দুই বাংলায় রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ও প্রভাবের খোঁজ করল রেডিও কোয়ারেন্টাইন কলকাতা


  • May 8, 2020
  • (0 Comments)
  • 333 Views

রেডিও কোয়ারেন্টাইন কলকাতা লকডাউনের পর্বেই কলকাতায় জন্ম নেওয়া একটি কমিউনিটি রেডিও স্টেশন। তার বয়স মাত্র দেড় মাস। গৃহবন্দির এই অকালে রবীন্দ্রনাথকে বরণ করে নেওয়ার অভূতপূর্ব উদ্যোগ নিয়েছে রেডিও কোয়ারেন্টাইন কলকাতা। আর ভার্চুয়ালি এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে জুড়ে থাকবে ৫৩-৫৪টি দেশ থেকে প্রায় ১২ হাজার শ্রোতাবন্ধু। জানালেন অনামিকা রায় প্রামাণিক

 

কবিগুরু বলেছিলেন মানবতা আসলে বিশ্বব্যাপী একটি সম্পূর্ণ সত্ত্বা। আমরা প্রত্যেকে তার এককমাত্র। হৃদয় মানবতা ও আমাদের মাঝের সেতুবন্ধন। তাই সহৃদয় ব্যক্তি সাহিত্যের মাধ্যমে জুড়ে যান গল্পের চরিত্রের জীবনের সঙ্গে। যেভাবে দূর প্রবাসে বসে থেকেও মাটির কাছাকাছি চলে আসা যায় বাংলা গানে, গল্প পাঠে। দেশ-কালের গণ্ডি পেরিয়ে এই এক হয়ে যাওয়াতেই আনন্দ। তাই নয় কি? জন্মভিটে থেকে দূরে চলে যাবার পীড়া বাঙালিভাগ্যে বরাবর থেকে যাবে হয়তো। আমরা সবাই জানি তার সবকটি কারণই রাজনৈতিক। প্রথমে ধর্মের ভিত্তিতে হল ভারত-পাকিস্তান, তারপর ভাষার ভিত্তিতে পাকিস্তান-বাংলাদেশ। এই ভাঙাগড়ার মাঝে কত জীবন হল উথালপাথাল। এমনই ক্ষত-বিক্ষত এক জীবনের গল্প লিখলেন কলিম শরাফি।

 

কলিম শরাফি জন্মেছিলেন এই বাংলার বীরভূমে। স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদান করে হলেন জেলবন্দি। এই জেলবন্দি দশাতেই আগামী জীবনে লড়বার অস্ত্রটি শানিয়ে নিয়েছিলেন। সেই হাতিয়ার আর কিছু নয় রবীন্দ্রনাথের গান। দেশভাগের পর জন্মভূমি থেকে বিদায় নিলেন। কমিউনিস্ট ভাবাদর্শী কলিম শরাফি ওপার বাংলায় গণসঙ্গীতে গাইলেন রবীন্দ্রনাথের গান। ভাবতে অবাক লাগে পাকশাসিত বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের গানের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল।

 

কাকতালীয় ভাবে অধুনাকালেও ভারতবর্ষের স্কুলপাঠ্য থেকে রবি ঠাকুরকে বাদ দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হচ্ছে বলে কানাঘুষো শোনা যায়। যাকগে সেসব কথা। আজ রবি ঠাকুরকে উদযাপনের দিনে আরেকবার স্মরণ করা হবে বিশ্ববাঙালির কাছে সমাদৃত এই যোদ্ধা শিল্পীকে রেডিও কোয়ারেন্টাইন কলকাতায়। ভাবনা ও সংকলনে ঢাকা থেকে থাকবেন প্রদীপ ঘোষ।

 

রবীন্দ্রনাথ যে যাত্রা শুরু করেছিলেন তাঁর কিন্তু কোনো অন্তিম বাঁক দেখা যায়নি আজকের তারিখেও। বিশ্বব্যাপী মানুষ ভালোবেসে যে যেখানে রবি ঠাকুরের ভাবনাকে আপন করেছেন, সেখান থেকেই শুরু হয়েছে রবীন্দ্রপ্রবাহের শাখানদী। এই আমি, আপনি, আমরা সকলে তার জলরাশি অর্থাৎ আবার কবির কথাই সত্য প্রমাণিত হল- “তোমায় আমায় মিলে এমনি বহে ধারা”। আমরা হয়তো নেই রবি-জীবনীতে, রবীন্দ্রসাহিত্য তত্ত্ব আলোচনায়। কিন্তু আমরা, সাধারণেরা কোথায় বলব রবীন্দ্রনাথ আর আমাদের সম্পর্কের গল্পগুলো? এই অতিমারির অসময়ে? গৃহবন্দির এই সময়ে সাধারণের ভাবনাগুলোকে রাখবার জায়গা করে দিয়েছে রেডিও কোয়ারেন্টাইন কলকাতা।

 

“মিছিলের আলখাল্লা”য় আজও মিছিলের সঙ্গী হিসেবে কীভাবে রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পান জানাবেন শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার। আমরা স্কুলবেলা থেকেই কথায় কথায় জুড়ে দিই কবির লাইনের অংশবিশেষ, তাতে মূল কবিতার ভাবনা সার্থক হল নাকি বিকৃত তাতে বিশেষ মাথা ঘামাইনা। এই বিষয়েই স্বপ্নময় চক্রবর্তী আলোচনা করবেন “ক্লান্ত কোটেশন” পর্বে। কবিগুরু এই দুঃসময়ের পতাকা হয়ে কীভাবে আছেন তা ব্যাখ্যা করবেন শৈবাল বসু। “সহজ নয় সহজ পাঠ” বিষয়টি নিয়ে কথা বলবেন শ্যামলবরণ সাহা। সঙ্গীত শিল্পী সাহানা বাজপেয়ী স্মরণ করবেন আরেক রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী বিক্রম সিং খাঙ্গুরাকে। এছাড়াও থাকবে আরও নানা ভাবনা, নানা কথা, গান, গল্প রেডিও কোয়ারেন্টাইন কলকাতায় দু’দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানে।

