মহামারীর দিন-রাত : প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতি বিপর্যয়েও উদাসীন রাষ্ট্র


  • April 2, 2020
  • (0 Comments)
  • 367 Views

দিল্লীর সাম্প্রতিকতম হিংসায় প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েছেন বহু মানুষ বা অনেক প্রতিবন্ধী মানুষও এই হিংসায় আক্রান্ত। হিংসা ও ট্রমাবিধ্বস্ত আশ্রয়স্থলগুলি করোনা-র সংক্রমণ আটকানোর অছিলায় কোনওরকম বিকল্প ব্যবস্থা না করেই ভেঙে দিয়েছে রাষ্ট্র। কী হবে এই মানুষগুলির? ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম ফর দ্য রাইটস্‌ অফ দ্য ডিসএবেলড পিপল (এনপিআরডি) – প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকার আন্দোলনের এই জাতীয় মঞ্চ তাদের বেশ কিছু দিনের রেশন, কিছু দিনের জন্য নিরাপদে ভাড়া থাকার ব্যবস্থা করেছে। নাগরিক সমাজের সহযোগীতা কাম্য এই উদ্যোগ চালিয়ে যেতে। এই মহামারীর সময়েও দেশের জনসংখ্যার এক বিরাট সংখ্যক মানুষ যাঁরা প্রতিবন্ধী তাঁদের প্রয়োজন ও সমস্যার প্রতি দৃক্‌পাত করেনি রাষ্ট্র। আন্দোলনকর্মীরা সোচ্চার হওয়ায় যে ঘোষনাটি করেছেন তা লজ্জাজনক। লকডাউন হয়ে যাওয়ায় অবস্থায় প্রতিবন্ধী মানুষদের সমস্যা নিয়ে লিখলেন সুদর্শনা চক্রবর্তী

 

 

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, অন্য যেকোনও সময়ের মতোই – করোনা ভাইরাস ভারতবর্ষে ঢোকার পর থেকে যে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং বিশ্ব জুড়ে তা মহামারীরূপে ছড়িয়ে পড়ার কারণে এ দেশের কেন্দ্র সরকার ‘লকডাউন’ পরিস্থিতি ঘোষনা করার পর – সবচেয়ে শেষে যে মানুষগুলির কথা রাষ্ট্র ভেবেছে তাঁরা হলেন প্রতিবন্ধী মানুষের। শারীরিক, মানসিক, বৌদ্ধিক কোনওরকম প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষকেই এইরকম একটি জরুরী অবস্থার সময়ে রাষ্ট্র তার অগ্রাধিকারের তালিকায় অন্যতম হিসাবে রাখার প্রয়োজনই মনে করেনি। কারণ প্রতিবন্ধী মানুষেরা সব সময়েই প্রান্তিকতম মানুষদের মধ্যেও সবচেয়ে কম গুরুত্ব পেয়ে আসছেন। ভোটদাতা হিসাবে তাঁদের গুরুত্ব রয়েছে। সেইজন্যই নির্বাচনের সময়ে কীভাবে তাঁরা ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে ভালোভাবে ভোট দিতে পারেন সে বিষয়ে বড় বড় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। যদিও অনেক সময়েই বাস্তবে সেগুলি থাকেই না। অবশ্য নির্বাচন মিটে গেলেই যে দলই সরকার গড়ুক না কেন প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকার, প্রাপ্য দাবি-দাওয়া ইত্যাদির বিষয়ে উদাসীনতা বদলায় না। আবারও একইরকমভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে হয় তাঁদের।

 

