হিন্দুত্বের ক্রোনোলজি ও স্বাতন্ত্র্যবীর সাভারকার : দশম কিস্তি


  • July 12, 2020
  • (0 Comments)
  • 699 Views

বিনায়ক দামোদর সাভারকারের ‘হিন্দুত্ব’ তত্ত্বের উপর গড়ে উঠেছে আজকের আরএসএস-বিজেপি-র সাম্প্রদায়িকতা, বিদ্বেষ ও ঘৃণার রাজনীতি। গোহত্যা, জাতিভেদ, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি বিষয়ে সাভারকারের মত থেকে বর্তমান মৌলবাদী হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শাসকশক্তি আজ অনেকটাই সরে এসেছে। বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদীর হিন্দুত্ব আসলে একদিকে সাভারকার আর অন্যদিকে হেডগেওয়ার আর গোলওয়াকারের ধর্মভাবনার এক খিচুড়ি তত্ত্ব। এই প্রেক্ষিতে সাভারকারের মতবাদ ও জীবন নিয়ে কয়েকটি কিস্তিতে দীর্ঘ আলোচনা রাখলেন পার্থ প্রতিম মৈত্র

 

প্রথম কিস্তি : গো-পূজন বিরোধিতা ও বর্তমান স্বীকৃতি পর্ব  

দ্বিতীয় কিস্তি : স্বাধীনতা সংগ্রাম ও নির্বাচনী পরাজয় পর্ব

তৃতীয় কিস্তি : হিন্দুধর্ম ও হিন্দুত্ব পর্ব 

চতুর্থ কিস্তি : হিন্দু উত্থান ও নির্বাচনী বিজয় পর্ব 

পঞ্চম কিস্তি : কংগ্রেস রাজনীতি ও সাম্প্রতিক সাভারকার পুনর্বাসন পর্ব 

ষষ্ঠ কিস্তি : হিন্দুরাষ্ট্রের তত্ত্বনির্মাণ পর্ব 

সপ্তম কিস্তি : বিবেকানন্দ, হিন্দুত্ব ও দেশভাগ পর্ব 

অষ্টম কিস্তি : হিন্দু রাষ্ট্র ও ঘৃণার রাজনীতি পর্ব 

নবম কিস্তি : ধর্ম ও রাজনীতির ককটেল পর্ব 

 

দশম কিস্তি : হিংস্র হিন্দুত্ব, স্টেইনস, পুনর্ধর্মান্তরকরণ পর্ব

 

২৩ জানুয়ারী ১৯৯৯ ভারতবাসী এক রক্ত হিম করা সংবাদ জেনে শয্যাত্যাগ করে। বজরং দল নামে একটি হিন্দু মৌলবাদী গোষ্ঠীর কিছু মানুষ  গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টেইনস (একজন অস্ট্রেলিয়ান খ্রিস্টান মিশনারি) এবং তাঁর দুই নাবালক পুত্র তাঁর দুই পুত্র ফিলিপ (১০ বছর) এবং টিমোথি (৬ বছর বয়সী) রাতের অন্ধকারে বন্ধ গাড়ির ভিতরে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল।

 

