মহামারী, লকডাউন এবং সোনাগাছির মেয়েরা ২


  • June 7, 2020
  • (0 Comments)
  • 454 Views

মোদীবাবুর অপরিকল্পিত লকডাউন-এর প্রথম সপ্তাহ পেরনোর আগেই থেকেই সোনাগাছির বেশিরভাগ মেয়েরই অবস্থা সঙ্গীন হয়ে দাঁড়াল। এ দেশের বিভিন্ন রাজ্যের প্রায় ৬ কোটি পরিযায়ী শ্রমিক অন্য রাজ্যে আটকে পড়ে যেমন চরম দুর্দশায় পড়েছেন, কলকাতার যৌনপল্লিগুলির প্রায় ১০ হাজার মেয়ের অবস্থা তার থেকে কিছু কম ভয়াবহ নয়। লকডাউনের দিন দশেকের মধ্যেই কোনোরকমে চালডাল ফোটানোর মতো অবস্থাও ওদের থাকত না যদি না বাইরে থেকে ত্রাণ পৌঁছত। লিখেছেন তরুণ বসু। দ্বিতীয় কিস্তি। প্রথম কিস্তি – এই লিঙ্কে

 

প্রথম দফার লকডাউন শেষ হওয়ার আগেই লক্ষ্মী-নীতা-স্বপ্না-ছবি-মীনা-জরিনা-আসমানী-কোহিনুর–পার্বতী কিংবা মায়াদের অবস্থা প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ওদের অনেকেরই দেশ-গাঁএর বাড়িতে বাবা-মা আছে, কেউ-বা কোনো হোম বা হোস্টেলে ছেলে-মেয়েকে রেখেছে লেখাপড়া শেখানোর জন্যে। তাদের কাছ থেকে আর্ত ফোন আসছে। কারণ তারা কেউ স্বস্তিতে নেই। একদিকে স্বপ্না-ছবি-মীনা-জরিনার রোজগার নেই ফলে আর্থিক দুর্দশা চরমে। অন্যদিকে ওদের বাচ্চাদের থাকা-খাওয়ার টাকা দিতে পারছে না, যান-বাহনও বন্ধ তাই ফিরিয়ে আনতেও  পারছে না। সরকারের ঘোষণা যাই থাক, হোম বা হোস্টেল কতৃপক্ষ চাপ দিচ্ছে; কারও-বা বৃদ্ধ বাবা-মা অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে, তাদেরকে টাকা পাঠাতে পারছে না।

 

আসলে দেশটা যারা চালায় তারা শাসক হওয়ার আগে চা বেচুন আর তেলেভাজা, টাকা-টাকায় পাওয়া ভারতের গোলবাড়ির পোলাও-বিরিয়ানি পেটে পড়লেই দুর্ভিক্ষকালে ইংল্যন্ডেশ্বরীর ‘রুটি নেই তো কেক খাক’ উক্তিটিই আবডালে অনুসরণ করতে শুরু করেন। যেমন এখন করছেন, এই করোনা কালে – একটা বিশেষ শ্রেণিকে বাঁচাবার স্বার্থে – করোনা-ত্রাসের গপ্পো ফেঁদে, করোনা প্রতিরোধে লকডাউনের গপ্পো ফেঁদে। হ্যাঁ, গপ্পোই ফেঁদে। আক্ষরিক অর্থেই গপ্পো ফেঁদে। আর এই গপ্পোর ‘বলি’ শ্রমিক শ্রেণির মানুষরাই, তা সে মুর্শিদাবাদের জলঙ্গির পাড়-ভাঙা চরে দিনে ৬০ টাকায় হাজার বিড়ি বাঁধা রশিদা বিবিই হোন আর মাতলায় মীন-ধরে দিনে ৪০ টাকা পাওয়া সরস্বতী মন্ডলই হোন কিংবা সুরাতের বা গুরগাঁও-এর রোজ-এর হিসেবের পরিযায়ী-অ-পরিযায়ী নির্মাণকর্মীই হোন। পরিশীলিত ভাষায় যাদের আমরা বলছি অসংগঠিত-শ্রমিক। এদের সংখ্যা ৪৬ কোটির কাছাকাছি। [মোট ৪৭.৩ কোটি কর্মজীবী শ্রমিকের মধ্যে ৯৪ শতাংশই অসংগঠিত দিন আনা দিন খাওয়া শ্রমিক। প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ থাক, মেয়েদের শ্রমে ৯৫ শতাংশই অসংগঠিত ক্ষেত্রের (রিপোর্ট অফ দ্য ন্যাশনাল কমিশন অন লেবার, ২৯ জুন ২০০২, পৃ.৯৮৫)।] হিসেবটা ২০০২ সালের। গুগল সার্চ করলে বর্তমান সময়ের সংখ্যাটা পাওয়া যাবে ৪৩.৭ কোটির মতো। সরকারি হিসেব!

