আইডিবিআই ব্যাঙ্ক: দেশের সম্পদ বিক্রির সরল রেসিপি


  • October 24, 2026
  • (0 Comments)
  • 2832 Views

দেশের মানুষের করের টাকা দিয়ে তৈরি রাষ্ট্রীয় সম্পদ জলের দরে কর্পোরেট মালিকদের বিক্রির সরকারি নীতির ধারাবাহিকতায় এবার বিক্রি হতে চলছে ইনডাসট্রিয়াল ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (আইডিবিআই ব্যাঙ্ক)।

 

সুমন কল্যাণ মৌলিক

 

দেশের মানুষের করের টাকা দিয়ে তৈরি রাষ্ট্রীয় সম্পদ জলের দরে কর্পোরেট মালিকদের বিক্রির সরকারি নীতির ধারাবাহিকতায় এবার বিক্রি হতে চলছে ইনডাসট্রিয়াল ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (আইডিবিআই ব্যাঙ্ক)। ১৪ অক্টোবর (২০২৬) কেন্দ্রীয় সরকার আইডিবিআই ব্যাঙ্কের ৬০.৭২% শেয়ার কানাডার ফেয়ারফ্যাক্স ফিনানসিয়াল হোল্ডিংসকে বিক্রির নীতিগত সম্মতি দিয়েছে এবং আশা করা হচ্ছে মাস ছয়েকের মধ্যে বিক্রিবাটার দলিল চূড়ান্ত হয়ে যাবে। নব্বই এর দশকে বিশ্বব্যাঙ্ক, আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার, এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাঙ্ক প্রভৃতি আন্তর্জাতিক আর্থিক এজেন্সিগুলির পৌরহিত্যে যে নয়া সংস্কার অর্থনীতিতে চালু হয় তার প্রধান স্তম্ভ ছিল ভারতের বিপুল সম্পদ দেশি বিদেশি কর্পোরেট মালিকদের হাতে তুলে দেওয়া। উপুর্যুপরি সরকার এই কাজে দায়বদ্ধ থেকেছে কিন্তু পরিসংখ্যানের বিচারে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার এতে সবিশেষ পারদর্শিতা দেখিয়েছে। বছর দুয়েক আগে কেন্দ্রীয় বাজেটে সরকার পরিষ্কার জানিয়ে দেয় যে সমস্ত ক্ষেত্রেই বেসরকারিকরণ হবে এবং সরকার আর কোন সম্পদই নিজের হাতে রাখবে না। খনিজ সম্পদ, স্টিল, টেলিকমুনিকেশন, আকাশ পরিবহন, বিভিন্ন শিল্প কর্পোরেশন ইতিমধ্যে প্রায় ৯০% বিক্রি হয়ে গেছে। এবার নজর পরেছে সামরিক শিল্প, মহাকাশ ও ওষুধ শিল্পের দিকে। আর্থিক ক্ষেত্রে বিমা শিল্পের গল্প প্রায় শেষ, এবার স্বাভাবিক ভাবে কর্পোরেট হাঙরদের পাখির চোখ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক এবং ডাকঘর। আগামী দিনে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদের বিলগ্নীকরণ ও পরবর্তীতে বেসরকারিকরণ এক বড় ক্ষেত্র হতে চলেছে ব্যাঙ্কিং শিল্প। সেই প্রেক্ষাপটে আইডিবিআই ব্যাঙ্ক বিক্রির ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

আলোচনার সুবিধার্থে প্রথমে বিক্রিবাটার চুক্তিপত্রটা বুঝে নেওয়া যেতে পারে।বিক্রির আগে ছবিটা ছিল এরকম: আইডিবিআই এর শেয়ারের ৪৯.২৪% ছিল জীবন বিমা নিগমের হাতে এবং ৪৫.৪৮% ছিল ভারত সরকারের। ৫.২৮% ছিল অন্যান্য শেয়ার হোল্ডারদের হাতে। বিক্রির পরে গল্পটা দাঁড়াবে : ফেয়ারফ্যাক্সের হাতে ৬০.৭২ (প্রকৃত অর্থে মালিকানা), এলআইসির হাতে ১৯%, ভারত সরকার ১৫% এবং অন্যান্য যথারীতি ৫.২৮%। দরপত্রের হিসাবটা হল একটা শেয়ারের মূল্য ৮১ টাকা (বেঞ্চমার্ক ছিল ৭৫.৯৯ টাকা), বিক্রি বাবদ আয় ৫২,৮৭৮ কোটি টাকা (৫.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।

