কল্যাণ তহবিল থেকে এক টাকাও পেলেন না রাজ্যে নথিভুক্ত নির্মাণ শ্রমিকেরা


  • April 27, 2020
  • (0 Comments)
  • 744 Views

কল্যাণ প্রকল্প থেকে কোনও সহায়তা মেলেনি রাজ্যের নির্মাণ শ্রমিকদের। ‘প্রচেষ্টা’ও কি বন্ধ হল? দেবাশিস আইচের রিপোর্ট

 

অভিযোগ উঠেছে যে, নির্মাণ শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিল থেকে অন্যান্য রাজ্যগুলি ১০০০ থেকে ৫০০০ টাকা শ্রমিকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি পাঠালেও পশ্চিমবঙ্গ এ বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ করেনি। ২৪ মার্চ কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রক রাজ্য সরকারগুলিকে পরামর্শ দেয় যে, বিল্ডিং অ্যান্ড অদার কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার ওয়েলফেয়ার বোর্ডের হাতে শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের যে অর্থ জমা রয়েছে সেখান থেকে রেজিস্ট্রিভুক্ত নির্মাণ শ্রমিকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা করা হোক। ৮ এপ্রিল পর্যন্ত ১৮টি রাজ্য কেন্দ্রীয় সরকারের ২৪ তারিখের পরামর্শ অনুযায়ী — ১০০০ টাকা থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত — মোট ১.৮ কোটি নির্মাণ শ্রমিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সাড়ে তিন কোটি টাকা জমা করেছে বলে শ্রমমন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে। দিল্লি শ্রমিক পিছু দিয়েছে ৫,০০০ টাকা, পঞ্জাব ও কেরালা দিয়েছে ৩,০০০ টাকা, হিমাচলপ্রদেশ ২০০০ টাকা, ওডিশা ১,৫০০ টাকা, উত্তরপ্রদেশ ১,০০০ টাকা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের দাবি ৩১টি রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারই শ্রমিকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দিয়েছে।  যদিও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তা সত্য নয়।

 

কেন্দ্রীয় সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৭-২০১৮ সালে নির্মাণ শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৫.৩ কোটি। এর মধ্যে সাড়ে তিন কোটি নির্মাণ শ্রমিক নথিভুক্ত। এবং একমাত্র নথিভুক্ত শ্রমিকরা এবং যাঁরা তাঁদের নাম নবীকরণ করেছেন তাঁরাই এই সাহায্য পাওয়ার অধিকারী। ৩১ মার্চ ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ রাজ্যে নথিভুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ২৮ লক্ষ ৮১ হাজার ২২৫ জন।

 

সিটু নেতা দেবাঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, প্রাথমিক ভাবে শ্রমদপ্তরের পরিকল্পনা ছিল রাজ্যে অসংগঠিত ক্ষেত্রের ১ কোটি ২০ লক্ষ রেজিস্ট্রিভুক্ত শ্রমিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এককালীন ১০০০ টাকা সরাসরি দেওয়া হবে। পরিবহন, বিড়ি, নির্মাণ শ্রমিক ছাড়াও যে সমস্ত অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক রাজ্য সরকারের প্রভিডেন্ট ফান্ডের আওতায় রয়েছেন তাঁরাও এই সহায়তা পাবেন। পরবর্তীতে রাজ্য সরকার ১০ এপ্রিল ‘প্রচেষ্টা’ এবং ২০ এপ্রিল, লকডাউনের জেরে রাজ্যে ফিরতে না-পারা শ্রমিকদের জন্য ‘স্নেহের পরশ’ প্রকল্প ঘোষণা করেন। ‘স্নেহের পরশ’ প্রকল্পেও আটক শ্রমিকদের এককালীন ১০০০ টাকা দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করে।

https://digitalbangali.com/prachesta-scheme-west-bengal-government.html?amp

 

