ডাইকিন শ্রমিকদের অধিকারের লড়াই


  • March 5, 2019
  • (0 Comments)
  • 652 Views

ভারতকে এখন মোদী সরকার ‘বহিঃশত্রু’র বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘দেশপ্রেমী যুদ্ধে’র গল্প শুনিয়ে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করছে চেষ্টা করছে অন্তর্দ্বন্দ্বের পথে ঠেলে দেওয়ার সেই একই সময়ে সেই একই সরকার আবার কর্পোরেটের সাথে হাত মিলিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধেই লাগাতার নানান অনৈতিক যুদ্ধ চালিয়ে চলেছে, যে অসম যুদ্ধ প্রকৃত অর্থে দেশদ্রোহী ও ধ্বংসাত্মক। সে সাধারণ মানুষ হতে পারেন কৃষক, শিক্ষক, ছোট ব্যবসায়ী, সংগঠিত বা অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক এমনকি সাধারণ জওয়ান। তাঁদের ক্ষমতা বা বিত্ত নেই। তবু তাঁরা কখনো কখনো ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেদের ও দেশের এই প্রকৃত শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান এবং অধিকারের লড়াই লড়েন। তেমনই এক যুদ্ধ রাজস্থানের নীমরানার ডাইকিন কোম্পানির শ্রমিকদের। ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে চলছে তাঁদের জেলে থাকা ১৮ জন সহকর্মীর মুক্তি, আন্দোলনরত ঠিকা ও স্থায়ী শ্রমিকদের পুনর্বহাল, সমান কাজের জন্য সমান বেতন, বেআইনি ছাঁটাই রদ ইত্যাদি নানা দাবিতে ক্রমিক অনশন ও ধরনা। একটি গ্রাউন্ডজিরো রিপোর্ট।

 

অন্যায্য ন্যূনতম মজুরি, চুক্তি শ্রম, বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের একের পর এক শ্রমিকবিরোধী আইন সংশোধন ইত্যাদির প্রতিবাদে এ বছরের শুরুতে ১০টি সেন্ট্রাল ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃত্বে ৮-৯ জানুয়ারি শ্রমিকরা দেশ জুড়ে হরতাল ডাকেন। ৮ তারিখ, এই হরতাল চলাকালীন, রাজস্থানের নীমরানায় ডাইকিন কোম্পানির প্রতিবাদী শ্রমিকরা কোম্পানির গেটে ডাইকিন এয়ার কন্ডিশনার মজদুর ইউনিয়নের পতাকা লাগাচ্ছিলেন। সেসময় ম্যানেজমেন্টের প্ররোচনায় পুলিশ এবং গুন্ডা বাহিনী তাঁদের উপর আক্রমণ চালায়। শুধু লাঠিচার্জ নয়, শান্তিপূর্ণ শ্রমিক জমায়েতের উপর টিয়ার গ্যাস এবং রবার বুলেটও ব্যবহার করা হয়, যার ফলে ইউনিয়ন প্রেসিডেন্ট রুকমুদ্দিন ও জেনারেল সেক্রেটারি দৌলত রামের সাথে আরও ৪০ জন শ্রমিক গুরুতর ভাবে আহত হন। এরপর পুলিশ প্রায় ১৭ জন নেতৃস্থানীয় শ্রমিক ও ৭০০ জন স্থায়ী ও ঠিকা শ্রমিকের নামে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯, ৩৩২, ৩৫৩, ৩০৭, ৪২৭, ৩৩৬ ও সেকশন ৩ প্রিভেনশন অফ ড্যামেজ টু পাবলিক প্রপার্টি অ্যাক্ট ধারায় মামলা দায়ের করে। ওই রাতেই ১২টা থেকে ২টোর মধ্যে পুলিশ এমন ১৪ জন শ্রমিককে গ্রেপ্তার করে, যাঁদের নাম এফআইআর-এ অব্দি ছিল না। গ্রেপ্তার হওয়া শ্রমিকদের বেআইনি ভাবে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে কাস্টোডিতে রাখার পরে তাঁদের আদালতে পেশ করা হয় এবং ৮ দিন বাদে তাঁরা জামিন পান। এর মধ্যে ম্যানেজমেন্ট এবং তাদের পোষা পুলিশ ও গুন্ডাবাহিনী ক্রমাগত শ্রমিকদের ও তাঁদের পরিবারদের হুমকি দিতে থাকে এবং তাঁদের ঘরবাড়ি ও ইউনিয়ন অফিস ভাঙচুরও করে। আরও কিছু শ্রমিকের নামে নতুন করে ৩০৭ জাতীয় নানা ধারায় (হত্যার প্রচেষ্টা ইত্যাদি) চার্জ আনা হয়। বেছে বেছে মহিলা শ্রমিকদের ঘর ভাঙচুর করে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়।

 

 

Posted by प्रमोद कुमार साहु on Tuesday, 26 February 2019

 

