বাংলা এখন – করোনাসময় এবং একরাষ্ট্র ও বহুরাষ্ট্রের রাজনীতি


  • July 29, 2020
  • (2 Comments)
  • 590 Views

বহু দশক ধরে বাংলা দখল করতে বিজেপি-আরএসএসের শখ কি করোনাসময়ে এসে পূর্ণ হতে চলেছে? সঙ্ঘ-রাষ্ট্রর সম্মিলিত উদ্যোগে সমাগত নাজি যুগের সম্ভাবনা নিয়ে বাংলার বাম, অতিবাম, মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়া কি ভাবছে ও করছে? লিখেছেন সৌমিত্র ঘোষ

 

করোনাবাজার 

করোনাসময়ে বাজার জমজমাট। লকডাউন হোক আর লোকে মরুক, রাজনীতির বাংলা বাজারটি একরকম থাকে। টিভি পর্দায় চোখ রাখুন, সরু মোটা টাইপড়া অ্যাঙ্করকূল হাত নেড়ে, গলা খেলিয়ে বাণী বিতরণ করছেন, অন্যদিকে তুখোড় দুর্দান্ত রাজনীতিবাজেরা এসে এক ভাট একই ভঙ্গিতে বলে যাচ্ছেন। চারমাস ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়া কোভিড, দস্যু করোনা, ইমিউনিটি করোনা, হার্ড ইমিউনিটি করোনা, কোমর্বিডিটি ও কোভিডের নিগূঢ় আর্ন্তসম্পর্ক, এবং কোভিড মোকাবিলায় বাংলা সরকারের ন্যাজগোবর ও জিভ-বার করা অবস্থার সাতকাহন শুনতে শুনতে দিকদারি ধরে গেলো। টিভি পর্দা মানে মিডিয়া। তার বাইরে আছে এসময়ের সমাজের জ্বলন্ত ফুটন্ত ঝকমকে অসলি আইনা—সোশ্যাল মিডিয়া। সেখেনে করোনা নিয়ে গায়ে কাঁটা দেওয়া সব বিদ্রোহী থিওরি উঠলে উঠছে, রোগফোগ সব বদ সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত, রোগ না থাকলে বিপ্লবের লেলিহান শিখা যে পুড়িয়েমুড়িয়ে সব ছাই করে দিতো, সেটি আটকানোর জন্য করোনা মালটিকে আমদানি করা হয়েছে। মানে এসব কিছু না, অর্থে ঘোর ষড়যন্ত্র, মাস্কফাস্ক ষড়যন্ত্রতর, রাস্তায় বেমাক্স দলে দলে বেরিয়ে পড়ুন, চা-বিস্কুট-বিড়ি খান, আলুপটল কিনুন, তাপ্পর ফেসবুকে দু দশ গন্ডা পোস্ট ঝেড়ে দিন। অথবা ভাইরাস নিয়ে থিওরি দিন। খচাখচ লিঙ্ক মেরে প্রমাণ করে দিন, সুইডেন কিম্বা আর্জেন্টাইন হচ্ছে আসল পথ, তারা গণবিরোধী লকডাউন না করে হার্ড ইমিউনিটি করিয়েছে, ফলে লোকজন করোনাকে তুচ্ছু করে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর, শরীরে যদি সিপিএম জিন থাকে, তাহলে বলতে থাকুন কেরালা কেরালা কেরালা কেরালা, রামনাম কি মোদীনামের মতো, কেরালানামেও কাজ হয়, ইমিউনিটি বাড়ে, করোনা ধরে না।

 

যাক গে। অমন হয়, হয়ে থাকে। মিডিয়া-সোশ্যাল মিডিয়ামার্কা রাজনীতির বাইরে গিয়ে সমাজবদলের বামপন্থী রাজনীতির চর্চা ও অনুশীলন এখনো সম্ভব, এই বিবেচনায় গ্রাউন্ডজিরোয় ইতিপূর্বে একটি লেখায় করোনাসময়ে বামপন্থীদের সম্ভাব্য কাজ বিষয়ে কিছু নেহায়েৎই প্রাথমিক প্রস্তাবনা রাখা হয়েছিলো। প্রস্তাবনাগুলো মোটামুটি সংক্ষেপে এরকম ছিলো, এক, রাষ্ট্র এই মুহূর্তে সামাজিক দায়িত্ব পালনে অক্ষম, যেহেতু নিওলিবরল সময়পর্বে পুঁজিতন্ত্র থেকে রাষ্ট্রকে আলাদা করা যায় না। করোনা বিপর্যয় বামপন্থীদের কাছে একটা সুযোগ এনে দিচ্ছে, জনস্বাস্থ্যের দাবীকে সামনে নিয়ে আসার, জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্কের কথা বলার, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য এ দুয়েরই ওপর পুঁজিতন্ত্রের সার্বিক হামলার কথা বলার। দুই, ব্যাপারটা ভাবতে বলতে যতই গোলমেলে লাগুক, এদেশের বামপন্থীদের গরিষ্ঠাংশ পুঁজিতান্ত্রিক এখনো বড় উন্নয়নে বিশ্বাসী, পুঁজিতন্ত্র-সৃষ্ট যে বিপর্যয়-বৃত্তে(সাইক্লিকাল ডিজাস্টার) পৃথিবী ও পৃথিবীর গোটা প্রাণ-ব্যবস্থা এখন আটকা, তার সঙ্গে নিজেদের রাজনীতিকে যুক্ত করার কথা তাঁরা ভাবতে পারেন না। তথাপি, পুঁজিতন্ত্র যে ব্যবস্থা হিসাবে অচল শুধু নয় প্রাণঘাতী, মানুষের জীবনজীবিকা রক্ষা করতে গেলে, পৃথিবীর প্রাণব্যবস্থাকে বাঁচাতে গেলে যে পুঁজিতন্ত্র থেকে বেরুতেই হবে, এই কথাটা জোর দিয়ে বলতেই হবে। তিন, হালের পুঁজি-রাষ্ট্র ব্যবস্থাটা সংষ্কার চালিয়ে ভালো হবার নয়, তাকে ভেঙে ফেলার রাজনৈতিক লড়াই চালাতে হবে। করোনা অবস্থা দেখাচ্ছে, পুঁজিতন্ত্র থেকে রাষ্ট্রকে আলাদা ভাবে দেখাটা, রাষ্ট্রকে ভরসা করাটা ঠিক নয়। রাষ্ট্র ব্যাপারটা, বিশেষত বিজেপিপ্রচারিত ও সঙ্ঘভাবাবিষ্ট কেন্দ্রীভূত শক্তিশালী রাষ্ট্রভাবনা ব্যাপারটা কোন কাজের না, তা না দিতে পারে মানুষকে কাজ, না পারে তাদের জীবন বাঁচাতে। চার এবং পাঁচে বলা হয়েছিলো, ভারত রাষ্ট্র ব্যাপারটাকে তলিয়ে বোঝার দরকার, রাষ্ট্রের মধ্যে যে সব বিরোধাভাস ও দ্বন্দ্ব বর্তমান, সেগুলোকে খুঁচিয়ে তুলে পুঁজিসহায়ক এবং দক্ষিণপন্থী ‘শক্তিশালী এক-রাষ্ট্র’ প্রকল্পটির বিরুদ্ধে কাজ করা দরকার। এই কাজটা করতে গেলে রাষ্ট্রের সঙ্গে, এক অর্থে রাষ্ট্রের মধ্যে ঢুকেও কাজ করতে হবে। যে কতিপয় পাঠক আগের লেখাটা পড়েছেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো, এখানেই একটা গোল পাকছে। রাষ্ট্রকে দিয়ে যদি সমাজবদলের কাজ আদৌ না হয়, রাষ্ট্র যদি পুঁজিতন্ত্রের অচ্ছেদ্য অংশই হয়, বামপন্থীরা তার সঙ্গে কাজ করবেন কেন, কি করেই বা? এক থেকে তিনে যা বলা হচ্ছে, চার-পাঁচে কি তার বিপরীত কথা বলা হচ্ছে না? যেহেতু আগের লেখাটায় বিষয়টি বিশদে বলা যায়নি, এবারের লেখাটায় সেই চেষ্টা করা যাক। সেই চেষ্টায় রাষ্ট্রের রকমফের, বিজেপি-সঙ্ঘ মার্কা শক্তিশালী এক-রাষ্ট্র, ভারত রাষ্ট্রের ইতিহাস, সে ইতিহাসে ওতপ্রোত রাষ্ট্রকেন্দ্রের বিকেন্দ্রীভবনের ঝোঁক, এসব নিয়ে খানিক আলোচনা, এবং শেষত, সে আলোচনায় আজকের বাংলাকে বসিয়ে বোঝার চেষ্টা করা, রাষ্ট্রহীন সাম্যবাদী সমাজের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদী কাজের মধ্যে রাষ্ট্রের সঙ্গে আপাত গা-ঘষাঘষিটাও(সাদা বাংলায় এনগেইজমেন্ট) কেন দরকারি হয়ে পড়ে।

