কথা বলার মধ্যে দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়, ছুটি না পাওয়া, ন্যূনতম বেতন না পাওয়া, মাইনে না বাড়া – এই সবক’টি ন্যায্য প্রাপ্য না পাওয়ার সঙ্গেই আরো যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি এই গৃহশ্রমিক নারীদের আহত করে, তা হল, মর্যাদাহীন ও অসম্মানজনক কাজের পরিবেশ।
সুদর্শনা চক্রবর্তীর প্রতিবেদন
“আমাদের যেন একটু সম্মান দিয়ে কথা বলে। ঐ যে বলে না, কাজের মাসি, কাজের মাসিটা এগুলো ভালো লাগে না শুনতে। আমরাও তো কাজ করি, আমাদের কাজের সেই সম্মানটুকু অন্তত যেন দেয়।”
“আমরা তো গরীব, ওরা চায় যেন আমরা সেরকমই থাকি। একদিন যদি একটু ভালো শাড়ি পরে যাই, এমনভাবে তাকায় না, কী বলব! বলবে, ‘বাবা, তোমাকে তো দেখে মনেই হয় না, তোমরা বস্তিতে থাকো!’ মানে আমাদের যেন ভালো জামাকাপড় পরতে নেই। মাইনে বাড়াতে বললেও কবে কোন ভালো পোশাক পরেছিলাম, তাই টেনে এনে বলবে।”
“একবার আমার নাতির জন্য একটা পাত্রে খাবার দিয়েছিল, নিয়ে গিয়ে দেখি পাত্রটার নীচে ছাতা পড়ে গেছে, এত পুরনো। খাবারটা ফেলে দিয়ে পরের দিন যখন বললাম বাসি খাবার দিয়েছেন, কিছুতেই স্বীকার করল না, বলল এক-দু’দিনের পুরনো। আমরা কি বাড়িতে এক দিনের বাসি খাই না? খাবার তো আমরাও নষ্ট করি না। তাই বলে কেউ কাওকে এরকম এত পুরনো খাবার দিতে পারে কী করে! আমরা কি মানুষ নই?”
উপরের কথাগুলি কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের গৃহশ্রমিক মহিলাদের। সদ্য এক পড়ন্ত দুপুরে একত্রিত হওয়া গেছিল এমন বেশ কয়েক জন গৃহশ্রমিক নারীদের সঙ্গে এবং আলোচনায় উঠে এসেছিল শ্রমিকের মর্যাদা, ন্যায্য দাবি নিয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অধিকার আন্দোলন এবং প্রতিদিন কাজের জায়গায় যে বৈষম্য, অসম্মান ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় তার নানা কথা। ব্যতিক্রম অবশ্যই রয়েছেন। যোগ্য সম্মান দিয়ে সুস্থ কাজের পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া নিয়োগকারীও রয়েছেন। তবে ব্যতিক্রমই বোধহয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় গৃহশ্রমিক মহিলাদের জন্য পরিস্থিতি কতটা প্রতিকূল।
‘শ্রমিক’ শব্দটার সঙ্গে যে অধিকার আর মর্যাদার প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে, আদৌ কি তা কাজের জায়গায়, নিয়োগকারীদের বাড়িতে পান তাঁরা? এই প্রশ্নের উত্তরে ১২ বছর কাজ করা কল্যাণী সিং যেমন স্পষ্টই বললেন, “একেবারেই আমাদের শ্রমিক বলে মনে করে না। তাহলে আমাদের এরকম হুটহাট ছাঁটাই করে দিতে পারত না। আমাদের যে কাজ বলে যতটাকা মাইনে বলে কাজে নেয়, কাজ শুরু করে দেখি, তারচেয়ে বেশি কাজ করাচ্ছে একই টাকায়। মাইনে বাড়ানোর কথা বললেই কাজ ছাড়িয়ে দেয়। হয়তো কাজের জায়গা থেকে আমরা একে, অন্যকে ভালোভাবে চিনি-জানি, কিন্তু শ্রমিক বলে আমাদের মানেই না।”
