মহামারী, লকডাউন এবং সোনাগাছির মেয়েরা ৪


  • August 3, 2020
  • (1 Comments)
  • 457 Views

মোদীবাবুর অপরিকল্পিত লকডাউন-এর প্রথম সপ্তাহ পেরনোর আগেই থেকেই সোনাগাছির বেশিরভাগ মেয়েরই অবস্থা সঙ্গীন হয়ে দাঁড়াল। এ দেশের বিভিন্ন রাজ্যের প্রায় ৬ কোটি পরিযায়ী শ্রমিক অন্য রাজ্যে আটকে পড়ে যেমন চরম দুর্দশায় পড়েছেন, কলকাতার যৌনপল্লীগুলির প্রায় ১০ হাজার মেয়ের অবস্থা তার থেকে কিছু কম ভয়াবহ নয়। লকডাউনের দিন দশেকের মধ্যেই কোনোরকমে চালডাল ফোটানোর মতো অবস্থাও ওদের থাকত না যদি না বাইরে থেকে ত্রাণ পৌঁছত। লিখেছেন তরুণ বসু। চতুর্থ কিস্তি।

 

প্রথম কিস্তি – এই লিঙ্কে

দ্বিতীয় কিস্তি – এই লিঙ্কে 

তৃতীয় কিস্তি – এই লিঙ্কে 

 

In the cool of the evening you see them before the doors of their houses, which are for `the most part small huts, and when the night comes they place at the doors a candle or a lighted lamp for a signal.

Jean-Baptiste Tavernier, Travels in India [১]

 

২০১৪ সালে মুম্বই-এর হিন্দি ফিলম ইন্ডাস্ট্রির নাগেস কুকুনুর “লক্ষ্মী” শিরোনামে একটি সিনেমা বানিয়েছিলেন। সিনেমার বিষয়বস্তু ছিল পাচার হওয়া ১৩ বছরের একটি মেয়ের যৌনপল্লিতে বিক্রি হওয়া এবং তারপর মেয়েটির পালিয়ে যাওয়া এবং আদালতে মামলা করা। কাহিনি সম্পর্কে জানানো হয়েছিল : পাচার হওয়া একটি নাবালিকা মেয়ের এইচআইভি আক্রান্ত এক ব্যক্তির কাছে ধর্ষিত হওয়া (এইচআইভি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার শুরুর যুগে একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, সংক্রামিত পুরুষ যদি কোনো কুমারী[virgin]-র সঙ্গে যৌনক্রিয়া করে তাহলে তার এইডস রোগ সেরে যাবে) এবং ধর্ষণের পর তাকে এক যৌনপল্লিতে রেখে যৌন-ব্যবসা চালানো। কিছুদিন পর ঐ মেয়েটি এক খদ্দেরের সঙ্গে সাঁট করে যৌনপল্লি থেকে পালাতে সক্ষম হয় এবং আদালতে ধর্ষণের মামলা করে। শেষপর্যন্ত আদালতের রায় মেয়েটির পক্ষে যায়। এইচআইভি-পাচার এবং ধর্ষণ বিষয়ে বেশ কিছু ঘটনাকে  অবলম্বন করে ছবিটি তৈরি হলেও, পরিচালক জানিয়েছিলেন, আদতে এটি একটি ফিকশান। যদিও ছবিটির কিছু কিছু দৃশ্য বা অংশ প্রায় তথ্যচিত্রর আদলে নির্মিত। ছবির এই ডকুমেন্টারি অংশে লক্ষ্মীকে উপলক্ষ্য করে  যৌনকর্মী পল্লিতে মেয়ে জোগানের কিংবা পাচারের ঘটনার যে বিবরণ তুলে ধরা হয়েছিল অর্থাৎ চিত্রায়িত হয়েছিল তার সঙ্গে এ-দেশে যে সব ‘খ্যাতনামা’ যৌনপল্লি আছে যেমন মুম্বাই-এর কামাঠীপুরা, দিল্লির জি বি রোড, এলাহাবাদের মিরগঞ্জ, পুণের বিধওয়র পেট, বেনারসের শিবদাসপুর, মজঃফরপুর-এর চতুর্ভুজস্থান কিংবা কলকাতার সোনাগাছি বা নাগপুরের ইটওয়ারির মাধুরী, সুনীতা, আলিয়া, শিরিন বা নিশা-র যৌনপল্লিতে পৌঁছনোর তথা পাচারের কাহিনির সামান্য এদিক-ওদিক ছাড়া বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। বলা বাহুল্য, বর্তমান বিশ্বে মানব-পাচার একটি অতি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। নানা দেশের নানা আইন থাকা সত্ত্বেও, এবং এমনকি আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধও মানব-পাচার রুখতে সমর্থ হয় নি। আর সে শুধু যৌনপেশায় নয়, অসংগঠিত,  অদক্ষ শ্রম-নিবিড় নানান ক্ষেত্রে। যেমন কয়েকবছর আগে কুয়েতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপের ঝাঁ-চকচকে স্টেডিয়াম নির্মাণের জন্যে দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলি থেকে পাচার করা হয়েছিল বিপুল পরিমাণ শ্রমিক, মূলস্রোতের গণ-মাধ্যমেই সেই সময়ে এ নিয়ে বেশ কিছু প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছিল। একই ঘটনা ব্রাজিল বিশ্বকাপের সময়ও ঘটেছিল। সেখানে শ্রমের জোগান এসেছিল লাতিন আমেরিকার দরিদ্রতর দেশগুলি থেকে।

