‘জঙ্গি’, সংখ্যালঘু বিদ্বেষ এবং রাষ্ট্র


  • September 23, 2020
  • (3 Comments)
  • 3920 Views

‘জঙ্গি’ সন্দেহে একটি বিশেষ ধর্মের যে মানুষগুলিকে গ্রেপ্তার করা হয়, তাদের অধিকাংশের পরিণতি কী হয়, এ-প্রশ্ন অনেকদিন ধরেই মাথার মধ্যে ঘুরত। খুঁজতে খুঁজতে যা তথ্য পাওয়া গেল তা চমকে যাওয়ার মত। লিখলেন নীলাঞ্জন মন্ডল

 

 

  • সম্প্রতি আমাদের রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে আল কায়দার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ছয় জনকে এবং কেরালা থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ। গোয়েন্দা সূত্র উল্লেখ করে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে “ভারতের আনসার গজওয়াত-উল-হিন্দ নামে একটি সংগঠনের সাথে ধৃতদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এই সংগঠন ভারতে আল কায়দার শাখা সংগঠন হিসাবে কাজ করে (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২০.০৯.২০২০)।

 

  • এর আগে ২০১৮ সালে বুদ্ধগয়ায় দলাই লামার আগমন উপলক্ষ্যে বিস্ফোরণ ঘটানর চেষ্টার অভিযোগে মুর্শিদাবাদের শমশের গঞ্জ, ধুলিয়ান প্রভৃতি অঞ্চল থেকে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

 

  • ২০১৪ র খাগড়াগড় বিস্ফোরণ সূত্রে জেএমবি-র নাম সংবাদে আসে।

 

  • বছর দুয়েক আগে কলকাতা স্টেশন থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বেশ কয়েকজনকে আনসার-উল-বাংলা’র সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে।

 

  • ২০১২ সালের ৮ এপ্রিল মেটিয়াবুরুজের লোহা গলিতে এক বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় হারুন রশিদ নামে এক ব্যক্তিকে। হারুনকে কলকাতা পুলিশের এসটিএফ সিমি বা স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া-র সদস্য বলে উল্লেখ করেছিল।

 

  • এই বছরের মার্চ মাসে উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এম এ প্রথম বর্ষের ছাত্রী তানিয়া পারভিনকে লস্কর-ই-তৈবার সাথে যোগাযোগের অভিযোগে।

 

  • এই বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হন হুগলি জেলার মেয়ে প্রজ্ঞা দেবনাথ, বা আয়েশা জান্নাত মোহনা। তার বিরুদ্ধে জেএমবি-র সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।

 

‘আল কায়দা’, ‘আইএস’, ‘হিজবুল মুজাহিদিন’, ‘লস্কর-ই-তৈবা’, ‘সিমি’ প্রভৃতি ইসলামিক সংগঠনগুলির যেমন অস্তিত্ব আছে, তেমনি ‘অভিনব ভারত’, ‘ সনাতন সংস্থা ’, ‘বজরং দল’ প্রভৃতি হিন্দু সংগঠনের অস্তিত্বও আছে। কিন্তু ‘জঙ্গি’ সন্দেহে যাদের গ্রেপ্তার করা হয় তারা সবাই একটি বিশেষ ধর্মের মানুষ। আরো পরিষ্কার করে বললে এরা সবাই মুসলমান। ব্যতিক্রম সাধ্বী প্রজ্ঞা, কর্নেল পুরোহিত, অসীমানন্দরা, বা গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকারী সন্দেহে ধৃত সনাতন সংস্থার সদস্যরা। আমাদের ভারত রাষ্ট্রের অভিমুখ যেহেতু ‘হিন্দু ‘ রাষ্ট্রের দিকে, তাই সাধ্বী প্রজ্ঞারা সংসদ আলো করে থাকেন।

 

‘জঙ্গি’ সন্দেহে একটি বিশেষ ধর্মের যে মানুষগুলিকে গ্রেপ্তার করা হয়, তাদের অধিকাংশের পরিণতি কী হয়, এ-প্রশ্ন অনেকদিন ধরেই মাথার মধ্যে ঘুরত। খুঁজতে খুঁজতে যা তথ্য পাওয়া গেল তা চমকে যাওয়ার মত।

 

“ফ্রেমড, ড্যামন্ড, আ্যকুইটেড: ডোসিয়ারস অফ ‘ভেরি’ স্পেশাল সেল” শীর্ষক একটি দলিলে জামিয়া টিচার্স সলিডারিটি অয়াসোসিয়েশন দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলের হাতে ‘সন্ত্রাসবাদী’ সন্দেহে গ্রেপ্তার মানুষদের ১৬টি মামলার পর্যালোচনা করেছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন, যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তাঁদের অধিকাংশই আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন।

 

সিমি সংক্রান্ত মামলাগুলি নিয়ে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “…Out of the 111 cases registered against SIMI members, 97 have resulted in acquittals.’

