হকার উচ্ছেদ : আইন, সামাজিক ন্যায়, ও জীবন-জীবিকার অধিকার


  • June 22, 2026
  • (0 Comments)
  • 62 Views

মানবিক বোধ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার কথা বাদ দিয়েও আইনের আইনের দৃষ্টিতে হকারি কোনও অবৈধ কাজ নয়। হকাররা উড়ে এসে জুড়ে বসেনি। আপনার যতোই উৎপাত মনে হোক না কেন দেশের আইন আপনাদের এই অধিকার দেয়নি যে ইচ্ছেমত তাদের উচ্ছেদ করা যাবে।

 

কৌশিক

Groundxero | June 22, 2026

 

হকাররা এক বড় সমস্যা। সরকারগুলো তাঁদের নিয়ে কী করবে বুঝতে পারে না। তাঁরা হলেন নাগরিক সমাজে উচ্চবিত্ত ও সরকারগুলোর চোখের বালি। সিপিএম, তৃণমূল প্রত্যেকটি সরকারের আমলেই তাঁরা জীবিকা ও জীবনের অধিকার খুইয়েছেন। চূড়ান্ত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের গর্ভে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন বারবার। কিন্তু এটাও খেয়াল রাখা দরকার শহরের সব জায়গা থেকেই তাঁদের উচ্ছেদ করা হয়নি। এবং যাঁরা বেলেঘাটা থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন দেখা যাবে কিছুদিন পর তাঁরাই হয়তো কালীঘাটে গিয়ে মাথা ঠেলে উঠেছেন। ঠিক যেভাবে কার্ণিশের ফাঁক দিয়ে বটগাছ ফুঁড়ে বেরোয়। সরকারগুলো এটা জানে, বোঝে। তাঁরা হাড়ে হাড়ে জানে এই ব্যবস্থায় সকলের সুষ্ঠু জীবন ও জীবিকার সংস্থান করার সাধ্য তাদের নেই। মোটের উপর বিক্ষিপ্ত ভাবে উচ্ছেদ চললেও হকাররা ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। হাজার বুলডোজারও শেষাবধি তাদের ‘নেই’ করে দিতে পারবে না।

 

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি জেতার পর যা হচ্ছে তা অভাবনীয় এবং অদৃষ্টপূর্ব। একটা সংগঠিত মতাদর্শ এবং অর্থনৈতিক কর্মসূচি রয়েছে এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায়। পূর্বতন সরকারগুলির সঙ্গে আজকের উচ্ছেদের ফারাক এখানেই। ইন্দিরা গান্ধীর আমলে দিল্লির তুর্কমান গেটেও বুলডোজার চলেছিল। হাজার হাজার বস্তিবাসী হারিয়েছিলেন তাঁদের ঘর। গরীবি হটাও স্লোগান পরিণত হয়েছিল গরীব হটাও পদক্ষেপে। মমতা বন্দোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর কলকাতাকে লন্ডন বানানোর খোয়াবে নানা জায়গায় উচ্ছেদের হাতুড়ি চালান। তবে সেই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া এমন সংগঠিত কার্যক্রমের অংশ ছিল না।

 