এই বিষয়টিকেই আরো একটু স্পষ্টভাবে বললেন ৩০-৩৫ বছর গৃহশ্রমিকের কাজ করা শান্তি মন্ডল। নিজের কাজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েই বললেন, “বাড়ির সবাউ হয়তো কাজে বেরিয়ে যায়, সারাদিন বাড়ির সবকিছু আমরাই সামলাই, বাড়ির যাবতীয় কাজ, সেইসঙ্গে ফোন ধরা, দরজা খোলা, বাচ্চা স্কুল থেকে ফিরলে কী খাবে, অফিস যাওয়া আর অফিস থেকে ফিরে কে কী খাবে সব আমরা জানি, করি। অথচ একটু সামান্য ভুল হলেই এমন বাজেভাবে বলে আমাদের খুব খারাপ লাগে। তাছাড়া ছুটির কথা বললেই, কিছুতেই ছুটি দেবে না। আগে থেকে বললেও নানা অশান্তি, নানা কথা। আমরা একদিন না থাকলে স্কুল-অফিস-বাড়ি সব জায়গাতেই অসুবিধা হয় তো! তাহলে আমাদের সুবিধা-অসুবিধাটা একটুও বুঝবে না? শরীর খারাপ কি বলে-কয়ে হবে? সব জায়গায় চারটে ছুটি, ১২টা আরো ছুটি, আর আমরা ছুটি চাইলেই হয় কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেবে নয়তো খারাপ কথা বলবে। শ্রমিকের মর্যাদা থাকলে আমাদের ফিক্সড ছুটি থাকত, শ্রমিকের মর্যাদা থাকলে আমাদের হুট করে ছাড়িয়ে দিতে পারত না।”
শান্তি বারেবারেই এমন একটি কোনো মধ্যস্থতাকারী ব্যবস্থার কথা বলার চেষ্টা করছিলেন যেখানে নিয়োগকারী ও কাজে যোগ দেওয়া গৃহশ্রমিক উভয় পক্ষের স্বার্থই রক্ষা পায়, গৃহশ্রমিকদের ন্যায্য ছুটি ও ন্যূনতম মজুরির দাবি স্বীকৃতি পায় ও দুই তরফের কোনো ধরনের অভিযোগ থাকলেও তা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকে।
প্রায় ১৫ বছর ধরে কাজ করা কালি হাজরার কাছে শ্রমিকের মর্যাদা মানে, “আমরা একটা সম্মান পেতে চাই। নামের দিক থেকেও একটা সম্মান পেতে চাই। আমাদের কাজের একটা নাম দেওয়া হোক। নাম ধরে সম্মানের সঙ্গে ডাকা হোক।”
গৃহশ্রমিক আন্দোলনে দীর্ঘদিনের দাবিগুলির মধ্যে অন্যতম কয়েকটি দাবি হল – নিয়োগকারী ও গৃহশ্রমিকদের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট চুক্তিপত্র থাকা, নির্দিষ্ট সময়সীমা ও নির্দিষ্ট কাজের জন্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা, আলাদা আলাদা কাজের জন্য আলাদা মজুরি ধার্য করা, মাসে নির্দিষ্ট ছুটি থাকা।
এখনো অধিকাংশ বাড়িতেই তাঁদের শৌচাগার ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না, বিশেষত বহুতলের ফ্ল্যাটগুলিতে। সেখানে বহুতলের নীচে সাধারণ যে একটি শৌচাগার থাকে সেটিই ব্যবহার করতে বলা হয়। “সেগুলো বেশিরভাগ সময় এত নোংরা থাকে যে আমরা যাই না, ইনফেকশন হয়ে যাবে আমাদের।” “সেগুলো ব্যবহার করতে গেলেও আমাদের অনেক সময় অনেকে নানা কথা বলে,” – জানালেন তাঁরা। সেইজন্য তাঁদের দাবি, বহুতলগুলিতে গৃহশ্রমিকদের জন্য একটি আলাদা নির্দিষ্ট শৌচাগারের ব্যবস্থা রাখা। এই প্রসঙ্গেই জানা গেল ঋতুকালীন সময়ে বা মাসিকের দিনগুলিতেও ছুটি বা তুলনামূলকভাবে কম কাজের সুযোগ থাকে না। এমনকি প্রয়োজনে স্যানিটারি ন্যাপকিন দিয়েও সাহায্য করা হয় না অধিকাংশ বাড়িতে। অথচ কর্মক্ষেত্রে ঋতুকালীন ছুটি নিয়ে সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেট-এ মহিলাদের শক্তিশালী স্বর শোনা যাচ্ছে। সম্প্রতি আদালতের এই সংক্রান্ত অবর্জাভেশন নিয়েও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অথচ বাড়ির সহায়িকা নারীর প্রতি মাসিকের সময়ে বৈষম্য করা, অসংবেদনশীল আচরণ করা থেমে থাকে না। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে নারী আন্দোলনের ভেতরকার এই দ্বিচারীতার বিষয়েও কথা বলা জরুরি হয়ে দাঁড়ায় বই কি!