অন্যদিকে, দেবাঞ্জনবাবুর আরও অভিযোগ, ২০২০-২১ রাজ্য বাজেটের আগে নির্মাণ শ্রমিক কল্যাণ তহবিল থেকে ১৭০০ কোটি টাকা রাজ্য সরকার তুলে নিয়েছিল। তিনি কন্সট্রাকশন ওয়ার্কাস ওয়েলফেয়ার বোর্ডের সদস্যও বটে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে ডিসেম্বর মাসে বোর্ডে আলোচনা হয়। সরকার পক্ষ শ্রমিক তহবিলের অর্থ ট্রেজারিতে সরিয়ে নেওয়ার জন্য জোরাজুরি করে। কিন্তু বোর্ড তা মানেনি। এর পর বোর্ডকে এক রকম অন্ধকারে রেখেই টাকা সরিয়ে ফেলা হয়। রাজ্য বাজেটে অর্থসংস্থান বৃদ্ধি করতেই শ্রমিক তহবিল থেকে টাকা সরানো হয়েছে বলে বোর্ড সদস্যদের অনুমান। যা অনৈতিক ও বেআইনি বলেও জানিয়েছেন দেবাঞ্জনবাবু। ওই সময় তহবিলে ২,৭১৮ কোটি টাকা ছিল। কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রকের পরামর্শ কর্ণপাত না-করার পিছনে তহবিলের অর্থ ট্রেজারিতে সরিয়ে ফেলার ঘটনার যোগ রয়েছে বলে মনে করছে শ্রমিক সংগঠনগুলি।

 

বিভিন্ন রাজ্যের সরকারি আধিকারিক এবং ১২টি রাজ্যের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে বছরের পর বছর নির্মাণ প্রকল্পগুলির উপর ১ থেকে ২ শতাংশ সেস বসিয়ে রাজ্য সরকারগুলি ৫২ হাজার কোটি টাকার ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে। শ্রমিকদের তার এক ক্ষুদ্র অংশই রাজ্য সরকারগুলি আর্থিক সাহায্য হিসেবে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। পাচ্ছেনও আরও এক ক্ষুদ্র অংশ।

 

এদিকে, অসংগঠিত ক্ষেত্রের কাজ হারানো দিনমজুর বা শ্রমিকদের এককালীন আর্থিক সাহায্য প্রকল্প ‘প্রচেষ্টা’-র ফর্ম পূরণও বন্ধ হয়ে গেল। সোমবার এই মর্মে এক বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে রাজ্য সরকার। গত ১০ এপ্রিল রাজ্য সরকার এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে এই নতুন যোজনাটি চালু করে। বলা হয়, এই প্রকল্পে এককালীন ১০০০ টাকা দেওয়া হবে এবং ১৫ এপ্রিল থেকে ১৫ মে পর্যন্ত এই প্রকল্প চালু থাকবে। পরিবারের একজনই এই সহায়তা পাবেন এবং তাঁকে একমাত্র উপার্জনকারী হতে হবে। শুধু তাই নয়, উপভোক্তা করোনার কারণেই কাজ হারিয়েছেন এবং অন্য কোনও উপার্জনের পথ নেই — এ বিষয়ে জেলাশাসক কিংবা কলকাতা পুরসভার ক্ষেত্রে পুর কমিশনারকে সন্তুষ্ট হতে হবে।

 

‘প্রচেষ্টা’ চালু হওয়ার ১৭ দিনের মাথায় ফর্ম পূরণ বন্ধ হওয়ায় বিস্মিত শ্রমিক মহল। শ্রমিক সংগঠন সিটু এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২৮ এপ্রিল রাজ্য জুড়ে প্রতীকী প্রতিবাদ জানাবে বলে স্থির করেছে। শ্রমিক মহলের দাবি, ফর্ম পূরণ বাতিল করার অর্থ প্রকল্পটিই বাতিল করা।

 

নির্মাণকর্মী রাজ্য ফেডারেশন কল্যাণ তহবিল থেকে নির্মাণ শ্রমিকদের আগামী তিন মাস ২০০০ টাকা করে দেওয়া এবং  অসংগঠিত শ্রমিকদের ছ’মাস বিনামূল্যে রেশন দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। আগামী ৩০ এপ্রিল ফেডারেশন রাজ্যের সর্বত্র শ্রম দপ্তরগুলির সামনে ধর্না কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি, সিটু ভিন রাজ্যে আটকে পড়া সব পরিযায়ী শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনা, যে সমস্ত আন্তঃজেলা পরিযায়ী শ্রমিক রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন জেলায় আটকে রয়েছেন তাঁদেরও ‘স্নেহের পরশ’ প্রকল্পের আওতাভুক্ত করার দাবি জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি দেবে বলে জানিয়েছেন দেবাঞ্জন চক্রবর্তী।

 

এই বিষয়ে, রাজ্য সরকার কিংবা শ্রমদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি। সরকারের বক্তব্য পাওয়া গেলেই এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।।

 

Share this
Leave a Comment