রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতীতে মোতায়েন হবে আধাসেনা, সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের


  • November 13, 2019
  • (1 Comments)
  • 478 Views

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে সিআইএসএফ কেন? এদের দায়িত্ব দেখেই বোঝা যায় এরা জঙ্গী হামলা সামলানোর কাজে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। পড়ুয়াদের আন্দোলনকে কি তবে জঙ্গী কার্যকলাপের সঙ্গে তুলনা করছেন উপাচার্য? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারের বিরুদ্ধ মত প্রকাশ, প্রতিবাদ করার অধিকার আর থাকবে না? সুদর্শনা চক্রবর্তীর রিপোর্ট ।

 

নজিরবিহীনভাবে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস চত্ত্বরে সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্স (সিআইএসএফ) মোতায়েন করা হতে চলেছে। সারা দেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা এই প্রথম। শুধু তাই নয় এই বাহিনীর খরচ চালাতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেই, এমনটাই না কি জানিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। এদিকে মাত্র কিছু দিন আগেই বিশ্ববিদ্যালয় তহবিলে অর্থ সঙ্কটের কথা বলছিলেন উপাচার্য, পড়ুয়াদের ফি কাঠামোয় বদল আনা হয়, তারা আন্দোলন শুরু করলে তাকে বলা হয় অগণতান্ত্রিক।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তার স্বার্থে, সিআইএসএফ মোতায়েনের অনুরোধ জানিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী। একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি সংবাদপত্রে খবরটি প্রকাশ হওয়ার পরেই বিশ্বভারতীর পড়ুয়া, অধ্যাপক, কর্মী সবস্তরেই অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে এভাবে সিআইএসএফ-এর মতো আধা সেনা মোতায়েন করা আদৌ কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। যদিও উপাচার্যের দফতর থেকে এই বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি।

 

উপাচার্যের চিঠির বক্তব্য –

চিঠিতে উপাচার্য যে বিষয়গুলির কথা বলেছেন বলে সংবাদ সূত্রে প্রকাশঃ

 

১.বর্তমানে যে নিরাপত্তা কর্মীরা কাজ করছেন তারা রাজ্যের শাসক দলের অনুগামী। যে কোনও সমস্যায় তারা শাসক দলের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের আনুকূল্য পান।

 

২. গত মে মাসে যখন ভর্তির আবেদন পত্রের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে ছাত্ররা আন্দোলন করছিলেন তখন এই নিরাপত্তা কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পাশে দাঁড়ায় নি।

 

৩. নিরাপত্তা রক্ষীদের (সিআইএসএফ-এর) প্রয়োজন গত কয়েক মাসে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, পড়ুয়া ও কর্মচারীদের মধ্যে বাড়তে থাকা সংঘাত সামলানোর জন্য।

 

৪. বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে ও বিশ্বভারতীতে পুরনো অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সিআইএসএফ প্রয়োজন।

 

সিআইএসএফ চেয়ে এই চিঠি দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ও প্রধানমন্ত্রীর দফতরেও পাঠান উপাচার্য।

 

সিআইএসএফ কী :

সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্স হল কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ সশস্ত্র নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনী। তারা সাধারণত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যে সব প্রতিষ্ঠান যেমন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র, পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র,  দেশের বিমানবন্দর, দিল্লি-মেট্রো,  দেশের বন্দর, ঐতিহাসিক স্থাপত্য এবং দেশের আর্থিক ক্ষেত্রে  গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস, বিদ্যুৎ, কয়লা, স্টিল ও খনন সেখানে নিরাপত্তা দেয়। এ ছাড়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সরকারি দফতরেও তারা নিরাপত্তা দেয়। জেড প্লাস ও জেড, এক্স, ওয়াই নিরাপত্তাধীন ব্যক্তিদের নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও সিআইএসএফ-এর ডাক পড়ে। এখনো পর্যন্ত কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সিআইএসএফ মোতায়েন করা হয়নি।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্বভারতীর এক ছাত্র জানালেন “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও স্টুডেন্ট ইউনিয়ন নেই। ছাত্রছাত্রীদের এক জোট হতে সময় লাগে। আমরা সকলেই এই সিদ্ধান্তের বিরূদ্ধে। আপাতত নিজেদের মধ্যে আমরা কথাবার্তা চালাচ্ছি। সামনে আমাদের পরীক্ষা। সেদিকেও মন দিতে হচ্ছে। তবে খুব তাড়াতাড়ি প্রাক্তনীদের সঙ্গে কথা বলা, কনভেনশন ইত্যাদি করার প্রয়োজন রয়েছে।”

 

এই সিদ্ধান্তের বিরূদ্ধে আপাতত বিশ্বভারতীর ভরে গেছে দেওয়াল লিখনে। ওই পড়ুয়া জানালেন “পোস্টারিং করা, দেওয়াল লেখা আমাদের প্রতিবাদের ভাষা। আমরা পোস্টারিং করছিলাম। ভিসির নির্দেশে তা রাতারাতি ছিঁড়ে দেওয়ায় আমরা দেওয়াল লিখছি।”

