সাঁওতাল বিদ্রোহ ইতিহাসের চোখে


  • June 30, 2018
  • (0 Comments)
  • 1767 Views

সাঁওতাল গণসংগ্রামের কাহিনি তুলে ধরেছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে। বাংলা ভাষায় তাঁর আগে কেউ এই বিদ্রোহের ইতিহাস এত বিস্তারিত আলোচনা করেননি। আজ ৩০ জুন সাঁওতাল বিদ্রোহকে স্মরণ করে আমরা সেই ইতিহাসের এক ক্ষুদ্র নির্বাচিত অংশ এখানে প্রকাশ করলাম।

গ্রাউন্ডজিরো: ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী গ্রামের পর গ্রামে এক নয়া আন্দোলনের ঢেউ উঠেছে। শত শত গ্রামে তারা বিশালকায় পাথর খুদে লিখিত চেতাবনি দিয়েছে, গ্রামের উপর একমাত্র গ্রামসভারই সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। অ-আদিবাসী সকলেরই গ্রামে ঢোকা নিষিদ্ধ। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের কোনো আইন ও কর্তৃত্ব মানতে তারা নারাজ। তাদের দাবি, ‘আমরাই এ দেশের প্রকৃত নাগরিক। জল-জঙ্গল-জমি আমাদের। কেউ তা ছিনিয়ে নিতে পারবে না।’ পাথরে খোদা এই আদিবাসী অনুশাসন থেকেই এই আন্দোলনের নাম হয়েছে পাত্থলগড়ি। আন্দোলনকারীদের দাবি, ঝাড়খণ্ডের প্রায় ৩২ হাজার ৬২০টি গ্রামেই এই আন্দোলন ছড়িয়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে ছত্তিশগড়েও। আদিবাসী অঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে চলা রাষ্ট্রীয় ও কর্পোরেট লুঠ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে এ আরও এক সাঁওতাল-মুন্ডা বিদ্রোহ বলেই মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি ঝাড়খণ্ডে আদিবাসী সমাজকর্মী ধর্ষণের অভিযোগে পাত্থলগড়ি নেতৃত্বের উপর পুলিশি নির্যাতন নেমে এসেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি এই ধর্ষণ-কাণ্ডে তারা যুক্ত নয়।

স্বাধীনতা-প্রিয় আদিবাসীরা বহু বহু বার অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী প্রধান অঞ্চলগুলি প্রকৃতপক্ষেই এক একটি যুদ্ধক্ষেত্র। পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রমাণিত পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলের আদিবাসীরা শাসক দলের উপর খুশি নয়। এই প্রেক্ষিতেই আমাদের ফিরে পড়া দরকার সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিহাস। তিলকা মুর্মুর নেতৃত্বে ১৭৮৪ সালের ১৭ জানুয়ারি ভাগলপুর ও রাজমহলের কালেক্টর ক্লিভল্যান্ডকে হত্যা করে সাঁওতাল বিদ্রোহীরা। ১৭৮৫ সালে তিলকা মুর্মুর ফাঁসি হয়। সে বিদ্রোহ ফের মাথা চাড়া দেয় ১৮৫৫ সালে। ওই বছর ৩০ জুন ভগনাডিহি গ্রামে বিশাল জনসমাবেশে সিদো-কানহু’র নেতৃত্বে দশ হাজার সাঁওতাল স্বরাজ প্রতিষ্ঠার শপথ নেয়। শুরু হয় বিদ্রোহ এবং কলকাতা অভিমুখে প্রথম গণ-পদযাত্রা।

সাঁওতাল গণসংগ্রামের ইতিহাস-এ সেই কাহিনি তুলে ধরেছেন ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে। বাংলা ভাষায় তাঁর আগে কেউ এই বিদ্রোহের ইতিহাস এত বিস্তারিত আলোচনা করেননি। আজ ৩০ জুন সাঁওতাল বিদ্রোহকে স্মরণ করে আমরা সেই ইতিহাসের এক ক্ষুদ্র নির্বাচিত অংশ এখানে প্রকাশ করলাম।

সাঁওতাল গণসংগ্রামের ইতিহাস

ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে

“আদিবাসীরাই ভারতের প্রকৃত স্বদেশী বা প্রাচীন বা প্রাচীনতম আদিবাসী; তাদের কাছে আর সকলেই বিদেশী। এই প্রাচীন জাতিরই নৈতিক দাবি ও অধিকার হাজার হাজার বছরের পুরানো।” (সি. বি. মেমোরিয়া, ‘ট্রাইবাল ডেমোগ্রাফি ইন ইণ্ডিয়া’, পৃ. ১৪২)

