একশ দিনের প্রকল্পে কেন্দ্র-রাজ্য চাপান-উতোরে বন্ধ কাজ, বকেয়া ছ’মাসের মজুরি


  • August 2, 2022
  • (0 Comments)
  • 356 Views

ছ’মাস ধরে এ রাজ্যে বন্ধ রয়েছে নারেগা প্রকল্পের সমস্ত কাজ। এবং বকেয়া মজুরি পাননি কোনও শ্রমিক। কেন্দ্র থেকে বারে বারেই পর্যবেক্ষক দল আসছে এবং কেন্দ্র-রাজ্য তরজার কুফল ভোগ করছেন গ্রাম বাংলার দরিদ্র শ্রমিকেরা। চূড়ান্ত অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দিয়ে দিন গুজরান করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। বকেয়া মজুরি না পাওয়ার প্রভাব পড়েছে দৈনন্দিন খাবার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রোজকার জীবনযাত্রায়। অথচ,আইন অনুযায়ী মাস্টাররোল বন্ধ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে শ্রমিকদের মোট মজুরি হিসাব করে মিটিয়ে দিতে হবে। যদি বকেয়া মজুরি মেটাতে দেরি হয় তা হলে মাস্টাররোল বন্ধ হওয়ার ১৬ দিন পর থেকেই ০.০৫% হারে প্রতিদিনের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নিদান রয়েছে। এমন কোনও পদক্ষেপ করেনি কোনও সরকারই। লিখছেন সুদর্শনা চক্রবর্তী

 

রাজ্যের অভিযোগ ১০০ দিনের প্রকল্পের টাকা আটকে রেখেছে কেন্দ্র। নবান্নের দাবি, ১০০ দিনের কাজের মজুরি বাবদ বিগত ২৬ ডিসেম্বর থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি টাকা বকেয়া রয়েছে। কেন্দ্রের দাবি, অডিট রিপোর্টই দেওয়া হয়নি। রাজ্য সেই অভিযোগ নসাৎ করে জানিয়েছে সব নথি ও তথ্যপ্রমাণ জমা দেওয়া হয়েছে। এবং কেন্দ্রের নিয়ম মেনে অডিট, জিয়ো-ট্যাগিং, নজরদারি, অ্যাপের ব্যবহার–সব হয়েছে। এর মধ্যে রাজ্যে ১০০ দিনের কাজের খতিয়ান আর বাস্তব কাজের মিল খুঁজে না পেয়ে এবং অনিয়মের দায়ে ৪টি জেলাকে জরিমানা করেছে কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের পরিদর্শক দল। কোথাও কিছু ক্ষেত্রে কাজের গুণমান খারাপ, কোথাও তৈরি হয়নি রাস্তা বা পুকুর কিন্তু স্থায়ী সম্পদ তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। খাতায়-কলমে কাজ হয়েছে দেখানো হলেও সে কাজের চিহ্ন পাওয়া যায়নি–এমনই সব অভিযোগে হুগলি জেলাকে ২ কোটি টাকা, পূর্ব বর্ধমানকে ১ কোটির কিছু বেশি এবং মালদহ ও দার্জিলিং জেলাকে যথাক্রমে প্রায় ২৬ ও ১৭ লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়। এখানেই শেষ নয়, ১ অগস্ট রাজ্যের ১৫টি জেলায় ১০০ দিনের কাজ, আবাস যোজনা, সড়ক যোজনার কাজ পরিদর্শন করবে গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। অগস্ট মাস জুড়েই এই পরিদর্শন চলবে বলে খবর। বিগত প্রায় ছ’মাস ধরেই এই চাপান-উতোর চলছে। বকেয়া মজুরি না পেয়ে একদিকে যেমন খাদ্যসুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গিয়েছে, অন্যদিকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন মজুরি ও কাজ না পাওয়া নারেগা শ্রমিকেরা। বেড়ে গিয়েছে ভিনরাজ্যে কাজের খোঁজে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও। এমনই তথ্য উঠে এসেছে নারেগা সংঘর্ষ মোর্চা-র উদ্যোগে গঠিত এক তথ্যানুসন্দ্ধানী দলের সমীক্ষায়। ২৫-২৭ জুলাই পুরুলিয়া, নদিয়া ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় এই সমীক্ষা হয়।

 