তবে এই কোভেড ১৯-এর বিপদের সময়ে সরকার যেভাবে প্রান্তিক মানুষদের প্রতি অমানবিক ব্যবহার করে চলেছে তাতে তাদের ফ্যাসিস্ট চরিত্রই আরও একবার বেরিয়ে আসছে। প্রতিবন্ধী মানুষেরা এই আচমকা লকডাউন-এ গৃহবন্দী হয়ে পড়ার ফলে যে কত বহুস্তরীয় সমস্যার মধ্যে পড়তে পারেন, তাঁদের পরিবারের মানুষদের যে কত ধরনের অসুবিধার মধ্যে দিয়ে যেতে হতে পারে, প্রতিবন্ধী মানুষ ও তাদের পরিবারের জীবনে এগুলির দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল কি হতে পারে তা নিয়ে রাষ্ট্রের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। এমনকি কোভেড মোকাবিলায় তাঁরা যে নির্দেশিকা তৈরি করছেন, যে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন সেখানেও প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতি উদাসীনতা, অবহেলা ও অসম্মান পীড়াদায়ক। প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলন নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও আন্দোলনকর্মীদের ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করায় যেটুকু ঘোষনা করা হয়েছে তা নিন্দনীয়ই শুধু নয়, ভাবতে অবাক লাগে যে এমন অযৌক্তিক কথাও সরকার বলতে পারে। আসলে ‘দিব্যাঙ্গ’ বলে দিয়ে রাষ্ট্র যদি দায় ঝেড়ে ফেলতে চায়, দেশের নাগরিকদের চূড়ান্ত বিপদের দিনেও যদি তাদের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ব পালন না করে – তাহলে প্রশ্ন ওঠে সেই সরকারের জনদরদী ভাবমূর্তি নিয়েই। ভুললে চলবে না,  যে আদর্শে কেন্দ্রে দায়িত্ব থাকা সরকার অনুপ্রাণীত তাতে প্রতিবন্ধকতা বিষয়টি গ্রহনীয় বা কাম্য নয়। সুতরাং এরকম রোগজর্জর বিপদের দিনে তাঁদের প্রতি এধরনের ঔদাসীন্য কেন তাও বোঝা দরকার।

 

মাত্রই কয়েক দিন আগে অর্থমন্ত্রী ঘোষনা করেন দেশের প্রতিবন্ধী মানুষদের সরাসরি এককালীন ১০০০ টাকা অর্থসাহায্য করা হবে। এই টাকা তিন মাস ধরে দু’টি কিস্তিতে দেওয়া হবে। যা প্রতি মাসে ৩৩৩.৩৩ টাকায় দাঁড়ায়। এই টাকাটি শুধুই খুবই কম ও অপর্যাপ্ত নয়, অত্যন্ত অপমানজনকও। এটি প্রমাণ করে রাষ্ট্রের কাছে প্রাপ্য অধিকার নয় যেন দয়ার দান হিসাবে এই টাকা প্রতিবন্ধী মানুষদের হাতে দেওয়া হচ্ছে।

 

এই সামান্য পরিমাণ অর্থসাহায্যের বিরোধীতা করে এনপিআরডি নির্দিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছেন। যেখানে বলা হয়েছে লকডাউন না ওঠা ও করোনা ভাইরাস সংক্রমণ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবন্ধী মানুষদের মাসিক ৫০০০ টাকা অর্থসাহায্য করা হোক তাদের প্রয়োজনীয়তা পূরনের জন্য। তাছাড়া প্রতিবন্ধী সার্টিফিকেট না থাকায় অনেক প্রতিবন্ধী মানুষ যে এর আওতায় পড়তে পারবেন না সে বিষয়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবী জানানো হয়েছে।

 

এনপিআরডি-এর সাধারণ সম্পাদক মুরলিধরন বিশ্বনাথ বলছিলেন, এ দেশের প্রতিবন্ধী মানুষেরা সব সময়েই প্রান্তিকতম ও তাদের অবস্থা সর্বদাই অত্যন্ত কষ্টকর। এই বিপযর্য়ের দিনে তা আরওই সমস্যাবহুল হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রের অসহযোগীতায়। “এই অবস্থায় সরকারের উদাসীনতা ও তারপর এই সামান্যতম অর্থের ঘোষনা তাঁদের অসংবেদনশীল মানসিকতাই স্পষ্ট করে দেয়। প্রতিবন্ধীরা সর্বদাই মইয়ের শেষ ধাপে থাকে। আর এই ঘোষনা যেন এক ধরনের ‘টোকেনিজম’ মাত্র। বহু প্রতিবন্ধী মানুষ তাঁদের জীবিকা হারিয়েছেন এই পরিস্থিতিতে। তাঁদের কী হবে? রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে। রাষ্ট্রের কাজের ধরন প্রমাণ করে দেয় তা ‘এলিটিস্ট’, উচ্চ মধ্যবিত্তের সুবিধা রক্ষাতেই ব্যস্ত। কেন রাষ্ট্রের তরফে প্রতিবন্ধী মানুষদের মতো প্রান্তিকতম মানুষদের জন্য কোনও ত্রাণ তহবিল বা বিকল্প ব্যবস্থা এরকম জরুরি অবস্থাকালঈন সময়ে নেই?” প্রশ্ন তুললেন মুরলিধরন বিশ্বনাথ।

 

