মরেও মরে না যে মারাদোনা


  • November 29, 2020
  • (0 Comments)
  • 219 Views

যতই কোকেন, ডোপ অথবা মাফিয়া  যোগসাজশের কলঙ্ক গায়ে লাগুক বল পায়ে মারাদোনাকে যতবারই দেখি, কুস্তুরিকার কথাটাই নির্ভেজাল সত্যি বলে মেনে নিতে মন চায় — For god, all is forgiven. লিখেছেন দেবাশিষ ঘোষ

 

 

সবে উত্তুরে হাওয়া নিয়ে শীত পড়তে শুরু করেছে। জাঁকিয়ে না বসলেও কাঁথা-কম্বলের ওম ছেড়ে বেরিয়ে এসে কর্মব্যস্ততার দিনের শুরুয়াৎ কিঞ্চিৎ দেরিতেই এখন; তবু নিত্যদিনের মতন ২৬ নভেম্বর ২০২০-র কাকভোরে কলকাতার এক শহরতলির ছোট্ট মাঠে পাড়ার ও আশেপাশের অঞ্চলের কিছু ছেলে-ছোকরা যারা রোজ ভোরে এই ঘাসে ফুটবল খেলে এখনও কেবল শখে, প্রাণের আনন্দে, তারা তাদের সস্তার ফুটবলখানা হিমসিক্ত বিগত হেমন্তের মরা হলদেটে ঘাসে রেখে তার চারিদিকে গোল করে দাঁড়িয়েছে। এখন তারা দু’মিনিট নীরবতা পালন করবে কারণ ২৫ নভেম্বর ২০২০-র রাতে, তারা অকস্মাৎ জানতে পেরেছে যে ফুটবলের শ্রেষ্ঠ জাদুকর দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা মরে গেছে। হ্যাঁ, ‘মরে গেছে’ – এইভাবেই তারা বলে থাকে। দেহত্যাগ করেছেন, পরলোক গমন করেছেন, নশ্বর দেহ ত্যাগ করেছেন অথবা নিছক মারা গিয়েছেনের মতন পোষাকি সৌজন্যমূলক ভাষায় তারা সকলে বলেন না কথা। তাদের এই দু’মিনিটের নীরবতা কোনও স্টপ ওয়াচে তারা মেপে নিচ্ছেন না এবং মনে মনে ভাবছেন না কতক্ষণে এটা শেষ হবে। সস্তার ময়দানি মোজা আর তাপ্তি দেওয়া বুটে যেখানে এখন হিমে ভেজা ছেঁড়া ছেঁড়া ঘাস লেগে আছে, সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাদের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে ইউটিউবে ও মোবাইলে ইতস্তত দেখা নীল-সাদা জার্সি গায়ে সেই বিস্ময়কর ফুটবল কিংবদন্তির অসামান্য সব গোল ও টুকরো টুকরো খেলার ক্লিপ। ইউটিউব ও মোবাইলের ক্লিপই কেবল, কারণ তাদের যা বয়স তাতে কারোরই ছিয়াশির বিশ্বকাপের আগে জন্ম অবধি হয়নি। তাদের মধ্যে একজনের অবশ্য মনে পড়ে তার কাছে মারাদোনা প্রসঙ্গে তার বাবার স্মৃতিচারণ, ঠিক সেই নীরবতা পালনের মুহূর্তেই নয় অবশ্য তার কিঞ্চিৎ পরে। তার বাবা বলেছিলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মারাদোনার সেই আশ্চর্য খেলার কথা। বলেছিলেন, মাঝমাঠ থেকে সেই আশ্চর্য টার্ন, ডজ এবং দৌড় টেলিভিশনের পর্দায় প্রথমবার দেখার বিস্ময়, অবিশ্বাস ও উন্মাদনার কথা।

 

