বন্ধ হয়েছে একের পর এক ব্যুরো, ব্যাপক কর্মী ও বেতন ছাঁটাই দেশের প্রধান প্রধান সংবাদমাধ্যমে


  • May 28, 2020
  • (1 Comments)
  • 4206 Views

গ্রাউন্ডজিরো রিপোর্ট

 

হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা ফোন, মেল কিংবা ভিডিও কনফারেন্স – ছাঁটাই পদ্ধতির এক নয়া নজির সৃষ্টি করল দেশের বৃহৎ সংবাদমাধ্যমগুলি। শুধু ছাঁটাই নয় বিনা বেতনে সাংবাদিকদের ছুটিতে পাঠিয়েছে কোনও কোনও সংবাদমমাধ্যম। পাশাপাশি, হয় বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে জেলা কিংবা ভিন রাজ্যের সংস্করণ না-হয় ব্যুরো চিফকে বহাল রেখে ছাঁটাই করে দেওয়া হচ্ছে অন্যান্য কর্মীদের। এমনকি অল ইন্ডিয়া রেডিও তাদের অস্থায়ী ঘোষক, অ্যাঙ্কর, কমপিয়ারদের লকডাউনের প্রায় শুরু থেকেই কাজ বন্ধ করে দিয়েছে।

 

এই ‘ডিজিটাল ছাঁটাই’ এর সাম্প্রতিকতম বলি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রণ বিভাগের ৩৫/৪০ জন কর্মী। জানা গিয়েছে, এক দিনে শুধুমাত্র হোয়াটস্‌অ্যাপ বা ফোন করে ওই কর্মীদের চাকরি থেকে পদত্যাগ করতে বলেছে কর্তৃপক্ষ। জোর করে এই বাধ্যতামূলক পদত্যাগ করানো হয়েছে মূলত প্রিন্টিং বিভাগের কর্মীদের। তবে আনন্দবাজার সংস্থায় এভাবে ছাঁটাই বা কর্মীদের বাধ্যতামূলক বদলির ঘটনা ঘটে চলেছে গত ২০০৫ সাল থেকে – এমনটাই দাবি ক্ষুব্ধ কর্মীদের, যা সমর্থন করছেন ওয়েস্ট বেঙ্গল নিউজপেপার এমপ্লয়িজ ফেডারেশন-এর সম্পাদক হারাধন ভট্টাচার্যও।

 

গ্রাউন্ডজিরো-র পাওয়া তথ্য অনুযায়ী আনন্দবাজারের শুধু বারাসাত প্ল্যান্টে প্রিন্টিং ডিপার্টমেন্টের ৪১/৪২ জন কর্মীর মধ্যে ছাঁটাই হয়েছেন ৮ জন এগ্‌জিকিউটিভ। ম্যানেজার দক্ষতায় কাজ করতেন যে ৬ জন তাঁদের মধ্যে ২ জনের চাকরি গেছে। প্রি-প্রেস ও মেকানিকাল বিভাগের প্রতিটি থেকে দু’জন করে মোট চার জন ছাঁটাই হয়েছেন। ইলেকট্রিকাল ও অ্যাকাউন্ট বিভাগ থেকে এক জন করে মোট দু’জনকে চাকরি ছাড়তে বলা হয়েছে। সল্টলেক প্ল্যান্ট-এর সব মিলিয়ে ২০/২২ জন কর্মীর মধ্যে ১৫/১৬ জনকেই চাকরি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বড়জোড়া প্ল্যান্ট-এর ১৩/১৪ জন কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। কর্মীদের অনুমান সল্টলেক প্ল্যান্টটি হয়তো বন্ধ করে দিয়ে তা বারাসাত প্ল্যান্টের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হতে পারে। সব মিলিয়ে আনন্দবাজার তার নতুন-পুরনো কর্মীদের চাকরি ছাড়তে বাধ্য করছে এই লকডাউন ও মহামারির দুর্দিনে।

 

ঠিক কী ঘটছে? নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাঁটাই হওয়ার কর্মীর বয়ান,

“ওরা তো খুব বুদ্ধিমান। ফোন করে বলেছে আমাদের নিজেদেরকেই রেজিগনেশন দিতে হবে, যে আমরা স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিচ্ছি – এইটা লিখতে হবে। কমপেনসেশন এই স্লটেই ভাগ করা হয়েছে। জুনিয়রদের তিন মাসের বেসিক, সিনিয়রদের ছ’মাসের বেসিক আর একদম যারা অনেকটা সিনিয়র তাঁদের ন’মাসের বেসিক দেবে। সিনিয়র বলতে, ২০-২৫ বছর শুধু এই কোম্পানিতেই সার্ভিস দিয়েছে। পাশ করে শুধু এখানেই চাকরি করেছেন। সেই মানুষগুলোরও চাকরি গেছে।”