বড় সত্যি কথা। পড়তে যেমন ভাল লাগে, শুনতেও তেমনি ভাল লাগে। কিন্তু ভারতের ইতিহাসে সেভাবে লেখা হয়নি। ভারতের ঐতিহাসিকরা তা করেন নি। ভারতীয় সভ্যতা ও ভারতের ইতিহাস আজ পর্যন্ত আদিবাসীদের এবং সেই সঙ্গে জনসাধারণের ইতিহাসকেও স্বীকৃতি দেয় নি। বড় দুঃখের কথা! আমরা জানি ইতিহাস — ইতিহাসই। ইতিহাসের ছোট বড় নেই, জাতি বিচার নেই। ইতিহাস সমাজের, দেশের ঘটনা ও কাহিনী। কিন্তু ভারতের ইতিহাসে অন্য রূপ দেখতে পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকরা লিখে গেছেন রাজরাজড়াদের, বড়লোকদের, বড় বড় কাহিনী। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত যে সব জাতি অনুন্নত জাতি বলে গণ্য হচ্ছে, তাদের কথা তাঁরা লিখলেন না। বরং একটু স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয়, যারা বনজঙ্গলের বাঘ-ভালুক তাড়িয়ে তৈরি করল দেশ, বন-জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে তৈরি করল জমি-জায়গা, চাষ-আবাদ করল, মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে বের করল সোনা-রূপা, তারা স্বীকৃতি তো পেলই না, বরং ইতিহাসে পরিচিত হল অসভ্য বর্বর জাতি বলে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা রেলপথ তৈরির কাজে যোগ দিল, তারা তার বিনিময়ে পেল অকথ্য অত্যাচার। বীরের মত যে জাতি দেশের জন্য প্রাণ দিল, বিদেশী শাসন লুপ্ত করার জন্য তীর-ধনুক, বল্লম, টাঙ্গি-তরোয়াল সম্বল করে কামান বন্দুকে সুসজ্জিত দুর্ধর্ষ ইংরাজ সৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করল, তাদের কথা লেখা হল ‘খণ্ড জাতির বিদ্রোহ’ কিংবা নিছক একটা স্থানীয় হাঙ্গামা বলে। দেশের প্রতি ভালবাসা তাদেরও যথেষ্ট এবং তারাও ভারতকে, এ দেশকে, সমানভাবে ভালবাসত, সেটা ঐতিহাসিকরা দেখেও দেখলেন না। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তারা স্থান পেল না, সুযোগ পেল না, সেটা চাপা পড়ল বৃটিশ শাসকগোষ্ঠীভুক্ত সাম্রাজ্যবাদী ঐতিহাসিকদের মনের সংকীর্ণতায়। আজকের সমাজে ব্যবস্থা যে পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িয়েছে, তা দেখে মনে হয়, তারাও সেদিন বুঝতে পেরেছিল আগামী দিনে কি হবে এবং তাই তারা চেয়েছিল শোষকশ্রেণীকে উৎখাত করতে। কিন্তু সেদিন কলকাতার সমস্ত সংবাদপত্র, ‘ফ্রেন্ড অব ইণ্ডিয়া’ থেকে ‘সংবাদ প্রভাকর’ পর্যন্ত সাঁওতালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বনের জন্য আন্দোলন আরম্ভ করেছিল। দুঃখের বিষয়, সাঁওতালদের সপক্ষে কথা বলবার কেউ ছিল না। এমন কি সমস্ত বিষয়টি নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণেরও কোন চেষ্টা হয় নাই। একটা নিরীহ জাতি, যারা রাজনীতির ধার ধারে না, তারা কেন বেপরোয়াভাবে জীবনের মায়া ছেড়ে মরিয়া হয়ে উঠেছিল, তা তদন্ত হল না। ভারতের ইতিহাসকে শোষণ ও শাসনব্যবস্থার প্রয়োজন অনুযায়ী সাজাতে হবে তো! তাই শোষণ ও শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম দেখা দিয়েছিল, তারা সেদিন তা আড়াল করে রাখবার চেষ্টা করেছিল। ঐতিহাসিকরা সেদিন শোষণ ও শাসনব্যবস্থার প্রয়োজনে আসল ইতিহাসকে গোপন রেখে মিথ্যা, শোষণ, উৎপীড়ন ও সংগ্রামের ইতিহাস রচনা করে গেছেন এবং ভারতীয় ঐতিহাসিকরাও গণসংগ্রামের ইতিহাসকে চাপা দিয়ে শাসকগোষ্ঠীর ইতিহাস রচনা করে গেছেন। যুগের পর যুগ আমরা সেই বিকৃত ইতিহাস পড়ে যাব? কিন্তু আর কতদিন? আদিবাসীদের সমস্যা আলোচনা করতে গিয়ে শ্রী বর্ধন লিখেছেন —