বুয়েনোস আয়রেস থেকে ঢের দূর এই এক শহরতলিতে কোন মায়ায় এই মানুষেরা এসে জড়ো হয় ঘাসে, নীরব হয়ে থাকে সে রহস্যের একটা পিঠ ফুটবল। দিয়েগোর অবিশ্বাস্য ফুটবল। কিন্তু কেবলই ফুটবলও নয়। ভৌগলিক দূরত্ব মুছে ফেলে পৃথিবীজুড়ে এই অগনন মানুষের দিয়েগোর প্রতি প্রায় জিসাসের মতন ভালোবাসাকে বুঝতে হলে তাকাতে হবে ঐ মুখগুলোর দিকেও। ঐ যারা বলে ‘মরে গেছে’, যা আমাদের মতন ‘ভদ্দরনোকেদের’ কানে বাজে। পৃথিবীর সব সমাজেরই তলায় থাকা সেই মানুষগুলোরও প্রতিনিধি হয়ে যেন আজীবন ফুটবল পায়ে লড়ে গিয়েছেন দিয়েগো।

 

আট বছর বয়সে আর্জেন্তিনোস জুনিয়রে যখন ট্রায়াল দিতে যান, কোচেদের বিশ্বাস হয়নি। তাঁরা বয়স ভাঁড়ানোর অভিযোগ করলে দিয়েগোর মা দোনা তোত্তাকে বার্থ সার্টিফিকেট এনে দেখাতে হয়। আসলে বয়সের নিরিখে দিয়েগোর চেহারা ছিল যথেষ্ট পেশিবহুল। ফিয়োরিতার এক বস্তি থেকে এত কম বয়সে এমন স্বাস্থ্যবান ও দক্ষতাসম্পন্ন ফুটবল সম্ভাবনা যে উঠে আসা সম্ভব তা বোধহয় কোচেদের বিশ্বাস হয় নি। ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষ ক্লাবের খুদে ফুটবলারদের অবস্থাপন্ন বাবা মায়েদেরও চক্ষুশূল হল দিয়েগো। একটা বস্তি থেকে উঠে আসা, ‘ডার্ক স্কিন র‍্যাট’, তাদের ছেলেদের বল পায়ে নাজেহাল করে তুলেছে এ তারা মেনে নিতে পারেননি। এ অবজ্ঞার জবাব অবশ্য দিয়েগো মাঠে যেমন বারবার ফিরিয়ে দিয়েছেন তেমনি ফিরিয়ে দিয়েছেন তার কথায় ও আচরণেও। ফুটবলের ইতিহাসে তাঁর করা সবচেয়ে বিতর্কিত গোল, হ্যান্ড অব গড প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে ফেয়ার প্লে ইত্যাদির মতন কোনও মনোরম অজুহাতের অনুশোচনা ব্যতিরেকে অবলীলায় তিনি বলতে পারেন- “While the others threw mud at me, I was so thrilled with that goal. It was as if I’d stolen an Englishman’s wallet.” ১৯৮২-র অঘোষিত ফকল্যান্ড যুদ্ধ ও তার পরিণামে ইংল্যান্ডের কাছে আর্জেন্তিনার হারের প্রতিশোধ ফুটবলের মাঠে দিয়েগো নিয়েছিলেন দুভাবেই। প্রথম – অন্যায় ছিনিয়ে নেওয়ার মতন সেই হ্যান্ড অব গড গোল করে যা সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেনের কলোনি দখল ও লুঠের গা-জোয়ারির মুখে একটা সপাট চড়ের মতন পড়েছিল এবং দ্বিতীয়টি শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ গোল হিসেবে যা মাঠে দাঁড়িয়ে চাক্ষুষ করে ইংল্যান্ডেরই স্ট্রাইকার গ্যারি লিনেকার পরে বলেছিলেন- “It was the closest in my life that I’ve ever felt like I ought to applaud someone else scoring a goal.”

