গণপিটুনি: দেশভক্তদের চাবুক কি বুমেরাং হচ্ছে


  • April 26, 2020
  • (1 Comments)
  • 570 Views

মহারাষ্ট্রের পালঘরে সাম্প্রতিক হাড়-হিম করা ঘটনার প্রেক্ষিতে মনে পড়ে গেল, বহু দিন আগে, ১৯০১ সালে আমেরিকার মিসৌরিতে এক নৃশংস গণপিটুনির ঘটনায় বিচলিত মার্ক টোয়েন আমেরিকাকে ‘ইউনাইটেড স্টেটস অফ লিঞ্চারডম’ বলে অভিহিত করেছিলেন (যদিও টোয়েনের জীবিতাবস্থায় লেখাটি প্রকাশিত হয়নি, বেরোয় ১৯২৩-এ ‘ইউরোপ অ্যান্ড এলসহোয়্যার’ সংকলনে)। আজ ভারতও যেন হয়ে উঠেছে লিঞ্চিস্তান। লিখেছেন পার্থ সিংহ

 

 

পালঘরে দুই সাধু ও তাঁদের গাড়ির চালককে পাথর ছুড়ে, রড দিয়ে স্থানীয় গ্রামবাসীদের একাংশের পিটিয়ে মারার ঘটনাকে দ্ব্যর্থহীন ভাবেই ধিক্কার জানিয়েছে সভ্যসমাজ। সংবাদে প্রকাশ, পর দিনই অন্তত একশোরও বেশি লোক গ্রেপ্তার হয়েছে। স্থানীয় কাসা থানার দুই পুলিশ অফিসারকেও সাসপেন্ড করা হয়েছে। তবে দেশের বর্তমান আপৎকালীন পরিস্থিতিতেও হিন্দুত্ববাদী দলটি এই ঘটনায় সাম্প্রদায়িক রং লাগাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে। গণপিটুনির রাতের নৃশংস ভিডিয়োর বিকৃত উপস্থাপনে সারাদেশে ঝড়ের গতিতে তারা প্রচার করেছে যে, ওই হিন্দু সাধুদের পিটিয়ে মেরেছে নাকি স্থানীয় কিছু মুসলমান যুবক। যদিও অনতিবিলম্বেই জানা যায়, আদিবাসী অধ্যুষিত ওই গ্রামে কিছু অনাদিবাসী থাকলেও মুসলমান নেই। ওই অঞ্চলে দু’দশক ধরে কাজ করা সমাজকর্মী ব্রায়ান লোবো বলেছেন, লকডাউনের পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। সম্প্রতি ছেলেধরা নিয়ে গুজব রটেছিল যে, পুলিশ বা সাধু বা ডাক্তারের বেশে ছেলেধরা আসছে শিশু চুরি করে তাদের কিডনি বিক্রি করতে। ঘটনার দিন দু’য়েক আগেও এনজিও থেকে খাবার বিতরণ করে ফেরার পথে এক সমাজকর্মী ড. বিশ্বাস ওয়ালভি মারধরের শিকার হয়েছিলেন। সে জন্যও পাঁচ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। মহারাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনিল দেশমুখ জানিয়েছেন, পালঘরের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ১০১ জনের মধ্যে এক জনও সংখ্যালঘু নেই। এও জানা গিয়েছে, পঞ্চায়েত বিজেপির দখলে এবং সরপঞ্চ স্থানীয় বিজেপি নেত্রী চিত্রা চৌধুরী (মুম্বই মিরর, ২১.০৪.২০২০)।

 

তার পরেও গৈরিক দলটি আকাশ ফাটিয়েছে ঘটনায় সাম্প্রদায়িক রঙ চড়িয়ে। সত্য প্রকাশের পর তাদের কেউ দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলেও জানা যায়নি। অবশ্য সেটা তাদের ডিএনএ-তেই নেই। ওডিশার কেওনঝড়ে তিন দশক ধরে কুষ্ঠ-নিবারণ কাজে ব্রতী অস্ট্রেলিয়ান মিশনারি গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টেইনসকে দুই সন্তান-সহ গাড়ির মধ্যে পুড়িয়ে মেরেছিল এই হিন্দুত্ববাদীরাই (২৩.০১.১৯৯৯)। সে জন্যও কখনও লজ্জাবনত হতে দেখা যায়নি সঙ্ঘীদের। উল্টে ২০১৯-এ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছেন সেই বীভৎস ‘অপারেশন’-এর অন্যতম এক কান্ডারি।

 

