ক্যাপিটল হিল স্বশাসিত অঞ্চলের দিনরাত্রি 


  • June 25, 2020
  • (0 Comments)
  • 667 Views
  • বামপন্থী বৈপ্লবিক ঘরানার দীর্ঘ প্রয়োগগত ঐতিহ্য অনুসরণ করে সিয়াট্‌লের প্রতিবাদীরা সে শহরের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এলাকাকে পুলিশ-মুক্ত স্বশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

 

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম গণঅভ্যুত্থানের সাক্ষী থেকেছি। মিনেসোটা রাজ্যের মিনিয়াপলিসে পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর ঘটনা মার্কিন দেশে এবং সারা পৃথিবী জুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছে, শামিল করেছে মারমুখী বিক্ষোভে। গোটা দেশ জুড়ে অজস্র শহরে থানা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, কর্পোরেট বিপণিগুলো লুট করা হয়েছে, আর পুলিশ যত প্রতিবাদীদের ঠান্ডা করার দিকে নজর দিয়েছে তত প্রতিবাদীদের সংখ্যা শুধু বেড়েই গিয়েছে। 

 

ওয়াশিংটন সিয়াট্‌ল শহরে মধ্যবিত্ত রুচি অনুযায়ী হাল ফ্যাশনে ঢেলে সাজানো ক্যাপিটল হিল এলাকায় প্রতিবাদীদের সঙ্গে সংঘর্ষের জেরে পুলিশ তাদের দপ্তর ছেড়ে পিছু হটেসংগঠক ও প্রতিবাদী গোষ্ঠীর সদস্যরা তখন এগিয়ে গিয়ে এলাকার এই আটটা ব্লক জুড়ে থাকা অংশটাকে একটা যৌথ পরিসরে পরিণত করেন। দ্রুত তার নাম রাখা হয় ক্যাপিটল হিল অটোনোমাস জোন (Capitol Hill Autonomous Zone বা CHAZ)। 

 

এই চ্যাজ দক্ষিণপন্থীদের রোষের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে, সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে দেশের রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত সকলেই তাতে শামিল, তারা ঘোষণা করে দিয়েছে যে এটা হিংসাত্মক নৈরাজ্যবাদী সংগঠনগুলো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সন্ত্রাসবাদ। অথচ চ্যাজের ভিতরমহল থেকে যে সব ছবি, ভিডিও ও সাক্ষ্য পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো থেকে সম্পূর্ণ অন্য একটা ছবি উঠে আসে, যা অন্যান্য অবরোধ আন্দোলনের (অকুপাই আন্দোলনেরও কি?) কাছাকাছি – যে সব আন্দোলনে মানুষকে সাদামাটা প্রতিবাদ থেকে অন্যরকম জীবনযাপনের নিরীক্ষার দিকে এগিয়ে যেতে দেখা গিয়েছে। 

 

স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কাফে, গানবাজনা ও সভা, গোষ্ঠী উদ্যান (কমিউনিটি গার্ডেন) ও অন্যান্য পরিষেবাকে পারস্পরিক সহযোগিতার একটা স্থায়ী ধাঁচার মধ্যে নিয়ে আসার জন্য বহু মানুষ শ্রম দিচ্ছেন। কাজটা সম্ভব হচ্ছে বিভিন্ন স্থানীয় সংগঠন ও এমনকী ব্যবসায়িক সংস্থাগুলোরও সহায়তায়। এখন চ্যাজ যে জায়গাটায় চলে এসেছে সেখানে ভবিষ্যতের একটা দিশা তৈরি হয়ে উঠছে। এখন আলোচনা চলছে রণনীতি নিয়ে, কোন কাজটা আগে কোনটা পরে, তা নিয়ে। আশু সংস্কার ও তুলনায় বিপ্লবী লক্ষ্যের মাঝামাঝি একটা পথের কথা উঠে আসছে বেশি।

 

চ্যাজের দুজন সংগঠকের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। কীভাবে তাঁরা এই উদ্যোগে এলেন, উদ্যোগটা কীভাবে চলছে এবং এই উদ্যোগ কোন দিকে যাবে বলে তাঁরা আশা করছেন, এসবই ছিল কথোপকথনের বিষয়বস্তু। দুজনেই ছদ্মনাম ব্যবহার করছেন। একজন অফিসার চ্যাজ (ওচ্যাজ) নামে পরিচিত, আর আরেক জনের ছদ্মনাম ফ্র্যাঙ্ক আসকাসো (এফএ)। এই দ্বিতীয় জন ব্ল্যাক রোজ/রোজা নেগ্রা অ্যানার্কিস্ট ফেডারেশন-এরও অন্যতম সংগঠক। এই দুই সংগঠকের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে আলাদা আলাদাভাবে এবং এখানে সাক্ষাৎকার দুটোকে একই কথোপকথনের অংশ হিসেবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

 

  • গত পঞ্চাশ বছরের সবথেকে বড় বিদ্রোহগুলোর একটার মধ্যে আমরা এখন রয়েছি। এই বিক্ষোভ এবং চ্যাজ হয়ে ওঠা এই স্বায়ত্তশাসনের উদ্যোগে আপনি যুক্ত হলেন কীভাবে?

 

ওচ্যাজ: ফেটে পড়ার বিন্দুতে পৌঁছনোর পথটা বেশ দীর্ঘ। জর্জ ফ্লয়েড ও ব্রেয়োনা টেলরের মৃত্যু এবারে আমাদের সত্যিই খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে। বুঝতে পারছিলাম যে এখনও যদি নীরব থাকি, খুশিমনে থাকি, তাহলে আমি আর নিজের সঙ্গে থাকতে পারব না। সক্রিয় হয়ে ওঠার একটা জ্বলন্ত বাসনা আমাকে দখল করে ফেলেছিল, তাই প্রথম সুযোগেই সিয়াট্‌লের প্রতিবাদ মিছিলের সামনের সারিতে ছুটে গিয়েছিলাম। আমার পক্ষে তখন এটুকুই করা সম্ভব ছিল। তবে সেটা ছিল আক্ষরিক অর্থেই সঠিক দিশার দিকে একটা পদক্ষেপ। ক্যাপিটল হিল অটোনমাস জোন (চ্যাজ) পর্যন্ত আসার গল্পটা প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই অনন্য, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সেটা অবশেষে এই কাঠামোগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটা শক্তপোক্ত অবস্থান নিতে পারার উচ্ছ্বাসের সঙ্গে জড়িত। সেই অনুভূতি এমনই একটা তীব্র উন্মত্ততার চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল যে আমি সেখান থেকে আর নামতেই চাইনি। আমি ন্যায়বিচারের নেশায় আসক্ত এবং এ নেশা আমি কোনদিনই ছাড়ব না।

 

