বনাধিকার আইন ও পশ্চিমবঙ্গ : সরকার যা করছেন


  • December 17, 2021
  • (0 Comments)
  • 559 Views

বনাধিকার আইন, ২০০৬ ইচ্ছেমাফিক বনগ্রামবাসীদের উচ্ছেদে করার ঔপনিবেশিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। বনগ্রামবাসীরা গ্রাম ছাড়বেন কিনা, ছাড়লে কোন শর্তে ছাড়বেন তা স্থির করবে বনবাসীদের গ্রামসভা। এটাই আইন। কিন্তু, এ তো আইনের কথা। বাস্তবে কী ঘটছে?

 ১৮ ডিসেম্বর। বনাধিকার আইন দিবস। ২০০৬ সালেই এই দিন সংসদে এই ঐতিহাসিক বনাধিকার আইন পাশ হয়েছিল। ই আইন রূপায়ণে রাজ্য সরকারের ভূমিকা বিষয়ে লিখছেন সৌমিত্র ঘোষ 

 

গ্রামসভা না গ্রামসংসদ? বেআইনি সরকারি তৎপরতা উত্তরে প্রতিরোধ

 

মোটামুটি ২০০৮-এর মার্চ থেকে প্রায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় পশ্চিমবঙ্গে বনাধিকার আইন রূপায়ণের সরকারি উদ্যোগ শুর হয়। কোনোরকম পূর্ব ঘোষণা বা প্রস্তুতি ছাড়াই, সরকারি আধিকারিকরা দল বেঁধে বিভিন্ন গ্রামে ঢুকতে থাকেন, এবং গ্রামবাসীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, চটজলদি গ্রাম-সংসদ অনুযায়ী বনাধিকার কমিটি তৈরি হতে থাকে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ২০০৮-এর মার্চে পাঠানো দুটি আদেশনামা অনুসারে, এই কাজ করা হয়। যেখানে যেখানে গ্রামবাসীরা আইনটি সম্বন্ধে অবহিত ছিলেন, যেমন উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং জেলার প্রায় সর্বত্র, সেখানে সেখানেই তাঁদের তরফ থেকে এর তীব্র প্রতিবাদ করা হয়। গ্রামবাসীদের বক্তব্য ছিল, যেহেতু আইনের ২নং ধারায় বনগ্রাম (টঙিয়া, এফডি হোল্ডিং-সহ বনভূমিতে স্থিত সব ধরণের গ্রাম) ‘গ্রাম’ হিসাবে গণ্য, প্রত্যেক পৃথক গ্রামের জন্য আলাদা গ্রামসভা ও আলাদা বনাধিকার কমিটি করা দরকার। তাঁরা যথাযথভাবেই দেখান, যেহেতু আইন রূপায়ণের ক্ষেত্রে গ্রামসভাই মূল প্রতিষ্ঠান, গ্রামসভাগুলি খুব বড় হলে, বা বিভিন্ন আলাদা গ্রাম নিয়ে তৈরি হলে, বনাধিকার কমিটি কাজ করতে পারবে না, গ্রামসভার বৈঠক করাও অসম্ভব হয়ে পড়বে। আইন রূপায়ণে সহসা অতি-উদ্যোগী হয়ে ওঠা প্রশাসন এ সব যুক্তির কথায় কান দিতে রাজি ছিল না। ফলত, উত্তরবঙ্গের প্রায় সর্বত্র (বক্সা বাঘ এলাকা এবং জলপাইগুড়ি বনাঞ্চলের কিছু এলাকা ছেড়ে) গ্রামবাসীরা নিজেদের উদ্যোগে গ্রাম-ভিত্তিক বনাধিকার কমিটি গঠন করেন। যেখানে যেখানে সরকারি আধিকারিকরা নেহাতই জোর করে কমিটি বানিয়েছিলেন, গ্রামসভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে সেগুলি ভেঙে দেন মানুষ। পুরো ২০০৮ এবং ২০০৯-এর মাঝামাঝি, সংসদীয় নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়া তক, নানান রকম সরকারি জোরজবরদস্তি তবু চলতেই থাকে।

