“সংরক্ষণ কেন এখনো গুরুত্বপূর্ণ – জাস্টিস ত্রিবেদীর প্রতি একজন “অস্পৃশ্য” প্রাক্তন সহকর্মীর খোলা চিঠি …”


  • November 26, 2022
  • (0 Comments)
  • 382 Views

[অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল শ্রেণি (ইডব্লিউএস)-র জন্য কলেজ এবং সরকারি চাকরিতে ১০ শতাংশ সংরক্ষণের পক্ষেই রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। দরিদ্রদের জন্য সংরক্ষণ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্ত যে বৈধ, তা মনে করেন এই মামলায় শীর্ষ আদালতের ৫ বিচারপতির মধ্যে ৩ জনই। সোমবার তাঁদের পর্যবেক্ষণ, অর্থনৈতিক মানদণ্ডের বিচারে এই সিদ্ধান্ত কোনও ভাবেই বৈষম্যমূলক নয়। এই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি উমেশ ললিতের নেতৃত্বে গঠিত ৫ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি দীনেশ মহেশ্বরী, বিচারপতি এস রবীন্দ্র ভট্ট, বিচারপতি বেলা এম ত্রিবেদী এবং বিচারপতি জেবি পার্দিওয়ালা।

 

সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি বেলা এম ত্রিবেদী-র উদ্দেশ্যে এই খোলা চিঠিটি লেখেন রাজেশ চাওরা। এটি গত ১৯ নভেম্বর প্রকাশিত হয় ‘স্ক্রোল’-এ; বর্তমান লেখাটি তারই বঙ্গানুবাদ; রাজেশ চাওরা বর্তমানে যুক্তরাজ্যে একজন কর্পোরেট লইয়ার]

 

 

প্রিয় জাস্টিস বেলাবেন,

 

হয়তো আপনার আমাকে মনে থাকবে। ২০০৪ সালের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত গান্ধীনগরের গুজরাত ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটিতে আমি আপনার সহকর্মী ছিলাম। সেই ছোট্ট দলটার আমরা একটা অংশ ছিলাম, যারা এই প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছিল। এটি তৈরি হয়েছিল ভবিষ্যতে ভারতের সর্বোত্তম একটি ল স্কুলে পরিণত হওয়ার জন্য। আপনি ছিলেন গুজরাত সরকারের ল ডিপার্টমেন্টের কার্যনির্বাহী সচিব, আর আমি ছিলাম প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন।

 

আপনার সঙ্গে কাজ করতে সত্যিই ভালো লাগত। আপনি শুধুই একজন দক্ষ প্রশাসক ছিলেন না, পাশাপাশি ছিলেন একজন সংবেদনশীল মানুষও। মনে আছে, একবার আপনি আমাকে আপনার আমেদাবাদের বাড়িতে ডেকে খুব সুস্বাদু ডিনার খাইয়েছিলেন। আমার বিশ্বাস, আপনারও আমাকে পছন্দ ছিল। আর সেজন্যই হয়তো আমি অপ্রত্যাশিত কিছু প্রশংসা পেয়েছিলাম; গুজরাতের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী, নরেন্দ্র মোদী, যিনি ওই প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলেন, উদ্বোধনের দিন বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছিলেন, “এই যে রাজেশ চাওরা কে দেখছেন, উনি দেখতে ছোটোখাটো হলে কী হবে, উনি যে কতটা মহান, তা আপনারা ভাবতেও পারবেন না।”

 

আমি ভেবেছিলাম, আমার কাজকর্মের কথা আপনি নিশ্চয়ই ওঁকে বলে থাকবেন, আর তাই আমি আপনার প্রতি খুবই কৃতজ্ঞতা বোধ করেছিলাম। আমাদের দু’জনের মধ্যে এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও আমি একটা ব্যাপার নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলাম। আমাদের কথোপকথনের সময় খেয়াল রাখতাম যাতে কোনোভাবেই অস্পৃশ্য হিসাবে আমার জাতের পরিচয় আপনার কাছে প্রকাশ না হয়ে পড়ে। আমি রাজনীতি, জাতপাত আর সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা যথাসম্ভব এড়িয়ে যেতাম।

 