 

সে যা হোক, সোনাগাছির লকডাউনের কথায় ফিরি। ভারত জুড়ে তালা বন্দির কারণ করোনা ভাইরাস। মুশকিল হয়েছে, টিবি বা ডায়েরিয়ার মতো শ্রেণি সচেতন নয় এই ভাইরাসটি। বাবুজনের হেঁশেলেও উঁকি মেরেছে সে, ফলে দেশের ‘ইতর জনতা’-র ইজারা নেওয়া রাজনৈতিক নেতা, উন্নয়নের-দালাল, বেসাতি-আধিপতি, বাবুশ্রেণির আমলা-কামলাদের বাঁচাতে মোদিবাবু পুরো দেশের সব কিছু মাত্র ৪ ঘণ্টার নোটিশে বন্ধ করে দিয়েছেন। তাঁকে সঙ্গত করেছে, তাঁর বা তাঁরই মতো মানুষদের জয়ধ্বজা তুলে ধরা তাদের আসলী দোসর মেইন স্ট্রিম মিডিয়া। দিন-রাত ঢাকঢোল পিটিয়ে এরা এমন ত্রাস ছড়িয়ে দিয়েছে যে, আপনি অন্য কিছু বুঝুন না বুঝুন, করোনা যে যে-কোনো মুহূর্তে আপনাকে শেষ করবে সেটা বুঝে গেছেন! সোনাগাছির মেয়েরা এই কথাগুলোর মানে ক্রম-অনুযায়ী ঠিক পরপর ধরে ধরে না-বুঝলেও ওসব গপ্পোর ভেতরের সারাসত্যটা বোঝে। বোঝে বাবু শ্রেণি আর তাদের তফাৎটিও।

 

কোনো পথ যেখানেতে নেই, সেখানেই বুঝি মেলে এক খেই, আর এক আশা।

 

বাঙালির সেক্যুলার উৎসব পয়লা বৈশাখের দিন দুয়েক আগের কথা। সুনসান সোনাগাছির দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিটের ৫ নম্বর বাড়ির বার দরজার সিঁড়িতে বসেছিল লক্ষ্মী-অনীতা-সাকিলারা – কিছু ত্রাণের আশায়। সেদিন অবশ্য চাল-ডালের থেকে ওদের অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল একটু জ্বালানির, একটু ‘কেরাচিনি’র।

 

একটু ভয়ে ভয়েই ওদের জিজ্ঞেস করেছিলাম – রেশনে কেরোসিন তেল দেয় না?

– হ্যাঁ, দ্যায় তো। মাঝে মাঝে দ্যায়। তবে যাদের ছোটো কার্ড আছে তারা পায়। আমাদের তো ছোটো কার্ড নেই। বড় কার্ডে কিছু দেয় না। (ছোটো কার্ড মানে ডিজিটাল কার্ড। আর বড় কার্ড মানে পুরনো আমলের পিচবোর্ডের রেশন কার্ড, যা এখন বাতিল হয়ে গেছে। তা দেখিয়ে এখন আর র‍্যাশান পাওয়া যায় না।)

– তোমাদের কার্ড নেই?