স্টেইনস ১৯৬৫ সাল থেকে ওড়িশায় “ময়ূরভঞ্জ লেপ্রসি হোম” নামে একটি ধর্মপ্রচারক মিশনারি সংস্থার অংশ হিসাবে যারা কুষ্ঠরোগী ছিল এবং সেই অঞ্চলের উপজাতির লোকদের দেখাশোনা করছিল যারা দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করত তাদের মধ্যে কাজ করছিেন। কিছু হিন্দু গোষ্ঠী অভিযোগ তুলেছিল যে এই সময়ে তিনি প্রচুর হিন্দুদের খ্রিস্টান বিশ্বাসে বিশ্বাসী করার জন্য প্ররোচিত করেছিলেন বা জোর করে চাপিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ওয়াধওয়া কমিশন তদন্ত করে সিদ্ধান্ত পৌঁছায় যে শিবিরগুলিতে কিছু আদিবাসীরা খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিল বটে, কিন্তু জোর করে ধর্মান্তরের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় নি। ঘটনাটি আতঙ্কজনক যে নৃশংশতার সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে তা নিয়ে। বিশ্রামরত নিদ্রামগ্ন স্টেইনস এবং তার সন্তানদের গাড়ির দরজা বন্ধ করে যেভাবে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে তার বর্ণনায় যে কোনও সুস্থ মানুষ শিউরে উঠেছিল। ট্রায়াল কোর্টে বজরং দলের কর্মী দারা সিংহকে হত্যাকারীদের দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল এবং ফাঁসির হুকুম হয়। কিন্তু হাইকোর্ট ফাঁসি মকুব করে এবং তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। দারা সিংহের মৃত্যুদণ্ডের জন্য কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো-এর আবেদন খারিজ করে বিচারপতি পি.সদাশিবম ও বিচারপতি বি এস চৌহানের বেঞ্চ ওড়িশা হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্তের সমর্থন করে বলে যে তার অপরাধ বিরলের মধ্যে বিরলতম নয়। কোর্ট আরও বলে যদিও গ্রাহাম স্টেইনস এবং তার দুই নাবালক সন্তানকে মনোহরপুরে একটি গাড়িতে শুয়ে থাকা অবস্থায়ই পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, কিন্তু তার উদ্দেশ্য ছিল গ্রাহাম স্টেইনসকে তার ধর্মীয় কার্যকলাপ সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া, যেমন দরিদ্র আদিবাসীদের খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তর করা। এই সমস্ত দিকগুলি হাইকোর্ট দ্বারা সঠিকভাবে প্রশংসা করা হয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ডকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিবর্তিত হয়েছে, যার সাথে আমরা সম্মতি জানাই”, আদালত ঘোষণা করে। শীর্ষ আদালতের এই রায়ে সারা বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে যায়। দেশজুড়ে শীর্ষস্থানীয় সম্পাদক, মিডিয়া গ্রুপ এবং সুশীল সমাজের সদস্যরা একটি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের তীব্র সমালোচনা করেন।  চার দিন পরে, ২৫ জানুয়ারী, ২০১১, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একটি বিরল পদক্ষেপে, তার রায় থেকে ধর্মান্তরের বিষয়ে নিজস্ব মন্তব্য বাতিল করে দেয়। ভারতীয় হিন্দুর মস্তক বিশ্বের সামনে আরও অবনত হয়ে যায়, যখন স্টেইনসের বিধবা গ্ল্যাডিস প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে বলেন “আমার স্বামী গ্রাহাম এবং আমার দুই সন্তানের মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি আমার মন থেকে অনেক দূরে। তবে আমার আকাঙ্ক্ষা এবং আমি আশাবাদী যে তারা অনুতপ্ত হবে এবং তাদের সংস্কার হবে।” তবে আমি মাঝে মাঝে অবাক হই যে কেন গ্রাহামকে হত্যা করা হয়েছিল, এবং কী কারণে তার ঘাতকরা ২২ তারিখ রাতে এইরকম বর্বর আচরণ করেছিল? গ্ল্যাডিস এরপরও ভারতে বসবাস করেন এবং যারা দরিদ্র, কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত তাদের মধ্যে কাজ করেছেন ২০০৪ সালে তাঁর জন্মভূমি অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যাবার আগে পর্যন্ত। ২০০৫ সালে, তিনি ওড়িশায় তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসাবে পদ্মশ্রী পান।

 