 

রাষ্ট্র ও সংগঠিত দক্ষিণপন্থা, বামপন্থীদের কাজ

সব রাষ্ট্র একরকম নয়, একও নয়। ভারতবর্ষ বলতে যে ভূখন্ডটিকে এখন আমরা চিনি, সেখানে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকমের রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে, সে সব রাষ্ট্র কিম্বা রাষ্ট্রকল্প শাসনতন্ত্র আদৌ এক ছাঁচে ঢালা ছিলো না। ঔপনিবেশিক সময় ও তার পরে উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতেও যে রাষ্ট্র নির্মিত হয়েছে, তা আদতে বহুরাষ্ট্র, বিভিন্ন রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রকল্প ব্যবস্থার সমন্বয়। এই ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে গিয়ে বিজেপি ওরফে সঙ্ঘ যে রাজনীতিটা বাজারে ছেড়েছে, সেটা বোঝা দরকার। অন্যত্র এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি, এখানে সংক্ষেপে বলা যাক। এই রাজনীতির পিছনে দীর্ঘদিনের ভাবনা, সাংগঠনিক কাজ ও পাকা মাথার পরিকল্পনা আছে। সোশ্যাল মিডিয়া কিম্বা মিডিয়া ওই রাজনীতির একটা বড় দিক, যেমন সমস্ত রাষ্ট্রপন্থী হিংস্র রাজনীতির ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। নেতা এবং তার দল যা করবে তাইই বেদবাক্য(বা রেডবুক), অনুসরণ করো, মেনে নাও, প্রশ্ন করো না। সত্যমিথ্যা মায়া মাত্র। এসব জানা ব্যাপার, হামেশা হয়ে থাকে। ঝামেলা হচ্ছে যে ব্যাপারটা, অর্থাৎ বিজেপির রাজনীতির বিপদটা তো আর সত্যিই শুধু মিডিয়াবন্দী নয়। বিজেপির আমি-তুমি, মানে হিন্দু-মুসলমানের রাজনীতিটা তৈরি হয় অর্ধেক আর এস এসের সংগঠন দিয়ে, মিডিয়াটিডিয়া সেই অর্ধেকে, যেখানেই যান সঙ্ঘের লোকজন দোকান খুলে বসে আছে। সেখানে কাজ করে লাভ নেই। এক তো সঙ্ঘের টাকার জোর অনেক বেশি, গোটা দুনিয়া থেকে তাদের ঘরে সমর্থক সদস্যদের সোনাদানা ঢুকছে, কর্পোরেট ও অ-কর্পোরেট পুঁজির কথা ছেড়েই দিলাম। ফলে তারা মিডিয়াদখল করতে পারে অনায়াসে, সোশ্যাল মিডিয়ায় মাসমাইনের ট্রল বাহিনী ছেড়ে রাখতে পারে বছরকে বছর। এসবের মোকাবেলা করা চাট্টিখানি কথা? কিন্তু এহ বাহ্য। বিজেপি রাজনীতির আসল শক্তি রাষ্ট্রবাদে। যাবতীয় সংগঠন সত্বেও, আর এস এস এবং হিন্দু মহাসভা জাতীয় সংস্থাকে প্রায় একশো বছর ঘসটাতে হয়েছে। আশি-নব্বুইয়ের রামলালা পর্ব, করসেবা, পরের পর দাঙ্গা, এর কোনটা থেকেই সেই নিরঙ্কুশ নিঃসংশয় আধিপত্য অর্জিত হয়নি, আজ যা মোদী-শা বাহিনীর করতলগত। প্রচারকরা প্রচার করে, একলব্য ইস্কুলে গরিব নিরন্ন আদিবাসীদের ধরে পাকড়ে হিন্দু বানানো হয়, সঙ্ঘের অন্যান্য আখড়ায় হিন্দু সেনানী তৈরি হতে থাকে, তৎসহ মিডিয়া বাজতে থাকে, ফেসবুক টুইটার ইত্যাদিতে গালি ও তালির বন্যা বয়ে যায়, কিন্তু স্রেফ এই দিয়ে হয় না। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর একচ্ছত্র দখল না থাকলে, আপাত বিরোধীহীন ও চূড়ান্ত স্বৈরাচারের যে রাজনৈতিক পরিসরে আমাদের তথাকথিত গণতন্ত্রটি আজ সেঁধিয়ে আছে, তা শুধুমাত্র আরএসএস-এর ‘হিন্দু ক্ষমতা’ দিয়ে সম্ভব হতো না। হিন্দু ক্ষমতা দরকার, সে সঙ্গে রাষ্ট্রশক্তি আরো বেশি দরকার। পিছন থেকে পুলিস মিলিটারি জজ ম্যাজিস্ট্রেট আমলা গামলা মন্ত্রী সান্ত্রী সরিয়ে নিন, দাঙ্গাবাজ ও গোরক্ষকদের অর্ধেকের বেশি হাওয়া হয়ে যাবে। এরকমই হয়ে থাকে, হয়ে এসেছে। ধরুন গত শতাব্দীর তিরিশের দশকের জর্মনি, নাজিদের উত্থান। কমিউনিস্ট ও ইহুদি ঠেকানোর জন্য যে কালোজামা বাহিনী বাজারে নেমেছিলো, তাদের একার শক্তিতে কুলোয়নি। হিটলার যবে থেকে চ্যান্সেলর হলো, খেলা বদলে গেলো, নাজিরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠলো। তার আগে পর্যন্ত কমিউনিস্টরা সমানে সমানে টক্কর দিচ্ছিলেন, কিন্তু নাজি বিপদের স্বরূপ তাঁরা বোঝেননি। এক তো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার রগরগে জাতীয়তাবাদ, তার সঙ্গে আপোস করে জরমন বিপ্লবকে শেষ করা হলো, কমিউনিস্টদের তৎকালীন রাজনৈতিক মঞ্চ, সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দলের গরিষ্ঠাংশ সে বিশ্বাসঘাতকতায় সামিল। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের ওপরে অগাধ বিশ্বাস, নির্বাচনে জিতে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসবেন, বাকিটা পরে বুঝে নেওয়া যাবে। রাষ্ট্রে যে নাজি পার্টিও ঢুকে পড়তে পারে, পড়লে ঠিক কি হতে পারে, সেটা তাঁরা হৃদয়ঙ্গম করে উঠতে পারেননি। যখন পারলেন, বড় দেরি হয়ে গেছে, পুরো অস্ট্রো-প্রাশ্যান সাম্রাজ্যের চৌহদ্দি জুড়ে কমিউনিস্টদের কোতল করা হলো। রাষ্ট্রহীন দক্ষিণপন্থা একটা রাজনৈতিক মত, তার বিরুদ্ধে পুরোনো কায়দায় লড়া যায়। দক্ষিণপন্থী রাষ্ট্র হচ্ছে দানবীয় ও পৈশাচিক, সে সার্বিক নিকেশপন্থা ছাড়া কিছু বোঝে না। এবং, কমিউনিস্টরা যে ভুল বারবার করেছেন, পুঁজির প্রয়োজনে তৈরি, পুঁজির সহোদর রাষ্ট্র কখন খুনী দক্ষিণপন্থার গহ্বরে ঢুকে পড়বে, সেটা কে জানে? আজ যা বাকস্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের দাবীতে সরব, কাল তা বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার কল, দেখামাত্র গুলি, খুঁজে খুঁজে খুন, নাহয় জেলে পোৱা। অসংখ্য উদাহরণ আছে। ইন্দোনেশিয়ার কথা ভাবুন। কতজনকে খুন করা হয়েছিলো হিসেব নেই, বলা হয় লাখ পাঁচেক। আরো পরে, চিলি। লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশ। আফ্রিকার কংগো। তারপরে ধরুন আমেরিকা—খানিকটা জানাই ছিলো, তদুপরি সাম্প্রতিকতম যে গণ-আন্দোলনে সে দেশ তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে, তার ধাক্কায় একের পর এক হাড় হিম করা পুরোনো খুনের খবর উঠে আসছে কবর ছেড়ে। কুখ্যাত ক্লু ক্লুক্স ক্ল্যান বলুন, আর অন্যান্য দক্ষিণপন্থী বর্ণবিদ্বেষী, রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে এদের শরীরি রিস্তা, পুলিশ আর বিচারব্যবস্থার সার্বিক মদত ছাড়া এরা দিনের পর দিন এভাবে কালো মানুষদের খুন করে যেতে পারতো না। একটা সময় আসে যখন রাষ্ট্র নিজেই নেমে পড়ে রাস্তায়, প্রকাশ্য দিবালোকে অর্থাৎ জনসমক্ষে পুলিশ খুন করতে থাকে, কিম্বা দাঙ্গা বা লিঞ্চিং করে। দূরদেশের কথা থাক। বর্তমান লেখকের মতো বুড়োদের নিশ্চয় স্মরণে আছে সত্তরের বাংলার কথা, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যখন লিখছেন মুন্ডহীন ধড়গুলি আহ্লাদে চিৎকার করে, অথবা কে তুমি হে, দেবদারু বীথিতে গন্ধ পাও পুলিশের,  ঠিক কতজনকে জেলের বাইরে ও ভিতরে খুন করা হয়েছিলো হিসেব নেই। পুলিশ এবং কংগ্রেসি গুন্ডাদের আলাদা করাই যেতো না একটা সময়। পুরোনো কাসুন্দিতে কাজ না হলে নিকটবর্তী সময়ে ফিরুন, হালের দিল্লি দাঙ্গার কথা স্মরণ করুন, কিম্বা উত্তরপ্রদেশের পুলিশরাজ। কে সঙ্ঘ কে পুলিশ কে গুন্ডা কিচ্ছু ঠাওর করা যায় না।