এফএ: মিনিয়াপলিস ও আর পাঁচটা শহর প্রতিবাদ আর দাঙ্গার আগুনে জ্বলে ওঠার পর কর্মী ও সংগঠকদের বিভিন্ন জোট এই সিয়াট্‌লে আলোচনা চালাচ্ছিল। এই শহরে পুলিশ-বিরোধী সংগঠিত প্রতিবাদের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। যুব সংশোধনাগার ও তথাকথিত “পুলিশ বাংকার”-এর সম্প্রসারণ আটকানোর জন্য এখানে আন্দোলন হয়েছে। এই “পুলিশ বাংকার”-টা ছিল শহরের উত্তরের একটা থানার সম্প্রসারিত অংশ। যাই হোক, মিনিয়াপলিসের সংহতিতে এখানে সিয়াট্‌লে কী করা যেতে পারে তা নিয়ে এই সমস্ত আলোচনায় লোকে কথা বলতে শুরু করে। সেখান থেকেই সপ্তাহান্তে প্রতিবাদী কর্মসূচি নেওয়ার পরিকল্পনা করাও শুরু হয়এবং নৈরাজ্যবাদী থেকে শুরু করে চার্চপন্থীরা ও যুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠী থেকে শুরু করে পুলিশ-বিরোধী জোট পর্যন্ত একগুচ্ছ গোষ্ঠী তাদের নিজেদের কর্মসূচির পরিকল্পনা নিতে শুরু করে। প্রথম সপ্তাহান্তিক প্রতিবাদে অন্তত আধ ডজন আলাদা আলাদা কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল, আর তখনই এখানেও হাঙ্গামা শুরু হয়। সেই গোড়ার দিনগুলোতেই আমিও এখানে এসে হাজির হই। 

 

  • শহরের অন্যান্য প্রতিবাদ আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজটা চ্যাজ কীভাবে করে?

 

এফএ: আমি বলব যে তারা এটারই একটা অংশ, তবে এই পরিসরটাকে আমি [আন্দোলনের] কেন্দ্র বলতে রাজি নই। ব্ল্যাক লাইভ্‌স-কে ঘিরে গড়ে ওঠা এই মুহূর্তটাই অবিশ্বাস্য এবং প্রতিটা গোষ্ঠীই এখন রীতিমতো নাটকীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। আর আমি একথাও বলতে চাই যে এই প্রক্রিয়াটা চলমান। বিভিন্ন অলাভজনক সংস্থা মিছিল বের করছে, চার্চপন্থী গোষ্ঠীগুলো মিছিল বের করছে, জেল-বিরোধী ও বর্ণবিদ্বেষ-বিরোধী গোষ্ঠীগুলোও মিছিল বের করছে, আর এর মধ্যে অনেকগুলোই কিন্তু ঘটছে এই পরিসরটার বাইরে। এগুলো আগে থেকেই ঘটে আসছিল এবং তারা তাদের নিজস্ব পরিকাঠামো ব্যবহার করেই এগুলো ঘটাচ্ছিল। এখনও এগুলো ঘটে চলেছে।

The abandoned Seattle Police East Precinct inside CHAZ. Photo by Derek Simeone

যেমন ধরুন এই হালেই সিয়াট্‌লের সবথেকে বড় দুটো পার্কের একটা থেকে আরেকটার মধ্যে ৬০,০০০ মানুষের মিছিল হয়েছে। আর আমি যতদূর বুঝেছি, এই মিছিলের সঙ্গে কিন্তু চ্যাজের বিশেষ কোনও যোগযোগই ছিল না। এর পাশাপাশি এটাও বলব যে এই স্বশাসিত পরিসরেও অনেক কিছুরই পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। কাজেই যেমন ধরুন গতকাল রাতেই (১৪ জুন) আমি একটা ব্ল্যাক লাইভ্‌স ম্যাটার মিছিলে অংশ নিয়েছি। সে মিছিল স্বশাসিত অঞ্চল থেকে বেরিয়ে অন্য জায়গায় পুলিশকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং রাস্তার দখল নিয়েছে। কাজেই স্বশাসিত অঞ্চলেও লোকে অনেক পরিকল্পনাই করছে, কিন্তু এই মুহূর্তটা এতই নাটকীয় ও বৈচিত্র্যে ভরা যে এর বাইরেও অনেক কিছু ঘটে চলেছে।

 

  • এই অঞ্চলটা প্রথম গড়ে উঠল কীভাবে? আর এটা গড়ে ওঠার আগে প্রতিবাদের চেহারাটাই বা কীরকম ছিল?

 

ওচ্যাজ: যে কোনও সামাজিক আন্দোলনের মতোই এক্ষেত্রেও নির্ভুল কোনও উৎস-বিন্দুতে আঙুল রাখাটা মুশকিল। চ্যাজের গড়ে ওঠাটা যে সমস্ত ঘটনাবলির ফলাফল সেগুলো এতটাই পরাবাস্তব আর বিশৃংখল যে ঠিক কোন ঘটনা-পরম্পরা আমাদের এখানে নিয়ে এসে ফেলেছে সেটা আমি কোনওদিনই পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারব কিনা সে বিষয়ে আমি যথেষ্ট সন্দিহান। তবে একটা কথা আমি এখানে স্পষ্ট করে দিতে চাইপ্রথম আঘাতটা করেছিল “রেজিম” [চ্যাজের ভাষায় সিয়াট্‌লের পুলিশ বিভাগের নাম]। ওরা আমাদের দশকের পর দশক ধরে খুন করে আসছে। স্মৃতি যতদূর পেছনে যেতে পারে সেই সময় থেকেই ক্যাপিটল হিলের মানুষ শহরের প্রশাসক সিটি কাউন্সিলের কাছে (শাসনশোষণের) এই আবর্জনা পরিষ্কার করার আবেদন করে আসছে, কিন্তু সেসব কথায় তারা কোনদিন কর্ণপাত করেনি। জেফ বেজোসের [মার্কিন শিল্পপতি, অ্যামাজন ডট কম-এর প্রতিষ্ঠাতা ও কর্ণধার – অনুবাদক] পদলেহন করতে তারা এত ব্যস্ত যে আমাদের দিকে ফিরে তাকানোরও তাদের সময় নেই। রাস্তায় যতই প্রান্তিক মানুষদের লাশের পাহাড় জমা হোক, আমাদের তথাকথিত রাজনৈতক “নেতা”-দের ঘুমের তাতে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটবে না, তাই এবার আমরা তাদের এমন কিছু একটা উপহার দেব যাতে সত্যিই তাদের ঘুম ছুটে যাবে। 

 

কিন্তু যখন আমরা “সঠিক পথ”-এ প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম, শান্তিপূর্ণ মিছিল করেছিলাম, তখনও কি তারা আমাদের কথা শুনেছিল? মোটেই না। তারা তাদের সিয়াট্‌ল পুলিশ বিভাগের (এসপিডি) গুন্ডা বাহিনীকে আমাদের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছিল। তারা আমাদের সঙ্গে এমন ব্যবহার করেছিল যেন আমরা পেশাদার অপরাধী – কিংবা তার চেয়েও খারাপ কিছু, কারণ অপরাধীদের ভাগ্যেও অন্তত বিচার পাওয়ার সুযোগটা জোটে। তারা আমাদের অনেকটা জন্তু-জানোয়ারের মতোই গণ্য করেছিল। মিছিলের সময় আমার অজস্র সঙ্গীদের দাঙ্গা পুলিশের নৃশংস হামলার শিকার হতে দেখেছি, আর সেটা শুধুমাত্র সংস্কার আর বর্ণসাম্যের দাবি তোলার জন্য। আমরা নিরাপদ আইন অমান্যের পথ নেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু এসপিডি-র “পুরনো ঘুঘু”-দের কাছ থেকে যে স্তরের হিংসার স্বাদ পাওয়ার আশা এতদিনে আমাদের তৈরি হয়েছে সে ব্যাপারে তারা আমাদের মোটেও হতাশ করেনি।  

 

এফএ: এই এলাকাটায় দেড় সপ্তাহ ধরে লাগাতার সংঘর্ষ চলেছে। প্রতিদিন সন্ধ্যে ছটা কি সাতটা থেকে মাঝরাত পর্যন্ত কিংবা রাত একটা পর্যন্ত প্রায় নিয়মিত সংঘর্ষ। তাই পুলিশ যখন ওই জায়গাটা থেকে পিছু হটে ততদিনে আসলে লোকে রীতিমতো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সেদিন রাত্রে অবশ্যই অনেক মানুষ এসেছিল, কিন্তু অনেকেই আবার তাড়াতাড়ি বাড়িও ফিরে গিয়েছিল। তাই সেদিন মধ্যরাতের পর যখন স্বশাসিত অঞ্চলের ঘোষণাটা করা হয় তখন অনেকেই সেখানে হাজির ছিল না – আমি নিজেও ছিলাম না। 

 

  • জনতা এই পরিসরটা দখল করল কীভাবে?

