক হিন্দুত্ববাদ। এটা আরএসএসের লক্ষ্য না। তিনি ইতিবাচক হিন্দুত্ব চেয়েছিলেন, যা সামাজিক শক্তি হিসাবে হিন্দুদের সংগঠনের উপর নির্ভর করে। আরএসএসকে রাজনৈতিক শক্তির উর্ধ্বে দাঁড় করানোর কথা ছিল, কিন্তু সংঘ পরিবারের মাধ্যমে তারা চিরকাল বাহ্যিক সংস্থাগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েমের চেষ্টা করে চলেছে।

 

রাজনৈতিকভাবে তাঁরা দু’জনই দেশকে শক্তিশালী করা, অস্ত্র তুলে নেওয়া, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা ইত্যাদিতে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু এই উদ্দেশ্যের ভিত ছিল একেবারেই আলাদা। গোলওয়ালকারের জাতীয়তাবাদ হিন্দু আধ্যাত্মিকতার উপর ভিত্তি করে। সাভারকার যুক্তি, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন। সাভারকার ছিলেন নাস্তিক। গোলওয়ালকর পাশ্চাত্য বস্তুবাদের চেয়ে হিন্দু আধ্যাত্মিকতার শ্রেষ্ঠত্বকে বিশ্বাস করেছিলেন। সাভারকার হিন্দু রাষ্ট্র এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের মধ্যেও পার্থক্য করেছিলেন। তাঁর কল্পনায় ছিল এমন রাষ্ট্র, যার মধ্যে সমস্ত ধর্মের লোকেরা অংশ নিতে পারেন। গোলওয়ালকর অঞ্চলভিত্তিক দেশের পরিবর্তে সাংস্কৃতিক রাষ্ট্রের পক্ষে ছিলেন, যার অংশ হতে হলে সমস্ত ধর্মের লোকদের হিন্দুধর্মের ঐতিহ্যকে গ্রহণ করতে হবে, যদি তারা ধর্মান্তরিত নাও হয়। অবশ্য তারা দুজনেই হিন্দুধর্মে পুনরায় অন্তর্ভুক্তির জন্য শুদ্ধি ও সংঘটনের আন্দোলনের প্রবক্তা ছিলেন। সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যক্রমে দুজনের কাউকেই এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় নি যে, কোন রাসায়নিক বিক্রিয়ায় হিন্দুধর্মে ঘরওয়াপসির ফলে, একজন ধর্মান্তরিত মুসলিম বা খৃষ্টান, সাইকোলজিকালি এবং প্যাথোলজিকালি পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।  পরস্পরবিরোধী হিন্দুদের ব্যক্তিস্বার্থ, দলদাসত্ব, যদি রাষ্ট্রস্বার্থের মুখোমুখি দাঁড়ায়, তবে তাদের হিন্দুত্ব কি স্বার্থসিদ্ধির অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে?

 