 

কি দাঁড়ালো তাহলে? দক্ষিণপন্থার সবচাইতে বিপজ্জনক দিক হলো রাষ্ট্রকে নিজের রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করা, এমনভাবে ও এতটাই ব্যবহার করা যে রাজনৈতিক বিরুদ্ধতা ও রাষ্ট্রবিরুদ্ধতা সমার্থক হয়ে ওঠে। আপনি বলছেন মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও সংবিধানের পবিত্রতার ভালো ভালো কথা, রাষ্ট্র দেখছে দেশদ্রোহিতা। ফলে আপনি কথা বললে দোষ, আপনার তিন তিরিক্ষে ন দিনের ফাঁসি আর দশ দুগুনে কুড়ি বছরের জেল। অন্যদিকে, সঙ্ঘী গুন্ডারা দাঙ্গা করলে কি খুন করলে রাষ্ট্র নির্বিকার, যেন কিছু ঘটেইনি। এসবই আসলে পুরোনো কাসুন্দি। অত্যাচারের আর জুলুমবাজির পুরোনো নতুন হয় না, এক অন্যায় নানা কায়দায় নানা চেহারায় ফিরে আসে। সেভাবে খুঁটিয়ে দেখলে, রাষ্ট্রের মাধ্যমে জবরদস্তি বিরুদ্ধ মতকে চেপে দেওয়ার যে কায়দা, তা দক্ষিণপন্থীদের একচেটে নয়। সংসদীয় গণতন্ত্র বলুন আর তথাকথিত বামপন্থী সমাজতন্ত্র বলুন, রাষ্ট্রীয় গুন্ডাবাজির লম্বা ঐতিহাসিক সিলসিলা মওজুদ, অস্বীকার করার জো নেই।

 

বাংলা – দুই ভাইরাসের হানা

এই জানাচেনা পুরোনো কথাগুলোকে মনে করতেই হয়। হয় তার কারণ, আমেরিকা, জর্মনি, দিল্লি কি জাঞ্জিবারে নয়, আপনার-আমার মা-বাপ ঠাকুমা-দাদুর বাসস্থান বাংলায় দুই ভাইরাসের যৌথ আক্রমণ চলছে। কোভিড নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই, হার্ড ইমিউনিটি হোক না হোক, সে ভাইরাস নেহায়েৎ প্রাকৃতিক, একদিন তার দম ফুরোবে। দ্বিতীয় ভাইরাসটা উগ্র রাষ্ট্রবাদি দক্ষিণপন্থার, সেটা সহজে মরবে বলে মনে হচ্ছে না। যেহেতু বাংলার স্বঘোষিত বামপন্থীরা আপাতত রাজনীতিহীন এক চির-বর্তমানে মশগুল, তৎসহ স্মার্টফোনে আকন্ঠ নেশাগ্রস্ত, তাঁরা নীলপর্দার বাইরে না পিছনে তাকান না সামনে দেখেন, নিজেরা কিছু করবেন না, বা করতে পারবেন না। অথচ আক্রমণ গভীরতর হবে, মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়িয়ে ঘরে ঢুকে কান কামড়ে দেবে, নরম চামড়ায় বিষহুল ফোটাবে। যা মনে হচ্ছে বিজেপি-র বঙ্গবিজয় এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। মিডিয়া কায়দায় না হলে হয়তো রাষ্ট্রকায়দায়ই এ কাজ হবে—কোভিড এবং জাতীয় বিপর্যয় আইন কাজে লাগিয়ে যে কোন দিন রাজ্যের সরকারটিকে ফেলে দেওয়া হবে। যারা ভাবছেন এমন কিছু ঘটা অসম্ভব, তাঁরা বরং কোভিড শুরু হওয়া ইস্তক পরপর কি ঘটছে ভাবুন। মিডিয়া/সোশ্যাল মিডিয়া ছেয়ে তৃণমূল ও রাজ্যসরকার বিরোধী ঝড় উঠলো, বিজেপি ও তস্য চামচেবেলচাদের কথা বাদ দিন,  এক বা আদখানা বামপন্থী দলের পক্ষ থেকেও রাজ্যকে সমর্থন করে কিছু বলা হয়েছে বলে মনে পড়ে না। উল্টে বিজেপি যা বলছে এরাজ্যের মূল বাম সিপিএম সেটা বেমালুম টুকলি করে যাচ্ছে, মিডিয়ায়, মিডিয়ার বাইরে।

