তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে … ভালবাসায় কমলা ভাসিন


  • September 26, 2021
  • (0 Comments)
  • 694 Views

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ দিল্লিতে ক্যান্সার আক্রান্ত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৭৫ বছরের কমলা ভাসিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। যেদিন মারা গেছেন সেদিন বিকেলে হাসপাতালের আইসিইউ থেকে একটি অনলাইন আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে বলেন, আবার ফিরে আসবেন। এই যদি প্রাণশক্তি না হয়, এই যদি কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা না হয়, এই যদি আজীবন আন্দোলনের কারণের প্রতি ভালবাসা না হয় – তাহলে সবই অর্থহীন। শৈশবে বারবার যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা, ব্যক্তি জীবনের চড়াই-উৎরাই, সন্তান শোক, প্রতিবন্ধী সন্তানের কেয়ারগিভারের দায়িত্ব পালন – সব কিছুর নির্যাস নিয়ে কমলা যেন সাজিয়েছিলেন নারীবাদী আন্দোলনের বহুস্তরীয় রূপরেখা। গ্রাউন্ডজিরোর জন্য সুদর্শনা চক্রবর্তীর প্রতিবেদন।

 

কমলা ভাসিনের মৃত্য হয় না। কমলা দিদি, কম্মো – কমরেড। কমলা ভাসিন শুধু ভারত নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, এই উপমহাদেশের নারীবাদী আন্দোলনে এক আশ্চর্য প্রাণ সঞ্চার করে দিয়ে গেলেন। আন্দোলন মানে যে শুধুই চোয়াল শক্ত করে, হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে লড়াই নয়, সেখানে যে গানের সুর, কবিতার ছন্দ আর অনন্ত হাসির উচ্ছাস থাকতে পারে, তা যে অধিকার আন্দোলনের আঙিনায় নিয়ে আসে এক অনাবিল জীবনের স্বাদ – তা বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন কমলা ভাসিন। তত্ত্বর সঙ্গে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে নিতে না পারলে নেতৃত্ব দিতে পারা কঠিন হয়ে যায়। নারীবাদ বিষয়টিকে জটিল-কঠিন তত্ত্বের ঘেরাটোপ থেকে বের করে সহজভাবে, সহজ ভাষায় দৈনন্দিন জীবনের চর্চায় দিয়ে গেলেন তিনি। রোজকারের কথাবার্তায়, যাপনে, বাড়িতে-বাইরে-কাজের জায়গায় নারীবাদ বিষয়টিকে সংযুক্ত করা, তাকে আলোচনার অংশ করে তুলতে পারা শিখিয়ে দিয়ে গেলেন। নারীবাদী আন্দোলন কোনও একমাত্রিক বিষয় নয়, নারীর অধিকার যে কেবলই কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, নারীবাদ আসলে এক বহুমাত্রিক পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিস্তৃত লড়াই এবং অবশ্যই সেই লড়াইয়ের মানে সামগ্রিকভাবে পুরুষবিদ্বেষ নয় – কমলা বলেছেন, ‘কমও নয়, বেশিও নয়, আমরা চাই অর্ধেক-অর্ধেক।’

 

কত অজস্র জীবনকে যে তিনি ছুঁয়ে দিয়ে গেলেন এক জীবনে, কত অসংখ্য জন যে ‘সহেলি’ বিচ্ছেদে এক শূণ্যতা অনুভব করছেন তা বোধহয় লিখে প্রকাশ করা যাবে না। সোশ্যাল মিডিয়ার ছবিতে দেখা যায় তাঁর নশ্বর দেহ নিয়ে শশ্মানে যাচ্ছেন বিভিন্ন প্রজন্মের নারীবাদী ও লিঙ্গ অধিকারের লড়াইয়ের বন্ধুরা আর কি আশ্চর্য সাদা নয় সেখানে তাঁর দেহ শুইয়ে রাখা হচ্ছে লাল রঙের ফুলের বিছানায়, ফুলের মিষ্টি গন্ধে আর গানে মৃত্যকেও রঙীন করে তুলছে কমলা ভাসিনের একটা গোটা জীবন। বন্ধু, প্রিয়জন, অভিভাবক হয়তো চলে গেলেন, কিন্তু হাসি-গান-কবিতা-কলরবে মেয়েদের অধিকার, সমাজে-রাজনীতিতে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে যে লড়াইয়ের ছন্দটা চিনিয়ে দিয়ে গেলেন তার থেকে ছন্দপতন হবে না।

