‘সবার পিছে, সবার নীচে, সবহারাদের মাঝে’ বিধানসভা নির্বাচন, বিহার: কয়েকটি অসম্পূর্ণ সংলাপ 


  • November 6, 2020
  • (0 Comments)
  • 601 Views

বিহারে জাতপাতের রাজনীতির বিভিন্ন প্রকারের হোলসেলার আছে। তথাকথিত নিচুজাতির অধিকারের জন্য গড়ে উঠেছে রকমারি রাজনৈতিক দল। ব্রাহ্মণ-ভূমিহার-রাজপুত মৌরসিপাট্টায় আঘাত হানতে নিম্নবর্গের উত্থান ছিল কাম্য। যাদব, কুর্মি ইত্যাদির উত্থান (যথাক্রমে লালু ও নীতীশ রাজের কল্যাণে)হলেও অবশিষ্ট প্রান্তজনের ক্ষেত্রে কয়েকটি নেতা ও তার পরিবার খেয়েছে ক্ষীর। সূর্য এবং তার রোদ্দুর থেকেছে দূরে। রামবাবু বা মুন্নি দেবী বা মৃত মেয়ের বাবা গুড্ডুর কাছে ভোটবিলাস শৌখিনতার অন্য নাম। মুজফ্‌ফরপুর জেলার মুশাহারি ব্লক থেকে শুভ প্রতিম-এর রিপোর্ট।

 

২০১৬-র কথা। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, হরিশ ত্রিবেদী বলেন, আজকের দিনে শুনতে আশ্চর্য লাগবে, কিন্তু বাস্তবতা হল সন্ত তুলসিদাস অযোধ্যার একটি মসজিদে আশ্রয় নেন এবং ‘রামচরিতমানস’ রচিত হয় সেখানেই। মসজিদটি কি বাবরি মসজিদ ছিল? প্রশ্ন আছে, আছে বিতর্কের অবকাশ। কিন্তু বিতর্ক নেই আর যা নিয়ে তা হল মহামান্য উচ্চ আদালত সেই মসজিদের ওপর রামমন্দির নির্মাণকে বৈধতা দিয়েছে। মন্দিরের উদ্বোধনও হয়ে গেছে। রামচরিতমানসের রাম, লোকায়ত রাম এখন ‘মর্যাদা পুরুষত্তম’। হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রঙিন ম্যানিফেস্টো।

 

বিহার নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং হিন্দুত্বের নব অবতার, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী, যোগী আদিত্যনাথ বারংবার রামমন্দির প্রসঙ্গ এনেছেন, কিন্তু মজার কথা হল ভোটের মুড (এবং ভোটারদেরও) বদলে দিয়েছেন তেজস্বী যাদব। ভোটে জিতলে প্রথম ক্যাবিনেট মিটিং-এ ন’লক্ষ চাকরির ঘোষণা।

 

নীতীশ কুমারের শাসনকাল কখনও ইউপিএ কখনও এনডিএ- এর সঙ্গে ঘর করা আমাদের জানা। কুর্সির জন্য রং বদলানোর ঐতিহ্য বিহারের রাজনীতিতে অবশ্য নতুন কোনও বিষয় নয়। কিন্তু এবারের নির্বাচনে এসব কিছু ছাপিয়ে উঠে এসেছে লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকদের অসহায়তা।

 

অসহায়তা নিয়ে কথা বলতে গেছিলাম সমাজের সব থেকে পিছিয়ে থাকা কিছু মানুষের সঙ্গে। সামাজিক সমীক্ষার একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে বিগত দুই মাস পাটনা ও মুজফ্‌ফরপুর আসা। মুজফ্‌ফরপুর জেলার মুশাহারি ব্লক। আর্থিক ও সামাজিক সূচকের বিভিন্ন পরিমাপকে অত্যন্ত পিছিয়ে থাকা এই ব্লকের গ্রামগুলি। আমাদের সমীক্ষা এখানের হতদরিদ্র মুশাহার, পাসওয়ান ইত্যাদি সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে। সেই সূত্রেই এবং এই ভোটের আপাত উদ্দেশ্যে কিছু কথোপকথন। অসম্পূর্ণ এবং অবশ্যই অসম্পাদিত।

 