একটা কথা মনে রাখা দরকার, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা প্রতিবন্ধী মানুষদের কাছে নতুন কিছু নয়। বহুক্ষেত্রে বাধ্য হয়েই, রাষ্ট্রের পরিকাঠামো না থাকার কারণে, সমাজের মানসিকতার কারণে তাঁরা এই বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। ফলে এই ‘লকডাউন’-এ ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখার মাধ্যমে যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করা হচ্ছে তাতে তাঁরা অনেকেই অভ্যস্ত। কিন্তু এই পরিকল্পনাহীন বাধ্যতামূলক গৃহবন্দীত্ব একদিকে যেমন তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে, তেমনি অন্যদিকে যে কোনও ধরনের প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনই অত্যন্ত বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে, জীবন হারাচ্ছে পরিচিত ছন্দ।

 

যেকোনও প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনেই ‘কেয়ার গিভার’ বা প্রাথমিক ও মূল শুশ্রূষাকারীর সঙ্গে তাঁদের যে নির্ভরশীলতার সম্পর্ক থাকে তা এইরকম গৃহবন্দী দশায় বিশেষভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। রাগ, ‘ডিপ্রেসন’-এর মাত্রা বাড়ছে। কারণ, এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক, সামাজিক যে চাপ প্রতিটি ব্যক্তিমানুষ ও পরিবারের উপর তৈরি হচ্ছে, তা প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতিদিনের জীবনে ‘কেয়ার গিভার’-দের সঙ্গে সম্পর্ককেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দু’পক্ষই বিপদের সময়ে নিজস্ব চাপগুলি দ্বারা জর্জরিত, তার উপরে প্রতিবন্ধকতাজনিত উদ্বেগ মোকাবিলায় উভয়েই কোনও কোনও সময়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। শহর ও গ্রামে প্রতিবন্ধী মানুষদের ক্ষেত্রে এই সমস্যার মাত্রার তারতম্য ঘটলেও, সব ক্ষেত্রেই তা থাকছে। কথা হচ্ছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মনজিৎ কুমার রাম-এর সঙ্গে, তিনি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। লকডাউন-এর জন্য তিনি আপাতত তাঁর হাওড়ার বাড়িতে গৃহবন্দী, তাড়াহুড়োয় সঙ্গে নিতে পেরেছেন কয়েকটি মাত্র বই। বলছিলেন, “আমরা যারা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, আমাদের কাছে স্পর্শ খুব গুরুত্বপূর্ণ। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে থাকি, তখন এই স্পর্শ মনের ভাব প্রকাশে অনেকটা সাহায্য করে। কিন্তু এখন আমাদের বাধ্য হয়ে ঘরে আটকে থাকায় সে সুযোগ নেই, যা আমাদের মনের উপর খুবই চাপ তৈরি করছে। অডিও বুক-এর সংখ্যাও তো কম আর তা সবার জন্য অ্যাকসেসিবল-ও নয়। বলা হচ্ছে মোবাইলে কথা বলে আমাদের সময় কাটাতে, কিন্তু আমার পক্ষে দীর্ঘ সময়ে ফোনে কথা বলা অসুবিধাজনক।” যেহেতু তিনি কোনও কাজের জন্য অন্যের উপর নির্ভরশীল, তাই কখনও কিছু করার ইচ্ছে হলেও বা একটু হাঁটতে যেতে হলেও অপেক্ষা করতে হচ্ছে বাড়িতে তাঁর ‘কেয়ার গিভার’-এর অন্যান্য কাজ সামলে কখন অবকাশ বা সময় হবে তার জন্য।

 

বাড়িতে থাকাকালীন স্থান অসঙ্কুলানের কারণে বা ব্যক্তিগত পরিসরের অভাবে অনেক প্রতিবন্ধী মানুষই নিজের মতো করে সময় কাটাতেও পারছেন না। মনজিৎ-ই যেমন গান, আবৃত্তি করেন। কিন্তু এখন বাড়িতে তিনি সেই পরিবেশ বা পরিসর পাচ্ছেন না। এটাও সত্যি যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিবন্ধী মানুষকে পুরোপুরি বোঝা একজন অ-প্রতিবন্ধী মানুষের পক্ষে সহজ না-ও হতে পারে। যেসব প্রতিবন্ধী মানুষ শারীরিক, মানসিক সহায়তার জন্য কোনও সংগঠন বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উপর নির্ভরশীল, সেগুলি বন্ধ থাকায় তারা আরও বেশি সমস্যার মধ্যে পড়ছেন। মনজিৎ-এর শ্লেষ মেশানো শেষ কথাগুলিই এ দেশের এখনকার ছবিটা স্পষ্ট করে দেয় – “এই পরিস্থিতিতে দেশের হতদরিদ্র মানুষগুলি কোনওরকম পরিষেবা পাচ্ছেন না। পরিযায়ী শ্রমিকেরা মারা যাচ্ছেন। তখন বোধহয় আমরা প্রতিবন্ধী মানুষেরা সরকারের থেকে একটু বেশিই আশা করে ফেলছি!”