 

কোভিড-পরিস্থিতির সঙ্গে হিঁদু রাজনীতিকে জুড়ে দিয়ে বাজারে নামানো হলো, তবলিঘি দেশের শত্রুর দল কলকাতার রাজাবাজার পার্ক সার্কাস মেটেবুরুজ সহ গোটা রাজ্যে করোনা ছড়াচ্ছে, করোনা-জিহাদ চালু হয়ে গেছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মুসলমান-তোষক, তাঁর নির্লজ্জ মদতে মুসলমানের দল লকডাউন ভাঙছে, স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। এর কিছুদিন পর থেকে, লকডাউন উঠে যাবার পর, ভদ্রেশ্বর এলাকায় দাঙ্গা লাগানো হলো। আরো কিছুদিন পরে, দিনাজপুরের হেমতাবাদের বিধায়কের মৃত্যু, সে নিয়ে আবার ভাঙচুর হইচই। খুব সম্প্রতি, দিনাজপুরের চোপড়ায় এক কিশোরীর অপঘাতমৃত্যুকে কেন্দ্র করে বাসে গাড়িতে আগুন, সাম্প্রদায়িক প্রচার, ভাঙচুর। যা যা ঘটছে, মিডিয়া/সোশ্যাল মিডিয়ায় তা বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুন।

 

ধনখড় কি চমৎকার   

কিন্তু এহ বাহ্য। রাজনীতির আসল খেলাটা চলছে অন্যত্র। রাজ্যপাল হয়ে আসা ইস্তক ধনখড় সাহেব যা যা করে যাচ্ছেন, তাঁর যাবতীয় পূর্বসূরী, মায় উনসত্তরের কুখ্যাত ধরমবীরা, স্রেফ নিলগেম খাবেন। ধনখড়কান্ড বিশদে বলার সুযোগ নেই—তবে তৃণমূলীদের যে অভিযোগ তিনি রাজভবনকে রাজ্য বিজেপি-র দপ্তর বানিয়ে ফেলেছেন, তাতে বিন্দুমাত্র অতিশয়োক্তি নেই। ধনখড় যা যা করছেন, তার পিছনে তাঁর মাথার ব্যায়রাম থাকতেই পারে। কিন্তু ধনখড়পর্বের চিত্রনাট্য যে অমিত শা বা ওইরকম কেউ লিখছেন, তা নিশ্চিত। তৃণমূলরাজত্বের নৈরাজ্যের কারণেই যে বাংলা মোদি-শা জমানার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-সুবিধা-সম্বৃদ্ধির শরিক হয়ে উঠতে পারছে না, ধনখড় সেই বাণী দিনরাত সাধারণ্যে পৌঁছে দিচ্ছেন। রাজ্য সরকার ফেলে দিয়ে কেন্দ্র যদি বাংলার দখল নেয়, ধনখড় তখন প্রকৃত লাটসাহেব, রাজ্যের দন্ডমুন্ডের অধিকর্তা, তাঁর শাসন জনগণমনগ্রাহ্য হয়ে উঠবে, এমন একটা ভাবনা যে বিজেপি নেতৃত্বের মাথায় নেই, তা বলা যায় না।

 

রাষ্ট্র ও একরাষ্ট্র 

একদিকে জাতীয় বিপর্যয় আইন, অন্যদিকে ধনখড় রাজ্যপাল। রাজ্যের ওপর যুগপৎ ধাক্কা আসছে বিজেপি দলের কিম্বা সঙ্ঘের পক্ষ থেকে নয়, সরাসরি দিল্লির কাছ থেকে, দিল্লিশ্বর মোদি-শা শাসিত খোদ ভারতরাষ্ট্রের কাছ থেকে। সংবিধানে যাই লেখা থাক, ইন্দিরা গান্ধীর স্বৈরাচার ও জরুরি অবস্থা সমেত স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এতাবৎকালে যাই-ই ঘটে থাকুক, মোদি-শা’র ভারতরাষ্ট্র একটা নতুন নির্মাণ(কনসট্রাক্ট), যা আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের দমনক্ষমতা ও সঙ্ঘের ‘হিন্দু’ ভাবনার কল্পনির্মাণকে(ইম্যাজিনারি) সম-পরিমাণে ধারণ করে। সেই রাষ্ট্রের চৌহদ্দিতে শক্তিশালী বিরোধীপক্ষ এবং স্বনির্ভর ও স্বশাসিত রাজ্যের ভাবনা পুরো জল-অচল অচ্ছ্যুত। রাষ্ট্রীয় কাঠামো কেন্দ্রাভিগ বা সেন্ট্রিপেটাল হবে, অর্থাৎ কেন্দ্র ক্রমেই ক্ষমতাধর হয়ে উঠবে, রাষ্ট্রের মধ্যে সমান্তরাল রাষ্ট্রের মাথা তোলার সুযোগ কমে আসবে, কালক্রমে সে সুযোগ থাকবেই না। অর্থাৎ রাজ্যের মধ্যে সংবিধানগ্রাহ্য স্ব-শাসনের কিম্বা দেশের মধ্যে রাজ্যের হাতে অধিক ক্ষমতার দাবী তোলার সুযোগ থাকবে না। অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে এখনো পর্যন্ত যা কেন্দ্রাতিগ বা সেন্ট্রিফ্যুগাল ঝোঁক আছে, তাকে নির্বাসনে পাঠানো হবে। এর আগে ইন্দিরা গান্ধীর শাসনকালে এমন চেষ্টা হয়েছে, নির্বাচিত রাজ্য সরকারকে ফেলে দিয়ে রাজ্যপালের মারফত কেন্দ্রশাসন জারি হয়েছে হামেশা। ৭৭-এ জনতা সরকারও একই কাজ করেছিলো। যতদূর মনে পড়ে, ১৯৯৪ এ সুপ্রিম কোর্টের প্রসিদ্ধ বোম্মাই রায়ের পর থেকে যখন-তখন সরকার ফেলার রেওয়াজ কমে আসে। ১৯৯৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত দেশে বহুদলীয় জোট সরকার ছিলো, বিভিন্ন রাজ্যে শক্তিশালী আঞ্চলিক দলের উথ্বান ঘটছিলো তার আগের কয়েক দশক ধরে। হবার কথাও। ভারতবর্ষের মতো বহু-পরিচয় সমন্বিত বিচিত্র এক ভৌগোলিক-সাংস্কৃতিক পরিসরে আঞ্চলিক দলের জন্ম হবে, রাষ্ট্রীয় রাজনীতির সমগ্র আঙিনাটাই পুনর্বন্টিত ও পুনর্বিন্যস্ত হয়ে ‘এক’ জাতিরাষ্ট্রের ধারণার অন্য বহুত্ববাদি বিকল্পের জন্ম দেবে, এটাই প্রত্যাশিত। ভারত সে অর্থে কস্মিনকালে জাতিরাষ্ট্র ছিলো না, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের উত্তরাধিকার বাবদ স্বাধীন দেশের সংবিধান-প্রণেতাদের কাছে যা এসে পৌঁছেছিলো, তা আর যাই হোক, পশ্চিমি জাতিরাষ্ট্র নয়।

 

ভারত রাষ্ট্র – কেন্দ্রাতিগ না কেন্দ্রাভিগ?

