জেল জেলেই আছে। থানা থানাতেই। লালবাড়িই হোক কিংবা… (চলছে)


  • March 20, 2020
  • (0 Comments)
  • 97 Views

জেল জেলেই আছে। থানা থানাতেই। লালবাড়িই হোক কিংবা নীল-সাদা, ঐতিহ্য হারায়নি কেউ। একটা আপাদমস্তক নিষ্ঠুর ও দুর্নীতিপরায়ণ আইনি ও বিচার ব্যবস্থা যা মূলত দাঁড়িয়ে রয়েছে পুলিশ-আইনজীবী, পেশাদার সমাজবিরোধী ও রাজনীতিকদের চারটি ঠ্যাঙের উপর – সেখানে মানুষ যে এক মর্যাদাহীন অবমানবে পরিণত হবে এ কথা বুঝতে অতিরিক্ত কোনও জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না। তবে, জেল-সাহিত্য বার বার এই মানহীন মানুষদের কালশিটে পড়া, ছাল-চামড়াহীন শরীর ও মনকে আমাদের সামনে হাজির করেছে। জুবি সাহার জেল ডায়েরি’ সেই ইতর ব্যবস্থাটির আর এক উলঙ্গ রূপ।  পর্ব ১ ও ২ এই লিঙ্কে 

 

পর্ব ৩

 

লালবাজারের দিনগুলো তো কেটে গেল। এরপর একদিন সকালে আবার বেরিয়ে কোর্টে গেলাম। যাওয়ার পথে আবার মেডিকেল চেকআপ হলো। আবার আমার কমরেডদের সাথে কাটানোর সুযোগ পেলাম। অল্প সময়ে কত যে কথা বললাম, হাসি-ঠাট্টা, গান – সবই করলাম ওইটুকু সময়ে। ভগৎ সিং-এর একটা গান গাইতে গাইতে কোর্টে ঢুকলাম। এবারেও কাছের মানুষদের মুখগুলো বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে দিল। লকআপে ওইদিন একাই ছিলাম। ধীরে ধীরে মনকে শান্ত করলাম। অপেক্ষা করতে লাগলাম, কেউ যদি দেখা করতে আসে তার জন্য। অনেকক্ষণ বাদে আমাদের আইনজীবী দেখা করতে এলেন। কিছু বাইরের খবর পেলাম। শুনলাম, বিচারকের সামনে বিজেপির আইনজীবীরা এমন ঝামেলা করেছে, যাতে বিচারক বিরক্ত হয়ে কিছুক্ষণের জন্য ঘর ছেড়ে উঠে চলে গিয়েছিলেন। যাই হোক, দিনের শেষে আমাদের আবার চার দিনের জেল কাস্টডি হল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর গাড়ি এল। আমাকে একটা গাড়িতে করে আলিপুর মহিলা সেন্ট্রাল জেলে আর বাকিদের প্রেসিডেন্সি সেন্ট্রাল জেলে নিয়ে যাওয়া হল।

 