এরপর ডাইকিন ম্যানেজমেন্ট সম্পূর্ণ বেআইনি ভাবে প্ল্যান্ট তালাবন্ধ করে দেয় এবং মাসখানেক ধরে, পুলিশ-প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে, শ্রমিকদের একত্রিত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে রাখতে সক্ষম হয়। ডাইকিনের শ্রমিকরা মূলত কোটপুতলি, বেহরোড়, নীমরানা, শাহজাদাপুর, রেওয়াড়ি, নারনৌল প্রভৃতি অঞ্চলে বসবাস করেন। সেসব অঞ্চলে পুলিশকে দিয়ে ম্যানেজমেন্ট শ্রমিকদের নামে মিথ্যে এফআইআর দায়ের করায়। ন্যায়ের আশায় শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলোত, উপমুখ্যমন্ত্রী শচীন পাইলট, শ্রমমন্ত্রী টিকারাম জুলি সহ নেতাদের কাছে দরবার করে, কিন্তু তাঁরা প্রত্যেকেই জাপানি ম্যানেজমেন্টের বিরুদ্ধে কোনোরকমের কোনো পদক্ষেপ নিতে সাফ অস্বীকার করেন। আশেপাশের অঞ্চলের বিধায়কদের মধ্যেও একজনও ডাইকিন শ্রমিকদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে রাজি হননি।

 

এত বাধা সত্ত্বেও শ্রমিকরা ক্রমশ ছোট ছোট মিটিং-এর মাধ্যমে একজোট হতে থাকেন। এঁদের মধ্যে ঠিকা শ্রমিকদের সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো বেশি। এবছর ৫ ফেব্রুয়ারি ম্যানেজমেন্ট-পুলিশ-প্রশাসনের অত্যাচার ও অসহযোগিতার মুখে দাঁড়িয়ে, ডাইকিন ইউনিয়ন নীমরানা এসডিএম কার্যালয় ঘেরাও করে একটি মিছিলের আয়োজন করে। এতে গুড়গাঁও থেকে জয়পুর অব্দি নানান ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধি ও শ্রমিক আন্দোলনের অন্যান্য সাংগঠকরাও যোগ দেন। এর ফলে ম্যানেজমেন্ট থেকে ৫৬ জন নেতৃস্থানীয় স্থায়ী শ্রমিককে সাসপেন্ড করা হয় এবং কয়েক’শ স্থায়ী ও ঠিকা শ্রমিককে বরখাস্ত করা হয়।

 

তাতে পিছপা না হয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি শ্রমিকরা আর একটি জমায়েতের ডাক দেন। জমায়েতের তিন দিন আগে মনোজ সাইনি নামে এক শ্রমিক একটি আবাসিক অঞ্চলে লিফলেট বিলি করছিলেন। পুলিশ ও কোম্পানির ঠিকাদাররা মিলে তাঁকে মেরে তাঁর হাত ভেঙে দেয়। পুলিশ থেকে তাঁর এফআইআর রিপোর্ট নিতেও অস্বীকার করা হয়। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে প্রায় ৩০০ শ্রমিক আবার এসডিএম অফিস ঘেরাও করে দোষী পুলিশ কর্মীদের শাস্তির দাবিতে প্রতিবাদ জানান। তাতেও কোনো ফল হয় না। তখন বাধ্য হয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে মামলা দায়ের করার চেষ্টা শুরু হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টা থেকে নীমরানা খেতানাথ ধর্মকাঁটা থেকে এসডিএম অফিস পর্যন্ত অস্থায়ী, ক্যাজুয়াল, স্থায়ী-অস্থায়ী-অসংগঠিত শ্রমিকরা মিলে অন্যায্য বেতন, ৬-৮ মাসের মধ্যে ছাঁটাই ইত্যাদির প্রতিবাদে এবং স্থায়ী শ্রমের জন্য স্থায়ী সুরক্ষিত বেতন, সমান শ্রমের জন্য সমান বেতন, নীমরানা সমেত সম্পূর্ণ ন্যাশনাল ক্যাপিটাল রিজিয়ন(এনসিআর)-এ দিল্লি সরকার ঘোষিত ১৪০০০ টাকার ন্যূনতম মজুরি লাগু করা, নীমরানার ঠিকা-ক্যাজুয়াল-স্থায়ী-অস্থায়ী শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার অধিকার লাগু করা, শ্রমিকদের মধ্যে কোম্পানিকৃত নানান বিভাজন পদ্ধতি (যেমন স্থায়ী-অস্থায়ী, পুরুষ-মহিলা, স্থানীয়-প্রবাসী) দূরীকরণ ইত্যাদি দাবিতে ‘সংঘর্ষ র‍্যালি’ বার করেন।

 

সকাল ১১টায় যখন মিছিল বার করার জন্য শ্রমিকরা জড়ো হতে শুরু করেন, দেখা যায়, সেখানে আগে থাকতেই অত্যধিক মাত্রায় পুলিশ ফোর্স মজুত রয়েছে। পুলিশের সাহায্যে মিছিলটিকে ‘জাপানি জোন’-এ (ডাইকিন যেখানে অবস্থিত) ঢুকতে না দিয়ে ঘুরপথে যেতে বাধ্য করা হয়। এই শান্তিপূর্ণ মিছিলটি আটকাবার জন্য র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স, স্পেশাল ফোর্স, রায়ট কন্ট্রোল বাহিনীর সাথে সাথে ৭০০ পুলিশকর্মী হাজির ছিলেন। এ সত্ত্বেও শ্রমিকরা শেষ পর্যন্ত মিছিলকে এগিয়ে নিয়ে যান। পরে, আলওয়ার শ্রম বিভাগের মধ্যস্থতায়, ম্যানেজমেন্ট ও ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের মধ্যে কিছু কথাবার্তা হয়। কিন্তু ম্যানেজমেন্ট শ্রমিকদের দাবি মেনে নিতে – বিশেষত সাসপেন্ড হওয়া ৫৬ জন শ্রমিককে অথবা বরখাস্ত হওয়া ৫০০ ঠিকা শ্রমিককে কাজে ফেরত নিতে সরাসরি অস্বীকার করে এবং শুধুমাত্র ৩৫০ জন স্থায়ী শ্রমিককে কাজে ফেরত নিতে রাজি হয়। এ-ব্যাপারে শ্রমিকদের তরফ থেকে জয়পুর লেবার কমিশনারের কাছে আবেদন জানিয়েও কোনো লাভ হয় না।

