মারাংবুরু পাহাড় বাঁচাতে উৎসবে মেতে উঠলেন সাঁওতাল সমাজ


  • January 16, 2026
  • (0 Comments)
  • 283 Views

১৫ জানুয়ারি (১লা মাঘ) পূজা-সমাবেশের মধ্য দিয়ে সাঁওতাল সমাজ আবারও তুলে ধরেছে তাদের অটুট সম্পর্ক – দেবতা, পাহাড়, সংস্কৃতির সঙ্গে। গ্রামসভা ও আদিবাসী সমাজের সম্মতি ছাড়া কোনো প্রকল্প নয় – এই দাবি। উন্নয়নের নামে দেবস্থান ধ্বংস হলে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে যাবেন তাঁরা।

 

Groundxero | 16 January 2026

 

পৌষ মাসের শেষ আর পয়লা মাঘ; এই সময়ই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসবের সময়। কোথাও পৌষ পার্বন, কোথাও সাকরাত, কোথাও মকর টুসু, কোথাও পোঙ্গল। নতুন ফসল ঘরে ওঠার আনন্দ, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের উদযাপন উৎসবগুলির মূল সুর। কিন্তু, যখন তামিলনাড়ুতে পোঙ্গল ‘কাদের উৎসব’ এবিষয়ে রাজনৈতিক বিতর্কে উত্তাল রাজ্য, তখন পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় অঞ্চলে প্রশ্ন উঠছে, সাঁওতাল সমাজের কৃষি ও ধর্মীয় উৎসব কী গুরুত্বহীন? শতাব্দীপ্রাচীন সাঁওতাল মানুষের বিশ্বাস ও পূজাস্থল ধ্বংসের আশঙ্কা কী কারও দৃষ্টিতে পড়ছে না?

 

পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার অযোধ্যা পাহাড়-অঞ্চলে বহুদিন ধরে প্রস্তাবিত হয়ে রয়েছে ঠুড়্গা পাম্পড স্টোরেজ ড্যাম প্রকল্প। তা বাস্তবায়িত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে অযোধ্যা পাহাড়ের অন্যতম পবিত্র ধর্মস্থল—মারাংবুরু পাহাড়। এমন আশঙ্কায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়েছে সাঁওতাল সমাজের মধ্যে। তাঁদের বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পাহাড়েই অধিষ্ঠান করেন তাঁদের সর্বোচ্চ আরাধ্য দেবতা মারাংবুরু। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই পাহাড়কে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে তাঁদের ধর্মীয় আচার, সামাজিক সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, জাপানের সরকারি অর্থায়নকারী সংস্থা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জিকা) এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থা ডব্লুবিএসইডিসিএল-এর যৌথ উদ্যোগে তৈরি হতে পারে ১০০০ মেগাওয়াটের ঠুড়্গা পাম্পড স্টোরেজ। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মারাংবুরু পাহাড়ের বড় অংশই জলের তলায় চলে যাবে। সম্পূর্ণ ডুবে যাবে পাহাড়ের জাহের থানগুলি। ডুবে যেতে পারে অন্তত ৮টি গ্রামের কৃষিজমি, প্রায় ৩০০ হেক্টর বনভূমি। এবং নষ্ট হবে ওই এলাকার বননির্ভর বাস্তুতন্ত্র। তাছাড়া, লক্ষাধিক গাছ কাটা পড়ার আশঙ্কা, জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি এবং হাজারো মানুষের জীবিকা হারানোর সম্ভাবনাও দেখা দিচ্ছে।

অন্যদিকে, গ্রামবাসীদের কথায়, “মারাংবুরু ছাড়া আমাদের পূজা নেই, আমাদের ধর্ম নেই।” দেবতার পাহাড় ডুবে যাওয়া মানে শুধুমাত্র একটি ভূখণ্ড হারানো নয়— তা সাঁওতাল সমাজের ধর্মীয় অস্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার ভাঙন। বনাধিকার (স্বীকৃতি) আইন, ২০০৬ অনুযায়ী, জঙ্গল রক্ষার পাশাপাশি বননির্ভর আদিবাসী মানুষের সমস্ত অধিকার রয়েছে তাঁদের পারম্পারিক প্রথা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার। এই অধিকার ও ঐতিহ্যকে সদর্থক করে তুলতে, গত ১৫ জানুয়ারি, সাঁওতালি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পয়লা মাঘ, পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের রাঙ্গা-বাড়েলহর সহ আশপাশের সাঁওতাল গ্রামগুলিতে পালিত হয়েছে সাকরাত পরব। নতুন বছরের সূচনা, পুরনো বছরের বিদায় এবং নতুন ফসলের উৎসব। এই দিনে ‘হাঁকু’, অর্থাৎ মাছ খেয়ে পুরনো বছর শেষ করার রীতি পালন করা হয়। তারপর নতুন ধান ও সরষে নিয়ে পুজো করা হয়  মারাংবুরু পাহাড়ে।