 

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানব পাচার সমস্যা মোকাবিলার উদ্দেশ্যে ১৯৯৬-এ রাওয়ালপিন্ডি রেজোলিউশান এবং সার্ক (SARRC) কনভেনশান অন প্রিভেন্টিং অ্যান্ড কমব্যাটিং ট্রাফিকিং ইন উওমেন অ্যান্ড চিলড্রেন অনুষ্ঠিত হয়। পরের বছর ১৯৯৭-এ মালদ্বীপের মালে-র সার্ক সামিট এবং ১৯৯৮-এ কলোম্বো সামিট-এও একই কথা বলা হলেও পাচার-রোধ সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো ইতর বিশেষ ঘটে নি। ভারতে যৌনপেশায় লাগানোর উদ্দেশ্যে নারী  পাচার বিষয়ে The Suppression of Immoral Traffic in Women and Girls Act, 1956 পাশ হয়। আইনটি তৈরি হয়েছিল প্রকৃতপক্ষে ইউনাইটেড নেশানস-এর Convention of the Suppression of Traffic in Persons and of the Exploitation of the Prostitution of Others-এ ভারত অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়ার কারণে। ১৯৫৬-য় পাশ হওয়ার পর দুবার আইনটি সংশোধিত হয়। ১৯৭৮ এবং ১৯৮৬-তে, এবং নাম বদলে হয় The Immoral Traffic (Prevention) Act.  যদিও পাচার রোধে এই আইনটি উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা রাখতে পারে নি শুধু তাই নয়, শেষ পর্যন্ত এটি যৌনকর্মীদের পক্ষেও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। এও এক paradox যে, যৌনপেশাকে সরকারি স্বীকৃতি বা তাদের শ্রমিকের অধিকার মেনে না নিলেও পেশাটি নির্মূল করার কোনো চেষ্টাই হয় নি। আদিম যুগ থেকে আজ পর্যন্ত শ্রমভিত্তিক পেশা সমাজে টিঁকে থেকেছে সামাজিক চাহিদার উপর নির্ভর করে। কিন্তু যৌনতা এমনই একটি বিষয় যা টিঁকে আছে প্রায় লিখিত ইতিহাসের কাল থেকে। অথচ কৌটিল্যর কাল বাদ দিলে কখনোই একে স্বীকার করে নেওয়া হয় নি। কৌটিল্যর অর্থশাস্ত্রে গণিকাদের কাছ থেকে কর আদায়ের কথা জানা যায়। অন্য কোনো কালে এমন ঘটনার কথা জানা যায় না, যদিও যৌন পেশার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য বাণিজ্য থেকে কর আদায় করা হত। ফরাসি পর্যটক তাভারনিয়ের ভারতে এসেছিলেন বর্তমান যুগের (CE) ১৬৪১ সালে। তিনি লিখেছেন :

 

It is then, also, that the shops where they sell tari are opened. It is a drink obtained from a tree, and it is as sweet as our new wines, it is brought from 5 or 6 coss distant in leather bottles, upon horses which carry one on each side and go at a fast trot, and about 500 or 600 of them enter the town daily. The King derives from the tax which he places on this tari a very considerable revenue, and it is principally on this account that they allow so many public women, because they are the cause of the consumption of much tari, those who sell it having for this reason their shops in their neighbourhood.[২]

 