ধর্মান্তরকরণ বহুযুগ থেকেই হিন্দু সংগঠনগুলির কাছে এক লোভনীয় ইস্যু। চন্দ্রনাথ বোস বা দয়ানন্দ সরস্বতীরা যদি ধর্মভিত্তিক ঘর ওয়াপসিতে আগ্রহী হয়ে থাকেন সাভারকার থেকে অমিত শাহদের ঘর ওয়াপসি সামাজিক ও রাজনীতিভিত্তিক। সর্বত্রই প্রতিপক্ষ (কাল্পনিক অথবা বাস্তবিক) মুসলিম বা খ্রিস্টান। এর মধ্যে তেলেঙ্গানা এবং অন্ধ্রপ্রদেশ ঘর ওয়াপসি প্রোগ্রামের আওতায় জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৪, যাতে ৮,০০০ জনের বেশি লোক হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিল। অক্টোবর ২০১৯, অন্ধ্র প্রদেশের ৫০০ জন দলিত খ্রিস্টান হিন্দুত্বে ফিরে আসার পরে কখনও আর গির্জার দিকে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এপ্রিল ২০১৭-তে, ঝাড়খণ্ডে আরএসএসের “খ্রিস্টান-মুক্ত” ব্লক নির্মাণের অংশ হিসাবে কমপক্ষে ৫৩ টি উপজাতি খ্রিস্টান পরিবার হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিল। ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে, পাঞ্জাবের প্রায় ৮,০০০ খ্রিস্টান শিখ ধর্মে ফিরে এসেছিল। বেশিরভাগ পুনর্নির্মাণটি হুশিয়ারপুর জেলায় হয়েছিল, তারপরেই ছিল অমৃতসর এবং বটালা। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলায় শতাধিক উপজাতি খ্রিস্টান হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিল। মে ২০১৭ সালে, উত্তর প্রদেশের ফয়েজাবাদের আম্বেদকর নগর জেলার আর্যসামাজ মন্দিরে গোপনীয় অনুষ্ঠানে আরএসএস মহিলা ও শিশু সহ কমপক্ষে ২২ জন মুসলমানকে হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করেছিল। জানুয়ারী ২০১৯-তে, ৯ বছর আগে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া ৯৬ টি উপজাতি পরিবার হিন্দু ধর্মে ফিরে যায় ঘর ওয়াপসির মাধ্যমে। ত্রিপুরার ঊনকোটি জেলার কৈলাশহরে এই অনুষ্ঠানটি হয়েছিল। ২০১৫ সালে, কেরালার আলাপুজ্জায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে প্রায় ৩৫ জন হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিল। তারা হ’ল দলিত পরিবার যারা কয়েক প্রজন্ম আগে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিল। ২০১৫ সালে, প্রথম ঘর ওয়াপসিটি অনুষ্ঠিত হয় তামিলনাড়ুতে, যেখানে ১৮ জন দলিত খ্রিস্টান হিন্দু মাক্কাল কাচ্চির একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিল। গুজরাটে ২০২০ সালে, ১৪৪ জন উপজাতি খ্রিস্টান যারা বহু বছর আগে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিল গুজরাটের ডাং জেলায় হিন্দু ধর্মে ফিরে এসেছে।

 

সাভারকার ছিলেন নাস্তিক, গোপূজন বিরোধী, যিনি ছিলেন মনেপ্রাণে সহিংস, হিন্দুত্ব প্রবক্তা হলেও তিনি হিন্দু ধর্মের বিকাশ নিয়ে ছিলেন উদাসীন, মুসলিম এবং খ্রিস্টান বিদ্বেষী, অথচ দেশজ মুসলিম ও খ্রিস্টানদের শুদ্ধিকরণও পুনর্ধমান্তকরণে বিশ্বাসী। হিন্দুত্ব তাঁর কাছে রাজনৈতিক ও সমাজিক উপকরণমাত্র। হিন্দু আইডেন্টিটি বিষয়ে সাভারকারের মানদণ্ডে তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত গুণ রয়েছে। প্রথমটি ভৌগোলিক। ভারত বা হিন্দুস্তান, যেমন সাভারকর একে বলা পছন্দ করেন, পাহাড়, মহাসাগর এবং নদী দ্বারা চিহ্নিত একটি পৃথক ভৌগোলিক অঞ্চল এবং একজন হিন্দু নিজেই বা তার হিন্দুস্তানের পূর্বপুরুষদের মাধ্যমে এদেশের নাগরিকত্বের দাবীদার। যদিও হিন্দু শব্দটির অর্থ ভূগোলের চেয়ে অনেক ব্যপ্ত।

 

