৩৫এ ধারা – ইতিহাস ও রাজনীতি: পর্ব ৩


  • July 22, 2019
  • (0 Comments)
  • 896 Views

২০১৯-এর বিপুল নির্বাচনী সাফল্যের পর ভারত-কাশ্মীর সম্পর্কের মূল স্তম্ভ ৩৭০ এবং ৩৫এ ধারাদুটি রদ করার পরিকল্পনা করছে মোদী সরকার। গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে তাঁর ভাষণে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তা ঘোষণাও করেছেন। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে, কাশ্মীরের ‘বিশেষ সাংবিধানিক স্বীকৃতি’ সংক্রান্ত আইনগুলির ইতিহাস, সাংবিধানিক বৈধতা এবং কাশ্মীরি স্বায়ত্তশাসনের ক্ষেত্রে তাদের প্রাসঙ্গিকতা-সহ নানা বিষয় নিয়ে আমাদের এই তিন পর্বের আলোচনা। প্রথম পর্বে, আমরা এই আইনগুলির মূল বক্তব্য ও সাংবিধানিক ইতিহাস নিয়ে কথা বলেছিলাম। দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করা হয় ৩৫এ ধারা রদের পক্ষে দাখিল করা বিভিন্ন যুক্তির সাংবিধানিক ও ঐতিহাসিক সারবত্তা নিয়ে। কাশ্মীরি স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে ৩৭০ ধারার ভূমিকা নিয়ে কথা বলব এই তৃতীয় এবং শেষ পর্বে। লেখক অনিন্দ্য দে

 

পর্ব ৩ঃ কাশ্মীরি স্বায়ত্তশাসন এবং ৩৭০ ধারা

 

গত দুই দশকে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে কাশ্মীর আবার মুখর হয়ে উঠেছে। প্রবল সামরিক ও পুলিশি নির্যাতনের সামনেও গণআন্দোলন স্তিমিত হয়নি। পেলেট-গুলির তোয়াক্কা না করে অসংখ্য মানুষ বিক্ষোভ কর্মসূচিতে সামিল হচ্ছেন, উপত্যকার দেওয়ালে দেওয়ালে ফুটে উঠছে “Quit Kashmir” আর “Go India Go Back” স্লোগান। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে কাশ্মীর-বিষয়ক একটি আইনের শুনানি কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের কাছে নেহাতই অবান্তর। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে যে ৩৫এ ধারার সমর্থনে সরব হয়েছেন কাশ্মীরের সর্বস্তরের মানুষ। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল ও গণসংগঠন এই ধারা পরিবর্তন বা বাতিল করার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছে।

 

৩৫এ ধারার ভবিষ্যৎ নিয়ে কাশ্মীরি জনসাধারণের এই উদ্বেগ ও আশঙ্কার মূলে আছে বিগত কয়েক দশকের ভারত-কাশ্মীর সম্পর্কের তিক্ত অভিজ্ঞতা। বিশ্বাসভঙ্গের শুরু সেই ১৯৪৯ সালেই। কংগ্রেস ও ন্যাশনাল কনফারেন্স-এর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর ৩৭০ ধারার একটি বয়ান চূড়ান্ত হয়। আইনের মূল অংশে উল্লিখিত “Government of the State”-এর পরিভাষা নিয়ে দুপক্ষের মতবিরোধ দেখা দেয়। আলোচনার শেষে চূড়ান্ত খসড়া আইনটিতে “Government of the State”-এর একটি স্পষ্ট পরিভাষা দেওয়া হয় –

For the purposes of this article, the Government of the State means the person for the time being recognized by the Union as the Maharaja of Jammu and Kashmir acting on the advice of the Council of Ministers appointed under the Maharaja’s Proclamation dated the 5th March 1948.