 

সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যেই বিভিন্ন বক্তব্য, প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ছে #ভাঙোঅচলায়তন নামে। এইসিদ্ধান্তের বিরূদ্ধে পড়ুয়াদের প্রতিরোধ কী ভাবে দানা বাঁধে তা সময় বলবে।

 

অসন্তোষ দানা বাঁধছে অধ্যাপক মহলেও। বর্তমান উপাচার্যের কার্যাবলীতে প্রায় সকলেই ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত। অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সুদীপ্ত ভট্টাচার্য যেমন বললেন “সিআইএসএফ-এর কাজ দেশের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা কেন আসবে?  সবুজ কলি সেন যখন উপাচার্য ছিলেন তখন একবার ভাবা হয়েছিল এ বিষয়ে তাও শুধু রবীন্দ্র ভবনের জন্য। কারণ তখন নোবেল চুরি যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে গেছে। কিন্তু তা কার্যকর করা হয়নি শেষ পর্যন্ত। এবার বিষয়টি সম্পর্কে আমরা মিডিয়া থেকেই জানছি। কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে সরকারি ভাবে কিছুই জানানো হয়নি। তবে নিশ্চয়ই আমরা সর্বতো ভাবে এর বিরোধিতা করব।” ঘটনা কোন দিকে এগোয় দেখে অধ্যাপকেরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেবেন।

 

কথা হল বিশ্বভারতীর কর্মচারী সংগঠনের সভাপতি দেবব্রত সরকারের সঙ্গে। প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই বললেন, “আশ্রম, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারী বুটের দাপাদাপি মানা যাবেনা। বিশ্বভারতী, রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জ্ঞান না থাকলে এমন চিঠি লেখা যায়। উপাচার্য সিআইএসএফ দিয়ে ইউনিভার্সিটি কন্ট্রোল করতে চাইছেন। নিজের কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজকর্ম দিয়ে আশ্রমের পরিবেশ নষ্ট করতে চাইছেন। সবেতেই ওঁর নোংরা রাজনীতি প্রকাশ পাচ্ছে। আজ পর্যন্ত বিশ্বভারতীর ভেতরে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রবেশ করেনি। বাইরে যার রাজনৈতিক আদর্শ যাই হোক না কেন। উনি সেটাই করতে চাইছেন। তাও সুচারুভাবে নয়,  খুল্লামখুল্লা। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর আচরণ, ব্যবহার, অশিক্ষক সুলভ ভাষা প্রয়োগে ছাত্রছাত্রীদের কাছে আনপপুলার হয়ে গেছেন।” তিনি আরও মনে করিয়ে দিলেন কী ভাবে কাজ শুরু করেই উপাচার্য বিশ্বভারতীর ঐতিহ্যবাহী বুধবারের ছুটি তুলে দিতে চেয়েছিলেন। পড়ুয়া, অধ্যাপক, কর্মচারীদের মিলিত প্রতিবাদে তা রদ হয়।

 

প্রশ্ন একটাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সিআইএসএফ কেন? এদের দায়িত্ব দেখেই বোঝা যায় দেশের সম্পদ জঙ্গী হামলা থেকে সামলানোর কাজে তারা বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। পড়ুয়াদের আন্দোলনকে কি তবে জঙ্গী কার্যকলাপের সঙ্গে তুলনা করছেন উপাচার্য? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারের বিরুদ্ধ মত প্রকাশ, প্রতিবাদ করার অধিকার আর থাকবে না?

 

বিশ্বভারতীতে আধা সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোদি সরকারের উচ্চ শিক্ষায় বাণিজ্যিকরণ ও ‘হিন্দুত্বের’ আদর্শে সেগুলোকে পরিচালিত করার বিরূদ্ধে চলছে তীব্র ছাত্র বিক্ষোভ ও আন্দোলন। বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে মুক্ত চিন্তা, আলাপ-আলোচনা, বিতর্ক, বহুত্বের চর্চার যত টুকু আবহাওয়া উপস্থিত ছিল সেটাকেও ধ্বংস করে সঙ্ঘী হিন্দুত্ব ও ঊগ্র-জাতীয়তাবাদের আখড়ায় পরিণত করতে চাইছে বর্তমান শাসক শ্রেণী। সেই নীল নকশার একটা ধাপ, বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে সিআইএসএফ-এর মত আধা সেনা মোতায়েন করা। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী দিয়ে তার শুরুয়াত হতে চলেছে!

 

লেখক ডকুমেন্টারি নির্মাতা এবং স্বতন্ত্র সাংবাদিক  

 

Share this
Recent Comments
1
  • comments
    By: Uttars on November 14, 2019

    The time has arrived to close down the university. Over the past few decades, the character of the school and university has changed. The aims and objectives with which Tagore had laid down the framework has been lost a long time. And the appointment of a para military force is the proverbial nail in th coffin.

Leave a Comment