বৈষম্য কী আর এক রকম থাকে! “বাসনের তফাতটা আমাদের সঙ্গে খুব করা হয়। ওনারা যে থালা-প্লেট-কাপ-গ্লাস ব্যবহার করেন আমাদের তাতে দেন না। নীচে বা বাজে জায়গায় আলাদা করে রেখে দেয়, ওখান থেকে নিয়ে আমরা ধুয়ে খাই,” বললেন শান্তি। শ্রমিক শ্রেণীর অন্য মানুষদের সঙ্গে বৈষম্য করাও চোখ এড়ায় না তাঁদের। একজন যেমন বললেন, “আমাদের সামনেই এসি সারাতে বা বাড়ির কোনো কাজ করতে কেউ এলেন, জল চাইলে একটা নোংরা বোতলে জল দেয় অনেক বাড়িতে। ঐ দেখে আমাদেরও আর জল খাওয়ার প্রবৃত্তি হয় না।”
বহুতলগুলিতে লিফট ব্যবহারের উপরেও থাকে নানা নিষেধাজ্ঞা। কোনো জায়গায় গৃহশ্রমিক ও অন্যান্য কাজের সূত্রে আসা মানুষদের জন্য আলাদা লিফট থাকে এবং সেখানে বসবাসকারী বা তাঁদের অতিথিদের জন্য আলাদা লিফট থাকে। আবার কোথাও একটিই লিফট থাকলেও, ওঠার সময় লিফট ব্যবহার করতে দিলেও নির্দেশ দেওয়া থাকে নামার সময় সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে নামার। তাছাড়া কাজে ঢোকা-বেরোনোর সময় আবাসনের নিরাপত্তারক্ষী ব্যাগ চেক করেন, কোথাও মহিলা কর্মী থাকলেও, বেশিরভাগ জায়গাতেই থাকেন পুরুষ নিরাপত্তারক্ষী। সেটা যেমন একদিকে অস্বস্তিকর, তেমনি প্রতিদিন এই ব্যাগ চেক করানোর মধ্যে দিয়ে যে এক ধরনের সামাজিক সম্মানহানির ঘটনা ঘটে তাও আঘাত করে তাঁদের।
কলকাতা সংলগ্ন জেলাগুলি থেকে বহু গৃহশ্রমিক রাত থাকতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন প্রথম ট্রেন ধরবেন বলে। আবার কলকাতারও যাঁরা বিভিন্ন জায়গায় কাজে যান চা ও জলখাবার বা দুপুরের খাবার নিয়ে প্রায়শই নানা অপ্রীতিকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। “বিশেষ করে বর্ষাকালে বা শীতকালে সত্যি মনে হয় একটু চা খেয়ে কাজে হাত দিলে ভালো হয়। কিন্তু সেটাও অনেক সময় হয় না। দেড়-দু’ঘন্টা বাদে এক কাপ চা নিয়ে বসলেও এসে ঠিক জিজ্ঞেস করে, ‘ঐ কাজটা হয়েছে?’ মানে বসাটা ঠিক পছন্দ নয়। খেতেও বেশিরভাগ জায়গায় দেয় না। আমাদের সব সময় টাকা থাকে না যে, আমরা খাবার কিনে খাব। নিজেদের বাড়ির সব কাজ সেরে বেরোতে বেরোতে আমরা অনেকেই নিজেদের খাবারটুকু আর বানিয়ে নিয়েও যেতে পারি না,” বলছিলেন শান্তি।
খাবার দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাসি, এমনকি পচে যাওয়া খাবার দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। তাঁরা জানালেন, এক-দু’দিনের বাসি নিজেদের বাড়িতেও খাওয়া হয়, ফেলে দেওয়া হয় না, কিন্তু দশ-বারো দিনের বাসি খাবার দিয়েছে এমন ঘটনাও তাঁদের সঙ্গে ঘটেছে। এমনকি শুকিয়ে যাওয়া বাসি, পচা খিচুড়ি দেওয়ায় তা ফেলে দেওয়ার পর অপমান করার মতো উদাহরণও রয়েছে।