 

কথা বলেছিলাম নারীবাদী আন্দোলন ও তার সঙ্গে সংযুক্ত লিঙ্গ পরিচিতি ও অন্যান্য অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু মানুষের সঙ্গে যাঁদের কাজে কমলা ভাসিন এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন। ভালবাসায় মনে করলেন তাঁরা তাঁদের প্রিয় কমলা দিদিকে।

 

শম্পা সেনগুপ্ত – প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলন কর্মী, যুগ্ম সম্পাদক – ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম ফর দ্য রাইটস অফ দ্য ডিসএবেলড

কমলাদিকে যখন প্রথম দেখি তখন খুব দূরের মানুষ মনে হতো, ভয় পেতাম একটু। যদিও তাঁর লেখা এত সহজ-সরলভাবে গভীর তত্ত্ব বোঝায় তখন সেটা পড়লে মনে হতো কাছের মানুষ লিখেছেন। অনেক পরে যখন ফেসবুকে বন্ধুত্ব হয় তখন দেখতাম বারবার নিজের মেয়ের মানসিক অসুখ আত্মহত্যা ইত্যাদির কথা লিখছেন। সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত ছেলের কথা কত সুন্দর করে লিখেছেন। আসলে এই জিনিসগুলো আমরা তথাকথিত বিখ্যাত বা সফল মানুষদের করতে দেখি না। তারা অনেক কিছু লুকিয়ে রাখতে চায়। একদিক থেকে আমি বলব যে এগুলো উনি খোলাখুলি বলতেন সেটা নিশ্চয় প্রতিবন্ধী আন্দোলনের জন্য একটি ভালো দিক কিন্তু আরেকটা দিক আমার মনে হয় যতটা আমরা চেয়েছি যে উনি আমাদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন, ততটা আমরা পাইনি। সেটা আমাদেরও ভুল থাকতে পারে। আমরাও হয়তো রিচ আউট করিনি। আসলে অনেক বড় মাপের মানুষ উনি। তাঁকে নিয়ে নানা বিতর্ক হয়েছে। কমলাদি এমন মানুষ নন যে তাঁকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি হবে না। সেই বিতর্ক ও তার সুন্দর কাজ – পুরোটা নিয়ে উনি কমলা ভাসিন। অত ভাইব্র্যান্ট মানুষ আমরা নারী আন্দোলনে আর পাব কি?

 

নিশা বিশ্বাস – লিঙ্গ পরিচিতি ভিত্তিক অধিকার আন্দোলন কর্মী

কমলা ভাসিনের চলে যাওয়া ব্যক্তিগত ও আন্দোলনের পরিসরে এক বিরাট ক্ষতি। তাঁর প্রাণশক্তিকে আমরা সবাই ভীষণ ‘মিস’ করব। তাঁর অদমনীয় ও দুর্দান্ত ব্যক্তিত্ব, কাজ ও কবিতার যে আগুন তাই যেন প্রত্যেককে উজ্জীবিত করত। কমলার চলে যাওয়া আমাদের সকলের কাছে একজন উষ্ণ সান্নিধ্যের বন্ধু হারানো ও একজন নারীবাদী আইকন হারানোর অপূরণীয় ক্ষতি। কমলা আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন তাঁর গান, কবিতা, গল্প, প্রকাশনার মধ্যে দিয়ে। নারীবাদ, পিতৃতন্ত্র, লিঙ্গ পরিচিতি ভিত্তিক হিংসার উপরে তাঁর বুকলেটগুলি বহু মানুষকে নারীবাদ বুঝতে ও অনুপ্রাণীত হতে সাহায্য করবে। সেই ম্যাজিকাল কমলাকে মিস করবে যিনি তাঁর প্রাণশক্তি, আনন্দ আর হাসিতে যেন এক আশ্চর্য বিস্ফোরণ ঘটাতেন।