 

এমন অনেকগুলি বিষয় রয়েছে যেগুলি সাধারণভাবে হয়তো আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। অথচ এরকম জরুরি অবস্থাকালীন সময়ে একজন প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষেত্রে সেগুলি খুবই বড় আকার ধারণ করে। অবিবেচকের মতো দেশজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করে এবং প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সহায়ক ব্যবস্থা তৈরি না করে সরকার সেই অসুবিধাগুলি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কেন্দ্র তো বটেই এমনকি রাজ্য সরকারগুলিও এ বিষয়ে কোনও উদ্যোগই নিচ্ছে না। অথচ প্রতিবন্ধকতা তো বটেই সঙ্গে স্বাস্থ্য, জরুরি অবস্থাকালীন পরিস্থিতি এগুলি তো ‘স্টেট সাবজেক্ট’। সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা প্রিয়াঙ্কা দে – “করোনা-র সংক্রমণ এড়াতে বলা হচ্ছে বয়স্ক মানুষদের, তাঁদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। আমার গৃহ সহায়ক আসছেন না। আমার পক্ষে একা বেরোনো সম্ভব নয়। ফলে বাড়ির বাজার-দোকান, ওষুধ, অত্যাবশকীয় জিনিসপত্র আনতে আমার মা, বাবাকেই বাধ্য হয়ে বেরোতে হচ্ছে। এর দায় কার? প্রতিবন্ধী মানুষদের সহায়ক হিসাবে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা এ সময়ে আসার জন্য কার্ফু পাস পেতে পারেন, কিন্তু সে বিষয়ে কারওর কাছেই কোনও সঠিক তথ্য নেই আর পাস পেলেও কে কীভাবে আসবেন?” প্রিয়াঙ্কা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার জন্য হুইলচেয়ার-আবদ্ধ। তিনি নিজের ও বাড়ির বেশ কিছু কাজ একা করতে সক্ষম। কিন্তু তার জন্য তাঁকে অনেকটা বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। এখনকার পরিস্থিতিতে কাজ বেড়ে যাওয়ায় পরিশ্রম ও সময় বেশি লাগছে এবং তিনি ক্লান্তও হয়ে পড়ছেন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ করতে হচ্ছে, যেক্ষেত্রে তিনি জানালেন, ‘মনঃসংযোগের সমস্যা হচ্ছে’।

 

সমস্যাটা এখানেই। সরকার থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাহিদা অনুযায়ী কোনও সমস্যা সমাধানের কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি লকডাউন ঘোষনা বা জরুরি অবস্থার আলোচনাতেও প্রাথমিকভাবে তাদের কোনও উল্লেখই নেই। প্রিয়াঙ্কা নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বললেন, তিনি এই আপদকালীন সময়ে প্রতিবন্ধীদের সমস্যা সমাধানে স্থানীয় প্রশাসন কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে কি না জানতে স্থানীয় পুলিস থানায় ফোন করেন ও সেখান থেকে বারেবারেই তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয় তাঁর খাওয়ার কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না! বাকি আর কোনও সমস্যার কথা জানতেও চাওয়া হয়নি। এমনকি করোনা হেল্প লাইন-এও আলাদা করে প্রতিবন্ধীদের জন্য কোনও নোটিফিকেশন নেই। লকডাউন-এর ফলে আতঙ্কিত হয়ে আর্থিকভাবে যাদের পক্ষে সম্ভব তাঁরা খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত করছেন। কিন্তু বহু প্রতিবন্ধী মানুষ ও তাদের পরিবারের পক্ষেই অর্থনৈতিক, শারীরিক নানা কারণে তা সম্ভব নয়। শহরে যাঁদের বাস ও অনলাইন কিনতে যাঁরা সক্ষম, এখন সেই পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে তাঁরাও সমস্যায় পড়েছেন। সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিবন্ধী মানুষদের কাছে গৃহবন্দী অবস্থার মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় খাদ্য, ওষুধ ও অত্যাবশকীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কোনও পরিকল্পনা বা উদ্যোগ সরকার নেয়নি। প্রিয়াঙ্কা প্রশ্ন তুললেন – “এই কাজটা স্থানীয় কাউন্সিলর বা এমএলএ-রা করছেন না কেন? কেন তাঁদের এলাকার প্রতিবন্ধী মানুষদের কোনও তালিকা তাঁদের কাছে নেই? প্রতিবন্ধী কমিশনের ভূমিকাটাই বা ঠিক কি এই মুহূর্তে? এইরকম জরুরি অবস্থাকালীন সময়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় যে কমিটিগুলি তৈরি হয় সেখানে প্রতিবন্ধী মানুষদের সমস্যাগুলি তুলে ধরার জন্য কোনও প্রতিবন্ধী মানুষ প্রতিনিধি হিসাবে আদৌ থাকেন কি?” এই পরিস্থিতি সত্যিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় জনসংখ্যার একটা বড় অংশকে রাষ্ট্র কীভাবে স্রেফ উপেক্ষা করতে পারে, না-দেখা করে রেখে দিতে পারে, চরম বিপদের দিনেও!