 

ভারতের গণপরিষদে পেশ করার দিন, কাশ্মীরি নেতৃত্বের সঙ্গে কোনো রকম আলোচনা না করে, খসড়া আইনের এই অংশটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করেন ড্রাফটিং-এর দ্বায়িত্বে থাকা আইনজীবী স্যার এনজি আয়াঙ্গার। পরিবর্তিত পরিভাষাটি এইরকম দাঁড়ায় –

For the purposes of this article, the Government of the State means the person for the time being recognized by the Union as the Maharaja of Jammu and Kashmir acting on the advice of the Council of Ministers, for the time being in office, under the Maharaja’s Proclamation dated the 5th March 1948.

 

অর্থাৎ “appointed” শব্দটিকে বদলে করা হল “for the time being in office”। আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও, এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথম পরিভাষা অনুযায়ী, “Government of the State” বলতে স্পষ্টভাবে ১৯৪৮ সালে ক্ষমতায় আসা শেখ আবদুল্লার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রীসভাকেই বোঝানো হয়েছে। এর ফলে, কাশ্মীরের গণপরিষদ গঠনের আগে, এই মন্ত্রীসভায় কোনও বড় রদবদল করা যাবে না তা বকলমে স্বীকার করে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে, ৩৭০ ধারার অস্থায়ী চরিত্রটিও স্বীকার করে নেওয়া হয়। অন্যদিকে, পরিবর্তিত পরিভাষায়, ক্ষমতাসীন যে কোনও রাজ্য সরকারকেই ৩৭০ ধারা প্রয়োগের ক্ষেত্রে “Government of the State” বলা যেতে পারে।

 

শেখ আবদুল্লা ও এনজি আয়াঙ্গার – আমেরিকা সফর থেকে ফেরার পরে, পালাম এয়ারপোর্ট, ১৬ ফেব্রুয়ারী ১৯৪৮। সূত্র: কাশ্মীর লাইফ

স্বভাবতই, এই ঘটনার ফলে শেখ আবদুল্লা সহ গণপরিষদের কাশ্মীরি সদস্যদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধে। পরবর্তীকালে, প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাকে বরখাস্ত ও গ্রেফতার করে দিল্লির রাজনৈতিক নেতৃত্ব কীভাবে Delhi Agreement-এর সিদ্ধান্তগুলি রূপায়িত করেছিল সেকথা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে, ৩৭০ ধারার প্রাথমিক খসড়াটি গৃহীত হলে, শেখ আবদুল্লার অপসারণ একটি অভূতপূর্ব সাংবিধানিক সঙ্কট হিসেবে দেখা দিত। “Government of the State”-এর পরিভাষায় ঐ ছোট্ট পরিবর্তন এইভাবেই কাশ্মীরের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

 

কাশ্মীরের জনমত উপেক্ষা করে, সুবিধাবাদী রাজনৈতিক নেতাদের সাহায্যে কাশ্মীরি স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে দুর্বল করার প্রকল্পের সেই শুরু। আর সেই কাজে প্রধান অস্ত্র হয়ে ওঠে ৩৭০ ধারা।

 

 

১৯৫৪ সালের ৩৫এ ধারা-সংক্রান্ত নির্দেশ থেকে শুরু করে ২০১৮ পর্যন্ত ৩৭০ ধারা ব্যবহার করে ৪৭টিরও বেশি সাংবিধানিক নির্দেশ জারি করা হয়েছে। এরই পাশাপাশি, সুবিধাবাদী কাশ্মীরি রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যক্ষ মদতে জম্মু-কাশ্মীরের সংবিধান একাধিকবার সংশোধন করা হয়। তারই সুবাদে ভারতীয় সংবিধানের প্রধান ৩৯৫টি ধারার মধ্যে ২৬০টিই আজ জম্মু-কাশ্মীরে প্রযোজ্য। কেন্দ্রীয় তালিকার ৯৭টি বিষয়ের মধ্যে ৯৪টি এবং সংযুক্ত তালিকার ৪৭টি বিষয়ের মধ্যে ২৬টির ক্ষেত্রে বর্তমানে ভারতীয় সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রয়েছে। মনে রাখতে হবে, ভারত-ভুক্তির দলিলে এবং Delhi Agreement-এ শুধু তিনটি বিষয়ে ভারতীয় সংসদকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। ফলত Delhi Agreement-এ প্রতিশ্রুত সাংবিধানিক সার্বভৌমত্বের (residual sovereignity) কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। জম্মু-কাশ্মীর আইনসভার “residuary power’’-এর ক্ষেত্রেও একই কথা বলা চলে।

