মোদি জমানার অর্থনৈতিক মডেলে ক্রোনি ক্যাপিটালিজম এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আইডিবিআই বিক্রি আরেকবার সেই সারসত্যকে প্রমাণ করল।
সুমন কল্যাণ মৌলিক
দেশের সম্পদ আইডিবিআই ব্যাঙ্ককে বিদেশি কোম্পানি ফেয়ারফ্যাক্সের হাতে তুলে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের পেছনে লুকিয়ে থাকা অসাড় যুক্তি ও দেশ লুঠের এই ধারাবাহিক ইতিহাসের কথা ইতিমধ্যে বহুল আলোচিত (বর্তমান নিবন্ধকারের আইডিবিআই বিক্রির সরল রেসিপি শীর্ষক লেখাটি আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন)। কিন্তু বিষয়টি আর নীতি ও পদ্ধতির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এই চুক্তির অস্বচ্ছতা, ফেয়ারফ্যাক্সের লাভ, আইডিবিআই ব্যাঙ্কের সম্পদের অবমূল্যায়ণ সংক্রান্ত তথ্য ইতিমধ্যে বিজনেস ওয়ার্ল্ড ও হিন্দু বিজনেস লাইনের প্রশংসনীয় অন্তর্তদন্ত মূলক প্রতিবেদনের কারণে জনসমক্ষে চলে এসেছে। লোকসভায় বিরোধী দলনেতার সোসাল মিডিয়ায় টুইট, প্রাক্তন অর্থসচিব ও সমাজকর্মী ই এ এস শর্মার খোলা চিঠি ও আইডিবিআই ব্যাঙ্ক কর্মীদের অনশন-আন্দোলন বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। মোদি জমানার বহু আর্থিক অস্বচ্ছতা মত এই চুক্তিতে ক্রোনি ক্যাপওটালিজমের ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে। সরকারি সম্পদকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার ইতিহাসে বার বার দেখা যায় সম্পদের অবমূল্যায়ণ, স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ। ফেয়ারফ্যাক্সের আইডিবিআই কেনার ক্ষেত্রেও গল্পটা আলাদা কিছু হচ্ছে না।
আলোচনার সুবিধার্থে আমরা এই অসঙ্গতিগুলিকে পর পর আলোচনা করব। আইডিবিআইকে বিক্রির বিষয়ে ব্যাঙ্কের সম্পদের প্রাথমিক মূল্যায়ণের দায়িত্বে ছিল সরকারি সংস্থা ‘ডিপার্টমেন্ট অফ ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড পাবলিক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট (ডাইপাম)। এদের দায়িত্ব ছিল সমস্ত দিক বিবেচনা করে শেয়ারের দাম ঠিক করা এবং এটাও নিশ্চিত করা যে প্রক্রিয়ার মধ্যে কোন স্বার্থের সংঘাত না থাকে। এই মূল্যায়ণ অনুযায়ী আইডিবিআই ব্যাঙ্কের বেস প্রাইস ঠিক হয় শেয়ার প্রতি ৯৪.৪২ টাকা। এই দামের উপর দাঁড়িয়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ডাইপাম দরপত্র আহ্বান করে। ফেয়ারফ্যাক্স এবং আরেকটি বিদেশি সংস্থা (মজার কথা হল এই দ্বিতীয় সংস্থাটির নাম জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে আজ পর্যন্ত প্রকাশ করা হয় নি) বেস প্রাইসের থেকে অনেক কম দাম দেয়। স্বাভাবিক ভাবে সেই দরপত্র কার্যকরী হয় নি। এখন এই পরিস্থিতিতে দুটো কোম্পানির দেওয়া দর যেহেতু বেস প্রাইসের থেকে অনেকটা কম, তাই সরকারের উচিত ছিল ভালো দাম পাওয়ার জন্য আবার নতুন দরপত্র আহ্বান করা এবং স্টেট ব্যাঙ্ক সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলোকেও আহ্বান জানানো। কিন্তু সরকার ঠিক তার উল্টোটা ঘটাল।তারা নতুন করে দরপত্র আহ্বান না করে ব্যাঙ্কের সম্পদের পুনর্মূল্যায়ণে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এক্ষেত্রে সরকার তার প্রেস নোটে RFP [para 53.6(iii)] এর উল্লেখ করেছে যাতে বলা হয়েছে ‘In the event the Financial Bid of the highest bidder is lower than the reserve price, the GoI will decide the further course of action and the QIPs shall not subsequently question any decision taken by the GoI in this regard”। এই নোটের ক্ষেত্রে প্রাক্তন অর্থসচিব সঠিকভাবে আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে এই নির্দেশনামা কখনো রাষ্ট্রের সম্পদকে কম দামে দেখানোর ছাড়পত্র হতে পারে না। বরং সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুসারে ভালো দাম পাওয়ার স্বার্থে সরকার বিডিং প্রক্রিয়া বাতিল বা স্থগিত করতে পারে ও সেই সিদ্ধান্ত “neither arbitrary nor unreasonable when guided by public interest and transparency”।