 

বর্তমানে ডাইকিনের ১৮ জন গ্রেপ্তার হওয়া শ্রমিকের জামিন খারিজ হয়ে গেছে। ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের জন্য কালেক্টর অফিসের সামনে ক্রমিক অনশন ও ধরনায় বসে আছেন।

 

২০১৩-১৯: অধিকারের দীর্ঘ লড়াই

আসলে ম্যানেজমেন্ট ও প্রশাসনের বিচারে ডাইকিনের শ্রমিকরা মূল যে ‘দোষে’ দোষী, তা হল এই যে, তাঁরা নিজেদের একটি ইউনিয়ন গঠন করেছেন এবং তার পতাকা কোম্পানি গেটের সামনে লাগাতে চেয়েছেন। এই কোম্পানির শ্রমিকদের উপর হামলা কিন্তু এই প্রথমবার হয়নি। গত ছ’বছরে ইউনিয়ন গঠনের অধিকার, ঠিকা শ্রমিকদের সমস্যা ও ওই এলাকার অন্যান্য কোম্পানির শ্রমিকদের সমস্যাকে কেন্দ্র করে এই কোম্পানিতে মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্ব বারবারই প্রকট হয়ে উঠেছে।

 

২০১৩-১৫: ডাইকিন শ্রমিকদের ইউনিয়ন তৈরি হয় ২০১৩ সালে। ম্যানেজমেন্ট ও সরকারি শ্রমিক বিরোধী আইনজনিত নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হতে একটা সময়ে এসে শ্রমিকরা সমষ্টিগত ভাবে অনুভব করেন, যে ইউনিয়নের মাধ্যমে একত্রিত হওয়া ছাড়া হয়তো আর কোনো সমাধান তাঁদের সামনে নেই। ২০১৩-র ৬ মে ১১৬ জন শ্রমিকের সই সমেত ইউনিয়ন তৈরির একটি আবেদনপত্র জমা করা হয়। সে-সময় মোট শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৪০০-র কাছাকাছি। খবর পেয়ে ম্যানেজমেন্ট থেকে আবেদনকারী শ্রমিকদের উপর চাপ দেওয়া হতে থাকে, যাতে তাঁরা লিখিত ভাবে ওই আবেদনের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেন। শ্রমিকরা এতে রাজি না হলে, জুন মাসের শেষ দিক থেকে কোনো কারণ না দেখিয়ে, বিনা নোটিসে স্থায়ী ও প্রশিক্ষণরত (ট্রেনি) – দু’ধরনের শ্রমিকদেরই কোম্পানি বরখাস্ত করতে শুরু করে।

 

৩১ জুলাই ‘ডাইকিন এয়ারকন্ডিশন কামগার ইউনিয়ন’ নামে শ্রমিকদের ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন হয়। সঙ্গে সঙ্গে চল্লিশ জনেরও বেশি শ্রমিক ছাঁটাই হয়ে যান। ২ অগাস্ট ইউনিয়ন থেকে ম্যানেজমেন্টকে একটি দাবিপত্র দেওয়া হয়, যাতে ৭৫% বেতন বৃদ্ধি, টিএ, আবাসিক ভাতা, বোনাস, চিকিৎসা, যাতায়াতের সুবিধা, ভালো ক্যান্টিন ইত্যাদির জন্য কোম্পানি থেকে ব্যবস্থা ইত্যাদি নানা দাবি ছিল। মোট যে ৩৯টি দাবি এতে রাখা হয়, তার মধ্যে দুটিতে ঠিকা প্রথা বন্ধ করা ও ঠিকা শ্রমিকদের স্থায়ী করার কথা এবং মহিলা শ্রমিকদের মা হওয়ার সময় ছুটি দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। যাইহোক, এর উত্তরে ছাঁটাই হন আরও কয়েকজন। এইভাবে ২০১৩-র অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে মোট ১২৫ জন শ্রমিক বরখাস্ত হন। এই শ্রমিকদের ফেরত নেওয়ার দাবিতে এবং অন্যান্য অধিকারের দাবিতে শ্রমিকরা ওই মাসের শেষের দিকে একটি হরতাল ঘোষণা করেন। তাতে ম্যানেজমেন্ট উল্টে ৫৬ জন শ্রমিককে ‘কাজ বন্ধ রাখার ফলে কোম্পানির সম্পত্তির ক্ষতি’র মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে সাসপেন্ড করে।

 