 

দক্ষিণে সরকারি গা-জোয়ারি

দক্ষিণবঙ্গের জঙ্গলমহল-সহ অন্যান্য জেলায় বনাধিকার আইন বিষয়ে সচেতন গণ-উদ্যোগ বিশেষ ছিল না। এর ফলে অবাধ সরকারি যথেচ্ছাচার চলতে থাকে, কোথাওই আইনটির বিভিন্ন ধারা সম্পর্কে মানুষকে জানানো হয় না। গ্রাম-সংসদ এবং গ্রাম-উন্নয়ন সমিতির দোহাই দিয়ে বনাধিকার আইন ২০০৬ অনুযায়ী আলাদা করে গ্রামসভা বা বনাধিকার কমিটি গঠনের বিষয়টিকে প্রায় সর্বত্রই অগ্রাহ্য করা হয়, গ্রাম সংসদই হয়ে ওঠে গ্রামসভা, গ্রাম-উন্নয়ন কমিটি বনাধিকার কমিটি।

 

সুন্দরবনের বিপুল সংখ্যক বন-নির্ভর মানুষকে আইনের আওতাতেই আনা হয় না। বন্যপ্রানী বাঁচানোর নামে সেখানে বনবিভাগের একচ্ছত্র শাসন আগের মতোই বলবৎ থাকে।

 

বনাধিকার কমিটিতে সরকারি প্রতিনিধি?

আইনানুযায়ী, একটি গ্রামের সকল প্রাপ্ত বয়স্কদের নিয়ে গ্রামসভা গঠন করে গ্রামসভার মাধ্যমে ১৫ জনের বনাধিকার কমিটি গঠন করার কথা। কী উত্তরবঙ্গে কী দক্ষিনবঙ্গে বাস্তবে ৬-৭ টা বা তার বেশি গ্রাম নিয়েও এক-একটি সরকারি, গ্রাম-সংসদ স্তরের বনাধিকার কমিটি গঠন করা হয়েছে। আইনে আছে বনাধিকার কমিটির সদস্য সংখ্যা সর্বোচ্চ ১৫ জন। কিন্তু জলপাইগুড়ি-সহ বিভিন্ন বনাঞ্চলে ১৫ জনের বদলে ১৯ জনকে নিয়ে বনাধিকার কমিটি গঠিত হয়, যার মধ্যে আবার ৪ (চার) জন সরকারি কর্মচারী! বনাধিকার কমিটিতে গ্রামের বাইরের কোনো লোক থাকতে পারেন না কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাইরের থেকে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঢোকানোর চেষ্টা চলে।

 

বনবিভাগের কর্তালি

আইনে বলা হয়েছে গ্রামসভা বনাধিকার কমিটির সাহায্যে গ্রামের সদস্যদের থেকে দাবিপত্র সংগ্রহ করে মহকুমা স্তরের কমিটির কাছে সরাসরি জমা দেবে, কিন্তু সরকারি পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলা হয় দাবিপত্র সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের রেঞ্জ অফিসার বা বিডিও-র কাছে জমা দিতে হবে এবং  তা রেঞ্জ অফিসারের দ্বারা অনুমোদিত হতে হবে। বেশির ভাগ জায়গায়, গোটা সরকারি প্রক্রিয়াটিই বনবিভাগের কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। ফলত, নিতান্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে, কোনো গোষ্ঠীগত বনাধিকারের কথা গ্রামের লোকদের জানানো হয় না। স্রেফ পাট্টা দেবার কথা বলা হতে থাকে। এমনকি, দক্ষিনবঙ্গের বহু এলাকায় গোষ্ঠী-অধিকারের দাবিপত্র বিলি করাই হয় না।

 

দাবিপত্র জমা দেবার শেষ দিন?

