প্রতিবাদ আর সন্ত্রাসবাদ — ফ্যাসিস্ত রাষ্ট্রের কাছে সবই সমান


  • July 7, 2021
  • (1 Comments)
  • 353 Views

এই বিপন্ন সময়ে, গণতন্ত্রের শ্মশান যাত্রায়, সমাজের স্বতোৎসারিত প্রতিবাদে কণ্ঠ না মেলালে ইতিহাস ক্ষমা করবে না। লিখেছেন মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী পার্থ সিংহ

 

রাজ-আদেশে হাতকড়া পরানো

রক্তঝরা গণতন্ত্রটিকে

প্রহরীদল হাঁটিয়ে নিয়ে যায়

প্রহরীদল মশানে নিয়ে যায়

আমরা সব দাঁড়িয়ে রাজপথে

দেখছি, শুধু দেখছি স্বেচ্ছায়।

— স্বেচ্ছা, জয় গোস্বামী

 

দিল্লি হাইকোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে সন্ত্রাসবাদী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে কুখ্যাত ইউএপিএ আইনে আটক তিন ছাত্র আন্দোলনকারীকে জামিন দিয়েছে। গত কয়েকদিনের মধ্যে, দীর্ঘ ১২ বছর কারাযন্ত্রণা ভোগ করার পর নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন বশীর আহমেদ বাবা আর দেড় বছর বাদে আসামের কৃষক আন্দোলনের নেতা অখিল গগৈ। মনে পড়ে, ২০১৬ সালে ২৩ বছর পর নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছিলেন নিসার উদ্দিন আহমেদ। সন্ত্রাসবাদের মিথ্যা অভিযোগে ধৃত মহম্মদ আমির খানের উপর, স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য, পুলিশ হেফাজতে অকথ্য নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যাবে তাঁরই লেখা, ‘ফ্রেমড অ্যাজ টেররিষ্ট’ শীর্ষক পুস্তিকায়। নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগে গরাদের ওপারে কেটে গিয়েছিল তাঁর জীবনের অমূল্য ১৪টি বছর। এমন ঘটনা অজস্র। জামিয়া টিচার্স সলিডারিটি অ্যাসোসিয়েশন তাঁদের ‘ফ্রেমড, ড্যামড, অ্যাকুইটেড: ডসিয়ার্স অফ ভেরি স্পেশাল সেল’ শীর্ষক অসামান্য দলিলে সন্ত্রাসবাদী সন্দেহে ধৃতদের ১৬টি মামলার অনুসন্ধান, পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছিল তাঁদের অধিকাংশই আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন।

 

ছাত্র আন্দোলনকারীদের জামিন দিতে গিয়ে দিল্লি হাইকোর্টের অসামান্য মন্তব্য ছিল, “ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ করতে সংবিধান স্বীকৃত প্রতিবাদের অধিকার এবং সন্ত্রাসবাদী কাজের মধ্যেকার পার্থক্যকে বিলীন করে দিতে রাষ্ট্রের এই চেষ্টা যত বেশি গতি পাবে গণতন্ত্র তত বিপদগ্রস্ত হবে।” ১৯৬৭ সালে ইউএপিএ (আনলফুল অ্যাকটিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট) আইনটি পাশ করেছিল সংসদ। বিচারপতিরা তাঁদের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট জানিয়েছেন, আইনসভার উদ্দেশ্য ছিল দেশের প্রতিরক্ষার পক্ষে হানিকর সন্ত্রাসবাদকে একটি নির্দিষ্ট সুনির্দিষ্ট অপরাধের শ্রেণিভুক্ত করার। প্রতিবাদ বা এমন কোনও কাজ প্রকৃতপক্ষে আইনশৃঙ্খলা জনিত সমস্যা, সন্ত্রাসবাদের অপরিহার্য বৈশিষ্টের মধ্যে কখনই পড়বে না, যেহেতু তা দেশের প্রতিরক্ষার পক্ষে বিপজ্জনক নয়। সরকার-বিরোধী বিক্ষোভ, প্রতিবাদ দমন করতে আইনটি প্রণয়ন করা হয়নি । এই বিপন্ন সময়ে, দিল্লি হাইকোর্টের রায় অবশ্যই ন্যায়বিচারের মশালটি জ্বালিয়ে রাখবে। তবে, সন্ত্রাসবাদ রুখতে ইউএপিএ, এনএসএ, আফস্পা এইসব মৌলিক অধিকার হরণকারী, মানবাধিকার বিরোধী, গণতন্ত্র হত্যাকারী কালাকানুনগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠল।