অবশেষে ডিএলসি, আলওয়ার ও এলসি, জয়পুর-এর উপস্থিতিতে একটি ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে (৯ নভেম্বর) ম্যানেজমেন্টকে রাজি হতে হয়। ১২৫ জন ছাঁটাই কর্মীর মধ্যে ম্যানেজমেন্টের তরফ থেকে মাত্র ৩৬ জনকে সরাসরি ফেরত নেওয়া এবং শেষ কিস্তিতে যাঁদের সাসপেন্ড করা হয়, তাঁদের কোম্পানির অভ্যন্তরীণ কমিটির বিচারের উপর নির্ভর করে ফেরত নেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়, যা শ্রমিকরা কোনোভাবেই মেনে নেন না। ১৪ নভেম্বর ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের দ্বিতীয় দফায় ম্যানেজমেন্ট বলে, মোট বরখাস্ত ও সাসপেন্ড হওয়া শ্রমিকদের ৫০%-কে চাকরিতে ফিরিয়ে নেওয়া হবে, কিন্তু শেষ দফায় সাসপেন্ড হওয়া শ্রমিকদের অভ্যন্তরীণ কমিটির বিচারে রাজি হতে হবে। এতে এই শ্রমিকদের পুনর্বহাল করার জন্য কোনো সময়সীমার উল্লেখ করা হয় না। শ্রমিকরা এই বক্তব্যে স্থির থাকেন, যে কোনো বরখাস্ত বা সাসপেন্ড হওয়া শ্রমিককেই কোনো অর্থেই দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না। তাঁরা প্রত্যেকে নির্দোষ এবং ম্যানেজমেন্টের তাঁদের বিচার করার কোনো অধিকার নেই।

 

এসময় শ্রমিকরা ৬০ দিন ধরে কোম্পানির গেটে ১০০ মিটার দূরত্বে বসে ধরনা চালিয়ে যান। তাঁরা এ-সময় আশেপাশের গ্রামগুলি থেকেও সমর্থন পেয়েছিলেন। সেবছর ২৬ নভেম্বরে আয়োজিত এক জমায়েতে এই গ্রামগুলি থেকে বহু মানুষ এসে শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ান। এইভাবে, ম্যানেজমেন্ট ও স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ঠিকা, ট্রেনি ও স্থায়ী শ্রমিক এবং অন্যান্য সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদ ডাইকিন আন্দোলনকে ২০১৩ থেকেই একটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

 

২০১৩-র ১৯ ডিসেম্বর সরকারি শ্রম বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে ম্যানেজমেন্ট ও শ্রমিকদের ভিতর একটি লিখিত চুক্তি হয়, যাতে ৩৯ জন শ্রমিককে বাদ দিয়ে বাকিদের কাজে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয়, ৮০ দিনের ভিতর একটি শুনানি কমিটি গঠন করে, শুনানির পর সঙ্গে সঙ্গেই এই ৩৯ জনকে ফেরত নেওয়া হবে। ডাইকিন ম্যানেজমেন্ট এই কমিটিতে শুধুমাত্র নিজেদের লোককে নেয়। ফলে শুনানির পরে কথার খেলাপ করে ওই ৩৯ জনের মধ্যে ২১ জনকে কাজে নেওয়া হয়, বাকি ১৮ জনকে সাসপেন্ড করে রাখা হয়। শুধু তা-ই নয়, আরও ৪০০ জন ঠিকা শ্রমিককে বরখাস্ত করা হয়। ২০১৫-র শেষদিক অব্দি সাসপেন্ড-বরখাস্তর এই রুটিন চলতে থাকে। ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের সিদ্ধান্তকে অবহেলা করে ম্যানেজমেন্ট সেই ৩৯ জনের প্রত্যেককেই আবার বরখাস্ত করে দেয়। শ্রমিকরা এই নিয়ে শ্রম বিভাগের নানা আধিকারিকের কাছে আবেদন জানায়। তাতে যথারীতি কোনো কাজ হয় না। ফলে, ২০১৫-র ১৬ ডিসেম্বর আবার শুরু হয় অনির্দিষ্টকালের জন্য ধরনা – জয়পুর শ্রম বিভাগের সামনে। এক বছর চলে এই ধরনা, কিন্তু বরখাস্ত শ্রমিকদের আর কাজে ফেরত নেওয়া হয় না।

 

২০১৬-১৮: ২০১৬-র ৮ সেপ্টেম্বর শ্রমিকরা ইউনিয়ন গঠনের জন্য জয়পুর ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রারের কাছে দ্বিতীয়বার আবেদনপত্র জমা দেন। আবারও ম্যানেজমেন্টের চাপ আসতে থাকে। শ্রমিকদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করার, লোভ দেখাবার এবং ধমকাবার, কোনো পদ্ধতিই বাদ রাখা হয় না। লেবার লাইনে গিয়ে শ্রমিকদের গণ্ডগোল করতে প্ররোচিত করার চেষ্টা হয়, যাতে তাঁরা রাগের মাথায় কিছু করে বসলে তাঁদের বিরুদ্ধে চার্জ এনে চাকরি খেয়ে নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। ওই বছর দিওয়ালির পরে আরও ৪ জন নেতৃস্থানীয় শ্রমিকের বিরুদ্ধে চার্জ দায়ের করতে ম্যানেজমেন্ট সক্ষম হয়। ২১ অক্টোবর দর্শন মালিক নামের এক শ্রমিকের উপর মিথ্যে আরোপ লাগিয়ে হঠাৎ তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়, যার ফলে প্ল্যান্ট জুড়ে শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে দেন। শ্রমিকদের বিক্ষোভ এতটাই বেড়ে উঠেছিল, যে অবস্থা হাতের বাইরে চলে যেতে পারত। কিন্তু শ্রমিক প্রতিনিধিদের ও নীমরানা প্রশাসনের সম্মিলিত চেষ্টায় শেষ অব্দি কোনো অপ্রিয় ঘটনা ঘটতে পারে না। ম্যানেজমেন্ট অবশ্য তা সত্ত্বেও প্ল্যান্টে পুলিশ ডেকে আনে, যাতে সুযোগ পেলেই লাঠিচার্জ শুরু করা যায়। যাই হোক, স্থানীয় তহসিলদারের হস্তক্ষেপের ফলে ম্যানেজমেন্টকে আবারও একটি সমঝোতার উদ্দেশ্যে কথোপকথনে রাজি হতে হয়।