যা নেই এবং নয়, তাকে বানাতে গেলে সেকারণে সংবিধান ও পশ্চিমী গণতন্ত্রের মডেলকে দুরমুশ করতেই হবে। জাতিরাষ্ট্র তৈরি করতে গেলে, জাতি নির্মাণ করতে হয়। ভারতীয় জাতি বলে কিছু বানানোটা মুস্কিল, যেহেতু ভারত ব্যাপারটা বহু জাতির(এথনিসিটি) সমাহার, তাদের অনেকেরই নিজস্ব লম্বা রাষ্ট্রীয় ইতিহাস আছে, লোককথা-কাহিনী, উৎস-বৃত্তান্ত আছে। ফলে হিঁদু জাতিতত্বের আমদানি। কিন্তু সে তত্বে চিঁড়ে ভিজবে না, রাষ্ট্র লাগবে। এবং সে রাষ্ট্রকে হতে হবে পুরোপুরি কেন্দ্রাভিগ, কেন্দ্রমুখীন, কালক্রমে কেন্দ্রসর্বস্ব। রোমিলা থাপার এক জায়গায় বলেছিলেন ভারতেতিহাসের আদি পর্বে যে সব সাম্রাজ্য/রাজত্ব/রাষ্ট্র তৈরি হয়েছিলো, তাদের প্রত্যেকের চারিত্র্যলক্ষণ ছিলো শক্তিশালী কেন্দ্র ও দুর্বল সীমানা, কেন্দ্রে রাষ্ট্র সর্বেসর্বা, কিন্তু যত বাইরের দিকে যাওয়া যায় রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে আসে, তার কর্তৃত্ব অস্বীকৃত হতে থাকে। শুধু আদি পর্বে কেন, ভারতবর্ষের প্রাক- ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সমস্ত পর্বেই এই প্রক্রিয়া চালু ছিলো। ঔপনিবেশিক সময়েই প্রথমবারের কেন্দ্রীভূত আধুনিক রাষ্ট্র তার শাখা-প্রশাখা সুদ্ধ ভারতবর্ষের মাটিতে শিকড় গাঁড়লো। কেন্দ্রীভূত বলছি বটে, কিন্তু কেন্দ্রীভবনের যে চেহারা/চেষ্টা আমরা উত্তর-ঔপনিবেশিক কালে দেখেছি, ইংরেজ রাজত্ব আদৌ সেরকম ছিলো না। প্রথমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও পরে ব্রিটিশ সরকার শাসিত ভারতবর্ষে, রাষ্ট্রশাসিত এলাকার পাশাপাশি অসংখ্য ছোটবড় ‘দেশীয়’ রাজ্য ছিলো, ‘ছেড়ে রাখা’ বা এক্সক্লুডেড অঞ্চলও ছিলো বহু—যথা মধ্য-দক্ষিণ ভারতের বিস্তীর্ণ অরণ্য এলাকা, উত্তর-পূর্ব ভারতের নেফা। মূলত ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠন, কাশ্মীরের জন্য বিশেষ অধিকার, এবং পরবর্তীতে বড় রাজ্য ভেঙে আরো রাজ্য তৈরি, এবং সংবিধানের পঞ্চম(মূলত পুরোনো মধ্য-দক্ষিণ ভারতের ‘ছেড়ে রাখা’ আদিবাসি এলাকার জন্য) ও ষষ্ঠ(উত্তর-পূর্ব ভারতের) তফশিলের মাধ্যমে স্বশাসনের নতুন রাষ্ট্রপরিসর নির্মাণের মধ্য দিয়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারত রাষ্ট্র এই ঐতিহাসিক কেন্দ্র-সীমানা বিরোধের মীমাংসা করতে চেষ্টা করে।

 

বিরোধ মীমাংসিত হয়নি। ১৯৫০-এ সংবিধান তৈরি হবার পর থেকেই, নানান প্রশ্নে ও নানা এলাকায় বিভিন্ন বিরোধ মাথাচাড়া দিচ্ছেই—জাতির প্রশ্নে, জাতের(কাস্ট) প্রশ্নে, ভাষার প্রশ্নে(হিন্দী না বহু রাষ্ট্রভাষা), এবং গত কয়েক দশক ধরে, ধর্মের প্রশ্নে। এক-রাষ্ট্র তত্বের আদি প্রবক্তা কংগ্রেস রাজনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, এবং বিভিন্ন রাজ্যে/এলাকায় জাতি/জাত/ভাষা ভিত্তিক নতুন আঞ্চলিক শক্তির উথ্বান ঘটেছে। এই পরিস্থিতিটা মূলে এখনো খুব বদলায়নি—ফলে আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে বিজেপিকে নানানরকমের আপোস করে চলতে হচ্ছে। আর এখানেই বাংলার প্রসঙ্গটা এসে পড়ে, অর্থাৎ বাংলায় এখন যা ঘটছে বা ঘটতে চলেছে তার রাজনীতিটাকে বুঝতে হয়।

 

 বাংলার রাজনীতি ও কেন্দ্রাভিগতা  

গত একশো-সোয়াশো বছর ধরে অবিভক্ত বাংলার ভূখন্ডে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র বিষয়টাকে অগ্রাহ্য ও অস্বীকার করার একটা পরম্পরা তৈরি হয়েছে। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন, তৎপরবর্তী একের পর এক ব্রিটিশ-বিরোধী সশস্ত্র অভ্যুথ্বান প্রচেষ্টা, কংগ্রেসের নেতৃত্বে সুভাষ চন্দ্র বসুর উথ্বান, ৪৭-এ স্বাধীনতার পর থেকে বামপন্থীদের শক্তি বাড়তেই থাকা, ৬৭ ও ৬৯-এ যুক্তফ্রন্ট সরকার, ওপার বাংলায় মুক্তিযুদ্ধ, ৭৭-এ বাম সরকার। রাষ্ট্রীয় রাজনীতির পরিসরে বামপন্থীদের মূল কাজটা ছিলো ভারত রাষ্ট্রের ভিতরে আগাগোড়া থেকে যাওয়া কেন্দ্রাতিগ ঝোঁকগুলোকে উস্কে দেওয়া। যুক্তরাজ্যিয় কাঠামো বা ফেডেরালিজমের পক্ষে সওয়াল, রাজ্যের হাতে অধিক ক্ষমতার দাবী, মাশুল-সমীকরণের দাবী, মাতৃভাষায় শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া, পঞ্চায়েতি ব্যবস্থার নবরূপায়ন, এসবই ছিলো সেই উস্কানির অঙ্গ। অর্থাৎ, এক অর্থে রাষ্ট্রবাদী বামপন্থীরা চাইছিলেন কেন্দ্রাভিগ রাষ্ট্রব্যবস্থার জায়গায় সমান্তরাল বহু-রাষ্ট্রের স্বেচ্ছা-সমাহার, একটিই শক্তিশালী কেন্দ্রের জায়গায় অনেকগুলি শক্তিশালী রাজ্য।

 