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দরিদ্রতর, গোঁড়া, ধর্মভীরু দেশগুলিতে সরকারিভাবে বেআইনি করে রাখা যৌন পেশাকে ধরে রাখার আদত ফসল অনিয়ন্ত্রিত নারী ও শিশু পাচার। নিকোলাস ডি. ক্রিস্টফ ও সেরিল উদুন তাঁদের বেস্ট সেলার গ্রন্থে লিখেছেন :

 

The implicit social contract is that upper-class girls will keep their virtue, while young men will find satisfaction in the brothels. And the brothels will staffed with slave girls trafficked from Nepal or Bangladesh or poor Indian villages. As long as the girls are uneducated low-caste peasants, … society will look the other way – … because the people being lashed looked different from them. [৩]

 

আন্তর্জাতিক স্তরে নজরদারির পরেও মানব-পাচারের নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসেব পাওয়া যায় না। Asian-African Legal Consultative Organization-এর Establishing Cooperation Against Trafficking in Women and Children শিরোনামে একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে :

 

… trafficking is not confined to the commercial sexual exploitation of women and children alone. It has myriad forms and the number of victims has been steadily on the rise over the past few decades. It takes place through and for marriage, sexual exploitation, begging, organ trading, military conflicts, drug peddling and smuggling, labor adoption, entertainment and sports. While there is no precise data, estimates provide that approximately 800,000-900,000 persons are traded annually across national borders. Of these, 70 per cent are women and 50 per cent are children.[৪]

 

প্রায় দু-দশক আগে ব্রিটেনের সুবিখ্যাত মেডিক্যাল জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট’ যৌন-ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে শুধু শিশু পাচারের একটি হিসেব কষে দেখিয়েছিল : 1 million children are forced into prostitution every year and the total number of prostituted children could be as high as 10 million.[৫] ‘ফ্রি দ্য স্লেভস’ নামের মানব-পাচার বিরোধী প্রচার সংস্থা-র কেভিন বেল-এর হিসেবে এই সংখ্যা ২.৭ কোটি। কিন্তু এ কথা সত্যি, যেকোনো নিরিখে প্রকৃত পাচারের সংখ্যা নির্ণয় করা অতীব দুঃসাধ্য কাজ। “Numbers are difficult to calculate in part because sex workers can’t be divided neatly into catagories of those working voluntarily and those working involuntarily. Some commentetors look at prostitutes and see only sex slaves; others see only enterpreneurs. But in reality there are some in each category and many other women who inhabit a grey zone between freedom and slavery.” – তথ্য ও তত্ত্বের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে নিকোলাস ডি. ক্রিস্টফ ও সেরিল উদুন-এর সিদ্ধান্ত।[৬]

 

ইউনাইটেড স্টেটস স্টেট ডিপার্টমেন্ট এর একটি হিসেবে বলা হয়েছে : প্রতি বছরে ৬ থেকে ৮ লক্ষ মানুষ আন্তর্জাতিক সীমান্ত দিয়ে পাচার হয়, তার মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী ও বালিকা, যার বেশিরভাগ অংশকেই যৌন শ্রম ও যৌন পেশায় কাজে লাগানো হয়। ইন্টারন্যাশনাল লেবর অর্গানাইজেশন-এরও একটি হিসেব আছে। তাতে বলা হয়েছে, “at any one time there are 12.3 million people engaged in forced labor of all kinds, not just sexual servitude.” আর ইউনাইটেড নেশনস-এর একটি রিপোর্ট-এ বলা হয়েছিল, এশিয়ায় ১ লক্ষ শিশু শ্রম-দাসত্বের শৃংখলে বাঁধা। প্রসঙ্গটি এল এই কারণে যে, মানব পাচারের মতো একটি গুরুতর বিষয় সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও খাতায়-কলমের বাইরে তাকে নিয়ে কোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে বিশ্বের প্রায় সব দেশের সরকারের তরফেই প্রবল অনীহা। ঠিক যেমনটি দেখা যায় শিশু শ্রমের ক্ষেত্রে। সরকারিভাবে নিষিদ্ধ, কিন্তু সর্বত্রই শিশু শ্রমের উপস্থিতি।

 