 

ওচ্যাজ: তেমন নির্দিষ্ট কোনও কৌশল বা পদ্ধতি যে ছিল তা নয়, আমরা স্রেফ… দখল নিয়ে নিয়েছিলাম। এই পরিসরটা যে আমাদেরই সে বিষয়ে আমাদের দিক থেকে কোন সন্দেহই ছিল না। তাই চারদিকে বেড়া তোলাটা আমাদের কাছে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার সবথেকে স্বাভাবিক উপায় বলেই মনে হয়েছিল। প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যখন চূড়ান্ত বিশৃংখলা দেখা দিল তখন আমরাও সচেতনতা হারিয়ে স্রোতে ভেসে পড়লাম, তখন আর কোনও চিন্তা-ভাবনার দরকার পড়ছিল না, আমাদের এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হওয়া গতিকে চালিত করছিল স্রেফ জনতার কর্মশক্তি। তখন আমরা সকলে একক বাহিনীর মতো করে কাজ করছিলাম, যেন সেই প্রবল উত্তেজনার মুহূর্তে সকলের একটাই শরীর, একটাই মন। 

 

শেষ যে ঘটনাটা আমার মনে আছে সেটা হল পাইন স্ট্রিটে পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়ানো। তখন ব্ল্যাক-এর [নৈরাজ্যবাদী গোষ্ঠী, উৎস মূলত পশ্চিম জার্মানিতে। এর সদস্যরা যে কোনও প্রতিবাদ কর্মসূচি কালো পোশাক পরেন ও মুখ ঢেকে রাখেন। – অনুবাদক] কৌশলের কথা মনে করে আমরা আমাদের শরীর দিয়ে একটা দেওয়াল গড়ে তুলেছিলাম, কিন্তু ওদের মধ্যে একজন যে ছুটে এসে আচমকাই আমার প্রিয় বন্ধু ডিকেম্বকে সজোরে ঘুষি মারবে সেটা আদপেই আশা করিনি। “বিগ ডি” কিন্তু আমাদের দলের মধ্যে ছিলই না, নিতান্ত নিরীহভাবে সে রাস্তার একধারে দাঁড়িয়ে ঘটনাটা দেখেছিল। সেই মুহূর্তেই আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। আমি দেওয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসি। জানতাম যে আমাদের দলটার আমাকে দরকার ছিল, কিন্তু ওদিকে ডি-র বিপদটাও গুরুতর। আমার নিজের নিরাপত্তার ঝুঁকি নিতে হলেও তাকে ফেলে পালানোটা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। সেই মুহূর্তে রাগের ঝোঁকে আমি বস্তুত আমার চেতনাই হারিয়ে ফেলেছিলাম, কিন্তু জ্ঞান যখন ফিরল তখন উঠে বসলাম চ্যাজ-এ। 

 

এইটুকু মনে আছে যে আমাদের দলটা পুলিশের ব্যূহ ভেঙে ছুটে গিয়ে ইস্ট প্রিসিংক্ট-এর [মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রশাসনিক ও নির্বাচনী এলাকাগুলোকে প্রিসিংক্ট হিসেবে ভাগ করা হয়। [বাংলায় প্রিসিংক্ট-এর সবথেকে কাছাকাছি অর্থ হতে পারে থানা এলাকা। – অনুবাদক] দখল নিয়েছিল। কাজেই পুলিশ পিছু হটেছিল এবং আমাদের সীমানার পরিধি বেড়েছিল। আমার বন্ধু ডিকেম্ব ভীষণ চোট পেয়েছিল, কিন্তু তারপরেও সে সীমানার প্রান্তে টকটকে লাল মোটা হরফে চ্যাজ কথাটা স্প্রে দিয়ে লিখে দিয়েছিল, যাতে গোটা দুনিয়া সেটা দেখতে পায়। সেটা ছিল প্রথম ট্যাগগুলোর মধ্যে একটা। পুলিশের কাছে সেই ট্যাগ ছিল পিছু হটার হুমকি। আর আমাদের কাছে তার অর্থ ছিল স্বাধীনতা। 

Street scene in the CHAZ, with a sign referencing the “Free Derry” autonomous zone in Derry, Northern Ireland. Photo by Alex Glidewell

এফএ: সেই গোটা দিনটাই ছিল রীতিমতো বিচিত্র। প্রতি রাতেই পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ চলছিল। মেয়র প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে বিক্ষোভে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হবে না, কিন্তু ঠিক তার পরের রাত্রেই পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছিল। তার পরের দিন একজনের গায়ে গুলি লেগেছিল, আর তার পরের দিনই পুলিশ পিছু হটে। এই নাটকীয় ঘোষণাটা করা হয়েছিল সেদিন দুপুরবেলা, পুলিশ প্রধান জানিয়েছিলেন যে তাঁরা ইস্ট প্রিসিংক্ট থেকে পিছু হটছেন। 

 

আমার ধারণা ঠিক কী করতে হবে সে বিষয়ে উৎকন্ঠা ও বিভ্রান্তি মানুষের মধ্যে ছিল। এরকম একটা জল্পনাও শোনা যাচ্ছিল যে পুলিশের পিছু হটাটা আসলে একটা ফাঁদ – যাতে লোকে প্রিসিংক্টে হামলা চালায়, তার জানলা ভেঙে দেয় কিংবা জ্বালিয়ে দেয়, আর পুলিশও প্রতিবাদীরা কত খারাপ সেটা জোরগলায় বলবার একটা অজুহাত পেয়ে যায়। এটা অবশ্য স্রেফ গুজব। সেদিন সন্ধ্যেবেলা লোকে যখন জায়গাটায় গিয়ে পৌঁছল তখন তারা পুলিশ বিভাগের দপ্তর পর্যন্ত চলে গিয়েছিল, কিন্তু কোনও কিছু করার ব্যাপারে লোকের মধ্যে রীতিমতো দ্বিধা ছিল। লোকে আদপেই নিশ্চিত ছিল না যে “আমাদের কী করা উচিত? হামলা চালাব কি? নাকি শুধু প্রতিবাদ হিসেবে জায়গাটা ধরে রাখব?” আর এই সমস্ত কথাবার্তা গোটা দিন পার করে রাত পর্যন্তও চলেছিল। 

 

এমন গুজবও ছড়িয়েছিল যে প্রাউড বয়েজ গোষ্ঠী [অতি-দক্ষিণপন্থী ও নয়া-ফ্যাসিবাদী বর্ণবিদ্বেষী মার্কিন গোষ্ঠী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছারাও পশ্চিমি দুনিয়ার কোনও কোনও দেশে এদের উপস্থিতি আছে। – অনুবাদক] এলাকায় এসে হাজির হয়েছে, এটারও কোনও সমর্থন পাওয়া যায়নি এবং সম্ভবত খবরটা আদপেই সত্যি ছিল না। তাই তখন লোকে সম্ভবত জায়গাটা রক্ষা করার কথা ভাবছিল। অন্যান্য ফ্যাসিবাদী সংগঠনের লোকেরাও যদি সেখানে আক্রমণ চালাতে আসে তাহলে কী হবে? আর আমার ধারণা যে এই জাতীয় কথাবার্তা থেকেই এলাকাটাকে স্বশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করার ভাবনাটা বেরিয়ে আসে।

 

  • চ্যাজের পেছনে ভাবনাটা ঠিক কী? “স্বশাসিত অঞ্চল” বিষয়টাই বা কী?

