“উঠিয়ে দিলে কোথায় যাব, কী খাব?” — পুজোর আগে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে শ্রমজীবী মহিলা হকারদের রোজনামচা


  • September 23, 2026
  • (3 Comments)
  • 338 Views

দুশ্চিন্তায় রাত কাটাচ্ছেন হকারেরা। শোনা যাচ্ছে, পুজোর পরেই উচ্ছেদ শুরু হবে।  কেউ বলছেন আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনের আগেই হবে উচ্ছেদ। সেই অনিশ্চয়তাই যেন শোনা গেল যাদবপুর স্টেশনের এক মহিলা হকারের সঙ্গে কথোপকথনে।

 

উজান ভূঁইয়া

 

গত ৭ জুন রেল স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে উত্তাল হয় দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর। তারপরে কেটে গেছে তিন মাস। সকলেই নিজ নিজ জীবনের ছন্দে ফিরেছেন। সংবাদমাধ্যমের কেন্দ্রবিন্দুর আলোর বাইরে যেন চলে গেছেন এখন হকাররা। যদিও অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা এবং হকার, বস্তিবাসীরা একযোগে লড়ে যাচ্ছেন উচ্ছেদ বিরোধী  আইনি ও রাস্তার লড়াই। কিন্তু হদিস মেলে না কোনো বিরোধী নেতাদের। এখনও দুশ্চিন্তায় রাত কাটাচ্ছেন হকারেরা। শোনা যাচ্ছে, পুজোর পরেই উচ্ছেদ শুরু হবে।  কেউ বলছেন আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনের আগেই হবে উচ্ছেদ।

 

সেই অনিশ্চয়তাই যেন শোনা গেল যাদবপুর স্টেশনের এক মহিলা হকারের সঙ্গে কথোপকথনে।

 

আনুমানিক ষাটের কাছাকাছি বয়সের একাদশী মণ্ডলের জীবনের লড়াই আজকের নয়। বাড়ি দক্ষিণ ২৪ পরগণার মগরাহাটে। বাম আমল থেকেই যাদবপুরে হকারি করে আসছেন তিনি। একসময় স্টেশন লাগোয়া বড় ব্রিজের নিচে বসতেন। তার ভাইপো স্টেশনের উপর হকারি করতেন। পরে ভাইপোর কথাতেই বর্তমান জায়গায় এসে বসতে শুরু করেন। কিন্তু এই জায়গাটুকুও কখনও নিশ্চিন্ত ছিল না। তাঁকেও একাধিকবার সরে যেতে বলা হয়েছে। এমনকি তৎকালীন সরকারের এক মন্ত্রীও ওঁকে জায়গাটি ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। প্রতিবারই তাঁর অসহায় প্রশ্ন ছিল, “বাবা, এখান থেকে উঠিয়ে দিলে কোথায় যাব?”

 

সেই প্রশ্নের উত্তর আজও তিনি পাননি।

 

এই জায়গাটুকু আঁকড়ে ধরেই একাদশী তার মেয়েকে বড় করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে তাঁর পরিবার বলতে এক দিদি। তিনি মানসিক প্রতিবন্ধী। একসময় একটি হকার কার্ডও পেয়েছিলেন, কিন্তু পরে সেটিও হারিয়ে যায়। নিজের নামে কোনও বাড়ি নেই। মা-বাবার বাড়িতেই কোনওরকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই। সেখানে ভাইপোর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলে সেই আশ্রয়টুকুও আর থাকবে না বলে আশঙ্কার একাদশীর। তখন তিনি আর তাঁর প্রতিবন্ধী দিদি —দু’জন মানুষের সামনে থাকবে কেবল অনিশ্চিত দিন।

 

দু’বেলা খাবারের নিশ্চয়তাটুকুও তাঁদের নেই। প্রতিদিন সকালে সামান্য চা-শিঙাড়া খেয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন। তারপর মগরাহাট থেকে যাদবপুরে এসে সকাল সাড়ে ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত লেবু বিক্রি করেন। বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় রাত ১১টা। সারাদিনের এই পরিশ্রমের পরও যদি লেবু বিক্রি না হয়, তাহলে শুধু একটি দিনের রোজগারই হারায় না — সেদিন একাদশী এবং তাঁর দিদির রাতের খাবারটুকুও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

 

বাড়িতে দিদি তাঁর কর্মরত বোনের অপেক্ষায় থাকেন। একাদশী  না ফিরলে তিনি মূলত অভুক্তই থাকেন। আর একাদশীর নিজের ভয়—তিনি যদি একদিন অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাহলে দুই বোনের সংসার চলবে কীভাবে?