 

বার্সেলোনা ছেড়ে নাপোলিতে যখন খেলতে গেলেন মারাদোনা তখন দক্ষিণ ইতালির কোনও ক্লাব যে অদূর ভবিষ্যতে সিরিয়া অথবা উয়েফা চ্যাম্পিয়নশিপ জিততে পারে এমন আশা নাপোলির অতি বড় সমর্থকও করতেন কিনা সন্দেহ। দক্ষিণ ইতালি ছিল ইতালির আফ্রিকা। উত্তরের জমকালো শহর মিলান বা তুরিনের ক্লাবগুলির সমর্থকেরা নাপোলির সাথে খেলা থাকলে গ্যালারিতে যে কদর্য শ্রেণী, বর্ণ ও জাতিবিদ্বেষমূলক আচরণ করতেন তা তাদের কিছু প্ল্যাকার্ড বা ব্যানারের দিকে লক্ষ্য করলে সহজেই অনুমান করা যায়। Lavatevi (পরিষ্কার কর নিজেদের), Ciao Colerosi ( হ্যাল্লো, কলেরা আক্রান্তের দল) কিংবা Napoli Fogna d’Italia (নেপলস্, ইতালির নর্দমা) প্রভৃতি তার কিঞ্চিৎ উদাহরণ। এহেন একটি ক্লাবকে মারাদোনা যেদিন উত্তর ইতালির জুভেন্তাসের মতন ডাকসাইটে ক্লাবের বিরূদ্ধে গোল করে প্রথম জেতালেন সেদিন নেপলস্-এর সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী পাঁচজন দর্শক মাঠে জ্ঞান হারিয়েছিলেন ও দুজনের হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয়। ১৯৮৭-র যে রাতে নাপোলি ইতালির চ্যাম্পিয়ন হয় সেদিন থেকে শুরু করে প্রায় দু’মাস অবধি নেপলস্-এ তার কিরকম উদযাপন হয় তার একটি চমৎকার ছোট্ট বিবরণ উরুগুয়ের লেখক সাংবাদিক এদুয়ার্দো গালেয়ানো তার Soccer in Sun and Shadow বইতে লিখে গেছেন। সারা নেপলস্ ছেয়ে যায় নীল পতাকায়। রাস্তায় ভার্জিন মেরির মতন হ্যালো আঁকা মারাদোনার ছবি বিকোয়। বিক্রি হয় মিলান, জুভেন্তাসের মতন ক্লাবের পতাকা আঁকা কফিন। কারা যেন দান্তের মূর্তির পায়ের কাছে রেখে যায় ফুটবল। কবরখানার বাইরের দেওয়ালে ঝোলে ব্যানার যাতে লেখা- E NON SANNO CHE SE SÒPERSO (তোমরা জানো না তোমরা কি মিস করলে)। মারাদোনার রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে এক নার্স ভায়ালটা চার্চে রেখে আসেন যেন কোন রেলিক। মারাদোনা তখন সান্তা মারাদোন্না।

 

পরবর্তীতে এহেন নেপলসের সাথেও নানা তিক্ততার মধ্যে দিয়ে সম্পর্কে ছেদ পড়লেও মারাদোনা আজও নেপলস্-র সান্তা মারাদোন্না হয়েই যে রয়ে গেছেন তা তার মৃত্যুশোকে জর্জর নেপলস্-এর দিকে তাকালে সহজেই অনুমেয়।

 

ইতালিতে মাফিয়াযোগ, কোকেইন, ডোপিং প্রভৃতি হাজারো বিতর্কে ও শাস্তিতে ফুটবল থেকে একপ্রকার ছিটকে দূরে সরে গিয়েও মারাদোনার তবু বাঁ-পায়ে বল নাচানো ফিয়োরিতার সেই বস্তির বাচ্চাটার মতন ফুটবলের প্রতি ভালবাসা শেষ পর্যন্ত অটুট থেকেছে এবং সেইসাথে আরও আরও বেশি করে সোচ্চার হয়েছেন ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের দুর্বল নিপীড়িত দেশের প্রতি অন্যায় অত্যাচারে। সরাসরি বিরোধিতা করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাতিন আমেরিকার প্রতি আগ্রাসনের এবং কিউবা ও ফিদেলের প্রতি তার অকুন্ঠ ভালবাসা জানিয়েছেন বুক ঠুকে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো সাভেজের সাথে একটি টিভি শো-তে বসে বলেছিলেন- “I hate everything that comes from the United States. I hate it with all my strength.”