‘ইন্ডিয়া স্পেন্ড’-এর (২৮.০৬.২০১৭) সংগৃহীত পরিসংখ্যানে প্রকাশ (২০১০–২০১৭ মে পর্যন্ত), গণপিটুনি বা ভিড়তন্ত্রের গুন্ডামির ৮৪% গো-রক্ষকদের দ্বারা সংঘটিত এবং তার মধ্যে ৯৭% ঘটেছে ২০১৪-র মে মাসে কেন্দ্রে সরকার বদলের পরে। লক্ষ্যবস্তু ধর্মীয় সংখ্যালঘু একটি সম্প্রদায়েরই মানুষ। এ অপরাধের শীর্ষে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ এবং কর্নাটক। যেগুলোর সবকটিই ছিল বিজেপি-শাসিত (বর্তমানে একটি বাদে)। ‘ইন্ডিয়া স্পেন্ড’ এটাও দেখিয়েছে, ঘটনাগুলোর ৩০% ক্ষেত্রে পুলিশ উল্টে আক্রান্তদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ দায়ের করেছে। আবার ‘অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ (ওআরএফ.ওআরজি, ০১.০৭.২০১৭)-এর সংগৃহীত তথ্যেও (জানুয়ারি ২০১১–জুন ২০১৭) দেখা যাচ্ছে, ২০১৪-র মে মাসে কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতা দখলের পর থেকেই গো-রক্ষার নামে গণপিটুনি অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ক্ষমতাসীন দলের সচেতন এবং সংগঠিত উদ্যোগেই ঘটে চলেছে নৃশংসতা। প্রকট অভিযুক্তদের রেহাইয়ে সরকারি ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, ক্ষমতাসীন দলের নেতা-মন্ত্রীদের প্রকাশ্য সমর্থন-সহ অভিযুক্তদের মদত এবং উপযুক্ত আইনের অভাবও (নিউজ লন্ড্রি, ০৪.০৭.২০১৭ ও ইন্ডিয়া টুডে, ২৫.০৬.২০১৭)।

 

দেশের রাজধানীর নাকের ডগায় উত্তরপ্রদেশের দাদরিতে ঘরে গোমাংস রাখার মিথ্যা অভিযোগে সুসংগঠিত পরিকল্পনায় পিটিয়ে মারা হয় প্রৌঢ় মহম্মদ আখলাককে (২৮.০৯.২০১৫)। জনৈক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ঘটনাটিকে নেহাৎ ‘দুর্ঘটনা’ বলে উপেক্ষা করেন। এর ঠিক এক বছর বাদে ওই ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত এবং জামিনে মুক্ত রবি শিশোদিয়া কিডনি ফেলিয়োরে মারা গেলে তার মরদেহ জাতীয় পতাকায় মুড়ে ওই মন্ত্রী বীরের সম্মান দেন। সঙ্গী ছিলেন এক বিধায়ক, যিনি মজফফরনগর দাঙ্গায় কুখ্যাত (দ্য হিন্দু, ০৭.১০.২০১৬)। দাদরিতে আখলাক-খুনের ক’দিন পরেই রাজস্থানের আলোয়ারের কাছে বেহরোরে খাটাল মালিক পেহলু খান আর তাঁর ছেলে ইরশাদকে হাট থেকে গরু কিনে ফেরার পথে নৃশংস ভাবে পেটায় গোরক্ষকদের দল। দু’দিন বাদে হাসপাতালে প্রৌঢ় পেহলু মারা যান। পুলিশ দুই নাবালক-সহ আট জনকে ধরে, পাশাপাশি পেহলুর বিরুদ্ধেও গরু পাচারের অভিযোগ দায়ের করে। যদিও হাট থেকে গরু কেনার বৈধ কাগজপত্র ছিল পেহলুর। পরে পুলিশ এবং ডাক্তারদের হাতযশে সব অভিযুক্তই বেকসুর খালাস পায়। কারণ, পুলিশ সঠিক প্রমাণ জোগাড় করে উঠতে পারেনি এবং সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার জানান, আঘাত নয়, হার্ট অ্যাটাকেই নাকি মারা গিয়েছেন পেহলু (ইন্ডিয়া টুডে, ১৪.০৮.২০১৯)! যদিও ওই হত্যার পর অভিযুক্তরা তাদের নৃশংসতার ভিডিয়োটি সগর্বে প্রচার করেছিল। এনডিটিভির এক্সক্লুসিভ রিপোর্টে প্রধান অভিযুক্ত বিনোদ যাদবকে কোনও লুকোছাপা না করেই বলতে শোনা গিয়েছে, কী ভাবে পরিকল্পনা করে তারা পেহলুকে দেড় ঘণ্টা ধরে পিটিয়ে মারে। পেহলুদের দুটো ট্রাকের চাবিও ছিল তাদের কাছে। কিন্তু পুলিশ নাকি প্রমাণ জোগাড় করতে পারেনি! ওই ঘটনা যখন ঘটে এবং তদন্ত-পর্বে রাজস্থানের সরকার ছিল বিজেপির। মামলার রায় বের হয় পরে কংগ্রেস আমলে (দ্য হিন্দু, ১৪.০৮.২০১৯)। তারা হাইকোর্টে দায়রা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে বলে জানা গিয়েছে।