– না, ৫ নম্বরে কারোর ছোটো কার্ড নেই। বড় কার্ডও সবার ছিল না।

 

 

সেদিনই পয়লা বৈশাখের জন্যে কোনো এক ত্রাণ বণ্টনকারী সংস্থা দু-ড্রাম কেরোসিন তেল দিয়েছে। খবরটা  সোনাগাছিতে যখন ছড়িয়েছিল তখনই দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিট, অবিনাশ কবিরাজ স্ট্রিট, ইমামবক্স লেন, মসজিদ বাড়ি স্ট্রিট থেকে কয়েকশ মেয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। লক্ষ্মী-নীতা-স্বপ্না-ছবিরাও সেই লাইনেই দাঁড়িয়েছিল। তবে ভিড় যা হয়েছিল তাতে তেল আর ওদের জোটে নি। বলতে গেলে দাঁড়াবার আগেই তেল শেষ। আধ-লিটার কেরসিন তেলের জন্যে সামাজিক দূরত্ব বিধি মানার কথা তখন ওদের মাথায় উঠেছিল।

– ‘আগে তো বাঁচতে হবে। বাঁচতে হলে খেতে হবে। খেতে হলে রান্না করতে হবে।’

তার জন্যে জ্বালানি চাই। কে দেবে ওদের জ্বালানি?

 

দুর্গাচরণের এই ৫ নম্বর বাড়িতে তিনটে তলা। ২৬ জন মেয়ে থাকে। তাদের অনেকেরই সন্তান আছে। এক জন বাদে সবারই বাবু আছে। মোটামুটি গড়ে আড়াই জন হিসেবে ধরলেও ৬৫ জন। হ্যাঁ, এটাই সোনাগাছির সব বাড়ির চিত্র। (দেবাশিস বসু সোনাগাছি-সহ কলকাতার কয়েকটি যৌনপল্লির ঠিকানা ও বাড়ির নম্বর ধরে ধরে একটি তালিকা তৈরি করেছেন। [‘কলকাতার যৌনপল্লী’, সুধীর চক্রবর্তী সম্পা. যৌনতা ও সংস্কৃতি, পুস্তক বিপণী, কলকাতা : ২০০০, পৃ.৩২০-২১] সেই হিসেবে সোনাগাছির বাড়ির সংখ্যা ১৭১। আর আমার গণনায় আমি এক-একটি বাড়িতে সর্বোচ্চ ৩৬ জন এবং সর্বনিম্ন ১৬ জন পর্যন্ত পেয়েছি। সেই হিসেবে যদি গড়ে ২০ জন মেয়ে ধরি তাহলে মেয়ের সংখ্যা ৩৪২০। কার্যত সংখ্যাটা এর থেকেও বেশি। এদের সংসারে মোট আড়াই জন হিসেবে ধরলে শুধু সোনাগাছিরই জনসংখ্যা হলো ৮৫৫০।) তো আড়াই জনের জন্যে শুধু ভাত-ডাল আর একটা ভাজা করতেও সিকি লিটারের বেশি তেল লাগে। ২৬ জনের মধ্যে ৬ জনের রান্নার গ্যাস আছে। বাকিদের নেই।

 

ওদের কাছেই জানতে চেয়েছিলাম – সোনাগাছিতে কতজন মেয়ের গ্যাস আছে?

– ১০০ জনের মধ্যে ২০ জনের ধরে নিতে পারেন। এই গ্যাসও পেয়েছে বছর কয়েক আগে। বিপিএল তালিকাভুক্তদের সরকার আলাদা করে গ্যাস দিয়েছিল যখন সেই সময়।

 

 

কথার সত্যতা বুঝলাম, অন্য আর একটি প্রসঙ্গে। দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি সোনাগাছির মেয়েদের লকডাউন পরবর্তী ত্রাণ বিলির অগ্রিম ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্দেশ্যে, লকডাউনের মধ্যেই একটি সমীক্ষা চালায়। সেখানে কত জন মেয়ের রেশন কার্ড আছে সেটা জানতে গিয়ে দেখা যায়, সমীক্ষা-শুরুর প্রথম ১০০ জনের মধ্যে মাত্র ২ জনের ডিজিটাল কার্ড আছে অর্থাৎ যে কার্ডে তারা রেশন পেতে পারে। সমীক্ষাটি এখনও চলছে তাই সম্পুর্ণ হিসেবটি দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এ-ব্যাপারে কোনো সন্দেহই নেই যে, সমীক্ষা শেষে গোটা অঞ্চলের সেই সংখ্যা খুব বেশি যদি বাড়ে তাহলেও সেটা ৫/৬ শতাংশর বেশি হবে না।