 

পাছে তাদের হাতে দিয়েগোর মৃত্যুর রক্তছাপ লাগে এই ভয়ে কোকেন আসক্ত মারাদোনার জন্য বুয়েনোস আয়রেসের কোন ক্লিনিকেই যখন জায়গা মেলেনি তখন ফিদেলের কিউবা তাকে সাদরে বুকে টেনে নিয়েছে। দীর্ঘ চার বছর দিয়েগো হাভানাতে কাটিয়েছেন। ফিদেলের মৃত্যুর পর তার প্রসঙ্গে স্মৃতিভারাতুর মারাদোনা বলেন- “কাস্ত্রো প্রায়শই সকালে টেলিফোন করে রাজনীতি, ফুটবল ইত্যাদি নিয়ে আমার সাথে আলোচনা করতেন, আমাকে দ্রুত আসক্তি কাটিয়ে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার জন্য অনুপ্রেরণা দিতেন, আমার কাছে এটাই ফিদেলের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি।” নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে অবিচল থেকেছেন দিয়েগো বরাবর। মার্কিন মুলুকের তাকে দিতে চাওয়া পুরস্কার যেমন হাত পেতে নেননি তেমনি প্রিন্স চার্লস তার সাথে দেখা করতে চাইলেও তিনি জানান- তিনি চান না দেখা করতে। ঐ রক্তমাখা হাতের সঙ্গে করমর্দনে তার বিন্দুবৎ আগ্রহ নেই।

 

ফুটবলের ইতিহাসে মারাদোনাই একমাত্র রূঢ়, দুর্মুখ খেলোয়াড় নন, কিন্তু একমাত্র মারাদোনারই মন্তব্য ও প্রশ্ন কর্তৃত্বের গায়ে জ্বালা ধরিয়েছে সবচাইতে বেশি। আন্তর্জাতিক শ্রম আইন কেন ফুটবলের বেলায় খাটবে না কিংবা টেলিভিশনের একনায়কতন্ত্রের চক্করে খেলোয়াড়দের কেন দুপুর রৌদ্রে ফুটবল খেলতে হবে কিংবা নিজের জীবনে যিনি কোনদিন ফুটবলে পা ছোঁয়াননি সেই ফিফা সভাপতি কেন ল্যিমুসিন চড়ে ঘুরে বেড়াবে এহেন সব প্রশ্নে ফুটবলের বড়বাবুরা যে যৎপরোনাস্তি বিব্রত ও ক্রুদ্ধ হবেন এ আর আশ্চর্য কি। ফুটবল থেকে মারাদোনার নির্বাসনে ফুটবল তার শ্রেষ্ঠ বিপ্লবীকে হারিয়েছে। ফুটবল একই সাথে গতি ও নিয়ন্ত্রণের খেলা। গতি বাড়িয়ে তুললে নিয়ন্ত্রণ কমবেই। আর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চাইলে গতি। মারাদোনা এই দুইয়ের এক আশ্চর্য সামঞ্জস্য। ছোট্ট অথচ ক্ষিপ্র ষাঁড়ের মতন যেন। যতই কোকেন, ডোপ অথবা মাফিয়া  যোগসাজশের কলঙ্ক গায়ে লাগুক বল পায়ে মারাদোনাকে যতবারই দেখি, কুস্তুরিকার কথাটাই নির্ভেজাল সত্যি বলে মেনে নিতে মন চায়- For god, all is forgiven.

 

  • লেখক  একজন  অধ্যাপক।

 

Share this
Leave a Comment