আপনি এখন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি। আজ আমি আপনার ইডব্লিউএস কোটা সংক্রান্ত রায়টা পড়লাম—জনহিত অভিযান বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া। এই রায়টি কিন্তু কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ বেঞ্চের [বিচারপতি দীনেশ মহেশ্বরী, বিচারপতি বেলা এম ত্রিবেদী, বিচারপতি জেবি পার্দিওয়ালা।] সুবিধাজনক সামাজিক অবস্থান আর অস্পৃশ্য তথা নানা জনজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির প্রতি বিরূপতাই প্রকাশ করে।

 

এই রায়ে আপনি জাস্টিস মহেশ্বরী ও জাস্টিস পার্দিওয়ালার সাথে একমত হয়ে ভারতের সংবিধানের ১০৩ তম সংশোধনীর পক্ষেই থেকেছেন। এই ১০৩ তম সংশোধনী শিক্ষাক্ষেত্র ও সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবে নানা সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠী, যেমন অস্পৃশ্য তথা নানা জনজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির বাইরে ১০% সংরক্ষণ নিশ্চিত করে। আপনি আরও প্রস্তাব করেন যে অস্পৃশ্য তথা নানা জনজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির ক্ষেত্রে যে সংরক্ষণ দিয়ে আসা হচ্ছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করে দেওয়া উচিত। আপনি লেখেন,

 

“দেশের চালু সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে শুরু করা হয়েছিল এসসি, এসটি ও ওবিসি গোষ্ঠীভুক্ত মানুষরা ঐতিহাসিকভাবে যে অবিচারের সম্মুখীন হয়ে আসছেন তার সংশোধন করা, এবং পাশাপাশি সমাজের এগিয়ে থাকা গোষ্ঠীর সাথে এইসব অনগ্রসর গোষ্ঠীর মানুষরা যাতে সমভাবে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেন, তার জন্য একটা সঙ্গতিপূর্ণ খেলার মাঠ তৈরি করা। কিন্তু স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরে আমাদের সংরক্ষণের এই ব্যবস্থাকে আরেকবার ফিরে দেখা উচিত, যাতে আমরা সাংবিধানিক রূপান্তরের (ট্রান্সফরমেটিভ কন্সটিটিউশিনালিজম) দিকে এক কদম এগিয়ে যেতে পারি।”

 

আচ্ছা, ঠিক কিসের ভিত্তিতে আপনি সিদ্ধান্তে এলেন যে অস্পৃশ্য তথা নানা জনজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির ক্ষেত্রে সংরক্ষণব্যবস্থা তুলে দেওয়ার সময় এসে গেছে? এরকম কোনো তথ্যসূত্র কি আছে, যেখান থেকে এই ধারণা করে নেওয়া যায় যে উচ্চশিক্ষার নানা ক্ষেত্র তথা সরকারি চাকরিতে এই গোষ্ঠীর এতটাই প্রতিনিধিত্ব আছে যে তাদের আর সংরক্ষণের সুবিধার দরকার নেই?

 

কোনো একটা প্রতিষ্ঠানে যদি অস্পৃশ্য তথা নানা জনজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির জন্য সংরক্ষণ না থাকে, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের কী হয় একটু বোঝার চেষ্টা করি। আপনি যে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, তাকে দিয়েই না হয় বিচার করা যাক।

 

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের মধ্যে কতজন অস্পৃশ্য তথা নানা জনজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি থেকে আসা? প্রতিষ্ঠার দিন থেকে নভেম্বর ২০২১ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে যে ২৫৬ জন বিচারপতি হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে মাত্র ৫ জন হলেন অস্পৃশ্য গোষ্ঠী থেকে আসা, আর ১ জন হলেন জনজাতি গোষ্ঠীর থেকে আসা।

 

ঐতিহাসিকভাবে নানা সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠী ও জাতি থেকে বিচারপতি বানানোর ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট কলেজিয়ামের কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকায় দেশের বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তরে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিবিধতার একটা বড় রকমের ঘাটতি থেকে গেছে। আর ঠিক এই কারণেই সেখানে এমন কেউ নেই যিনি কিনা জোর গলায় বলতে পারবেন যে অস্পৃশ্য তথা নানা জনজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি ও গোষ্ঠীর মানুষরা সামাজিকভাবে এতটাই অগ্রসর হয়েছেন যে তাঁদের আর সংরক্ষণের সুবিধার দরকার নেই—এটা একটা ভ্রান্ত ধারণা।