আইনের কোনো ধারাতেই বনাধিকারের দাবিপত্র (Claim Form) জমা দেবার কোনো নির্দিষ্ট দিন বা তারিখ দেওয়া নেই। গ্রামসভাকে এই বিষয়ে সম্পূর্ণ অধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন সরকারি আধিকারিকরা এবং রাজনৈতিক দলের নেতারা গ্রামে গিয়ে ‘নির্দিষ্ট দিন’ বলে যেতে থাকেন এবং সেই দিনের মধ্যে দাবিপত্র জমা না দিলে তা আর গ্রহণ করা হবে না বলে গ্রামবাসীদেরকে ভয় দেখান। এইভাবে, বনাধিকার আইনের বিষয়টিকে একটি মাথাভারী প্রশাসনিক-রাজনৈতিক উদ্যোগে পরিণত করার অপচেষ্টা চলে, এবং এক্ষেত্রে গ্রামসভার প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্বকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়। রূপায়ণের নামে আইনটিকে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে অগ্রাহ্য করতে থাকেন সরকার।

 

পাট্টা দিচ্ছে কে? গ্রামসভা কোথায়?

বনাধিকার আইনের নিয়মাবলীর ধারা ১১ ও ১২ অনু্যায়ী গ্রামসভা যতক্ষণ না আনুষ্ঠানিকভাবে সমস্ত জমা-পড়া দাবিগুলিকে খুঁটিয়ে দেখবে, এবং এর পরে গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের লিখিত সম্মতি-সহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব মহকুমা স্তরের কমিটিকে জমা না দেবে, এই দাবিগুলি সরকারি বিচার-বিবেচনার স্তরেই আসবে না। যে যে ক্ষেত্রে তথাকথিত ‘পাট্টা’ দেওয়া হচ্ছে এবং যে যে জায়গায় নানারকম ভয় দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে দাবিপত্র জমা করানো হয়েছে (উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি, বক্সা ও কার্শিয়াং বনাঞ্চলে), কোথাও-ই গ্রামসভা আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব জমা দেয়নি। সেক্ষেত্রে ‘পাট্টা’ দেওয়া হয় কী করে?

 

বনাধিকার আইনের বিরুদ্ধে সরকার: পিছনের দরজা দিয়ে যৌথ বন-পরিচালনা বা জেএফএম

বনাধিকার আইনের নিয়মাবলির ৪-এর ১ নং ধারার ‘ঙ’ উপধারায় বলা হয়েছে যে আইনের ৫ নং ধারা অনু্যায়ী দায়িত্ব পালনের জন্য প্রত্যেক গ্রামসভা বিভিন্ন বন-পরিচালন কমিটি তৈরি করবে। এই কমিটিগুলি বন, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র রক্ষায় গ্রামসভার হয়ে সবধরনের বনপরিচালনার কাজ করবে। ধারা ৫-এ দেওয়া এই ক্ষমতা এবং ধারা ৩-এ দেওয়া সমস্ত অধিকারকে (জ্বালানি কাঠ-সহ যাবতীয় উদ্ভিদজাত এনটিএফপি-র মালিকানা, পশুচারণ ও মাছ ধরবার অধিকার, বনগ্রামকে রাজস্বগ্রামে পরিণত করবার অধিকার এবং এ ছাড়াও অন্যান্য পারম্পরিক অধিকার) প্রায় নস্যাৎ করে ২০০৮-এর ডিসেম্বর মাসে রাজ্য সরকার এক নয়া যৌথ বন পরিচালন নীতি (জেএফএম) ঘোষণা করেছেন। এই নীতি অনুযায়ী, বন থেকে সম্পদ সংগ্রহ বা বনের যে কোনো রকম ব্যবহার নির্ভর করবে বনদপ্তরের ইচ্ছার উপর, তাঁদের তত্ত্বাবধানে যৌথ বন কমিটি বা জেএফএমসি (আগে বলা হতো বন সুরক্ষা কমিটি বা এফপিসি) তৈরি হবে এবং ‘ভাল কাজ’ করলে বনদপ্তর কমিটিদের এলাকার কাঠ বিক্রির লভ্যাংশ থেকে শতকরা ১৫-২৫ ভাগ (উত্তরে ১৫) পর্যন্ত দেবেন। অন্যান্য বনসম্পদেও বনদপ্তরের ইচ্ছাসাপেক্ষে কমিটির সদস্যদের কিছু কিছু অধিকার থাকবে।

