নেশা ও আসক্তি সম্পর্কে দুটি একটি কথা যা আমরা জানি না


  • September 17, 2020
  • (0 Comments)
  • 909 Views

ভারতবর্ষের প্রথম মাদক বিষয়ক আইন এনডিপিএস বলবৎ করা হয় ১৯৮৫ সালে, রাজীব গান্ধী সরকারের আমলে। তার নেপথ্যে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা ঘোষিত বিশ্বজোড়া মাদক-বিরোধী যুদ্ধের প্রভাব। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু রাজ্য সহ পশ্চিমি দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশই মাদক সেবন সম্পর্কে বিকল্প নীতির পথে হেঁটেছে। আমাদেরও বরং শুরু করতে হবে প্রাথমিক এবং মূলগত স্তর থেকে: প্রথমত, আসক্তি যে এক ধরনের অসুস্থতা সেকথা স্বীকার করতে হবে, তাকে বিপথগামী নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। লিখলেন রনি সেন 

 

মাদক ও আসক্তি বিষয় দুটি মূলগতভাবেই পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। অথচ ভারতবর্ষের নারকোটিক্স ড্রাগস অ্যান্ড সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস আইন (১৯৮৫)-এ ‘আসক্তি’ শব্দটি একবারের জন্যও উল্লেখ করা হয়নি। এনডিপিএস আইনটি আমাদের দেশে মাদক সেবন সংক্রান্ত বুনিয়াদি স্তরের সংসদীয় আইন। যে কোনও মাদক বা মানসিক অবস্থার উপর প্রভাব সৃষ্টিকারী যে কোনও পদার্থ (সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্স) সঙ্গে রাখা, বেচাকেনা করা, উৎপাদন করা ও ব্যবহার করার ক্ষেত্রে এই আইনটি প্রযোজ্য হয়। ১৯৮৬ সালে এই আইনের আওতাতেই নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো (এনসিবি) গঠিত হয়। তার উদ্দেশ্য ছিল এনডিপিএস আইনটি বলবৎ করা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মাদক-বিরোধী অধিবেশন ও চুক্তিতে ভারতবর্ষ যে অঙ্গীকারগুলি করেছে সেগুলি রক্ষা করা। এনডিপিএস আইনে মাদকাসক্ত ব্যক্তির আসক্তির চিকিৎসার কথাও বলা হয়েছে বটে, কিন্তু এই বিষয়টিকে বাস্তবে প্রয়োগ করার মতো কোনও বন্দোবস্তের অস্তিত্ব চোখে পড়ে না; আরও মূলগত প্রশ্নটি হল, এই আইনে তো আসক্তি কী তার কোনও সংজ্ঞাই দেওয়া হয়নি, সেক্ষেত্রে এই আইনের মাধ্যমে সাফল্যের সঙ্গে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা করা কীভাবে সম্ভব? উপরন্তু নিছক বিনোদনের জন্য যে ব্যক্তি মাদক সেবন করেন তাঁর সঙ্গে মাদকাসক্ত ব্যক্তির কোনও ফারাক করতেও আইনটি সমর্থ হয়নি।

 

ভারতবর্ষের প্রথম মাদক বিষয়ক আইন এনডিপিএস বলবৎ করা হয় ১৯৮৫ সালে, রাজীব গান্ধী সরকারের আমলে। তার নেপথ্যে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা ঘোষিত বিশ্বজোড়া মাদক-বিরোধী যুদ্ধের প্রভাব। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু রাজ্য সহ পশ্চিমি দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশই মাদক সেবন সম্পর্কে বিকল্প নীতির পথে হেঁটেছে। এরই অন্যতম অংশ গাঁজা সেবনকে আইনসিদ্ধ করা কিংবা গাঁজা সঙ্গে রাখা ও তা সেবন করাকে অপরাধের আওতা থেকে মুক্ত করার হিড়িক। ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতে এই বয়ানটিকে অন্ধের মতো অনুসরণ করার কোনও অর্থ হয় না। ১৯৮৫ সালে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যকভাবে অবগত না-হয়েই মাদক সেবনকে অপরাধের আওতাভুক্ত করে তড়িঘড়ি একটি আইন পাশ করে দিয়ে ঠিক সেই ভুলটিই করা হয়েছিল। আমাদের বরং শুরু করতে হবে প্রাথমিক এবং মূলগত স্তর থেকে: প্রথমত, আসক্তি যে এক ধরনের অসুস্থতা সেকথা স্বীকার করতে হবে, তাকে বিপথগামী নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে চলবে না।

 