দ্বিতীয়, এবং সম্ভবত হিন্দুত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয়তা হ’ল  যাকে সাভারকর অভিহিত করেছেন  “(সামূহিক) সাধারণ রক্তসম্পর্ক” বা জাতি বলে। একজন হিন্দু অবশ্যই হিন্দু পিতামাতার বংশধর এবং অন্যান্য হিন্দুদের সাথে বৈদিক পিতৃ পুরুষ বা সিন্ধুদের সঙ্গে সাধারণ রক্ত ​​ভাগ করে নিয়ে থাকে। এই যুক্তি মূলত স্বজ্ঞা এবং সংবেদনশীলতার যুক্তি। সাভারকর বলতেন আমরা কেবল একটি দেশ নই, জাতি। আমাদের জন্মগত ভ্রাতৃত্ব। আর কিছুই হিসেবে না ধরেও, শেষ পর্যন্ত এটি হৃদয়ের প্রশ্ন। এর পরে আর কিছুই গণ্য হতে পারে না। আমরা মনে করি যে একই আদিম রক্ত রাম ও কৃষ্ণ, বুদ্ধ এবং মহাবীর, নানক এবং চৈতন্য, বাসব এবং মাধব, রুইদাস এবং তিরুভাল্লুভারের হিন্দুত্বের শিরা থেকে শিরায় প্রবাহিত হয়, হৃদয় থেকে হৃদয়ে স্পন্দিত হয় । হিন্দুত্বের প্রথম দুটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে ভারতের মুসলিম বা খ্রিস্টান নাগরিকরা শর্তসাপেক্ষে হিন্দু হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। এই সম্ভাবনা ছিল সাভারকর দ্বারা স্বীকৃত। তাদের ধর্মান্তরকরণগুলির কাহিনী, যা তাদের মত লক্ষ লক্ষ মানুষের ক্ষেত্রে জোর করে করা হয়েছিল, তারা অবশ্যই মনে রেখেছে কারণ ঘটনাগুলি খুব সাম্প্রতিক। যদি তারা ভুলেও যেতে চায় তবু, তাদের শিরায় প্রবহমান হিন্দু রক্তের দ্বারা তারা হিন্দুত্বের উত্তরাধিকারী।

 

একটি সাধারণ পিতৃভূমি (রাষ্ট্র) এবং রক্তসম্পর্ক ​​(জাতি) – এর প্রতি ভালবাসার পাশাপাশি হিন্দুত্বের তৃতীয় মানদণ্ডের প্রস্তাব দিয়েছেন  সাভারকর । তা হলো হিন্দু সংস্কৃতি আর সভ্যতার প্রতি  শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। সাভারকর এই কমন-কালচারকে সংস্কৃতি নামে অভিহিত করেছিলেন। এর অন্তর্ভুক্ত হয় একটি সহভাগী ইতিহাস, সাহিত্য, শিল্প, আইন উৎসব, পূজাবিধি, আচার-অনুষ্ঠান এবং বীরগাথা। এই মানদণ্ডটিতে কেবল ভারতীয় মুসলমানদেরই নয়, ভারতীয় খ্রিস্টানদেরও বাদ দেওয়ার ভিত্তি ছিল। অঞ্চল এবং রক্তসম্পর্ক ​​ভাগ করে নেওয়া সত্ত্বেও, তারা, সাভারকারের ভাষায়, “সামগ্রিকভাবে হিন্দু সভ্যতা (সংস্কৃতি) কে নিজের স্বত্ত্ব বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেছে। এরা নিশ্চিতভাবে সম্পূর্ণ আলাদা একটি সাংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। “ যেমন গুজরাটের মুসলিম বোহরা এবং খোজা যারা তাদের প্রতিদিনের জীবনে সংস্কৃতভিত্তিক সংস্কৃতির অনেক উপাদানকে সংযুক্ত করেছিলেন,তাদের নিজস্ব সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য তিনি বেশ দেরিতেই নিজের কাজে হিন্দুত্বের ধর্মীয় মাত্রা বিবেচনা করতে শুরু করেন।

 