 

তথ্যের আয়নায় 

এক ঝলকে কিছু তথ্যে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

 

১৯৯৩ সালে হায়দরাবাদের একটি মুসলিম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিস্ফোরণ ঘটে। তাতে  যুক্ত থাকার অভিযোগে হায়দরাবাদ পুলিশ তুলে নিয়ে যায় কর্নাটকের গুলবার্গার বাসিন্দা নিসারউদ্দিন আহমেদকে। ১৯৯৩-র এপ্রিলে গ্রেপ্তার করা হয় নিসারের দাদা, পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার জহিরউদ্দিনকে। যে ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ তাঁদের তুলে নিয়ে যায়, তাতে কোনও দিনই অবশ্য তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। অন্য একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনায় তাঁদের জড়িয়ে দেওয়া হয় এবং টাডা প্রয়োগ করা হয়। সবক’টি মামলাতেই নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে যখন নিসার কারাগারের বাইরে পা রাখলেন, তত দিনে কেটে গিয়েছে ২৩টা বছর।

 

১৯৯৮ সালে একটি বিস্ফোরণে জড়িত অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় আমির খানকে। এর পর একের-পর-এক মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়। সমস্ত মামলা থেকেই অব্যাহতি পেয়ে, নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে যখন তিনি পা রাখলেন জেলখানার বাইরে, ততদিনে কেটে গিয়েছে ১৪টা বছর। আমিরের একমাত্র অপরাধ– তিনি দেশের হয়ে অন্য দেশের চরবৃত্তি করতে অস্বীকার করেছিলেন।

 

২০০১-এর ৩১ জুলাই সবরমতী এক্সপ্রেসে বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় গুলজার আহমেদ ওয়ানিকে। তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছিলেন। দিল্লি, মহারাষ্ট্র এবং উত্তরপ্রদেশে আরও ১০টি বিস্ফোরণের মামলায় তাঁকে জড়িয়ে দেওয়া হয়। সমস্ত মামলায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে ২০১৭ সালে তিনি মুক্তি লাভ করেন। এর মাঝে কেটে গেছে ১৬টা বছর।

 

২০০২-এর ২৪ সেপ্টেম্বর গুজরাটের অক্ষরধাম মন্দিরে হামলায় ৩৩ জন মারা যান এবং ৮৬ জন জখম হন। হামলাকারীরা পাকিস্তানের মদতপুষ্ট বলে গুজরাট পুলিশ ঘোষণা করে। ষড়যন্ত্রে জড়িত, এই অভিযোগে মুফতি আবদুল কাইয়ুম-সহ ৬ জন ১১ বছর কারাবাসের পর সুপ্রিম কোর্টে নির্দোষ প্রমাণিত হন। এদেঁর মধ্যে তিন জন দায়রা আদালতে এমনকি মৃত্যুদণ্ডেও দণ্ডিত হয়েছিলেন। মুফতির অপরাধ, তিনি গুজরাট দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছিলেন।

 

২০০৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ‘সন্ত্রাসবাদী’ অভিযোগে দিল্লিতে গ্রেপ্তার হন অনজুম জামারুদ হাবিব। পুলিশ হেফাজতে যথাবিহিত নির্যাতন সহযোগে ‘জিজ্ঞাসাবাদে’র পর তাঁর ঠাঁই হয় তিহার জেলে। পোটা-য় দোষী সাব্যস্ত হন দায়রা আদালতে। ২০০৭-এর ডিসেম্বরে যখন তিনি মুক্তি পেলেন, তত দিনে কেটে গিয়েছে পাঁচটা বছর। অনজুম ছিলেন ‘মুসলিম খোয়াতিন মরকজ’ নামে এক নারী সংগঠনের সভানেত্রী এবং কাশ্মীরের হুরিয়ত কনফারেন্সের সদস্য।

 

২০০৫-এর ২৯ অক্টোবর দিল্লির তিনটি স্থানে বিস্ফোরণ ঘটে এবং ৬৭ জন মারা যান। ঘটনায় যুক্ত সন্দেহে কাশ্মীর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মহম্মদ রফিক শাহ, মহম্মদ হুসেইন ফজিলি এবং তারিক আহমেদ দারকে। গ্রেপ্তার করে সেই দিল্লি পুলিশের ‘স্পেশাল সেল’। ১২ বছর পর অতিরিক্ত সেশন জজ রীতেশ সিং এঁদের তিন জনকেই নির্দোষ ঘোষণা করেন। কাশ্মীরের মানুষ হওয়াটাই ছিল রফিকদের হয়রানির কারণ।

 

২০০৬ সালে আল বদর নামে একটি সংগঠনের হয়ে ‘সন্ত্রাসবাদী’ কাজকর্ম চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় ইরশাদ আলি ও মৌরিন কামারকে। দশ বছর কারাযন্ত্রণা ভোগ করার পর তাঁরা বেকসুর খালাস পান ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। খোদ সিবিআই তদন্ত রিপোর্টে জানিয়েছিল “…the duo were IB and Special Cell informers and had been falsely implicated.”

 

২০০৬-এর ১১ জুলাই মুম্বইয়ে লোকাল ট্রেনে অল্প সময়ের ব্যবধানে অনেকগুলি বিস্ফোরণ ঘটে। ১৮৮ জন মারা যান। ওই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তার করা হয় আবদুল ওয়াহিদ শেখকে। ন’বছর কারাবাসের পর আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পান ২০১৫ সালে।

 

২০০৬-এরই ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের মালেগাঁওয়ে হামিদিয়া মসজিদের কাছে বিস্ফোরণ ঘটে। ৩৭ জন মারা যান। জখম হন শতাধিক। ঘটনায় জড়িত অভিযোগে মহম্মদ জহিদ, রইস আহমেদ, অব্রার আহমেদ, নুরুল হুদা-সহ ন’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মহারাষ্ট্র কন্ট্রোল অফ অঅর্গানাইজড ক্রাইম এক্ট (এমসিওসিএ) প্রয়োগ করা হয়। দশ বছর পর ২০১৬ সালে আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে ৯ জনই মুক্তি পান।১০

 