 

অস্পৃশ্যদের জন্য যদি কোনো সংরক্ষণ না থাকত, তবে আমি নিজে ব্যাঙ্গালোরের ন্যাশনাল ল স্কুলে ভর্তি হতে পারতাম না, আর লইয়ারও হতে পারতাম না। পাশাপাশি আমি আজকে লক্ষ লক্ষ রাজেশ চাওরার পক্ষ নিয়ে এই চিঠিও লিখতে পারতাম না। এইসব রাজেশ চাওরাদের কিন্তু সংরক্ষণ লাগে। যে মাঠে তাঁরা খেলতে নামছেন, সেখানে ঐতিহাসিকভাবে সমস্ত সামাজিক সুযোগপ্রাপ্ত উচ্চবর্গের ও উচ্চবর্ণের সন্তানরা রয়েছেন তাঁদের অদৃশ্য সংরক্ষণের সুবিধা নিয়ে। সেই সুবিধার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হলে সংরক্ষণ লাগে।

 

আপনার রায়ে আপনি আরও বলেছেন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ আর ১৬ তে যে বিশেষ সংরক্ষণ আর প্রতিনিধিত্বের কথা বলা আছে, সেগুলোর প্রভাবকে সম্ভবমতো সময় দিয়ে বেঁধে ফেলতে হবে, যাতে আমরা একটা জাতপাতবিহীন আর শ্রেণিহীন সমানাধিকার সম্পন্ন সমাজের দিকে অগ্রসর হতে পারি।

 

আমি জানি না এই জাতপাতবিহীন আর শ্রেণিহীন সমানাধিকার সম্পন্ন সমাজের রূপটা ঠিক কীরকম হবে!

 

সেই ২০০৪ সালে যখন আমরা একসঙ্গে কাজ করতাম, তখন গুজরাত ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটির চলার শুরুতেই আপনি হিন্দু ধর্মমতে আচার অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন, যার পরিচালনায় ছিলেন ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা। আপনি কি এমন কোনো জাতপাতহীন সমাজের কল্পনা করতে পারেন, যেখানে একটা ইউনিভার্সিটি প্রোজেক্ট শুরু হচ্ছে হিন্দু ধর্মের আচার অনুষ্ঠান দিয়ে আর সে অনুষ্ঠানের দায়িত্বে আছেন অস্পৃশ্যরা? হিন্দুমতে আচার অনুষ্ঠান পালনের যে ‘এক্সক্লুসিভ এনটাইটেলমেন্ট’ রয়েছে ব্রাহ্মণদের, আপনার কি মনে হয় তা তাঁরা স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেবেন?

 

২০০৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০০৬ সালের জুনের মধ্যে যখন আমি আমার জন্য পাত্রী খুঁজছিলাম নানা ‘ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইট’-এ, সেখানে আমার সঙ্গে সুবিধাভোগী শ্রেণির নানান মহিলার আলাপও হয়েছিল। আমার জীবনপঞ্জিকায় নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া ল স্কুল আর ভারতের ন্যাশনাল ল স্কুল-এর নাম থাকায় তাঁরা উৎসাহিতও হয়েছিলেন, কিন্তু তারপরেই তাঁদের অবধারিত প্রশ্ন থাকত আমার জাত নিয়ে। আমি অস্পৃশ্য শোনার পর কেউই আর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি, আমার প্রোফাইলে বড় বড় প্রতিষ্ঠানের নাম থাকা সত্ত্বেও।

 

আপনার কি মনে হয় আপনি যদি অস্পৃশ্যদের সংরক্ষণের আওতার বাইরে নিয়ে আসেন, তাহলে এঁরা আর জীবনসঙ্গী খোঁজার ক্ষেত্রে জাতপাত দেখবেন না?