নদিয়ার এক ভুক্তভোগী শ্রমিক জানিয়েছেন, তাঁর ছেলে দশম শ্রেণিতে প্রথম বিভাগে পাশ করার পরেও সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হয়ে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিয়েছে। একটি গ্রামের মহিলাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এখন বাধ্য হচ্ছেন প্রায় ৫০-৬০ কিলোমিটার দূরের গ্রামে কাজে যেতে। তাঁরা জানিয়েছেন, ১০০ দিনের প্রকল্প চালু থাকাকালীন তাঁরা কখনও বাইরে কাজে যাননি। এখন ভোররাতে উঠে বাড়ির কাজ সেরে কাজে বেরোচ্ছেন। সারাদিনে একবার খাওয়া পান্তাভাত। বিকেল-সন্ধেয় ফিরে ফের সংসার সামলানো। কোনও কোনও বাড়িতে একজন অভিভাবকের কাছে শিশুদের রেখে বাড়ির সব মহিলা কাজে বেরিয়ে পড়ছেন এমনও ঘটছে। বিশেষ করে প্রভাব পড়েছে খাওয়াদাওয়ার উপরে। মাছ, মাংস, ডিম তো অনেক দূরের কথা নিত্যদিনের পুষ্টিকর খাবারটুকু জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা। বহু পরিবার আধপেটা খেয়ে বা অভুক্ত অবস্থায় দিন গুজরান করতে বাধ্য হচ্ছেন। কোভিড লকডাউনের সময়ে রেশন থেকে পাওয়া চাল জমিয়ে অত্যন্ত কষ্ট করে সংসার চালাতে হয়েছে সকলকেই। এখন চাষের মরশুমে দৈনিক মজুরিতে কাজ করছেন কেউ কেউ, এই মরশুম শেষ হলে সংসার চলবে কীভাবে তা ভেবেই দুশ্চিন্তার ভাঁজ অধিকাংশের কপালে। আদিবাসী গ্রামগুলিতে অনেকেই কাছাকাছি ইটভাটায় ফুরনে কাজ করতে গিয়েছেন। হতদরিদ্র পরিবারগুলিতে বাড়ির শিশুদের জন্য বরাদ্দ কালেভদ্রে মিড-ডে মিল-এর রেশনে ভাগ বসাচ্ছেন অভিভাবকরা এমন খবরও পাওয়া গেল। রাগত স্বরে অনেকেই প্রশ্ন তুললেন, “এই যে লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা আসছে কোথা থেকে? এদিকে আমরা ন্যায্য মজুরি পাচ্ছি না।” টাকার অভাবে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন বেশিরভাগই। ব্যাঙ্ক ছাড়াও গ্রামের মধ্যে মহাজনের থেকেও ঋণ নিতে হচ্ছে, তেমনি এই সুযোগে ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থাগুলি আরও বেশি করে ব্যবসা বাড়াচ্ছে। তাদের টাকা মেটাতে হয় প্রতি সপ্তাহে, এখন টাকার অভাবে অনেক সময়েই সমস্যায় পড়ছেন। ফলে সংস্থার ঋণ উদ্ধারকারীদের হাতে হামেশাই অপদস্থ হতে হচ্ছে তাঁদের।

 

অভিযোগ উঠেছে দুর্নীতিরও। নদিয়া জেলায় নির্দিষ্টভাবে এই অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, সারা জেলায় সরকারি রেট যে ২২৩ টাকা, সেই রেট-এ কেউই কখনও মজুরি পাননি। একটি গ্রামে জানা গেল মোট ৩০০ জনের জবকার্ড রয়েছে, ১৫০ জন কাজ পেয়েছেন, বাকিরা পাননি। ছ’মাস টাকা না পাওয়ার কারণ তাদের ব্যাখ্যা করা হয়নি, বরং বলা হয়েছে বাকি ১৫০ জন কাজ পেলে সবাই একসঙ্গে টাকা পাবেন। নদিয়ারই আরেক গ্রামে শোনা গেল গত পাঁচ বছরে সেই গ্রামে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে কোনও কাজই হয়নি। অথচ গত দু’মাস আগে পঞ্চায়েত প্রধান এসে তাঁদের কাজ দেন এবং বলেন মজুরি এখন না পেলেও তাঁরা টাকা পাবেন। এভাবেই এই প্রকল্পের বর্তমান জটিলতা বিষয়ে গ্রামবাসীদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে বিনা মজুরিতে তাদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছে কোনও কোনও পঞ্চায়েত। কেন্দ্র-রাজ্য টানাপোড়েনে নতুন কাজ শুরু হওয়া, বকেয়া টাকা মেটা সবটাই যে এখন বিশ বাঁও জলে তা জানেন না অনেকেই।

 