 

কেন্দ্রীয় সরকার, বিশ্ব ব্যাংক ইত্যাদির টাকায় এই রাজ্যে গত প্রায় কুড়ি বছর ধরে এই তথাকথিত যৌথ বন-পরিচালন চলেছে। এই ব্যবস্থার আঁতুড়ঘর দক্ষিণবঙ্গের শালজঙ্গলেই এখন প্রক্রিয়াটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। উত্তরবঙ্গে বিষয়টি সেভাবে চালুই হয়নি। নিতান্ত এলোমেলোভাবে এদিক ওদিক কিছু বনরক্ষা কমিটি কী ইকো-ডেভেলপমেন্ট কমিটি (বন্যপ্রাণীর জন্য সংরক্ষিত অঞ্চলে লোকের জঙ্গলে ঢোকা বারণ ছিল, অতএব তাঁদের অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধির জন্য বনবিভাগ ‘প্রকল্প’ দিতেন) তৈরি হয়েছিল মূলত গ্রামের কিছু ক্ষমতাশালী মাতব্বরদের নিয়ে। সাধারণ গ্রামবাসীদের এ ব্যাপারে কোনো ভূমিকাই থাকত না। এই কমিটির সভা ডাকতেন সংশ্লিষ্ট বিট অফিসার, যিনি কিনা কমিটির সম্পাদকও বটে। আদ্যন্ত অগণতান্ত্রিক এই প্রক্রিয়াটিকে বনদপ্তর আপাতত জেএফএমসি বা জয়েন্ট ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট কমিটি বা যৌথ বন পরিচালন কমিটি-র নামে গ্রামসভার উপর চাপানোর চেষ্টা করছে। উত্তরবঙ্গের বনবস্তির মানুষদের ভয় দেখানো হচ্ছে, জেএফএমসি তৈরি না হলে কেন্দ্রীয় সরকার প্রদত্ত আদিবাসী উন্নয়নের টাকা ফেরৎ যাবে। এমনকি চিলাপাতা এলাকায় একাধিক গ্রামের ক্ষেত্রে গ্রামোন্নয়নের টাকা নিতান্ত গায়ের জোরে আটকে রেখেছে বনদপ্তর। বলা হচ্ছে জঙ্গলে গাছ কাটতে (বা ক্লিয়ার ফেলিং) না দিলে, টাকা ছাড়া হবে না।

 

বনাধিকার আইন বা দেশের কোনো আইনেই যৌথ বন পরিচালনার কথা বলা নেই। এছাড়া যেহেতু বনাধিকার আইনে অরণ্য পরিচালনার সুস্পষ্ট এবং নির্দিষ্ট ক্ষমতা গ্রামসভাকে দেওয়া হয়েছে, এর বিরোধিতা করার কোনো আইনি অধিকার বনদপ্তরের থাকতে পারে না। ১৯২৭-এর ঔপনিবেশিক ভারতীয় বন-আইন, ১৯৭২ / ২০০২ / ২০০৬-এর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন এবং অংশত বন সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী বন পরিচালনার যে সর্বময় কর্তৃত্ব বনদপ্তরের ছিল, বনাধিকার আইন — পরবর্তী সময়ে তা চূড়ান্তভাবেই খণ্ডিত। যত বেশি সংখ্যক মানুষ তাঁদের অধিকারের কথা জানবেন-বুঝবেন তত ক্ষমতাবান হয়ে উঠবে গ্রামসভাগুলি, যত বেশি সাইনবোর্ড অরণ্য এলাকায় লাগানো হবে, ততই কমতে থাকবে বনের উপর বনদপ্তরের অধিকার।

 

কার জঙ্গল?  কার ক্ষমতা?