 

১৯৮৬ সালে ২৪৯ ধারা সংক্রান্ত একটি সাংবিধানিক নির্দেশকে ঘিরে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। রাষ্ট্রপতি-শাসিত জম্মু-কাশ্মীরে রাজ্য সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে এই নির্দেশে সম্মতি দেন দিল্লি-মনোনীত রাজ্যপাল জগমোহন, যা ৩৭০ ধারার বয়ান অনুযায়ী সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক। ষাট থেকে নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এইভাবেই ৩৭০ ধারার যথেচ্ছ অপব্যবহার চলে। ২০১৭ সালে, Goods and Services Tax (GST)-বিষয়ক সাংবিধানিক সংশোধনীটি জম্মু-কাশ্মীরে প্রয়োগ করা হয় ৩৭০ ধারার মাধ্যমে। কাশ্মীরের অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর এই আক্রমণের তীব্র প্রতিবাদ করেন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। ২০১৯-এর মার্চ মাসে সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণ বিষয়ক দুটি সাংবিধানিক সংশোধনীর ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। নব্বইয়ের দশকের শেষে কাশ্মীরি স্বায়ত্তশাসনের একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করতে রাজ্য সরকারের উদ্যোগে গঠিত হয় Kashmir State Autonomy Committee। কমিটি তাদের রিপোর্টে স্পষ্ট বলে:

“It is abundantly clear, therefore, that from 1953 onwards, especially in the sixties, the process of erosion of State autonomy was so rapid and on such a massive scale that the entire Article 370 of the Constitution of India which was supposed to guarantee and preserve the special status of the State in the Indian Union was emptied of its substantive content with the result that the State’s jurisdiction over the matters as envisaged by the Instrument of Accession of October, 1947 and the Delhi Agreement of 1952 was gradually diminished and subsequently transferred to the Union.”

 

কমিটির মূল্যায়নে, ভারতের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায়, কেন্দ্র-রাজ্য ক্ষমতার ভারসাম্যের দিক থেকে জম্মু-কাশ্মীরের অবস্থা আরও শোচনীয়। সাধারণভাবে একটি রাজ্য-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সাংবিধানিক সংশোধনী পাশ করাতে গেলে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং রাজ্যটির সম্মতি প্রয়োজন। জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষেত্রে সেই একই কাজ করা সম্ভব স্রেফ একটি সাংবিধানিক নির্দেশ জারি করে। একটি ছোট উদাহরণ দেওয়া যাক। আশির দশকে পাঞ্জাবে রাষ্ট্রপতি শাসন বহাল রাখার জন্য মোট চারবার সংবিধান সংশোধন করতে হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকে কাশ্মীরের ক্ষেত্রে এই একই কাজ করা সম্ভব হয়েছিল ৩৭০ ধারার মাধ্যমে সাংবিধানিক নির্দেশ ব্যবহার করে।

 

শেখ আবদুল্লা, বক্সি গুলাম মহম্মদ এবং ঈশ্বরী দেবী মাইনি ও রাজিন্দার সিং – কাশ্মীর গণপরিষদের দুই মহিলা সদস্য, শ্রীনগর, ৩১ অক্টোবর ১৯৫১। সূত্র: কাশ্মীর লাইফ