 

কর্মীদের অভিযোগ, এই সংস্থায় কোনও ইউনিয়ন তৈরি করতে দেওয়া হয়নি কখনওই। নাম-কে-ওয়াস্তে সাংবাদিকদের একটি যে সংগঠন আছে, তা মালিকপক্ষ ঘনিষ্ঠ। ফলে কোনওভাবেই কোনও দাবি-দাওয়া তোলা বা আন্দোলন-বিক্ষোভ হওয়ার অবকাশ নেই। যেসব তরুণ কর্মীদের চাকরি গেল তাঁরা অবাক হচ্ছেন এটা ভেবেই যে যদিও বা তাঁরা কোনওভাবে চাকরি জোগাড় করে নেওয়ার মতো অবস্থায় আছেন, যেসব বরিষ্ঠ কর্মীরা ২০-২৫ বছরের বেশি এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত তাঁদের সঙ্গে এই অভব্য আচরণ, অনৈতিক ব্যবহার কর্তৃপক্ষ করতে পারল কীভাবে!

 

গত দু’বছর আগে একবার বিভিন্ন বিভাগ থেকে কয়েক’শো কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছিল। তারপরে যদিও নতুন করে নিয়োগ হয়েছিল। তবে এবার প্রিন্টিং বিভাগের থেকেই অধিকাংশ কর্মীর চাকরি যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের মধ্যে ২০০৪ থেকে ২০১৫-র মধ্যে যোগ দেওয়া অর্থাৎ, তুলনায় নতুন কর্মী যেমন আছেন, তেমনি রয়েছেন ১৯৯৩ সাল থেকে সংস্থায় যুক্ত থাকা কর্মীও। এমনকি মাত্র ছ’মাস আগে কাজে যোগ দেওয়া কর্মীও আছেন। চাকরি চলে যাওয়া অপর এক কর্মী যেমন স্পষ্টই জানালেন চূড়ান্ত অব্যবস্থা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে তাঁদের কাজ করতে হয় এবং উপায় থাকলে তিনি নতুনদের আনন্দবাজারে কাজে যোগ না দেওয়ার পরামর্শই দিতেন। নাম গোপন রাখার শর্তে তিনি বলেন,

 

“এক তো আনন্দবাজারে কোনও ট্রেড ইউনিয়ন নেই। যা ছিল এককালে, ’৮৪ সালে আন্দোলন চলেছিল টানা বহুদিন। সেটাকে আনন্দবাজার মালিকরা শেষ করে দিয়েছে, যা করে থাকে। শেষ ট্রেড ইউনিয়নের লোক যাঁকে ভিআরএস দিয়েছিল, যতদূর আমার মনে পড়ছে বোধহয় ২০১৫ সালে। তারপর ট্রেড ইউনিয়নের আর কেউ নেই। আর একটা লটকে বোধহয় ২০১৩-তে বার করেছিল। এই হল প্রেক্ষাপট। তো এর ফলে এখন আর কেউ আটকানোর মতো জায়গায় নেই। আটকানো তো দূর, কথা বলারই জায়গা নেই।”

 

এর ফলে আরও একটি বিষয় সামনে আসছে, তা হল – এই ছাঁটাই ও তারপর কর্মী নিয়োগের চক্রে অনেকটাই বেতন হ্রাসও করা হয়। কম মাইনেতে নিয়োগ করা হয় নতুন কর্মী। ম্যানেজারিয়াল স্তরে যাঁরা চাকরি করেন তাঁদের লকডাউনের সময়ে ১৫-২০% বেতন হ্রাস হয়েছে বলে খবর। উচ্চপদস্থ কোনও কর্মীরই চাকরি যায়নি। একমাত্র মধ্যপদস্থ তিন/চার জন ম্যানেজার ছাঁটাই হয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। আরও যে বিষয়টি কর্মীদের কথায় উঠে আসছে তা হল – এর ফলে কম কর্মী দিয়ে তুলনায় কম বেতনে যে কাজ চালানো যায় তেমনটা প্রমাণ করা সহজ হয়ে যাচ্ছে মালিক পক্ষ ও কর্তৃপক্ষের তরফে। তাই নীতি-আদর্শের তোয়াক্কা না করে স্রেফ দূরভাষে কিছুটা হুমকির মতোই বলা হচ্ছে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা।