আসল বিভ্রান্তিটা এইখানেই। মানুষ ক্ষমতাবান হয়ে উঠুক তা প্রায় কেউই চান না, কী বড় রাজনৈতিক দল, কী সরকারি আমলা। সুতরাং, বনাধিকার আইনের মতো একটি বৈপ্লবিক এবং ঐতিহাসিক আইনকে ‘পাট্টা’ দেবার প্রহসনে পর্যবসিত করা হয়। বনবাসী মানুষের ‘অজ্ঞানতা’কে ধ্রুব ভেবে, ও এ বিষয়ে শহুরে মধ্যশ্রেণির প্রায়-সহজাত উপেক্ষাকে সম্বল করে, নেতা-মন্ত্রী-আমলারা যথেচ্ছ মিথ্যা বলে যেতে থাকেন। অন্যদিকে বন বাঁচানোর নামে কী মাওবাদী দমনের নিরাপত্তাজনিত কারণে জঙ্গলে সরকারি গুলিগোলা চলতেই থাকে, প্রতি বছর নিয়ম করে সেই গুলিতে মরে যেতে, পঙ্গু হয়ে যেতে থাকেন অরণ্যের আসল মালিক, বনবাসী আদিবাসীরা। অন্যত্র অরণ্য ভরে উঠতে থাকে বড় মানুষের পর্যটনে, পর্যটকদের গাড়ির ধোঁয়ায় আর তাঁদের ফেলে যাওয়া অফুরন্ত প্লাস্টিকে

 

কে বিভ্রান্তি ছড়ায়?  জঙ্গল আসলে কার?

দক্ষিণবঙ্গের আদিবাসীরা আর সুন্দরবনের মৎস্যজীবী, মধু-সংগ্রাহকেরা পুরুষানুক্রমে যে অরণ্য ব্যবহার করে এসেছেন, যে অরণ্যে তাঁদের ঐতিহাসিক অধিকার, ইংরেজ শাসককূল ও স্বাধীন ভারতের শাসকেরা সেই অরণ্য কেড়ে নেয়। ইংরেজরা যখন দক্ষিণের জঙ্গলমহল চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমিদারদের দিয়ে দেয়, জঙ্গল হাসিল করে প্রজা বসানো হতে থাকে। কিছু কিছু বনখণ্ড যা জঙ্গল হিসাবেই থেকে যায়, তাতে ওই এলাকার প্রজাদের এবং অন্যান্য গ্রামবাসীদের বিভিন্ন লিখিত-অলিখিত অধিকার ছিল। এ সত্ত্বেও, ব্রিটিশ শাসনের দুশো বছরের মধ্যে, জঙ্গলমহলে অরণ্যের অধিকার নিয়ে একের পর এক আদিবাসী বিদ্রোহ হয়েছে, যা ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতার যুদ্ধের সঙ্গে মিশে যায়। এই বিদ্রোহগুলির গৌরবময় ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে, অরণ্যে আদিবাসী-অরণ্যবাসী মানুষের সমস্ত অধিকারকে অগ্রাহ্য করে, স্বাধীন ভারতের বনবিভাগ জমিদারি জঙ্গলগুলিকে দখল করে। যে কাজ ইংরেজ বনকর্তারা একশো বছর ধরে (১৮৬৫-তে বনবিভাগ তৈরির পর থেকেই এই নিয়ে ভাবনাচিন্তা হয়) করার সাহস পাননি, যাবতীয় আইন-কানুনকে কলা দেখিয়ে, সেই কাজ অনায়াস নির্লজ্জতা নিয়ে করে ফেলেন ‘ভারতীয়’ বন-আমলারা। যে বনে সরকারের কোনো আইনি অধিকার নেই, সেই বন বিনা বাধায় ‘সরকারি’ হয়ে যায়।

 

বনাধিকার আইন ২০০৬ জঙ্গলমহলের মানুষের সামনে এক সু্যোগ এনে দিয়েছে, অরণ্যের অধিকারের দাবীতে এক নতুন লড়াই শুরু করার।

