৩৫এ ধারা – ইতিহাস ও রাজনীতি: পর্ব ২


  • July 21, 2019
  • (1 Comments)
  • 809 Views

২০১৯-এর বিপুল নির্বাচনী সাফল্যের পর ভারত-কাশ্মীর সম্পর্কের মূল স্তম্ভ ৩৭০ এবং ৩৫এ ধারাদুটি রদ করার পরিকল্পনা করছে মোদী সরকার। গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে তাঁর ভাষণে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তা ঘোষণাও করেছেন। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে, কাশ্মীরের ‘বিশেষ সাংবিধানিক স্বীকৃতি’ সংক্রান্ত আইনগুলির ইতিহাস, সাংবিধানিক বৈধতা এবং কাশ্মীরি স্বায়ত্তশাসনের ক্ষেত্রে তাদের প্রাসঙ্গিকতা-সহ নানা বিষয় নিয়ে আমাদের এই তিন পর্বের আলোচনা। প্রথম পর্বে, আমরা এই আইনগুলির মূল বক্তব্য ও সাংবিধানিক ইতিহাস নিয়ে কথা বলেছিলাম। এই দ্বিতীয় দফায়, আমরা ৩৫এ ধারা রদের পক্ষে দাখিল করা বিভিন্ন যুক্তির সাংবিধানিক ও ঐতিহাসিক সারবত্তা নিয়ে আলোচনা করব। কাশ্মীরি স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে ৩৭০ ধারার ভূমিকা আলোচিত হবে তৃতীয় পর্বে। লিখছেন অনিন্দ্য দে

 

পর্ব ২ঃ ৩৫এ ধারা এবং সামাজিক ন্যায়

 

৩৫এ ধারা অসাংবিধানিক বলে যাঁরা দাবি করেন, তাঁদের যুক্তি মূলত দুটি। “We The Citizens”-এর করা জনস্বার্থ মামলার বক্তব্যও মোটামুটি এই দুটি যুক্তির উপরে দাঁড়িয়ে আছে।

 

১) রাষ্ট্রপতি ভারতের পার্লামেন্টকে এড়িয়ে সংবিধান সংশোধন করতে পারেন না। ৩৭০ ধারা রাষ্ট্রপতিকে ৩৬৮ ধারাটি (যা পার্লামেন্টকে সংবিধান সংশোধনের অধিকার দেয়) উপেক্ষা করার ক্ষমতা দেয় না, এই হল এই তর্কের প্রধান বক্তব্য।

২) ৩৫এ ধারাটি বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের একটি মূল ভিত্তি, ধারা ১৪ দ্বারা সুরক্ষিত আইনের চোখে সমতার অধিকারকে (equality before law) খর্ব করে।

 

আমাদের আলোচনার পরিসরে গভীর আইনি তর্ক-বিতর্কের অবকাশ নেই। কিন্তু ৩৭০ ধারার অন্তর্গত দফা 1(d)-এর বয়ান একটু মন দিয়ে পড়লে প্রথম যুক্তিটি মানা মুশকিল। জম্মু-কাশ্মীরে ভারতীয় সংবিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় “exceptions and modifications”-এর বাস্তবতা সেখানে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে কোনও শর্ত ছাড়াই এবং সাংবিধানিক নির্দেশিকার মাধ্যমেই যে রাষ্ট্রপতিকে এই আইনগুলি জারি করতে হবে, তা-ও বলা হয়েছে। এরই পাশাপাশি, ৩৬৮ ধারায় জম্মু-কাশ্মীর সংক্রান্ত অনুবিধির বয়ানও খুব স্পষ্ট। ফলত ৩৭০ ধারাকে (বিশেষত তার অন্তর্গত দফা 1(d)) বাতিল না-করলে ৩৫এ ধারার সাংবিধানিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কঠিন।

 

মজার কথা হল, “We The Citizens”-এর মামলার এই প্রধান যুক্তিটি অতীতে সুপ্রিম কোর্টেই খারিজ হয়ে গেছে অন্তত দুবার। ১৯৬১ সালে “পুরনলাল লখনপাল বনাম ভারতের রাষ্ট্রপতি” মামলায়, পাঁচ-সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ রায় দেয় যে ৩৭০ ধারার ক্ষেত্রে “modifications” শব্দটি ব্যাপকতর অর্থে বুঝতে হবে। তারা বলে যে সাংবিধানিক নির্দেশিকার মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরে প্রযোজ্য যে কোনও আইনে আমূল পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির আছে। ১৯৬৯ সালে “সম্পৎ প্রকাশ বনাম জম্মু-কাশ্মীর সরকার” মামলায় আরও পরিষ্কারভাবে সুপ্রিম কোর্ট জানায় যে ৩৬৮ ধারা সরাসরি জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাবে না। ভারতীয় সংবিধানের কোনও সংশোধিত অংশ জম্মু-কাশ্মীরে প্রয়োগ করতে গেলে তা করতে হবে ৩৭০ ধারার অনুবর্তী সাংবিধানিক নির্দেশিকার মাধ্যমেই।