কেন্দ্রীভূত এক-রাষ্ট্রের ভাবনার বিরুদ্ধে মমতা বন্দোপাধ্যায় যা এখন বলছেন, সেটা বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের অনুবর্তী ও কোনভাবেই রাষ্ট্রবাদী বামপন্থী ভাবনার থেকে পৃথক নয়। এখনকার বামপন্থীরা(যথা সিপিআইএম) রাজনীতি-ভাবনায় আগ্রহী নন। অথচ বিজেপি ও সঙ্ঘ মমতা ও বাংলার রাজনীতিটাকে বোঝে, তারা জানে একরাষ্ট্র-একজাতির ভাবনায় বাংলার কেন্দ্রাতিগ/কেন্দ্রবিরোধী রাজনীতি কতটা গোল পাকিয়ে দিতে পারে। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর(একমাত্র বাঙালি যিনি বিজেপির কাছে গ্রাহ্য) নাম বিজেপিওয়ালারা এমনি এমনি করে না—যে দু’তিনটে ইতিহাসের কথা বলা হয় তার অন্যতম, শ্যামাপ্রসাদ কি করে ১৯৪৭-এ সর্দার প্যাটেলকে দিয়ে স্বাধীন বাংলারাষ্ট্র তৈরির চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন। বিজেপি-র হিঁদু রাজনীতির মূল কথাটাই হলো-‘হিঁন্দু জাতি’র ঐতিহাসিক মাতৃভূমি ভারতবর্ষ, সুতরাং সেখানে বাঙালি, তামিল, কাশ্মিরী কি অন্য অন্য ‘জাতি’র আলাদা রাষ্ট্র নৈব নৈব চ, ভারত ‘এক’, হিন্দু ‘এক’, ফলে রাষ্ট্রও ‘এক’। এই ভাবনার সঙ্গে যুক্তরাজ্যিয় কাঠামো অর্থাৎ ফেডেরালিজম, স্বশাসন, বহুরাষ্ট্র বা বহুস্তরীয় সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা, এর কোনটাই যায় না। যেহেতু শাসনকেন্দ্র একটাই হতে হবে, এমন কোন ফাঁক রাখা চলবে না, যেখান দিয়ে দ্বিশাসন, বহু-শাসন বা স্বশাসনের কালসাপের দল ঢুকে পড়ে সব ভন্ডুল করে দিতে পারে।

 

বামপন্থীরা কি চাইছেন?  

কাল যদি জাতীয় বিপর্যয়ের কি আইনশৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে মোদি-শা বাংলার সরকারটাকে ফেলে দেন, বামেদের কিছু করণীয় আছে কি নেই? ত্রিপল বিলি নিয়ে, রেশন নিয়ে তৃণমূলী দুর্নীতির প্রতিবাদ করা জরুরি। রাজ্যের হাতে ক্ষমতার, রাজ্যের আর্থিক বকেয়া মেটানোর, কোভিড মোকাবিলায় রাজ্যের জন্য আরো বরাদ্দ বাড়ানো, এসবের দাবী তোলা কি জাতীয় বিপর্যয়ের ছুতোয় নির্বাচিত রাজ্য সরকারের ওপর বেলাগাম খবরদারি, রাজ্যপালকে দিয়ে যা-ইচ্ছে-তাই করানো, সরকারকে ফেলে দেওয়ার ছক করা, এসবের নিরন্তর বিরোধিতা করাটা কি অনেক বেশি জরুরি নয়? বিজেপিকে ভোটে জিতে আসতে হবে না, একবার ধনখড় ওরফে শা-শাসন শুরু হয়ে গেলে বামপন্থীদের রাস্তায় নামা, ফেসবুক-হোয়াটসয়্যাপ মায় যাবতীয় ঘাঁটি ও আঘাঁটি নিঃশব্দে উবে যাবে। বিশ্বাস না হলে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, আসামের হাল দেখুন—কংগ্রেসী বিরোধিতাই বরদাস্ত করা হচ্ছে না তো বাম। যেখানে পুলিশ বিজেপি-র হাতে, যা-খুশি যেমন-খুশি হতে পারে, মিডিয়া দু মিনিটে ঠান্ডা হয়ে যাবে, আদালতে গিয়ে কিছু হবে না। অ-সিপিএম বামপন্থীদের গণভিত্তি বা গণ-সংগঠন বলে প্রায় কিছু নেই, সিপিএমের যা ছিঁটেফোঁটা আছে সেটা সঙ্ঘ-পুলিশের যৌথ হামলা ঠেকানোর পক্ষে যথেষ্ট নয়। ত্রিপুরা থেকেও সিপিএমের শিক্ষা হলো না, বাংলার সে দলের যে যেখানে আছে তারা বিশ্বাসই করে না মমতা বন্দোপাধ্যায়কে গাল দেওয়া ছাড়া অন্য কোন রাজনৈতিক কাজ ভাবা সম্ভব। এনআরসি-সিএএ বিরোধী আন্দোলনে বামেদের অংশগ্রহণ দেখে কারুর যদি অন্য কিছু মনে হয়ে থাকে, সে খোঁয়াড়ি এতদিনে কেটে গেছে।

 

ব্যক্তি মমতা বন্দোপাধ্যায় ও তাঁর প্রধানত লুম্পেনপুষ্ট দলের বিরুদ্ধে অভিযোগের ও সমালোচনার লম্বা ফিরিস্তি আনাটা সম্ভব। কথাটা হলো, সে কাজটা কাদের, এবং কেন, বিশেষত এই সময়ে, যখন বিজেপি-সঙ্ঘের ভাগওয়া ঢলে বাংলা ডুবুডুবুপ্রায়, সমস্ত শক্তি নিয়ে বিজেপি-সঙ্ঘ বাংলা গ্রাসে বদ্ধপরিকর? সিপিএম দলটার তো সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিজেপি-সঙ্ঘ বিরোধী একটা রাজনৈতিক অবস্থান আছে, সেই অবস্থান অনুযায়ী তাঁরা ফাসি-বিরোধী বাম-গণতান্ত্রিক(নাকি গণতান্ত্রিক-বাম) গড়ার কথা বলেন, কংগ্রেস ও বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট তৈরির কথা বলেন। বাংলায় সেই যুক্তফ্রন্ট গড়ার কথা হলে, কোন রাজনৈতিক নিরিখে বিজেপি এবং তৃণমূল তাঁদের কাছে তুল্যমূল্য হয়ে যায়? বহুত্ববাদি যুক্তরাজ্যিয় কাঠামোর পক্ষে, সংগঠিত দক্ষিণপন্থার আক্রমণের বিরুদ্ধে বাংলায় যদি এই মুহূর্তে কোন কাজ করতে হয়, তা তৃণমূলকে আক্রমণের লক্ষ্যবিন্দু করে তুলে, এবং এতদ্বারা স্পষ্টতই বিজেপি-র সুবিধা করে দিয়ে, কিভাবে সম্ভব? সিপিএম দলের রাজনীতিটা কি? আদৌ কোন রাজনীতি আছে কি? ধনখড় কি করছেন, কেন করছেন, সেটা জানার পরেও তাঁদের নেতারা কোন আক্কেলে তাঁর কাছে রাজ্য-সরকার বিরোধী স্মারকলিপি চড়াতে যান? কেন সর্বভারতীয় স্তরে পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রমিক-বিরোধী নীতি নিয়ে তাঁরা রাষ্ট্রপতির(যিনি চিহ্নিত সঙ্ঘী) কাছে আবেদন করেন? সিপিএম নিয়ে রাজনৈতিক প্রত্যাশার কোন মানে হয় না—দলের ভিতরে প্রলয়-অভ্যুথ্বান না ঘটে গেলে এঁরা বদলাবেন না, ফলে রাষ্ট্রবাদী সংসদীয় রাজনীতির চৌহদ্দির বাইরে এঁরা কদাচ কাজ করবেন, সে কাজ নিয়ে ভাববেন, সে আশা কুকুরে-কামড়ানো পাগলেও করে না। কিন্তু রাষ্ট্রবাদী সংসদীয় রাজনীতির চৌহদ্দির মধ্যেও বিবেচনা ও সাধারণ বুদ্ধির পরিচয় দেওয়া সম্ভব—বিজেপি-সঙ্ঘের সর্বশক্তিমান হিঁদুরাষ্ট্রের বিরোধীতা করতে গেলে যে এই মুহূর্তে বহুত্ববাদি যুক্তরাজ্যিয় কাঠামোর পক্ষে সওয়াল করা, রাস্তায় নেমে আওয়াজ তোলাটা ইতিকর্তব্য, তা সিপিএম(এবং বামফ্রন্ট অর্ন্তভুক্ত অন্য দল) ভুলে যায় কি করে? আসলে কিসে কি হয় সেটা তো জানাই আছে—বাংলায় এখন বিজেপি-সঙ্ঘ এবং কেন্দ্র বিরোধী কথা তুললে, তা তৃণমূলের পক্ষে যাবে, সামনে পুরভোট ও বিধানসভা, ফলে সেখানে আবার তৃণমূলের দবদবা, সিটি চইলব্যেক লাই। তার চে’ রাজ্যে বিজেপি আসুক, পরে বুঝে নেওয়া যাবে।