 

বনাধিকার আইন অনু্যায়ী, সুন্দরবনের মানুষও তাঁদের ন্যায্য অধিকারের দাবি ওঠাতে পারেন। আইন বলছে, যাঁরা জীবিকা বা অন্য প্রয়োজনে বনে যেতে বাধ্য হন, তাঁরাই বনবাসী। সুন্দরবনের ভিতরে মানুষ নেই বলে বনদপ্তর যে দাবি করছে, তা সর্বৈব মিথ্যা।

 

যে মানুষেরা ঔপনিবেশিক সময় থেকে শুরু করে এই সেদিন পর্যন্ত শত শত কোটি টাকার রাজস্ব সরকারকে দিয়েছেন, রক্তজল করে, বেগার খেটে যাঁরা গাছ লাগিয়েছেন, বাঁচিয়েছেন, উত্তরবঙ্গের আদত বনবাসী, পাহাড়-সমতলের ২৩০টিরও (সরকারি হিসাবে ১৭৮) বেশি বনগ্রামের কয়েক লক্ষ বাসিন্দা এখন দিন কাটাচ্ছেন উপায়হীন দারিদ্রে। বনশ্রমিক হিসাবে একদা তাঁদের যা সুযোগসুবিধা ছিল, তার সবই এখন অমিল। কাঠ ও অন্যান্য বনসম্পদের বাণিজ্যিক উৎপাদন কমে আসা, বনক্ষেত্রে শ্রমদিবস তৈরির সুযোগ কমে যাওয়া, এবং সর্বোপরি প্রাকৃতিক বন নষ্ট হয়ে যাবার ফলে, তাঁরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। যেহেতু বাস্তু কী চাষজমির ওপর তাঁদের কোনো আইনি অধিকার এতদিন পর্যন্ত ছিল না, উন্নয়নের সাধারণ সুযোগ থেকেও তাঁরা বঞ্চিত ছিলেন। ২০০৬ নাগাদ, নেহাৎ প্রায় আলটপকাই, বনগ্রাম উন্নয়নের এক কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্প এসে না পড়া অবধি বনদপ্তর এঁদের উৎপাতই ভাবতেন। এই প্রকল্পের পর অবশ্য উন্নয়নের কাজ জায়গায় জায়গায় হচ্ছে, বনগ্রামে আসছে এনআরজিইএ প্রকল্পের ১০০ দিনের কাজও। কিন্তু এই উন্নয়ন কী কাজের সবটাই প্রায় হচ্ছে বনদপ্তর মারফৎ, এবং বনবিভাগ বনগ্রামবাসীদের উপর তাঁদের চিরাচরিত জমিদারি কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য এই ‘উন্নয়ন’কে এক মহা অস্ত্র ঠাউরেছেন। এফডিএ তহবিল নামে খরচা হওয়া এই টাকার হিসাব গ্রামের মানুষকে জানানো হচ্ছে না, এবং তথ্য জানার অধিকার আইন অনুযায়ী আবেদন করা হলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই টাকা খরচার কোনো হিসাব জানাতে প্রচুর টালবাহানা করা হচ্ছে।

 