 

নন্দিনী ধর – অধ্যাপক, ছোট পত্রিকা ও বিকল্প গণমাধ্যম কর্মী, কবি

কমলা ভাসিন নামটি আমি প্রথম শুনি “What is Patriarchy?” নামে চটি একটা বই পড়তে গিয়ে। আমি  তখন কিশোরী। সেই অর্থে বলতে গেলে, ওই বইটি দিয়েই আমার নারীবাদ বা লিঙ্গবিদ্যা চর্চার শুরু। বইটির একটি বাঙলা অনুবাদও ছিল। যদিও এখন আর বইটি মোটেই পাওয়া যায় না। প্রকাশক : কালী ফর উইমেন। আমি পরবর্তী সময়ে বারবার ভেবেছি, বিশেষতঃ নিজে বিকল্প গণমাধ্যম কর্মী হয়ে ওঠার পরে যে, কালী ফর উইমেন ভারতবর্ষের স্বাধীন, বিকল্প প্রকাশনার জগতে একটি অন্য দিগন্ত খুলে দিয়েছিল। এবং এমন একটি সময়ে যখন “নারীবাদ” বা “জেন্ডার মুভমেন্ট” কথাগুলির কোন বিশেষ অর্থবহতা ভারতীয় সমাজে ছিল না। তো,  কমলা ছিলেন কালি ফর উইমেন-এর অন্যতম কর্ণধার, প্রতিষ্ঠাত্রী। কমলা বুঝেছিলেন, পিতৃতন্ত্র বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে হলে, একইসাথে গড়ে তুলতে হবে একটি বিকল্প সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র, বিকল্প জ্ঞানচর্চার ধারা। এবং সেখান থেকেই তিনি নিজে যেমন হয়ে উঠেছিলেন, প্রকাশক-সংগঠক, তেমনি কলমও ধরেছিলেন নিজে। তাঁর কবিতা, ছোটদের জন্য লেখা তাঁর বই পড়লে যেটা বোঝা যায়, একদিকে যেমন একধরনের আপাত-সারল্যের মোড়কে মুড়ে অন্য এক ধরনের গল্পকে তিনি পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন সাধারণ মানুষের কাছে, তেমনি অতি-সারল্যর ফাঁদে তিনি কখনোই পড়েননি। কমলার নারীবাদ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, প্রশ্ন থাকতে পারে। থাকবেও। কিন্তু, তাঁর নারীবাদ চর্চা শুধু আজকের ফেসবুক কেন্দ্রীক পারফরমেন্স ছিল না। বরং ছিল সামাজিক স্থিতাবস্থাকে আঘাত করার অস্ত্র। আন্দোলন গড়ে তোলার অস্ত্র।

 

ঈশিতা মুখোপাধ্যায় – অধ্যাপক, সভাপতি – ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর উওমেন’স স্টাডিজ