 

এমনকি শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ-এ করোনা মোকাবিলার কোনও নির্দেশ দেওয়ার ব্যবস্থা হয়নি। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য কোনও ‘অডিও’ নির্দেশনামার ব্যবস্থাও নেই। শুধুমাত্র কেরালার মুখ্যমন্ত্রীর সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ‘অফিশিয়াল পেজ’ সেখানে সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ-এ এই নির্দেশগুলি দেওয়া রয়েছে। সারা দেশে এই একটিমাত্র রাজ্যই ব্যতিক্রম। কেরালা ও দিল্লী সরকারই এখনও পর্যন্ত প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রাপ্য ভাতা দু’মাসের আগাম দেবে বলে ঘোষনা করেছে। এই যে একটি অসুস্থতা, সংক্রামক ব্যধি, মহামারী বিষয়ে জরুরি তথ্য প্রতিবন্ধী মানুষদের কাছে ‘অ্যাকসিসেবল্‌’ না হওয়া, তাঁরা বঞ্চিত থাকাও এক রকমভাবে তাঁদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হওয়া।

 

প্রতিবন্ধী মানুষ ও তাঁদের পরিবার আরও যে বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত যে, তাঁরা যদি কোনওভাবে সংক্রমণের শিকার হন তাহলে তাঁদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার মতো পরিকাঠামো কি আদৌ আছে? অনেক প্রতিবন্ধী মানুষই আংশিক বা পুরোপুরি কেয়ার গিভার-দের উপর নির্ভরশীল। এধরনের ‘আইসোলেশন’-এ রেখে চিকিৎসা করতে গেলে তাঁদের বিভিন্ন চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করোনা-র জন্য বিশেষভাবে তৈরি হওয়া চিকিৎসাকেন্দ্রগুলিতে রয়েছে কি না সে বিষয়ে কোনও তথ্যই কেউ জানেন না। করোনা ছাড়াও কোনও রকম আপৎকালীন চিকিৎসার জন্যও প্রতিবন্ধী-বান্ধব প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিকাঠামো রয়েছে কি না তা নিয়েও তাঁদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

 

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ঈশান চক্রবর্তী। দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি তাঁর রয়েছে আংশিক শ্রবণ প্রতিবন্ধকতাও। সেইসঙ্গে শরীরের বাঁ দিকে তাঁর কিঞ্চিৎ প্যারালিটিক প্রবণতা রয়েছে, যাঁরজন্য তাঁর নিয়মিত ফিজিওথেরাপি প্রয়োজন হয়। ফিজিওথেরাপিস্ট আসতে না পারায় ইতিমধ্যেই বূজতে পারছেন কিছুটা খুঁড়িয়ে হাঁটতে হচ্ছে। শুধু প্রতিবন্ধকতাই নয়, নিজের পরিবারের উদাহরণ দিয়ে বলছিলেন বরিষ্ঠ মানুষেরাও কী নিদারুণ সমস্যার মধ্যে পড়ছেন। “এই রকম পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র তার সীমা’টা ভুলে যায়। লকডাউন-এর নামে চারপাশে যে ‘ব্রুটাল ভায়োলেন্স’ চলছে তা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। বলা হচ্ছে এখন প্যানিক করবেন না। বুঝতে হবে আমাদের মতো পরিস্থিতিতে প্যানিক-টা অনেক ক্ষেত্রেই চয়েজ নয়, একটা সাইড এফেক্ট, পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া যা আমরা এড়াতে পারব না।” ঈশানের শুধু শারীরিক প্রতিবন্ধকতাই নয়, রয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সমস্যাও। জানালেন, একটা দীর্ঘ সময় এরজন্য চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ওষুধও খেতে হয়েছে। এই আচমকা লকডাউন, বাধ্যতামূলক গৃহবন্দীত্ব, পেশাগত জীবনে ছেদ পড়া, পছন্দের কাজকর্ম করতে না পারা ও সেইসঙ্গে সুস্থতা বিষয়ক চিন্তায় ‘ডিপ্রেসন’ আবারও বেড়ে যাচ্ছে। যেহেতু দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য যে রিডার ও রাইটার-রা কাজ করেন তাঁরাও কেউই আসতে পারছেন না, তাই ঈশানের মতো অনেকেরই পড়াশোনা, লেখালেখি ইত্যাদি করে মানসিকভাবে নিজেদের ব্যস্ত রাখাও সম্ভব হচ্ছে না। সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম-এ কোভিড ১৯ নিয়ে আলোচনা, ফোন-এ বেশিক্ষণ কথা বলতে না পারা ইত্যাদি নানা কারণেই মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতির মধ্যে পড়তে হচ্ছে ঈশানের মতো আরও অনেককেই।