আজ এনডিপিএস আইনটিকে দুর্নীতিগ্রস্ত, আক্রমণাত্মক মামলার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রক্তপিপাসু সংবাদমাধ্যমের কর্মসূচির সঙ্গেও তা খাপ খেয়ে যায়। গত ২৬ আগস্ট অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যু সংক্রান্ত তদন্তের সূত্রে এনসিবি-র পক্ষ থেকে অভিনেত্রী রিয়া চক্রবর্তী ও অন্যান্য কয়েকজনের বিরুদ্ধে এনডিপিএস আইনে একটি এফআইআর দায়ের করা হয়। এই লেখাটি লেখার সময় পর্যন্ত রিয়ার চব্বিশ বছরের ভাই ও সুশান্তের বাড়ির প্রাক্তন ম্যানেজার সহ আট জন ব্যক্তিকে এই তদন্তের সূত্রে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং রিয়াকে মুম্বইয়ের এনসিবি দপ্তরে জেরা করা হচ্ছে। যাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছেন তাঁদের এবং রিয়ার বিরুদ্ধে এনসিবি যে মামলা সাজিয়েছে তার ভিত্তি একটি নির্দিষ্ট অভিযোগ – তাঁরা সকলেই সুশান্তের মাদক সেবনে সহায়তা করেছেন এবং তাতে প্ররোচনা জুগিয়েছেন।

 

এই উচ্চকোটির মাদক কেলেঙ্কারির আখ্যানটি থেকে বোঝা যায় যে ভারতীয় সমাজে মাদক সেবন ও মাদকের আসক্তিকে নৈতিক সঙ্কট হিসেবেই দেখা হয়, জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত একটি বিষয় হিসেবে, অর্থাৎ তা বাস্তবত যা, সেই হিসেবে নয়। আসক্তি বিষয়টিকে যদি অসুস্থতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা ও স্বীকৃতি দেওয়া হয় তাহলে তার সঙ্গে জড়িত বহিষ্কারের প্রবণতা, অপবাদ ও অমর্যাদা স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। এক্ষেত্রে প্রথমত বোঝাপড়ায় আসতে হবে আইনের সঙ্গে: তার কারণ বর্তমানে আইন গোঁড়ামিতে আচ্ছন্ন ভ্রান্ত ধারণাগুলিকে জিইয়ে রাখার কাজটি করে চলেছে এবং নেশাসক্ত ও মাদক সেবনকারীদের পক্ষে সম্পূর্ণ নিরাপত্তাহীন একটি পরিবেশের সৃষ্টি করেছে – তা সে তাঁদের চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েই হোক কি আদালতে পেশ করার মাধ্যমেই হোক।

 

ভারতবর্ষে সামাজিক স্তরে বা আইনি স্তরে আসক্তিকে যেভাবে বোঝা হয় তার মধ্যে জটিলতা ও সূক্ষ্মতার বোধের গভীর অভাব আছে। আমাদের আইনে এক্ষেত্রে আমাদের সমষ্টিগত অজ্ঞতা ও পক্ষপাতেরই প্রতিফলন ঘটেছে। সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার বিশদে এবং বিস্তারিতভাবে আসক্তির সংজ্ঞা জানিয়ে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করেছে। এর ফলে নেশাসক্ত ব্যক্তিদের সফলভাবে চিহ্নিত করা ও তাঁদের চিকিৎসা করার কাজটি সহজ হয়ে যায় এবং যাঁরা ভুক্তভোগী তাঁরাও নির্দিষ্ট অধিকার পান; তাছাড়া এর ফলে জনগণের মধ্যেও সচেতনতা গড়ে তোলা সম্ভব হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাদকের আসক্তি সংক্রান্ত একাধিক আইনের অস্তিত্ব আছে। যেমন ওপিঅয়েড জাতীয় ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে ওপিঅয়েড নির্ভরতার চিকিৎসা যুক্তরাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা পরিচালিত এবং সাবস্ট্যান্স অ্যাবিউজ অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ সার্ভিসেজ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-এর আওতাধীন। এই প্রশাসক সংস্থাটি স্বীকার করে যে ‘আসক্তি একটি রোগ, তার বিভিন্ন রোগীদের চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন রীতিনীতির প্রয়োজন হতে পারে।’ কানাডার সুপ্রিম কোর্ট আসক্তির এই সংজ্ঞাটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে: ‘একটি মূলগত ও দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যার বৈশিষ্ট্য হল মানসিক প্রক্রিয়ার উপর প্রভাব সৃষ্টিকারী পদার্থ এবং/অথবা আচরণের ওপরে নিয়ন্ত্রণ না থাকা।’ বিশ্বের বেশ কিছু দেশে যে আসক্তিকে তার যথার্থ আলোকে, অর্থাৎ একটি রোগ হিসেবে বোঝা হয় এবং সেই বিচারেই তার চিকিৎসা করা হয়, এই উদ্ধৃতিগুলি তারই উদাহরণ।

 