লকআপ থেকে বেরোনোর সময় একটু কেঁদে ফেলেছিলাম, কারণ বেরোনোর সময় আমার হাতে একটা কাগজে মোড়া রোল করা একটা জিনিস ধরানো হয়েছিল। কিছু রুটি আর পেঁয়াজ ছিল ওর মধ্যে। আমায় বলা হয়েছিল যে, আজ আর জেলে গিয়ে কিছু পাবে না, এটা রাতের খাবার। শক্ত করে ধরেছিলাম প্যাকেটটা। বাইরে এতজন কাছের মানুষ এভাবে হাত বাড়িয়ে আছে, সেই হাতগুলো একবার স্পর্শ করতে পারছি না আর হাতে ধরা আছে নতুন ঠিকানার খাবার। সেই নতুন ঠিকানা কেমন হবে কে জানে? সব মিলিয়ে খানিকটা ঘেঁটে গেছিলাম সাময়িক ভাবে, তাই কেঁদে ফেলেছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই জেলগেটে পৌঁছে গেলাম। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করার পর গেট খুলল। বিরাট সাইজের গেট আর তেমন যোগ্য তালা-চাবি। আবার প্রশ্ন, ‘কটা এলো?’, ‘একটা।’ গেটের ভেতরে ঢুকে অনেক ধরনের কাজ থাকে। প্রায় দশবার নাম, ঠিকানা, বাবার নাম ইত্যাদি বলে যেতে হল। তারপর জেলারের কিছু কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তর দিতে হলো। তাঁর স্বামীও নাকি যাদবপুরে পড়তেন, এসএফআই করতেন, অনেক আন্দোলন-টান্দোলন করেছেন, কিন্তু এখন বিশ্বাস করেন এভাবে কিছু হয় না। তারপর পাশের একটা খুপরিতে নিয়ে গিয়ে সার্চ করা হল। না, জামাকাপড় খুলতে বলা হয়নি কিন্তু অত্যন্ত বিশ্রীভাবে গায়ে হাত দিয়ে সার্চ করা হল। যিনি সার্চ করেন, তিনিও একজন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দি (যদিও এটা পরে জেনেছি)। এঁরাই জেলের ভেতরের পরিশ্রমের সমস্ত কাজ করেন এবং অন্য বন্দীদের ওপর কর্তৃত্ব করেন। পুলিশ শুধু নজরদারি চালায়।

 

প্রথম দিন আমার ঠিকানা হল পাঁচ নম্বর ঘরে আমদানি ওয়ার্ড। একটা লম্বাটে ঘর। সেখানে প্রায় পনেরো-ষোলো জন আছেন। প্রথম দিন সবাইকে এই ঘরেই উঠতে হয়। সেদিন আমার সাথে আরেকজন মহিলা প্রথম এসেছেন, বাকিরা পুরনো। নতুন মহিলার বাড়ি সুন্দরবনের দিকে। ওঁর স্বামী দিনে দু’বোতল চোলাই এনে দিত আর সেটাই উনি ছোট ছোট প্যাকেটে বিক্রি করতেন। দিনে ৯০ টাকা দামের দু’বোতল চোলাই বিক্রি হত। কে কোথা থেকে খবর দিয়ে দিয়েছে আর পুলিশ তুলে নিয়ে চলে এসেছে, কবে কিভাবে ছাড়া পাবেন কিচ্ছু জানেন না। বেচারির শরীর এতটাই শীর্ণ ছিল যে কাঁদবার মত ক্ষমতাও ছিল না, চোখ মুখ ফ্যাকাসে করে বসে থাকতেন।

 

প্রথম দিন যাওয়ার পরই সবাই আমাকে কি কেস জিজ্ঞেস করতে এল। আমি সব খুলে বললাম, শুনে সবাই হাঁ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। জেলের সব ওয়ার্ডের মেন্টররাই মোটামুটি যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দি। আমদানি ওয়ার্ডের মেন্টর তো আমায় খুব আদরযত্ন করলেন। উনিও বধূহত্যা কেসে সাজাপ্রাপ্ত। ওঁর দেওয়া সাবান, শ্যাম্পু দিয়ে স্নান করতে দিয়ে ওঁরই নাইটি পরতে দিলেন। জেলের রুটি ফেলে দিয়ে বললেন, ‘ভাত আছে, আমাদের সাথে খেয়ে নেবে এসো।’ জেলে প্রত্যেক বন্দিকে দুটো কম্বল, একটি অ্যালুমিনিয়ামের থালা এবং গ্লাস দেওয়া হয়। আমার থালাটা ফুটো ছিল, মেন্টরদিদি সেটা আবার পাল্টে দিলেন। সন্ধ্যেবেলা গুনতি হল। এভাবে দিনে পাঁচবার গুনতি হয়। সকাল ছটায়, নটায়, দুপুর বারোটা, তিনটে এবং সন্ধে ছটায়। গুনতির দশ মিনিট আগে থেকে প্রত্যেককে তার নির্দিষ্ট ঘরে এসে ঠিকঠাকভাবে বসে থাকতে হয়। পুলিশ আসার পর যদি দেরি বা ডিসঅর্ডার দেখে, তাহলেই লাঠি চালায়।

 