 

২৩ অক্টোবর বিকেলে ম্যানেজমেন্টের তরফ থেকে জিএম, এজিএম, কার্যবাহক এসডিএম মুকুন্দ সিং, বেহরোড় এসডিএম, বেহরোড় পুলিশ ডিএসপি, নীমরানা কোতওয়ালের সাথে সাথে একজন সাব ইন্সপেক্টর, তহসিলদার, লেবার ইন্সপেক্টর এবং শ্রমিক পক্ষের উপস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত হয়, যে দর্শন মালিককে তৎক্ষণাৎ কাজে পুনর্বহাল করা হবে, অন্য কোনো শ্রমিকের উপর নতুন করে কোনো চার্জ আনা হবে না এবং শ্রমিকরা কোম্পানির ক্ষতিপূরণের জন্য অতিরিক্ত কাজ করবেন। ম্যানেজমেন্ট প্রথমে এই সিদ্ধান্তে রাজি হয় না। কোনো শ্রমিককে কাজে ফেরত নেওয়া তো দূরের কথা, তারা আরও ৫১ জন শ্রমিককে বরখাস্ত করার হুমকি দেয়। তার উপর ডাইকিনের শ্রমিকদের উপর ওই এলাকার অন্য শ্রমিকদের উপর প্রভাব বিস্তার করে ‘গণ্ডগোলে ইন্ধন যোগাবার’ এবং হোন্ডা (টাপুকরা) কোম্পানির প্রতিবাদী শ্রমিকদের সহযোগিতা করার আরোপ আনা হয় (ডাইকিন শ্রমিকরা হোন্ডা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। নীমরানায় অবস্থিত বড় কোম্পানিগুলি স্বাভাবিক ভাবেই এই মিলিত আন্দোলনকে ভালো চোখে দেখেনি)। যাই হোক, তা সত্ত্বেও সমঝোতা হয় এবং চুক্তি অনুযায়ী শ্রমিকরা অতিরিক্ত সময় কাজ করে কোম্পানির ক্ষতিপূরণ করেন, কিন্তু ম্যানেজমেন্টের তরফ থেকে চুক্তি অস্বীকার করে দর্শন মালিকের শুনানির সময় পিছিয়ে দেওয়া হতে থাকে। সাথে সাথে শুধু অন্য শ্রমিকদের উপর অভিযোগ না আনার শর্ত মানা হয় না তা-ই নয়, লিখিত চুক্তির তথ্য বিকৃতি অব্দি ঘটানো হয়। এইভাবে ৬ মাস কেটে যায়।

 

ইতিমধ্যে ১৮ অক্টোবর ১০৪ জন শ্রমিকের সই সমেত ইউনিয়ন তৈরির আবেদন তৃতীয় বার জমা করা হয়। ম্যানেজমেন্ট থেকে বেহরোড় কোর্টে স্টে অর্ডার নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তাদের তরফে কোম্পানিতে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা বাড়িয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়, যে আবেদনকারীর সংখ্যা মোট শ্রমিকের ১০%-এর কম (অতএব আইন অনুযায়ী ইউনিয়ন তৈরির আবেদন খারিজ যোগ্য)। যাই হোক, কোর্ট স্টে অর্ডারের প্রস্তাব খারিজ করে দেয়। ম্যানেজমেন্ট যথারীতি শ্রমিকদের শাসাতে থাকে। লেবার লাইনে অন্যান্য শ্রমিকদের সামনে তাঁদের নানাভাবে অপমানিত করা হতে থাকে। নেতৃত্বে থাকা শ্রমিকদের চাকরি থেকে বার করে দেওয়ার ভয়ও দেখানো হতে থাকে। একই সময় ম্যানেজমেন্ট থেকে শ্রমিকদের কাছে খুব অল্প সময়ের মধ্যে একটি প্রতিনিধির তালিকা চাওয়া হয়, যাদের নিয়ে কমিটি গঠন করে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে নাকি আলোচনা করা হবে। শ্রমিকরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তালিকা প্রস্তুত করে দিলেও সেই কমিটি আজও তৈরি হয়ে ওঠেনি! সমস্যার সমাধানের চেষ্টার পরিবর্তে, ম্যানেজমেন্ট শ্রমিকদের হয়রান করার অভিনব সব উপায় বার করতে ব্যস্ত থাকে। যেমন, ২০১৭-র ৫ এপ্রিল কোম্পানির প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষ্যে শ্রমিকদের যে রুপোর কয়েন দেওয়া হয়, তা ফেরত চাওয়া হয়। দর্শন মালিকের বরখাস্তকরণের প্রতিবাদ করার জন্য অভ্যন্তরীণ কমিটির বিচারের নামে ইউনিয়নের জেনারাল সেক্রেটারি দৌলত রামকে ২০১৬-র নভেম্বর মাসে প্রথমে সাসপেন্ড ও পরে বরখাস্ত করে দেওয়া হয়।

 