“বিদেশী শাসকদের বিরুদ্ধে সামগ্রিক সংগ্রামের একেবারে পয়লা সারিতে আদিবাসীরাও যে ছিল এবং উল্লেখযোগ্যভাবে সর্বাধিক আত্মত্যাগ তারাও যে করেছে এ কথা স্মরণ না করলে তাদের প্রতি প্রকৃত সুবিচার করা হয় না, এবং ভারতের ইতিহাস রচনায় তাদের ভূমিকার যথাযথ মূল্যায়নও করা হয় না। বুর্জোয়া ঐতিহাসিকরা হয় এ সত্য অস্বীকার করার চেষ্টা করেন অথবা মাঝে মাঝে উদারতার বশবর্তী হয়ে আদিবাসীদের এই সংগ্রামকে খুব বেশী হলেও স্থানীয় বিদ্রোহমাত্র বলে উল্লেখ করেন — অর্থাৎ তাঁদের ভাষায় এই সব ঘটনা ছিল আদিবাসীদের আদিম ক্রোধের বহি:প্রকাশ মাত্র, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের ওপর তার প্রভাব খুব একটা পড়েনি। বুর্জোয়ারা চেষ্টা করেছে স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাসকে কেবল বুর্জোয়াশ্রেণীর ভাবাদর্শগত প্রভাবেই পরিপুষ্ট এবং তাদেরই কর্মপদ্ধতি অনুযায়ী পরিচালিত একটি আন্দোলন মাত্র বলে চিত্রিত করতে। এই পটভূমিতেই আজ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে আদিবাসীদের অসংখ্য তীব্র সংগ্রামকে দাসত্ব ও শোষণের বিরুদ্ধে ভারতীয় জাতির সংগ্রামের সাধারণ উত্তারাধিরের অঙ্গ হিসাবে স্থান করে দেওয়ার।” (এ. বি. বর্ধন, ‘দি আনসলভড ট্রাইবাল প্রবলেম’, পৃ-৫)

ইতিহাস কিছু ভোলে না, ভুলতে পারে না। ১৮৫৫ খৃষ্টাব্দের সাঁওতাল বিদ্রোহের কথা। ভি. রাঘবাইয়া লিখেছেন —

“বিভিন্ন আদিম জাতির সংগ্রামের অঙ্গ হিসাবে নানা জটিলতার কিছুটা পূর্ব অভিজ্ঞতার পর বৃটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সরকারকে সম্ভবতঃ বৃহত্তম আদিবাসী অভ্যুত্থানের, ১৮৫৫ সাঁওতালজাতির বিদ্রোহের সম্মুখীন হতে হল। এর আগে অবধি বৃটিশরা জানত না আদিবাসীদের সঙ্গে সংঘাতের অর্থ কি, সুতরাং এবার বৃটিশদের এই সমস্যা মোকাবিলার জন্য খুব ভালভাবে তৈরি হতে হল। এজন্যই আমরা দেখতে পেলাম সাঁওতাল সঙ্গে প্রায় একই সময় এ দেশের আর একটি উপজাতি, মুণ্ডাদের সঙ্গে আচরণে বৃটিশরা আরো বেশী সতর্ক, আরো বেশী যত্নবান হয়েছে।” (ভি. রাঘবাইয়া, ‘ট্রাইবাল রিভোল্টস’, পৃ-১৩)

প্রচণ্ড বিক্ষোভে সেদিন সাঁওতাল চরিত্রের উগ্ররূপ সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে পড়েছিল। সমসাময়িক কবি কৃষ্ণদাস রায় ‘সাঁওতাল হাঙ্গামার ছড়া’ রচনা করে লিখেছিলেন —

“শুন ভাই বলি তাই সভাজনের কাছে।
শুভবাবুর হুকুম পেয়ে সাঁওতাল ঝুঁকেছে।।
বেটারা কুক ছাড়িল জড় হৈল হাজারে হাজারে।
কখন আসে কখন লুটে থাকা হৈল ভার।।…
হাজার দুই সাঁওতাল তারা রাজবাড়ী সান্ধ্যায়।
লুটি ঘর সব কলরব করিয়া বেড়ায়।।…
বার শ’ বাষট্টি সাল, বর্ষাকাল বানের বড় বৃদ্ধি।
আব্দারপুরের মানুষ কেটে করল গাদাগাদি।।”
(‘পূর্ববঙ্গ-গীতিকা’, ৩য় খণ্ড, ২য় সংখ্যা।)