সুশান্ত মাদক নিতেন বলে যে অভিযোগ উঠে এসেছে তাকে তাঁর আত্মহত্যার ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে এবং সেটিই এই তদন্তের ক্ষেত্রে প্রাথমিক মাথাব্যথার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এর মাধ্যমে মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত মূল সমস্যাটিকে নানা দিক থেকেই সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া এই পদক্ষেপটির ভরকেন্দ্র আসক্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত একটি বোঝাপড়া। এই প্রেক্ষিতে ‘মাদকাসক্ত’, ‘আসক্তি, ‘চেতনানাশক মাদক ব্যবহার’ এবং এই জাতীয় অন্যান্য প্রাসঙ্গিক শব্দগুলিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া ও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার কাজটি অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। বিচারবিভাগীয় প্রতিষ্ঠানগুলির নানান নৈতিক পক্ষপাত ও অজ্ঞতা যাতে তাদের রায় ও অবস্থানের উপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সেজন্য এই জাতীয় শব্দগুলির সংজ্ঞাকে খুবই আঁটোসাটো চেহারার মধ্যে বেঁধে দিতে হবে।

 

আর ভারতবর্ষের এই কাজটি জরুরি ভিত্তিতে করা উচিত: আসক্তি যে জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি বিষয় সেকথা স্বীকার করা উচিত এবং আসক্তি সংক্রান্ত আইনের ভাষাকে সংশোধন করে তার মধ্যে এ সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতাকে ঠাঁই দেওয়া উচিত। আর এনডিপিএস আইনের বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপগুলিকেও সেই অনুযায়ী ঢেলে সাজানো উচিত এবং তা এই মূলগত ভিত্তিটির উপরেই প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।

 

আমরা যদি এই শব্দগুলিকে স্পষ্ট ভাষায় সংজ্ঞায়িত না করি তাহলে কিন্তু এই অসুস্থতা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য বা এর জন্য যথাযথ চিকিৎসার দ্বারস্থ হওয়ার ক্ষেত্রে মানুষকে কোনও রকম সাহায্য করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। আসক্তি একটি জটিল জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক অবস্থা। আর মাদকাসক্তের সত্তাটি একটি স্থায়ী সত্তা। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি জন্ম থেকেই আসক্ত এবং মৃত্যুর সময় তিনি কোনও মাদক নিচ্ছেন কিনা তা ব্যতিরেকেই একজন আসক্ত ব্যক্তি হিসেবেই তাঁর মৃত্যু ঘটবে। কোনও একটি নির্দিষ্ট সময়ে একজন আসক্ত ব্যক্তি হয় নেশা করছেন, আর নয়তো আরোগ্যলাভের চেষ্টায় আছেন। অথচ এনডিপিএস আইনের ভাষায় মাদকাসক্ত ‘সেই ব্যক্তি যিনি কোনও মাদক বা মানসিক অবস্থার উপর প্রভাব সৃষ্টিকারী কোনও পদার্থের উপর নির্ভরশীল’। এটি আদ্যন্ত অতিসরলীকরণ। তার কারণ যে ব্যক্তি কোনও একটি নির্দিষ্ট সময়ে রাসায়নিক অর্থে কোনও একটি বিশেষ মাদকদ্রব্যের উপর নির্ভরশীল তাঁকে যে মাদকাসক্ত হতেই হবে তার কোনও মানে নেই। আবার যে মাদকাসক্ত ব্যক্তি বেশ কয়েক দশক নেশামুক্ত অবস্থায় রয়েছেন তিনি যে কোনও মুহূর্তে মাদক সেবনের পথে ফিরে যেতে পারেন। আসক্তি ও মাদকাসক্তের ব্যক্তিত্বের আগমার্কা বৈশিষ্ট্য হল তাঁর আচরণের ধরনের মধ্যে নিহিত এই জটিলতা। কিন্তু এই জাতীয় সরলীকৃত সংজ্ঞায় সেই জটিলতা পুরোপুরি চাপা পড়ে যায় এবং তার ফলে আখেরে মূল উদ্দেশ্যটিই ব্যাহত হয়। কোনো ব্যক্তি সাময়িকভাবে বিশেষ কোনও মাদকের প্রতি আসক্ত হতেই পারেন এবং নিজে থেকেই সে নেশা ছেড়ে দেওয়াও তাঁদের পক্ষে সম্ভব, কিন্তু মাদকাসক্ত ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর নেশার বস্তুটির সম্পর্কটি সহজাতভাবেই ব্যাধিজনিত নির্ভরতার সম্পর্ক। মাদকাসক্ত ব্যক্তির আচরণের গড়নটিই বদ্ধমূল আচ্ছন্নতা সৃষ্টিকারী এবং তা নেশাসক্ত ব্যক্তিকে বাধ্যতামূলক নির্ভরতার দিকে চালিত করে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি যখন কোনও একটি বিশেষ মাদক দ্রব্য সেবন করা বন্ধ করার জন্য তাঁর নিজস্ব ইচ্ছা প্রয়োগ করতে যান, তখন তাঁর আচরণের এই বিশেষ ধরন গঠনগত দিক থেকেই তাঁকে প্রতিহত করে। মাদক সেবনকারীর সঙ্গে মাদকাসক্তের মূলগত ফারাকটি এখানেই। এনডিপিএস আইন প্রণয়নের প্রাথমিক উদ্দেশ্য মাদক বা মাদক জাতীয় পদার্থ নিয়ে ব্যবসা করা ব্যক্তিদের অপরাধীর আওতাভুক্ত করা ও তাঁদের শাস্তি দেওয়া। আইনটি যেভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে এবং তার কাঠামোকে যেভাবে সাজানো হয়েছে তা একটি গুরুতরভাবে ভ্রান্ত ধারণার ইঙ্গিতবাহী: ধারণাটি হল নেশার দ্রব্যের বন্টন নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই নেশা এবং আসক্তির সমস্যাটির সমাধান করা সম্ভব।