কোম্পানির প্ররোচনায় তৎকালীন ভাজপা সরকার জয়পুর-এর ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে ইউনিয়নের আবেদন পত্র বেআইনি ভাবে এক বছর ফেলে রাখে। শেষ অব্দি হাইকোর্টের আদেশে ২০১৮-র অগাস্টে তৃতীয় আবেদন পত্রটি রেজিস্টার করা হয়। পরের দিন থেকেই আন্দোলনে সক্রিয় শ্রমিকদের অন্যান্য রাজ্যে ট্রান্সফার করা হতে থাকে। ৩০ অগাস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ১৩ জনের ট্রান্সফার হয়ে যায়। অক্টোবর মাসে ইউনিয়ন থেকে একটি চার্টার অফ ডিম্যান্ড তৈরি করা হয় এবং আইন মতো ‘প্রোটেক্টেড ওয়ার্ক মেন’ হিসেবে ৫ জন নেতৃস্থানীয় শ্রমিকের নাম প্রস্তাবিত করা হয়, যাতে ম্যানেজমেন্ট যেনতেন প্রকারে তাঁদের বিরুদ্ধে হঠাৎ কোনো পদক্ষেপ না নিতে পারে। এর কোনোটিকেই কার্যকরী করতে ম্যানেজমেন্ট তার ভূমিকা পালন করেনি– সে নিয়ে মামলা এখনও শ্রম বিভাগে ঝুলে আছে।

 

২০১৮-র ৫ সেপ্টেম্বর শ্রমিকরা কোম্পানি গেটে আনুষ্ঠানিক ভাবে ইউনিয়নের পতাকা লাগান এবং সেই ‘অপরাধে’ দৌলত রাম ও রুকমুদ্দিনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে, পতাকাটিও বাজেয়াপ্ত করা হয়। ডিসেম্বরের শুরুতে আরেকবার পতাকা তোলার চেষ্টা করা হয় কিন্তু এবারেও শ্রমিকদের আটকে দেওয়া হয়। ডাইকিন আন্দোলনকে প্রশাসন থেকে একটি অপরাধ মূলক প্রয়াস বলে প্রচার করা হতে থাকে এবং মামলা দায়ের করা হয়, যেমন মারুতি মানেসর, শ্রীরাম পিস্টন ভিওয়াড়ি, হোন্ডা টাপুকরা, আইসিন রোহতক ইত্যাদির ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ বারবারই করেছে। যখনই এই ইন্ডাস্ট্রি বেল্টে শ্রমিকরা আইনি ভাবে নিজেদের অধিকারের প্রশ্নে সরব হয়েছেন, বারবারই চলেছে সেই একই রকম আইনি-বেআইনি পথে শ্রমিকদের দাবিয়ে রাখার চেষ্টা, পুলিশ-গুন্ডা দিয়ে মার খাওয়ানো, ইউনিয়নের আবেদনপত্র আটকে রাখা, ট্রান্সফার, সাসপেন্ড, ছাঁটাই ইত্যাদি।

 

নীমরানা ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেল্টে শ্রমিক শোষণ ও আন্দোলন বিষয়ে কিছু তথ্য

 

ডাইকিন শ্রমিকদের বেতন – শোষণ পরিমাপের একটি একক: ডাইকিন এয়ারকন্ডিশনিং ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড ডাইকিন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের একটি অংশ। ডাইকিন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড একটি শতভাগ জাপানি কোম্পানি, যার ৬০টি উৎপাদনকারী ইউনিট রয়েছে এবং যা বিশ্বে এক নম্বর এয়ার কন্ডিশনার নির্মাতা কোম্পানি হিসেবে পরিচিত। নীমরানা প্ল্যান্ট ভারতে ডাইকিনের একমাত্র উৎপাদনকারী ইউনিট। ৪০ একরেরও বেশি জমি নিয়ে ন্যাশনাল হাইওয়ে ৮-এর উপর আই.এম.টি বাভল থেকে ২৫-৩০ কিমি এবং গুড়গাঁও থেকে ৯৭ কিমি দূরে, নীমরানায় রিকো শিল্পাঞ্চল ‘জাপানি পার্ক’-এ ফ্যাক্টরিটি অবস্থিত। ২০০৮ সালে স্থাপিত (উৎপাদন শুরু ২০০৯-এ) কোম্পানিটির বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৫০০০০ ভিআরভি (ভেরিএবল রেফ্রিজ্রেন্স ভলিউম) ইউনিট ও ১৮০০ কুলিং ইউনিট। ভারতীয় বাজারে ডাইকিনের বার্ষিক নেট সেল ৪০০০ কোটি টাকা এবং গ্লোবাল নেট সেল বর্তমানে ১৫৩২৪ মিলিয়ন আমেরিকান ডলার। এই ‘হাই প্রোফাইল’ কোম্পানির দ্রুত মুনাফা বৃদ্ধির প্রবৃত্তি ম্যানেজমেন্টকে শ্রমিকদের উপর অত্যধিক কাজের চাপ বাড়াতে এবং শ্রম অধিকার ও চাকরি ক্ষেত্রে নানান সুবিধা থেকে তাঁদের বঞ্চিত করে রাখতে প্ররোচিত করে।

 