আর সাঁওতালরা? চিৎকার করে বলে উঠেছিল —

“স্ত্রী-পুত্রের জন্য,
জমি-জায়গা বাস্তু-ভিটার জন্য,
হায়! হায়! এ মারামারি, এ কাটাকাটি
গো-মহিষ লাঙল ধন-সম্পত্তির জন্য,
পূর্বের মত আবার ফিরে পাবার জন্য
আমরা বিদ্রোহ করব।”

বৃটিশ শাসন ও শোষণ-উৎপীড়ণের কবল থেকে মুক্তি লাভ করার জন্য দলে দলে সাঁওতাল সেদিন আপসহীন স্বাধীনতা-সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। হ্যাঁ — বৃটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম। স্বাধীনতা লাভের জন্য আপসহীন সংগ্রাম ছাড়া কোন পরাধীন জাতির অন্য কোন অস্তিত্ব ও ক্রিয়াকলাপ থাকতে পারে না। এ সংগ্রামে পরাজয় ছিল, আপস ছিল না; সাঁওতালরা নির্ভয়ে মৃত্যুবরণ করেছিল, কিন্তু আত্মসমর্পণ করে নি। কারণ এ সংগ্রামের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠা। ইংরাজ ঐতিহাসিক ও শাসকবর্গও এ কথা স্বীকার করে লিখেছেন —

“সাঁওতাল-বিদ্রোহের পশ্চাতে ছিল জমির উপর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙখা এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সাঁওতালদের স্বাধীনতা স্পৃহা, যার ফলে তারা ধ্বনি তুলেছিল: তাদের নিজ দলপতির অধীন স্বাধীন রাজ্য চাই।” (বেঙ্গল ডিষ্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার ফর সাঁওতাল পরগনাস’, পৃ-৪৮)

ওল্ডহাম সাহেব লিখেছেন —

“পুলিশ ও মহাজনের অত্যাচারের স্মৃতি যাদের দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলেছিল, আন্দোলন তাদের সকলকেই আকৃষ্ট করল, কিন্তু যে মূল ভাবধারাকে কাজে পরিণত করার চেষ্টা চলছিল তা ছিল সাঁওতাল অঞ্চল ও সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠার চিন্তা।” (‘সানতাল রিবেলিয়ন’: প্রবন্ধ, পি. সি. যোশী)

সমসাময়িক সাঁওতাল গুরু কলিয়াম হাড়ামের শিষ্য জুগিয়া হাড়াম সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিবৃত্ত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন —

“খানগে সিদো আর কানহুকিন হুকুমকেৎআ, রাজ আর সাউ যতবোন গচ’ চাবাকোওয়া আর দসার দেকো দো গঙ্গা পারমতেবোন  লাগাকোওয়া, আবোনা:ক’ রাজগে হোয়া:ক’আ।” (‘হড়কোরেন মারে হাপড়ামকো রেয়াক:’ কাথা’, পৃ-২৪৩)

অর্থাৎ —

‘সিদো আর কানহু বলল, আমরা রাজামহাজনদের সবাইকে খতম করব, পরে হিন্দু ব্যবসায়ীদের গঙ্গার ওপারে তাড়িয়ে দিব, আমাদেরই রাজ্য হবে।’

ছটরায় দেশমাঁঝিও একই কথা বলে গেছেন। বিদ্রোহে তিনি যোগ দিয়েছিলেন ও পরে বিদ্রোহের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন —

“হুল এতহপ’ পাহিলরে দো সিদো কানহুকিন পাসনাওকেৎআ, কাডা নাহেল ৮ আনা আর ডাংরা নাহেল ৪ আনা বোন এমা, আর রাজ নওয়া কাথা বাকো দহয়তাবোন খান লাড়হাইবোন এহবা; বেবাক দেকোবোন মা:ক’ গচূ’কোওয়া আর আবোবোন রাজ:ক’আ।” (‘ছটরায় দেশমৌঞ্জহি রেয়া:ক’ কাথা’, পৃ-৭)

অর্থাৎ —

‘বিদ্রোহ আরম্ভ হবার পূর্বে সিদো কানহু জাহির করল, আমরা মহিষে টানা লাঙ্গল ৮ আনা ও বলদে টানা লাঙ্গল ৪ আনায় দিব আর সরকার আমাদের কথা না রাখলে আমরা যুদ্ধ আরম্ভ করব, দেকোদের খতম করব এবং আমরাই রাজা হব।’