অন্তরালের অন্ধকারে

উপরের তথ্যগুলি দেখে যে কেউ বলতেই পারেন, তদন্তে ভুল হয়েছে। সঠিক তদন্ত হলে এঁরা ঠিকই সাজা পেতেন। আপাতদৃষ্টিতে সেটা মনে হওয়া হয়তো খানিক স্বাভাবিকও। তবে সেই আপাত স্বাভাবিকতার পিছনে কিছু অস্বাভাবিক বিষয় উঠে এসেছে, এ বার সেগুলির দিকে নজর দেওয়া যাক।

 

‘সন্ত্রাসবাদী’ সন্দেহে আটক ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তারের আগে দীর্ঘদিন বেআইনি ভাবে হেফাজতে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করা হয়েছে প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই। উদ্দেশ্য একটাই, পুলিশের পছন্দমতো স্বীকারোক্তি আদায়।

 

২০০৬-এর সেপ্টেম্বরে মহারাষ্ট্রের মালেগাঁওয়ে বিস্ফোরণে অন্যতম অভিযুক্ত এবং পরে নির্দোষ প্রমাণিত অব্রার আহমেদ জানিয়েছেন, তাঁর আঙুলের সমস্ত নখ উপড়ে ফেলা হয়। দু’টি জ্বলন্ত সিগারেট তাঁর নাকের ছিদ্রে ঢুকিয়ে চেপে ধরা হত। একদিন রাতে তাঁকে জোর করে প্রচুর জল খাওয়ানো হয়। প্রস্রাবের বেগ এলে তাঁকে একটি বালতি দিয়ে তার মধ্যে প্রস্রাব করতে বলা হয়। আর প্রস্রাব শুরুর সাথে সাথে তাঁর শরীরে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করা হয়। তিনি জ্ঞান হারান।

 

এ ধরনের অত্যাচার ‘সন্ত্রাসবাদী’ সন্দেহে আটক সবাইকেই ভোগ করতে হয়েছে।

 

অক্ষরধাম মন্দিরে হামলায় জড়িত সন্দেহে মুফতি আবদুল কাইয়ুম-সহ ৬ জনকে ২০০৩-এর ১ অগস্ট থেকে ১৭ অগস্টের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে গুজরাট পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ বেআইনি ভাবে হেফাজতে রেখে সব ধরনের অত্যাচার চালায়। ‘এনকাউন্টার’ করে দেওয়ারও ভয় দেখানো হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁরা যখন পুলিশের পছন্দমতো স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হন, তখন ২৯ অগস্ট গ্রেপ্তার দেখানো হয়। অক্ষরধাম মামলায় তাঁদের কী ভূমিকা হবে, তাও তাঁদেরই ঠিক করতে বলা হয়। অক্ষরধামে হামলা, হারীন পান্ড্য হত্যা অথবা গোধরা-কাণ্ড– এই তিনটি মামলার কোনও একটি বেছে নেওয়ার প্রস্তাবও তাঁদের দিয়েছিল মোদী-ময় গুজরাট পুলিশ।১১

 

আমির খান তাঁর বইতে লিখেছেন: “The next morning they took us back to the rooms in the Inter-state Crime Cell. It was here that the police told me that I had to admit to being involved in bomb blasts. They told me I had to admit to the charges and since the case was false I would come out in a few years. When I resisted I was beaten. I was made to lie on my stomach and my legs and arms were pulled together and joined in an arch.”১২

 

২০০৬-এ মুম্বই লোকাল ট্রেনে বিস্ফোরণের মামলায় নির্দোষ প্রমাণিত আবদুল ওয়াহিদ শেখ জানিয়েছেন, হেফাজতে থাকাকালীন তাঁকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তিনি যদি রাজসাক্ষী হন, তা হলে ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু তিনি রাজি হননি। ৮০ দিন তাঁকে বেআইনি ভাবে হেফাজতে আটকে রাখা হয়।

 

২০০৬-এ মুম্বইয়ে লোকাল ট্রেনে বিস্ফোরণের ঘটনায় আর এক বন্দি এহেসান কুতুব জানিয়েছেন, হেফাজতে থাকাকালীন মহারাষ্ট্র এটিএসের তৎকালীন প্রধান কেপি রঘুবংশী রাজসাক্ষী হওয়ার জন্য তাঁকে এমনকি ২৫ লক্ষ টাকা অফার করেছিলেন। তিনি তা প্রত্যাখান করেন।

 

এই ট্রেন বিস্ফোরণে জড়িত অভিযোগেই ধৃত এবং ২০১৫-য় দায়রা আদালতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত এহতেসান কুতুবুদ্দিন সিদ্দিকি সেন্ট্রাল জেলের ‘আন্ডা সেলে’ বন্দি থাকাকালীন মিল্লি গেজেট- এর সম্পাদককে একটি চিঠি লেখেন। চিঠির বিষয়বস্তু সম্পর্কে বলা হয়েছে, “It described in detail not only the tools and devices of torture in the various offices of ATS and Mumbai police, but also the farce of Narco analysis, conducted without consent of the accused, or permission from the court.” যদিও নারকো টেস্টে প্রাপ্ত স্বীকারোক্তি আদালতগ্রাহ্যও নয়।১৩

 

নারকীয় নকশা 

এই প্রসঙ্গে আমরা একটু ব্যাঙ্গালোর ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর ড. এস মালিনীর কথা বলব। ইনি নারকো টেস্টের সময় নিষিদ্ধ সোডিয়াম পেন্টাথল ব্যবহার করতেন। পুলিশের চাহিদা মতো নারকো টেস্টের রিপোর্ট প্রস্তুত করতে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ইনি ড. নারকো এবং নারকো কুইন, এই দুই নামে কুখ্যাতি বা ‘সুখ্যাতি’ও অর্জন করেন।

 

এস মালিনীর বিরুদ্ধে নারকো পরীক্ষার সময় অত্যাচারের অভিযোগ উঠেছিল। দীর্ঘ দিন কারাবাসে থাকা নকশালপন্থী রাজনৈতিক কর্মী অরুণ ফেরেরা ড. মালিনী সম্পর্কে বলেছেন, “During narco- analysis, she slapped and abused me, pinched my ears with pliers, and even administered electric shocks to me and my co-accused to keep us from turning unconscious”। ১৪ বয়সে কারচুপির অভিযোগে ২০০৯-এর ফেব্রুয়ারিতে চাকরি যায় সেই মালিনীর।১৫

 

নারকো টেস্টের সিডি আদালতে পেশ করার সময়েও বিকৃত করা হয়েছিল। বিকৃতির নমুনা পেশ করা যাক:

 

প্র: কতগুলি বোমা রাখা হয়েছিল?