 

রাষ্ট্রবাদী রাজনীতি এবং সিপিএমের কথা থাক। সে রাজনীতিতে যাঁরা সেভাবে নেই(বা ভাবেন নেই), রাজনৈতিক কিছু বলছেন কি? অ-সিপিএম বাম, এনআরসি-সিএএ বিরোধী আন্দোলনে যাঁদের সক্রিয় ও উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিলো, তাঁরা কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রাজ্যের স্বপক্ষে, বহুত্ববাদি যুক্তরাজ্যিয় কাঠামোর সমর্থনে, এবং সবচাইতে যা গুরুত্বপূর্ণ, সংগঠিত দক্ষিণপন্থার সার্বিক হামলার বিরুদ্ধে, এই সময়ে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নেবেন কি? নির্বাচনী রাজনীতিতে এহেন অবস্থানের প্রভাব পড়তে পারে, না-ও পারে। পড়লে তা তৃণমূলের স্বপক্ষে এবং বিজেপি-র বিপক্ষে যেতে পারে। তাতে ক্ষতি কি? হতে পারে যে তৃণমূলের রাজনীতিতে বিশুদ্ধ পপুলিজম ছাড়া কিছু নেই—ফলে আজ যা বিজেপি-বিরোধিতা কাল তা বিজেপিপন্থা হয়ে যেতে পারে। সে তো পারেই। সিপিএম নিজে তো কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সঙ্ঘীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলো—প্রাক-সাতাত্তর জনতা পার্টির কথা ভাবুন, তারপর উননব্বই-এ ভি পি সিংহ সরকারের কথা। তৃণমূল কবে কি করবে বা সিপিএম কবে কংগ্রেসপন্থী বা বিরোধী হবে, তার ঠিকে নেবার দায়িত্ব এই লেখকের নেই, অন্যদেরও থাকা উচিত নয়।

 

মূল কথাটা হচ্ছে, রাষ্ট্রবাদী রাজনীতির বাইরের সামাজিক পরিসরে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কাজের সূচনা করাটা দরকার। গ্রাউন্ডজিরোয় আগের লেখাটায়, সেই মূল কাজের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রবাদী রাজনীতির পরিসরেও বামপন্থীরা কি ধরণের কাজ করতে পারেন, তা বলতে গিয়ে বলা হয়েছিলো:

 

আপৎকালীন পরিস্থিতিতে, হয়তো তার পরেও অনেকদিন, রাষ্ট্রকে পুরোপুরি অস্বীকার করা সম্ভব নয়। কিন্তু কেন্দ্রীভূত, ফাসিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়া, রাষ্ট্রকে দুর্বল করার কাজ চালানো সম্ভব। যদি মূল রাজনৈতিক-সাংগঠনিক প্রক্রিয়া বিরুদ্ধ শ্রেণী-রাজনীতি, অর্থাৎ রাষ্ট্র-পুঁজি বিরুদ্ধতার রাজনীতিতে আধারিত থাকে, রাষ্ট্রের বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষ নিয়ে কথা বলা ও জনমত সংগঠিত করা আজকের বিশেষ পরিস্থিতিতে একটা বড় কাজ হতে পারে। পঞ্চায়েত, পুরসভা, জেলা, রাজ্য, অর্থাৎ বিকেন্দ্রীকরণের যে রাষ্ট্র-নির্ধারিত কাঠামো আছে, তার মাধ্যমে ও তাকে ছাপিয়ে গিয়েও, সর্বস্তরে স্বশাসনের দাবি তোলা যেতে পারে। বিভিন্ন এলাকায় গ্রামসভা ও নাগরিক সভা গড়ে তুলে, জনস্বাস্থ্য, গণ-বন্টন ও বিভিন্ন স্থানীয় অর্থনৈতিক উদ্যোগ স্বশাসিত সংস্থাগুলির মাধ্যমে সংগঠিত করা যেতে পারে।…সংসদীয় গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে রক্ষার কথা বলা দরকার, কেননা পুঁজিতন্ত্র ও জাতিরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে পারে না। সব ধরণের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন/সন্ত্রাসের, পিতৃত্ববাদের, জাত-বর্ণবাদী, জাতিসত্ত্বাগত, ভাষাসত্ত্বাগত, জাতিবাদী ও ধর্মকেন্দ্রিক/ধর্মাশ্রয়ী শোষণের বিরোধিতা করা দরকার।…ধর্মীয় ফাসিবাদের…বিরুদ্ধে লাগাতার সাংষ্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রচার চালানো, এবং এই বিপদের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলাও দরকার।

 