সাভারকার জানতেন যে তাঁর হিন্দুত্ব ভারতবর্ষের রাজনৈতিক মানচিত্রে সংখ্যাগুরু হিন্দুদের প্রতিনিধি হয়ে ওঠার ওপর নির্ভরশীল। গণতন্ত্রে এই সংখ্যাগুরু ভোটব্যাংক আর প্রতিপক্ষ হিসাবে এক বা একাধিক সংখ্যালঘু গোষ্ঠির খলনায়কত্ব ছাড়া বিজয়সম্ভাবনা সূদূরপরাহত। ফলে কংগ্রেসের কোমল হিন্দুত্বের বিপরীতে কঠিন হিন্দুত্বে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন আধারিত।  বেশিরভাগ হিন্দু সনাতন ধর্ম বা বৈদিক ধর্ম হিসাবে হিন্দু ধর্মকে চিহ্নিত করে থাকেন, সেখানে হিন্দু ধর্ম বা হিন্দু ধর্মের জেনেরিক বিভাগে অবশ্যই জৈন ধর্ম, শিখ ধর্ম, বৌদ্ধধর্মের (যাদের শিকড় রয়েে ভারতীয় মাটির গভীরে), তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। সাভারকারের মতে হিন্দু ধর্মের ছত্রছায়ায় অন্তর্ভুক্ত সমস্ত ঐতিহ্য কেবল পিতৃভূমি (পিতৃভূু) হিসাবে নয়, পবিত্রভূমি হিসাবেও (পুণ্যভূু) কাঙ্ক্ষিত। সাভারকর এই প্রয়োজনীয় হিন্দুত্ববাদকে যথেষ্ট তাৎপর্য দিতেন এবং এটিকে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের বাদ দেওয়ার চূড়ান্ত কারণ হিসাবে ব্যবহার করতেন।

 

অশিক্ষিতদের হাতে দেশের লাগাম তুলে দিয়ে রাজনীতি, অর্থনীতি, সংবিধানের দেশজ চরিত্র বিধ্বস্ত করে কেবলমাত্র বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুদ্ধজিগির তোলা আদ্যোপান্ত দূর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক মৌলবাদী পশ্চাদমুখী হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি আপাততঃ নিঃশ্বাস ফেলার অবকাশ পেয়েছে কোভিড-১৯ ভাইরাসের আবির্ভাবে। রণবাদ্য, অকাল দীপাবলী বা পুষ্পবৃষ্টির কথা বলছি না, টানা লকডাউন, বিপুল রিলিফ ফাণ্ড, উদ্ভট সিদ্ধান্তমালা মনে হচ্ছে মোদী অ্যাণ্ড কোম্পানীকে নতুন করে অক্সিজেন দিল। একই সঙ্গে করোনার মাধ্যমে মুসলিমবিদ্বেষও নতুন করে জাগিয়ে তোলা যাচ্ছে। করোনা-ভাইরাস লকডাউনের সময় নয়াদিল্লির নাজিমউদ্দিন মারকাজে সারা পৃথিবী থেকে আগত তবলিগি সদস্যদের জমায়েতে আসা এবং থাকা তো সরকারী অনুমতিপ্রাপ্ত, সরকারের জারি করা।  তবলিগি সদস্যরা একটি অমার্জনীয় ভুল করেছে এবং তাদের অনেকেই কোভিড-১৯ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে ভারতে দেশব্যাপী এই মারাত্মক রোগ ছড়ানো হয়েছে জিহাদের অঙ্গ হিসাবে, এই প্রচার তাদেরকে ‘অপরাধী’ হিসাবে পরিচয় করিয়ে দেয়। “করোনা-জিহাদ,” এবং “মারকাজ-ষড়যন্ত্র” এর মতো পরিকল্পিত প্রচারে পরিষ্কার সাম্প্রদায়িকতার সুর। তবলিগি সদস্যরা মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান সহ অনেক দেশ থেকে এসেছিলেন। কিন্তু এখানকার দরিদ্র মুসলিম বিক্রেতাদের সবজি, ফলমূল এবং অন্যান্য আইটেম বিক্রি প্রায় নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। গুজরাটে, একটি সরকারী হাসপাতাল হিন্দু করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের  থেকে মুসলিম করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের বিচ্ছিন্ন করে দুটি পৃথক ওয়ার্ডে রাখা হয়েছিল। এই পদক্ষেপটি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তাতে কিছু যায় আসেনি।

 