 

কিছুদিন আগে পর্যন্তও প্রতিদিন প্রায় এক হাজার টাকার লেবু আনতেন। রাজ্যে নতুন সরকার আসার কিছুদিনের মধ্যেই উচ্ছেদের নোটিশ আসায় লোকসানের ঝুঁকি কমাতে অল্প পরিমাণ লেবু আনেন। এখন প্রায় ৬০০ টাকার লেবু এনে দু’দিনে বিক্রি হয় মাত্র ৫০০ টাকার মতো। বলছিলেন, “বাজার খারাপ, বিক্রি কম। বিক্রি কমলে কেউ সহজে ধারও দিতে চায় না। অথচ মাথার উপর রয়েছে দেনার বোঝা। দু’বেলা ঠিকমতো খাবার জোটানোই কঠিন, দেনা শুধব কীভাবে?” ক্রমশ বাড়তে থাকা ঋণ শোধ করার চিন্তা তাড়া করে ফেরে একাদশীকে।

 

যাদবপুর স্টেশনে আরেকটু এগিয়ে গেলে রয়েছে একটি প্রসাধনীর দোকান। সঙ্গীতা রায় এখানে তেইশ বছর ধরে আছেন। পুরো পরিবার হকারি করেই টিঁকে আছে। পরিবারে রয়েছে এক ছেলে। দোকান উঠে গেলে গোটা সংসার চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। তাঁর বাচ্চা স্কুলে পড়ে। দোকান উঠিয়ে দিলে ছোট্ট মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে। একবার পুলিশ নোটিশ দিয়ে গেছে। প্রথমে বুঝে উঠতে সময় লেগেছিল ব্যাপারটা। তারপর যখন আশেপাশের দোকান ভেঙে দিল, তারপর থেকে রাতের পর রাত ঘুমের সমস্যা শুরু হয়েছে, ভয়ে-আশঙ্কায়।

 

একই কাহিনী শোনালেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্টেশনের পাশে চায়ের দোকান দেওয়া বয়স্ক দিদি। প্রথমে যখন উচ্ছেদের খবর আসে, তখন তাঁরা ভেবেছিলেন স্টেশনের অন্যদিকে উচ্ছেদ হবে, এদিকে তাদের চিন্তা নেই, বিধায়িকা নিজে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কিছু হবে না বলে; বরং ঝামেলা (মিটিং-মিছিল) করলে সমস্যা হতে পারে। তার কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, এবং পরবর্তীতে আদালতের স্থগিতাদেশের পরও সন্ধ্যাবাজারে নোটিশ দেওয়ার পর এখন তিনিও আশঙ্কায় রয়েছেন। বার্ধক্যজনিত কারণে হাত কাঁপার চিকিৎসার খরচ মেটাতেই যথেষ্ট সমস্যায় পেতে হয়​। এখন উপরন্তু পুজোর বা পৌরসভা নির্বাচনের পরেই উচ্ছেদ হওয়ার আশঙ্কার বাড়তি বোঝা চেপেছে।

 

একাদশীদের জীবনকাহিনীতে তাই হকারি শুধু একটি পেশা নয়। এই ছোট্ট পসরটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের সন্তানদের বড় হয়ে ওঠা, মেয়ের বিয়ে, দিদির খাবার, নিজেদের চিকিৎসা, মাথার উপর সামান্য আশ্রয় এবং প্রতিদিন বেঁচে থাকার লড়াই। সেই পসারটুকুও যদি উঠে যায়, তাদের কাছে হারানোর মতো আর কী-ই বা থাকবে?

 

একাদশীর বক্তব্য, “ছাত্ররা এসে সেদিন (৭ই জুন) বুলডোজার আটকানোয় শেষ সম্বলটুকু রক্ষা পেল।” কিন্তু সেই স্বস্তিও স্থায়ী হয়নি। আদালতের স্থগিতাদেশের পরেও রাজ্য জুড়ে হাবড়া, কৃষ্ণনগর, পার্ক সার্কাস, সোনারপুর সহ একাধিক জায়গায় উচ্ছেদ অভিযান চলেছে। রাজ্যের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কর্পোরেটরাজের পথ মসৃণ করতে এগিয়ে চলা দাম্ভিক বুলডোজাররাজ বার্তা দিচ্ছে গরীবের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের। পাশাপাশি বর্তমান শাসকদলের নেতাদের দৈনন্দিন স্ব-বিরোধী বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতি উচ্ছেদের আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে।

 

তাই তাঁদের  প্রশ্নটি কেবল একজন হকারের প্রশ্ন নয়। “যাও বা করে খাচ্ছিলাম, তাও যদি তুলে দেয়, তাহলে কোথায় যাব, কী খাব?” এই প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে বহু বছরের শ্রম, একা হাতে সংসার টেনে নিয়ে যাওয়ার ইতিহাস এবং আগামীকালটুকু নিয়েও অনিশ্চিত শ্রমজীবী নারীদের জীবনের ভয় ও লড়াইয়ের আখ্যান।

 


উজান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউজি ছাত্রী। এই প্রতিবেদনটি গ্রাউন্ডজিরো (Groundxero)-র ইন্টার্ন হিসেবে তাঁর কাজের অংশ।


 

Share this
Recent Comments
3
  • comments
    By: Dr. Barnali Ray Basu on September 23, 2026

    খুব হৃদয় বিদারক প্রতিবেদন। স্বাধীনতার আশি বছর পরেও স্বাধীন দেশের প্রান্তিক মানুষদের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে তো সেই প্রশ্ন আবার করতে হয় – *স্বাধীনতা তুমি কার*? * স্বাধীনতা তুমি কিসের জন্য?*

  • comments
    By: Dr. Brnli Ray Basu on September 23, 2026

    খুব হৃদয় বিদারক। স্বাধীনতার 80 বছর পরেও যদি স্বাধীন দেশের প্রান্তিক মানুষদের এই অবস্থা হয় তাহলে তো জিজ্ঞেস করতেই হয় – “স্বাধীনতা তুমি কার?
    স্বাধীনতা তুমি কিসের জন্য? “

  • comments
    By: Mangal Hansda on September 25, 2026

    Thanks

Leave a Comment