এক, কেন্দ্রীভূত, ফাসিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়া, রাষ্ট্রকে দুর্বল করার কাজ চালানো।  দুই, রাষ্ট্রের বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষ নিয়ে জনমত সংগঠিত করা। বিজেপি-সঙ্ঘের বাংলা বিজয় ঠেকাতে বামপন্থীরা নির্দিষ্ট কর্মসূচী নিলে, সেই কাজ কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকে দুর্বল করবে, এবং রাষ্ট্রের স্থায়ী বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষে যাবে। এ লেখায় বিশদ আলোচনা করা যাবে না, উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আজকের আমেরিকায় যে গণ-আন্দোলন চলছে, তার একটি অন্যতম চারিত্র্য বা হলমার্ক হলো, রাষ্ট্রের বহুস্তরে কেন্দ্রীভবনের এবং কেন্দ্র-প্রধান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। সেই দেশের বামপন্থীরা এই প্রসঙ্গে রাষ্ট্রের ভিতরকার বিরোধাভাসগুলিকে উস্কে দিচ্ছেন, এক-রাষ্ট্রের সঙ্গে বহু-রাষ্ট্রের(ট্রাম্পের সঙ্গে গর্ভনরদের, গর্ভনরদের সঙ্গে মেয়রদের, এমনকি মেয়রদের সঙ্গে সিটি কাউন্সিলের) দ্বন্দে রাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছেন। এই অবস্থান থেকে ডেমোক্রাটদের নির্বাচনী সুবিধা হবে, রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী জো বাইডেন লাভবান হবেন। ডেমোক্রাটরা সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন রাষ্ট্রের অঙ্গ এবং বাইডেন অতীব গন্ডগোলের লোক, এই যুক্তিতে যদি বামপন্থীরা নিষ্ক্রিয় থাকেন বা এই মুহূর্তে বাইডেন এবং ডেমোক্রাটদের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানানোকে প্রধান রাজনৈতিক কাজ হিসেবে দেখেন, কার সুবিধা হবে, কাদের লাভ হবে? ভারত/বাংলা আর আমেরিকা এক নয়, ভারতের যুক্তরাজ্যিয় কাঠামো ও মার্কিনি যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থাও সমতুল নয়। কিন্তু মোদ্দা রাজনৈতিক প্রসঙ্গটা এক, প্রশ্নগুলোও একগোত্রের। রাষ্ট্রকে কিভাবে দেখবো? রাষ্ট্র ফাসিবাদী দমন চালাতে চাইলে কি ব্যবস্থা নেবো। রাষ্ট্রের ভিতরকার বিরোধ-দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে সমাজে কিভাবে রাষ্ট্র-বহির্ভূত আন্দোলন ও পুনর্গঠনের কাজ চালাবো? এবং সেই অনুষঙ্গেইঃ বিজেপি-সঙ্ঘ বাহিনী ক্ষমতায় এলে, বাংলায় বামপন্থীরা প্রকাশ্যে কাজ করতে পারবেন কি? এই যে গ্রাউন্ডজিরোয় লিখছি, সেটা লেখা যাবে? গ্রাউন্ডজিরোটা নিষিদ্ধ হয়ে যাবে না তো? স্রেফ ফেসবুক পোস্টের জন্য লোকজনকে পাইকারি ইউএপিএ দেওয়া হবে না তো? যাদবপুরে প্রেসিডেন্সিতে বাম ছাত্র-ইউনিয়ান, সেগুলো আস্ত থাকবে তো? এই যে ত্রাণ বিলি হলো এতদিন ধরে, সেটা দেওয়া যাবে তো? যদি বামপন্থীদের মেরেপিটিয়ে জেলে পুরে দুরমুস করে দেওয়া হয়, ভবিষ্যত বিপ্লবের কাজ ত্বরান্বিত হবে, সুতরাং আসুক ফাসিবাদ, আসুক অত্যাচার, হাম লড়কে লেঙ্গে হিন্দুস্তান(সরি, বাংলাস্তান) এসময় একথা যদি কেউ ভাবেন এবং বলেন, তিনি/তাঁরা বামপন্থী নন বামবিরোধী, স্পষ্টতই উগ্র দক্ষিণপন্থার পক্ষে কাজ করছেন। রাজনীতিহীন কট্টর তৃণমূলবিরোধীতা দেখিয়ে বাংলায় সিপিএম যা করছে, অত্যাচার-না-বাড়লে-মানুষ-পথে-নামবে-না এই গোলা ও ক্ষতিকর তত্ত্বে যাঁরা স্থিত, তাঁরা সমধিক ভুল কাজ করছেন। গণতন্ত্রের পক্ষে, কেন্দ্রের বিরুদ্ধে, বাংলায় বিজেপি-সঙ্ঘ হামলার বিরুদ্ধে পথে নামা ছাড়া এই মুহূর্তে বামপন্থী প্রকল্প এক ইঞ্চি এগুতে পারবে না। চুপ করে থাকাটা হবে আত্মহননের সামিল।

 

 

লেখক বামপন্থী ও পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী। মতামত লেখকের নিজস্ব।

 

Share this
Recent Comments
2
  • comments
    By: পার্থ সিংহ on July 31, 2020

    আপনার সঙ্গে একশ শতাংশ একমত, অত্যন্ত ছোটখাটো দু-একটা তথ্য বাদে। সরকারি বামেদের বর্তমান রাজনীতি আত্মঘাতী। নিজেদেরকেও পোড়াবে আর তছনছ করবে বাংলার নিজস্ব সমাজ-রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে, বিজেপি/RSS-এর ক্ষমতায় আসার রাস্তাটা মসৃণ করে। অনেক বিরোধীতা থাকলেও এই বাংলার একটি বড় অংশের সমর্থন পাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে তাদের। সিপিএম বিরোধী বামপন্থীদের তারা সাথে পাবে, পাবে যুক্তিবাদী, মুক্তমনাদের, তৃণমূলী অত্যচার/দুর্নীতিতে বীতশ্রদ্ধদের আর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের তো সহজেই টানতে পারবে। সম্প্রতি কেরল সংস্কৃতিতেও দেখলাম শুধুমাত্র বাম ও কংগ্রেসের মধ্যে ভোট ভাগ হতে। শবরীমালা ঘটনাটি নিয়ে RSS বহু কোটি টাকা ঢাললেও মানুষের কাছে তাদের ভাবনাকে গ্রহনযোগ্য করাতে পারেনি। লোকসভায় তলানিতে এসেছে তাদের ভোট শতাংশ। তবে এই বাংলায় বিজেপি আসাটা বোধহয় সময়ের অপেক্ষা। কারণ, সিট সংখ্যা কম পেলেও তারা অর্থের জোরে জুটিয়ে নেবে বিধায়ক। তারপর কিন্তু খুব কঠিন এবং অন্ধকার সময়, সেটা আদৌ কবে কাটবে আমাদের জীবদ্দশায় জানি না। মাফ করবেন দীর্ঘ বক্তব্যের জন্য।

  • comments
    By: পার্থ সিংহ on July 31, 2020

    আপনার সঙ্গে একশ শতাংশ একমত, অত্যন্ত ছোটখাটো দু-একটা তথ্য বাদে। সরকারি বামেদের বর্তমান রাজনীতি আত্মঘাতী। নিজেদেরকেও পোড়াবে আর তছনছ করবে বাংলার নিজস্ব সমাজ-রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে, বিজেপি/RSS-এর ক্ষমতায় আসার রাস্তাটা মসৃণ করে। অনেক বিরোধীতা থাকলেও এই বাংলার একটি বড় অংশের সমর্থন পাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে তাদের। সিপিএম বিরোধী বামপন্থীদের তারা সাথে পাবে, পাবে যুক্তিবাদী, মুক্তমনাদের, তৃণমূলী অত্যচার/দুর্নীতিতে বীতশ্রদ্ধদের আর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের তো সহজেই টানতে পারবে। সম্প্রতি কেরল সংস্কৃতিতেও দেখলাম শুধুমাত্র বাম ও কংগ্রেসের মধ্যে ভোট ভাগ হতে। শবরীমালা ঘটনাটি নিয়ে RSS বহু কোটি টাকা ঢাললেও মানুষের কাছে তাদের ভাবনাকে গ্রহনযোগ্য করাতে পারেনি। লোকসভায় তলানিতে এসেছে তাদের ভোট শতাংশ। তবে এই বাংলায় বিজেপি আসাটা বোধহয় সময়ের অপেক্ষা। কারণ, সিট সংখ্যা কম পেলেও তারা অর্থের জোঐরে জুটিয়ে নেবে বিধায়ক। তারপর কিন্তু খুব কঠিন এবং অন্ধকার সময়, সেটা আদৌ কবে কাটবে আমাদের জীবদ্দশায় জানি না। মাফ করবেন দীর্ঘ বক্তব্যের জন্য।

Leave a Comment