নতুন মূল্যায়ণের পর চিত্রনাট্য অনুসারে আইডিবিআই ব্যাঙ্কের শেয়ার প্রতি বেসপ্রাইস হল ৭৫.৯৯ টাকা, ফেয়ারফ্যাক্স শেয়ার প্রতি ৮১ টাকা দর দিয়ে সর্বোচ্চ বিডার হল (সেই দুজনের মধ্যে) এবং ব্যাঙ্কের মালিকানা হাতে পেল। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল আইডিবিআইয়ের সম্পদের মূল্যায়ণ কিভাবে হল! প্রশ্নটা জরুরি কারণ তেলেঙ্গানার হায়াদ্রাবাদের সবচেয়ে উন্নত এলাকায় আইডিবিআই ব্যাঙ্কের ৫০ একরের এক সম্পত্তি আছে। তেলেঙ্গানা রাজ্য সরকারের ভ্যালুয়েশন অনুযায়ী এক একরের দাম ২৬৯ কোটি টাকা। সেই হিসাবে আইডিবিআই ব্যাঙ্কের হায়দরাবাদের সম্পত্তির দাম ১৩,৪৫০ কোটি টাকা। ব্যাঙ্কের ভারতের এরকম বড় শহরগুলিতে ১২০ টা স্থাবর সম্পত্তি আছে। মুম্বাইতে ৬০, পুনেতে ২০, আমেদাবাদে ৭, কলকাতা ৬, দিল্লি ও ব্যাণ্গালোরে ৫। ওয়াকিবহাল মহলের মতে ফেয়ারফ্যাক্স যে দামে আইডিবিআই পেয়েছে তা আদতে ব্যাঙ্কের স্থাবর সম্পত্তির দামের চেয়ে কম। তথ্যের খাতিরে এটাও বলা দরকার যে বিক্রির সময় আইডিবিআই এর স্ট্যাটাস দেখানো হয়েছে প্রাইভেট ব্যাঙ্ক হিসাবে কিন্তু মূল্যায়ণের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যাঙ্কের তকমা দেওয়া হয়েছে। একই ভাবে বিক্রির সময় ব্যাঙ্কটি ছিল ভারতের অন্যতম লাভজনক সংস্থা, মূল্যাঙ্কনের সময় তা মাথায় রাখা হয় নি।
এবারের চাঞ্চল্যকর বিষয়টা হল ফেয়ারফ্যাক্স কার টাকাতে আইডিবিআই ব্যাঙ্ক কিনল! বিজনেস ওয়ার্ল্ডের রিপোর্ট বলা হয়েছে আইডিবিআই ব্যাঙ্কের টাকা দিয়েই ফেয়ারফ্যাক্স আইডিবিআই কিনছে। একেবারে মাছের তেলে মাছ ভাজার আদর্শ উদাহরণ। ১৫ অক্টোবর (২০২৬) ফেয়ারফ্যাক্সের কনফারেন্সে তাদের চেয়ারম্যান প্রেম ওয়াটসা এক প্রশ্নের উত্তরে খবরটি জানিয়েছেন। বোর্ড মিটিং এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গো ডিজিট জেনারেল ইন্সুরেন্স, গো ডিজিট লাইফ ইন্সুইরেন্স এবং আইআইএফএল ক্যাপিটেলে থাকা ফেয়ারফ্যাক্সের হোল্ডিংস কিনে নেবে আইডিবিআই ব্যাঙ্ক তার হাতে থাকা টাকা থেকে। এখন এই কোম্পানিগুলোর বাজার মূল্য ঠিক কত তা নিয়ে কোন স্বাধীন নিরপেক্ষ সংস্থা দিয়ে মূল্যায়ণ হয় নি। অথচ ঠিক হয়েছে এই চুক্তির জন্য আইডিবিআই ফেয়ারফ্যাক্সকে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (২৮,০০০ কোটি টাকা) দেবে। আর ফেয়ারফ্যাক্স আইডিবিআই ব্যাঙ্ক কিনছে ৫ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ ফেয়ারফ্যাক্সের ফান্ড থেকে যত টাকা আসছে তার ৫৪% আসলে আইডিবিআই এর টাকা। এখানে আরেকটি তথ্য মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। সেটা হল বীমা ব্যবসা করবে না বলে কিছুদিন আগে আইডিবিআই ফেডারেল লাইফ ইন্সুইরেন্সের সঙ্গে তার চুক্তি ভঙ্গ করে। বিজনেস ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদন এই চুক্তির বিষয়ে যে নতুন প্রশ্ন গুলো হাজির করে তা হল:
১) ফেয়ারফ্যাক্স কি কেন্দ্রীয় সরকারকে একথা জানিয়েছিল যে আইডিবিআই এর পুঁজি দিয়ে ফেয়ারফ্যাক্সের সংস্থা কেনা হবে?