বর্তমানে ডাইকিনে কর্মরত শ্রমিকদের বেতন ১২৫০০ থেকে ২২০০০ টাকার মধ্যে। ঠিকা শ্রমিকরা ৮০০০ টাকা পান এবং তার সাথে ৫০০ টাকার একটি অ্যাটেন্ডেন্স অ্যালাওয়েন্স থাকে। ফিক্সড টার্ম চুক্তিতে থাকা শ্রমিকরা ১২৫০০ টাকা এবং ডিপ্লোমা ট্রেনিরা ১৩০০০ টাকা পান। ১০ বছরে ডাইকিনের শ্রমিকদের বেতন মাত্র ৮-১০% বেড়েছে। তাঁরা যে বোনাস পান, সেটাকে পর্যন্ত কোম্পানি থেকে কাগজে কলমে বেতন বৃদ্ধি হিসেবে দেখানো হয়ে থাকে। ডাইকিন শ্রমিক ইউনিয়ন বা ওয়ার্কার্স কমিটি না থাকায় তাঁদের যে বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি হয়ে থাকে, তাতে বেশিরভাগ শ্রমিকের গড়ে খুব বেশি হলে ১০০০ টাকা বেতন বাড়ে। উদাহরণ– ২০১৮-তে কোম্পানি শ্রমিকদের চার ভাগে ভাগ করে বেতনবৃদ্ধি করে, যাতে কমতে কমতে চতুর্থ ভাগে এসে বেতন মাত্র ৫০০ টাকা বাড়ানো হয়। এইসব হিসেব মাথায় রেখে কোম্পানির বার্ষিক আয়ের দিকে তাকালে বোঝা যায়, যে কোম্পানি আসলে শ্রমিকদের কতখানি শোষণ করছে।

 

ওই বেল্টে অন্যান্য কোম্পানির শ্রমিকদের সমসাময়িক আন্দোলন ও ডাইকিন আন্দোলনের প্রভাব: নীমরানা ভিওয়াড়ি শিল্পাঞ্চল দিল্লি-মুম্বই ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডোর(ডিএমআইসি)-এর একটি অংশ। এটি হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মধ্য প্রদেশ ও গুজরাটের ভিতর দিয়ে মুম্বই থেকে দিল্লি অব্দি রাষ্ট্রীয় রাজধানী ক্ষেত্রের উন্নয়ন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে গৃহীত একটি বিরাট পরিযোজনা, যা আসলে এই মুহূর্তে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরের সব চাইতে বড় পরিযোজনা। এতে হরিয়ানার ৬০%, রাজস্থানের ৫৮% ও গুজরাটের ৬২% ভাগ পড়ছে। এই পরিযোজনার প্রয়োজনে যে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তার ফলে ইতিমধ্যেই হরিয়ানা, রাজস্থান ও গুজরাটের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে কৃষক বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এই উন্নয়নের বিকাশ ঘটছে কৃষক-শ্রমিকের উপর চালানো শোষণের উপর ভর করে। নীমরানা শিল্পাঞ্চলে এই মুহূর্তে প্রায় ৫০টি কোম্পানির উৎপাদন ইউনিট রয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এই সংখ্যাটি ২৫০-এ পৌঁছতে পারে। এর মধ্যে অধিকাংশই বিদেশি পুঁজির লগ্নি ক্ষেত্র। ডাইকিন ও অন্যান্য কোম্পানির শ্রমিক আন্দোলন এই বেল্টে তথাকথিত উন্নয়নের পিছনের চেহারাটা নানাভাবে বার করে আনছে।

 

২০১৩ সালে এই অঞ্চলে টয়োটো মিন্ডা(মারুতি সুজুকির ভেন্ডার কোম্পানি)-র শ্রমিকরা অধিকারের দাবিতে হরতাল ডেকে ছিলেন, কিন্তু তাঁদের আন্দোলনকে কোম্পানি শুরুতেই ভেঙে দেয়। লিবার্টি নামে আরেকটি কোম্পানির শ্রমিকরা নিজেদের ইউনিয়ন তৈরি করেন, কিন্তু মালিকানার বদল ঘটার পরে নতুন ম্যানেজমেন্ট সেই ইউনিয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে এবং জোর করে নেতৃস্থানীয় শ্রমিকদের পুরনো মালিকের অধীনস্থ একটি চামড়ার কোম্পানির উৎপাদন ইউনিটে ট্রান্সফার করিয়ে দেয়, যারপর ক্রমশ আন্দোলনটি গতিরুদ্ধ হয়ে পড়ে। রুচি বিয়ার কোম্পানির ক্ষেত্রেও শ্রমিকরা ইউনিয়ন বানাতে সক্ষম হয়, কিন্তু ম্যানেজমেন্টের হামলায় আন্দোলনের প্রভাব স্থায়ী হতে পারে না। এই অবস্থায় ডাইকিন শ্রমিকদের আন্দোলনকে ২০০০ সালে ঘটে যাওয়া মারুতি শ্রমিকদের আন্দোলন বা ২০০৫-এ হোন্ডা শ্রমিকদের আন্দোলনের সাথে তুলনা করা যায়, যা বর্তমানের ও ভবিষ্যতের শ্রমিক আন্দোলনে ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রাখছে ও রাখবে। ডাইকিন শ্রমিকরা আশে পাশের অন্যান্য কোম্পানির শ্রমিকদেরও সংগঠিত করার কাজ শুরু করতে চলেছেন। ২০১৮-র মে দিবসে নীমরানা ইন্ডিয়ান জোনে শিওন আলট্রাওয়্যার কোম্পানির প্ল্যান্টে ডাইকিনের শ্রমিকদের সহায়তায় কোম্পানি গেটে ইউনিয়নের পতাকা লাগানো সম্ভব হয়েছিল। ডাইকিনের সফলতার পরে ‘জাপানি জোন’-এ অবস্থিত নিশিন কোম্পানির শ্রমিকরাও ইউনিয়ন গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