 

এফএ: স্বশাসিত অঞ্চলের ইতিহাস দীর্ঘ, তার শুরুটা সম্ভবত পারি কমিউনে, সেই সময় ফ্রান্সের সরকার প্রাশিয়ার অবরোধের বিরুদ্ধে, অর্থাৎ একটা বিদেশি শক্তির অবরোধের বিরুদ্ধে শহরকে রক্ষা করতে অস্বীকার করেছিল। প্যারিসের মানুষ স্রেফ শহরের প্রশাসনিক ব্যবস্থাটাকে দখল করে নিয়েছিল। তারা ভেবেছিল, “আমরা এটা আমাদের নিজেদের স্বার্থে অনেক ভালোভাবে চালাতে পারব। দেখা যাচ্ছে যে আমাদেরকে বাঁচানোর জন্য তোমাদের সাহায্য আমাদের প্রয়োজন নেই, আমরা নিজেরাই নিখুঁতভাবে নিজেদের দেখভাল করতে পারি।” তারা একেবারে মূলগত অর্থে নতুন গণতান্ত্রিক নীতির ভিত্তিতে এবং প্রত্যক্ষ অর্থে অনেক বেশি গণতান্ত্রিক একটা সংগঠনের ভিত্তিতে শহরের কাঠামোকে ঢেলে সাজিয়েছিল।

 

তারপর থেকে পরিসর ও পরিকাঠামো পুনর্দখল করার জন্য এ জাতীয় বহু গণতান্ত্রিক উদ্যোগ দেখা গিয়েছে, সেগুলোর উদ্দেশ্য ছিল সেনাবাহিনী, ব্যবসা, কিংবা পুলিশের স্বার্থের বদলে জনগণের স্বার্থে ব্যবস্থাটা চালানো। কাজেই আমি উদ্যোগটাকে সেই ধারার এবং সেই উত্তরাধিকারের অংশ হিসেবেই দেখছি। এই পরিসরটার সবথেকে চমৎকার দিকগুলোর মধ্যে একটা হল এই মুহূর্তে, যখন পুলিশ আক্ষরিক অর্থেই রাজপথে মানুষকে হত্যা করা থামাতেপারছে না, তখন এখান থেকে একটা অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দেওয়া যাচ্ছে।

 

গত সপ্তাহান্তেই আটলান্টায় আরও একজন কৃষ্ণাঙ্গকে হত্যা করা হয়েছে। এই স্বশাসিত অঞ্চল থেকে বলা হচ্ছে, “ওহে, দেখাই যাচ্ছে যে তোমাদেরকে আমাদের প্রয়োজন নেই। পুলিশি ব্যবস্থা ছাড়াই আমরা আমাদের এলাকাকে নিরাপদভাবে চালাতে পারি। পুলিশি ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে আমরা এটাকে অনেক বেশি মানবিক স্বার্থে চালাতে পারি।” এই নির্দিষ্ট দখল কর্মসূচি থেকে এই রাজনৈতিক বার্তাটা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এবং দৃঢ়ভাবে বেরিয়ে আসছে। 

 

ওচ্যাজ: পুলিশবিহীন একটা দুনিয়া যে সম্ভব, চ্যাজ তার একটা জাজ্বল্যমান প্রমাণ। যখন আমরা বলছি, “পুলিশের হাতে টাকা দেওয়া বন্ধ করো,” তখন তার অর্থ শুনে যা বোঝা যাচ্ছে ঠিক সেটাই। পুলিশ যতটা না সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করে তার থেকে ঢের বেশি সমস্যা তারা তৈরি করে – বিশেষ করে অনথিভুক্ত অভিবাসী, অশ্বেতাঙ্গ, মার্কিন আদিবাসী, কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা, রূপান্তরকামী, সমকামী ও অন্যান্য প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষদের জন্য। তারা যখন পুলিশকে সাহায্যের জন্য ডাকে (কিংবা কোনও বৈচিত্র্যের বোধহীন “কারেন” – এই জাতীয় লোককে আপনি ভালো করেই চেনেন – যখন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশ ডাকে) [জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে কারেন মধ্যবিত্ত, শ্বেতাঙ্গ ও বর্ণবিদ্বেষী আম মার্কিন মহিলার প্রতিভূ, বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি খড়্গহস্তহালে হোয়াট্‌সঅ্যাপ জাতীয় মাধ্যমের মিম মারফত প্রবলভাবে বিখ্যাত কিংবা কুখ্যাত চরিত্র। – অনুবাদক] তখন কোনও সুরক্ষার সুবিধা তারা পায় না। 

 

পুলিশের সঙ্গে সামান্য যোগাযোগও আমাদের মতো প্রান্তিক মানুষদের কাছে মৃত্যুদণ্ড হয়ে দেখা দিতে পারে। চ্যাজ এই সমস্ত কিছুর প্রতিষেধক। চ্যাজের মূল চরিত্র ও চালিকাশক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল প্রতিশোধ বা শাস্তির বদলে পুনঃপ্রতিষ্ঠার উপর ঝোঁক। আমাদের কাছে “স্বশাসিত”-এর অর্থ হল আমাদের যৌথ ঘাড়ের উপর চেপে থাকা এসপিডি-র বুটের ভার থেকে মুক্তি পাওয়া, অর্থাৎ স্বশাসন। পুলিশকে আমাদের প্রয়োজন নেই, কারণ তার বদলে আমরা একে অপরের মুখাপেক্ষী। একে আপনি যা খুশি নাম দিতে পারেন: সমবায়, সমূহ, কমিউন। সর্বোপরি, চ্যাজ হল একটা পরিবার

 

  • এই মুহূর্তে সেখানে প্রাত্যহিক জীবনের চেহারাটা ঠিক কীরকম? এটা কি শুধুই একটা প্রতিবাদের পরিসর, নাকি আপনারা সেখানে সমষ্টির রোজকার জীবনের সঙ্গে জড়িত কাঠামোগুলোকে নতুন করে গড়ে তুলছেন?