উ: সাত।

আসলে প্রশ্ন ছিল এ রকম–

প্র: ছয়ের পরের সংখ্যা কত?

উ: সাত।

 

প্র: বিস্ফোরণের ষড়যন্ত্রে কারা কারা জড়িত?

উ:  ড. তনভির, ফয়জল, কামাল, মুজম্মিল, আসিফ।

আসলে প্রশ্ন ছিল–

প্র: তোমার পরের সেলে কারা থাকে?

উ:  ড. তনভির, ফয়জল, কামাল, মুজম্মিল, আসিফ।১৬

 

যে মানুষগুলি আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হলেন, তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল কেন? এ প্রশ্ন উঠতেই পারে। যুক্তি হিসাবে কেউ বলতেই পারেন, পুলিশ এমনি এমনি কাউকে গ্রেপ্তার করে না। সাধারণ ভাবে তাই মনে হবে। কিন্তু মালেগাঁও বিস্ফোরণে যুক্ত সন্দেহে ধৃত নুরুল হুদা বা ২০০৬ সালে মুম্বইয়ে লোকাল ট্রেনে বিস্ফোরণে যুক্ত সন্দেহে ধৃত এহতেসান কুতুবের অভিজ্ঞতা শুনলে ধারণা পাল্টে যেতে পারে।

 

নুরুলকে মারতে মারতে বলা হয়েছিল, ‘আমরা জানি বিস্ফোরণ ঘটানো তোমার কম্ম নয়, কিন্তু আমাদের জেল ভর্তি করার জন্য তোমাদের প্রয়োজন।’ ‘তোমাদের’ বলতে এখানে মুসলমানদের কথা বলা হচ্ছে।১৭

 

মহারাষ্ট্র এটিএসের তৎকালীন প্রধান রঘুবংশী কুতুবকে থার্ড ডিগ্রি দিতে দিতে বলেছিলেন, “ভারতের মুসলমানরা কেবলমাত্র জেলে যাওয়ার জন্য এবং এনকাউন্টারে মরার জন্য।”১৮

 

বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থাগুলির মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষের অভিযোগ বারে বারেই উঠেছে। আমির খান লিখেছেন, “I had never heard such dirty and violent language. The abusive language was full of antimuslim innuendos.”১৯

 

এহতেসান কুতুবুদ্দিন মুম্বই সেন্ট্রাল জেলের ‘আন্ডা সেল’ থেকে যে চিঠি লিখেছিলেন, তাতে লেখা ছিল, “On 29 Sept. 2006 I was tortured continuously five hours using third degree methods…later I was produced before police commissioner A N Roy and ATS chief K P Raghuvanshi…Raghuvanshi told me that I have been implicated in the blast case and forget about India being a democratic country. India is a Hindu rastra and there is no place for Muslims in India. Muslims in India are only for jail and encounter.” ২০

 

পুলিশ এবং অন্য তদন্তকারী সংস্থায় হিন্দুত্ববাদী বা ব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্য সম্পর্কে সংসদ হানায় ধৃত এবং পরবর্তীতে আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত অধ্যাপক এসএ আর গিলানি লিখেছেন, “I have seen the intelligence agency very closely. Sitting with them, I never felt I was not in a government office of a democratic country. Instead, it felt like the RSS headquarters.”

 

অলিখিত বিদ্বেষ-বিধি 

ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক দেশ। অন্তত দেশের সংবিধানে তাই লেখা আছে। অথচ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে মুসলমানদের প্রতি পুলিশ ও বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থায় কর্মরতদের আচরণ দেখলে তা মনে হয় না। এই বিদ্বেষের উৎস কোথায়? তদন্তকারী সংস্থায় নিয়োগের ক্ষেত্রে ভারত রাষ্ট্রের নীতির মধ্যেই আসলে এর বীজ নিহিত আছে।

 

আউটলুক পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে,  “… the unwritten code within the agency was that Muslims could not be inducted in. That code vis-a-vis Muslims is still followed. From 1969 till today—RAW’s current staff strength is about 10,000—it has avoided recruiting any Muslim officer. Neither has the National Technical Research Organisation (NTRO), a crucial arm of external intelligence. The Intelligence Bureau (IB) with 12,000 personnel has been a little more open. It has a handful of Muslim officers,…”।২১ তেহেলকা-য় প্রকাশিত আর একটি প্রতিবেদন থেকে জানতে পারছি, “Sikhs are banned from SPG, formed in 1984 to provide security to the prime minister, and the National Security Guard (NSG), the elite anti-terror force functioning under the Union Ministry of Home Affairs.’২২

 