আমদানি ওয়ার্ডে একটি মেয়ে ছিল, বাংলাদেশী, বর্ডার পার হতে গিয়ে ধরা পড়েছে তিন সন্তানকে নিয়ে। কোলের শিশুটি মাস তিনেকের, আর বড় দুটি ওই দুই-তিন বছরের হবে, অপুষ্ট, রোগা লিকলিকে পায়ে হাঁটতে যায় আর দুমদাম পড়ে যায়। মেয়েটির বুকে দুধ হত কিন্তু কোলের বাচ্চা টেনে খেতে পারত না। চুড়িদার সব সময় ভিজে থাকত, রাতে যন্ত্রণায় কাতরাত, বাচ্চাটাকে জোর করে দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করত কিন্তু তারই বা আর দম কত! আর বড় দুটির জন্য জেল থেকে দুধ দিত। জলমেশানো হাফগ্লাস মতো দুধ হবে, তাই পরমানন্দে চেটেপুটে খেত।

 

এই ওয়ার্ডেই সবচেয়ে বয়স্কা ছিলেন গঙ্গা। সবাই তাঁকে ওই নামেই ডাকতো। ইন্দির ঠাকরুনের মত চেহারা। বয়স কত বলতে পারেন না, তবে সত্তরের কাছাকাছি হবে। ওঁর জামিন মঞ্জুর হয়ে গেছে। তিন হাজার টাকা দিতে হবে, বাড়ির কেউ সেই টাকা দেয়নি, তাই জেল থেকে বেরোনো হয় নি। এখন তিনি এখান থেকে আর যেতে চান না, কারণ এখানে লোকজন, থাকার জায়গা, দুবেলা খাবার আছে, বাইরে তো তাও নেই। মুক্তির তুলনায় এগুলোই আজকে তাঁর বেশি প্রয়োজন। এখানে সবাইকে খুব ভালোবাসেন আর ফিকফিক করে ফোকলা দাঁতে হাসতে থাকেন।

 

সেদিন রাতটা মনে হচ্ছিল একটু ভালো করে ঘুম হবে কারণ এখানে ঘরে সিসিটিভি নেই। কিন্তু মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল, দেখলাম পুলিশ এসে গোটা ঘর তছনছ করে দিয়েছে। জেল বাউন্ডারির মধ্যে নাকি একটা সিমের ভাঙা অংশ পাওয়া গেছে। তাই অতর্কিতে এভাবে তল্লাশি করা হচ্ছে। যার উপর খুশি লাঠি চালানো হলো। তারপর বারান্দায় সবাইকে লাইন দিয়ে বসানো হল। গোটা শরীরে এলোপাথাড়ি হাত চালানো হল। ঘরের সমস্ত জিনিস জুতো দিয়ে, লাথি মেরে পুরো লন্ডভন্ড করে দিল। কারোর সাবান গুঁড়ো কৌটো থেকে ঢেলে দিল, কারোর চিনির কৌটো উলটে দিল। ওয়ার্ডের কয়েকজন ‘পালা’ করতে যেতেন, অর্থাৎ এনজিওর সহযোগিতায় বাইরে নাটক করতে যেতেন। তাঁদের একটু বেশি জিনিসপত্র থাকতো। ‘জেলে এত কেন জিনিস থাকবে’ বলে কিছু জিনিস হঠাৎ পুলিশ টানতে টানতে নিয়ে চলে গেল। পরে জানতে পারলাম এরকম নাকি মাঝেমধ্যেই হয়। আদৌ কোথাও কোনো সিম পাওয়া গেছে কিনা তা কেউ জানে না, কিন্তু এই অজুহাতে এই অত্যাচার চলে। যাই হোক সেদিন রাতটা ঘুমিয়ে পড়লাম।

 