উত্তরবঙ্গের বনগ্রামের রাভা-মেচ-গারো-ডুকপা-লিম্বু-শেরপা-রাই ইত্যাদি আরণ্যক জনগোষ্ঠীভুক্ত মানুষ, যাঁরা যথাক্রমে বিনা মজুরিতে, কম মজুরিতে এবং বনবিভাগের দয়াদাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে দিন কাটিয়েছেন, অরণ্যের অধিকারের লড়াইটা উত্তরবঙ্গে শেষত তাঁরাই লড়ছেন। বনাধিকার আইনের রূপায়ণেরই দাবিও তাঁরাই ওঠাচ্ছেন, সরকারি আধিকারিকদের আইনের বই থেকে পড়ে শোনাচ্ছেনও তাঁরা। এমন কি হতে পারে না যে প্রশাসন কী বনবিভাগ এঁদের শত্রু ভাবা বন্ধ করলেন, মেনে নিলেন অরণ্যের উপর এঁদের আইনসিদ্ধ অধিকার? বন পরিচালনার ক্ষেত্রে বনবিভাগের কর্মী-আধিকারিকরা গ্রামসভাগুলিকে সাহায্য করলেন, অন্যান্য সরকারি দপ্তরগুলি বনজ সম্পদ বিক্রির ক্ষেত্রে দিলেন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা? গাড়ি গাড়ি সৈন্য পাঠিয়ে নয়, বড় বড় কুৎসিত কংক্রিট দালান তুলে, বনে জঞ্জাল বিছিয়ে নয়। বনগ্রামগুলিতে গড়ে তোলা হল গ্রামসভা পরিচালিত পরিবেশসম্মত পর্যটন কেন্দ্র, গ্রামের উন্নয়নে কী কাজ কোথায় কীভাবে করা হবে তা গ্রামসভা বসিয়ে গণতান্ত্রিক উপায়ে ঠিক হল?

 

এসবই কি অবাস্তব, কোনোদিন হবার নয়, এমন কষ্টকল্পনা? সরকার বিষয়টা নিয়ে ভাবুন, ইত্যবসরে বনবাসীরা তাঁদের ন্যায্য লড়াইও চালাতে থাকুন। সরকার গণতন্ত্র-টন্ত্র নিয়ে বিশেষ মাথা না ঘামাতেও পারে। অরণ্যে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি বনবাসীদের কাছে অস্তিত্বের, আত্মমর্যাদার, স্বাভিমানের। তাঁদের পক্ষে এখন আর সরকারি জমিদারি চুপচাপ মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।

 

পরিশিষ্ট:  বনাধিকার আইন ও গণ-সংগঠনগুলি কী করতে পারে?        

 

কাজ ১/ গ্রামসভা গঠন

যে যে গ্রামে এখনো অবধি গ্রামসভা গঠিত হয়নি, সেই সেই গ্রামের নিজস্ব গ্রামসভা গঠন করতে হবে। বনাধিকার আইন অনুসারে তৈরি এই গ্রামসভা গ্রাম সংসদ থেকে ভিন্ন হবে, বিশেষত যখন বিভিন্ন গ্রামের সদস্যেরা জঙ্গলের আলাদা আলাদা অংশ ব্যবহার করেন। একই জঙ্গল একাধিক গ্রামসভার সদস্যেরা যে ক্ষেত্রে ব্যবহার করছেন, সেখানে প্রয়োজনমাফিক সংশ্লিষ্ট গ্রামসভাগুলির যৌথ বৈঠক ডাকতে হবে।

 

কাজ ২/ বনাধিকার কমিটি গঠন

যে যে গ্রামে এখনো বনাধিকার কমিটি নেই, সেই সেই গ্রামে প্রতি গ্রামসভা নিজস্ব বনাধিকার কমিটি তৈরি করবে। এর সঙ্গে গ্রাম উন্নয়ন সমিতি বা সরকারি আধিকারিকদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। গ্রাম সংসদ স্তরে এর আগে যে সরকারি কমিটি হয়েছে, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট গ্রামসভার বৈঠক ডেকে এই কমিটি ভেঙে দিতে হবে।

 

কাজ ৩/ বনাধিকার কমিটির মাধ্যমে দাবিপত্র ভর্তি ও পেশ

গ্রামসভা-স্তরে আইনে উল্লেখিত অধিকার নিয়ে প্রচার চালাতে হবে, এবং মানুষকে তাঁদের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। এর পরে গ্রামে ভূমি-সমীক্ষার কাজ চালিয়ে, গ্রামের এবং নিকটবর্তী অরণ্যের উপযুক্ত মানচিত্র তৈরি করতে হবে। এই কাজে সরকারি সাহায্যের দাবি তুলতে হবে। ব্যক্তি ও গোষ্ঠী দাবিপত্র দুটিই ভর্তি করতে হবে। অবশ্য যদি কোথাও ব্যক্তি-দাবিপত্র যথাযথভাবে জমা পড়ে থাকে, সেখানে বিশেষত অরণ্য-সম্পদের উপর গোষ্ঠী-দাবি জমা দিতে হবে।