আপাতত সারা ভারতবর্ষকে করোনা-ভীতিতে আতঙ্কিত করে দেশের মানুষকে কাশ্মীরি লকডাউন আর সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং-এ অভ্যস্ত করে দেওয়া গিয়েছে। সঙ্গে পারস্পরিক অবিশ্বাস। মানুষকে এখন আর সামাজিক জীব বলা যাবেনা, তারা পারিবারিক জীব। আপাতত ব্যাকস্টেজে চলে গেছে নাগরিকত্ব ইস্যু, অর্থনৈতিক ইস্যুও। কাশ্মীর, পাকিস্তান, চীন, গো রক্ষা, রামনবমী, রামনবমী, মনুস্মৃতি, সংখ্যালঘু বিনাশ, ডিজিটাল ইন্ডিয়া, মেক ইন ইন্ডিয়া,  সব মুলতুবী। মুলতুবী মানে কিন্তু বাতিল নয়, আপাতত জিরেন। যখন যেমন প্রয়োজন সেই ইস্যু তুলে আনা হবে যতদিন না আনুষ্ঠানিকভাবে হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়, হিন্দুত্বর ভগোয়া ধ্বজ ওড়ে। নাস্তিক সাভারকার হিন্দুধর্মকে হিন্দুত্বের এক ক্ষুদ্র অংশ বলে প্রতিপন্ন করতে চেয়েছিলেন। তিনি ভারতবর্ষকে পূণ্যভুমি এবং পিতৃভূমি মেনে নিলে মুসলিম এবং খ্রিস্টানদেরও সমমর্যাদায় পুনর্বাসনের কথা বলতেন।  তবু তাঁকে বাদ দিয়ে হিন্দুত্ব হয়না। হিন্দুত্ব বাদ দিয়ে হিন্দুরাষ্ট্র হয় না।  বিজেপি এক তীক্ষ্ণবুদ্ধিদের দল যাদের সামনে থাকে বোকাবুদ্ধিদের সারি। ঠিক তেমনি বিরোধী দলগুলির সামনে রয়েছে পণ্ডিতম্মন্য একদল বাক্যনবাব আর তাদের ফলো করে নির্বুদ্ধিদের কাতার। এমন অকর্মণ্য বিরোধী দল-সমাহারও ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে আগে দেখা যায়নি। বিজেপি সাভারকার আর হেডগেওয়ার-গোলওয়ারকার তত্ত্বের মধ্যে নিখুঁত ব্যালান্স করে চলে। এদের শাসনে ভারতবর্ষ নতুন করে গৃহযুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে। আর এই সর্বনাশের প্রেক্ষাগৃহে তৃপ্তির ঢেঁকুর উঠছে নাগপুরে। সংবিধানের যূপকাষ্ঠে এবার বলি হবে ধর্মনিরপেক্ষতা। বৃহত্তর হিন্দু জোট রাজ করবে মহাভারতে। সরসংঘচালকেরা এবার পাশ ফিরে শুতেই পারেন। দীর্ঘদিনের হিন্দু অ্যাজেণ্ডা সাফল্যের দোরগোড়ায়। ভারতপিতা কী জয়।

 

একাদশ কিস্তি : নাগরিকত্ব, বিদেশী ও চিহ্নিতকরণ পর্ব 

 

গ্রন্থসূত্র ও তথ্য সূত্র:

  1. The Origins of Religious Violence : An Asian Perspectiveby Nicholas F. Gier
  2. Who is Hindu?by V.D. Savarkar
  3. The Hindu Mahasabha and the Indian National Congress, 1915 to 1926, by Richard  Gordon
  4. The Gandhian Confusion by D. Savarkar
  5. Hindu Rastro Darshan D. Savarkar
  6. Country First? Vinayak Damodar Savarkar (1883–1966) and the Writing of Essentials of Hindutva, by Janaki Bakhle
  7. Third Way by Dattopant Thengadi
  8. Savarkar: Echoes from a Forgotten Past, by Sampath, Vikram.
  9. The Brotherhood in Saffron: The Rashtriya Swayamsevak Sangh and Hindu Revivalism, by Walter Anderson & Shridhar D. Damle
  10. Marathi – Gandhi Hatya Abhiyogatil Savarkaranche Nivedan
  11. Economic Thoughts of Swami Vivekananda by Sebak Kumar Jana
  12. Bunch of Thoughts by Golwalkar
  13. भावी भारत का निर्माण – दत्तोपंत ठेंगड़ी
  14. Global Economic System-A Hindu View
  15. Mohan Bhagwat’s Speech Reflects Concerns About Prime Minister Narendra Modi – By Mani Shankar Aiyar
  16. small is beautiful by E.F. Shumakher
  17. Full Text of speech by RSS Sarasanghachalak Mohan Bhagwat’s RSSVijayadashami Speech-2015
Share this
Leave a Comment