আলোচনার সময় তাঁরা বারেবারেই বলছিলেন এমন বৈষম্য বা অপমানজনক ব্যবহার সব নিয়োগকারী করেন না। ভালোভাবে চা-খাবার দেওয়া, বাসি খাবার না দেওয়া, নিয়োগকারী ও সেখানকার ছোটরা সম্মান দিয়ে কথা বলা, শৌচাগার ব্যবহার করতে দেওয়া ইত্যাদি কিছু বাড়িতে নিশ্চিতভাবেই দেওয়া হয়। তবে এ তো তাঁদের ন্যায্য প্রাপ্য, কাজের জায়গার সুস্থ পরিবেশের অধিকার। যা স্বাভাবিক তাই যখন ব্যতিক্রম হয়ে ওঠে তখন বাস্তব পরিস্থিতি কতটা নেতিবাচক তাই স্পষ্ট হয়ে যায়।
ছুটি করলে মাইনে কেটে নেওয়া থেকে, মাইনে না বাড়ানো – এই সংক্রান্ত সমস্যা সবচেয়ে বেশি লেগে থাকে। রূপালি নস্কর দীর্ঘদিন একটিই বাড়িতে কাজ করেন, বাকি সবকিছু ঠিক থাকলেও ছুটি নিলে টাকা কেটে নেওয়ার সমস্যা ছিল, “তারপর একদিন খুব ঝগড়া করলাম, যে আমি এত বছর তোমাদের বাড়িতে কাজ করছি, বাড়ির সবকিছু সামলাই, তাও এইভাবে টাকা কেটে নাও! এরকম করলে আর কাজে আসব না। তখন থেকে টাকা কাটা বন্ধ করেছে।”
পাপিয়া গুপ্তা ২২ বছর গৃহশ্রমিকের কাজ করছেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বললেন সবচেয়ে বেশি দেখা যায় পুজোর একমাস আগে কাজে রাখা আর পুজোর এক মাস আগে কোনো অজুহাতে কাজ থেকে বের করে দেওয়া, দু’ক্ষেত্রেই বোনাস দিতে হয় না। “আমি এক জায়গায় ৫-৭ বছর কাজ করতাম। সেখানে প্রায় বছর দুয়েক মাইনে বাড়ায়নি। বাড়িতে আমার অসুস্থ মেয়ে। শেষে একদিন মাইনে বাড়াতে বলায় আমার মেয়েকে নিয়েও উল্টোপাল্টা কথা বলেছে এমনকি। আমিই কাজ ছেড়ে দিয়েছি তারপর,” পাপিয়া জানালেন।
১৪ বছর ধরে এই পেশায় রয়েছেন মামনি সর্দার। মাইনে কেটে নিলে বেতনের সামান্য টাকায় সংসার চালানো কতটা কঠিন হয়ে পড়ে তাই বলছিলেন। তিনি বললেন, “আমাদের তো এইটুকু টাকা রোজগার, তার থেকেও কেটে নিলে আমরা কী করে চালাব? সঞ্চয় তো কিছু করতেই পারি না। ধরুন ছেলেমেয়েদের শরীর খারাপের জন্য ছুটি করলাম, টাকা তো কেটে নেয়ই, একবার জিজ্ঞেসও করে না, বাড়িতে সব ঠিক আছে কি না। আজকাল দিদি ইংলিশের উপর সব। বাচ্চাদের ইংরাজি মিডিয়াম স্কুলে দিলে তারও তো খরচ আছে। মাইনে কাটলে, বছরে একবার একটু মাইনে না বাড়ালে আমাদের কী করে চলে! সব কিছর দাম তো চারপাশে বেড়েই চলেছে।”