 

এবার দ্বিতীয় যুক্তিটি নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। কোনও অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীকে বিশেষ কিছু অধিকার দেওয়া কি সমতার মৌলিক অধিকারকে খর্ব করে? বিশেষত সেই জনগোষ্ঠীর যদি অর্থনৈতিক, সামাজিক বা রাজনৈতিকভাবে শোষিত হওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস থেকে থাকে। সংগঠিত শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আইনি রক্ষাকবচ ছাড়া সমতার অধিকার তো দূর স্থান, সামাজিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে। ভারতীয় সংবিধান তো বটেই, ঔপনিবেশিক যুগের একাধিক আইনেও এই সহজ যুক্তি স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। অ-কাশ্মীরি বহিরাগতদের নিয়োগের বিরুদ্ধে বাড়তে-থাকা জনরোষ সামলাতেই যে ১৯২৭-এর Hereditary State Subject Order-এর জন্ম, সেকথা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। প্রাক-স্বাধীনতা যুগের আরও একটি আইন এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯০৮ সালে, বিরসা মুণ্ডার নেতৃত্বে আদিবাসী অভ্যুত্থানের অব্যবহিত পরেই, তৈরি হয় Chotanagpur Tenancy Act (CNTA)। পূর্ব-ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে CNTA আদিবাসী জমি বিক্রি ও হস্তান্তরের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। বিশেষ করে, আদিবাসী জমি অ-আদিবাসীদের বিক্রি বা হস্তান্তর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। ব্রিটিশ আমলে এবং স্বাধীনতা-উত্তর যুগে আদিবাসী-মূলবাসি মানুষের জমি ও জীবিকার অধিকার রক্ষা করার ক্ষেত্রে CNTA যে একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে তা বলাই বাহুল্য। সাম্প্রতিক কালে ঝাড়খণ্ডে বিভিন্ন মাইনিং কর্পোরেশনগুলির আগ্রাসন ঠেকাতেও CNTA গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। তাই CNTA-র দ্বারা একটি ভৌগোলিক অঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে কিছু বিশেষ অধিকার দেওয়া হলেও, এই আইন সামগ্রিকভাবে সমতার মৌলিক অধিকারকেই প্রতিষ্ঠিত করে। ভারতীয় সংবিধানের ৩৫এ ধারাটিকেও এই একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা উচিত।

 

CNT Act রদবদলের বিরুদ্ধে ঝাড়খণ্ডে আদিবাসী-মূলবাসী জনজাতির বিক্ষোভ। সূত্র: হিন্দুস্থান টাইম্‌স।

এখানে যে প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে, তা হল ভারতের অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় জম্মু-কাশ্মীরের সঙ্গে ভারতীয় রাষ্ট্রের এই বিশেষ বোঝাপড়া ঠিক কতদূর ব্যতিক্রমী? ১৯৬২ সালে পাশ হওয়া নাগাল্যান্ড-বিষয়ক ধারা ৩৭১(এ)-এর কথাই ধরা যাক। ধারাটির অন্তর্গত দফা 1(a) বলে:

(1) Notwithstanding anything in this Constitution, – (a) no Act of Parliament in respect of – 
(i) religion or social practices of the Nagas, 
(ii) Naga customary law and procedure, 
(iii) administration of civil and criminal justice involving decisions according to Naga customary law, 
(iv) ownership and transfer of land and its resources, 
shall apply to the State of Nagaland unless the legislative Assembly of Nagaland by a resolution so decides. 

 

দফা 1(a) (iv) এই তালিকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ধর্মীয় আচার বা সামাজিক প্রথাসিদ্ধ আইনের ক্ষেত্রেই নয়, জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার সংক্রান্ত যাবতীয় আইন প্রণয়নের ক্ষমতাও থাকছে নাগাল্যান্ড আইনসভার হাতে। ধারাটির পরবর্তী দফাগুলি নাগাল্যান্ডের সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে।

 

প্রায় একই কথা বলা চলে মিজোরাম বিষয়ক ধারা ৩৭১(জি) সম্পর্কে। ধারাটির অন্তর্গত দফা 1(a) বলে:

(1) Notwithstanding anything in this Constitution, – (a) no Act of Parliament in respect of – 
(i) religious or social practices of the Mizos, 
(ii) Mizo customary law and procedure, 
(iii) administration of civil and criminal justice involving decisions according to Mizo Customary law, 
(iv) ownership and transfer of land, 
shall apply to the State of Mizoram unless the Legislative Assembly of Mizoram by a resolution so decides.