যদি আমরা বর্তমান প্রেক্ষাপট থেকে উদাহরণ খুঁজে নিতে চেষ্টা করি, তবে দেখবো বিজেপি ও শিবসেনা – দুটি হিন্দুত্ববাদী দল – সাভারকার ইস্যুতেও  পরষ্পরের মুখোমুখি দাঁড়ালে তার প্রতিক্রিয়া কী হয়। কংগ্রেস ও জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি) নিয়ে সরকার গঠনের পর বিজেপি সাভারকার ইস্যুতে সেনাকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) আক্রমণ করে শিবসেনা বলেছে যে সেনা বা সাভারকারকে “কোণঠাসা” করার বিজেপি চক্রান্ত কাজে আসবে না। বিজেপি এবং তার আদর্শের উ‍ৎস, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) উপর সেনা তার মুখপত্র “সামনা”তে অদৃষ্টপূর্ব বিদ্রূপাত্মক আক্রমণ শানায় এবং প্রশ্ন তোলে যে, “বীর সাভারকারের তো ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান রয়েছে। কিন্তু সেই সময়ে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে আরএসএসের ভূমিকা কী ছিল? আরএসএসকে আক্রমণ করে সেনা এও বলেছে যে আরএসএস ভারতের স্বাধীনতা, ভারতের সংবিধান এবং ত্রিবর্ণ ভারতীয় পতাকাকে মেনে নেয়নি। আরও বলা হয়েছে, আরএসএসকে সর্দার প্যাটেল দুবার নিষিদ্ধ করেছিলেন। সেই নিষেধাজ্ঞা এই শর্তে তুলে নেওয়া হয়েছিল যে আরএসএস ভারতীয় ত্রিবর্ণ জাতীয় পতাকাকে মেনে নেবে। এই শর্তটি গোলওয়ালকার গুরুজি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ২০০২ সাল অবধি সে প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয় নি। সাভারকার দেখে যেতে পারেননি যে তাঁর হিন্দুত্ববাদের পুনরুত্থানের মাধ্যমেই ভারতবর্ষে হিন্দু বিজয়রথ বর্তমানে অপ্রতিহত গতিতে ধাবমান। তিনি এও দেখে যাননি যে তাঁর তত্ত্বকে আশ্রয় করেই ভারতবর্ষ তার ইতিহাসের অন্ধকারতম যুগে প্রবেশ করছে। পরবর্তী পর্বে এই হিন্দুত্বের ফ্যাসিবাদী উত্থান নিয়েই আলোচনা করবো।

 

চতুর্থ কিস্তি : হিন্দু উত্থান ও নির্বাচনী বিজয় পর্ব

 

গ্রন্থসূত্র ও তথ্য সূত্র:

  1. The Origins of Religious Violence : An Asian Perspective by Nicholas F. Gier
  2. Hindutva. Who is Hindu? by V.D. Savarkar
  3. The Hindu Mahasabha and the Indian National Congress, 1915 to 1926, by Richard  Gordon
  4. Demons in Hindutva: Writing a Theology for Hindu Nationalism, by M. Reza Pirbhai
  5. Country First? Vinayak Damodar Savarkar (1883–1966) and the Writing of Essentials of Hindutva, by Janaki Bakhle
  6. Patriots and Partisans: From Nehru to Hindutva and Beyond, by Ramchandra Guha
  7. The History of Hindu India, by Satguru Bodhinatha Veylanswami
  8. Uproot Hinditva: The Fiery Voice of the Liberation Paathers, by Thirumaaialavan, translated from the Tamil by Meenakandasamy
  9. The Saffron Wave: Democracy And Hindu Nationalism In Modern India, by Thomas Blom Hansen
  10. Savarkar: Echoes from a Forgotten Past, by Sampath, Vikram.
  11. The Brotherhood in Saffron: The Rashtriya Swayamsevak Sangh and Hindu Revivalism, by Walter Anderson & Shridhar D. Damle
  12. Savarkar’s views on Hindu Nationalism, by Sauro Dasgupta
  13. Swami Vivekananda : The Friend of All, by Swami Lokeswarananda

 

লেখক প্রাবন্ধিক ও কবি। মতামত লেখকের নিজস্ব।

Share this
Recent Comments
2
  • comments
    By: Saikat on June 25, 2020

    লেখাটি তথ্য সমৃদ্ধ। ভারতে ক্লাস রিলেশনের থেকেও, কাস্ট রিলেশন তীব্র।তা নিয়ে এরা কেউ সমাধানের পথে হাঁটেনি। আবার সাভারকরকে ছিবরে করার যে কুচক্রী রাজনীতি সেটা আজ প্রবল আকার নিয়েছে, এই পরিসরে তাঁর ইতিবাচকতাও একটু তাদের বাড়তি বাতাস দেবে নাতো?

  • comments
    By: Ratish Deb on June 25, 2020

    Well written relevant article.

Leave a Comment