 

উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহরে পুলিশ ইনস্পেক্টর সুবোধকুমার সিং-কে গুলি করে খুন করে গোরক্ষকদেরই একটি দল। অভিযুক্ত জিতেন্দ্র মালিক স্থানীয় বজরং দলের কর্মী। নিকটবর্তী গ্রামে একটি গরুর মৃতদেহের সূত্রে গো-হত্যার অভিযোগে কাছের পুলিশ ফাঁড়ি ঘেরাও করা হয় বিজেপির যুব মোর্চা ও বজরং দলের উদ্যোগে। ঘেরাও সামলাতে গেলে সুবোধ সিং-কে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়। এই পুলিশ অফিসারই ছিলেন দাদরির তদন্তকারী। স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক বলেন, ওই অফিসার নাকি ভয় পেয়ে নিজেই নিজেকে গুলি করেছেন (এনডিটিভি, ৩০.১২.২০১৮)! প্রধান অভিযুক্ত বজরং দলের স্থানীয় প্রধান যোগেশ রাজ, বিজেপি যুবমোর্চার কর্মী শিখর আগরওয়াল-সহ পাঁচ অভিযুক্ত জামিনে‌ মুক্ত হওয়ার পর নায়কোচিত সম্মানে তাদের মালা পরিয়ে জয় শ্রীরাম ধ্বনিতে বরণ করে স্থানীয় বিজেপি (এনডিটিভি, ২৬.০৯.২০১৯)।

 

নৃশংস ঘটনায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর খোলাখুলি অভিযুক্তদের পাশে দাঁড়ানোর আর একটি উদাহরণ স্মরণযোগ্য। ঝাড়খণ্ডের রামগড়ে জনৈক মাংস ব্যবসায়ী আলিমুদ্দিন আনসারিকে গো-রক্ষকরা পিটিয়ে মারে। অভিযুক্ত আট জনকে গত ০৮.০৭.২০১৮-তে হাইকোর্ট জামিন দিলে ওই মন্ত্রী তাদের গলায় মালা পরিয়ে সাদরে অভ্যর্থনা করেন এবং মামলার খরচের ব্যবস্থা তিনিই করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন (টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ০৮.০৭.২০১৮)।

 

আরএসএস-এর মতো একটি শক্তিশালী সংগঠনের সুপরিকল্পিত উদ্যোগে এবং তার রাজনৈতিক শাখা ভারতীয় জনতা পার্টি কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখলের পর গণপিটুনি বা ভিড়তন্ত্রের গুন্ডামিকে বস্তুত একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক চেহারা দেওয়া হয়েছে। ফলে এক দিকে যেমন তাদের ঘৃণ্য মতাদর্শের বাস্তবায়ন সহজ হচ্ছে (সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের নিকেশ করা, তাদের ভীত-সন্ত্রস্ত করা, ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে নাগরিক সমাজের বাইরে এনে ফেলা), তেমনই অশিক্ষা এবং সীমাহীন বেকারত্বের জ্বালায় জর্জরিত বিপুলসংখ্যক যুব-সমাজের ক্ষোভ ও হতাশাকে কাজে লাগানো হচ্ছে শয়তানিতে, যাতে সেই ক্ষোভ সত্যিকারের বিদ্রোহ না হয়ে ওঠে।

 