মুজফ্‌ফরপুরের পাশেই বয়ে যাচ্ছে বুড়িগন্ডক নদী। প্রায় স্রোতহীন, স্বচ্ছতাকে তামাদি করা এক নদীর ফসিল। সিকন্দরপুর ঘাটে আলাপ রিকশা চালক রামবাবু শা’র সাথে। পায়ের গোড়ালির নীচে ছোট্ট ঘা। ঘাটের নোংরা পরিবেশে মাছি বসছে তাতে।

রিকশা চালক রামবাবু শা

‘রিকশা আমার নয়, মালিককে একবেলার জন্য দিতে হয় ৩০ টাকা, দু’বেলা নিলে ৬০। আজকাল অটো, টোটোর বাজার, রিকশার বাজার নেই।’ কথা এগোতে থাকে। রামবাবুর গ্রাম সাকরা ব্লকের এক গ্রামে। জাতিতে কৈরি। কুর্মি-কৈরি জাত সমীকরণ এবার এনডিএর পক্ষে বলেই খবর। ৪ ছেলে, ২ মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে সংসার রামবাবুর। কে জিতবে মনে হয় জানতে চাইতেই সহাস্যে জানালেন, জানি না বাবু। কিন্তু কাকে ভোট দেবেন এই প্রশ্নে জানালেন তির ছাপ। তির ছাপ মানে নীতীশের দল, জনতা দল ইউনাইটেড। কেন জানতে চাওয়ার আগেই বলেন, হাওয়া আছে ওদিকেই দিতে হবে। হাওয়া মতলব? প্রেসার ভি হ্যায়, দেনা পরেগা।

 

আমাদের গ্রামে ৪০ ঘর ভূমিহার, ৩০০ ঘর যাদব, ৪০০ ঘর পাসওয়ান আছে। আমরা কয়েক ঘর মাত্র। কোনও জমি নেই আমাদের। সব জমি ভূমিহার, যাদবদের। ১০ বছর আগে কলকাতায় ছিলাম। কলকাতার খিদিরপুরের ২ নম্বর গেটের কাছে থাকতাম। প্রথমে কুলির কাজ করতাম। পরে ঠেলাগাড়িতে ফল বেচতাম। কিন্তু  চলে আসতে হল, বড় বেটির বিমারির জন্য। বাঁচাতে পারিনি ওকে। তারপর আর কলকাতা ফিরিনি বাবু।

 

আমাদের জাতের প্রার্থী হোক বা ভিন জাতের আমাদের কিছুই বদলাবে না। পায়ের ঘায়ের ওষুধ নিতে সদর হাসপাতাল গেছি, ওষুধ পেয়েছি একবার। পরের বার বলেছে ওষুধ নেই। আমরা গরিব, আমাদের কথা হাসপাতালের ডাক্তার বা স্টাফ কেউ শোনে না।

 

মুজফ্‌ফরপুর শহরের ‘ধর্মতলা’ হল কল্যাণী চক। একদল ঝুড়ি বিক্রেতার মধ্যে মুন্নি দেবীর সঙ্গে কথা। বছর ২৮-এর মুন্নি সঙ্গে মাস চারেকের বাচ্চা। স্তন্যদান ও ঝুড়ি বিক্রির যুগপৎ তৎপরতা। বোচাহা বিধানসভার এক চামার টোলির পাশে তার গ্রাম। মুজফ্‌ফরপুরের ঘিরনি পোখর (বাংলায় পুকুর) -এর পাশের বস্তিতে বাস। বিকেলে গ্রামে ফিরবে, ভোট দিতেই, রাত পোহালেই ভোট যে!

 

গাঁওমে বিজলি হ্যায় লেকিন চব্বিশো ঘণ্টা রেহেতা নেহি। লকডাউনের সময় গ্রামেই ছিলাম। সরকার তিন মাস চাউল গেঁহু দিল এখন পয়সা মাঙছে। তাই আবার মুজফ্‌ফরপুরে ফিরে এসেছি। সামনে ছট পরব, বিয়ের লগ্ন, ঝুড়ি-কুলোর বিক্রি আছে। সাচ বলে তো ভোট কাউকে দেওয়ার ইচ্ছে নেই। লেকিন সমাজ হ্যায়, তাদের বিচার অনুযায়ী চলতে হয়।

 