আমি কমলা দিদির সঙ্গে দেখা হওয়ার তারিখটা ভুলে গেছি। কিন্তু স্পষ্ট মনে রয়েছে তাঁর সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ-এর সময়টি – ২০২০র জানুয়ারিতে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর উওমেন’স স্টাডিজ-এর জাতীয় সম্মেলন। তিনি এলেন, আমাকে জড়িয়ে ধরলেন আর পুরো প্রেক্ষাগৃহকে যেন উজ্জীবিত করে তুললেন, যেখানে আমরা সবাই গান গাইছিলাম আর তাঁর স্লোগানগুলো চিৎকার করে বলছিলাম। তিনি আশির দশকে স্বাধীন নারীদের আন্দোলনের একজন আইকন ছিলেন। তিনি জীবন্ত উদাহরণ ছিলেন কীভাবে স্বাধীনতার, মুক্তির প্রশ্নগুলি নারীবাদী ও একইসঙ্গে পুরুষতান্ত্রিক আঙ্গিক থেকে করা যায়। তিনি সবাইকে বোঝাতে পেরেছিলেন যে অসমতা হল পিতৃতন্ত্রের উৎস। আমাদের দেশে ভারতীয় নারীদের আন্দোলনের অন্যতম হাতিয়ার হল তাঁর বিশ্লেষণে ভারতীয় মহিলাদের স্বাধীনতার প্রশ্নটি উত্থাপন করা। এগুলি সব সময়ে আমাদের পথ দেখিয়েছে, তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়া সর্বদাই মহিলাদের সাম্যের জন্য লড়াইতে উদ্বুদ্ধ করত। সেই উদ্বুদ্ধ করার মানুষটিকে হারালাম, কিন্তু তাঁর স্লোগানগুলি অমর।

 

মঞ্জিরা মজুমদার – বরিষ্ঠ সাংবাদিক

আমি কমলা ভাসিনকে কোনও দিনই ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম না। কিন্তু জেন্ডার এমপাওয়ারমেন্ট বা লিঙ্গ পরিচিতির ক্ষমতায়নের বহু ইস্যুতে তাঁর উপস্থিতি দীর্ঘ বহু বছর ধরে ছায়া দিয়ে গেছে। তাঁর কথা বলতে গেলে আমার প্রথমেই যেটা মনে হয় যে কমলা জীবন ভালবাসতেন। একজন ডেভেলপমেন্ট অ্যাকটিভিস্ট, জেন্ডার অ্যাকটিভিস্ট ও কবি হিসাবে তাঁর জীবনের ‘থিম’-ই ছিল ‘আজাদি’, আমার কাছে যা মনে হয় যা একজনের নিজের কাছ থেকে স্বাধীনতা। অনেক কিছু থেকে স্বাধীনতা – শুধু শোষন-দমনপীড়ন থেকে নয়, বা একটি দেশের স্বাধীনতা নয়। আমি তাঁকে অনেক সাক্ষাৎকারে বলতে শুনেছি তাঁর খুবই কষ্টসাধ্য জীবন সম্পর্কে – তাঁর মেয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। ফলে মানসিক স্বাস্থ্য, অবসাদ, মহিলাদের উপর এগুলির প্রভাব বিষয়ে তিনি জানতে খুবই আগ্রহী ছিলেন। তাঁর জীবনের আরও কিছু দিক ছিল। তাঁর ছেলে প্রতিবন্ধী। কিন্তু এগুলির কোনও কিছুই তাঁর জীবনীশক্তি কেড়ে নেয়নি, অন্যের জন্য কাজ করে যাওয়া থেকে তাঁকে বিরত করেনি, নিজের আগে অন্যকে অগ্রাধিকার দিতে সব সময়ে তিনি প্রস্তুত থাকতেন। তিনি যেন প্রাণশক্তিতে ভরপুর ছিলেন, নিজের এই এনার্জিকে তিনি কোনও মানুষ যখন সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে তখন তাঁকে উজ্জীবীত করতে কাজে লাগিয়েছেন। তাঁর কাছ থেকে এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। কমলার মতো মানুষদের অন্যদের জন্য কাজ করে যাওয়ার একেক ধরনের প্রেরণা থাকে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনও এক গভীর বেদনা বোধ থেকে উঠে আসে। কমলা ভাসিন একজন স্পষ্টবাদী, যেন খানিক ‘প্রোটেক্টিভ’ মানুষ ছিলেন এবং সব মিলিয়ে তিনি একজন অসাধারণ মানুষ আমার কাছে।

 

দোলন গাঙ্গুলি – নারীবাদী অধিকার আন্দোলন কর্মী, প্রোগ্রাম ডিরেক্টর (কলকাতা) – আজাদ ফাউন্ডেশন