দু’বছর আগে গণপিটুনির বিষয়ে তাশিন পুনাওয়ালা বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া মামলার রায়ে শীর্ষ আদালত এ অপরাধকে ‘ভিড়তন্ত্রের দ্বারা সংঘটিত বীভৎস অপরাধ’ বলে অভিহিত করে রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে শক্ত হাতে দমন করতে বলে। উপযুক্ত আইন বানাতে বলে যাতে এ অপরাধে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে দ্রুত বিচার হয় (দ্য হিন্দু, ১৭.০৭.২০১৮)। যাতে ভুক্তভোগী সুবিচার ও ক্ষতিপূরণ পান। শীর্ষ আদালতের রায়ের প্রেক্ষিতে মাত্র তিনটি রাজ্য কিছু পদক্ষেপ করেছে বলে জানা গিয়েছে। তিনটিই অবিজেপি রাজ্য–মণিপুর, রাজস্থান এবং পশ্চিমবঙ্গ। কেন্দ্রীয় সরকারের হেলদোল দেখা যায়নি। বিজেপির সভাপতি (পরে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) বরং গণপিটুনির অভিযোগকে সংবাদমাধ্যমের চক্রান্ত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন (হাফিংটন পোস্ট, ০৩.০৭.২০১৭)।

 

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন জাতীয় অপরাধ পরিসংখ্যান সংস্থা বা এনসিআরবি-র ২০১৭-র রিপোর্টে ‘গণপিটুনিতে নিহত ও ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে মৃত’-এর পরিসংখ্যানই চেপে যাওয়া হয়েছে। সংস্থার প্রাক্তন নির্দেশক ঈশ কুমারের মন্তব্য, ‘এটা আশ্চর্যজনক যে, গণপিটুনিতে এবং ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে খুন–এই সাব-ক্যাটিগরিতে সংগৃহীত এবং পূর্ণ বিশ্লেষিত তথ্য থাকা সত্ত্বেও তা প্রকাশ করা হয়নি। কেন হয়নি, তা সরকারের সর্বোচ্চ পদাধিকারীই বলতে পারবেন’ (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২২.১০.২০১৯)।  কুইন্ট-ল্যাবের সংগৃহীত তথ্য অবশ্য দেখাচ্ছে–২০১৫ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ১১৩ জনকে খুন হতে হয়েছে গণপিটুনির শিকার হয়ে (দ্য কুইন্ট / কুইন্ট-ল্যাব)।

 

দেশ-বিদেশের নিরন্তর সমালোচনায় প্রধানমন্ত্রী কদাচিৎ প্রতিক্রিয়া দিয়ে কখনও ‘দুঃখজনক’, কখনও ‘ট্র্যাজেডি’ বলেই দায় সেরেছেন এ সব ঘটনায়। অবশেষে ২০১৯-এর ১ জানুয়ারি তিনি বলেন, ‘এ সব ঘটনা ধিক্কারযোগ্য, কিন্তু এ সব কি ২০১৪-র পরেই শুধু শুরু হয়েছে’ (ইন্ডিয়া টুডে, ০১.০১.২০১৯)! গত বছর নাগপুরে বিজয়াদশমীর সমাবেশে আরএসএস-এর সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত আবার বলেন, লিঞ্চিং হচ্ছে বিদেশি শব্দ এবং গণপিটুনির সংস্কৃতিও বিদেশাগত। এ সব ভারতের সংস্কৃতি নয়। সাধারণ সামাজিক অপরাধগুলোকে এই সব নাম দিয়ে বিশ্বের দরবারে আমাদের সম্মান এবং ভারত সরকারকে হেয় করা হচ্ছে। এর সঙ্গে হিন্দুদের এবং সঙ্ঘের নাম জুড়ে দেওয়া একটা গভীর চক্রান্ত (ইন্ডিয়া টুডে, ০৮.১০.২০১৯)।

 