পরেরদিন সকালে গুনতির পর বাইরে বেরোলাম। দেখলাম এক জায়গায় পেপার এসেছে। সেখানে অনেকে ভিড় করে বসে আছে। চোলাই কেসের সেই মাসিমা আর আমি – দুই নবাগতা ধীরে ধীরে সেদিকে এগিয়ে গেলাম। যাওয়ার আগে মনে হচ্ছিল প্রথম দিন এতজনের মাঝে পেপার পড়ার চান্স পাবো কিনা কে জানে। গিয়ে দেখলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি ঘুরে গেল। আমার হাতে প্রায় সব কটা পেপার চলে এল, আর মহিলারা আমাকে ঘিরে বসে থাকলেন। ওখানে সবাই এতক্ষণ ছবি দেখছিলেন, টুকটাক অক্ষর পরিচয় থাকলে ছবির নিচের ক্যাপশনটা পড়ছিলেন। আমি ওদের খবরগুলো পড়ে শোনালাম আর মুগ্ধ দৃষ্টিতে সবাই শুনলেন। হঠাৎ একজন কর্মী এসে ‘এতক্ষণ পেপার পড়া যাবে না’ – এই বলে পেপারগুলো নিয়ে চলে গেল।

 

কিছুক্ষণ পর আবার নামধাম লেখার ডাক এল। ডাক্তারের কাছে যেতে হল। জেলের ডাক্তার ছিলেন অত্যন্ত ভালো মানুষ। প্রথমত বন্দিদের সাথে খুব ভালো ব্যবহার করেন, কি সমস্যা আছে ভালোভাবে শোনেন, আমার সাথেও অনেক গল্প করলেন – রাজনৈতিক বিষয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে কথা বললেন। বন্দি ছাড়া এই প্রথম কারো সাথে কথা বলে বেশ ভালো লাগলো।

 

বেরিয়ে এসে গুনতির পর জেল চত্বর ঘুরে ফিরে দেখতে লাগলাম। ভেতরে একটা বড় পুকুর আছে – তখন জল ছিল না, মেয়েরা পুকুর পাড়ে শাক তুলছে, তাই দিয়ে জেলে রান্না হত। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নাম-সংকীর্তন চলছে, আবার কোথাও ঠাকুরের মূর্তির সামনে আঁচল পেতে কেউ ফাটানো চিৎকার করে কাঁদছে। যে মুসলিম বন্দীরা ছিলেন, বিশেষত বাংলাদেশীরা, তাঁরা অদ্ভুত সুরে কোরান-হাদিস পড়তেন, সকালে ঘুম ভাঙার পরেও আমি চুপচাপ শুয়ে সেই সুর শুনতাম। কেমন যেন ঘোর এসে যেত।

 

দ্বিতীয় দিন আরেকজনের সাথে আলাপ হলো। তিনিও সেদিনই এসেছেন, বাহাত্তর বছর বয়স, দুই ছেলে ইঞ্জিনিয়ার, পেপারে বিজ্ঞাপন দিয়ে বড় ছেলের জন্য পাত্রী খোঁজা হয়েছিল, কিন্তু কিছুতেই বনিবনা হচ্ছিল না। বাপের বাড়িতেই থাকতো ছেলের বউ, ছেলেও সেখানেই চলে গিয়েছিল, তবু অসুস্থ বাবা-মাকে দেখতে এলেও ঝামেলা হতো। তারপর হঠাৎ সে একদিন বাপের বাড়িতেই সুইসাইড করে। পুলিশ রাত এগারোটার সময় বৃদ্ধাকে তুলে এনেছে। তাঁর স্বামীকেও আনতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি এতটাই অসুস্থ যে পুলিশ গাড়িতে তুলতে পারেনি। স্বামী এখনো বেঁচে আছেন কিনা, কেউ এসে একটু খাবার দিয়ে যাবে কিনা, ওষুধ খেতে পারবেন কিনা – কিচ্ছু জানেন না। শুধু ভরসা ছিল, ছোট ছেলে বাইরে থাকে, খবর পেয়ে এলে নিশ্চয়ই সব ঠিক হয়ে যাবে। এই বৃদ্ধাকে সিকরুমে রাখা হয়েছিল।

 