 

অধ্যাপক হিসাবে ঈশান স্পষ্টতই জানালেন এই পরিস্থিতিতে তিনি অনলাইন ক্লাস নেওয়ার পক্ষপাতী নন। প্রথমত, বিভিন্ন পরিষেবা ও উপযুক্ত পরিবেশ না থাকার কারণে তাঁর নিজের মানসিক স্বাস্থ্য ও মনঃসংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে অনেক সময়েই তিনি অনলাইন-এ ক্লাস নেওয়ার মতো অবস্থায় থাকছেন না। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অনেক ছাত্রছাত্রীর কাছেই এরকম সময়ে অনলাইন-এ পড়ার মতো ব্যবস্থা না-ও থাকতে পারে, শিক্ষক হিসাবে সে দিকটিও তিনি ভাবতে চান। ইন্টারনেট পাওয়া, নেট রিচার্জ করা, অনলাইন পড়া ইত্যাদিও প্রতিবন্ধী, অ-প্রতিবন্ধী নির্বিশেষে এখন বাস্তব সমস্যা। তাঁর বক্তব্য, “কেন্দ্র, রাজ্য সব সরকারই করোনার সময়ে স্পেকটাকল তৈরিতে ব্যস্ত। অথচ প্রতিবন্ধী মানুষদের সমস্যা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র নজর দেওয়া হচ্ছে না।”

 

ঈশানের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গেই উঠে এল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাঁর প্রাথমিক কেয়ার গিভার তাঁর মা। বাইরে পেশাগত কারণে বা ব্যক্তিগত সময় কাটাতে বেরোনো এখন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর দেখভালের জন্য অনেক বেশি সময় তাঁর মা-কে দিতে হচ্ছে। সেইসঙ্গে তাঁকে বাড়িরও যাবতীয় কাজ সামলাতে হচ্ছে (যেহেতু ঈশানের বাবা অত্যাবশকীয় পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত তাঁকে কর্মক্ষেত্রে যেতে হচ্ছে।) এই সবটা মিলিয়ে শারীরিক, মানসিক ও আবেগজনিত এক অস্বাভাবিক চাপ সামলাতে হচ্ছে তাঁর মা-কে। সেইসঙ্গে যুক্ত হয়েছে উদ্বেগ – যদি তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন তাহলে ছেলেকে কে সামলাবে বা ছেলে অসুস্থ হলে কীভাবে তা সামলানো যাবে? তাঁর মা প্রতিবন্ধী সন্তানদের অভিভাবকদের একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, সেখানেও চলছে দুশ্চিন্তার আলোচনা, লকডাউনের কারণে অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, ফলে মেজাজের উপর প্রভাব পড়ছে। ঈশান বললেন, “আসলে পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোয় আমি তো সুবিধাভোগী অবস্থানে এমনিই রয়েছি। তার উপরে আমি কিছু কাজ নিজে করতে পারলেও, সমাজ অনেক সময়ে তা মেনে নিতে পারে না – অন্ধ ছেলে বাসন মাজছে দেখতে অভ্যস্ত নয় তাঁরা।”

 