 

এফএ: সেই আলোচনাটা বেশ চিত্তাকর্ষক, কারণ স্বশাসিত অঞ্চলের ঘোষণাটা হওয়ার পরের দিন পর্যন্ত জায়গাটায় আদৌ কোনও পরিকাঠামোই ছিল না। আমার ধারণা ঘোষণাটা বহু মানুষকেই চমকে দিয়েছিল। পরের দুদিনে অজস্র মানুষ এসে সবকিছু গড়ে তোলার কাজটা শুরু করেন। এখন এলাকাটার চেহারা দাঁড়িয়েছে শহরের মধ্যে আরেকটা শহরের মতো। এখানে এখন একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে, খাদ্য বন্টনের রীতিমতো আধুনিক ও প্রাচুর্যে ভরা একটা ব্যবস্থা আছে। কোনও বিবাদ বা হাঙ্গামার ক্ষেত্রে সমষ্টিগত নজরদারির ব্যবস্থা আছে। আলোচনা ও মত বিনিময়ের একটা পরিসরও আছে; “ডিকলোনিয়াল কাফে” নামে একটা কাফে আছে। আছে গোষ্ঠী উদ্যান, বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য দেওয়ার জন্য টেন্ট এবং তথ্যভিত্তিক আলোচনার ব্যবস্থা, সেখানে বিনামূল্যে বিভিন্ন পুস্তিকা ও পত্রপত্রিকা দেওয়া হয়। আর আছে একটা ব্যান্ড স্ট্যান্ড, রাত্রে সেখানে বিভিন্ন ব্যান্ডের অনুষ্ঠান হয়। 

 

কাজেই অজস্র কর্মকাণ্ড চলছে এবং পরিসরটা নিজেই উত্তেজনা ও প্রাণের স্পন্দনের একটা অনুভূতি দেয়। সেখানে গেলেই প্রতিরোধের উৎসব চলার একটা অনুভূতি হয়। তাছাড়া লোকে বিভিন্ন আন্দোলনের পরিসর সম্পর্কে তথ্য আদানপ্রদান করে ও সেগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়, বিভিন্ন আলোচনা সংগঠিত করে এবং পরবর্তী পদক্ষেপের পরিকল্পনা করে। কিংবা বাগানটা কীভাবে সাজানো উচিত এবং গোষ্ঠীবাগানের উদ্দেশ্য কী এ জাতীয় বিষয় নিয়েও তারা ভাবনা-চিন্তা করে। আমার কাছে গোটা ব্যাপারটাই রীতিমতো অবিশ্বাস্য।

 

প্রথম দিন কয়েক কোন কাঠামোই ছিল না। প্রথম সপ্তাহের শেষের দিকে একদিন ভরদুপুরে মানুষ সাধারণ সভার একটা ধাঁচা শুরু করে। প্রথম সভাটা ছিল অনেকটা “সবাই কথা বলুন” গোছের, লোকে তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলে এবং তার মধ্যে দিয়ে অনেক কিছু তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। গত কয়েক সপ্তাহের পুলিশি হিংসার প্রবল মানসিক অভিঘাত। পুলিশের সঙ্গে প্রাত্যহিক লড়াইয়ের অভিজ্ঞতার বর্ণনার মধ্যে দিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ কন্ঠস্বরগুলোকে তুলে আনা। এরপর সাধারণ সভাকে একটা “কার্যকরী গোষ্ঠী”-র ধাঁচার চেহারা দেওয়া হয়। তারা এসে সভার কাছে রিপোর্ট করবে, সরবরাহ-ব্যবস্থা জাতীয় বিষয় নিয়ে কাজ করার জন্য দরকারে অন্য জায়গায় যাবে, তারপর আবার এলাকায় ফিরে আসবে। 

 

তারা কোনও যৌথ সিদ্ধান্ত নিতে সমর্থ হয়েছে কিনা সেটা আমরা জানি না, আর তার জন্য কোনও প্রক্রিয়া তাদের আদৌ আছে কিনা, থাকলে সেটা ভোট, না সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট, নাকি সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া, সেসবও আমার জানা নেই। কিন্তু এটা নিঃসন্দেহে গোটা অঞ্চলটার পরস্পরের সঙ্গে কথা বলার একটা পরিসর।

 

ওচ্যাজ: ফক্স নিউজ জাতীয় দক্ষিণপন্থী প্রচারসর্বস্ব চ্যানেলগুলোতে যে চেহারাটা তুলে ধরা হচ্ছে, ছবিটা অবশ্যই তেমনটা নয়। সশস্ত্র পাহারায় ঘেরা “সেনাচৌকি” কিংবা ওই জাতীয় কোনও হাবিজাবিই আমাদের এখানে নেই। যারা ব্ল্যাক লাইভ্‌স আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানায় এবং পুলিশি হেনস্থার হাত থেকে নিরাপত্তা ও বাঁচার আশ্রয় চায় তেমন যে কোনও মানুষের জন্য আমাদের সীমানা খোলা। কেউ কেউ অন্য রাজ্য থেকে গাড়ি চালিয়ে চ্যাজে এসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চায়, আবার অনেকে সম্পূর্ণভাবে সীমানার মধ্যেই থাকে এবং কাজ করে। যারা এখানে খোলা মনে আসে তাদেরই চোখে পড়ে সীমাহীন ভালোবাসায় ভরা একটা ফলবতী পরিবেশ। 

 

অনুভূতিটা অনেকটা দিনের মধ্যে চব্বিশ ঘণ্টাই একটা পরিষ্কার স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলার মতো। পার্কটাকে আমরা বিভিন্ন বিনোদনমূলক কাজের জন্য ব্যবহার করি, যেমন রাত্রে বিনা পয়সায় সিনেমা দেখানো, হাস্যকৌতুক, নাচের আসর। স্থানীয় চাষিরা এখানে শস্য ফলায়, শিল্পীরা সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর জন্য দেওয়াল-চিত্র আঁকে, শিশুদের ও বিভিন্ন পরিবারগুলোর পক্ষে উপযোগী ও স্বাস্থ্যকর বিভিন্ন উদ্যোগের আয়োজন করা হয়। এখানে সর্বত্রই বন্ধুদের মুখ চোখে পড়ে, যেমন আমাদের ৬৩ বছর বয়স্ক আবাসিক আবাসিক সঙ্গীতজ্ঞ “পাপা জ্যাকোবি।” রাস্তাঘাটে ড্রাম বাজিয়ে বেড়ানো এই মানুষটি সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার পাঠ সহ প্রামাণ্য খাঁটি জেম্বে [জেম্বে ড্রাম গোত্রের বাদ্যযন্ত্র, আদিতে পশ্চিম আফ্রিকার গোষ্ঠী জীবনের সঙ্গে জড়িত। সঙ্গীতের একটা ঘরানাও বটে। – অনুবাদক]  সঙ্গীতের শিক্ষা দেন। 

 

চ্যাজে সকলেই খুবই আনন্দে থাকে, কিন্তু কেন আমরা এখানে এসেছি এবং কাদের জন্য আমাদের লড়াই সেটাও আমাদের পক্ষে ভোলা সম্ভব নয়। তাই জন্যেই বর্ণবিদ্বেষের ইতিহাস, ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্তির রণনীতি ও শ্বেতাঙ্গত্বের ধ্বংসাত্মক উত্তরাধিকারের মতো বিষয় নিয়ে এখানে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া হয়। বর্ণবিদ্বেষের ব্যবস্থাকে মাথার ভেতর থেকে বের করার জন্য আমরা কঠোর পরিশ্রম করছি। আমাদের উদ্দেশ্য হল চ্যাজে এমন একটা পরিসর গড়ে তোলা যেখানে মার্কিন দেশের ইতিহাসে অন্তত একবার সাদারা পিছু হটে কালো, বাদামি আর আদিবাসী মানুষদের অশ্রুত কন্ঠস্বরগুলোর জন্য জায়গা করে দেবে। 

 

চ্যাজের যে কোনও প্রান্তের দিকে তাকান, আপনি দেখতে পাবেন জীবনের স্পন্দনে ভরপুর একটা বাড়ন্ত সম্প্রদায়কে, তার প্রতিটি নাগরিক ব্ল্যাক লাইভ্‌স ম্যাটার আন্দোলনকে বোঝে, তাকে মনপ্রাণ দিয়ে উপলব্ধি করে। এমন কোনও সৌন্দর্য আমার কখনও চোখে পড়েনি যাকে দেখলে আমার সত্যি সত্যি কাঁদতে ইচ্ছে করে, কিন্তু ঠিক সেটাই চ্যাজের সারসংক্ষেপ। 

 

  • এই অঞ্চলটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য নেওয়া পারস্পরিক সহযোগিতার উদ্যোগগুলো কীভাবে চলবে?

