কারাবন্দি কাশ্মীর: “স্বাভাবিকত্ব” না “শ্মশান-স্তব্ধতা”?


  • August 16, 2019
  • (1 Comments)
  • 667 Views

“The siege is a waiting period
Waiting on the tilted ladder
In the middle of the storm”

-Mahmoud Darwish

 

কাশ্মীর উপত্যকায় রাষ্ট্র-প্রবর্তিত গণ-শ্বাসরোধী স্তব্ধতাকে স্বাভাবিক অবস্থা বলে ভুয়ো প্রচার করে চলেছে সংবাদমাধ্যম।

 

কাশ্মীরের মানুষ গলা চড়িয়ে যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠতে চায়। এক দমবন্ধ করা ভয়ে তারা নিশ্চুপ। সারা কাশ্মীর যেন এক তীব্র শোকের মহা আতঙ্কের বিক্রিয়ায় পাথর হয়ে আছে, কিছুই বলে উঠতে পারছে না। যে কোনও, সামান্যতম বিরোধিতার চিহ্ন দেখা দিলেই পরিণাম হবে ভয়াবহ। ইতিমধ্যেই হাজারেরও বেশি যুবক, ছাত্র, কিশোর, রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী, সাংবাদিক, অধ্যাপক এমনকী দুজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার কিংবা আটক করা হয়েছে। প্রায় প্রত্যেককেই রাতের অন্ধকারে ঘর থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কোন আইনে এঁরা আটক বা গ্রেপ্তার সে নিয়ে মুখ খুলছে না প্রশাসন। আত্মীয়দেরও জানানো হচ্ছে না তাঁরা কোথায় আছেন। 

 

ভারত সরকারের দাবি এই অবরোধ কাশ্মীরিদের জীবন রক্ষা করছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের এক মুখপাত্র বলেন, “বাধানিষেধের অসুবিধা কিংবা জীবনহানি –এই দুইয়ের মধ্যে বেছে নিতে হবে।” এই একটিই বিবৃতি প্রমাণ করে, কাশ্মীরের এই “স্বাভাবিকত্ব” অবাক করার মতো কোনও ব্যাপার নয়। এ ভারতের সামরিক পরাক্রমের নির্মাণ করা “শ্মশান-স্তব্ধতা”?

 

সমস্ত ধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন উপত্যকায় মিথ্যা প্রচার নস্যাৎ করে দিতে, অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক ও সমাজকর্মীদের একটি দল সম্প্রতি সরজমিনে কাশ্মীর পরিদর্শন করে ফিরেছেন। তথ্যানুসন্ধানী এই দলে ছিলেন, জ্যঁ দ্রেজ, মৈমুনা মোল্লা, কবিতা কৃষ্ণান ও বিমল ভাই।

 

এই তথ্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদন ‘কাশ্মীর কেজড’-এর বাংলা অনুবাদ আমরা প্রকাশ করলাম। অনুবাদ করেছেন সোমকরাজ ব্যানার্জি‌ । মূল রিপোর্ট, ছবি ও ভিডিও-তথ্যচিত্রও যুক্ত করা হল।  

 

 

আমরা পাঁচদিন ধরে (৯-১৩ অগস্ট) যতটা সম্ভব কাশ্মীর ঘুরে দেখলাম। আমাদের যাত্রা শুরু হয় ৯ অগস্ট – ভারত সরকারের ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা রদ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের ঠিক চার দিন পর। সরকারের এই সিদ্ধান্ত অনুসারে জম্মু ও কাশ্মীর নামক রাজ্যটি ভেঙে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল তৈরি হবে।

 

৯ তারিখ  শ্রীনগরে পৌঁছেই আমরা দেখি টানা কার্ফুর ফলে শহরটা একটা পরিত্যক্ত, নিস্তব্ধ উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। চারিদিকে অত্যাধিক সেনা ও আধা-সামরিক বাহিনী। ৫ অগস্ট থেকে টানা কার্ফু জারি রয়েছে। শ্রীনগরের রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ নির্জন; সমস্ত প্রতিষ্ঠান, দোকানপত্র, স্কুল-কলেজ, লাইব্রেরি, পেট্রোল পাম্প, সরকারি অফিস, ব্যাঙ্ক – সব বন্ধ। খালি কিছু এটিএম, ওষুধের দোকান আর থানা খোলা রয়েছে। মুষ্টিমেয় স্থানীয় লোকজনকে এক-দুজন করে এখানে ওখানে দেখা যাচ্ছে, দল বেঁধে ঘোরা বারণ।

 