দ্বিতীয় দিন আমার ঘর পরিবর্তন হল। আপাতত এখানেই আমাকে থাকতে হবে। এই ঘরে বাংলাদেশের চারজন বন্দী, তার মধ্যে একজন বর্ধমানের একটি ছেলেকে ভালোবেসেছিল, দেখা করতে এসে গ্রেপ্তার হয়েছে। সেই ছেলেটি আর তেমন কোনো খোঁজখবর রাখে না। একটি বাচ্চা মেয়ের সাথে আমার খুব ভাব হয়ে গেছিল। প্রচণ্ড বুদ্ধিমান – মুখে মুখে কোনো ছড়া বললে মুখস্থ করে নিত। স্কুলে যেতে চাইত, কিন্তু ওর মা যেতে দিত না। কারণ জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, ওঁরা বাংলাদেশী, কিন্তু বাচ্চাটার বাবা বিহারের দিকে কাজ করে, ওখানকারই বাসিন্দা। স্বামীর সাথে দেখা করতে এসে বর্ডার থেকে তিন সন্তানসহ এই ভদ্রমহিলা অ্যারেস্ট হন। প্রথম দুই সন্তান ছেলে এবং মেয়ে হওয়ার জন্য দু’জন দু’টি আলাদা হোমে আছে। ছোট মেয়েটির বয়স সাত বছরের কম হবার কারণে মায়ের কাছে থাকার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু এখন মেয়েটির বয়স সাত পেরিয়ে গেছে। জেল কর্তৃপক্ষের নজরে এখনো আসে নি, কিন্তু স্কুলে গেলেই বয়স ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে আর তখনই এই মেয়েকেও অন্য কোন হোমে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। অর্থাৎ পরিবারের পাঁচ জনের ঠিকানা হবে পাঁচ রকম। সেই আতঙ্কে এই ভদ্রমহিলা নিষ্ঠুরভাবে মেয়েকে স্কুলের চৌহদ্দি মাড়াতে দেন না। এমনকি পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি করার কারণে আমার ওপরেও রেগে গিয়েছিলেন। জেলের স্কুলটিতে প্রায় ষাট জন বাচ্চা পড়ে, যাদের সবার বয়স সাতের কম। স্কুলে পড়াশোনা নামমাত্র হয়, তবে দুধ আর ডিম পাওয়া যায়। মহিলা জেলের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ বাচ্চা। অনেকের জন্ম এখানেই হয়েছে।

 

খাগড়াগড় বিস্ফোরণ কান্ডে অভিযুক্ত দুজন বন্দি আছেন। তাদের মধ্যে একজন ধরা পড়ার সময় সাত মাসের গর্ভবতী ছিলেন। পুলিশ লকআপে তাঁর পেট লক্ষ্য করে লাথি মারে, লাঠি চালায়। তাই নিয়ে হাইকোর্টে মামলাও হয়েছিল। কিন্তু ওই ভদ্রমহিলার বিশ্বাস ছিল, ‘আল্লা চাইলে বাচ্চার ক্ষতি করবে কে?’ যাই হোক, আল্লার কৃপায় হোক বা মায়ের যত্নেই হোক, বাচ্চাটি সুস্থ ভাবে জন্ম নিয়েছে। ফুল আঁকা একটা ফ্রক জামা পড়ে জেলের ভেতরে ঘুরে বেড়াতো সে, তবে ওর একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। জেলের ভেতরে ইলেকট্রিশিয়ান, রাজমিস্ত্রি বা যে কোন পুরুষকে দেখলেই মাকে ডেকে বলতো, ‘আম্মু দেখো, ঐ যে বাবা এসেছে।’ এই কথাটা আমাকে বলার সময় মহিলারা খুব হাসাহাসি করছিল আর আমার ভেতরটা মোচড় দিচ্ছিল। ওর মা একদিন আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘তোমরাও ইনসাফের জন্য লড়াই করছো, আমরাও ইনসাফের জন্য, তাই আমাদের জিত হবেই।’

 

(শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মূর্তি ভাঙার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তার তিনটি পর্ব দিলাম আপাতত কিছুদিনের জন্য লেখা বন্ধ রাখছি এখন করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সময় সোশ্যাল নেটওয়ার্ক এই লড়াইয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে করোনামুক্ত পৃথিবীতে বাকি লেখাটা শেয়ার করবো। )

 

… (ক্রমশঃ)

 

জুবি সাহা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিকস এন্ড ইনস্ট্রুমেনটেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রাক্তন ছাত্রী, বর্তমানে একজন রাজনৈতিক কর্মী।

Share this
Leave a Comment