উপরে পরিবেশিত তথ্য থেকে যদি কেউ  সিদ্ধান্তে আসেন যে, শুরু থেকেই ভারত রাষ্ট্রের ভিতর এই হিন্দুত্ববাদী ঝোঁক রয়ে গেছে, তা হলে তাঁকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। এ সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় হয় তেহেলকা-য় প্রকাশিত প্রতিবেদনটির এই অংশ থেকে, যেখানে বলা হয়েছে, “Former IB joint director MK Dhar writes in his book Open Secrets (2005) that his anti-Muslim beliefs got strengthened while he was being trained for the IB: ‘I was surprised to find that the RSS and the IB shared an anti-Muslim attitude,’ he writes. ‘During training, Muslims were projected as a threat to the system. This attitude was instilled in the officers’ minds.” ২৩

 

আইবি-র প্রতিষ্ঠা হয় ১৮৮৭ সালে লন্ডনে সেক্রেটারি অফ স্টেট ফর ইন্ডিয়ার অধীনে, সেন্ট্রাল স্পেশাল ব্রাঞ্চ নামে।২৪ এর ১৩২ বছরের ইতিহাসে প্রথম বারের জন্য ডিরেক্টর নিযুক্ত হন একজন মুসলমান, সৈয়দ আসিফ ইব্রাহিম, ২০১২ সালে।

 

কত না গুণ গোয়েন্দাদের

শুধুমাত্র নির্দোষ মানুষকে জেনেবুঝে ‘জঙ্গি ‘বানানোই নয়, মৃতের পরিচয় পাল্টে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে।

 

সবারই মোটামুটি স্মরণে আছে ২০১৪-র ২ অক্টোবর বর্ধমানের খাগড়াগড়ে একটি বাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটে। ঘটনাস্থলেই এক জনের মৃত্যু হয়। তাঁর নাম শাকিল আহমেদ। বিস্ফোরণে জখম আর এক জনের মৃত্যু হয় বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে। প্রথম দিন সংবাদমাধ্যমে তাঁর নাম কিন্তু ছাপা হয়েছিল স্বপন মণ্ডল। দ্বিতীয় দিন থেকে সংবাদমাধ্যম জানায়, তাঁর নাম শোভন মণ্ডল বা সুবহান মণ্ডল। প্রায় এক মাস বর্ধমান মর্গে মৃতদেহটি রাখা ছিল অশনাক্ত অবস্থায়। ৯ অক্টোবর কেন্দ্রীয় সরকার এনআইএ-র হাতে খাগড়াগড় বিস্ফোরণের তদন্তভার তুলে দেয়। ২৩ অক্টোবর এনআইএ জানায় বিস্ফোরণের সাথে বাংলাদেশের জামাত-উল মুজাহিদিন বা জেএমবি যুক্ত।

 

১২ নভেম্বর প্রথম বর্ধমান পুলিশের তরফে বর্ধমান হাসপাতালে জানানো হয়, মৃতদেহটি নাকি জামশেদ শেখের পুত্র করিম শেখের এবং জামশেদ শেখ দেহটি শনাক্ত করেছেন। মৃতদেহটি জামশেদ শেখের হাতে তুলে দেওয়ার আবেদনও জানান হয়। ওই দিনই বীরভূমের কীর্ণাহারের বাসিন্দা জামশেদ শেখ দেহটি গ্রামে নিয়ে গিয়ে সৎকারও করেন। যদিও জামশেদ শেখ নিজে জানান, তিনি দেহটি শনাক্ত করেননি। কারণ মৃতদেহটি শনাক্ত করার মতো অবস্থাতেই ছিল না। বিস্ফোরণে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল।২৫

 

আউটলুক পত্রিকায় ৮ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখে এ-বিষয়ে তাৎপর্যপূর্ণ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, এনআইএ-র লোকেরা মৃতদেহটি গ্রহণের জন্য জামশেদের উপর চাপ দিতে থাকেন এবং ভয় দেখান বলে জামশেদ অভিযোগ করেছেন। এনআইএ তাঁর বাড়িতে গিয়ে ভয় দেখায় বলেও অভিযোগ। শুধু তাই নয়, তাঁকে মোবাইল ফোনে একটি ছবি দেখিয়ে বলা হয়, এটি তাঁর ছেলে করিম শেখের ছবি। ছবির কোন প্রিন্ট আউট অবশ্য হাতে দেওয়া হয়নি। ২৬

 

জামশেদের এক ছেলের নাম করিম এবং তিনি কাজের খোঁজে কেরালায় গিয়েছিলেন। কিন্তু মৃতদেহটি করিমের নয় বলেই জানিয়েছেন জামশেদ এবং তাঁর গ্রামের লোকেরা। এ ক্ষেত্রে এনআইএ ডিএনএ পরীক্ষার আশ্রয় নিতে পারত, কিন্তু তা না করে এত তাড়াহুড়োর কারণ কী? যেখানে ২০১৪-র ৭ নভেম্বর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে জানা যাচ্ছে, “The NIA has now opted for Mondal’s DNA profiling to establish his identity. A Central Forensic Science Laboratory team recently visited the police morgue in Burdwan and collected samples from Mondal’s teeth, hair and nails for for DNA testing.’২৭ আউটলুক পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যাচ্ছে, পারভেজ খান নামে এক জন পুলিশের ইনফর্মার তাঁকে (প্রতিবেদককে) জানিয়েছেন, আহতদের তিনি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং হাসপাতালে মৃত ব্যক্তির সুন্নতের চিহ্ন ছিল না। অর্থাৎ মৃত ব্যক্তি মুসলমান নন।২৮

 

এখানে আর একটি প্রশ্ন উঠে আসে। করিম শেখ নামে জামশেদের যে পুত্র কেরালায় কাজের সন্ধানে গিয়েছিলেন, তাঁর কী হল? তাঁর কোনও সন্ধান পাওয়া গেল কি? সে অবশ্য এখনও রহস্যই।