 

ক্যাবিনেট কমিটি অন ইকনমিক অ্যাফেয়ার্স যে নীতিগত সম্মতি জানাল তা যে পদ্ধতিতে হল তাও একটু বুঝে নেওয়া দরকার। ভারতের প্রাইভেট ব্যাঙ্কগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি নিয়মে আছে। কারা কিনবে, তাদের আর্থিক ক্ষমতা কেমন, শেয়ারহোল্ডারদের ভোটদানের ক্ষমতা কিরকম — সমস্ত বিষয়টা থাকে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার হাতে। নিয়ম হল প্রাইভেট সেক্টর ব্যাঙ্কে স্বয়ংক্রিয় ভাবে (automatic route) প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের মাত্রা হল ৪৯% এবং ৭৪% পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে হলে ভারত সরকারের অনুমতি বাধ্যতামূলক। সরকারি ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ হতে পারে সর্বোচ্চ ২০%, তাও কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে। আইডিবিআই আগে সরকারি ব্যাঙ্ক হিসাবে থাকলেও ২০১৯ সালে এলআইসির অধিগ্রহণের কারণে তা প্রাইভেট ব্যাঙ্কের তকমা পায়। তাই আইডিবিআই বিক্রির কাঠামোটা সাজানো হয়েছে প্রাইভেট সেক্টরের ব্যাঙ্ক হিসাবে। তবে যেহেতু এই বিনিয়োগ ৭৪% এর সিলিং এর মধ্যে পড়ে তাই অবশ্যই বিক্রির দলিলকে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার শর্তাবলী মেনে হতে হবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে একটা প্রশ্ন জরুরি ভাবে উঠছে। তা হল ফেয়ারফ্যাক্সের আরেকটা বড় অঙ্কের মালিকানা রয়েছে ক্যাথলিক সিরিয়ান ব্যাঙ্কে (সিএসবি)। তাহলে তারা আরেকটা ব্যাঙ্কের মালিকানা কিভাবে নেবে! অনেকে মনে করছেন ফেয়ারফ্যাক্স ভবিষ্যতে আইডিবিআই ও সিএসবির মধ্যে মার্জার ঘটাবে।

 

ভারতে বেসরকারিকরণের ধামাকা শুরু হওয়ার পর্বে সরকার দেশের সম্পদ কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলোর কাছে বিক্রি করার কারণ হিসাবে প্রধান যে যুক্তিটা খাঁড়া করত তা হল সংস্থাটি রুগ্ন, সেই প্রতিষ্ঠানকে চালানোর অর্থ হল করদাতাদের টাকায় হাতি পোষা ইত্যাদি। যদিও ইতিহাস সাক্ষী যে বিগত তিন দশকে বিক্রি বা বিলগ্নীকরণ, যাই হোক না, কর্পোরেটটা কিনেছে মূলত লাভজনক সংস্থা। এই মুহূর্তে আইডিবিআই দেশের অন্যতম লাভজনক ব্যাঙ্ক, যাকে প্রায় জলের দামে বিক্রি করা হচ্ছে। আইডিবিআই ব্যাঙ্কের ২০২০-২১ আর্থিক বর্ষে নেট লাভের পরিমাণ ছিল ১৩৫৯ কোটি টাকা যা ২০২৫-২৬ সালে হয়েছে ৯,৫১৩ কোটি টাকা। গত ছয় বছরে এদের লাভ ৩০,১০৬ কোটি টাকা। গত অর্থবর্ষে শুধুমাত্র সুদ থেকে ২৮,৯৯৭ কোটি টাকা আয় করছে ব্যাঙ্ক। বর্তমানে সারা দেশে আইডিবিআইয়ের ২১০০ শাখা এবং ৩০০০ এটিএম রয়েছে। সংস্থার ব্যালেন্স শিটে রয়েছে ৪ লক্ষ ১১ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা। বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ ৭৯৮ কোটি টাকার ব্যবসা করছে আইডিবিআই। ব্যাঙ্কটির নেট অ্যাডভান্সের পরিমাণ ২ লক্ষ ৫৩ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা, পাশাপাশি ২০.৬৪ শতাংশ হারে বাড়ছে মুনাফা। ফলে কর্মীপ্রতি লাভের নিরিখে প্রথম স্থানে আছে আইডিবিআই, সেটা কম-বেশি ৪৬ লাখ টাকা। তাই কর্পোরেটরা কোন রুগ্ন ব্যাঙ্ককে কিনছে না, তারা বিনিয়োগ করছে এক চূড়ান্ত লাভজনক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে।