 

আসক্তি বলতে ঠিক কী বোঝায় এবং তার সঙ্গে মাদকাসক্ত ব্যক্তির বাস্তব ও যাপিত জীবনের সংযোগ কোথায় সে প্রশ্নের কোনও সদুত্তর যেহেতু এই আইনে নেই, তাই আইনটি নিজেই নেশামুক্তির পথে একটি বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনও মাদক নেওয়া বন্ধ করার পর মাদকাসক্ত ব্যক্তির শরীরে উইথড্রয়াল বা প্রত্যাহার জনিত যে সমস্ত প্রতিক্রিয়াগুলি দেখা যায় সেগুলির মতো বিভিন্ন শারীরিক উপসর্গের কথা এনডিপিএস আইনে উল্লেখ পর্যন্ত করা হয়নি। তার ফলে আইনজীবীদের পক্ষে সওয়াল করা বা বিচারকদের পক্ষে সঠিক রায় দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ধরে নিতে হবে এবং আশা করতে হবে যে সংশ্লিষ্ট বিচারপতি নেশা বন্ধ করার শারীরিক প্রতিক্রিয়ার মতো একটি মূলগত বিষয় সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হবেন। এহেন ধারণা অসম্ভব বিপজ্জনক। উইথড্রয়ালের ক্ষেত্রে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে সময় মতো তার নেশার বস্তুটির জোগান দেওয়া না-হলে তাঁর কথাবার্তা, হাঁটাচলা, খাওয়াদাওয়া, ঘুমোনো ইত্যাদি বন্ধ হয়ে যায় এবং তাঁর পক্ষে স্বাভাবিক কাজকর্ম করা সম্ভব হয় না। এই জাতীয় প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা চূড়ান্ত জায়গায় পৌঁছলে তাঁদের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। এই বিষয়টি কতদূর গুরুতর সে বিষয়ে কি বিচারপতিরা ওয়াকিবহাল? আমাদের জানা নেই। উক্ত আইনটিতে ‘উইথড্রয়াল’ শব্দটির উল্লেখ পর্যন্ত নেই এবং তার ফলে আদালতকক্ষ জায়গাটি মাদকাসক্ত ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভব বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

 

এনডিপিএস আইনের এক জায়গায় বলা হয়েছে যে বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার মাদক ব্যবহারকারীদের মাদকের জোগান দিতে পারে। এর থেকে মনে হতে পারে যে আইনটির খসড়া যাঁরা তৈরি করেছিলেন তাঁদের উইথড্রয়াল বিষয়টি সম্পর্কে কিছুদূর বোঝাপড়া ছিল। এনডিপিএস আইনে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে মাদকের জোগান দেওয়ার ক্ষমতা সরকারকে দেওয়া হয়েছে ‘চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রয়োজন’-এর ক্ষেত্রে, কিন্তু এই চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রয়োজন যে বস্তুত উইথড্রয়াল জনিত প্রতিক্রিয়ার জন্যই দেখা দেয় তা ব্যাখ্যা করতে আইনটি সমর্থ হয়নি। আইনের ভাষাকে অস্পষ্ট রেখে রাষ্ট্র আইনিভাবে একথা স্বীকার করেনি যে উইথড্রয়াল জনিত প্রতিক্রিয়াই পূর্বোক্ত ‘চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রয়োজন’।

 