 

এরও পর আছে।। সরকারি রেশন যদি মিলতও তাহলেও পেত কিছু চাল, চিনি, আর হয়তো কিছু মশলাপাতি। হ্যাঁ ‘হয়তো’-ই। কারণ মাঝারি গৃহস্থরা এখন লাইনে দাঁড়িয়ে রেশন নেয় না। তাই রেশন ডিলাররা এখন আর কাউকে ভয় পায় না। তারা যা দেয় তাই-ই নিতে হবে। ‘ছোটোলোকদের’ আবার পছন্দ-অপছন্দ কী? সেও বাজার দরের তুলনায় এমন কিছু কম নয়। তারপর আরও কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র থাকে। সেও কিনতে হয় বাইরে থেকে। এই অভাবের উঠোনে সে কি সম্ভব?

 

সাবিনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম – তোমার তো এখন আয় নেই। তাহলে সংসার চালাবে কিভাবে?

– এখন তো কাস্টমার নেই। তাই আয়ও নেই। লকডাউন উঠে গেলে কাস্টমার আসলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

– কিন্তু, এখন তো অনেকদিন এরকম চলবে। তোমার যা পেশা তাতে তো ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখতে পারবে না। কাস্টমারও তো ভয় পাবে। আসলেও আগের তুলনায় কমই আসবে।

– না, এখন কাস্টমার নেই। থাকলেও আমরাই নিতাম না। সোনাগাছির একটাও মেয়ে এই সময়ে কাস্টমার করে নি। এখন তো আমরা যে যা যতটুকু দিচ্ছে তাতেই চালাচ্ছি। রান্নার জ্বালানি না পেলে চিঁড়ে মুড়ি। বাচ্চাদেরও তাই। তাছাড়া আমদের এখানে ঘর ভাড়াও তো অনেক। বাকি পড়ে আছে। এখানে দালাল বাড়ির ভাড়া মাসে ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকা। আমাদের ভাড়া একটু কম হলেও দিতে তো হবে! বাড়িওলা তো ছাড়বে না। আর পরে আয় কমে গেলে সেই রকম করেই চালাতে হবে।

 

আরও চাঁছাছোলা উত্তর দিয়েছিল নমিতা ধাড়া যখন ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, যদি পেশাটা না চলে কি করবে?

– এডস-এর সময়েও তো এরকমই ভয় দেখিয়েছিল, এডস হলে সারবে না, লোকে ছোঁবে না। হাসপাতালে নেবে না। সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না। সোনাগাছিতেই টিঁকতে পারবে না। কত কিছু। কৈ কিছুই তো হয় নি। কাস্টমারও তো কমে নি। করোনার বেলায়ও কিচ্ছু কমবে না। সে যতই ছোঁয়াছুঁয়ির ভয় দেখাক না কেন?

 

 

Whether I reach the destination or not / At least I am part of the caravan

— Kamala Bhasin, Exploring Masculinity, Women Unlimited, New Delhi: 2005(2004) p.63

 

কিন্তু না, সবাই নমিতা ধাড়ার মতো আশাবাদী নয়। অনেকেই বলেছে, পরে কি হবে তা ভাবি নি। অন্যান্য অনেকের কথার নির্যাস থেকে পাওয়া যাচ্ছে : আগে আমাদের তো কেউ স্বীকারই করত না। সমাজ আমদের ভালো চোখে দেখত না। এখনও দেখে না। তারপর এডসের কল্যাণে আমরা সংগঠিত হলাম। আমরা শ্রমিকের অধিকার চাইলাম, কিন্তু পাই নি। এ রাজ্যে আমরা ৩০,০০০ (?) যৌনকর্মী। কে আমদের কথা ভাববে? কোন সরকার ভাববে? সব তো নিজের নিজের ধান্দায় থাকে, আমাদের ধান্দা নিয়ে কে আর মাথা ঘামবে? আমাদের ভূত-ভবিষ্যৎ লকডাউন করে দিলেই সব বেঁচে যায়। আমরা এরই মধ্যে আমাদের মতো করেই চালিয়ে যাব। হ্যাঁ, চালিয়ে ওদের যেতেই হবে। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্যে। পরবর্তী প্রজন্মর আর একটু ভালো ভবিষ্যতের আশায়।  এখানে মনে পড়তে পারে আধুনিককালের সমাজতাত্ত্বিকের বয়ান :  Prostitution was encouraged by affairs even as the women were trying to piece together their lives. Thus, despite the will to survive, ‘the stringent codes of conduct of Indian society crushes them again into keeping the families interest and name and fame above their own and their children’s hope for a better life. (Malavika Karlekar, ‘Domestic Violence’, in Veena Das ed., The Oxford India Companion to Sociology and Social Anthropology, OUP, New Delhi : 2003, p.1149)।