 

সরকারি তরফে নতুন করে দাবিপত্র জমা না নেওয়া হলে, তার লিখিত কারণ জানতে চাওয়া উচিত। এক্ষেত্রে, বিষয়টিকে আন্দোলনের বিন্দু করে তুলতে হবে।

 

যে যে গ্রামসভা এলাকায় তথাকথিত পাট্টা বিলি হয়েছে, সেখানে দাবিকৃত জমির পরিমাণের সঙ্গে পাট্টা-পাওয়া জমির পরিমাণ মিলিয়ে দেখতে হবে। প্রতি গ্রামসভা এলাকায় এভাবে যারা খণ্ডিত পাট্টা (যা চাওয়া হয়েছিল তার চাইতে কম) পেয়েছেন এবং যাঁরা পাননি, তাঁদের তালিকা তৈরি করতে হবে। যেখানে যেখানে বেনিয়ম ঘটেছে (কম জমির পাট্টা পাওয়া, শুধু বাস্তুজমির পাট্টা পাওয়া, গ্রামসভার বাইরের কারোর নামে পাট্টা আসা ইত্যাদি), তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা বানিয়ে গ্রামসভা লিখিতভাবে মহকুমা শাসকের কাছে জমা করবেন।

 

কাজ ৪/ ধারা ৫ অনুযায়ী বন-পরিচালনা সমিতি গঠন

প্রতি গ্রামসভা তার নিজস্ব বন-পরিচালন কমিটি গঠন করবে। এই কমিটি বনাধিকার কমিটি থেকে আলাদা হবে (যদিও একই ব্যক্তি দুটি কমিটিরই সদস্য থাকতে পারেন) এবং বনরক্ষা ও বন-ব্যবহার সম্পর্কে নিয়মকানুন তৈরি করবে। এই কমিটি কাজ করতে শুরু করলে বেআইনি সরকারি বন-সুরক্ষা কমিটি বা ইকো-ডেভেলপমেন্ট কমিটিকে গ্রামসভা লিখিত বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ভেঙে দেবে। ওই কমিটির সমস্ত দায়িত্ব বন পরিচালন কমিটি গ্রহণ করবে।

 

গ্রামসভার আওতাধীন জঙ্গলে (অর্থাৎ বন পরিচালন কমিটি যে জঙ্গলের দায়িত্ব নেবে), গ্রামসভাকে না জানিয়ে বনবিভাগ নিজেদের ইচ্ছামত কোনো কাজ করতে পারবে না।

 

গ্রাম-উন্নয়নের জন্য যে অর্থ এখন বনবিভাগ ও বন সুরক্ষা কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয় তা পঞ্চায়েত বা গ্রামসভার মাধ্যমে খরচার দাবি ওঠাতে হবে। এই খরচার ক্ষেত্রে গ্রামসভার মতামত গ্রহণ অবশ্যম্ভাবী করে তুলতে হবে।

 

কাজ ৫/ পঞ্চায়েতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন

গ্রামসভার কাজগুলি স্থানীয় পঞ্চায়েতের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে করা ভাল, এবং আইনত, পঞ্চায়েতের সচিব গ্রামসভার সচিব হিসাবে কাজ করতে পারেন। কিন্তু গ্রামসভার সিদ্ধান্ত গ্রামসভা স্তরেই নিতে হবে, তা পঞ্চায়েতে নির্ধারিত হবে না।

 

লেখক উত্তরবঙ্গ বন-জন শ্রমজীবী মঞ্চের অন্যতম কর্মী।

 

পড়ুন এই লেখার প্রথম কিস্তি : বনাধিকার আইন, ২০০৬ : আইনে যা বলা আছে 

 

Share this
Leave a Comment