এহেন প্রেক্ষিতে অপরাধের উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায় নামক স্তম্ভটি ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার পরিসর থেকে স্রেফ উধাও হয়ে গেছে। অথচ এই স্তম্ভটির উপর ভর করেই আদালত কোনও একটি বিশেষ অপরাধ সম্পর্কে তার বিচারের কাঠামোটি সাজায়। উইথড্রয়াল জনিত প্রতিক্রিয়া মাদকাসক্ত ব্যক্তির জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িত নানান সূক্ষ্মতার অন্যতম উদাহরণ মাত্র। এনডিপিএস আইনে মাদক ‘ব্যবহারকারী’, ‘মাদকাসক্ত’, ‘বিক্রেতা’ ও ‘ব্যবসায়ী’-দের মধ্যে স্পষ্টভাবে পার্থক্য করা হয়নি। এই আইনের আওতায় অপরাধীর গোত্রে পড়ার ঝুঁকি সবথেকে বেশি ছোটখাটো বিক্রেতাদের, কিন্তু তাঁরা প্রাথমিকভাবে মাদক দ্রব্য বিক্রি করেন তাঁদের নিজেদের নেশার খরচ চালানোর জন্য। এই পার্থক্যগুলিকে আদপেই স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়নি এবং তাই আদালতে সেগুলি সম্পর্কে গুরুতর রকমের ভুল ধারণা করা হয়। তাছাড়া মাদকাসক্ত ব্যক্তির পক্ষপাতহীন বিচার হচ্ছে কিনা কিংবা শেষে তিনি অপরাধী সাব্যস্ত হচ্ছেন কিনা তা-ও জাতপাত, শ্রেণি ও অর্থনীতির কাঠামোর উপর নির্ভরশীল। উচ্চ বর্ণ ও শ্রেণির মানুষরা এই ব্যবস্থা থেকে অন্যায্যভাবে নানান সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে তাঁদের সহায় হয় তাঁদের সুবিধাভোগী ও সামাজিক পুঁজির নিকটবর্তী অবস্থান।

 

এনডিপিএস আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইন দ্বারা চিহ্নিত মাদক বা মানসিক অবস্থার উপর প্রভাব সৃষ্টিকারী কোনও পদার্থ সঙ্গে রাখা শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীর দশ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। ২০১৮ সালে পাঞ্জাব সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে একটি সুপারিশ করে। তাতে বলা হয় যে মাদক বিক্রি বা চোরাচালানের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের বাধ্যতামূলকভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হোক, এমনকী তা যদি অপরাধীর প্রথম অপরাধ হয় সেক্ষেত্রেও যেন তাঁকে ছাড় না দেওয়া হয়।

 

এনডিপিএস আইনের ৩১এ পরিচ্ছেদটির শিরোনাম ‘আগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরবর্তী অপরাধের জন্য বর্ধিত শাস্তি’। ২০০১ সালে এই আইনে একটি সংশোধনী আনার মাধ্যমে বস্তুত উক্ত পরিচ্ছেদে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। ২০১১ সালে ইন্ডিয়ান হার্ম রিডাকশন নেটওয়ার্ক বনাম ভারত সরকার মামলায় মুম্বই হাইকোর্ট বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে রায় দেয়। ২০১৪ সালে আরও একবার আইন সংশোধনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টিকে বিচারবিভাগের বিবেচনাধীন করা হয়েছে। বর্তমানে পাঞ্জাব সরকারের উপরোক্ত সুপারিশের ফলে বিষয়টি আবার পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠেছে।

 

এছাড়া চিকিৎসার কোনও পথের সন্ধান দিতেও আইনটি সমর্থ হয়নি। এই মুহূর্তে নেশার চিকিৎসার সবথেকে শক্তপোক্ত পরিকাঠামোটি সম্পূর্ণভাবেই মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের স্বেচ্ছাশ্রম দ্বারা এবং মাদকাসক্তদের জন্য পরিচালিত। এ জাতীয় স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলি মূলত বিনামূল্যে পরিষেবার জোগান দেয়: কোনও সদস্য চাঁদা লাগে না। শুধু লাগে মাদক সেবন বন্ধ করার সদিচ্ছা। আসক্তি থেকে সুস্থতার পথে চলা মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের পরিচালনায় সারা দেশজুড়ে অজস্র বৈঠক হয়। কলকাতায় যেমন সপ্তাহে প্রতিদিন চারটিরও বেশি এই ধরনের বৈঠক হয়। বিভিন্ন সহায়ক গোষ্ঠী পরিচালিত এই সহযোগিতার অসামান্য পরিকাঠামোটি কোনওরকম সরকারি বা কর্পোরেট সংস্থার সাহায্য ছাড়াই চলে।

 