 

একথা সকলের জানা যে ১৯৬৯ সালে ইন্দিরা গান্ধী যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী তখন ১৪ টি প্রধান প্রাইভেট ব্যাঙ্ককে জাতীয়করণ করা হয়, ১৯৮০ সালে হয় আরো ৬ টি। ঘোষিত লক্ষ্য ছিল গ্রাহকের স্বার্থরক্ষা, পরিচালন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং ব্যাঙ্কের সম্পদকে কৃষি, ক্ষুদ্র ও বৃহৎ শিল্প, কর্মসংস্থান ও বৃহত্তর সামাজিক দায়বদ্ধতা পূরণে ব্যবহার। ১৯৬৪ সালে আইডিবিআই এক ডেভলপমেন্ট ফিনানসিয়াল ইনস্টিটিউশন হিসাবে তার যাত্রা শুরু করে। প্রথমে এই ব্যাঙ্কের পরিচালন ভার ছিল রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হাতপ, পরে ১৯৭৬ সালে এর মালিকানা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে হস্তান্তরিত হয়। ২০০৪ সালে এই ব্যাঙ্ক কমার্শিয়াল ব্যাঙ্কের তকমা পায়। একথা ঠিক যে এক সময় আর্থিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আইডিবিআই। এর প্রথম কারণ ২০০৬ সালে অতি রুগ্ন ইউনাইটেড ওয়েস্টার্ন ব্যাঙ্কের সঙ্গে এর সংযুক্তিকরণ। তার আগে বহু শিল্প প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়ে তা ফেরত না পাওয়ার কারণে ব্যাঙ্কের অনুৎপাদক সম্পত্তির পরিমাণ হু হু করে বাড়তে থাকে। ২০১৮ সালে আইডিবিআই এর অনুৎপাদক সম্পত্তির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩১.৭৮%। এই নন পারফর্মিং অ্যাসেটের পরিমাণ বৃদ্ধির মূল কারণ ছিল চারটি সংস্থা। সেগুলো হল কিংফিশার এয়ারলাইন্স, এবিজি শিপইয়ার্ড, উইনসাম ডায়মন্ডস এবং ভিডিয়োকন গ্রুপ। ২০১২ সালের মধ্যে এদের যথাক্রমে ৮৬০.৯২ কোটি, ৩৬৩৯ কোটি, ১১৪.৭৯ কোটি, ৯৯০৩ কোটি ঋণ দেয় ব্যাঙ্ক। এরা টাকা তো শোধ দেয় না বরং দিল্লির বর্তমান সরকার ঘনিষ্ঠ এই গ্রুপগুলোর অনেকে দেশ ছেড়ে পালায় বা সরকারের উদ্যোগে এই ঋণ খেলাপীদের বেশিরভাগ ঋণ মকুব হয়। পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে এলআইসি ব্যাঙ্কের ৫১ শতাংশ স্টক ১২,০০০ কোটি টাকায় কিনে নেয়। কেন্দ্রীয় সরকারও এক বড় অঙ্কের শেয়ার কেনে। সব মিলিয়ে করদাতাদের টাকায় চলা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ২৫,০০০ কোটি টাকা পেয়ে আইডিবিআই তার সংকটকে সামলে নেয় এবং লাভের মুখ দেখে। এখানেই আজকের বিক্রির ছকটা আমাদের বোঝা দরকার। যখন ব্যাঙ্কটি বিপন্ন ছিল তখন জনগনের টাকায় রাষ্ট্রীয় সংস্থা দ্বারা ব্যাঙ্কটিকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে আনা হল। অথচ যখন আইডিবিআই লাভের মুখ দেখল তখন তাকে জলের দামে কর্পোরেট সংস্থার হাতে বিক্রি করা হল। এই ছক আমরা আগেও দেখেছি। এই বিষয়টাকে আর্থিক বিশেষজ্ঞরা ব্যাঙ্গ করে বলেন: “nationalisation of losses and privatisation of profit”।

 

