উলগুলানের শেষ নেই 


  • November 14, 2022
  • (0 Comments)
  • 497 Views

আক্রমণ যত তীব্র হচ্ছে প্রতিবাদী লড়াইয়ে বুক বাঁধছে আদিবাসী ও গণতান্ত্রিক ভারত। এই লেখা যখন লিখছি, ঠিক তখন বিরসা মুন্ডার জন্মদিনের প্রাক্কালে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের বামনি ঝোরায় সমবেত হয়েছেন শত শত আদিবাসী মানুষ। তাঁদের হকের অধিকার ফিরে পেতে। শোনা যাচ্ছে ধরতি আবা বিরসা মুন্ডার ‘আবওয়াঃ দিশম, আবওয়াঃ রাজ’-এর ডাক। ফের শোনা যাচ্ছে খুটকাঠি ভূমিপ্রথার কথা। লিখছেন দেবাশিস আইচ

 

 

—‘জংলা কানুন এখন চালু করেছে।’

—‘কোথা।’

—‘পালামৌ, মানভূম, সিংভূম।’

—‘সিংভূমে কি করল। কানুন তো ১৮৭৮ সালের।’

—’কানুন ছিল, চালু করে নাই। এখন ঢোল দিয়া দিয়াছে সকল গ্রামে সকল খাস জমি জঙ্গলের আপিস নিয়া নিল। জঙ্গলে আমরা লাখো লাখো চাঁদ ধরে গাইছাগল চরায়েছি, জঙ্গল থেকে কাঠ আনায়াছি। হা বিরসা। জঙ্গল তো নিয়াই নিয়াছে। এখন হতে কেউ গাইছাগল চরাতে পারবে না জঙ্গলে। জঙ্গল থেকে কাঠ-পাতা-মধু আনতে পারবে না। শিকার করতে পারবে না। জঙ্গলের ভিতর যত গ্রাম আছে সব উচ্ছেদ করে দিল।’

—‘না।’

বিরসা চেঁচিয়ে উঠেছিল। ওর রক্তে বসে চুটুয়া আর নাগু চেঁচিয়ে উঠেছিল। অরণ্যের অধিকার কৃষ্ণ-ভারতের আদি অধিকার। যখন সাদা মানুষের দেশ সমুদ্রের অতলে ঘুমোচ্ছিল, তখন থেকেই কৃষ্ণ-ভারতের কালো মানুষরা জঙ্গলকে মা বলে চেনে।

অরণ্যের অধিকার, মহাশ্বেতা দেবী।

 

ভরমিদের সঙ্গে বিরসার এই কথোপকথনের সময়টা তাৎপর্যপূর্ণ। মহাজনদের বিরুদ্ধে সর্দার -বিদ্রোহের পাশে না থাকার জন্য মিশনারি চার্চের প্রতি বীতশ্রদ্ধ বিরসা মিশন ছেড়ে আশ্রয়  নিয়েছেন বন্দগাঁওয়ের এক বৈষ্ণব মুন্সি আনন্দ পাঁড়ের কাছে। অস্থির বিরসা তখন জমিদার, মহাজনদের অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি খুঁজছেন। কতই-বা বয়স তখন, বড় জোর পনেরো-ষোলো। নানা তথ্যের সংযোগে অনুমান করা হয় ১৮৭৫ সালে জন্মেছিলেন বিরসা। ১৮৯০ সালে চার্চ ত্যাগ করেন। ১৯০০ সালের ৯ জুন জেলে যখন তাঁর মৃত্যু হয় তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৫ বছর। মিশন শিক্ষায় শিক্ষিত, প্রতিবাদী চরিত্রের বিরসার উপর ভরসা ছিল ভরমিদের। তাই তাঁর কাছে আসা। ১৮৭৮ সালের বন আইনের মধ্য দিয়ে, বনবাসী ও বন নির্ভর আদিবাসী মানুষের চিরাচরিত সব অধিকার কেড়ে নিয়েছিল ইংরেজ। তারও বহু আগেই বাপ-দাদাদের আমলেই জমিজমা, গ্রামের অধিকার হারিয়েছিল মুন্ডারা।

 

ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি যেদিন মুঘল বাদশাহ শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা-বিহার-ওড়িশার  দেওয়ানি পেল, সেই ১৭৬৫ থেকেই মুন্ডাদের জীবনে চরম দুর্দশা নেমে এসেছিল। কোম্পানির সাহেবদের সঙ্গে সঙ্গে এসেছিল মহাজন, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার। এই সব বহিরাগতরাই মুন্ডারি ভাষায় দিকু। তারা শুধু এল না, ছোটনাগপুরের মুন্ডারি খুটকাঠি গ্রাম ও ভূমি ব্যবস্থাটাই ভেঙে ফেলল। ভয় দেখিয়ে, গা জোয়ারি করে জমি তো কেড়েইছিল। তার সঙ্গে স্থানীয় রাজারাও ভিনদেশি মহাজন, ঠিকাদারদের গ্রামের পর গ্রাম বেচে দিয়েছিল। যেমন, ছোটনাগপুরের রাজপরিবারের হরনাথ শাহী একসঙ্গে পাঁচটি পরগনা তুলে দিয়েছিল বহিরাগতদের হাতে। জমি হারিয়ে মজুর হল মুন্ডারা, গ্রাম হারিয়ে দেশান্তরী হল।

 

“খুটকাঠি ও ভুঁইহারি প্রথায় মুন্ডারা প্রয়োজন অনুযায়ী জমি ভোগ করতেন—যার যেমন দরকার সে ততটা পাবে, কারও হাতে উদ্বৃত্ত বলে কিছু থাকবে না। গাছপালা পাহাড় পশুপাখি নিয়ে তাঁদের সংসার, তাঁদের জীবন। গ্রাম প্রধান পাহান, কয়েক গ্রাম নিয়ে মানকি, এঁরা সবাইকে নিয়ে গ্রাম চালাতেন, উতসব, বিবাহ, বিবাদ-বিসম্বাদ, সব কিছুতেই এঁদের ভূমিকা। …আর ছিল স্বাধীনতা ও সাম্য—সবাই স্বাধীন, কেননা সবাই সমান। সবাই নিজের মত ব্যক্ত করতে পারত, একশো জনের মধ্যে একজনও বিরোধী কথা বললে তা মন দিয়ে শোনা হত, যুক্তি দিয়ে প্রমাণিত হলে, গৃহীত হত।

 

“ইংরেজদের অনুপ্রবেশে তাঁদের এই ব্যবস্থা বিধ্বস্ত হয়ে পড়ল। ইংরেজদের পিছু ধরে আসল বানিয়া, রাজপুত, ব্রাহ্মণ, ভূমিহার প্রভৃতি শোষকরা। মুন্ডাদের ভাষায় দিকু। ইংরেজের ছত্রছায়ায় এই সব দিকুরা কেড়ে নিতে লাগল মুন্ডাদের জমি। রাতারাতি একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতি ভেঙে পড়ল। কৃষক মুন্ডারা হয়ে গেল দিনমজুর, খেতমজুর। যে সব খেত তাদের পূর্বজদের মেহনতে তৈরি, অনেক মুন্ডা সেই সব জমিতে মজুরি খাটতে বাধ্য হল।’ (বিরসা মুন্ডা, কুমার রানা)।

     