 

যখন আমাদের পরিবারে কোনো মৃত্যু ঘটে, আমরা গুজরাতের অস্পৃশ্যরা সেই মৃতদেহকে দাহ করি না, কবর দিই। আমাদের পৃথক সমাধিক্ষেত্র আছে। ২০১৬ সালে আমার দেশের বাড়িতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হয় ও আমাদের সমাধিক্ষেত্র জলের তলায় চলে যায়। এই সময়ে আমাদের গ্রামে এক প্রতিবেশীর মৃত্যু হয়। কিন্তু আমাদের সমাধিক্ষেত্র জলের তলায় চলে যাওয়ায় আমরা তার দেহ সমাধিস্থ করতে পারিনি। আমাদের গ্রামে মোট দু’টি শ্মশান রয়েছে। দুটিতেই উচ্চবর্ণের মানুষদের মৃতদেহ দাহ করা হয়। সেই বছর বন্যার কারণে আমরা তাঁদের অনুরোধ করি যাতে তাঁদের কোনো একটি শ্মশানে ওই প্রতিবেশীর দেহকে দাহ করার অনুমতি তাঁরা দেন। কিন্তু সেই অনুমতি তাঁরা দেননি কারণ তাঁদের মতে অস্পৃশ্যরা তাঁদের শ্মশানকে কলুষিত করবে।

 

যে জাতপাতহীন সমাজের দিকে আপনি তাকিয়ে আছেন, সেখানে কি আপনি উচ্চবর্ণের মানুষদের জন্য শ্মশানকে সংরক্ষিত করা বন্ধ করতে পারবেন?

 

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমার পাশের গ্রামে একটি কুড়ি বছরের অস্পৃশ্য ছেলেকে কিছু উচ্চবর্ণের মানুষ শারীরিকভাবে নিগ্রহ ও হত্যা করে। ছেলেটির “অপরাধ” ছিল যে সে হিন্দু উৎসব নবরাত্রিতে উচ্চবর্ণের মানুষদের আয়োজিত গর্বা-রাস নাচের একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠান দেখতে গিয়েছিল। উচ্চবর্ণের মানুষদের এটা ভালো লাগেনি, তাই তারা ওকে মেরে ফেলে। আপনার কি মনে হয় কোটা না থাকার জন্য অস্পৃশ্যদের জীবনের দাম উচ্চবর্ণের কাছে বাড়বে?

 

একই রায়ে আপনার ব্রাদার জাজ পার্দিওয়ালা মন্তব্য করেছেন, সংবিধানের খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে বি আর আম্বেদকর নাকি চেয়েছিলেন যাতে সংবিধান প্রণয়নের ১০ বছরের মধ্যেই সংরক্ষণ ব্যবস্থা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তিনি তাঁর এই বক্তব্যের সপক্ষে কোনো সূত্র দেননি। অপরদিকে আমার সহকর্মী ব্রাদার অনুরাগ ভাস্কর, যে কিনা নিজে অস্পৃশ্য, প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, এটা সর্বৈব মিথ্যা।

 

প্রসঙ্গত ১০ বছরের প্রাথমিক সময়সীমা বেঁধে দেওয়া ছিল কিছু শর্তসাপেক্ষে রাজনৈতিক সংরক্ষণের ক্ষেত্রে। শিক্ষা বা সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নয়।

 

যদিও আম্বেদকর ১৯৪৯ এর ২৫ অগস্ট সংবিধান সভায় দাঁড়িয়ে যে বক্তব্য রেখেছিলেন, তা থেকে এটা বোঝা যায় যে উনি এমনকি রাজনৈতিক সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও কোনো সময়সীমা বেঁধে দেবার পক্ষপাতী ছিলেন না।

 

এমনকি আপনি আর জাস্টিস পার্দিওয়ালা যে জাতপাত-সংক্রান্ত সংরক্ষণ তুলে দেওয়ার কথা বলছেন, এক্ষেত্রেও কিন্তু আপনারা এমনকি ইডব্লিউ কোটা-র সদস্যদের জন্য কোনো রাস্তা তৈরি করে দিচ্ছেন না, যা বহাল রাখতে পারে।

 

১৯৯২ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সংরক্ষণের সর্বাধিক অনুপাত কখনোই ৫০% ছাড়ানোর কথা নয়। কিন্তু আপনারা ইডব্লিউএস কোটাকে এই ৫০%-এর বাইরে রেখেছেন।

 

২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ভারতে অচ্ছুৎ আর জনজাতির সংখ্যা ২৫%। ১৯৭৯ সালে গঠিত মণ্ডল কমিশন ওবিসি- র সংখ্যা নির্ধারণ করে ৫২% এর মতো। অর্থাৎ সব মিলে ৭৭%; কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট তাদের সংরক্ষণের সীমা বেঁধে দেয় ৫০%-এ।