 

ইউএপিএ আইনে সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মের প্রকৃতিকে নির্দিষ্ট করা হলেও, সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা অনুপস্থিত। বস্তুত, রাষ্ট্রপুঞ্জ ১৯৭২ সাল থেকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে। দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও অদ্যাবধি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি। এ ব্যপারে, রাষ্ট্রপুঞ্জের ইন্টার প্রেস সার্ভিসের বরিষ্ঠ সম্পাদক থালিফ ডিন বলেছিলেন, সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা আর কেনই-বা রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা বাহিনীর অত্যাচারকে সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়া হবে এ নিয়ে কমিটির সদস্যদের মধ্যেই বিরাট মতপার্থক্য রয়েছে (ইউএন মেম্বার্স স্টেটস স্ট্রাগল টু ডিফাইন টেররিজম, থালিফ ডিন, আই.পি.এস.)। সংজ্ঞার আইনি ব্যখ্যার অস্পষ্টতা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ন্যায়ালয়ের প্রাক্তন বিচারপতি রিচার্ড ব্যাক্সটার তাঁর স্কেপ্টিক্যাল লুক অ্যাট দ্য কনসেপ্ট অফ টেররিজম শীর্ষক রচনায় বলেছিলেন, উই হ্যাভ কজ টু রিগ্রেট দ্যাট এ লিগ্যাল কনসেপট অফ টেররিজম ওয়াজ এভার ইনফ্লিকটেড আপন আস। দ্য টার্ম ইজ ইম্প্রেসাইজ; ইট ইজ অ্যাম্বিগুয়াস; অ্যান্ড অ্যাবভ অল, ইট সারভস নো অপারেটিভ পারপাস।

 

রাষ্ট্রপুঞ্জ গঠিত অ্যাডহক কমিটির ২০০২ সালে খসড়া রিপোর্টে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী অপরাধের সর্বসম্মত সংজ্ঞা নির্ধারণের চেষ্টা করে বলা হয়েছে, যে সব ভয়ানক ধ্বংসাত্মক অপরাধমূলক কাজকর্মের দ্বারা নাগরিকের মারাত্মক শারীরিক ক্ষতিসাধন, প্রাণহানি, ব্যক্তিগত বা সরকারি সম্পত্তি, গণ-পরিবহনের, সরকারি পরিকাঠামো, পরিবেশগত প্রভূত ক্ষতিসাধন করা, সমাজে জনগণের কোনও একটা অংশের মধ্যে তীব্র ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করা এবং সরকারকে বাধ্য করা কোনও বিশেষ পদক্ষেপ করতে বা বিরত থাকতে, প্লেন হাইজ্যাকিং, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে পণবন্দি করা হয় — সেসব অপরাধমূলক কাজকর্ম সন্ত্রাসবাদী অপরাধের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুপ্রিমকোর্টও একাধিক রায়ে এই ভাবনাই ব্যক্ত করেছে। যদিও ইউএপিএ আইনের সংজ্ঞায় অপরাধের গণ্ডি আরও ব্যাপক। সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম করাই শুধু নয়, এ ধরনের কাজ করার উদ্দেশ্য বা ইচ্ছা আছে বা করতে পারে বলে মনে হলেও আইনটি প্রয়োগ করা যাবে।

 

ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে স্বাধীনতা আন্দোলন দমন করতে ব্রিটিশ শাসকরা গণতান্ত্রিক অধিকার হরণকারী কুখ্যাত রাওলাট আইন এনেছিল। যার বিরুদ্ধে না উকিল, না পিল, না দলিল স্লোগান দিয়ে দেশজুড়ে আন্দোলনে সামিল হয়েছিল ভারতবাসী। অথচ, স্বাধীন দেশেও একের পর এক গণতন্ত্র বিরোধী, সাংবিধানিক অধিকার হরণকারী নিবর্তনমূলক আটক আইন তৈরি করা হয়েছে আর সেই আইনকে হাতিয়ার করে শাসকরা বার বার চেষ্টা করেছে সরকার বিরোধী আন্দোলন দমন করতে, ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ করতে। ১৯৯৪ সালের ২৪ অগস্ট, সংসদে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের তদানীন্তন রাষ্ট্রমন্ত্রী, রাজেশ পাইলট জানিয়েছিলেন, সে সময় চালু থাকা টাডা (টেররিষ্ট অ্যান্ড ডিসরাপটিভ অ্যাক্টিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট, ১৯৮৫) আইনে মোট ৬৭০০০ মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং নিম্ন আদালতে শাস্তি হয়েছে ৭২৫ জনের (১.০৮% মাত্র)। পরে আরেকটি কুখ্যাত আইন পোটা (প্রিভেনশন অফ টেররিজম অ্যাক্ট, ২০০২)-র পর্যালোচনা করে কমনওয়েলথ হিউম্যান রাইটস ইনিটিয়েটিভস তাদের অসামান্য পর্যবেক্ষণটি, ২০০৩ সালে সরকারের পোটা রিভিউ কমিটির কাছে, পেশ করে জানিয়েছিল, রাজনৈতিক কার্যসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে, ধর্মীয় বৈষম্যের কারণে সংখ্যালঘু মানুষকে হেনস্থা, নির্যাতন করতে, পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তির নিদিষ্ট শাস্তি বিধান করতে আইনটি ব্যবহৃত হয়েছে। সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মের সংজ্ঞার ব্যাপকতা, আইন ব্যবহারে পুলিশকে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দেওয়া, স্বচ্ছ বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে অভিযুক্তকে বঞ্চিত করা এবং সর্বোপরি আদালতের নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার দেওয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ জারি করা ছিল এই আইনটির বৈশিষ্ট্য (হিউম্যান ইনিশিয়েটিভস ডট অর্গ)। অবশেষে, প্রবল গণ-অসন্তোষের জেরে ১৯৯৭ সালে টাডা এবং ২০০৪ সালে পোটা আইন দুটি তুলে নেওয়া হয়। এরপর, সরকার সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম রুখতে ইউএপিএ আইনটিকে আরও কঠোর করে তুলতে যথাক্রমে ২০০৪, ২০০৮, ২০১২ সালে সংশোধনী আনে। প্রাথমিকভাবে এই আইনটি হয়েছিল সন্ত্রাসবাদী কাজের সঙ্গে জড়িত সংগঠনকে নিষিদ্ধ তালিকাভুক্ত করতে। সম্প্রতি বিপুল ক্ষমতাধর মোদী সরকার ২০১৯-এ সবচেয়ে মারাত্মক সংশোধনীটি আনে। এযাবৎকাল, সরকার শুধুমাত্র কোনও সংগঠনকে সন্ত্রাসবাদী ঘোষণা করে নিষিদ্ধ করতে পারত, আর কোনও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনানুগ পদ্ধতিতে বিচার করে সন্ত্রাসবাদী হিসেবে ঘোষণা করার এক্তিয়ার ছিল আদালতের। কিন্তু, এখন ২০১৯-এর সংশোধনীর বলে সরকারের একজন প্রশাসকই সন্দেহবশে কোনও ব্যক্তিকে সন্ত্রাসবাদী ঘোষণা করে দিতে পারে। ফলে, এক্ষেত্রে সংবিধানের মর্মবস্তু ‘ক্ষমতার স্বাতন্ত্র’ (Separation of Power)-র তত্ত্বকে নস্যাৎ করে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ বিচারব্যবস্থার স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ক্ষমতাটিও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ফ্যাসিস্ত সরকারের রাজনৈতিক প্রভুদের বশংবদ একজন প্রশাসকের মর্জিতে কোনও ব্যক্তির স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা নির্ভর করছে। যা নাৎসি জমানার স্বেচ্ছাচারী পুলিশ রাষ্ট্রের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই আইনের বিধানে পুলিশের দেওয়া তথ্যের উপরেই ভরসা রাখতে হয় বিচারককে, এভিডেন্স অ্যাক্ট অনুযায়ী তা যাচাই করতে পারবেন না। আসলে, অপছন্দের ব্যক্তিকে দীর্ঘসময় জেলবন্দি করে রাখাই সরকারের লক্ষ্য। দেশের শীর্ষ আদালতও একাধিক মামলার পর্যবেক্ষণে এই অভিমত ব্যক্ত করেছে (কর্তার সিং বনাম ভারত, ১৯৯৪)। অন্যদিকে, হিতেন্দ্রবিষ্ণু ঠাকুর মামলায় তাঁদের মন্তব্য ছিল, একজন সাধারণ অপরাধীকে কোনোমতেই সন্ত্রাসবাদীর তকমা দেওয়া যায় না।