প্রতিমা সরকার, ৩৫ বছর এই পেশায় আছেন, নিজের অভিজ্ঞতায় জানালেন, একবার বিশেষ প্রয়োজনে কাজের জায়গায় টাকা ধার চাওয়ায় পুজোর দু’মাস আগেই বোনাস ধরিয়ে দিয়েছিল। তিনি পুজোর সময় কতটা অসুবিধায় পড়তে পারেন তা না ভেবেই।
কমলা সরকার, নিজের ১০ বছরের কাজের কথা বলতে গিয়ে বললেন, “আমরা তো রোজগার করছি নিজেরা একটূ ভালো থাকব বলেই। নিজে খেটে যে টাকা পাচ্ছি, তাই দিয়ে কেনা একটা ভালো শাড়ি পরে গেলেই বলবে, তোদের দেখে তো মনে হয় না বস্তিতে থাকিস। মাইনে বাড়াতে বললেই এসব কথা টেনে আনবে। ওরা চায় আমরা ছেঁড়াখোড়া শাড়ি-জামাকাপড় পরেই কাজে যাই।”
কথা বলার মধ্যে দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়, ছুটি না পাওয়া, ন্যূনতম বেতন না পাওয়া, মাইনে না বাড়া – এই সবক’টি ন্যায্য প্রাপ্য না পাওয়ার সঙ্গেই আরো যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি এই গৃহশ্রমিক নারীদের আহত করে, তা হল, মর্যাদাহীন ও অসম্মানজনক কাজের পরিবেশ। যেভাবে তাঁদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক শ্রেণী অবস্থানের কারণে তাঁদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়, যেভাবে মানবিক, সংবেদনশীল ব্যবহার করা হয় না, যেভাবে কাজে সামান্য ভুলচুকেই কথা শোনানো হয়, তাতে যে মানসিক আঘাত তাঁরা পান, তা গভীর ক্ষত তৈরি করে ভেতরে, যা নিয়ে কথা হয় না।
প্রতিমা বলছিলেন, “চোখে জল চলে আসে মাঝেমাঝে। আমরা জানি ওরা বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে আমাদের নিয়ে অনেক সমালোচনা করে, খারাপ কথাও বলে, এগুলো খুব কষ্ট দেয়।”
যে টাকা উপার্জন করেন তা ‘খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের খরচ মেটাতেই চলে যায়। সেইসঙ্গে অসুখ-বিসুখ, সন্তানের লেখাপড়া, জরুরি দরকার তো থাকেই। ফলে সঞ্চয় করা হয়ে ওঠে না কিছুই। আলোচনায় উপস্থিত একজন বললেন, “সঞ্চয় বলতে শুধু লক্ষ্মীর ভান্ডার, তাও ওই টাকাটা সরাসরি ব্যাঙ্কে যায় বলে জমাতে পারি।”
সমস্যা আরো গভীরেও থাকে, যৌন হেনস্থার ঘটনাও শুনতে পাওয়া যায় বহু ক্ষেত্রে। তবে কাজ হারানোর ভয়ে অনেকে পরিস্থিতির চাপে যেমন মুখ বুজে মেনে নিতে বাধ্য হন, অনেকে কাজ ছেড়ে দিলেও এই বিষয়টা সামনে আনেন না, কারণ বদনামের ভয়, সামাজিক সম্মানহানির দুশ্চিন্তা। ফলে আবারও কেউ এই একই সমস্যায় পড়তে পারেন। তবে শান্তি যেমন বললেন, “এখন অবশ্য দশ জনের মধ্যে ন’জনই এরকম ঘটনা ঘটলে কথা বলবে। কারণ আমাদের নিজেদের সংগঠনের জোর আছে। গায়ে হাত