 

বছর কুড়ি আগে সোনাগাছির এক যৌনকর্মী বলেছিলেন : A Sexworker should have the right to be a human being and should enjoy all the rights that a human being enjoyes. Instead of abolishing the profession, the oppression and exploitation inherent in sex work should be abolished. (John Frederik, Thomas L. Kelly, eds., Fallen Angels : The Sexworker in South Asia, Lustre Press, Roli Books, New Delhi : 2000, p.161) কারণ Finally, female prostitution must be named as a traditional Indian outside-family occupation, and communities of prostitutes as sometime substitutes for families. The condition of prostitutes in India, as in other large nations, ranges from relatively privileged to severely oppressed. Long-standing, well-structured, and self-protective communities of sexually active women outside of traditional families. (Margaret Trawick, ‘The Person Beyond the Family’, in Veena Das ed., The Oxford Companion to Social Anthropology, OUP, New Delhi : 2003, p. 1164)

 

তৃতীয় দফার লকডাউনের পর স্বাভাবিকভাবেই সোনাগাছির মেয়েদের অবস্থা করুণতর হয়েছে। আশ্চর্যের যে সোনাগাছির, এমনকি রামবাগান-শেঠবাগান-জোড়াবাগান কিংবা বউবাজার-লকার মাঠ-টালিগঞ্জ-খিদিরপুরেও একটিও করোনা রোগীর খবর নেই। অথচ প্রথম দফার লকডাউনের মধ্যেই সোনাগাছিতে ঢোকার সব মুখ পুলিশের গার্ড রেল দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হলো, হাই রিস্ক জোন হিসেবে। অথচ লকডাউনের জন্য সোনাগাছিতে যাঁরা মারা গেছেন তাঁরা কেউই করোনা পজিটিভ নন। এই অঞ্চলের অবিনাশ কবিরাজ স্ট্রিটে প্রথম মৃত্যু হয় যাঁর তিনিএকজন পুরুষ। মৃত্যুর পরপরই বলা হলো, তিনি করোনা পজিটিভ তাই তাঁর মৃতদেহ স্বজনদের হাতেও দেওয়া হলো না। কিন্তু, কয়েকদিন বাদেই ফের ঐ মৃতের নতুন রিপোর্ট আসে যেখানে বলা হয়, মৃত ব্যক্তি করোনা পজিটিভ ছিলেন না। সরকারি গাফিলতি নাকি লকডাউন সিন্ড্রোম।

 

চতুর্থ দফার লকডাউনের পরও সোনাগাছিতে করোনা আক্রান্তের কোনো খবর নেই, নেই মৃত্যুর খবর। না, ওরা কেঊ বাইরে বেরোয় নি, ওদের ভেতরেও কেউ ঢোকে নি। লকডাউনের মধ্যে ওরা ওদের নিজস্ব আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে রিলিফ নিয়েছে, কিন্তু পেশা করে নি। ওরা এখনও আশায় আছে লকডাউন উঠে গেলে সোনাগাছি আবার সোনাগাছিতেই ফিরবে।

 