 

তবে শুধু আনন্দবাজার নয় একই রকম ঘটনা ঘটেছে আজকাল ও এই সময় সংবাদপত্রেও। আজকালে গত ৪ মে একটি স্বাক্ষরবিহীন নোটিস পড়ে যাতে বলা হয় নির্দিষ্ট পরিমাণ বেতন কাটার কথা। দু’দুটি সরকার স্বীকৃত কর্মী ইউনিয়ন থাকা সত্ত্বেও তাঁদের সঙ্গে কোনও রকম আলোচনা না করেই এই নোটিস দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। যদিও পরবর্তী সময়ে কর্মীদের তরফ থেকে চাপ বাড়ায় একটি স্বাক্ষরিত নোটিস দেওয়া হয়। আজকাল পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড পার্মানেন্ট ওয়াকার্স ইউনিয়ন (কলকাতা)-র তরফ থেকে যেমন জানা গেল, ৫% থেকে ৩০% পর্যন্ত বেতন ছাঁটাই হচ্ছে কর্মীদের। বিজ্ঞাপন, সংবাদ, সার্কুলেশন, অ্যাকাউন্টস, প্রেস সব বিভাগ মিলিয়ে প্রায় ১০০ জন কর্মী এর আওতায় পড়েছেন। ২০,০০০ টাকার নীচে যাঁদের বেতন তাঁদের এর মধ্যে ধরা হয়নি। সমস্যাটি হল এই ঘটনা ঘটেছে কর্মীদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এবং তাঁদের সম্মতি না নিয়েই। দু’টি ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা বারবার সম্পাদক ও মালিক পক্ষের সঙ্গে বসে নিজেদের দাবি পেশ করা এবং একটি আলোচনার পরিসর তৈরির চেষ্টা করলেও কোনও লাভ হয়নি। তবে তার থেকে নিশ্চিত সমাধানসূত্র বেরোতে পারত বলেই কর্মীদের আশা। লকডাউন, কোভিড বিধ্বস্ত সময়ে পরিবার প্রতিপালনের ক্ষেত্রে আচমকা বেতন ছাঁটাই আরও এক বিপর্যয় তো বটেই। মালিক ও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এরকম আচরণ তাঁদের অভিপ্রেত ছিল না। যদিও নোটিস পড়া মাত্রই ইউনিয়নের পক্ষ থেকে মালিক পক্ষের কাছে প্রতিবাদের চিঠি দেওয়া হয়। তবে অপর পক্ষ থেকে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি বলেই ইউনিয়নের দাবি। যদিও আগামী কিছু দিনের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

 

টাইমস অফ ইন্ডিয়া গ্রুপের বাংলা দৈনিক এই সময় সংবাদপত্রের ৯ জন সাংবাদিককে ফোন করে চাকরি ছাড়ার কথা বলা হয়েছে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে। এর আগে চলতি সময়ে আর্থিক বিপর্যয়ের অজুহাতে প্রত্যেক কর্মীর সব মিলিয়ে প্রায় ১৫% আর্থিক সুযোগ-সুবিধা হ্রাস করা হয়। এই সময় শুধু নয়, ৬ মে এক ভিডিও কলের মাধ্যমে ইকনমিক টাইমসের বেশ কয়েকজন বিভাগীয় সম্পাদক, সাংবাদিক, ডিজাইনারকে পদত্যাগ করতে বলা হয়। চাকরি হারিয়েছেন গ্রুপের অ্যাকাউন্টস বিভাগের ১২ জন কর্মী। গ্রুপের অন্ধ্র ব্যুরোর তিন জেলার ৬ জন এবং কেরালার ১৩ জন সাংবাদিক চাকরি খুইয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। চাকরি হারাদের মধ্যে রয়েছেন পুনের সকাল টাইমসের ১৫ জন। এছাড়াও বাৎসরিক পাঁচ লক্ষ টাকা যাঁদের বেতন তাঁরা বাদে সারা দেশে সমস্ত কর্মীদের বেতন কাঠামো অনুযায়ী ১০% থেকে ৩০% পর্যন্ত বেতন হ্রাস করা হয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য হিন্দু, দ্য টেলিগ্রাফ একই পদ্ধতিতে বেতন হ্রাসের পথ নিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে ভায়াকম এইট্টিন, এনডি টিভি, নিউজ নেশন, দ্য কুইন্ট, এমনকি এআইআরও। দ্য টেলিগ্রাফ ৩১ মে থেকে তাদের গুয়াহাটি ব্যুরো বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। দ্য কুইন্ট তাদের ৪৫ জন কর্মীকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিনা বেতনে ছুটিতে পাঠিয়েছে। নিউজ নেশন তাদের ইংরেজি ডিজিটাল টিমের ১৫ জনকে বরখাস্ত করেছে। নিউ ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস কেরালার তিনটি জেলা সংস্করণ বন্ধ করেছে। সেখানে সাংবাদিক ও অন্য কর্মীরা চাকরি খুইয়েছেন।