আমরা ব্যাপকভাবে শ্রীনগরের এদিক-ওদিক ঘুরেছি। শহরের মাঝখানে যে ছোট্ট জায়গা থেকে দেশের অন্য সংবাদ মাধ্যমগুলি তাদের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে তার থেকে অনেকটাই দূরে দূরে আমরা গেছি। শহরের মাঝের ওই নির্ধারিত জায়গাটাতে আটকে থাকলে সময়ে সময়ে মনে হয় চারপাশটা খুব কিছু অস্বাভাবিক নয়, তাই তারা দাবি করে কাশ্মীর নাকি স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরে গেছে। আসলে সত্যিটা পুরোপুরি আলাদা।

 

আমরা পাঁচদিন ধরে শ্রীনগর শহর, তার সংলগ্ন গ্রাম, ছোট শহরগুলোতে মোটামুটি কয়েকশো লোকজনের সাথে কথা বলেছি। আমরা স্থানীয় মহিলা, স্কুল-কলেজের পড়ুয়া, দোকানদার, সাংবাদিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ প্রভৃতি এলাকা থেকে আসা শ্রমিকদের সাথে কথা বলেছি। আমরা উপত্যকার বাসিন্দা কাশ্মীরি পণ্ডিত, শিখ এবং মুসলিম সকলের সাথে কথা বলেছি।

 

কাশ্মীরে সমস্ত জায়গায় আমাদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানো হয়, এমনকী যাঁরা আমাদের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহপ্রবণ ছিলেন তাঁরাও এর অন্যথা হননি। ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্তে বিরক্ত, প্রতারিত এবং সম্পূর্ণ বীতশ্রদ্ধ হয়েও তাঁরা যে হৃদয়ের উষ্ণতা এবং আতিথেয়তার পরিচয় দিয়েছেন তা আমাদের আশ্চর্য করেছে।

 

একমাত্র বিজেপি’র মুখপাত্র বাদে কাউকেই আমরা দেখলাম না যে ভারত সরকারের ৩৭০ ধারা বাতিলের এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিচ্ছে। বরং লোকজন ৩৭০ (ও ৩৫এ) ধারা রদ করা এবং যে প্রক্রিয়ায় এটা করা হয়েছে সে নিয়ে রীতিমত ক্ষুব্ধ।

 

চারিদিকে মানুষ রাগ আর ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, তাঁদের অনুভূতি বলতে শুধু এই দুটিই। সাধারণভাবে কথোপকথন হলে প্রায় সকলেই খোলাখুলি ভাবে তাঁদের রাগ-বিরক্তি প্রকাশ করছেন কিন্তু কেউ ক্যামেরার সামনে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। কেউ মুখ খুললেই সরকারের খাঁড়া নেমে আসতে পারে।

 

অনেকেই আমাদের বললেন, তাঁরা কিছুদিনের মধ্যেই বিরাট আন্দোলন শুরু হবে বলে আশা করছেন, (বাধানিষেধ তুলে নেওয়ার পর, ঈদের পর, ১৫ অগস্টের পর, কিংবা আরও পরে) আর তাঁরা এটাও মনে করেন যে মানুষ আন্দোলন করলে তা শান্তিপূর্ণ হলেও কঠোরভাবে দমন করা হবে।

 

সোপোরে সেনা টহল। সূত্র: কবিতা কৃষ্ণান।

সারাংশে আমাদের পর্যবেক্ষণগুলি

  • কাশ্মীরে বস্তুত সর্বসম্মতভাবে ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরূদ্ধে একটা নিদারুণ ক্ষোভের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সরকার যে পদ্ধতিতে ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা রদ করল, ক্ষোভটা সে নিয়েও।
  • এই ক্ষোভকে নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার কাশ্মীরে কার্ফু-পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছে। কয়েকটা এটিএম, পুলিশ থানা আর ওষুধের দোকান বাদে প্রায় সমস্ত কিছুই বন্ধ।
  • জনজীবনের ওপর নামানো বিবিধ বিধিনিষেধ এবং কার্ফু কার্যকর করার ফলে কাশ্মীরের অর্থনীতিকে পঙ্গু করছে; তাও আবার প্রাচুর্যের উৎসব বকর ঈদ এর সময়।
  • সাধারণ মানুষ সরকার, পুলিশ এবং সেনার হাতে হেনস্থা হতে হবে বলে ভয়ে ভয়ে রয়েছে। ক্যামেরায় বক্তব্য রাখতে না চাইলেও ঘনিষ্ঠ কথাবার্তায় তাঁরা ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন।
  • প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম গুলি যেভাবে কাশ্মীরের দ্রুত স্বাভাবিকত্ব ফিরে আসার খবর জানাচ্ছে, তা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। এগুলি নিতান্তই শ্রীনগর শহরেই বসে বসে জানতে পারা তথ্যের ভিত্তিতে বলা, বাছাই করা কিছু খবর।
  • পরিস্থিতি এখন যে জায়গায়, কাশ্মীরে কোনও প্রকার প্রতিবাদ জানানোর উপায় নেই। তা সে যতই শান্তিপূর্ণভাবে হোক না কেন। তবে, খুব শীঘ্রই হয়তো জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়বে।