নাগেশ তার নায়িকাকে এইচআইভি সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু নিশা – মাত্র ১২ বছর বয়েসে তাকে ওড়িশার এক গ্রাম থেকে শহরের ভালো কাজের লোভ দেখিয়ে সোনাগাছিতে নিয়ে এসেছিল এক আড়কাঠি। “যে মালকিনের বাড়িতে নিয়ে তুলেছিল সেখানে সারাদিন খাটের নীচে শুয়ে থাকতে হতো দরজা বন্ধ করে। এভাবে কদিন ছিলাম জানি না। সারাদিন কাঁদতাম। দুদিন কিছু খাই নি। ওদের কথাও বুঝতে পারতাম না।” বর্তমানে এইডস রোগাক্রান্ত পেশা থেকে সরে আসা নিশা বলেছিল, “কিছুদিন থাকার পর মালকিন মাসির সাথে ভাব হলো। তারপর মাস দুয়েক এভাবে কাটল। মাসির সঙ্গে আরও একটু ফ্রি হয়ে এসেছি, সেইসময় একদিন মালকিন আমাকে সন্ধ্যে বেলা সাজিয়ে দিল বেশ যত্ন করে। তারপর বাইরে থেকে ঘর বন্ধ করে চলে গিয়েছিল। খানিক রাতে হঠাৎ একটা লোককে ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল মালকিন।” অতীতে ফিরে যাওয়া নিশা খুব আতঙ্কিত গলায় বলে চলেছিল, “এখনও তাড়া করে ফেরে সেই রাত। সেই দুঃস্বপ্নের অন্ধকার। সেদিন যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছিল আমার সমস্ত শরীর। রক্তে ভেসে গিয়েছিল শরীরের নিচের অংশ। …  তারপর কতদিন কেটে গেল। পুরনো জীবনের সব কিছু ধুয়ে-মুছে যাওয়া আমি, এখন এইডস রোগী।” কথা বলতে বলতে উদাস হয়ে পড়া নিশা, সোনাগাছির দশ বাই দশ ঘরে চুঁইয়ে পড়া শেষ বিকেলের থিতোনো আলোয় মুখ মুছে বলেছিল, “এখন, পেশাহীন, একাকী, আমার চারপাশ জুড়ে সোনাগাছি।” নিশা পাচার হয়ে এখানে এসেছিল। ধর্ষিত হয়েছিল। ধর্ষিত হতো। প্রতিদিন প্রতিরাত। কুকুনুর-এর ছবির প্রথম অংশ আর নিশার বাস্তব জীবন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। কিন্তু তার পরের ঘটনা ছবির পরের অংশর ঠিক বিপরীত। নিশা কারও বিরুদ্ধে কোনো মামলা করে নি। কোনো মামলা জেতে নি। ছায়াছবির গল্পের মতো জীবনে কোনো ফলবান খণ্ডও সে জয় করে নি।

 

কুকুনুর তার ছবি সম্পর্কে আরও একটি তথ্য দিয়েছিলেন যে, এইচআইভি সংক্রামিত ব্যক্তির ধর্ষণের বিরুদ্ধে কোনো মেয়ের ভারতের আদালতে প্রথম জয়। ২০০৬ সালে ‘হিউম্যান রাইটস ল নেটওয়র্ক’ “ট্রাফিকিং অ্যান্ড দ্য ল” শিরোনামে যে গ্রন্থটি প্রকাশ করেছিল, তাতে কোনো যৌনকর্মীকে ধর্ষণ ও যৌন হেনস্থা নিয়ে যে সব মামলা এদেশে হয়েছে সেরকম কয়েকটি মামলার রায়-সহ বিবরণ নথিবদ্ধ করা আছে।[৭] কিন্তু কোনো মামলাতেই শেষ পর্যন্ত কোনো যৌনকর্মী উল্লেখযোগ্য কোনো জয় পায় নি।

 

চোখে চোখ রেখে কথা বলা, সোনাগাছির শিরিন বলেছিল, “পনেরো বছর বয়েসে ঘর ছেড়েছিলাম প্রেমের টানে। ওই কদমতলা আর বাঁশি আর কি… থাকগে সেসব কথা তোমরা বুঝবে না।” বুঝেছিলাম, অভাবী পরিবার থেকে শিরিন সোনাগাছি পৌঁছয় নি। স্বেচ্ছায়ও নয়। তবু সোনাগাছির জীবনকে যখন মেনে নিতেই হয়েছে তখন “কিল মারার গোঁসাই এই ভাত দেবার ভাতার নয় সমাজকে” মেনে নেবার কোনো দরকার আচ্ছে বলে ও মনে করে না। ও জানে ওর জীবন এভাবেই কাটবে। উজ্জ্বল কোনো সোনালি সকাল হানা দিয়ে ওকে কোনো রাজপ্রাসাদে পৌঁছে দেবে না। টিঁকে থাকতে যে সামান্য আকাঙ্ক্ষা ভালোলাগা সেটুকু পেলেই ওর চলে যাবে।

 

কথায় কথায় ওকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম : “ভারি সুন্দর নামটা তোমার, কে রেখেছিল?” উত্তরে বলেছিল, “টিভি সিরিয়ালে একটা মেয়ের নাম ছিল। ভালো মেয়ের নাম। ওর নামটা আমার পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। তাই নিয়ে নিয়েছি।”

“তোমার আসল নামটা কী?”