অবশ্যই লিঞ্চিং ইংরেজি শব্দ। উৎপত্তি মার্কিন দেশে। অষ্টাদশ শতাব্দিতে ভার্জিনিয়ার চার্লস লিঞ্চ (মতান্তরে উইলিয়াম লিঞ্চ), যিনি প্রথমে খামার-মালিক, পরে বিচারক হয়েছিলেন–তিনি আমেরিকার বিপ্লবের সময়ে সন্দেহভাজনদের শাস্তি দিতে চালু করেছিলেন আইনবহির্ভূত এক বিতর্কিত বিচার ব্যবস্থা–যাকে ‘লিঞ্চ ল’ নামে অভিহিত করা হয়। পরবর্তীতে ভিড়তন্ত্রের গুন্ডামিকে এই নামেই চিহ্নিত করা হয়েছে।  তবে শব্দটি বিদেশি হলেও কুকর্মটির উদাহরণ এ দেশের ইতিহাসে রয়েছে। চলছে বর্তমানেও। ভুলে গেলে চলবে না, এ দেশে দুশো বছর আগে ঠগীর বিপদ ছিল ভয়ঙ্কর। একদল দেশীয় অস্ত্র-সজ্জিত লোক স্থলপথ বা জলপথে ভ্রমণরত যাত্রীকে আক্রমণ করে তাঁর যথাসর্বস্ব কেড়ে নিত। ইংরেজ সরকার ১৮৩৬ সালে আইন করে (ঠগী অ্যাক্ট ১৮৩৬) এই অপরাধ দমনের চেষ্টা শুরু করে। সেই সাথে মনে পড়বে সতী প্রথার নৃশংসতাও। স্বামী মারা যাওয়ার পর সদ্য বিধবা স্ত্রীকে গ্রামের এবং পরিবারের মাতব্বররা জবরদস্তি করে স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় ছুড়ে ফেলে খুন করত শাস্ত্রীয় বিধানের অজুহাতে, পুন্যের কাল্পনিক আশা দেখিয়ে। প্রকৃতপক্ষে বিধবার সম্পত্তি দখল করতে। এটি বন্ধে ‘সতীদাহ রদ আইন’ হয় ১৮২৯ সালে। ডাইনি অপবাদে প্রহার ও হত্যাও কি কিছু কম! আর নিত্যই তো ঘটে চলেছে দলিতদের উপর উচ্চবর্ণের নৃশংসতা। কখনও গোঁফ রাখার জন্যে, কখনও বা ঘোড়ায় চড়ে বিয়ে করতে যাওয়ায়। তবে গো-রক্ষার ছুতোয় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু করে নিকেশের ছকটি ‘গৈরিক নতুন ভারতে’ নয়া আমদানি বইকী।

 

গো-পূজা, গো-রক্ষার নামে ভারতীয় সংস্কৃতি প্রসারের অজুহাতে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, ধর্ম-প্রাণ হিন্দু মানুষের মনে হিংসার চাষ করাই গৈরিক রাজনীতির অন্যতম প্রকরণ। চরম দারিদ্র্য, সীমাহীন অসাম্য, নাগরিকের ন্যূনতম চাহিদা মেটানোর ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরাতে ঘৃণার বিষের চেয়ে অতি সহজলভ্য, অব্যর্থ ওষুধ আর কি আছে? এই অপরাধকে প্রায় সংগঠিত শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে আরএসএসের শক্তিশালী সংগঠন এবং তার রাজনৈতিক শাখার সর্বোচ্চ সরকারি ক্ষমতা। এই বিষময়, ঘৃণ্য প্রকল্পের একমাত্র উদ্দেশ্য সমাজের হতদরিদ্র, না-পাওয়া মানুষদের নজর মূল সমস্যা থেকে ঘোরানো। সেই মানুষজনের অধিকাংশই কিন্তু দলিত, আদিবাসী। যারা বর্ণ-বিভক্ত ভারতীয় সমাজের একেবারেই নীচের তলার মানুষ। ট্র্যাজেডি হল, অনেক ক্ষেত্রে তারাই সঙ্ঘের প্রকল্পের সেনাবাহিনী। প্রাক্তন দলিত স্বয়ংসেবক ভাওয়ার মেঘবংশীর উপলব্ধি, ‘আমি ধীরে ধীরে লক্ষ করলাম মুখ্য কর্মকর্তারা সবাই উচ্চবর্ণের, আর আমাদের মতো (দলিত) ছেলেরা সবাই সাধারণ কর্মী’ (ম্যায় এক করসেবক থা: ভাওয়ার মেঘবংশী। ইংরেজি অনুবাদ: আই কুড নট বি হিন্দু, দ্য স্টোরি অফ এ দলিত ইন দ্য আরএসএস)। এহেন পদাতিক সৈন্যরা আজ কি ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের দৈত্য হয়ে দেখা দিচ্ছে? বুমেরাং হতে চলেছে কি সঙ্ঘের প্রকল্প?

 

লেখক মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী

 

Share this
Recent Comments
1
  • comments
    By: joydip on April 26, 2020

    thank you for such informative report …specially the facts and figures of all earlier such heinous acts by our great state-backed “deshpremiks”… it would have been much effective on readers like me, if there could be some more facts about the Palghar’s case… it may happen that due to such knock-lock-down such good journalism also not easy to publish… the problem is so less and less journalism is being practiced now in this state that we have to spread share send subscribe to web-news-portal and groundxero is no doubt one of the very best…great work…jai bhim jai birsa

Leave a Comment