দেওয়া, খারাপ ইঙ্গিত বা চুরির বদনাম যাই হোক না কেন, সবাই মিলে প্রতিবাদ করা যায়, থানাতেও জানানো যায়।” তাঁদের অন্যতম দাবি কাজে যোগদানের সময় যেমন অনেক জায়গায় সহায়িকাদের পরিচয়পত্র জমা নেওয়া হয়, তেমনি সরকারি যদি এমন কোনো প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয় যেখানে তাঁদের ও নিয়োগকারীর উভয় পক্ষেরই পরিচয় পত্র ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা থাকবে তাহলে সমতা থাকে ও দু’তরফেরই নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হয়।
দু’দশকের বেশি সময় ধরেই কলকাতায় তৈরি হয়েছে গৃহশ্রমিকদের অধিকার রক্ষার নানা সংগঠন। যার মধ্যে অন্যতম ‘সমাধান দল’। কথা বলেছিলাম, এই সংগঠনের তরফে পারমিতা চৌধুরির সঙ্গে। সমাধান দল আপাতত কাজ করে কলকাতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলায়। মূলত দক্ষিণ কলকাতায় ও শহরের ঘন বসতিপূর্ণ এলাকায়। স্থির হয়েছে পরবর্তী পর্যায়ে একেকটি ওয়ার্ড ধরে কাজ করার। এই মুহূর্ত সমাধান দলের সদস্য সংখ্যা আনুমানিক ৬৭৭। এই সংখ্যাটি ১২০০তে নিয়ে যাওয়া এখন লক্ষ্য।
পারমিতা জানালেন, “সমাধান দল অনেক দিন ধরেই কাজ করছে। এতদিন পর্যন্ত স্থানীয় নেতৃত্ব তৈরি করেছি। সরকারি স্তরে কথাবার্তা চালাতে গেলে অফিশিয়ালি সমাধান দলের মুখ হয়ে আমরা যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমরা তো শ্রমিক নই। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় গৃহশ্রমিকেরাই সমাধান দলের মুখ হবেন, প্রতিনিধিত্ব করবেন, আমরা তাঁদের সহযোগিতা করতে পারি, অ্যালাই হতে পারি, বন্ধু হতে পারি। গত জানুয়ারি মাসে প্রতিটি এলাকা থেকে দু’জন করে নিয়ে তিনটি পদের জন্য নির্বাচন হয় – সচিব, সভানেত্রী ও কোষাধ্যক্ষা। একেবারেই নির্বাচনী প্রতীক দিয়ে এলাকার নেত্রীরা কেন্দ্রীয় ফেডারেশনের নেত্রীকে নির্বাচিত করেছেন।”
পারমিতা কথা প্রসঙ্গে জানালেন, অতীতে যে জায়গায় পৌঁছেছিল এ রাজ্যে গৃহশ্রমিকদের অধিকার আন্দোলন, তা সামান্য হলেও দুর্বল হয়েছে। কারণ নানাবিধ। সম্প্রতি এ রাজ্যের গৃহশ্রমিকদের একমাত্র ইউনিয়ন ‘পশ্চিমবঙ্গ গৃহ পরিচারিকা সমিতি’র ট্রেড লাইসেন্স বাতিল হয়েছে এই কারণ দেখিয়ে যে তা ট্রেড নয়। উচ্চস্তরীয় প্রশাসনিক জায়গা থেকে ব্যাঙ্গাত্মকভাবে এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে যে, এবার তবে গৃহবধূদেরও সংগঠন তৈরি হবে! বাড়ির অভ্যন্তরটিকে কর্মক্ষেত্র হিসাবে