“আরে দুর! আমাদের আবার আসল নাম নকল নাম। সেই কবে বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে এসেছিলাম, তারপর চলতে চলতে এই সোনাগাছি। তার আবার নাম!”

“বাবা-মা তো একটা নাম রেখেছিল!”

“এখন সে ভুলে গেছি!”

 

মনে পড়ল, বউবাজারের যৌনকর্মী প্রয়াত উমা মন্ডল একদা এক সাক্ষাতকারের সময় বলেছিলেন, ‘পূর্বাশ্রমের নাম বলতে নেই, জানো না!’’[৮] শিরিনও সেই কথারই পুনরাবৃত্তি করেছিল। আর বলেছিল, “এই সোনাগাছিই আমার সব। আগে তো ছিলাম খানকি, বেশ্যা, এখন হয়েছি যৌনকর্মী। সেও তো এই হালে।”

 

বেশ্যা নয়, গণিকা নয়, পতিতা নয়, ‘যৌনকর্মী’। শব্দটি প্রথম বেছে নিয়েছিলেন ক্যারল লেই (Carol Leigh) – যৌনকর্মীদের সংগঠিত করার কাজে নিবেদিত এক সক্রিয় কর্মী।

 

Jill Nagle সম্পাদিত Whores and Other Feminists নামে একটি বই-এ লেই-এর “Inventing Sex Work” শিরোনামে একটি প্রবন্ধ আছে। ঐ প্রবন্ধে লেই লিখেছেন : ১৯৭৯ কি ১৯৮০-তে সানফ্রানসিসকো-তে ‘Women Against Violence in Pornography and Media’ নামে একটি কনফারেন্সে গিয়ে যৌন কর্ম বিষয়ে একটি কর্মশালায় ‘Sex Use Industry’ বাক্যবন্ধটি ব্যবহার করতে দেখি। ‘The words stuck out and embarrassed me, … How could I sit amid other women as a political equal when I was being objectified like that described only as something used, obscuring my role as actor and agent in the transaction? লেই-এর যুক্তি ছিল ‘Sex Use Industry’ বদলে হওয়া উচিত ‘Sex Work Industry’ কারণ শেষোক্ত শব্দবন্ধটির মধ্যে একটা শ্রমের ধারণা আছে। এর ব্যবহার প্রসঙ্গে লেই লিখেছিলেন, ‘The usages of the term “Sex Work” marks the beginning of a movement. It acknowledges the work we do rather than defines us by our states.’

 

ফ্রেদেরিকে দেলা কোস্তা এবং প্রিসসিলা আলেকজান্ডার সম্পাদিত Sex Work Writings by Women The Industry বইটির প্রকাশ হয়েছিল ১৯৮৭-তে। এই বই-এ whore, prostitute/prostitution–এর বদলে সেক্স ওয়র্ক এবং সেক্স ওয়ার্কার শব্দবন্ধ দুটির বহুল ব্যবহার দেখা গিয়েছিল। এরপর বিশ্বের বিভিন্ন হেলথ এজেন্সি (স্বাস্থ্য সংস্থা) এবং অ্যাডভোকেসি গ্রুপ (পক্ষে-মতামত তৈরি করেন যারা সেইসব গোষ্ঠী) শব্দবন্ধ দুটি ব্যবহার করতে থাকায় তা মূলস্রোতের শব্দভাণ্ডারে জায়গা করে নেয়। মূল সমাজে শব্দবন্ধ দুটির প্রচলন শুরু হয় মোটামুটি ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে।

 