 

আপনার রায়ের অন্যত্র আপনি লিখেছেন,

 

“স্বতঃসিদ্ধ হিসাবে এটা সবসময়েই ধরে নেওয়া হয় যে আইনসভা তার নিজের মানুষদের প্রয়োজন বোঝে আর তাকে সম্মানও দেয়। বিভিন্ন আইন যেসব সমস্যার সমাধানের উদ্দেশ্যে তৈরি হয়, সেগুলো যথেষ্ট অভিজ্ঞতালব্ধ এবং সেখানে যদি কোনো বৈষম্য থাকে, তাহলে বুঝে নিতে হবে যে তা বাস্তব অবস্থার কারণেই করা হয়েছে।”

 

সত্যি তাই? যেসব বাস্তব অবস্থার কথা আপনারা বলছেন সেগুলো তা বিচারপতিদের চেম্বারে বসে যেটুকু বোঝা যায় সেটুকু। তাও সেই বিচারপতিরা সকলেই উচ্চবর্ণের বা সুবিধাভোগী শ্রেণির। এই বাস্তব তো এঁদের মধ্যকার আলোচনা আর অচ্ছুতদের নীরবতার মাধ্যমে নির্মিত হয়।

 

যেহেতু আমরা বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে একমত হতে পারলাম না, আসুন আমরা কিছু সংখ্যার দিকে নজর দিই। ইডব্লিউএস-র শর্ত অনুযায়ী যদি কোনো পরিবারের মাসিক রোজগার ৬৬,৬৬৬ টাকার কম হয় তাহলে তাঁরা এই সংরক্ষণের সুবিধা পাবেন। মে মাসে ‘ইনস্টিটিউট অফ কম্পিটিটিভনেস’ একটা রিপোর্ট তৈরি করেছিল যার নাম ছিল ‘স্টেট অফ ইনইকুয়ালিটি ইন ইন্ডিয়া’। সেখানে দেখা যাচ্ছে দেশের ৯০% মানুষের মাসিক রোজগার ২৫,০০০ টাকার কম। অর্থাৎ সংখ্যার বিচারে অস্পৃশ্য তথা নানা জনজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির মানুষ ছাড়া শুধুমাত্র রোজগারের ভিত্তিতেই ৯০% এর বেশি সংখ্যক মানুষ ইডব্লিউএস-এর সুবিধার দাবিদার হবেন। সহজ কথায় ইডব্লিউএস কোটা মোটেই আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়াদের জন্য নয়।

 

বহু বছর আগে, সেই গান্ধীনগরে থাকাকালীন একটা মিটিংয়ের কথা আমার মনে পড়ে। সেখানে আমার সঙ্গে গুজরাত ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটির একজন উচ্চপদস্থ অফিসারের আলোচনা হচ্ছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন গুজরাতের আইনমন্ত্রী। ওই অফিসার জিজ্ঞেস করেন, “আচ্ছা ভর্তির ক্ষেত্রে সংরক্ষণের বিষয়টা আমরা কী করব? রাখব?” মন্ত্রী বলেন, “অবশ্যই রাখবেন। এটা তো আমাদের সাংবিধানিক কর্তব্য।”

 

আমি এই আলোচনার মধ্যে স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম। ভাবছিলাম আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সেই অফিসার, যিনি কিনা তুখোড় আইনবিশারদও বটেন, তিনি কীভাবে এইরকম একটা প্রশ্ন করতে পারেন! ইচ্ছে হচ্ছিল, সেখানে বসেই আমি তাঁকে বলি যে, আমাকে দেখুন। সেই সংরক্ষণ ব্যবস্থার আমি একটা প্রোডাক্ট। আমাকে দেখুন! কিন্তু পাশাপাশি আমি এটাও জানি যে এরকম করাটা ঠিকও হত না। কারণ প্রতিটা অস্পৃশ্য ব্যক্তি যে কিনা জীবনে সফল হয়েছে, তারা প্রত্যেকে প্রিভিলেজড শ্রেণির চোখে একেকটা বাধা। তাঁদের প্রত্যেকের সাফল্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে যুক্তি নির্মাণ করে। তাঁদের ক্ষেত্রে সমস্যাটা সংরক্ষণ না। সমস্যাটা আমি।

 

ভালো থাকবেন।

Share this
Leave a Comment