বাস্তবিকই জবকার্ড ও মাস্টাররোল নিয়ে যারপরনাই অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। কাজে যোগ দেওয়ার সময় থেকে, কাজ পাওয়া, মজুরি সংক্রান্ত বিষয় সবেতেই অভিযোগের আঙুল উঠছে স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত ও প্রশাসনের উপরে। পঞ্চায়েত প্রধান ও দলীয় ঘনিষ্ঠতার কারণে ১০০ দিনের কাজের সুপারভাইজারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতিতে যুক্ত হয়ে যাওয়ার অভিযোগই উঠে আসছে সবচেয়ে বেশি। তার মধ্যে অন্যতম হল, জবকার্ড রয়েছে এমন যোগ্য প্রার্থীদের কাজ না দেওয়া। তিনটি জেলার সমীক্ষাকৃত প্রায় প্রতিটি গ্রামেই মানুষদের একটা বড় অংশ জানিয়েছেন, তাঁদের জবকার্ড সুপারভাইজারদের কাছেই রাখা থাকে এবং তাঁরা কখনওই মাস্টাররোল দেখার সুযোগ পান না। আরও যে অভিযোগগুলি উঠছে তার মধ্যে অন্যতম হল – সুপারভাইজাররা মাস্টাররোল না দেখিয়ে শ্রমদিবসের সংখ্যায় কারচুপি করছেন। জবকার্ড নিজেদের কাছে রেখে দিয়ে যোগ্য শ্রমিকদের কাজ না দিয়ে হয় যাঁদের কাজ পাওয়ার কথা নয় তাঁদের কাজে ঢোকাচ্ছেন অথবা ঐ জবকার্ড দেখিয়ে কোনও কাজ না করিয়েই টাকা তুলে নিচ্ছেন। আর যাঁর জবকার্ড তাঁকে কিছু টাকা ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখন কাজের দিনে দু’বেলা শ্রমিকদের ছবি তুলে ‘আপডেট’ করার নিয়ম হয়েছে। সেক্ষেত্রে কাজ না করিয়ে ডেকে এনে শুধু ছবি তুলে রাখা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। কাজ না করানোর ফলে কাজ করতে আগ্রহী অদক্ষ শ্রমিকেরা কাজ হারাচ্ছেন, তাদের কর্মক্ষমতা ও উৎসাহ নষ্ট হচ্ছে। নিজেদের প্রাপ্য মজুরির অধিকার ছেড়ে দিয়ে সামান্য টাকা পেতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ। অভিযোগ, একটি পরিবারে একাধিক ব্যক্তির জবকার্ড থাকলেও কাজের সুযোগ সকলে পাচ্ছেন না। বরং যারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল তাঁরাও জবকার্ড তৈরি করে কাজ পাচ্ছেন। নিজেদের মজুরি থেকে সুপারভাইজারদের কিছু অংশ দেওয়ার ফলে তাঁরা কাজ হারাচ্ছেন না, তাছাড়া তাঁরা পঞ্চায়েত প্রধান ও সদস্যদের ঘনিষ্ঠ বলেও অভিযোগ রয়েছে। দরিদ্র গ্রামবাসীদের দাবি, অবস্থাপন্নদের জবকার্ড না দেওয়ার বিষয়টিও প্রশাসন দেখলে তাঁদের উপকার হয়। এই প্রকল্পে নির্দিষ্ট কাজ শেষ হওয়ার পর সুনির্দিষ্ট তথ্য-সহ যে বোর্ড লাগানোর কথা অনেক গ্রামে তা চোখে পড়েনি, অনেক ক্ষেত্রে সেই বোর্ডে প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকাও নজর এড়ায় না।

 

প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় দরিদ্রদের বাড়ি তৈরি করার জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়। এর মধ্যে বাড়ি তৈরি করতে দেওয়া মজুরি বাবদ ১৫০০০ টাকা ধরা হয়ে থাকে। এবং এই বাড়ি তৈরির কাজটি ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে পড়ে। তাছাড়া হাঁস, মুরগি, শুয়োর রাখার জন্য ঘর তৈরির কাজও এর আওতায় পড়ে। এ রাজ্যে এই আবাস যোজনার সুবিধা পেতে নাম নথিভুক্তিকরণের ক্ষেত্রেও পঞ্চায়েত স্তরে দলীয় সমর্থকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে মোটামুটি সব গ্রামেই অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার নাম বদলে “বাংলা আবাস যোজনা’ করা নিয়ে বিতর্কের জেরে এই খাতেও টাকা আটকে দিয়েছে কেন্দ্র। আবাস যোজনাও এখন কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দলের তদন্তের আওতায়। আরেক দুর্নীতির অভিযোগ হল মাটি কাটার বা পুকুর খোঁড়ার কাজে ‘এক্সকাভেটর’ বা ‘জেসিবি’ মেশিনের ব্যবহার। অভিযোগ, মেশিন দিয়ে মাটি খুঁড়ে পরে কিছু উপভোক্তার নামে মাস্টাররোল তৈরি করা হয়। টাকা নয়ছয় করার এই অশুভ চক্র কমবেশি সর্বত্রই সক্রিয়।