 

ওচ্যাজ: পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন শক্তপোক্ত কর্মসূচিই চ্যাজের সাফল্যের চাবিকাঠি, তাছাড়া যেখানে সম্ভব সেখানে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর প্রয়োগকৌশল নেওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষজন এখানে সম্প্রদায়ের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হয়। আমাদের “পুলিশহীন সমবায়” (No-cop co-op)-তে কোনও নগদ টাকা নেওয়া হয় না – চ্যাজের একজন নাগরিকের যা-যা প্রয়োজন সেসবই এখান থেকে বিনা পয়সায় দেওয়া হয়, কারণ আমরা বিশ্বাস করি যে মুনাফার ঊর্ধ্বে মানুষ। আমাদের রান্নাঘর থেকে দিনেরাতে গৃহহীনদের খাবার দেওয়া হয়, আর খাবার বলতে এখানে শুধু কৌটোবন্দি ঠান্ডা বিনের কথা বোঝানো হচ্ছে না। যে কোনও ক্ষুধার্ত মানুষই চ্যাজে সুষম ও পুষ্টিকর গরম খাদ্য পেতে পারে, তার উপর আমরা শেষপাতে স্কুপ আইসক্রিম আর কিবলারের মিন্ট কুকিও [কিবলার মূলত ক্র্যাকার ও কুকি জাতীয় খাবার প্রস্তুতকারক মার্কিন সংস্থা। এদের পণ্য গোটা মার্কিন মুলুকেই প্রবল জনপ্রিয়। – অনুবাদক]  দিয়ে থাকি।  

 

The “No-cop co-op” in the CHAZ. Photo by Derek Simeone

 

কাছেই আছে বিনামূল্যের একটা শিশুদের দেখভাল করার কেন্দ্র, যার উদ্দেশ্য চাকরি-করা কৃষ্ণাঙ্গ মহিলাদের চাপ একটু কমানো। তার সঙ্গে আছে একটা স্বাস্থ্য পরিষেবা কেন্দ্র, সেখানে যার প্রয়োজন তাকেই “বিনা প্রশ্নে” স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়া হয়। বিশেষ করে চ্যাজের বাইরে বসবাসকারী অনথিভুক্ত অভিবাসীরা প্রায়শই ডাক্তার দেখাতে ভয় পায়, কারণ ডাক্তারের কাছে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করার জেরে অভিবাসন ও শুল্ক বিভাগের কর্তৃপক্ষ তাদের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াতে পারে। আমাদের অভিবাসী সাথীরা যখন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে যাবে তখন যাতে তাদের ভয়ের কোনও কারণ না থাকে সেটা চ্যাজ সুনিশ্চিত করে, আর তার উপায়টা হল বিগ ফার্মা ও আর পাঁচটা পশ্চিমি সাম্রাজ্যবাদী স্বাস্থ্য-প্রতিষ্ঠানের একটা টেকসই বিকল্প-ব্যবস্থা গড়ে তোলা।  

 

স্বশাসিত অঞ্চলের আরেকটা গর্বের ও উচ্ছ্বাসের আরেকটা জায়গা হল আমাদের সমবায় কৃষির কর্মসূচিআমাদের উদ্যান এলাকায় এসে ফসল ফলানো ও ভাগ করে নেওয়ার জন্য আমরা এখানকার সমস্ত নাগরিকদেরই স্বাগত জানাই, তবে সবথেকে উর্বর জমিগুলো আমরা এ দেশের আদি বাসিন্দাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছি, যাতে যা ন্যায়সম্মতভাবেই তাদের তার দখল তারা কোনওরকম অনধিকার প্রবেশের ঝঞ্ঝাট ছাড়াই নিতে পারে। যারা কখনওই বিশ্বাস করবে না যে মার্কিন দেশের মানুষ পুঁজিবাদের খাঁচা ভেঙে বেরতে পারে এবং একচেটিয়া আধিপত্যের শাসনতন্ত্রকে বিদায় জানাতে পারে তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, আরও একবার ভেবে দেখুন – চ্যাজ কিন্তু কাজ করে চলেছে, আর আমরা প্রতিদিন আরও বেশি করে সমাজমুখী কর্মসূচি নেওয়ার মাধ্যমে আমাদের কাজের পরিধিকে বাড়িয়েও চলেছি। 

 

এফএ: এদেশে অতিমারী হানা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিয়াট্‌লে যে পারস্পরিক সহযোগিতাভিত্তিক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল তারা এই স্বশাসিত অঞ্চলের পরিসরটা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল। কোভিডের জন্য তারা খাদ্য ও অন্যান্য জিনিসপত্র বন্টনের যে ব্যবস্থাগুলো ব্যবহার করেছিল সেগুলো তারা এই পরিসরটায় ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছিল। সুতরাং সেটা একটা চমৎকার কাজ হয়েছিল। তাছাড়া আমার মনে হয় যে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং একে অপরকে সাহায্য করার ধারণাটাই এর একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাজেই সেখান থেকেই জন্ম হয়েছে  “পুলিশহীন সমবায়”-এর, সেখানে মানুষ তাদের হাতে যা আছে সেটা বিনা পয়সায় বিতরণ করছে তাদের মধ্যে যাদের সেটা প্রয়োজন। আর যে পরিমাণ খাদ্য-সাহায্য আসছে ইত্যাদি সেসবই এই একই ধারণার অংশ।

 

বহু মানুষ প্রচুর কাজ করছেন, আমার থেকে ঢের বেশি। স্বাস্থ্য-পরিষেবা দল তো অবিশ্বাস্য কাজ করছে। বহু সপ্তাহ ধরে তারা পুলিশের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে এসেছে এবং তার পাশাপাশি পুলিশের হাতে যারা অত্যন্ত গুরুতরভাবে আহত হয়েছে তাদের চিকিৎসাও করেছে। তাদের চিকিৎসার সরঞ্জাম জোগাড় করার এবং মানুষের মধ্যে তা বন্টন করার ক্ষমতা সত্যিই অবিশ্বাস্য। 

 

  • দক্ষিণপন্থী সংবাদমাধ্যমে যে ছবিটা তুলে ধরা হচ্ছে সে ব্যাপারে আপনার কী মনে হয়? সেটা কি আপনার নিজের অভিজ্ঞতার থেকে একেবারেই আলাদা?