কমলা ভাসিনকে আমি প্রথম দেখি নব্বই দশকের মাঝামাঝি। তাঁর সঙ্গে আমার উজ্জ্বলতম স্মৃতি নব্বইয়ের শেষের দিকে বাংলাদেশে এক মাসের জেন্ডার ট্রেনিং প্রোগ্রাম যেখানে অন্যতম ফেসিলিটেটর ছিলেন তিনি। আমার ব্যক্তিগত জীবনে চিন্তা-মতাদর্শের মোড় ঘোরানোর ক্ষেত্রে কমলার এই মাসাধিক কালের সান্নিধ্যর এক বিশাল ও বিশেষ অবদান আছে। বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় ততদিন পর্যন্ত আমি জেনে এসেছি আর ভাবতামও যে শ্রেণী দ্বন্দ্বই পৃথিবীর মূল দ্বন্দ্ব। প্রথম যাঁদের কাছে নারীর প্রতি বৈষম্যের রাজনৈতিক পাঠ নিই, শিখি যে পিতৃতান্ত্রিক দ্বন্দ্বও কীরকম সর্বগ্রাসী, এর দাপট কেমন প্রান্তিক মানুষকে আরও প্রান্তিকতার দিকে ঠেলে দেয় – তাঁদের মধ্যে কমলা ভাসিন অন্যতম। আমার চেতনার উত্তরণে তাঁর অবদান ভোলা মুশকিল। কমলার যে চটি বইগুলো আছে – পিতৃতন্ত্র কাকে বলে, নারীবাদ কাকে বলে যেগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে – আমাদের মতো মাঠে কাজ করা কর্মীদের কাছে নারীবাদ, পিতৃতন্ত্র, জেন্ডার-এর পাঠে বর্ণপরিচয় বলা যেতে পারে। খুব সহজভাবে তিনি তত্ত্বগুলি বলতে, লিখতে, বোঝাতে আর সর্বোপরি অন্য মানুষের জীবনের সঙ্গে কানেক্ট করতে পারতেন। কত অনায়াসে অবলীলায় তিনি বলেছিলেন – ‘ছেলেরা কেন রান্না করতে পারবে না? মেয়েরা কি গর্ভাশয় দিয়ে রান্না করে না কি? হাত দিয়েই তো করে। ছেলেদেরও হাত আছে। তারাও হাত দিয়েই বাড়িতে রান্না করতে পারবে।’ তাঁর একটা অদ্ভূত প্রকাশভঙ্গী ছিল যাতে মানুষ খুব সহজে যুক্তিটা ধরতে পারতেন। এইটা কমলার একটা বিরাট অবদান নারী আন্দোলনকে পপুলার করার ক্ষেত্রে, তাকে মানুষের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে। আমি তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মধ্যে কোনও দিনই না থাকলেও আন্দোলনের ময়দানে, মঞ্চে, খোলা আকাশের নীচে বিভিন্ন সময়ে বারেবারেই দেখা হত, কথা হত। কমলার উপস্থিতিটাই যেন একটা আনন্দ ছিল, উনি যেখানে থাকতেন সেখনটাকে আনন্দে ভরিয়ে তুলতে পারতেন, আন্দোলনকে আনন্দে ভরিয়ে তুলতে পারতেন, মুক্তির পীঠস্থানে পরিণত করতে, মানুষকে ভরিয়ে তুলতে – কমলা অদ্বিতীয়। উনি বলতে পেরেছেন আন্দোলনের গানে – ‘মিল কর হম নাচেঙ্গে,গায়েঙ্গে, মিল কর হম খুশিয়া মানায়েঙ্গে।’ মানুষের, বিশেষত মেয়েদের যে খুশি থাকার অধিকার তাকে এত সহজে গানের মধ্যে দিয়ে আর কে তুলতে পেরেছেন? লিখেছিলেন, ‘তু খুদকো বদল, তবহি তো জমানা বদলেগা’ – আমি নিজেকে বদলানোর চেষ্টা জারি রাখব, কমলাজী।

 