 

পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে এমজিএনআরইজিই-তে নথিভুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা ৩.২ কোটি। ১০০ দিনের কাজের দৈনিক মজুরি ২২৩ টাকা। কিন্তু, গত ছ’মাস ধরে এ রাজ্যে বন্ধ রয়েছে নারেগা প্রকল্পের সমস্ত কাজ। এবং বকেয়া মজুরি পাননি কোনও শ্রমিক। কেন্দ্র থেকে বারে বারেই পর্যবেক্ষক দল আসছে এবং কেন্দ্র-রাজ্য তরজার কুফল ভোগ করছেন গ্রাম বাংলার দরিদ্র শ্রমিকেরা। চূড়ান্ত অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দিয়ে দিন গুজরান করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। বকেয়া মজুরি না পাওয়ার প্রভাব পড়েছে দৈনন্দিন খাবার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রোজকার জীবনযাত্রায়। অথচ,আইন অনুযায়ী মাস্টাররোল বন্ধ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে শ্রমিকদের মোট মজুরি হিসাব করে মিটিয়ে দিতে হবে। যদি বকেয়া মজুরি মেটাতে দেরি হয় তা হলে মাস্টাররোল বন্ধ হওয়ার ১৬ দিন পর থেকেই ০.০৫% হারে প্রতিদিনের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নিদান রয়েছে। এছাড়া আইনে রয়েছে, অদক্ষ শ্রমিকেরা কাজের দাবি জানান বা না জানান সক্রিয় জবকার্ড থাকা শ্রমিকেরা বেকার ভাতার সুবিধা পেতে পারেন। মাস্টার রোল হল শ্রমিকদের ‘অ্যাটেন্ডান্স রেজিস্টার’। এই মাস্টাররোলের উপর ভিত্তি করেই প্রোগ্রাম অফিসার-এর থেকে প্রাপ্য মজুরি হিসেব করেন। আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের জবকার্ড সব সময়েই তাঁদের কাছে থাকবে এবং মাস্টাররোলও সুপারভাইজার তাঁদের দেখাতে বাধ্য থাকবেন। উল্লেখ করা যেতে পারে, এখন পশ্চিমবঙ্গের ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে বকেয়া মজুরির পরিমাণ প্রায় ২৬০০ কোটি টাকা। রাজ্য সরকারের দাবি, ২০২১-২২ অর্থবর্ষে এ রাজ্যে ১.১ কোটি মানুষ এই প্রকল্পে কাজ পেয়েছেন। এবং ৩৬.৪ কোটি শ্রমদিবস তৈরি করে রাজ্য দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে। যদিও বরাদ্দ অর্থের সঠিক হিসাব না মেলায় ও কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতার অভিযোগে ২০২২-২৩-এ এই প্রকল্পের জন্য যে বাজেট রাজ্য পেশ করেছিল তাও নামঞ্জুর করে দিয়েছে কেন্দ্র।

 

রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছে বকেয়া টাকা মেটানোর দাবি জানাচ্ছে, কিন্তু ন্যায্য কাজ কেন হচ্ছে না, কেন স্থানীয় স্তরে দুর্নীতি রোখা যাচ্ছে না সে বিষয়ে নীরব। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্রামবাসীদের দাবি, তাঁদের কথা, বকেয়া মজুরি মেটানোর আর্জি পঞ্চায়েত বা জেলাস্তরের আধিকারিকদের কাছে পৌঁছায় না। ক্ষমতাশালী স্থানীয় দলীয় নেতারাই সবটা নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। পঞ্চায়েত সদস্যরা গত ছ’মাস যাবত তাঁদের শুধু শুকনো আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন এবং কেন্দ্র টাকা দিচ্ছে না এমনটা বলছেন। কী কারণে রাজ্য সরকার নির্দিষ্ট অর্থ পাচ্ছে না, তা গ্রামবাসীদের কাছে আদৌ স্পষ্ট নয়। অল ইন্ডিয়া এগ্রিকালচারাল ওয়ার্কাস ইউনিয়ন-এর এক সদস্য যেমন বললেন, এমজিএনআরইজিএ-তে ঠিকভাবে কাজ হচ্ছে কি না, টাকাপয়সার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় থাকছে কি না তা দেখার জন্য একটি কমিটি তৈরি করা প্রয়োজন। যেখানে জবকার্ড নিয়ে প্রকল্পে নথিভুক্ত অদক্ষ শ্রমিকেরা, সামাজিক কর্মীরা, পঞ্চায়েত স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, প্রশাসনিক আধিকারিকেরা থাকবেন। এই মুহূর্তে যে দাবিগুলো নিয়ে জোরদার আন্দোলন হওয়া উচিত তার মধ্যে থাকা দরকার – বকেয়া মজুরি মেটানো, কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য ও যোগ্য দাবিদারকে কাজ না দেওয়া, কাজের দাবি তুলে প্রকল্পের কাজ না আনা ইত্যাদি। পয়লা আগস্ট দেশের ৫০০টি রাজ্যে এমজিএনআরইজিএ-এর সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক, আন্দোলনকারীরা, ইউনিয়ন, সিএসও-র প্রতিনিধিরা জেলাশাসকের কাছে তাদের ‘চার্টার অফ ডিমান্ড’ পেশ করবেন। তাছাড়া বকেয়া মজুরি মেটানোর দাবিতে লাগাতার আন্দোলন চলবে।