 

চোপ, আদালত চলছে

এ বার আইন-আদালতের বিষয়ে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। গ্রেপ্তার হওয়ার পর মামলা শুরু হতেই লেগে যায় কয়েক বছর। এর পর নিম্ন আদালত, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট হয়ে মামলা শেষ হতেই কেটে যায় দীর্ঘ সময়। অনেককেই এ ধরনের  একাধিক মামলায় জড়ানো হয়। সে ক্ষেত্রে অবস্থা আরও ভয়ঙ্কর। যেমন আনিশ আহমেদ, মহম্মদ আলি-সহ আরও তিন জনকে ২০০১-এর সেপ্টেম্বরে সিমি নিষিদ্ধ হওয়ার পর জব্বলপুর পুলিশ এঁদের গ্রেপ্তার করে। মাস দু’য়েক পর এঁরা জামিনে ছাড়া পান। মামলাটি ঠান্ডা ঘরে চলে যায়। ২০০৮ সালে এই মামলায় তাঁদের আবার গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৮-র মার্চে তাঁরা বেকসুর খালাস পান। কিন্তু মুক্তি থেকে যায় অধরাই। কারণ, এর মধ্যে গুজরাট পুলিশ তাঁদের ৩৮টি মামলায়  জড়িয়েছে। এই ৩৮টি মামলায় মোট সাক্ষীর সংখ্যা ৩০০০ এবং গত দশ বছরে মাত্র ১০০০ জনের সাক্ষ্য সমাপ্ত হয়েছে।২৮

 

মামলা চালানোর ক্ষেত্রে একটি বিরাট অন্তরায় আর্থিক দায়ও। নিম্ন আদালত থেকে সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত মামলা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং উপযুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন আইনজীবী নিয়োগে যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, সেই ভার বহন করার মতো সংগতি অল্প মানুষেরই থাকে। তাই যথোপযুক্ত আইনি লড়াই না-লড়তে পারার কারণে ‘জঙ্গি’ সন্দেহে গ্রেপ্তার হওয়া অনেক মানুষই অপরাধী প্রমাণ হয়ে যান কোনও অপরাধ না করেও।

 

যে মানুষগুলি দীর্ঘ কারাবাসের শেষে, বিস্তর আইনি জটিলতা পার হয়ে আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হন, তাঁদের জীবন থেকে হারিয়ে যায় জীবনের সেরা সময়, যা কোনওদিনই তাঁরা আর ফিরে পাবেন না। যে অপরাধ তাঁরা করেননি তার দায় বয়ে বেড়াতে হবে সারা জীবন। এই মানুষগুলি যখন ক্ষতিপূরণ চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন, তখন তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

 

অক্ষরধাম মন্দিরে আক্রমণের মামলায় সুপ্রিম কোর্টে নির্দোষ প্রমাণিত ছ’জন ক্ষতিপূরণ চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি দীপক মিশ্রের ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তাঁদের আইনজীবী কে টি এস তুলসী সওয়াল করেছিলেন, “The apex court gave them back freedom but who can give them back the 10 years they spent behind bars for no fault? The state must adequately compensate them as it violated the right to life brazenly.”২৯

 

বিচারপতিদ্বয় ক্ষতিপূরণের আবেদন নাকচ করে বলেন, এ-ধরনের ক্ষতিপূরণ নাকি ‘ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত’ স্থাপন করবে।

 

এ -প্রসঙ্গে সুমন্ত ব্যানার্জি লিখেছেন, “The apex court’s dismissal of the plea has major implications for the human rights movement in India. …It virtually sanctions the continuation of the impunity with which the police and intelligence agencies indiscriminately arrest Muslim youths (on charges of ‘Islamic terrorist’ links) and tribal men and women in Chattishgarh and other areas (accusing them of Maoist links). It provides them with immunity against the punishment that they deserve for their policy of persecuting innocent citizens.’৩০

 

 কোনও প্রশ্ন নয়

পুলিশ এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলির এ-হেন ভূমিকায় তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক এবং তাদের প্রতি আস্থার ভিত টলে যাচ্ছে। ফলে, মানুষের মধ্যে আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বাড়ছে গণপ্রহারের মতো ঘটনাও। তথাকথিত গো-রক্ষকদের সুপরিকল্পিত গণপ্রহারের নীল নকশার কথা মাথায় রেখেই এ কথা বলছি।

 

গোয়েন্দা সংস্থাগুলির বেলাগাম আচরণের অন্যতম কারণ, তারা কারও কাছে দায়বদ্ধ নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন-সহ পৃথিবীর সমস্ত গণতান্ত্রিক দেশে গোয়েন্দা সংস্থাগুলি তাদের দেশের আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ। সিআইএ-র মত সংস্থাও মার্কিন কংগ্রেসে জবাব দিতে বাধ্য।৩১ ব্যতিক্রম ভারত। এখানে আইবি বা ‘র’ বা সিবিআই-এর মতো গোয়েন্দা সংস্থাগুলিকে সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। ‘সন্ত্রাসবাদ’ সংক্রান্ত ঘটনাগুলির তদন্তে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ  আইবি-র বিরুদ্ধে বারে বারেই উঠেছে। ইশরাত জাহান বা সোহরাবুদ্দিন শেখ ভুয়ো সংঘর্ষে হত্যার ঘটনায় আইবি-র ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে, কিন্তু তাদের কাজকর্ম খতিয়ে দেখার এক্তিয়ার যে এ-দেশের সংসদেরও নেই।

 