ঔপনিবেশিক ভারতের সেই নির্মম লুঠের বিরুদ্ধে একের পর এক আদিবাসী বিদ্রোহ ঘটেছে। ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল অভ্যুত্থান—হুল, কিংবা ১৯০০ মুন্ডা বিদ্রোহ উলগুলান। এমন বিদ্রোহগুলিকে নির্দয়ভাবে পিষে মেরেছে ইংরেজরা। কিন্তু, মরেও মরেনি সিধু, কানহু, চাঁদ, ভৈরব এবং তাঁদের বোন ফুলো, মানোরা। মুন্ডা সমাজের কাছে, আদিবাসী সমাজের কাছে বিরসারও মরণ নেই। উলগুলানেরও শেষ নেই। বিরসার মৃত্যুর পর এক দশকের মধ্যে ১৯০৮ সালে আদিবাসীদের জমি যাতে বহিরাগতরা হস্তগত না করতে পারে, তার জন্য ছোটনাগপুর টেন্যান্সি আইন (সিএনটি অ্যাক্ট) তৈরি করতে বাধ্য হয় ইংরেজ শাসক। ১৯৪৯ সালে একই দিশায় সদ্য স্বাধীন ভারতে সাঁওতাল পরগনা টেন্যান্সি (সাপ্লিমেন্টারি প্রভিশনস) আইন (সিপিটি অ্যাক্ট) তৈরি হয়। সংবিধানের প্ঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিল, তফসিলি জাতি ও জনজাতির জন্য শিক্ষা ও চাকরিতে সংরক্ষণ, পঞ্চম তফসিলভুক্ত আদিবাসী প্রধান এলাকায় আদিবাসী সামাজিক রীতিনীতি ও প্রথা, শাসন ব্যবস্থার ঐতিহ্য রক্ষা করতে পঞ্চায়েত (এক্সটেনশন টু শিডিউল্ড এরিয়াস) অ্যাক্ট (পেসা), বনাধিকার আইন (২০০৬)—এই সবই দীর্ঘ দীর্ঘ আদিবাসী বিদ্রোহ, মরণপণ যুদ্ধ এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ফসল। এরপরও বলা যাবে না আদিবাসী ভারত স্বমর্যাদায় অধিষ্ঠিত। তার জল, জঙ্গল, জমি সুরক্ষিত। ভারতের সবচেয়ে বঞ্চিত, অত্যাচারিত, দরিদ্র, ক্ষুধার্ত, জমি ও জঙ্গল থেকে বিস্থাপিত—একক জনসম্প্রদায় হল আদিবাসীরা।

 

আরও পড়ুন : স্বাধীনতার ৭৫ বছর : উচ্ছেদ ও ধ্বংসের আদিবাসী ইতিবৃত্ত 

 

বিশ্বজোড়া নয়া অর্থনীতি এবং অতি দক্ষিণপন্থী কর্তৃত্ববাদী শাসকদের বাড়বাড়ন্তে পরিবেশ প্রকৃতি লুঠের মাত্রা সহ্যের সীমা ছাড়িয়েছে। বিগত ১১ বছরে শাসক ও বণিকের যৌথ উদ্যোগে—স্রেফ মুনাফার জন্য—ভারতেও আদিবাসীদের উপর অত্যাচার, বন-পাহাড়-নদী, প্রকৃতি-পরিবেশ ধ্বংস, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার এবং পরিবেশ ও বন আইনের সংকোচন, লঘু ও সরলীকরণ এবং সরাসরি লঙ্ঘন মাত্রাহীনভাবে বেড়েই চলেছে। মোদীরাজের প্রথম পাঁচ বছরে পরিবেশ এবং বন ও বন্যজন্তু বিষয়ক আইনগুলিকে যথাসম্ভব দুর্বল করে তোলা হয়েছে। কয়লা প্রকল্পের সম্প্রসারণের জন্য জনমত গ্রহণের রীতি বাতিল; দূষণ ঘটায় এমন শিল্পতালুক বনাঞ্চল ও লোকালয় থেকে ন্যূনতম দূরত্বের নিষেধাজ্ঞা বাতিল করা; স্থান-নির্দিষ্ট পরিবেশের উপর প্রভাব বিষয়ক পর্যবেক্ষণের আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা সঙ্কুচিত করা; খনি কোম্পানির জন্য ‘নো-গো’ নীতির লঘুকরণ; ন্যাশনাল বোর্ড অফ ওয়াইল্ড লাইফ-এর ভূমিকা সম্পূর্ণ হ্রাস; বনাঞ্চলে খনন ও খনিজদ্রব্যের সন্ধান প্রক্রিয়া আইনের লঘুকরণ—তার অন্যতম নিদর্শন। এখানেই শেষ নয় ২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট এক মামলায় ১১.৮ লক্ষ অরণ্যবাসীকে উচ্ছেদ করার পক্ষে রায় দেয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদের ফলে কোনও রাজ্য সরকারই সেই রায় কার্যকর করার চেষ্টা করেনি। কিন্তু, এই মামলা নিয়ে ফের নাড়াঘাঁটা শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, বন ও পাহাড়ে সঞ্চিত তাবড় খনিজ কর্পোরেটের হাতে তুলে দিতে মরিয়া কেন্দ্রীয় সরকার। নিয়মগিরির মতো যাতে আর কোথাও  বন-পাহাড়ের বাসিন্দা আদিবাসীরা বনাধিকার আইনের সাহায্যে কর্পোরেটদের খনি রুখে দিতে না পারে—সেই সার্বিক লুঠের লক্ষ্যে নতুন অরণ্য সংরক্ষণ বিধি (২০১২) এনেছে কেন্দ্রীয় সরকার।