ভারতে ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণের প্রশ্নে সরকার যে সব যুক্তি দেয় তা আরেকবার আমাদের তথ্য-প্রমাণের আলোকে বিচার করা দরকার। কারণ আগামীদিনে বিষয়টা শুধু আইডিবিআই ব্যাঙ্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রথম যুক্তিটি হল দক্ষতা, আধুনিক প্রযুক্তি ও স্বচ্ছ পরিচালন ব্যবস্থা। মজার কথা হল এর কোনটার সঙ্গে বেসরকারিকরণের বিষয়টা যুক্ত নয়, বেসরকারি হোক বা সরকারি, একজন গ্রাহককে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ পেশাদারি পরিষেবা দেবে, এটাই নিয়ম হওয়া উচিত। আর পরিচালন দক্ষতা ও দুর্নীতির প্রশ্নটিও সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিচার করা উচিত। ভারতে যারা প্রাইভেট ব্যাঙ্কের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গলা ফাটান, তাদের মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে ৫০০০ কোটি টাকা ডিএইচএফ এল কেলেঙ্কারির জন্য রানা কাপুরের ইয়েস ব্যাঙ্ক ধ্বংস হয়ে যায় (বিস্তারিত বিবরণের জন্য গ্রাউন্ডজিরোতে প্রকাশিত বর্তমান নিবন্ধকারের প্রতিবেদনটি পড়া যেতে পারে )। একদা প্রাইভেট ব্যাঙ্কিং এর ম্যাগনেট বলে পরিচিত আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কের সিইও চন্দা কোচর ভিডিওকন কোম্পানিকে অসাধু উপায়ে ৩০০ কোটি টাকা ঋণ ও সে বাবদ ৬৪ কোটি টাকা উৎকোচ নেওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। সম্প্রতি নৈতিক কারণ দেখিয়ে ভারতের সর্ববৃহৎ প্রাইভেট ব্যাঙ্ক এইচডিএফসির চেয়ারম্যান অতনু চক্রবর্তীর পদত্যাগ আরো বৃহত্তর দুর্নীতির দিকে ইঙ্গিত করে। গত তিন-চার বছরে বন্ধন ব্যাঙ্ক,ইন্দাসল্যান্ড ব্যাঙ্ক, অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক,কোটাক মহিন্দ্রা ব্যাঙ্ক আর্থিক অস্বচ্ছতা ও দুর্বল পরিচালন ব্যবস্থার কারণে সংবাদ শিরোনামে এসেছেন। বিষয়টা শুধু ভারতেই ঘটছে না। ১৩ অক্টোবর (২০২৬) ব্যাঙ্ক অব আমেরিকাকে ৭৫০ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছে ইউনাইটেড স্টেটস অফিস অফ দি কমপ্রোট্রোলার অফ দা কারেন্সি। ব্যাঙ্কের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা সেদেশের ব্যাঙ্ক সিক্রেসি অ্যাক্ট ও তৎসংক্রান্ত আইন ভেঙেছেন। এই উদাহরণগুলো দেওয়ার অর্থ এটা নয় যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক দুর্নীতি মুক্ত,বলার কথা হল সরকারি বা প্রাইভেট নির্বিশেষে আজ জনগণের স্বার্থে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন।

 