কেন্দ্রীয় সরকারের ক্যাবিনেটের অতিরিক্ত সচিব বি. রমন সঠিক ভাবেই লিখেছেন, “The public and the Parliament have a right to know to what extent the agencies have been producing results and what are the areas of their non-performance. The Parliament has a right to know what kind of financial controls are in place, who exercises those controls and to what extent they are effective.”৩২ মুশকিল হল আজকের দিন পর্যন্ত আইবি বা সিবিআই-এর মতো সংস্থার কাজের এক্তিয়ার এবং দায়িত্ব নিয়ে সরকারি কোনও ঘোষণাই নেই। আবার আজকের দিন পযন্ত ‘র’-এর কোনও আইনি অস্তিত্বই নেই। কারণ, ‘র’ প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৬৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর এক প্রশাসনিক আদেশের ভিত্তিতে।৩৩ সংসদে এ-নিয়ে কোনও আইন প্রণয়ন হয়নি।

 

২০১৭-১৮ বাজেটে আইবি-র জন্য ১৫৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল।৩৪ সেই টাকার হিসাব জানারও কোনও উপায় নেই, কারণ সিএজি-রও এক্তিয়ার নেই আইবি-র হিসাব খতিয়ে দেখার। যদিও এ টাকা আমার, আপনার করের টাকা।

 

র, আইবি এবং এনটিআরও-কে সংসদের কাছে দায়বদ্ধ করার উদ্দেশ্যে এবং এই সংস্থাগুলিকে সিএজি-র আওতায় আনার আবেদন জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা করেছিল সেন্টার ফর পাব্লিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন নামে একটি অসরকারি সংস্থা। মামলা খারিজ করে দিয়ে বিচারপতি দীপক মিশ্র এবং বিচারপতি শিবকীর্তি সিং বলেন, “We are not inclined to entertain this petition…Trying to get into the domain of intelligence may create dent in national security,” তাঁরা আরও বলেন, “We do not think the court should entertain such kinds of petition which deal with security of the country.”৩৫ ‘দেশের নিরাপত্তার’ দোহাই দিয়ে এদের যা খুশি করার লাইসেন্স দিয়ে দেওয়া হল।

 

নাগরিকের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ

রাজনৈতিক দলগুলি কোনওদিন এ-বিষয়ে সরব হয়নি। কারণ, যে দল যখন ক্ষমতায় থেকেছে তখন তারা গোয়েন্দা সংস্থাগুলিকে কাজে লাগিয়ে বিরোধীদের শায়েস্তা করার চেষ্টা করেছে। সুপ্রিম কোর্টেরই প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি লোধা সিবিআই সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘খাঁচায় বন্দি তোতা।’

 

‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’র অছিলায় ভারত রাষ্ট্র তার নাগরিকের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। রাষ্ট্রকে সব সময়ই দেখিয়ে যেতে হয় যে সে ‘আক্রান্ত’, তার বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র’ চলছে, রাষ্ট্র ‘বিপন্ন’ মানে নাগরিকরাও ‘বিপদে’।  তাই আত্মরক্ষার তাগিদে, নাগরিকদের ‘সুরক্ষার’ জন্য তাকে কঠিন পদক্ষেপ করতে হচ্ছে। তাই টাডা, পোটা, আফস্পা, ইউএপিএ-র মতো দানবীয় আইনের আয়োজন। প্রয়োজন হয় অপারেশন গ্রিনহান্ট-এর। এ সবই নাকি আমার, আপনার মঙ্গলের জন্য। তাই, বিনা প্রশ্নে সব মেনে নিন। ‘কোনও প্রশ্ন নয়, নো কোয়েশ্চেন।’

 

আটের দশকে রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ ছিল শিখ সম্প্রদায়। শিখ মাত্রই ‘সন্দেহজনক উগ্রপন্থী’ এ রকম একটা ধারণা সে সময় রাষ্ট্র নির্মাণ করেছিল। প্রায় ২৫০০০ শিখ নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন।৩৬ এখন তার প্রতিপক্ষ মুসলমান এবং আদিবাসীরা। নতুন একটি প্রতিপক্ষও খুঁজে পেয়েছে রাষ্ট্র। তার নাম ‘আরবান নকশাল’। প্রতিবাদী, বিবেকবান, শিক্ষিত মানুষদের এখন এই নামেই অভিহিত করছে রাষ্ট্র। আর নিকেশ করে দিচ্ছে গোবিন্দ পানসারে, কালবুর্গি, দাভোলকর, গৌরী লঙ্কেশদের। শোনা যায় অভিনব ভারত, সনাতন সংস্থার মতো সংগঠনের নাম। তবু নাকি সন্ত্রাসের রং গেরুয়া হতেই পারে না।

 

এখানে লিখিত সংবিধান আছে, সংসদ আছে, আইন আছে, বিচার ব্যবস্থা আছে, সংবাদমাধ্যম আছে। নিয়ম করে নির্বাচন হয়। পালাবদলও হয়। গণতন্ত্রের আলো ঝলমল চেহারা ভেদ করে তার গভীরে ডুব দিলে চোখে পড়ে এক অদ্ভুত আঁধার। তার খাঁজে খাঁজে লুকিয়ে থাকে হিংসা। সে হিংসা একান্তই রাষ্ট্রের।

 

তথ্যসূত্র:

০১।    https://www.oneindia.com/india/111-cases-against-simi-and-there-are-already-97-acquittals-1937958.html

০২।   https://indianexpress.com/article/india/india-news-india/babri-masjid-demolition-train-blast-tada-supreme-court-acquitted-in-babri-anniversary-train-blasts-case-nisar-2824883/

০৩।   Mohammad Amir Khan with Nandita Haksar, Framed as a terrorist.