 

সরকারি বাধা নিষেধ উপেক্ষা করে অল ইন্ডিয়া রেডিও তাদের অস্থায়ী কর্মীদের কাজে ডাকেনি বলে অভিযোগ করেছেন এআইআর ক্যাজুয়াল অ্যানাউন্সার অ্যান্ড কম্পিয়ার ইউনিয়নের সভাপতি হরিকিষাণ শর্মা। সারা দেশে এআইআর-এর এমন কর্মীর সংখ্যা ১৩,৮১০। তারা অনুষ্ঠান ভিত্তিক ডাক পান এবং সে অনুযায়ী নির্দিষ্ট একটি অর্থ আয় করে থাকেন (সূত্র: নিউজলন্ড্রি)।

 

এই রাজ্যের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ওয়েস্ট বেঙ্গল নিউজপেপার এমপ্লয়িজ ফেডারেশন-এর পক্ষ থেকে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে, কপি পাঠানো হয়েছে শ্রমমন্ত্রী ও অতিরিক্ত মুখ্য সচিব (অ্যাডিশনাল চিফ সেক্রেটারি)-এর কাছেও। এই চিঠিতে স্পষ্টতই বলা হয়েছে যে কোভিড ১৯ বা  লকডাউন-এর পরিস্থিতির সময়ে সংবাদ সংস্থার মালিক পক্ষ যেভাবে কর্মীদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণ এবং তাঁদের ছাঁটাই ও বেতন হ্রাস করা হচ্ছে, তা শুধু অমানবিক নয়, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারের বিরূদ্ধেও যাচ্ছে। আপৎকালীন সময়ে কর্মীদের বেতন কাটা যাবে না ও চাকরি থেকে ছাঁটাই করা যাবে না –  কেন্দ্রীয় সরকারের এই নির্দেশ এবং রাজ্য সরকারের এই মর্মে আবেদনও এই প্রথম সারির সংবাদ সংস্থাগকুলি উল্লঙ্ঘন করছে বলে এই চিঠিতে তীব্র নিন্দা করা হয়েছে। যত শীঘ্র সম্ভব মুখ্যমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করে যাতে যাবতীয় ছাঁটাই, জোর করে নেওয়া ইস্তফা ও বেতন হ্রাস বন্ধ করেন তার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্তগুলি দেশব্যাপী লকডাউন চলার সময়ে যে অনৈতিক, বেআইনি, অসাংবিধানিক ও ভারতের সংবিধানের ১৪ নং ধারা বিরোধী তাও উল্লেখ করা হয়েছে। এখনকার অবস্থার সুযোগ নিয়ে মালিক পক্ষ যে কর্মীদের সংখ্যা কমাতে চাইছেন তা স্পষ্ট। এই চিঠিতে এমনটাও বলা হয়েছে যে, এই সংস্থাগুলি নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে আইনের ঊর্ধ্বে থাকার চেষ্টা করে এবং শ্রমিকদের বহু দিনের লড়াইয়ের ফলে অর্জিত অধিকার খর্ব করার চেষ্টা করে। কিন্তু এই কোভিড -১৯ জরুরি অবস্থার সময়েও সংবাদকর্মীরা যেভাবে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন তাতে সংবাদ সংস্থার মালিক ও কর্তৃপক্ষের এই আচরণ কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

 

ফেডারেশন-এর সম্পাদক হরনাথ ভট্টাচার্যর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন –

 

“আনন্দবাজার এটা বহুদিন ধরে করে চলেছে। কিন্তু কোনও সময়েই কেউ কোনও প্রতিবাদ করে না। তাছাড়া আমাদের বহু লড়াই করে পাওয়া সর্বভারতীয় বেতন বোর্ড-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী বেতনও কেউ দেয় না। আনন্দবাজার তো নয়ই। একমাত্র বর্তমান পত্রিকা নিয়ম-নীতি মেনে চলে। আমরা একটি প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে, তাঁকে দ্রুত হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়ে। এভাবে কর্মী ছাঁটাই করে ‘স্কেলিটন স্টাফ’ দিয়ে কাজকর্ম চালিয়ে তাঁরা যদি একবার প্রমাণ করে দিতে পারে যে, এভাবে সংবাদসংস্থা চালানো যায় তাহলে পরিস্থিতি মারাত্মক হবে। আশা করি সরকার, মুখ্যমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করবেন। নাহলে আইনের পথে যেতে হবে।”