 

আরও পড়ুন : নয়া অরণ্য সংরক্ষণ বিধি : আদিবাসী অধিকার হরণই মূল লক্ষ্য 

 

আক্রমণ যত তীব্র হচ্ছে প্রতিবাদী লড়াইয়ে বুক বাঁধছে আদিবাসী ও গণতান্ত্রিক ভারত। এই লেখা যখন লিখছি, ঠিক তখন বিরসা মুন্ডার জন্মদিনের প্রাক্কালে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের বামনি ঝোরায় সমবেত হয়েছেন শত শত আদিবাসী মানুষ। তাঁদের হকের অধিকার ফিরে পেতে। শোনা যাচ্ছে ধরতি আবা বিরসা মুন্ডার ‘আবওয়াঃ দিশম, আবওয়াঃ রাজ’-এর ডাক। ফের শোনা যাচ্ছে খুটকাঠি ভূমিপ্রথার কথা। এই আন্দোলনের উদ্যোক্তা ‘প্রকৃতি বাঁচাও ও আদিবাসী বাঁচাও’ তাদের প্রচারপ্ত্রে জানাচ্ছে :

 

“সুদীর্ঘ চলমান আন্দোলনের আজকের দিনের মতো করে সুসজ্জিত হওয়া প্রয়োজন। আমাদের উন্নয়ন কেমন হবে তা ঠিক করব আমরাই। আমাদের সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সরকার স্বীকৃত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে। আমাদের পায়ের নীচে খনিজ, মাটির উপর অরণ্য, অরণ্যের নদীকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পরিকল্পনা করার সমস্ত অধিকার আমাদের আছে। আমাদের মতামত না জেনে, আমাদের অনুমতি না নিয়ে করা যে কোনও উন্নয়নী প্রকল্পে আমাদের কোনও ভালো হতে পারে বলে আমরা মনে করি না।”

 

শুধু অযোধ্যা নয়, এ রাজ্যের ‘বনবাসী ও প্রকৃতি বাঁচাও আদিবাসী মহাসভা’ বিরসা মুন্ডার জন্মদিন ১৫ নভেম্বর থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত ‘সত্যাগ্রহ সপ্তাহ’ পালন করবে। দেউচা-পাঁচামি, অযোধ্যা, তিলাবনি, জয়ন্তী-সহ রাজ্যে ঘটে চলা পরিবেশ আন্দোলনগুলিকে সমর্থন জানিয়ে আদিবাসী ও অরণ্য অঞ্চলে গ্রামসভা গড়ে তোলার এবং বনসংরক্ষণ অধিনিয়ম ২০২২-এর বিরোধিতার ডাক দিয়েছে।

 

পাশাপাশি অরণ্য, পাহাড়, নদ-নদী, সমুদ্রের উপর জীবন-জীবিকার জন্য নির্ভরশীল ৪০ কোটি দেশবাসী, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘনঘন প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বন্যা, খরা, সাইক্লোন থেকে মানুষ, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে একজোট হওয়ার ডাক দিয়েছে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন, ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অফ পিপলস মুভমেন্ট, সর্ব ভারতীয় কিষান মজদূর সভা, আদিবাসী অধিকার রাষ্ট্রীয় মঞ্চ, জাগৃতি আদিবাসী দলিত সংগঠন, মালকানগিরি জিলা আদিবাসী সংঘ, তেলেঙ্গানা গিরিজন সঙ্গঠম-সহ একগুচ্ছ গণসংগঠন। ইংল্যান্ডের রানি ও কোম্পানিরাজ এবং দিকুদের বিরুদ্ধে উলগুলান বা পূর্ণ যুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন বিরসা মুন্ডা। সে কথা স্মরণ করে এই সংগঠনগুলি ১৫ নভেম্বর বিরসা মুন্ডার জন্মদিনে দেশীয় সরকার ও কর্পোরেট রাজের যৌথ আক্রমণের হাত থেকে অরণ্য ও ভূমি রক্ষা করার জন্য রাজ্যে রাজ্যে বন সংরক্ষণ বিল ২০২২-এর প্রতিলিপি পোড়ানোর ডাক দিয়েছে।

 

Share this
Leave a Comment