বিশিষ্ট সংবিধান-বিশেষজ্ঞ এজি নুরানির মতে, প্রথমটি বাদে ৩৭০ ধারার মাধ্যমে জারি করা এই সাংবিধানিক নির্দেশগুলির কোনওটিই আইনত বৈধ নয়। ৩৭০ ধারার অনুবর্তী যে কোনও সাংবিধানিক নির্দেশ আসলে একটি অন্তর্বর্তী আদেশ, যা আইন হিসেবে গ্রহণ করার এক্তিয়ার আছে একমাত্র জম্মু-কাশ্মীর গণপরিষদের। গণপরিষদ গঠিত হওয়ার আগে, এই আদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সম্মতি দেওয়ার অধিকার আছে জম্মু-কাশ্মীর সরকারের। কিন্তু গণপরিষদ গঠনের পর সরকারের সে অধিকার আর নেই। ফলত ১৯৫৬ সালে গণপরিষদ ভেঙে দেওয়ার পর ৩৭০ ধারার মাধ্যমে কোনও সাংবিধানিক নির্দেশ জারি করা আর বৈধ নয়, কারণ তাকে আইন হিসেবে গ্রহণ করার এক্তিয়ার জম্মু-কাশ্মীর সরকারের নেই।

 

৩৭০ ধারার অপব্যবহারের পরিকল্পনার কথা অবশ্য একাধিকবার প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন পঞ্চাশ ও ষাট দশকের কংগ্রেস সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা। ১৯৫৬ সালে গোবিন্দবল্লভ পন্থ শ্রীনগরে একটি ভাষণে জম্মু-কাশ্মীরকে ভারতের “অটুট অঙ্গ” বলে মন্তব্য করেন।

 

১৯৬৩ সালে লোকসভায় ৩৭০ ধারা প্রসঙ্গে একটি প্রশ্নের উত্তরে জওহরলাল নেহরু বলেন:

“.. it has been eroded, if I may use the word, and many things have been done in the last few years which have made the relationship of Kashmir with the Union of India very close. There is no doubt that Kashmir is fully integrated.”

 

পরের বছর লোকসভায় তৎকালীন গৃহমন্ত্রী জি এল নন্দা আরও স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন দিল্লির অভিসন্ধি:

“[Article 370 is] neither a wall nor a mountain but it is a tunnel. It is through this tunnel that a good deal of traffic has already passed and worse will.”

 

অর্থাৎ ৩৭০ ধারাটির মাধ্যমেই ধাপে ধাপে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনকে ধ্বংস করা হবে। ভারতীয় রাষ্ট্রের সম্প্রসারণবাদী রাজনীতির স্পষ্ট প্রতিধ্বনি শোনা যায় পন্থ, নেহরু ও নন্দার এই ভাষণগুলিতে।

রাজ ভবন চত্বরে জহরলাল নেহরু, বক্সি গুলাম মহম্মদ এবং ডা: করণ সিং (নেপথ্যে ইন্দিরা গান্ধী)। সূত্র: কাশ্মীর লাইফ

এইভাবেই কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টিকে পরিহাসে পরিণত করেছে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অবশ্যই কাশ্মীরের বশংবদ রাজনৈতিক শ্রেণির প্রত্যক্ষ মদতে। ১৯৬৫ সালের এপ্রিল মাসে জম্মু-কাশ্মীরের তৎকালীন কংগ্রেস সরকার সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচিত সদর-ই-রিয়াসত পদটি বাতিল করে। তার পরিবর্তে, সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতির দ্বারা মনোনীত “রাজ্যপাল”-এর পদটি তৈরি করা হয়। এই একই সংশোধনীতে, কাশ্মীরের “প্রধানমন্ত্রী” হয়ে যান “মুখ্যমন্ত্রী”।

 

এইভাবেই, Delhi Agreement-এর আরও একটি প্রধান সমঝোতার উপর আঘাত হানে দিল্লির রাজনৈতিক নেতৃত্ব। ২০১৫ সালে জম্মু-কাশ্মীর হাইকোর্ট এই সংশোধনীটিকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেয় এবং জম্মু-কাশ্মীর আইনসভাকে এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বলে। বলাই বাহুল্য, কাশ্মীরের পিডিপি-বিজেপি সরকারের আমলে এই বিষয়ে আলোচনা মুলতুবি রাখা হয়।

 

১৯৫৩। শেখ আবদুল্লার গ্রেফতারির প্রতিবাদে সড়ক লিখন মুছে ফেলতে বাধ্য করছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। সূত্র: কাশ্মীর লাইফ