 

এবছর বৃষ্টি ভালো হওয়ায় ফসলও মোটামুটি ভালো হয়েছে। বাড়ির উঠোনে ধানে ভরে উঠেছে গোলা। বাজারমুখী নয়, প্রায় সার-কীটনাশকমুক্ত পরম্পরাগত চাষ। যে চাষের সাফল্য উদযাপনের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে পাহাড়-বন-নদী-প্রকৃতিকে ঘিরে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রার্থনা। আগামী বছর যেন গাই-বাছুর, পাখি, জন্তু-জানোয়ার ও জঙ্গলের সঙ্গে শান্তিতে বেঁচে থাকা যায়— এই কামনাই উঠে আসে পুজোয়। মারাংবুরু পাহাড়ে রাঙ্গা-বাড়েলহর গ্রামসভার উদ্যোগে এবছরের পূজার আয়োজন করা হয়। পাহাড়ের অন্যান্য গ্রাম থেকেও মানুষ হেঁটে এসে যোগ দেন। কোনো মাইক, ব্যান্ড বা জাঁকজমক নেই। শান্ত পরিবেশে ‘নাইকে’ বাবা নতুন ধান ও সরষে দিয়ে জোড়া শালগাছের নীচে পূজা করেন। ছোট মাটির ঘোড়া-হাতির মূর্তি, ধূপের ধোঁয়া, ফুলের থালা— সব মিলিয়ে এক নিবিড় ধর্মীয় পরিবেশ। পাশে কাপড়ে লেখা—“মারাং বুরু আছে তাই আমরা আছি।” পূজাস্থলের পাশ দিয়েই বয়ে চলে ঠুড়্গা নালা, যাকে সাঁওতালরা মারাংবুরুর ধমনী বলে বিশ্বাস করেন। পূজার জল, ভোগ রান্নার জল— সবই আসে এই নালা থেকে। পাহাড়ের উপরে রয়েছে একটি প্রায় ১০০ মিটার লম্বা গুহা, যেখানে বছরের এই একদিনই প্রবেশের অনুমতি। পূজা শেষে প্রসাদ বিতরণ, ‘নাইকে’ বাবার উপদেশ, তারপর পাহাড় থেকে নামা। সন্ধ্যায় তামাক-টুমডা নিয়ে নাচে ছেলে-মেয়ে-বুড়ো-বাচ্চা সবাই।

 

অথচ, সংস্কৃতি ও পরম্পরার উদযাপনেও উঠে এসেছে স্থানীয় আদিবাসী মানুষের আশঙ্কা। কর্পোরেট ও সরকার কর্তৃক প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকার ঠুড়্গা প্রকল্পের সামনে প্রশ্ন উঠছে। একটি সমাজের ধর্ম, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের বিপ্রতীপে এই উন্নয়ন ভাবনা প্রকৃত অর্থে কী তাঁদের জঙ্গলনির্ভর জীবন, জীবিকা ও পরম্পরাকে সুনিশ্চিত করতে পারে? সাঁওতাল সমাজের দাবি স্পষ্ট— গ্রামসভা ও আদিবাসী সমাজের সম্মতি ছাড়া কোনো প্রকল্প নয়। উন্নয়নের নামে যদি দেবস্থান ধ্বংস করা হয়, তবে বৃহত্তর আন্দোলনের পথেই হাঁটবেন তাঁরা।

 

মারাংবুরু পাহাড় রক্ষার এই লড়াই তাই শুধু প্রকৃতি বা জীবিকার নয়। আদিবাসী সাঁওতাল মানুষ উনিশ শতকেই ব্রিটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছিলেন ‘হুল’ অর্থাৎ বিদ্রোহ। আজকে, তাঁদের পাহাড়-জঙ্গল, ধর্মীয় অস্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের লড়াই, সেই ঐতিহাসিক লড়াইয়েরই এক সময়াতীত সংলাপ হয়ে উঠছে।

 

Share this
Leave a Comment