সত্যিই কি ফিরবে? দুর্যোগের সময় জীবন বাজি রেখে পলায়নী মন পেছনের স্মৃতিকে হিসেবে রাখার অবকাশ পায় না। আসল সঙ্কটের শুরু দুর্যোগের পর। প্রত্যাশাহীন সহযোগিতার হাত আড়ালে ঢাকা পড়লে, ফেলে যাওয়া স্বভূমির ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে, টুকরো মন জোড়া দিয়ে ফের খোঁজ পড়ে নতুন পথের— নতুন প্রাণের প্রবাহের। অনেকদিনের পথ পেরিয়ে ইতিহাস-ভূগোলহীন সোনাগাছির মেয়েরা তেমনই এক নির্ভেজাল আশায় বসে আছে। কারণ তারাও থাকতে চায় উর্ধ্বতমের উদ্বর্তনের লড়াই-এ।

 

দুর্বারের এক প্রাক্তন সচিব কথায় কথায় সেদিন বলেছিলেন, আমরা তো সব সময়েই লকডাউনেই আছি। আগে ছিলাম সামাজিক লকডাউনে। তারপর এইচআইভি-র লকডাউনে। আর এখন আমরা করোনার লকডাউনে। আমাদের শয্যা তো সাগরেই পাতা, শিশিরে ভয় পেয়ে আর কি করব!

 

 

 

প্র তি বে দ কে র  কৈ ফি য় ত

নটেগাছটি মুড়োয় নি। মুড়োবে না।

 

করোনা-লকডাঊনে সোনাগাছির খবর পেতে ঢুকে পড়েছি ওদের অন্দরে, ওদের ইতিহাস-ভূগোল-সমাজ-বিন্যাসের অন্দরে। ঢুকে পড়েছি ওদের বর্তমান দৈনন্দিন চিত্রে, অচ্ছ্যুৎ পেশা নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই-এ। পুরনো ধারণার খাঁজে খাঁজে লেপ্টে থাকা অজ্ঞতার ঢেউ লকডাউনের আশীর্বাদে খোঁজ দিয়ে গেল ওদের জানা-না-জানা অন্য একরাশ অঙ্ক্র। যেমন, বছর কুড়ি আগে আটলবিহারী বাজপেয়ির আমলে, ১৯৯৯-এর ১৫ অক্টোবর রবীন্দ্র বর্মার নেতৃত্বে গঠিত হয় ২য় জাতীয় শ্রম কমিশন। ঐ কমিশনের খসড়া রিপোর্টে বিভিন্ন পেশার যে তালিকা তৈরি হয়েছিল তাতে যৌনকর্মকে একটি পেশা হিসেবে প্রথমে উল্লেখ করা হয়েছিল, কিন্তু ২৯ জুন ২০০২-এ চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেখা যায়, যৌনকর্ম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে। মেয়েদের শ্রমে ৯৫ শতাংশ অসংগঠিত শ্রমিক নিয়ে কত কথাই বলা হয়েছে ঐ প্রতিবেদনে। এমনকি কোন কোন পেশাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে তার বিবরণও। (পৃ. ৯৮৫-৮৭)। কিন্তু এ তো এই যুগের কথা। অনেক অনেক বছর আগে, সেই কবে কৌটিলীয় অর্থশাস্ত্রে ‘গণিকাধ্যক্ষ’ নামে একটি অধ্যায় যোগ করা হয়েছিল, যা পড়লে বোঝা যায় তাদের স্বীকৃতির কথা। অনেক পরে ষোড়শ শতকে মোগল সম্রাট আকবর তার একটি সুলভ রূপ নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। সে ইতিহাস আছে আইনী-এ-আকবরীতে। তারপর?  কিংবা তার আগে?  মনুর বিধান কিংবা বাৎসায়নের কামসূত্র, মহাভারত কিংবা রামায়ণ, অথবা এ-দেশের প্রথম উল্লেখযোগ্য লিখিত ইতিহাস কলহনের রাজতরঙ্গিনীতে ওদের সম্পর্কে মন্দ কথাই লেখা রয়েছে। অথচ, দু-হাজার বছর ধরে পেশাটা রয়েই গেছে। এও এক irony!

 

থাক, সে আখ্যান পরে কখনও শোনানো যাবে।

 

কৃ ত জ্ঞ তা  স্বী কা র

রণিতা ভড়, কাজল বোস, মিতা মন্ডল, বিশাখা লস্কর, ভারতী দে, বিপ্লব মুখার্জি।

 

লেখক সামাজিক কর্মী ও প্রাবন্ধিক।

Share this
Leave a Comment