 

এফএ: চ্যাজ সত্যিই আপনাকে একটা উৎসব আর উচ্ছ্বাসের অনুভূতি দেয়। সিয়াট্‌ল পুলিশ বিভাগ এবং দক্ষিণপন্থী সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে, এমনকী নিছকই মূলধারার সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকেও এই পরিসরটার নামে কাদা ছেটানোর বিস্তর চেষ্টা করা হয়েছে।

 

  • পুলিশ কিংবা দক্ষিণপন্থী নজরদারি কমিটির সদস্যরা কি এখানে ঢোকার চেষ্টা করছে?

 

এফএ: পুলিশ আবার এই এলাকায় ঢুকেছিল। থানাটা সম্পূর্ণ তছনছ করে দেওয়া হয়েছিল। বাড়িটা খোলাই ছিল, কোনও তালা লাগানো ছিল না, যে কেউ চাইলেই ভেতরে ঢুকতে পারত। প্রথম দিন দুয়েক তো কেউ ঢোকেনি। ইস্ট প্রিসিংক্টে ঢোকা নিয়ে তখনও সেই আগের দ্বিধাটা লোকের মধ্যে ছিল। কী করা উচিত সেটা লোকে তখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। দিন দুয়েক পর পুলিশ এসে বাড়িটায় তালা মেরে তার চারপাশে বেড়া তুলে দিয়ে যায়। 

 

আমি যতদূর জানি, ওই একবারই পুলিশ এলাকায় ঢুকেছিল। তার বাইরে শহরের বিভিন্ন পরিষেবা এলাকার সব প্রয়োজনই মেটাচ্ছে। দমকল বিভাগ, পরিবহণ বিভাগ ও উদ্যান বিভাগকে মেয়র এলাকায় ঢোকার নির্দেশ দিয়েছেন। কাজেই সেই একবারের পর আমি এলাকায় আর কখনও কোনও পুলিশকে দেখিনি। 

 

ওচ্যাজ: ফ্যাসিবাদীরা সব সময়েই আমাদের পেছনে লেগে আছে, আর সেটা তো প্রত্যাশিতই। যেটা দুর্ভাগ্যের সেটা হল, আমাদের পক্ষে এই সমস্যার মোকাবিলা করার সেরা উপায়টা কী সেটা আমাদেরকে খুঁজে বার করতে হবে। বেশিরভাগ সময়টা জুড়েই অবশ্য পুলিশ আমাদের নিজেদের মতোই থাকতে দিয়েছে, আমরা তাদের এই এলাকা থেকে নির্বাসনে পাঠানোর পর থেকেই তারা ভয়ে ভয়ে আছে। কিন্তু দক্ষিণপন্থী হতচ্ছাড়ারা যে কোনও সময় হানা দিয়ে আমরা যা কিছু গড়ে তুলেছি সেসব তছনছ করে দিতে পারে এরকম একটা আশংকার মেঘ অবশ্যই জমে আছে। তারা যেটা বুঝতে পারছে না সেটা হল আমরা তাদের দিকে বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখেছি। আমরা কখনওই স্রেফ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে তাদের হামলা মেনে নেব না, কিংবা আমাদের লোকেদের মাথার একটা চুলও তাদের ছুঁতে দেব না। পুলিশ, “দেশপ্রেমিক,” বাইক বাহিনী ইত্যাদি আরও যতজনের নাম আপনি করতে পারবেন তাদের সকলের তরফ থেকেই আমরা বিস্তর হুমকি পেয়েছি। কিন্তু এই সমস্ত দালালের দলের উদ্দেশ্যে চ্যাজের বার্তা একটাই: তোমাদের খেলা আমাদের জানা আছেযা করছ করে যাও, তারপর কী ঘটবে ভাবতেও পারছ না। 

 

Anti-cop sticker on one of the barricades surrounding the CHAZ. Photo by Eldan

 

  • চ্যাজ সম্পর্কে দীর্ঘ মেয়াদে আপনার ভাবনাটা কী? আপনার কি মনে হয় যে এটা টেকসই হবে, ছড়িয়ে পড়বে?

 

ওচ্যাজ: অনর্থক আশাবাদের ঝাপটা যাতে আমাকে অন্ধত্বের দিকে  না নিয়ে যায় তার জন্য আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। বর্ণসাম্য অর্জন করার জন্য এখনও দীর্ঘ পথ হাঁটা বাকি। এখনও অনেক কাজই করা বাকি – আমাদের পরিসরের বিস্তারটা বাড়াতে হবে, পরিকাঠামোর পাকাপোক্ত বন্দোবস্ত করতে হবে, আর এমনটা একটা কৌম গড়ে তুলতে হবে যা সকলের জন্য কাজ করে, শুধু সাদাদের আর তাদের দলে জায়গা পাওয়া কালো কিংবা বাদামি চামড়ার মানুষদের জন্য নয়। আমরা যারা অবস্থাপন্ন পরিসর থেকে এসেছি তারা যাতে আন্দোলনের কেন্দ্রে না যাই বা নিয়ন্ত্রক জায়গায় চলে না-যাই তার জন্য আমাদের এখনও লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে, তার কারণ বর্ণবিদ্বেষের অভিঘাতকে গুঁড়িয়ে দেওয়া একবারের ব্যাপার নয় – এটা সর্বক্ষণের কাজ।

 

সেকারণে, সকলকে কিছু কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আমরা রোজ পোস্টার টাঙাচ্ছি। যাতে যে রাস্তা দিয়ে আমরা রোজ হেঁটে যাই সেটাই সজোরে ঘোষণা করে যে আমরা সকলে ঠিক কীসের পক্ষে। একটু একটু করে আমরা চোখে পড়ার মতো প্রত্যেকটা বাড়ির দেওয়াল জর্জ ফ্লয়েড, স্যান্ড্রা ব্ল্যান্ড, টামির রাইস, মাইকেল ব্রাউন ও অন্যান্যদের [সকলেই পুলিশের হাতে কিংবা পুলিশি হেফাজতে নিহত কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন নাগরিক। – অনুবাদক] প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য দিয়ে ভরিয়ে দিচ্ছি। শহরের ঝাঁ-চকচকে মধ্যবিত্ত চেহারাটা আমরা পালটে দিচ্ছি, উপনিবেশের প্রতিষ্ঠাতাদের নামে যে সমস্ত রাস্তার নাম রাখা হয়েছিল সেগুলোর নাম আমরা বদলে দিচ্ছি এবং আমাদের দেশের বর্ণবিদ্বেষী অতীতের যে সমস্ত অবশেষ এখনও টিকে আছে সেগুলোকে আমরা রীতিমতো অধ্যবসায়ের সঙ্গে মুছে ফেলছি, যাতে আমরা শ্রেয়তর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারি। আমাদের নজর দূরের দিকে, সম্পূর্ণ স্বয়ম্ভরতা অর্জন করার দিকে, যাতে নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য আমাদেরকে আর বাইরের অর্থসাহায্যের উপর ভরসা করতে না হয়। আমার নিজের তালিকায় এরপরেই আছে একটা গ্রিনহাউজ খাড়া করা, যাতে রান্নাঘরের নানান ধরনের নিরামিষ তরিতরকারির জোগান দেওয়ার জন্য বিভিন্ন শাক-সবজি ফলানো যায়।

 