এছাড়া ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসারও কয়েকটি বন্দোবস্ত আছে। ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে যে এই ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠার নজির প্রায় নেই বললেই চলে, তার কারণ এই চিকিৎসার পরিধিটি একান্তভাবেই সীমাবদ্ধ। আর আইনবিভাগের মূল উদ্দেশ্য হল মাদকদ্রব্যের প্রসার বন্ধ করা। ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসার বাইরে নেশার চিকিৎসার যে পদ্ধতিটি সর্বাধিক প্রচলিত সেটির নাম মিনেসোটা মডেল – যা ‘অ্যাবস্টিনেন্স বা বিরত থাকার মডেল’ নামেও পরিচিত। ১৯৫০-এর দশকে এক মনস্তত্ত্ববিদ ও এক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ যৌথভাবে এই মডেলটি সর্বপ্রথম প্রয়োগ করেন। মডেলটি মোটের উপর অ্যালকোহলিক অ্যানোনিমাস (এএ) মডেলের উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়, যার মূল কথা হল একজন আসক্ত ব্যক্তিই আরেকজন আসক্ত ব্যক্তিকে সবথেকে ভালো বুঝতে ও সাহায্য করতে পারেন। ভারতবর্ষের বেশিরভাগ পুনর্বাসন কেন্দ্রে এই মডেলটিরই প্রসার ঘটেছে। এই চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে একটি মানবিক গোষ্ঠী গড়ে তোলা হয় এবং সেই গোষ্ঠীতে একজন নেশাসক্ত ব্যক্তি আরেকজন নেশাসক্ত ব্যক্তির দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।

 

ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসার যে গড়পড়তা পদ্ধতি সেখানে কোনও একটি বিশেষ ওষুধ বা মাদকের উপর নির্ভরতার মোকাবিলা করা হয় বিকল্প কোনও ওষুধের উপর নির্ভরতা গড়ে তোলার মাধ্যমে। পাঞ্জাবে সরকার নেশাসক্ত ব্যক্তিদের (সরকারি ভাষায়) “নেশা ছাড়ানোর বড়ি” নামক কোনও একটি বস্তু দিচ্ছে, জিনিসটি আসলে বুপ্রেনরফিন। হেরোইন তৈরি করা হয়েছিল মরফিনের বিকল্প হিসেবে। নরফিন হল কৃত্রিম উপায়ে তৈরি মরফিন, আর বুপ্রেনরফিনও ঠিক তাই। এ এক বিকৃত চক্র: মাদকাসক্তদের হাতে এমন একটি রাসায়নিক যৌগ তুলে দেওয়া হচ্ছে যাকে প্রতিস্থাপিত করার উদ্দেশ্যেই হেরোইন বস্তুটি তৈরি করা হয়েছিল। রাষ্ট্র এই বিভ্রমে মজে থাকতেই পারে, কিন্তু আমাদের হাতে বুপ্রেনরফিন তুলে দিয়ে কিংবা মাদকাসক্তদের মৃত্যুদণ্ড দিয়ে সে আদপেই আসক্তির সমস্যার কোনও সমাধান করতে পারবে না। এটি এক ধরনের অস্বীকারের প্রবণতাকে তুলে ধরে এবং এর মধ্যে দিয়ে নেশাসক্ত ব্যক্তিদের অধিকার-চ্যুতি ও এ বিষয়ে ভারতীয় সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের নৈতিকভাবে উচ্চমন্য অবস্থান নেওয়ার প্রবণতারই প্রতিফলন ঘটে। মেথাডোন প্রকল্পের মতো একদা অত্যন্ত জনপ্রিয় নেশাজনিত ক্ষতি কমানোর ও দৈনিক পরিচর্যার প্রকল্পগুলি মূলত প্রতিস্থাপনমূলক পদ্ধতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এবং এই প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে মাদকাসক্তদের নেশার পথে ফিরে যাওয়ার হারও অত্যন্ত বেশি – কাজেই এই জাতীয় প্রকল্পগুলি কোনওমতেই দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই এখন এই জাতীয় প্রকল্পগুলির কার্যকারিতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবনাচিন্তা চলছে। আসক্তি বিষয়টি এক ধরনের অসুস্থতা এবং ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে তাকে পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয় – এই সত্যটির পক্ষে উক্ত মেথাডোন প্রকল্পের পথিকৃৎ ডা. রবার্ট জি. নিউম্যান দীর্ঘদিন ধরে সওয়াল চালিয়ে গিয়েছেন।

 