এক লপ্তে বেলঘরিয়া, দমদম, বালি, যাদবপুর, হাবড়া সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় হকার উচ্ছেদের সাক্ষী ছিল না ইতিহাস। এবং সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ, সরকারে এসেই এই কাজ হাতে নিয়েছে নব নির্বাচিত বিজেপি। পরিকল্পনা যে তৈরি ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাস্তবিক কাজের সঙ্গে সংগত করছে তাত্ত্বিক যুক্তি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন “মানুষ আমাদের ভোট দিয়েছে তাদের কাছে আমরা দায়বদ্ধ। তাদের মসৃণ ও অবারিত গতিবিধির নিশ্চয়তা প্রদান করতেই হবে। কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার থেকে জনতার কথা আমাদের ভাবা প্রয়োজন।” তাঁর বা তাঁদের সমর্থক বাহিনি পরিশীলিত কথার ধার ধারে না। উচ্ছেদের বিরোধী যে কোনও বক্তব্যের প্রেক্ষিতে তারা দুটো কথা বলছে। “যাদের এতো সমস্যা তারা নিজেদের বাড়ির দোরগোড়ায় হকারদের জায়গা দিন।” আর বলছে, “রাস্তা জুড়ে বসা বেআইনি হকারদের উচ্ছেদ করাকে আমরা সম্পূর্ণ সমর্থন করছি, রাস্তায় আমাদের চলাফেরা করার অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।” হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু যুক্তিপূর্ণ, মানবিক, রাজনৈতিক লেখা ফেসবুকে চোখে পড়েছে। ফলে আবার একটা লেখার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু হকার মানেই বে-আইনি – এই বিষয়টা নিয়ে লেখাজোখা চোখে পড়েনি। তাই ভাবা গেল একটু আইনি কচকচি করা যাক। বিশেষত ক্ষমতার পঙ্কিল ভাষ্যে যারা আকন্ঠ নিমগ্ন তাদের জন্যে তো বটেই।

 

২০১৪-তে লোকসভায় গৃহীত হয় হকার সংক্রান্ত আইন – THE STREET VENDORS (PROTECTION OF LIVELIHOOD AND REGULATION OF STREET VENDING) ACT, 2014। এই আইনে হকারদের জীবিকাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাদের অধিকার ও দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা আছে। অর্থাৎ ‘ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে’ – তাঁদের নিয়ে এই ছেলেখেলা আইনের চোখে বৈধ নয়। দেখা যাক এই আইন কী বলছে।

 

১) এই আইনের মাধ্যমে হকারদের ব্যবসা করার অধিকার স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে এবং তাঁদের নিয়ন্ত্রনের বিধিবদ্ধ নির্দেশাবলি এখানে নির্দিষ্ট করা হচ্ছে।

 

২) যে এলাকায় হকাররা ব্যবসা করবে সেখানে তাঁদের সংখ্যা সেই মিউনিসিপ্যাল/কর্পোরেশন ওয়ার্ডের মোট জনসংখ্যার ২.৫ শতাংশের অধিক না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। একটা টাটকা উদাহরণ দেওয়া যাক। পূর্ব-পশ্চিমে ত্রিকোন পার্ক থেকে বিজন সেতু, উত্তর-দক্ষিনে গড়িয়াহাট উড়ালপুলের দুই প্রান্ত অবধি এলাকায় ২০২২ সালের সার্ভেতে দেখা যাচ্ছে প্রায় ২৫০০ হকার ব্যবসা করছেন। হকার ইউনিয়ন-এর বক্তব্য, “২০১৫ সালে আমাদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৬৫।” মাত্র ৭ বছরে পাঁচ গুণ বৃদ্ধি! স্বাধীনতার অমৃতকালই বটে। এর লাগোয়া আছে ৬৮, ৬৯, ৭০ নম্বর ওয়ার্ড। তিনটি ওয়ার্ডের মিলিত জনসংখ্যা ২০১১-র জনগণনা অনুযায়ী প্রায় ৮০ হাজার। ২০২২ সালে এর আনুমানিক জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১.০২ লাখে। এর মধ্যে  ৫০% মানুষকে ধরে নেওয়া যেতে পারে গড়িয়াহাটের কাছাকাছি বসবাস করেন। সেক্ষেত্রে জনসংখ্যা দাঁড়ায় ৫০ হাজারের মতো। এর ২.৫ শতাংশ হল ১২৫০। আইনত এই সংখ্যক হকার-ই এই এলাকায় ফুটপাতে ব্যবসা করার অধিকারী।  খেয়াল রাখা প্রয়োজন ২০১৫ সালেও হকারদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৬৫। ১২৫০ বা ২৫০০ এটা মূল কথা নয়, আইনত একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ যে কোনও অঞ্চলে হকারি করতে পারেন। কিন্তু এই প্রশ্নের জবাব কে দেবে – মাত্র ৭ বছরে হকরদের সংখ্যা ৪৬৫ থেকে বেড়ে ২৫০০ হয়ে যায় কোন যাদুবলে? ভয়াবহ বেকারির দায়িত্ব কার, এটাই হল মৌলিক প্রশ্ন।