দেখতেই রাজি নয় কেউ। প্রশাসন হোক বা বিচারব্যবস্থা তারাও নিয়োগকারীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেখছে বিষয়টিকে এবং গৃহশ্রম বিনামূল্যে পেতেই অভ্যস্ত বলেই গৃহ পরিচারিকাদের কাজকে শ্রমিকের শ্রম বলে দেখতে, তার নির্দিষ্ট মজুরির কথা ভাবতে নারাজ তারা। ফলে যৌন হেনস্থা হলে অভিযোগের সঠিক ব্যবস্থা বা কাজের সুস্থ উপযুক্ত পরিবেশ সবই অধরা রয়ে যায়।
অবশ্য আশার কথাও কিছু জানালেন পারমিতা যেমন, “শ্রম কমিশনারের কাছে আমরা ন্যূনতম মজুরির নোটিফিকেশন অন্য রাজ্য থেকে নিয়ে জমা করেছি, তাঁরা বলেছেন বিষয়টা দেখছেন। কিছু মাস আগে নিয়োগকারীদের সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনায় তাঁরাও জানিয়েছেন যে সরকারিভাবে কোনোও প্ল্যাটফর্মে উভয় পক্ষের তথ্য থাকলে দু’তরফেই নিয়ম-নীতি মেনে চলা সহজ হয়। দিল্লির একটি সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে আমরা দশ জন নিয়োগকারীর সঙ্গে গৃহশ্রমিকদের একটা বেসিক চুক্তিপত্র করতে পেরেছি। আমরা এখানেও আরো বেশি সংখ্যক নিয়োগকারী ও গৃহশ্রমিকের মধ্যে এরকম চুক্তিপত্র করার চেষ্টা শুরু করছি, যাতে একটা কোড অফ কন্ডাক্ট বজায় রাখা যায়।”
শেষ করা যাক, এই প্রতিবেদকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে। যে গৃহশ্রমিক নারী আমার বাড়িতে আসেন, তিনি রাত আড়াইটেয় ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে ওঠেন, তিনটেয় বাড়ি থেকে রওনা দেন, দক্ষিণ ২৪ পরগণার এক গ্রাম থেকে। সারা দিন পাঁচটি বাড়িতে কাজ সেরে, বিকেলের ট্রেনে বাড়ি ফেরেন। নিজেই বলেন, “টানা ৭-১০ দিন কাজ করে, একটা ছুটি না করলে পারি না গো, শরীর দেয় না।“ বয়স বাড়ার সঙ্গে নানা শারীরিক সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। বাড়ি ফিরেও বাড়ির যাবতীয় রান্নাবান্না করতে হয়। তাঁর শাশুড়ি বা পুত্রবধূ সে দায়িত্ব নেন না, “জানো ওরা বোধহয় ভাবে আমি তো সারাদিন কলকাতায় ঘুরেঘেরে যাচ্ছি, তাহলে রান্নাটুকু করব না কেন!” প্রসঙ্গত বলে রাখা যাক, কোভিডকালীন সময়ে অটো করে কাজ করতে আসতে গিয়ে দুর্ঘটনায় তাঁর হাতের আঙুল বাদ যায়। একজন নারীর এই এতগুলি পরিচিতি ও তার লড়াইয়ের আন্তঃসম্পর্ক সম্ভবত শুধুই তত্ত্বের বিষয় নয়। এর উপর ভিত্তি করেই যাবতীয় অধিকার আন্দোলন তৈরি হয়, তৈরি হয় ইতিহাসের মানচিত্র।
Sudarshana is an independent journalist. She is part of Groundxero collective.