মিনাক্ষী সান্যাল – প্রান্তিক লিঙ্গ ও যৌন পরিচিতির অধিকার আন্দোলন কর্মী, সহ-প্রতিষ্ঠাতা – স্যাফো ফর ইক্যুয়ালিটি

কমলা ভাসিন অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ হয়ে থাকবেন। বহুদিন পর্যন্ত নারীবাদী আন্দোলনকে এ দেশে একমাত্রিকভাবেই দেখা হত। নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের বাইরে ভাবা হত না। কমলা ভাসিন নারীবাদকে জেন্ডার অ্যাক্টিভিজমের বহুমাত্রিকতার সঙ্গে জুড়ে সহজভাবে সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ভূমিকা নিয়েছিলেন। একটা বৃহত্তর লেন্স দিয়ে নারীবাদ, পিতৃতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধের লড়াইকে দেখতে শিখিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

 

পারমিতা চৌধুরি – নারীবাদী অধিকার আন্দোলন কর্মী

প্রথম আলাপ তাঁর সঙ্গে বইয়ের পাতায়, বইয়ের নাম ‘পুরুষ ও পৌরুষ’। সেটা বোধহয় ২০১৩। বইটা পড়ে আলাপ করার ইচ্ছা ছিল। উপায়টা হল বহু পরে। ২০১৬ সালে হিমাচল প্রদেশে গিয়ে সকালে ঘুম থেকে উঠে পায়চারি করছি। দেখছি একজন ভদ্রমহিলা হনহন করে হাঁটছেন। যোগব্যায়াম করছেন। আমার পায়ের তলায় একটি শামুক চাপা পড়ে মড়মড় শব্দ করেছে দেখে হাঁটা থামিয়ে বললেন যে “সাবধানি সে চলো ইয়ার, উসে ভি জিনে কি অধিকার হ্যায়।” ভাবলাম কে ইনি সকাল সকাল বকে দিলেন! পরের দিন ছিল নারীবাদ নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা। উনি এলেন। গান দিয়ে শুরু করলেন। মহিলাদের প্রতিবাদ আর নারীবাদের তফাৎটা কোথায় প্রাঞ্জল করে বোঝালেন। বললেন সাম্যের কথা, সমতার কথা। কীভাবে ক্ষমতার বিন্যাস সাম্য ও সমতার স্বপ্ন ভেঙে দেয়। বললেন ভালবাসার কথা, পিতৃতন্ত্র ক্ষমতাকে ভালবাসতে শেখায়, উনি মানুষকে ভালবাসতে বললেন। পরে আরো অনেক অনেক কর্মশালায় দেখা হয়েছে। আরো কথা হয়েছে। নারীবাদ যে পুরুষ বাদ দিয়ে নয় সেটা আরো ভালো করে বুঝিয়েছেন। গান গেয়েছেন আমাদের সঙ্গে রাত জেগে। আগুন জ্বেলে দিয়ে গিয়েছেন প্রতিবাদের। আবার জলও দিয়েছেন ভালবাসার। তাঁর মতো করে ভালবাসতে পারব কি না জানি না। চেষ্টা করবো আজীবন যাতে সমতার পথে থাকি, ভালবাসার পথে থাকি।

 

চন্দ্রাস্মিতা চৌধুরি – রাজনৈতিক কর্মী – অল ইন্ডিয়া প্রগ্রেসিভ উওমেন’স অ্যাসোসিয়েশন