এফএ: চমৎকার প্রশ্ন। গতকাল যখন ওখানে ছিলাম তখন আমার মনে হচ্ছিল যে পরিসরটা একটা শক্তপোক্ত বনেদের উপর থিতু হতে পেরেছে। লোকে পার্কের একটা অংশ ভেঙে ফেলে সেখানে গোষ্ঠীবাগান তৈরি করেছে। অস্থায়ী ছাউনিগুলো জুড়ে জুড়ে একটা গোটা টেন্ট সিটি খাড়া হয়ে উঠেছে, এই প্রতিবাদীরা কতকটা অকুপাই আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। পারস্পরিক সহযোগিতার যে সমস্ত উদ্যোগগুলোর কথা বলছিলাম, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, খাদ্য বন্টন ব্যবস্থা ইত্যাদি, সেগুলো সবই সুপ্রতিষ্ঠিত। তাদের পরিকাঠামোর অবস্থা রীতিমতো মুগ্ধ করে দেওয়ার মতো। কাজেই আমার অন্তত মনে হয়েছে টিকে থাকার ক্ষমতা এর আছে। 

 

এর থেকে কী ফল পাওয়া যাবে সে ব্যাপারে অবশ্য আমি নিশ্চিত নই। বেশ কিছু গোষ্ঠী নানান দাবি তুলেছে, তার মধ্যে কিছু দাবি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত, কয়েকটা আবার অন্যগুলোর থেকে আলাদা। এই শহর থেকে তারা কোন দাবিগুলো অর্জন করতে সমর্থ হবে এবং শেষের লক্ষ্যটাই বা কী তা এখনও আমাদের অজানা। আমার ধারণা সাধারণ সভার চলতি অধিবেশনগুলোতে এবং এই গোটা পরিসরটাতেই সে সমস্ত আলোচনা এখন উঠে আসছে। তবে এই মুহূর্তে এর টিকে থাকার ক্ষমতা আছে আর অদূর ভবিষ্যতেও যে এটা থাকবে না তেমনটা আমি অন্তত ভাবতে পারছি না। 

 

  • এই এলাকার আদিবাসী মানুষদের সঙ্গে আপনি কীভাবে কাজ করেছেন?

 

ওচ্যাজ: চ্যাজে গৃহীত প্রত্যেকটা সিদ্ধান্তই কার্যকরী হয় এই বোঝাপড়া সহ যে এই দেশ প্রথমত এখানকার আদি বাসিন্দাদের, ব্যস। আদিবাসীদের বিভিন্ন প্রয়োজন চ্যাজের প্রথম অগ্রাধিকার, যাতে এটা নিশ্চিত করা যায় তাঁরা তাঁদের প্রাপ্য প্রতিনিধিত্বের অধিকার পাচ্ছেন, পুরনো শাসনতন্ত্র যা তাঁদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল। অনুমোদন পাওয়ার জন্য আমরা সবসময়েই স্থানীয় আদিবাসী নেতাদের তলায় কাজ করি, এ ব্যাপারে আমরা বিশেষভাবে মনোযোগ ও গুরুত্ব দিই। চ্যাজ গড়ে তোলার সময় আমাদের অন্যতম প্রথম কাজ ছিল দুওয়ামিশ উপজাতির প্রধান ও তাঁর আধ্যাত্মিক উপদেষ্টার সঙ্গে পরামর্শ করা। তাঁদের শুভেচ্ছা ছাড়া কোনও কিছু করার কথা আমরা স্বপ্নেও ভাবি না। 

 

  • এই উদ্যোগটা সম্পর্কে আপনার ব্যক্তিগত আবেগের জায়গাটা কী?

 

এফএ: কৃষ্ণাঙ্গদের জীবন সম্পর্কে উদ্বেগ। এই উদ্যোগের উৎস ও সূত্রপাত যেখানে, এই উদ্বেগ তারই অংশ। আমার ধারণা এর শেষটা তাই কৃষ্ণাঙ্গ মানবতা, কৃষ্ণাঙ্গ ঐক্য ও কৃষ্ণাঙ্গ আত্মমর্যাদার মধ্যেই হতে হবে। এছাড়া, আমাদের শহরগুলোর চেহারাটা কীরকম হবে সে ব্যাপারেও আমরা এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ নতুনভাবে ভাবতে পারি। সেই চেহারাটা নতুনভাবে কল্পনা করতে পারি। এটা সেরকমই একটা মুহূর্ত। আমাদের স্থানীয় স্তরের বাজেটে সামরিক শক্তি ও হিংসাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। আর সেটা জাতীয় স্তরের ক্ষেত্রেও খাটে। এর থেকে একটা বিশেষ ভাবনা বেরিয়ে আসে – আমরা যখন মানুষের প্রয়োজন মেটানোর জন্য নিজেদের সংগঠিত করি তখন যা উঠে আসে তা হল চমৎকার শিল্পকীর্তি, নতুন ধারার সঙ্গীত, নতুন আঙ্গিকের সাহিত্য, নতুন সব রাজনৈতিক ভাবনা আর পরস্পরকে স্বাস্থ্য-পরিষেবা ও খাদ্য জোগানোর জন্য নতুন পরিকাঠামো। এই অগ্রাধিকারগুলোর উপরেই আমাদের জোর দেওয়া উচিত এবং এই স্বশাসিত অঞ্চল সেটা একেবারে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে।

 

ওচ্যাজ: সোজাসুজি বললে, ক্যাপিটল হিলই আমার ঘর। আমাদের জনগণ দৈনিক ভিত্তিতে ক্ষমতাতন্ত্রের তাড়া খেতে খেতে ক্লান্ত। তাই আমার পক্ষে বসে বসে আমার লোকেদের ওই “থিন ব্লু লাইন”-এর [সাধারণভাবে পুলিশকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টহলদার পুলিশের উর্দির রং হাল্কা নীল, যা আগে মার্কিন সেনার উর্দির রং ছিলপ্রতীকটার মর্মার্থ হল, পুলিশই সমাজের আইন-মেনে-চলা অংশ ও অপরাধীদের মধ্যে বিভাজন-রেখা এই দুটো অংশকে পরস্পরের থেকে আলাদা করে রেখেছে এবং সমাজকে নিরাপদে রেখেছে। এই প্রতীক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ইজরায়েল, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও ব্যবহৃত হয়। – অনুবাদক] হাতে নিপীড়িত হতে দেখা আর সম্ভব হচ্ছিল না। ক্যাপিটল হিলে আমাদের নিজস্ব “সীমারেখা” আছে: রামধনু রেখা। আমাদের রেখাটা কিন্তু সূক্ষ্ম নয়, রীতিমতো মোটাদাগের, আর তোমাদের পক্ষে সেটা না টপকানোই ভালো। 

 

 

  • শেন বার্লি ওরেগন রাজ্যের পোর্টল্যান্ডের বাসিন্দা, পেশায় লেখক ও চলচ্চিত্রকার। তাঁর লেখা গুরুত্বপূর্ণ বই ফ্যাসিজম টুডে: হোয়াট ইজ ইট অ্যান্ড হাউ টু এন্ড ইট (একে প্রেস, ২০১৭)। জ্যাকোবিন, কমিউন, দ্য ব্যাফলার, ভিউপয়েন্ট ম্যাগাজিনআপিং দ্য অ্যান্টি জাতীয় পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখালিখি প্রকাশিত হয়। তিনি !No pasaran!: Independent Journalism on Fascism and Resistance-এর নির্মাতা।   

 

  • Bengali translation : Prasit Das

 

To read the original article click https://roarmag.org/essays/life-and-times-at-the-capitol-hill-autonomous-zone/

 

Share this
Leave a Comment