 

রেডিও কোয়ারেন্টাইন কলকাতা লকডাউনের পর্বেই কলকাতায় জন্ম নেওয়া একটি কমিউনিটি রেডিও স্টেশন। তার বয়স মাত্র দেড় মাস। গৃহবন্দির এই অকালে রবীন্দ্রনাথকে বরণ করে নেওয়ার অভূতপূর্ব উদ্যোগ নিয়েছে রেডিও কোয়ারেন্টাইন কলকাতা। আর ভার্চুয়ালি এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে জুড়ে থাকবে ৫৩-৫৪টি দেশ থেকে প্রায় ১২ হাজার শ্রোতাবন্ধু। বিশ্ব-বাঙালির মধ্যে এই ভার্চুয়াল মানববন্ধন গড়তে রেডিও কোয়ারেন্টাইন কলকাতার মতো মিডিয়াকে অসংখ্য অভিনন্দন।

 

রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপনের আগে রেডিও কোয়ারেন্টাইন কলকাতা “মে দিবস” পালন করেছে। সেটিও ছিল এক অভিনব অনুষ্ঠান যার মাধ্যমে এই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বাংলাভাষী প্রগতিশীল যুব সমাজ শ্রমজীবী মানুষের অস্তিত্বের সঙ্কট, অধিকারের সংগ্রামকে সামনে রেখেছে। ইতিহাস বলতে যদি বুঝি অন্যায় এর বিরুদ্ধে, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মানবজাতির সুদীর্ঘকাল ধরে করা আসা লড়াই এর গল্প, তবে এও কি এক নতুন ইতিহাস নির্মাণ নয়? উত্তরবঙ্গের চা-শ্রমিকদের এই অতিমারির সময়েও একই ভাবে চা পাতা যোগান দিয়ে যেতে হবে। মালিকেরা তার বদলে নেবে না তাঁদের সুরক্ষার দায়িত্ব। বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পের শ্রমিকেরা আজ সঙ্কটে। পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন গ্রামগঞ্জের থেকে শ্রমিকেরা দেশের অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছেন। রক্ত জল করে পাওয়া টাকাগুলো সব খরচ করে মালবাহী ট্রাকের পেছনে বসে প্রাণটুকু নিয়ে তারা ফিরেছেন ঘর। নিজের দেশে, নিজের মাটিতে প্রান্তিক হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর গল্প বলা দরকার। দূর আমেরিকায় কিংবা ইউরোপের কোনো দেশে কাজের সূত্রে গিয়ে পৌছানো বাঙালিরাও সেখানের সমাজে প্রান্তিক। একটা সুস্থায়ী পরিচয় তৈরি করার আশায় বছর বছর কাজ করে যাবার পর যখন জানতে পারলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনির্দিষ্টকালের জন্য গ্রিন কার্ড বাতিল করতে চলেছেন, তাদের সামনেও প্রশ্ন আসে, “আমাদের সমাজ কোনটা?” এই অতিমারির সময়ে প্রবাসী বাঙালিরা সেই দেশের মানুষের দ্বারা এশিয়ান বলে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় বাঁচছেন। আমাদের নিজেদের মধ্যে, এক ভাষাভাষী মানুষগুলোর মধ্যে যোগাযোগ প্রায় নেই বলে আজ আমরা হীনমন্যতায় ভুগছি।

 

এই যোগাযোগকে দৃঢ় করার উদ্দেশ্যেই রেডিও কোয়ারেন্টাইন কলকাতার জন্ম। এক বন্ধুর লড়াইয়ের গল্প সাহস জোগাবে অপর বন্ধুকে। ভাষাগোষ্ঠী হিসেবে বাঙালিরা অনেক বৃহৎ। বাংলাভাষীর লড়াই এর ইতিহাসও সুদীর্ঘ। ইতালির কৃষক আন্দোলনের গান “বেলা চাও”কে যেভাবে আপন করেছি, সেভাবেই আমাদের “হেই সামালো ধান হো”কেও আন্দোলনের মন্ত্র হিসাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। আসাম, পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি বিরোধী আন্দোলনে দিল্লি থেকে ভেসে আসা “হাম কাগজ নহি দিখায়েঙ্গে”র পাশে বাঙালির স্লোগান “রক্ত দিয়ে কেনা মাটি, কাগজ দিয়ে নয়” সম্পূর্ণ নিজস্ব ইতিহাসকে প্রতিধ্বনিত করে। আজকের সময় এইরকম নতুন স্লোগানগুলি সমবেত ডাকের দাবি রাখে। এখানেই প্রয়োজন একটি বাংলা ভাষায় বিশ্বচর্চার গ্লোবাল মিডিয়ার। রাষ্ট্র দ্বারা পরিচালিত মিডিয়া সে কাজ করতে ব্যর্থ। রেডিও কোয়ারেন্টাইন কলকাতা কি সেই বিকল্প ভূমিকা পালন করবে? উত্তর রাখা থাক সময়ের কাছে।

 

Share this
Leave a Comment