কমলা ভাসিনকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম না। কিন্তু তাঁর অনেক লেখা পড়েছি, ইন্টারভিউ পড়েছি। বিশেষ করে এক ৮ মার্চ নারী দিবসে কমলা ভাসিনের একটি বক্তব্য আমাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল। আমরা পিততন্ত্রকে যেভাবে দেখতে অভ্যস্ত উনি যেন আমাদের নতুন করে দেখতে শেখালেন। আমরা পিতৃতন্ত্রকে যেভাবে দেখি, বুঝি যে তা মহিলাদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। কিন্তু উনি তাকে উল্টোদিক থেকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। বলতে চেয়েছেন যে, পিতৃতন্ত্র আসলে মেয়েদের থেকেও ছেলেদের বেশি ক্ষতি করে। এর মাধ্যমে ছেলেদের ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠার মধ্যে তাদের স্বাভাবিক আচরণকে দমিয়ে দেওয়া হয়। যেমন – কান্না, যা যেকোনও শিশুর স্বাভাবিক আবেগ। অথচ কোনও ছেলে বাচ্চা কাঁদলে বলা হয় মেয়েদের মতো কেঁদো না। এটা আমার চোখ খুলে দিয়েছিল। আমরা সব সময়ে মেয়েদের বোঝানোর চেষ্টা করি পিতৃতন্ত্র কত ক্ষতিকারক, কিন্তু উনিই প্রথম বুঝতে শেখালেন যে ছেলেদের এটা বুঝতে হবে যে পিতৃতন্ত্র তাদের কতটা ক্ষতি করছে ও মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়ে এর বিরুদ্ধে লড়তে হবে তাদেরও। যখন আমি মহিলা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছি, পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে বাস্তব জীবনে কাজ করতে নামছি তখন এই ভাবনাটা আমাকে খুব প্রভাবিত করেছিল। আমি মনে করি আজকের দিনের নারী আন্দোলনের কর্মীদের কমলা ভাসিনকে নতুন করে পড়া দরকার।

 

চিত্রাঙ্গদা – অ্যান ইনিশিয়েটিভ অ্যাগেইনস্ট জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন (তাদের ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত)

কমলা ভাসিনের মৃত্যু এক অপূরণীয় ক্ষতি। এরকম সহজ ভাষায়, সাবলীলভাবে পিতৃতন্ত্রকে নগ্ন করে তুলে ধরতে পেরেছেন খুব কম মানুষই। তিনি বারবার নারীবাদী আন্দোলনের থেকে বিচ্ছিন্ন জনতার নারীবাদী আন্দোলন নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা, আন্দোলনের থেকে দূরত্ব ঘটাতে সচেষ্ট হয়েছেন। বারংবার তিনি আলোচনায় আনতে চেয়েছেন কীভাবে পিতৃতন্ত্র লিঙ্গ পরিচয় নির্বিশেষে সমস্ত মানুষকে ‘মনুষ্যতর’ হিসেবে দেখে বা হবে উঠতে বাধ্য করে। যে ‘আজাদি’র স্লোগান উঠলে ভারত রাষ্ট্র ‘দেশদ্রোহী’ খুঁজতে পোষা পুলিশ পাঠায়, সৈন্য নামায়, সেই স্লোগান এ দেশের মাটিতে প্রথমবার প্রতিধ্বনিত হয়েছিল কমলা ভাসিনের কন্ঠেই। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা থেকে ‘আজাদি’র দাবিতে। পাকিস্তান থেকে ভারতবর্ষ হয়ে এই নারীমুক্তির স্লোগান আজ সমস্ত প্রতিবাদী জনতার। তাঁর চলে যাওয়ার শূণ্যতা থাকবে, জারি থাকবে পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে জান কবুল লড়াইও। আর লড়াইয়ের মধ্যে দিয়েই তিনি থেকে যাবেন আমাদের সাথেও।

আপনার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ না থেকেও ‘কমলা ভাসিন’ এ লেখা লিখতে গিয়ে মনে হয়, আজ ও আগামীর বহু দিন পুরুষতন্ত্র ও তার বিবিধ শোষনের বিরুদ্ধে মেয়েদের অধিকার, নারীবাদের দাবি নিয়ে যখনই কোনও মিছিলে পা মেলাব আমরা দেশের যে কোনও প্রান্তে, শ্লোগানে গলা মেলাব মাঠে-প্রান্তরে-রাজপথে – ‘পিতৃতন্ত্র সে আজাদি’, দারুণ ভালবাসায় একে অপরের দিকে তাকিয়ে বলতে পারব – ‘হ্যায় পেয়ার কা নারা আ-জা-দি’

 

Share this
Leave a Comment