শহর থেকে ১০ কিমি দূরে প্রহ্লাদপুর। মুশাহারি ব্লকের এক গ্রাম। ২০১৭-১৮ তে এইএসসি (অ্যাকিউট এনসেফেলাইটিস সিনড্রোম) যা স্থানীয় ভাষায় ‘চমকি বুখার’- এর জন্য খবরের শিরোনামে আসে। বিখ্যাত মুজফ্‌ফরপুর লিচুর বিস্তৃত বাগান এই ব্লকের গ্রামগুলিতে। চমকি বুখারে মারা গিয়েছিল শিশুরা। যাদের মধ্যে অধিকাংশ মুশাহার, পাসওয়ান ও চামার পরিবারের শিশু। কথা হচ্ছিল মুশাহার জাতির গুড্ডু মাঝির সঙ্গে। ২০১৮ সালে গুড্ডুর দু’বছরের মেয়ে নন্দনের মৃত্যু হয় চমকি বুখারে। গুড্ডুর বয়ানে-

 

কোয়ি নেহি আয়া। মেয়ের জ্বর থামছিল না। এখানে ব্লক হাসপাতালে আমাদের মুশাহারদের গরিব বলে কোনও গুরুত্ব নেই। দুগো সুইয়া দিয়া, বাদমে বোলতা হ্যায় যাও। মেয়ের বেলায় তো তাও পেলাম না। কী করব শ্বশুরবাড়ি সমস্তিপুর গেলাম। এদিকে মেয়ের জ্বর কমছে না, সঙ্গে ক্লান্তি। দৌড়াদৌড়ি সেখানেও কম হল না। নার্সিংহোমে দেব তার পয়সা কোথায়? শেষে মারাই গেল মেয়েটা আমার। মুশাহার চটির অন্যদের কথা বলতে পারব না সাহাব, আমরা বুথের দিকে যাব না। মেরা লড়কি বাপস নেহি আয়েগা।

গুড্ডুর দু’বছরের মেয়ে নন্দনের ছবি

ফিরে আসছি তখন দুপুরের সূর্য, অন্ধকার ঘরে অপুষ্টি আর অনাহার-অর্ধাহারে থাকা বাকি বাচ্ছাগুলো ঘুমোচ্ছে অসময়ের ঘুম। ক্লান্তির ঘুম। মুশাহাররা হল একসময়ের যাযাবর সম্প্রদায়। মুষিক মানে ইঁদুর খায় বলে মুশাহার। অন্য জাতের কাছে (এমনকি অন্য দলিত শ্রেণির কাছেও) অস্পৃশ্য। বিহারে জাতপাতের রাজনীতির বিভিন্ন প্রকারের হোলসেলার আছে। তথাকথিত নিচুজাতির অধিকারের জন্য গড়ে উঠেছে রকমারি রাজনৈতিক দল। ব্রাহ্মণ-ভূমিহার-রাজপুত মৌরসিপাট্টায় আঘাত হানতে নিম্নবর্গের উত্থান ছিল কাম্য। যাদব, কুর্মি ইত্যাদির উত্থান (যথাক্রমে লালু ও নীতীশ রাজের কল্যাণে) হলেও অবশিষ্ট প্রান্তজনের ক্ষেত্রে কয়েকটি নেতা ও তার পরিবার খেয়েছে ক্ষীর। সূর্য এবং তার রোদ্দুর থেকেছে দূরে। রামবাবু বা মুন্নি দেবী বা মৃত মেয়ের বাবা গুড্ডুর কাছে ভোটবিলাস শৌখিনতার অন্য নাম।

 

শেষের কথা। গতকাল মুশাহারি ব্লকের কাছে ভারত পেট্রোলিয়ামের এক পাম্পে দেখলাম বিশাল লাইন। মোটর সাইকেল বাহিনীর জন্য তেল ভরানো হচ্ছে। এনডিএ প্রার্থীর প্রায় দেড় কিমি মোটরসাইকেল মিছিল শুরু হচ্ছে। সামনে রামের বিশাল কাটআউট। মন্দির উদ্বোধন ও নতজানু প্রধানমন্ত্রী। প্রহ্লাদপুরে গুড্ডু মাঝির কুঁড়ে ঘরের পাশ দিয়েই যাবে সেই মিছিল। যাবেই।

 

  • লেখক সামাজিক গবেষক ও গণআন্দোলনের কর্মী।

 

Share this
Leave a Comment