Sex Work বা Sex Worker শব্দবন্ধ দুটির প্রতিশব্দ বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায়ও গৃহীত হয় ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিক থেকে এবং বাংলায়ও – যৌনকর্ম এবং যৌনকর্মী। বাংলায় ব্যবহৃত আর যেসব তৎসম (সংস্কৃত শব্দ) প্রতিশব্দ পাওয়া যায় সেগুলি হলো “বেশ্য” [স্ত্রীলিঙ্গে বেশ্যা], “পতিতা”, “গণিকা” ইত্যাদি। “বেশ্যা”, বা “গণিকা”-র যে সব অর্থ M. Monier Williams-এর  Sanskrit–English Dictionery [৯]–তে আছে সেগুলি হলো – বারকন্যকা – ‘girl (taken) in term’. a herlot, courtazen, Das. বারনারী, বারমুখ্য, m (prob) the chief of a number of harlots, a royal courtazen, MBH; বারযুবতি  f [স্ত্রীলিঙ্গ] = Kanyaka, Das; বারঘোষিত, বারবনিতা (Ratnav : Dhurtan) f, a harlot, prostitute; বারবিলাসিনী, বারসুন্দরী (L), f = Kanyaka = seva f practice of harloty  or a set of harlots, w (= স্ত্রী) f kanyaka; বারাঙ্গনা f. id kav. ‘পতিতা” – এই তৎসম শব্দটিও যৌনকর্মীর প্রতিশব্দ, এবং এরও ব্যবহার বাংলায় আছে। তবে প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে সম্ভবত গণিকা অর্থে এই শব্দটির ব্যবহার নেই কারণ পতিতার অর্থ পতন বা পড়ে যাওয়া। বাংলায় তথাকথিত ‘সমাজচ্যূত’ হওয়া মেয়েদের বোঝাতে স্ত্রীলিঙ্গ করে ‘পতিতা’ করা হয়েছে। বাংলায় খাঁটি দিশি শব্দ ‘খানকি’ বা ‘রাঁঢ়’ কিংবা হিন্দি ‘রেন্ডি’ শব্দটিরও বহুল লোকায়ত ব্যবহার আছে।

 

শিরিন বলেছিল, “সারা রাত আমার ঘরে আমার শরীর ধামসে যাওয়া রসের নাগর, সকালে আমার মতো খানকির মুখ দেখে ভুরু কোঁচকায়, তাদের কাছে আমি যৌনকর্মী, না খানকি না বেশ্যা কি এল গেল? আমি, আমিই!” তারপর ওর সঙ্গী রাবেয়াকে দেখিয়ে বলেছিল, “ঐ দ্যাখো, ঐ খানকি পাশের পাড়ায় বাবু ধরেছিল। বাবুর ছেলে পেটে ধরেছিল। ছেলের জন্ম হতেই সে বাবু পালাল। কোনোদিন ছেলের মুখের দিকেও তাকায় নি। ‘ভগমান’ দিয়েওছে তেমনি, বাপের মুখ বসানো ছেলের মুখ!”

 

ত থ্য সূ ত্র

১. Jean-Baptiste Tavernier, Travels in India, 1 trans. V.Ball, Second edition, ed. William Crooke, Munshiram Manoharlal, New Dellhi : 2001, p.126-27

২. ঐ।

৩. Nicholas D. Kristof and Sheryl WuDunn, Half the Sky: Turning Oppression into Opportunity for Women Worldwide, Vintage, New York, 2009, pp5-6.

৪. Asian-African Legal Consultative Organization, ‘Establishing Cooperation Against Trafficking in Women and Children’, AALCO Secretariat, New Delhi pp.3

৫. Brian M. Willis and Barry S. Levy, “Child Prostitution: Global Health Burden, Research Needs, and Interventions,” The Lancet 359 (April, 2002)

৬. Nicholas D. Kristof and Sheryl WuDunn, Half the Sky: Turning Oppression into Opportunity for Women Worldwide, Vintage, New York, 2009, pp9-10.

৭. Human Rights Law Network, Trafficking & the Law, HRLN, New Delhi, 2006.

৭. তরুণ বসু, “ভিন্ন নারী অন্য স্বর”, দুর্বার, কলকাতা, ২০১১, পৃ.৩৪।

৮. M. Monier Williams, Sanskrit–English Dictionary, Munshiram Manoharlal, (New Delhi, 1994. p.943-45।

 

লেখক সামাজিক কর্মী ও প্রাবন্ধিক।

Share this
Recent Comments
1
  • comments
    By: বিপ্লব মাজী on August 25, 2020

    নারী পাচার নিয়ে চতুর্থ কিস্তির তথ্য সমৃদ্ধ লেখাটি ভাল লাগল। মর্মান্তিক! নারী পাচার পৃথিবীর অন্যতম বড় ব্যবসা ও শিল্প। পৃথিবীর কোন সরকার এর প্রতিকার করতে পারে নি।

Leave a Comment