২) শেয়ার পিছু ৮১ টাকা চূড়ান্ত দাম হিসাবে মেনে নেওয়ার সময় সরকার বা মূল্যাঙ্কণ সংস্থা এই তথ্যটি জানত?
৩) এই ডিলের ক্ষেত্রে আইডিবিআই কি নগদ টাকা দেবে না কি শেয়ার ইসু করবে?
৪) এক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নির্দেশিকা কি?
৫) গো ডিজিট লাইফের কোনও বাজার মূল্য না থাকা সত্বেও এই কোম্পানির শেয়ারের দাম কে এবং কিভাবে ঠিক করল?
৬) আগামীদিনে এই হস্তান্তর যখন হবে তখন বৃহত্তম মাইনরিটি শেয়ার হোল্ডার হিসাবে ভারত সরকার ও এলআইসির কি কোন ভোটাধিকার থাকবে?।
এই প্রশ্নগুলোর কোন উত্তর এখনো পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকার দেয় নি।
আইডিবিআই বিক্রির ক্ষেত্রে যে চুক্তি প্রক্রিয়া চলেছে তার অস্বচ্ছতার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বিষয় হল স্বার্থের সংঘাত (conflict of Interest)। প্রথমত ডাইপামকে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার বিলগ্নীকরণের জন্য যে সংস্থা পেশাদারি পরামর্শ দেয় তার নাম কেপিএমজি। এরা যথারীতি আইডিবিআই ব্যাঙ্কের মূল্যাঙ্কণের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে। এখন এই সংস্থাটি যৌথভাবে হিসাবপত্র ও অন্যান্য মূল্যাঙ্কনে যে সংস্থার সঙ্গে কাজ করে তার নাম আইআইএফএল। এই সংস্থার বেশিরভাগ ইকুইটির মালিক ফেয়ারফ্যাক্স, যারা ২০০০ কোটি টাকা দিয়ে আইআইএফএলের মালিকানা কিনেছে। এটা পরিষ্কার স্বার্থের সংঘাত। দ্বিতীয়ত প্রাক্তন আমলা অমিতাভ কান্ত ছিলেন ভারত সরকারের সেই প্যানেলের সদস্য যারা আইডিবিআই বিক্রির সুপারিশ করেছিল।আবার তিনি ঐ অবস্থাতেই ফেয়ারফ্যাক্সের ডিরেক্টর হিসাবে যোগ দেন যারা আদতে ব্যাঙ্কটি কেনে। এটাও স্বার্থ সংঘাতের আরেকটি উদাহরণ।
আজকাল কর্পোরেট অর্থনীতি সংক্রান্ত যে কোন আলোচনায় ক্রোনি ক্যাপিটালিজম কথাটি বহু আলোচিত। সাধারণ ভাবপ এর অর্থ “an economic system characterized by close, mutually advantageous relationships between business leaders and government officials” (ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ও পারস্পরিক সুবিধাজনক সম্পর্কের বৈশিষ্ট্যযুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা)। এককথায় বলা যায় যে তত্ত্বগত ভাবে মুক্তবাজার অর্থনীতি এমন এক ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে বিদ্যমান নিয়ম নীতির মাধ্যমে সমস্ত আর্থিক প্রক্রিয়াটি সংঘটিত হবে, রাষ্ট্র সেখানে কোন পক্ষ নেবে না। কিন্তু ক্রোনি ক্যাপিটালিজমে রাষ্ট্র পরিচালক মন্ডলী (সরকার) কোনও একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পক্ষ নিয়ে তাদের ব্যবসার পথ মসৃণ করবে। অন্যভাবে বলতে গেলে সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বানিজ্যিক সাফল্য বহুলাংশে রাষ্ট্রের বদান্যতা বা সক্রিয় সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল। মোদি জমানার অর্থনৈতিক মডেলে ক্রোনি ক্যাপিটালিজম এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আইডিবিআই বিক্রি আরেকবার সেই সারসত্যকে প্রমাণ করল।
লেখক গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের কর্মী।
পড়ুনঃ আইডিবিআই ব্যাঙ্ক: দেশের সম্পদ বিক্রির সরল রেসিপি