২০১৮ সালে ব্রিটেন, কানাডা, নরওয়ে, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডের মতো দেশে র‍্যান্ডমাইজড্‌ ক্লিনিকাল ট্রায়াল পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে হেরোইনের নেশায় আসক্ত ব্যক্তিদের উপর অল্প মাত্রায় হেরোইন প্রয়োগ করা হতে থাকে। এর উদ্দেশ্য ছিল উইথড্রয়াল জনিত প্রতিক্রিয়ার মোকাবিলা করা। এছাড়া অন্য একটি চিকিৎসা-পদ্ধতিতে প্রয়োগ করা হয় ন্যালট্রেক্সোন হাইড্রোক্লোরাইড, এর ফলে মস্তিষ্কের ওপিঅয়েড গ্রাহক কেন্দ্রগুলির কার্যকলাপ বন্ধ করে দেওয়া যায় – তাই এই ওষুধটি প্রয়োগ করার পর মাদকাসক্ত ব্যক্তি ব্রাউন সুগার নিলেও তাঁর আর নেশা হবে না। মাদকাসক্ত ব্যক্তির শরীরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমেও ন্যালট্রেক্সোন হাইড্রোক্লোরাইড প্রবেশ করানো সম্ভব, তার ফলে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে মস্তিষ্কের ওপিঅয়েড গ্রাহক কেন্দ্রগুলিকে প্রতিহত করা সম্ভব। কিন্তু এই চিকিৎসা-পদ্ধতি সঠিকভাবে প্রযুক্ত না-হওয়ার ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই রোগীদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এবং এ জাতীয় মৃত্যু অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়কও বটে। যেমন ধরা যাক, ডাক্তার কোনও মাদকাসক্ত ব্যক্তির কাছে জানতে চাইলেন যে সেই ব্যক্তি সেদিন ব্রাউন সুগার নিয়েছেন কিনা। এখন সেই ব্যক্তি যদি সামাজিক চাপে ও লোকলজ্জার কথা ভেবে না বলেন এবং ডাক্তার যদি তাঁর রোগীর শরীরে ন্যালট্রেক্সোন হাইড্রোক্লোরাইড প্রয়োগ করেন, সেক্ষেত্রে তার ফলাফল মারাত্মক হতে পারে। এর ফলে সেই রোগী অকল্পনীয় মাত্রায় শারীরিক যন্ত্রণার শিকার হতে পারেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁর মৃত্যুও ঘটতে পারে। এ প্রসঙ্গে লক্ষনীয় যে ডাক্তার ও মাদকাসক্তের এই সম্পর্কের পরিসরটি আদপেই নিরাপদ নয়, তাই মাদকাসক্ত ব্যক্তি এই পরিসরে তাঁর নেশা ও অন্যান্য অভ্যাস সম্পর্কে অকপটে কথা বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না: তার কারণ চিকিৎসা-শিল্পের পেশাদার চিকিৎসকদের অবস্থানটিও অজ্ঞতা ও সামাজিক অপবাদের বোধ থেকে মুক্ত নয়। উক্ত মিনেসোটা মডেলের কার্যকারিতার এটিও অন্যতম কারণ: এই মডেলে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে একজন মাদকাসক্তের সঙ্গে আরেক জন মাদকাসক্তের যে সহযোগিতার সম্পর্ক তার কোনও বিকল্প নেই।

 

ডাক্তাররা ন্যালট্রেক্সোন হাইড্রোক্লোরাইড ব্যবহার করার পক্ষে আরেকটি যুক্তি এই দেন যে এর মাধ্যমে ব্রাউন সুগার নেওয়ার বা মদ্যপান করার ইচ্ছা সামগ্রিকভাবে কমে আসে। এই যুক্তিটিতে বড় রকমের গলদ আছে। তার কারণ একজন মাদকাসক্তের নেশা করার ইচ্ছা একটি জটিল প্রক্রিয়া (এবং তা যতখানি জৈবিক ততখানিই মনস্তাত্ত্বিকও বটে) এবং নিছক কোনও ব্যক্তির মস্তিষ্কের ওপিঅয়েড গ্রাহক কেন্দ্রগুলিকে প্রতিহত করে তাকে কমানো সম্ভব নয়। এই ধরনের ভ্রান্ত যুক্তির ভিত্তিতে আজও বহু ভয়াবহ চিকিৎসা-পদ্ধতি চালু আছে: তার মধ্যে অন্যতম রোগীর মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক উদ্দীপক প্রয়োগের ইলেকট্রোকনভালসিভ থেরাপি (ইসিটি)। অথচ এর আগে বারবার দেখা গেছে যে এই পদ্ধতিটি প্রয়োগ করার ঝুঁকি অনেক এবং পদ্ধতিটি আদপেই কার্যকরী নয়। নেশার চিকিৎসার যে একটি মাত্র অংশে ওষুধ প্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে সেটি হল উইথড্রয়াল জনিত প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ। মাদক সেবন বন্ধ করে দেওয়ার পর উইথড্রয়ালের কারণে মাদকাসক্ত ব্যক্তি যে দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করেন তাকে ওষুধ ছাড়া সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। বিভিন্ন মাদকের ক্ষেত্রে উইথড্রয়াল জনিত উপসর্গের ধরন বিভিন্ন: ব্রাউন সুগারের উইথড্রয়াল জনিত প্রতিক্রিয়া শারীরিকভাবে অত্যন্ত কষ্টকর, আবার মদের ক্ষেত্রে উইথড্রয়ালের ফলে যে শারীরিক যন্ত্রণা হবেই তার কোনও মানে নেই, তবে তারও শারীরিক উপসর্গ আছে, যেমন হাত কাঁপা, অনিদ্রা, বিভ্রম (মদ বন্ধ করার পর কিছু দিন কেটে যাওয়ার পরে) এবং অতিরিক্ত ঘাম হওয়া। আদর্শ চিকিৎসা-পদ্ধতিতে প্রথমে চিকিৎসা ও ওষুধের মাধ্যমে মাদকাসক্ত ব্যক্তির উইথড্রয়াল জনিত প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়, তার পর চালু করা হয় বেশ কয়েক মাসের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রকল্প – এতে ওষুধ প্রয়োগের কোনও ভূমিকা নেই এবং এর ভিত্তি মিনেসোটা মডেল।