 

শুধু এই দুটি রাজ্যেই নয়, এই ধরনের তথাকথিত “বিশেষ” আইন প্রচলিত অসম, মণিপুর, অন্ধ্রপ্রদেশ, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশ ও গোয়ার ক্ষেত্রেও (যথাক্রমে ৩৭১ বি, সি, ডি, এফ, এইচ ও আই ধারা)। ভারতবর্ষের মতো একটি দেশে, যেখানে নানা জাতিগোষ্ঠী ও ভাষাগোষ্ঠীর বাস, সেখানে প্রভূত ক্ষমতাশালী কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসনের ফলে জমি-জীবিকা, প্রাকৃতিক সম্পদ, ভাষা ও সংস্কৃতি হারানোর আশঙ্কা অত্যন্ত সঙ্গত। বিশেষ করে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্র থেকে দূরে, ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে খানিকটা প্রান্তিক অঞ্চলগুলির ক্ষেত্রে তা আরও বেশি করে প্রযোজ্য। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এই ধরনের “বিশেষ” আইন কেন্দ্র-রাজ্য ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে একটি ন্যূনতম পদক্ষেপ। অসম বা নাগাল্যান্ডে যেমন তার প্রয়োজন আছে, তেমনি আছে জম্মু-কাশ্মীরে। তাই ৩৭০/৩৫এ ধারাগুলি যে ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলির নিরিখে ব্যতিক্রমী, এই তর্ক স্পষ্টতই ভিত্তিহীন। ভারতীয় সংবিধানে এই ধরনের অঞ্চলভিত্তিক বিশেষ আইনগুলিকে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর এক অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবেই দেখা হয়েছে।

 

৩৫এ ধারা সংক্রান্ত সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে যে কয়েকটি বিষয় ঘুরেফিরে আসে তার মধ্যে অন্যতম হল – জম্মু-কাশ্মীরে চালু উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইনগুলি মহিলাদের প্রতি বৈষম্যমূলক, এবং ৩৫এ ধারা এই আইনগুলিকে সাংবিধানিক বৈধতা দেয়। সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন আইনজীবী চারু ওয়ালি খান্নার আবেদনের সারমর্ম এটিই। ২০০২ সালে “জম্মু-কাশ্মীর সরকার বনাম ডাঃ সুশীলা সাহানি” মামলার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রায়ে জম্মু-কাশ্মীর হাইকোর্ট এই বিষয়ে কয়েকটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তার মধ্যে একটি হল, জম্মু-কাশ্মীরের বাইরে বিবাহ করা মহিলা স্থায়ী বাসিন্দাদের সম্পত্তির উত্তরাধিকারের দাবিকে মান্যতা দেওয়া। কিন্তু এই বিবাহিত মহিলাদের স্বামী বা ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে এই দাবি এখনও গ্রাহ্য হয় না। অন্যদিকে জম্মু-কাশ্মীরের বাইরে বিবাহ করা পুরুষের স্ত্রী বা ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনও সমস্যা নেই। সুতরাং একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে উত্তরাধিকার বিষয়ক আইনগুলিতে লিঙ্গবৈষম্যের দিকটি স্পষ্ট।

 

এই প্রসঙ্গে স্বাধীনতার পরে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদের বিষয়টিও উল্লেখ করা যেতে পারে। দীর্ঘ কয়েক দশক জম্মু-কাশ্মীরে (প্রধানত জম্মু অঞ্চলে ) বাস করার পরেও তারা স্থায়ী বাসিন্দার স্বীকৃতি পায়নি, তাই যাবতীয় সরকারি সুযোগ-সুবিধে থেকে তারা বঞ্চিত। পঞ্চাশের দশকে পাঞ্জাব থেকে আসা সাফাই-কর্মীদের অবস্থাও অনেকটা একইরকম। স্থায়ী বাসিন্দার স্বীকৃতি না-থাকায়, এই পরিবারগুলির বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের পক্ষে সরকারি চাকরি বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধে পাওয়া দুষ্কর।

 

জম্মু-কাশ্মীরে স্থায়ী বাসিন্দার স্বীকৃতি বিষয়ক আইনগুলিতে এই ধরনের নানা বৈষম্যের উদাহরণ আছে। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে এই আইনগুলির সঙ্গে ৩৫এ ধারার সরাসরি কোনও সম্পর্ক নেই। এই বৈষম্য দূর করতে ৩৫এ ধারা বাতিল করারও কোনও প্রয়োজন নেই। জম্মু-কাশ্মীর আইনসভায় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই তা করা সম্ভব। এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, জম্মু-কাশ্মীর সংবিধান গৃহীত হওয়ার এত বছর পরেও এই বৈষম্যমূলক আইনগুলি সংশোধন করা হয়নি কেন? এই অনীহার কারণ বুঝতে গেলে আমাদের গত কয়েক দশকে কাশ্মীরি স্বায়ত্তশাসনের ক্ষয়ের ইতিহাস বুঝতে হবে।

 

(ক্রমশ…)

 

লেখক পেশায় পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক।

ফিচার ছবির সূত্র: এ.এফ.পি।

Share this
Recent Comments
1
  • comments
    By: Dr. Sunil Kumar Baskey on August 5, 2019

    Bah. I do appreciate you for highlighting of Removing Article 35A. Thanks dear. Looking forward more and more…..

Leave a Comment