 

১৬ এপ্রিল ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অফ জার্নালিস্ট, দিল্লি ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্ট, বৃহনমুম্বাই ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্ট এক যোগে এই ছাঁটাই, ফারলো ও বেতন হ্রাসের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা করে। আবেদনে ২০ মার্চের মালিকদের প্রতি কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রকের পরামর্শের উল্লেখ করা হয়। সেখানে রাজ্য, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ও মালিকপক্ষকে লকডাউনের সময় কর্মীদের ছাঁটাই কিংবা বেতন হ্রাস না করার কথা বলা হয়। ২৯ মার্চ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্টের ১০(২)(১) ধারা অনুযায়ী নির্দেশ জারি করেন যে, লকডাউন পর্বে সমস্ত শ্রমিককে পূর্ণ বেতন দিতে হবে এবং তাদের কাজের নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। আইন অনুযায়ী এই নির্দেশ পালন করা বাধ্যতামূলক এবং পালিত না-হলে আইন লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

 

২৭ এপ্রিল আদালত সাংবাদিক সঙ্ঘগুলির আবেদন শীর্ষ আদালত গ্রহণ করে। ১১ মে মালিকপক্ষের সংগঠন নিউজ ব্রডকাস্টার অ্যাসোসিয়েশন (এনবিএ) এবং ১৩ মে ইন্ডিয়ান নিউজ পেপার সোসাইটি (আইএনএস) তাদের পাল্টা হলফনামা জমা দেয়। এনবিএ জানায়, সাংবাদিক সংঘ ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য আবেদন জানিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের বেঁচে থাকাটাই এখন বিপদের মুখে। আইএনএস তার হলফনামায় জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় পরামর্শ ও আইন অস্পষ্ট, যুক্তি ও নিয়মবর্হিভূত, বেআইনি ও অসাংবিধানিক। কেন্দ্র এই মামলার অন্যতম বিবাদী পক্ষ হলেও সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনও হলফনামা পেশ করা হয়নি। একই সঙ্গে মালিকপক্ষের সাফাই, লকডাউনে সংবাদপত্রের প্রচার, বিজ্ঞাপন থেকে আয় কমেছে। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বিজ্ঞাপন বাবদ পাওনা মিলছে না (নিউজলন্ড্রি)।

 

এদিকে ১৭ মে কোভিড-১৯ ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটি চতুর্থ লকডাউন ঘোষণাপত্রে জানিয়ে দেয়, ডিএম অ্যাক্ট, ২০০৫ -এর ১০(২)(১) ধারা অনুযায়ী নির্দেশ ১৮ মে ২০২০ থেকে লুপ্ত হল। অর্থাৎ, লকডাউন পর্বে ছাঁটাই, ফারলো, বেতন হ্রাস চলতে পারে। অন্তত, ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী কেন্দ্র কোনও হস্তক্ষেপ করবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইন বিষয়ে পঞ্জাবের অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এমএসএম ইন্ডাস্ট্রি) শিল্পমালিকদের সংগঠনের করা এক মামলায় শীর্ষ আদালতের রায়ের ফলেই কেন্দ্র এই আইন বাতিল করেছে। ওই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ তাদের রায়ে বলে, বেসরকারি সংস্থাগুলি যদি তাদের কর্মীদের লকডাউনের সময় পূর্ণ বেতন না-দিতে পারে তাহলে সরকার বলপ্রয়োগ করে তা বাধ্য করতে পারে না। পঞ্জাবের শিল্পপতিদের যুক্তিগুলি হাজির করেছে সংবাদমাধ্যমের মালিকরা।

 

মহামারি লকডাউন, প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখিয়ে দিল সংবাদ সংস্থাগুলিও কীভাবে নিছক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে এবং তারাও কতটা অমানবিক, নীতিবিরূদ্ধ হতে পারে আর কেনই বা সংবাদকর্মীদের নিজস্ব স্বাধীন ইউনিয়ন এখন সময়ের দাবি।

 

Share this
Recent Comments
1
  • comments
    By: Amit Das on May 28, 2020

    Sob miliye 400jon kormi chhatai hoyeche abp te.

Leave a Comment