 

ভারতবর্ষে এখনও পর্যন্ত নেশা সংক্রান্ত মূলগত আইনি ধারণাটিকে ঢেলে সাজানোর কোনও সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আমাদের প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত স্তরে এবং যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা যুক্ত সেগুলির স্তরে এই অনুশীলন শুরু করা উচিত। আর এর প্রথম ধাপ হল এ বিষয়ে প্রকাশ্য আলোচনায় মত বিনিময় করা, সমস্ত বিপন্ন পক্ষগুলিকে সেই আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করা এবং সংলাপের পথ মসৃণ করার জন্য এমন নিরাপদ মঞ্চ গড়ে তোলা যেখানে সকলেই স্বাগত। আইনি নজরদারিহীন, দীর্ঘমেয়াদি ও সূক্ষ্মতাবোধসম্পন্ন পথটিই এক্ষেত্রে সাফল্যের মুখ দেখতে পারে, তার কারণ এই সংলাপ শুরু করার পূর্বশর্ত হল মূলগত স্তরের ভ্রান্ত ধারণাগুলিকে নির্মূল করা। মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা জারি করা রাজনীতিবিদদের কাছে জনমোহিনী রাজনীতিই পছন্দসই পথ। পাঞ্জাব সরকার যে মাদকাসক্তদের মৃত্যুদণ্ড দিতে সমর্থ হয়েছে তা নয়, কিন্তু মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দাবিটিই জনগণের কাছে এক বিশেষ বার্তা পৌঁছে দেয়। তার ফলে সংবেদনশীল বা সমবেদনামূলক মনোভাব নিয়ে নেশার সমস্যাটির মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যটিই ব্যর্থ হয়। এহেন বার্তা নিছকই রাজনৈতিক ভঙ্গিমা মাত্র।

 

নেশার বিষয়ে ১৯৮৫ সালের পূর্ববর্তী মাপকাঠিগুলিকে ফিরিয়ে আনাও নিঃসন্দেহে যথেষ্ট বিপজ্জনক। বিশ্বজোড়া যে কাঠামোগত পদ্ধতিগুলি আমাদের এনডিপিএস-এর মতো কঠোর ও কট্টর আইন প্রণয়নের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, সেগুলিকে বোঝা অত্যন্ত জরুরি। আর একথা বোঝাও জরুরি যে আইন প্রণয়নকারী সাংসদবর্গ, বিচার-ব্যবস্থা, পুরোহিতকুল, আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থা কিংবা মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের উপর নির্ভর করে বসে থাকলে আমাদের চলবে না। আমাদের এই কাঠামোগুলির সীমা পেরিয়ে যেতে হবে – বস্তুত এগুলিকে নির্মূল করতে হবে – এবং যাঁরা বাস্তবিকই ভুক্তভোগী, যাঁরা মাদকাসক্ত ও যাঁরা তাঁদের পরিবারের লোকজন এবং বর্তমান আইনগুলি যাঁদের খাপছাড়াভাবে অপরাধীর আওতাভুক্ত করেছে, তাঁদের সকলের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে।

 

  • রনি সেন কলকাতাবাসী চলচ্চিত্র পরিচালক, লেখক ও ফোটোগ্রাফার। তাঁর প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র ‘ক্যাট স্টিক্‌স’-এর প্রথম আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী হয় ২০১৯ সালে, স্লামডান্স চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে এবং সেখানে তা জুরিদের বিশেষ পুরস্কার পায়। তাঁর দুটি ফোটোবুক প্রকাশিত হয়েছে: খ্‌মের দিন (২০১৩) ও এন্ড অফ টাইম (২০১৬)।

 

  • এই নিবন্ধটি ‘অ্যাকাডেমি ম্যাগ’ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি লেখার বাংলা ভাষায়ে পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত রূপ। বাংলা অনুবাদ করেছেন প্রসিত দাস

 

Share this
Leave a Comment