একজন বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধী সন্তানের মা ও প্রতিবন্ধী সন্তানদের একটি সংগঠনের মুখ্য হিসাবে বহ্নি ভট্টাচার্য বেশ কয়েকটি সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। বহ্নির মেয়ে বেশ কিছু নিজস্ব ও বাড়ির কাজ নিজে করতে পারেন। কিন্তু তাঁর শিক্ষক বাড়িতে আসা বন্ধ হয়ে গেছে, প্রতিদিনের বিকেলে মায়ের সঙ্গে তাঁর বাজারে যাওয়ার রুটিন’টিও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। বারবার তার কারণ জিজ্ঞেস করছেন। কিছুটা বুঝিয়ে বললেও বেশিক্ষণ মনে রাখতে পারছেন না ও আবার পরের দিন যাওয়ার কথা বলছেন। তাঁকে মানসিকভাবে ব্যস্ত রাখার জন্য বাড়িতে তাঁর পছন্দ মতো একটি খাবার তৈরি করা হচ্ছে ও তাতে তাঁকেও সাহায্য করতে বলা হচ্ছে। বুঝিয়ে বলার কারণে বহ্নির মেয়ে এখনও পর্যন্ত সহযোগিতা করছেন। কিন্তু লকডাউন অনিশ্চিতকালের জন্য চললে কি হতে পারে তা বুঝে পরিকল্পনা করতে চান বহ্নি। সংগঠন মুখ্য হিসাবে তিনি জানালেন, অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগে বুঝতে পারছেন বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধী প্রতিটি শিশু-কিশোরই অত্যন্ত হাইপার হয়ে উঠছে। অভিভাবকদের নানারকম অনলাইন মেটেরিয়াল, ভিডিও পাঠিয়ে, ভিডিও কল করে অভিভাবকদের আলোচনার মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছে এরকম পরিস্থিতি কিভাবে সামলানো যেতে পারে। “এই বাচ্চারা বছরের নির্দিষ্ট ছুটির বিষয়গুলি জানে, বোঝে। কিন্তু এই যে আচমকা সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়া এটা বুঝতে বা মেনে নিতে পারছে না। বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধীদেরই এই সময়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যা। স্কুলে, থেরাপি সেশনে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যাদের ‘আর্লি ইন্টারভেনশন’ দরকার হয় তাঁরাও সেই পরিচর্যা পাচ্ছে না, ফলে তাঁদের যে মানসিক বৃদ্ধি/উন্নতি তা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি কেটে গেলে আমরা জানি না কী অবস্থায় আমরা এঁদের আবার পাব। এই বিপদের সময়ে আমাদের এই যে বিরাট প্রতিবন্ধী পরিবার এর কথা রাষ্ট্র ভুলে গেল কীভাবে?”

 

নিঃসন্দেহে বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধী মানুষদের এই সময়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যা, কারণ তাঁরা পরিস্থিতিটি বুঝতে পারছেন না। তাছাড়া তাঁরা কেয়ার গিভার-দের উপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল হন। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হওয়ায় তাঁদের ও তাঁদের অভিভাবকদের দৈনন্দিন জীবন প্রায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। এমন অনেক অভিভাবক রয়েছেন যাঁরা বরিষ্ঠ অভিভাবক বা প্রায় সেই বয়স ছুঁয়েছেন। এরকম বিপর্যয়ের সময়ে নিজেদের সন্তানদের নিয়ে তাঁরা কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। শারীরিকভাবে তাঁরা নিজেরাই কখনও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। প্রতিবন্ধী সন্তানের খেয়াল রাখা, বাড়ির কাজ, অত্যাবশকীয় সামগ্রী ও ওষুধ কিনতে বাইরে যাওয়া – এই সবটা সামলানো ক্রমেই অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এধরনের প্রতিবন্ধী মানুষদের অনেকজ সময়েই মৃগীরোগ-প্রতিরোধ বা পেশিকে শিথিল করে আরাম দেবে এমন ওষুধ প্রয়োজন হয় – এখন বাজারে যার সরবরাহে টান পড়ছে। ওষুধ খুঁজে আনার জন্য সন্তানকে বাড়িতে বন্ধ করে দুই অভিভাবককেই বেরোতে হচ্ছে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সেরিব্রাল পলসি-র পক্ষ থেকে স্বাতী চক্রবর্তী জানালেন, “আমরা এখানে একটি রেসপাইট সেন্টার চালাই। যেখানে অভিভাবকদের কোনও সমস্যা হলে কিছুদিনের জন্য সন্তানদের রাখা হয়। আচমকা লকডাউন হওয়ায় বেশ কিছু বাচ্চা এখানে আটকে আছে, কর্মীরাও আটকে পড়েছেন, অভিভাবকেরা আসতে পারছেন না। অদ্ভূত পরিস্থিতি। বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধীরা যেহেতু লকডাউন বুঝতে পারছেন না ফলে বিরক্ত হয়ে পড়ছেন, তাঁদের স্কুল বা কোনও প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার রুটিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এক ধরনের ট্রমায় চলে যাচ্ছেন। চেনা অভ্যাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের মনের উপর, খাওয়া, ঘুমের মতো প্রয়োজনীয় বিষয় প্রভাবিত হচ্ছে। কেয়ার গিভার-রা জানেন ঠিক কি ধরনের অ্যাক্টিভিটি দিয়ে তাদের রাখা যায়, অভিভাবকেরা এই বিষয়গুলিতে অনেক সময়েই দক্ষ হন না। ফলে এখন তাঁরাও কোনও উপায় বের করতে পারছেন না। অনেক প্রতিবন্ধী সন্তান যারা বিষয়টি একটু বুঝছেন তারা অভিভাবকদের উপরে নির্ভরশীল হলে তাঁদের নিয়ে অত্যধিক উদ্বেগে ভুগছেন। এই লকডাউন পরিস্থিতি কীভাবে সামলানো যাবে ও এর শেষে কীভাবে এই ট্রমা কাটিয়ে উঠিয়ে সন্তান ও অভিভাবক অভ্যস্ত জীবনে ফিরবেন তা এক বিরাট প্রশ্ন।” স্বাতী ও আরও বন্ধুরা নিজেদের উদ্যোগে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিবন্ধী ও বরিষ্ঠ নাগরিকদের জন্য হেল্পলাইন শুরু করছেন।