আরেকটি বহু আলোচিত কথা আরেকবার মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। সরকারি ব্যাঙ্কের হাল-হকিকতের মূল্যায়ণ শুধু মাত্র ব্যাঙ্কের লাভের খতিয়ান দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয় কারণ রাষ্ট্রের সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পগুলির মেরুদণ্ড হল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক। পুরানো কথা বাদ দিয়ে আমরা যদি আর্থিক উদারীকরণের জমানায় চোখ রাখি, তাহলেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখব। ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে নরেন্দ্র মোদি সরকারের ফ্ল্যাগশিপ প্রজেক্ট ‘প্রধানমন্ত্রী জনধন যোজনা’ চালু হয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রকল্প শুরুর দিনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে ১ কোটি ৫০ লক্ষ ‘জিরো ব্যালেন্স’ বা ‘মিনিমাম ডিপোজিট’ অ্যাকাউন্ট খোলা হয় যা এক বিশ্বরেকর্ড। ২০১৭ সালের রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হিসাব অনুসারে ৩ কোটি ৭ লক্ষ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ও ২ কোটি ৩১ লক্ষ ‘Rupay Card’ বিতরণ করা হয়েছে। সরকার নিয়ম করেছিল প্রাইভেট ব্যাঙ্কগুলোও এই ধরণের অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবে। ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারির হিসেব অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো এই ধরনের অ্যাকাউন্ট খুলেছে ৪০ কোটি ৪৮ লক্ষ, অন্যদিকে প্রাইভেট ব্যাঙ্ক খুলেছে মাত্র  ১ কোটি ২৭ লক্ষ। নিম্ন আয়ের এই মানুষদের সামান্য আয়কে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় যুক্ত করার (financial inclusion) কাজ একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের দ্বারাই করা সম্ভব। ২০১৩ সালের ১ জুলাই সরকারি ভর্তুকি, ভাতা উপভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য ডাইরেক্ট বেনিফিসিয়ারি ট্রান্সফার (ডিবিটি) চালু হয়। জীবন জ্যোতি বীমা, কৃষকনিধি সম্মান, অটল পেনশন যোজনা, শস্য লোন সহ প্রায় ৪৫০ টি সরকারি প্রকল্প চলে এই পদ্ধতিতে। গত ১২ বছরে ৯০ কোটি মানুষের কাছে ৮.২২ লক্ষ কোটি টাকা এই ডিবিটির সাহায্যে অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো। এই পরিষেবার মূল্য কিভাবে নির্ধারিত হবে!

 

আইডিবিআই কিন্তু নিছক ব্যাঙ্কিং ব্যবসার সাধারণ ইতিহাস নয়। স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতে ধীরে ধীরে যে শিল্প কাঠামো গড়ে উঠেছিল তার জন্য প্রয়োজন ছিল শিল্পঋণ। স্টিল, সিমেন্ট, ইঞ্জিনিয়ারিং সহ সমস্ত বুনিয়াদি শিল্পে দীর্ঘ মেয়াদি বড়ো অঙ্কের ঋণ দিতে এই ব্যাঙ্কের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আজকে যে ‘আত্মনির্ভর ভারত’ এর শ্লোগান শোনা যাচ্ছে তা হাস্যকর হয়ে যায় যখন আমরা দেখি সরকারের আর্থিক সাহায্যপ ঘুরে দাঁড়ানো এক ব্যাঙ্ককে কর্পোরেট মুনাফার পথ সুগম করতে বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। ২০০৪ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী (বিজেপি নেতা যশোবন্ত সিং) সংসদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন আইডিবিআই এর রাষ্ট্রায়ত্ত চরিত্র বজায় রাখতে ব্যাঙ্কের ৫১ শতাংশ শেয়ার সরকারের হাতে থাকবে।আজ সেসব প্রতিশ্রুতি যথারীতি গঙ্গার জলে ভেসে গেছে।

 

২০১৪ সালে যখন নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন এনডিএ ক্ষমতাসীন হয় তখন দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সংখ্যা ছিল ২৭। ২০১৭ সালে ৫ টা অ্যাসোসিয়েটেড ব্যাঙ্ক ও ভারতীয় মহিলা ব্যাঙ্কের স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে সংযুক্তি হওয়ার ফলে সংখ্যাটা হয় ২১। ২০১৮ সালে ব্যাঙ্ক অব বরোদার সঙ্গে দুটো ব্যাঙ্ক সংযুক্তির ফলে কমে ১৯। ২০২০ সালে আরেকদফা সংযুক্তির ফলে ১০ টা ব্যাঙ্ক কমে হয় ৪ ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সংখ্যা ১৩। আর আইডিবিআই যেহেতু ২০১৯ সালেই সরকারি ব্যাঙ্কের তকমা হারিয়েছে তাই ভারতে এই মুহূর্তে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সংখ্যা মাত্র ১২ টি। কেউ জানে না পরের টার্গেট কে! রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশের আর্থিক মেরুদণ্ড, সামাজিক দায়বদ্ধতা মেটানোর ইঞ্জিন। গ্রাম ভারতে তার অজস্র শাখা ও প্রতিনিধি এক আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি করেছে যাকে কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়ার অর্থ বিপর্যয়কে ডেকে আনে। আইডিবিআই এর বিক্রি নিয়ে প্রতিবাদে সরব হওয়া তাই আজকের সময়ের দাবি।

 


লেখক গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের কর্মী। 

 

 

 

Share this
Leave a Comment