 

ভারতীয় সংবিধানের নৈতিকতার পরিপন্থী এই আইনের বলে বর্তমান ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্ত শাসকের স্বেচ্ছাচারিতা হয়ে উঠেছে অকল্পনীয়। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০১৫ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ইউএপিএ আইনের অপব্যবহারের উল্লম্ফন ঘটে গ্রেফতার বেড়েছে ৭২%। এবছর ১০ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী জি কিষান রেড্ডি রাজ্যসভায় জানান, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে মোট ৫৯২২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এই আইনের অধীনে আর এ পর্যন্ত নিম্ন আদালতে শাস্তি পেয়েছে মাত্র ২.২% অভিযুক্ত (দ্য হিন্দু, ১০/০২/২০২১)। যাদের অনেকেই উচ্চ আদালত থেকে মুক্তি পেতে পারে। সংশয়াতীতভাবে প্রমাণিত, সরকারের উদ্দেশ্য সমালোচকদের জেলবন্দি করে রাখা। ফলে, সিএএ-এনআরসি আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ধর্না, চাক্কা জ্যামের ডাক ইত্যাদি সরকার বিরোধী প্রতিবাদ আন্দোলনের মধ্যে পুলিশ, তাদের রাজনৈতিক প্রভুদের নির্দেশে, দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের’ ইঙ্গিত অনুমান করে নিয়েছে। অথচ, ২০০৮-এর মালেগাঁও বিস্ফোরণ (মৃত ৬, আহত ১০০), ২০০৭-এ আজমেরশরিফ দরগায় (মৃত ৩, আহত ১৭), হায়দ্রাবাদের মক্কা মসজিদে (মৃত ৯, আহত ৫৮) এবং সমঝোতা এক্সপ্রেসে (মৃত ৬৮, আহত ১২) ভয়াবহ বিস্ফোরণ কাণ্ডে — ধৃত, বিচারপতির সামনে অপরাধ কবুল করা, চার্জশিট প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ অপরাধীরা, বিজেপি দেশের সরকারে আসীন হওয়ার পর জামিনে জেলের বাইরে আর বিচারপ্রক্রিয়া শীতঘুমে। অতি গুরুত্বপূর্ণ এক অভিযুক্ত বর্তমান শাসকদলের অন্যতম সাংসদ। সন্ত্রাসবাদী কাজের অভিযোগে আদালতে চার্জশিট প্রাপ্ত অভিযুক্ত দেশের অন্যতম একজন আইনপ্রণেতা। ইউএপিএ-তে ঘোষিত সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের তালিকায় খুঁজে পাওয়া যাবে না, অভিনব ভারত, সনাতন সংস্থা, হিন্দু জাগরণ মঞ্চের মতো ইত্যাদির মতো হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী সংগঠনের নাম।

 