০৪।   https://www.hindustantimes.com/india-news/sabarmati-express-blast-kashmiri-research-scholar-acquitted-of-all-charges-after-16-years/story-bIHV4g5w6gzbM4gU7SmJGO.html

০৫।   Mufti Abdul Qayum, Eleven years Behind the Bars.

০৬।  http://www.kashmirlit.org/3155-2/

০৭।   https://thewire.in/uncategorised/setback-delhi-police-court-acquits-two-accused-2005-serial-blasts

০৮।   https://indianexpress.com/article/india/irshad-ali-maurif-qamar-acquitted-after-11-year-trial-in-terror-case-no-logs-no-fingerprints-delhi-court-points-to-lapses-in-police-probe-4485672/

০৯।   https://indianexpress.com/article/india/acquitted-in-mumbai-blasts-case-abdul-wahid-sheikh-pens-book-on-9-years-in-prison-4651780/

১০।    https://www.hindustantimes.com/india/how-malegaon-s-innocent-terrorists-lost-10-years-of-their-lives/story-YGqgBk3ejtu1egeIU4etvJ.html

১১।    Mufti abdul Qaum,  Eleven Years Behind the Bars.

১২।   Mohammad Amir Khan with Nandita Haksar, Framed as a terrorist, p 108.

১৩।   Manisha Sethi, Kafkaland, p 19.

১৪।    Cited by Manisha Sethi in Kafkaland, p 21.

১৫।   https://bangaloremirror.indiatimes.com/opinion/sunday-read/dr-narco-and-ms-hide/articleshow/22204505.cms

১৬।   Manisha Sethi, Kafkaland, p 20.

১৭।    https://www.hindustantimes.com/india/how-malegaon-s-innocent-terrorists-lost-10-years-of-their-lives/story-YGqgBk3ejtu1egeIU4etvJ.html

১৮।http://twocircles.net/2010oct18/my_75_days_horror_hands_mumbai_ats.html

১৯।   Mohammad Amir Khan with Nandita Haksar, Framed As A Terrorist, p 90

২০।http://twocircles.net/2010oct18/my_75_days_horror_hands_mumbai_ats.html

২১।   https://www.outlookindia.com/magazine/story/muslims-and-sikhs-need-not-apply/233087

২২।   http://old.tehelka.com/the-bias-against-minorities-in-intelligence-recruitments/

২৩।   http://old.tehelka.com/the-bias-against-minorities-in-intelligence-recruitments/

২৪।   http://www.allgov.com/india/departments/ministry-of-home-affairs/intelligence-bureau?agencyid=7590

২৫।   https://www.outlookindia.com/magazine/story/that-house-in-burdwan/292735

২৬।  https://www.outlookindia.com/magazine/story/that-house-in-burdwan/292735

২৭।   https://indianexpress.com/article/cities/kolkata/a-month-on-nia-yet-to-confirm-second-victims-identity/

২৮।  “Once at the hospital, Khan tied the feet and hands of Swapan/ Subhan/ Karim to the bed posts on the doctors’ instructions. “His face was covered in blood, his right eye was blown off completely and there was a gaping wound in his chest,” says Khan. Shown the photograph the NIA had showed Jamshed, Khan said the body in the picture did not have the wounds he had seen on the body. Willing to give his testimony, he claims the police have actually told him to lie low. Khan also insists the critically wounded man was uncircumcised. Karim had been circumcised as a child.”

https://www.outlookindia.com/magazine/story/that-house-in-burdwan/292735

২৯।   https://thewire.in/law/cops-judges-andterrorists

৩০।   https://thewire.in/law/cops-judges-andterrorists

৩১।   https://www.nationalheraldindia.com/opinion/herald-view-oversight-of-nia-ib-and-cbi-by-parliament-necessary

“ The Central Intelligence Agency (CIA) of the United States was created by the National Security Act of 1947 and specifically empowered by the Central Intelligence Agency Act of 1949 (CIA Act) to carry out the duties assigned to it by the 1947 Act.

http://www.asianage.com/opinion/columnists/101118/intelligence-agencies-need-a-legal-base.html

৩২।   https://www.outlookindia.com/website/story/ensure-oversight-and-accountability/263861?scroll

৩৩।  https://www.outlookindia.com/website/story/ensure-oversight-and-accountability/263861?scroll

৩৪।   https://www.business-standard.com/budget/article/rs-78-000-crore-budget-for-mha-rs-1-577-crore-for-ib-117020101192_1.html

৩৫।  https://www.indiatvnews.com/news/india/supreme-court-financial-audit-intelligence-agencies-57845.html

৩৬।  https://www.huffingtonpost.ca/harman-singh/jaswant-singh-khalra-canada_a_23522817/?ncid=other_email_o63gt2jcad4&utm_campaign=share_email

“Jaswant Singh Khalra exposed the murder of approximately 25000 Sikhs in the late 1980s / early 1990s, a figure many believe is just the tip of the iceberg”

 

 

  • লেখক মানবাধিকার কর্মী এবং মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর-এর সদস্য। 

 

 

 

 

 

 

 

 

Share this
Recent Comments
3
  • comments
    By: Shareef Ahmad on September 24, 2020

    We are small media group namely Eastern Voice from Assam. We need the author’s permission to use the text and sources to make an AV documentary. Can we do that? Thank You.

  • comments
    By: সুশান্ত কর on September 24, 2020

    খুব কাজের কথা লিখলেন… ধন্যবাদ!

  • comments
    By: Shah kamal on October 2, 2020

    এটা একটা জ্বলন্ত দলিল , সংগ্রহে রাখা জরুরি।

Leave a Comment