কাশ্মীরের মানুষের কাছে স্বায়ত্তশাসন খর্ব করার এই দীর্ঘ সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা বৃহত্তর ভারতীয় আগ্রাসনেরই অঙ্গ, যে আগ্রাসনে সামিল ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং সুপ্রিম কোর্ট। এই পরিস্থিতিতে, ৩৫এ ধারাটি প্রকৃত অর্থেই কাশ্মীরি স্বায়ত্তশাসনের শেষ স্তম্ভ। প্রবল ভারতীয় আগ্রাসনের সামনে, এই আইনটি কাশ্মীরি মানুষের জমি ও জীবিকার অধিকার সুনিশ্চিত করে। এছাড়াও, নয়ের দশকের পরবর্তী সময়ের রাজনীতির প্রেক্ষিতে এই আইনটির আরেকটি তাৎপর্য আছে। কাশ্মীরে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হওয়ার পর ভারতের সামরিক উপস্থিতি ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। এই বিপুল সেনাবাহিনীর জন্য কাশ্মীরের বিভিন্ন অঞ্চলে তৈরি হয় বিশালাকার সামরিক ক্যাম্প ও অন্যান্য পরিকাঠামো। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীর উপত্যকায় ভারত সরকার বড় মাপের জমি অধিগ্রহণ করে জনসংখ্যার বিন্যাস পাল্টানোর চেষ্টা করবে – এই আশঙ্কা মানুষের মনে দানা বেঁধে ওঠে। ২০০৮-এ Shri Amaranth Shrine Board-কে প্রায় ৪০ হেক্টর জমি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়, যার প্রতিবাদে বিক্ষোভের ঝড় ওঠে কাশ্মীরে। তারপরেও কাশ্মীর উপত্যকায় “সৈনিক কলোনি” বা কাশ্মীরি পণ্ডিতদের জন্য বিশেষ ক্যাম্প নির্মাণের প্রস্তাব করা হয় ভারত সরকারের বিভিন্ন মহলে।

 

কাশ্মীরে ভারতীয় সেনার আগ্রাসন এবং অমরনাথ তীর্থযাত্রা – একই সিক্কার দুই পিঠ। সূত্র: ইন্টারনেট।

স্বাভাবিকভাবেই, আগ্রাসনের পরবর্তী ধাপ হিসেবে ভারত যে কাশ্মীরের জমি দখল করে সেখানে বহিরাগতদের বসতি গড়ে তুলতে পারে, এই আশঙ্কার সঙ্গত কারণ আছে। প্যালেস্তাইনের ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক এবং জেরুজালেম অঞ্চলে এই একই কৌশলে ইজরায়েল কীভাবে জনসংখ্যার বিন্যাস পালটে ফেলেছে, সেই ইতিহাস সবারই জানা। এই মুহূর্তে, সেই সম্ভাবনার পথে একটিই সাংবিধানিক অন্তরায় আছে — ৩৫এ ধারা। স্বায়ত্তশাসনের এই শেষ চিহ্নটিকে বাঁচিয়ে রাখা তাই কাশ্মীরের মানুষের কাছে স্বাধীনতার লড়াই এবং ভারতীয় আগ্রাসনের মুখে জমি-জীবিকা ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়েরই অঙ্গ।

 

তথ্যসূত্র:

১) AG Noorani, Article 370: A Constitutional History of Jammu and Kashmir.

২) C Robinson, Body of Victim, Body of Warrior.

৩) C Snedden, Kashmir: The Unwritten History.

৪) AG Noorani, Rape of Article 370.

৫) The Constitution of India

৬) MA Qayoom, What the Delhi Agreement of 1952 is All About.

৭) AG Noorani, Article 35A is Beyond Challenge.

৮) Scroll Staff, Jammu and Kashmir: Arun Jaitley says Article 35A is ‘constitutionally vulnerable’.

 

লেখক পেশায় পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক।

ফিচার ছবি: কাশ্মীর গণপরিষদ – কাশ্মীরি সংবিধানের রূপকার, ১৯৫১। সূত্র: কাশ্মীর লাইফ

 

Share this
Leave a Comment