 

প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের দীর্ঘদিনের কর্মী শম্পা সেনগুপ্ত-র মতে এই পুরো বিষয়টিকে সামাজিক, অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করতে হবে। তাঁর মতে, “এ ধরনের পরিস্থিতিতে শহরের নাগরিক জীবনে বিভিন্ন ধরনের পরিষেবা পাওয়া প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা সব সময়েই বেশি থাকে। তুলনায় গ্রামের মানুষদের অসুবিধা কম, কারণ এমনিতেই তাঁদের কাছে অধিকাংশ প্রয়োজনীয় পরিষেবা পৌঁছায়ই না। এই জরুরি অবস্থায় বহু সরকারি হোম বন্ধ হয়ে গেছে। গৃহহীন, ভবঘুরে মানুষ, মানসিক প্রতিবন্ধী, প্রতিবন্ধী নারীরা এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যা ও বিপদের মধ্যে পড়ে যান, যার সমাধানে রাষ্ট্র কোনও পদক্ষেপই নিচ্ছে না। প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য এই সময়টা যেভাবে প্রচার করা হচ্ছে ‘ফ্যামিলি বন্ডিং টাইম’ হিসাবে তা না-ই হতে পারে। কারণ – কেয়ার গিভারদের অনুপস্থিতি, অভিভাবক বা পরিবারের কেউ কেয়ার গিভার হলে তাঁদের দিশাহারা অবস্থা। মানসিক স্বাস্থ্য এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই সময়টি তো পেরিয়ে যাবে, কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য কতদিনে ঠিক হবে তা বোঝা মুশকিল। একমাত্র কেরালা সরকার এই পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য হেল্পলাইন চালু করেছে।” বিভিন্ন বয়সের প্রতিবন্ধী মানুষদের উপর এর আলাদা প্রভাব পড়বে এবং তা কাটিয়ে ওঠাও সময় ও পরিশ্রমসাপেক্ষ বিষয়।

 

এ দেশের অনেক প্রতিবন্ধী মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাস করেন। বহু প্রতিবন্ধী মানুষ তাঁদের সংসারে একমাত্র উপার্জনকারী। সেইসব মানুষ ও তাঁদের পরিবার আজ চূড়ান্ত অসহায়তা ও সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। এই রাষ্ট্রব্যবস্থা করোনা সংক্রমনের আতঙ্ককে কাজে লাগিয়ে পুঁজিবাদ ও ধনতন্ত্রের স্বার্থসিদ্ধিকেই বাড়িয়ে চলেছে। সেখানে প্রতিবন্ধী মানুষেরা সব সময়েই উপেক্ষিত। তবে বরাবরের মতোই নিজেদের অধিকারের দাবীতে তাঁরা এই বিপদকালীন পরিস্থিতিতেও সোচ্চার ও ঐক্যবদ্ধ, যা মহামারীর দুঃসময়েও দাবী আদায়ের আন্দোলনকে কুর্নিশ করতে বাধ্য করে।

 

 

লেখক ডকুমেন্টারি নির্মাতা এবং স্বতন্ত্র সাংবাদিক 

 

Share this
Leave a Comment