অতি স্পষ্ট কথা। অরণ্যরাজ্যে সুখে শান্তিতে বসবাস করার জন্য তারা জমি করেছে, গ্রাম বসিয়েছে, শান্তির দেশ গড়ে তুলেছে। সেই শান্তি আজ নষ্ট হতে চলেছে। তাদের শ্রমের অংশ লুঠ করে নেবার জন্য কোম্পানির অনুগত জমিদার ও মহাজনী ব্যবসাদারের দল হাত বাড়িয়েছে — এ যে অসহ্য। তারা প্রতিবাদ জানাল, কিন্তু বৃটিশ শাসক তাদের কথায় কর্ণপাত করল না। দিনে দিনে অত্যাচার বেড়ে যেতে লাগল। আর সহ্য করতে পারে না নিরীহ অশিক্ষিত সাঁওতালরা। তাদের সহ্যের সীমা যখন অতিক্রম করল তখন তারা বহুদিনের জমানো বিক্ষোভে ফেটে পড়ল বিদ্রোহের তূর্য নিনাদে ১৮৫৫ সালে। হাজার হাজার সাঁওতালের কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এল —

“নুসাসাবোন, নওয়ারাবোন চেলে হুঁ বাকো তেঙ্গোন, / খাঁটি গেবোন হুলগেয়া হো, / খাঁটি গেবোন হুলগেয়া হো, / দিশম দিশম দেশমৌঞ্জহি পারগানা / নাতো নাতো মাপাঞ্জিকো / দ: বোন দানাং বোন বাং গেকো তেঙ্গোন / তবে গেবোন হুলগেয়া হো।”

অর্থাৎ—

‘আমরা বাঁঁচব, আমরা উঠব, কেউ আমাদের পাশে দাঁড়াবে না / আমরা সত্যিই বিদ্রোহ করব / আমরা সত্যিই বিদ্রোহ করব / দেশের মাঝি ও পারগানারা / গ্রামের মোড়লরা, / আমাদের সর্বপ্রকারে সাহায্য করবে, কেউ পাশে দাঁড়াবে না / তবে আমরা নিশ্চয় বিদ্রোহ করব।’

সাঁওতালরা বিদ্রোহ ঘোষণা করল আর এ বিদ্রোহ শুধু স্বাধীনতার জন্যই। বিদেশীর ইতিহাসে তারা বন্য অসভ্য ও বর্বর বলে পরিচিত হল — একমাত্র তাদের স্বাধীনতা-প্রিয়তার জন্য। পরবর্তীকালে ডব্লিউ জি আর্চার লিখেছেন —

“এটা এখন সকলেই স্বীকার করেন যে সাঁওতাল বিদ্রোহের একটা গভীরতর, অন্ততপক্ষে অতিরিক্ত কারণ হচ্ছে সাঁওতালদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, যখন তাদের মাথার উপর কোন উৎপীড়ক প্রভু চেপে বসেনি সেই প্রাচীন অতীত দিনের স্বপ্ন; হয়তো বা প্রাগৈতিহাসিক যুগের সেই স্মৃতি, যখন কোন কোন পণ্ডিতের মতে সাঁওতালরা নিজেরাই ছিল গাঙ্গেয় উপত্যকার একচ্ছত্র প্রভু এবং আর্য আক্রমণকারীদের দ্বারা তখনও সেখান থেকে তারা বিতাড়িত হয়নি। যাই হোক না কেন, কোন কোন সময় সাঁওতালদের মধ্যে ‘খেরওয়াড়ী’ নামে একটা আন্দোলন দেখা যায়। ‘খেরওয়াড়’ সাঁওতালদের প্রাচীন নাম এবং সাঁওতালদের মধ্যে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত হয়ে আছে সেই অতীত দিনের স্মৃতি, যখন তারা চাম্পা দেশে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বাস করত; কাউকে খাজনা বা কর দিতে হত না, শুধু সর্দারগণকে সামান্য কিছু বার্ষিক খাজনা দিলেই চলত।”

এর পরেও কি বলতে হবে যে, সাঁওতাল বিদ্রোহ সাম্রাজ্যবাদী শোষক ইংরাজের বিরুদ্ধে একটা সচেতন বিদ্রোহ নয়? ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় অধ্যায় নয়?

(সাঁওতাল গণসংগ্রামের ইতিহাস, ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে, পার্ল পাবলিশার্স, ১৯৭৬। বানান অপরিবর্তিত।)

Share this
Leave a Comment