 

একদিকে নীমরানার কর্পোরেট কোম্পানিগুলির কোটি কোটি টাকার মুনাফা হয়ে চলেছে, অন্যদিকে কোম্পানির শ্রমিকরা সুরক্ষিত চাকরি, সম্মানজনক জীবন যাপনের মতো বেতন, শ্রম আইনের সুযোগসুবিধা – এই সমস্ত কিছু থেকে বঞ্চিত হয়ে চলেছেন। এই শ্রমিকদের চুক্তির টার্ম শেষ হওয়ার সাথে সাথে (যেমন হিরো মোটো কর্পে) বা ম্যানেজমেন্টের ইচ্ছে মতো যে কোনো সময় চাকরি থেকে বার করে দেওয়া যেতে পারে। ডাইকিনের মতো কোম্পানিতে ৩-৪ বছর ঠিকা শ্রমিক হিসেবে কাজ করার পরেও না চাকরি পাকা করা হয়, না বেতন বাড়ানো হয়। হিরো বা ডাইকিনের মতো কোম্পানিতে বেআইনি ভাবে একজনও শ্রমিককে স্থায়ী না করে গোটা প্ল্যান্ট চালানো হচ্ছে। কোথাও কোথাও এমন ভাবে ডিউটি ফেলা হয়, যে শ্রমিকরা জল খেতে যাওয়া বা বাথরুমে যাওয়ার সময়টুকুও পান না। নিশিন, মিকুনি, নিডেক ইত্যাদি ‘জাপানি জোন’-এ অবস্থিত অন্যান্য কোম্পানি গুলিতেও ঠিকা বা অস্থায়ী শ্রমিকদের অবস্থা ‘ইন্ডিয়ান জোন’-এর মতোই। তবে ‘ইন্ডিয়ান জোন’-এ শ্রমিকদের উপর শোষণের মাত্রা আরও ভয়াবহ। পার্লে, রুচি বিয়ার, গিনি ইন্টারন্যাশনাল – এইসব কোম্পানিতে এখনও বেআইনি ভাবে দুই খেপে ১২ ঘণ্টা করে ডিউটি, সিঙ্গল ওভার টাইম ইত্যাদি চালু রয়েছে। মহিলা ও প্রবাসী শ্রমিকদের উপর নানা খাতে অত্যাচারের ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক। অবস্থা এমনই, যে ঠিকা ও অস্থায়ী শ্রমিকদের সাথে গালিগালাজ দিয়ে কথা বলা, বিনা কারণে চাকরি থেকে বার করে দেওয়া, জোর করে ওভারটাইম করানো, ছুটি না দেওয়া – এসব খুবই সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেতন যা দেওয়া হয়, তাতে সংসার চলে না, বাচ্চাদের পড়াশুনোর ঠিকমতো ব্যবস্থা করা হয়ে ওঠে না, অসুখ-বিসুখে ভালোভাবে চিকিৎসা অব্দি করা সম্ভব হয় না। একের পর এক কোম্পানিতে চাকরি খুইয়ে অন্য কোম্পানিতে চাকরির সন্ধান করাই এখানকার শ্রমিকদের জীবন। ৩০ বছরের উপর বয়েস হয়ে গেলে সে চাকরিটুকু পাওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তার উপর গত এক বছরে গুড়গাঁও থেকে বাভল অব্দি ৯টি কোম্পানিতে বেআইনি ভাবে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

 

স্বচ্ছল জীবনধারণের অধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের লক্ষ্যে আন্দোলন

 

নয়া উদারনৈতিক পুঁজি গুড়গাঁও থেকে নীমরানা বেল্টে শ্রমিক শোষণের জাল বুনে চলেছে। তার উপর সরকার থেকে যেভাবে শ্রম আইনের বদল ঘটানো হয়ে চলেছে, তাতে কোম্পানি মালিকদের সামনে শ্রমিকদের আরও ভালো ভাবে শোষণ করার রাস্তা চওড়া করা হচ্ছে। ঠিকা-ক্যাজুয়াল-ফিক্সড-অ্যাপ্রেন্টিস-ট্রেনির ভিড় স্থায়ী চাকরির বাজারকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে। ফ্যাক্টরি অ্যাক্টে বদল এনে হায়ার অ্যান্ড ফায়ার নীতি লাগু করে শ্রমিকদের সুরক্ষার অভাবে অতিব্যস্ত করে রাখা হচ্ছে, যাতে ন্যূনতম আয়টুকু জোটানোর বাইরে তাঁদের আর কিছু নিয়ে ভাবার অবসরটুকুও না থাকে।

 

কিন্তু এসব দুর্ভোগ, অসাফল্য, যন্ত্রণা পেরিয়েও ডাইকিন শ্রমিকদের আন্দোলন এই এলাকায় শ্রমিকদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের প্রেরণা হয়ে উঠছে। বিশেষ করে আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে, নানা স্তরে গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াইয়ের ইতিহাসে এ ধরনের আন্দোলনের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

সঙ্গের ছবি – ফেসবুক (ডাইকিন শ্রমিকদের ক্রমিক অনশন ও মিছিল, মাসা র‍্যালি)। ফীচার ছবি – ডাইকিন শ্রমিকদের ১ মার্চ-এর  মিছিল ও জমায়েত

Share this
Leave a Comment