 

রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের এমজিএনআরইজিএ বিভাগের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক জানান, তারা দ্রুত এই বিষয়টির মীমাংসা করার চেষ্টা করছেন। যাতে বকেয়া টাকা মেটার পাশাপাশি ১০০ দিনের কাজও দ্রুত শুরু করা সম্ভব হয়। রাজ্যের অন্যান্য চালু প্রকল্পে ১০০ দিনের প্রকল্পে নথিভুক্ত শ্রমিকদের সাময়িকভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ করা হয়েছে বলেও তিনি জানালেন। ১০০ দিনের কাজের সঙ্গে তা তুলনীয় নয়।

 

তথ্যানুসন্ধান দলের তরফ থেকে যে দাবিগুলি জানানো হয়েছে তার মধ্যে মুখ্য হল কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক দোষারোপ, রাজ্যে পঞ্চায়েত ও স্থানীয় স্তরে দুর্নীতি ইত্যাদি পেরিয়ে নারেগার কাজে শ্রমিকদের ২৬০০ কোটি টাকার বকেয়া মজুরি মেটাতে হবে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে যা কিছু তথ্য বিনিময় হচ্ছে, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী দল যে রিপোর্ট তৈরি করছে তা সাধারণের অবগতির জন্য প্রকাশ করতে হবে। বিলম্ব না করে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের পেশ করা ১০০ দিনের কাজের বাজেট মঞ্জুর করুক যাতে এই প্রকল্পে কাজ শুরু হয়। আগে থেকে মঞ্জুর হওয়া ও চলতি কাজগুলি কর্মসংস্থান চালু রাখার জন্য দ্রুত শুরু হোক। তাছাড়া পরিবেশ ও জীবন-জীবিকার জন্য নদীবাঁধ তৈরি, সেচের খাল তৈরির কাজ গুরুত্বপূর্ণও বটে। ‘সোশ্যাল অডিট’ বিষয়টিকে সম্পূর্ণভাবে আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে কোনও অনিয়ম ও অসঙ্গতি দেখা না দেয়। যে পরিমাণ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তাতে নির্দিষ্ট সময় অন্তর সোশ্যাল অডিট ছাড়াও মধ্যবর্তী অডিটও করা প্রয়োজন। যে সব ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই দুর্নীতির অভিযোগ চিহ্নিত হয়েছে এবং ধরা পড়েছে সে সব ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারকে দ্রুত কড়া পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি, রাজ্য সরকারকে কমপক্ষে ৩৫০০ কোটি টাকার একটি তহবিল তৈরি করতে হবে যা ভবিষ্যতে কেন্দ্রের কাছ থেকে বরাদ্দ অর্থ পেতে দেরি বা অন্য কোনও জটিলতা দেখা দিলে এই তহবিল থেকে শ্রমিকদের মজুরি মেটাতে ব্যবহার করা যাবে। এবং আবেদন করুক বা না করুক রাজ্য সরকারকে ২০২২ সালের ১ এপ্রিল থেকে সমস্ত শ্রমিককে বেকার ভাতা দিতে হবে।

 

লেখক নারেগা তথ্যানুসন্ধানী দলের অন্যতম সদস্য।

 

ছবি: নরেগা সংঘর্ষ মোর্চার তথ্যানুসন্ধানী দলের সঙ্গে কথা বলছেন নদিয়ার এক গ্রামের একশ দিনের প্রকল্পে মজুরি বকেয়া থাকা মহিলা শ্রমিকরা।

 

 

Share this
Leave a Comment