রাষ্ট্রপুঞ্জে গৃহীত নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিপত্রের ২১ ধারায় স্বীকৃত শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার। ভারত সরকার ১৯৭৯ সালের ১০ এপ্রিল এই দলিলটি গ্রহণ ও স্বাক্ষর করে। রাষ্ট্রপুঞ্জের স্পেশাল র‍্যাপোর্টার ক্রিস্তফ হেইন্স সম্প্রতি বলেছেন, উদযাপন করার জন্যই হোক বা প্রতিবাদ জানানোর জন্য, জমায়েত হওয়ার অধিকার মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। সুনির্দিষ্ট এবং স্বীকৃত মূল্যায়ন ছাড়া, শুধুমাত্র জন-নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা বা অনির্দিষ্ট হিংসার কাল্পনিক সম্ভাবনায় এই অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না (ওএইচআর ডট অর্গ)। ভারতীয় সংবিধানের ১৯(১)খ ধারায় শান্তিপূর্ণ জমায়েতের অধিকার এবং ১৯(১)ক ধারা অনুযায়ী বাক-স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। একটি গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি গড়ে তোলে এই অধিকারসমূহ। সরকারের সমালোচনা, প্রতিবাদ বিনা গণতন্ত্র অসম্পূর্ণ। সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় বিভিন্ন মামলায় বলেছে, নাগরিকের বিক্ষোভ, প্রতিবাদের অধিকার সম্পূর্ণ সংবিধানসম্মত, সাধারণ আইন-শৃঙ্খলা সমস্যা আর সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম কখনই এক নয়। শান্তিপূর্ণ অহিংস প্রতিবাদ পদযাত্রা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল হাতিয়ার ছিল, … শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দেশের রাজনৈতিক ঐতিহ্য, বলে একটি মামলায় পর্যবেক্ষণ ছিল সুপ্রিমকোর্টের (অনিতা ঠাকুর বনাম জম্মু-কাশ্মীর সরকার, ২০১৬)। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জুলিয়াস স্টোন, তাঁর দ্য প্রভিন্স অফ ল শীর্ষক গ্রন্থে বলেছিলেন, ইলেকশনস, ডে টু ডে পলিটিক্যাল ডিসকোর্সেস, ক্রিটিসিজম অ্যান্ড ভয়েসিং অফ প্রোটেস্টস আর ইনটিগ্রাল টু দ্য ডেমোক্রেটিক প্রসেস।

 

আগ্রাসী ফ্যাসিস্ত শাসকদের লক্ষ্য সংবিধান বাতিল করে তাদের পথপ্রদর্শক গোলওয়ালকর কল্পিত মনুস্মৃতি অনুসারী স্বৈরাচারী, বর্ণবিদ্বেষী, ধর্মবিদ্বেষী, ব্রাহ্মণ্যবাদী, প্রবল কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাধর হিন্দুরাষ্ট্র গড়ে তোলা। কল্যাণকামী চরিত্রটি ধ্বংস করে দেওয়া দায়হীন সেই রাষ্ট্রে নিম্নবর্ণের, নিম্নবর্গের মানুষদের থাকবে না ন্যূনতম অধিকার। অনুপ্রবেশকারী, দেশের শত্রু তকমা দিয়ে কেড়ে নেওয়া হবে অহিন্দুদের জীবনের সমস্ত অধিকার। গণতান্ত্রিক ভেকধারী সেই ফ্যাসিস্ত রাষ্ট্রে, দেশ এবং সরকার সমার্থক। সরকারের সমালোচনা বা বিরোধীতা করার অর্থই দেশদ্রোহিতা। ইতিমধ্যেই দেশের বিধিসম্মত সংস্থাগুলো সরকারের আজ্ঞাবহ এবং সাংবিধানিক সংস্থাসমূহ মানুষের আস্থা হারিয়েছে। নাৎসি জমানার স্মৃতি উসকে দিয়েছে নতুন ভারতের ভয়ঙ্কর অবয়ব। সেই হিংস্র ভ্রূণ হিন্দুরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, গান্ধীর অহিংস মতাদর্শে উজ্জীবিত কৃষক-সমাজ, শ্রমজীবী, প্রান্তবাসী মানুষ, সর্বোপরি বিপুল ছাত্রযুবরা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। সমাজে তৃণমূল স্তরের গণতন্ত্রের দাবিতে সোচ্চার হচ্ছেন মানুষ। পূর্ব ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকার মতো এদেশেও নাগরিক সমাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশের বিবেকী মুক্তকণ্ঠ প্রতিবাদে সামিল হচ্ছেন। এই বিপন্ন সময়ে, গণতন্ত্রের শ্মশান যাত্রায়, সমাজের স্বতোৎসারিত প্রতিবাদে কণ্ঠ না মেলালে ইতিহাস ক্ষমা করবে না।

 

লেখক মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী।

 

পড়ে দেখুন:

গণপিটুনি: দেশভক্তদের চাবুক কি বুমেরাং হচ্ছে

মিথ্যা প্রচার, ঘৃণার রাজনীতি

 

Share this
Recent Comments
1
Leave a Comment