 

৩) হকারদের সংখ্যা, এলাকার সঠিক অঞ্চল, তাঁদের লাইসেন্স দেওয়ার এক্তিয়ার থাকবে টাউন ভেন্ডিং কমিটির (TVC) হাতে।

 

৪) TVC-র মাথায় থাকবে কমিশনার এবং সরকারি আধিকারিক সহ হকাররাও (মোট সদস্যের ন্যূনতম ৪০ শতাংশ হবে তাঁদের প্রতিনিধি)। তাছাড়া সেই এলাকায় কর্মরত কোনও NGO বা অন্য সংস্থাও স্থান পেতে পারে। অর্থাৎ TVC কেবল সরকারের আধিকারিকদের নিয়েই গঠিত হবে না। যাকে বলা যায় non state actor তাদেরও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 

৫) এই আইন পাশ হওয়ার পর TVC-র সার্ভের মাধ্যমে হকারদের নতুন লাইসেন্স প্রদান করা হবে।

 

৬) ফুটপাথের প্রস্থের ১/৩ অংশ হকারদের জন্য বরাদ্দ থাকবে।

 

৭) সার্ভে করে সেই এলাকায় তদানীন্তন ব্যবসাকারি সব হকারদের লাইসেন্স দেওয়া বাধ্যতামূলক। TVC তাদের ইচ্ছেমত হকারদের উচ্ছেদ বা স্থানান্তর করার অধিকারি নয়।

 

আরও বিবিধ ধারা উপধারা রয়েছে যার উল্লেখ প্রয়োজনীয় হলেও এই পরিসরে মানানসই নয়। তবে লক্ষ্যনীয় এই আইন খুব কঠোর নয় এর মধ্যে নমনীয়তার উপাদান রয়েছে। বেশ কিছু তাৎক্ষনিক ও স্থানীয় সিদ্ধান্তের দায়িত্ব দেওয়া আছে TVC-র উপর।

 

এই প্রসঙ্গে বলা দরকার  রাস্তা ও ফুটপাথ ডিজাইনের কাজ যাদের উপর ন্যস্ত, সেই Indian Road Congress ফুটপাথ ডিজাইন নিয়ে বলছে – The informal commercial activities are an integral part of the footpath environment in India. The pedestrian also need them as they cater to their day-to-day needs, but sometimes the extent of encroachment rises to a level that the footpath facility becomes inaccessible/ non-usable by the pedestrian. The informal sector has to be integrated in the overall design of the footpath facility by providing space for them to operate। বাংলায় বললে, দেশীয় বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই ফুটপাথ ডিজাইন করা জরুরি। গরীব দেশে প্রচুর মানুষ পেটের দায়ে হকারি করবেন এটাই বাস্তব। তাকে মান্যতা দিয়েই ফুটপাথের প্রস্থ নির্ণয় করা আবশ্যক।

 

এ বাদ দিয়ে যে কোনও আইনের ব্যাখ্যার জন্য আমরা দ্বারস্থ হই আদালতের নির্দেশের উপর। আইনের সর্বোচ্চ ব্যাখ্যা কর্তা হিসেবে তাদের স্থান এভারেস্টের চুড়ায়। এই বিষয়ে আদালতের ভূমিকাও দেখা জরুরি।

 

২০১৮ সালের জুন মাসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার কলকাতা হাইকোর্টে জানায় তাঁরা ইতিমধ্যে ২০১৪-র হকার আইন রাজ্যে নোটিফাই করেছে। নিষ্ঠুর পরিহাস, তার পরের মাসেই রাজ্য সরকার সল্টলেকের সেক্টর ফাইভে হকার উচ্ছেদ শুরু করে। তা নিয়ে মামলা হলে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ রায় দেয় – অবিলম্বে ২০১৪-র আইনকে তার মর্মার্থ অনুযায়ী রাজ্য সরকার (in true spirit) প্রয়োগ করতে বাধ্য। রায়ে এ কথাও বলা হয়, সার্ভে করার আগে কোনও হকারকে উচ্ছেদ করা যাবে না। হকারদের সংখ্যা অধিক হয়ে গেলে, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার পরেই উচ্ছেদ করা যাবে।

 

১৯৮৮-তে সোদন সিং বনাম দিল্লি কর্পোরেশান মামলায় সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে স্পষ্ট করে বলে রাস্তায় ব্যবসা করার অধিকার সংবিধানের ১৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী একটি মৌলিক অধিকার। বলা বাহুল্য গোটা রাস্তা জুড়ে হকারদের ব্যবসা করার অধিকার এর মধ্যে দিয়ে বৈধ হয়ে যায় না। আবারও ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট গোইন্দা রাম বনাম দিল্লি কর্পোরেশান মামলায় বলে – হকারি করা সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত। তাছাড়া পুনর্বাসন ব্যতিরেকে কাউকে উচ্ছেদ করা বেআইনি। এই মর্মে একটি নির্দিষ্ট, পরিকল্পিত আইন করা জরুরি।

 

মানবিক বোধ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার কথা বাদ দিয়েও এমনকি আইনতও বোঝা গেল হকারি কোনও অবৈধ কাজ নয়। হকাররা এসেছেন নোংরা বস্তি থেকে, এসেছেন শহরের প্রান্ত থেকে কিন্তু উড়ে এসে জুড়ে বসেনি। তাই আপনার যতোই উৎপাত মনে হোক না কেন, হকাররা নাচার। আর আমরাও নাচার, আপনাদের মন যুগিয়ে চলা আমাদের কাজ নয়। দেশের আইন আপনাদের এই অধিকার দেয়নি যে ইচ্ছেমত তাদের উচ্ছেদ করা যাবে। এই কাজ হল দেশবিরোধী কাজ। আর আপনি যদি এর পক্ষে ওকালতি করেন তাহলে আপনিও দেশবিরোধী তকমা পাবেন। অতএব ভেবে দেখুন।

 

আইনি কচকচির বাইরে এসে যে কোনও সামাজিক সমস্যার গভীর দিকগুলো বোঝা মননশীল মানুষের কর্তব্য। আইন আদতে কী? তা হল বিবিধ সামজিক সমস্যা নিরসনের সামান্য ও আংশিক প্রচেষ্টা। সমাজে কোনটা প্রতিষ্ঠিত হবে তা নির্ভর করে কোন সামাজিক বর্গ কতোটা সংগঠিত তার উপর। ধরা যাক কোনও এলাকায় হকাররা যঠেষ্ট সংগঠিত। সেখানে তাঁরা ইচ্ছেমত রাস্তা আটকে পথচারীদের প্রভূত অসুবিধা সৃষ্টি করেও ব্যবসা করতে পারেন। তার উপর সরকার যদি তাঁদের দিকে নানা কারণে হেলে থাকে তাহলে তো কথাই নেই। কিন্তু বৃহত্তর সামাজিক দৃষ্টির সাপেক্ষে হকারদের এই কাজ কি সামাজিক ন্যায়ের পরিপন্থী নয়? ফলে আইনি কাঠামোর অন্দরেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আর আইনও কোনও নিশ্চল বস্তু নয়, সামজিক সংঘাতের মধ্যে দিয়েই সে নতুন আকৃতি লাভ করে। বৃহত্তর সামাজিক ন্যায়, সাম্য, মানুষের জীবন ও জীবিকার অধিকার নিশ্চিত করার চিন্তা ও কাজই হওয়া উচিত লক্ষ্য।

 


লেখক গণতান্ত্রিক ও শ্রমিক আন্দোলন-এর কর্মী।

Share this
Leave a Comment