 

জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে সরকারের মনোভাব সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া

  • আমাদের ফ্লাইট অবতরণের সাথে সাথেই বিমানকর্মী ঘোষণা করলেন যে আমরা আমাদের মোবাইল গুলো চালু করতে পারি। যাত্রীদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন কাশ্মীরি, তাঁরা এই ঘোষণা শুনে ব্যঙ্গাত্মক হাসিতে ফেটে পড়েন। আমরা লোকজনকে বলতে শুনি, “এ কীরকম মস্করা?” বলাই বাহুল্য কাশ্মীরে দূরভাষ ও ইন্টারনেট পরিষেবা ৫ আগস্ট থেকেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
  • শ্রীনগরে পা ফেলতেই আমরা দেখলাম একদল বাচ্চা একটা পার্কে কিছু অভিনয় করছে খেলার ছলে। শুনতে পারছিলাম তারা বলছে, “ইবলিশ্ মোদি।” “ইবলিশ্” মানে হল “শয়তান”।
  • লোকজনের সাথে সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে কথাবার্তা হলেই “জুলম” (অত্যাচার), “য্যাদতি” (নিষ্ঠুরতা) আর “ধোকা” (প্রতারণা) – এই শব্দ গুলি বারবার উঠে আসছিল। সাফাকদালের (শ্রীনগরের শহরতলি) এক ব্যক্তির ভাষায়, “সরকার আমাদের, কাশ্মীরিদের সাথে দাসেদের মত ব্যবহার করেছে, আমাদেরকে বন্দি রেখে আমাদের জীবন, ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ যেন আমাদের বন্দি করে, মুখ বেঁধে, মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে বলপূর্বক সব গিলতে বলা হচ্ছে।”
  • শ্রীনগরের অলিগলিতে, প্রত্যেক গ্রাম-শহরে, যেখানেই আমরা গিয়েছি সেখানেই সাধারণ মানুষ এমনকী স্কুলের বাচ্চারা অবধি আমাদের কাশ্মীর-বিতর্কের ইতিহাস শোনাতে, বোঝাতে চেয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম যেভাবে তাঁদের ইতিহাসকে ভ্রান্ত্র বয়ানের মাধ্যমে মুছে দিতে চাইছে তাতে তাঁরা ক্ষুব্ধ ও হতবাক। অনেকে বললেন, “৩৭০ ধারা ছিল ভারত আর কাশ্মীরের নেতৃত্বের মধ্যে হওয়া চুক্তি। এই চুক্তি না হলে কাশ্মীর কখনোই ভারতের অংশ হতে রাজি হত না। আজ যখন এই চুক্তি আর নেই, ভারতেরও কোনো অধিকার নেই কাশ্মীরকে নিজের অংশ বলে দাবি করার।” লালচকের কাছে, জাহাঙ্গির চক বলে এক এলাকায় একজন ৩৭০ ধারাকে “মঙ্গলসুত্র”-র সাথে তুলনা করে ফেললেন, এই ধারা দিয়েই কাশ্মীর আর ভারতের বিবাহ হয়েছিল। (৩৭০ ও ৩৫এ ধারা তুলে দেওয়া নিয়ে আরও স্থানীয়দের মতামত নীচে তুলে ধরা হয়েছে।)
  • ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিয়ে জনতার অসন্তুষ্টি তুঙ্গে। লোকজন গৃহবন্দি, কেউ কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না, সোশ্যাল মিডিয়াতে বা অন্য কোনোভাবেই কেউ মতপ্রকাশ করতে পারছেন না। বাড়িতে তাঁরা টিভিতে দেখে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম প্রচার করছে কাশ্মীরিরা নাকি এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁরা বুকভরা ক্ষোভ নিয়ে দেখেন তাঁদের আওয়াজকে কীভাবে দমিয়ে দেওয়া হচ্ছে, মুছে ফেলা হচ্ছে। সাফাকাদালের এক যুবক যেমন বললেন, “কিসকি শাদি হ্যায়, আওর কৌন নাচ রহা হ্যায়” (কার বিয়ে, আর নাচছে কে!) বললেন, “এই সিদ্ধান্ত যদি আমাদের ভালোর জন্যই নেওয়া হয়েছে তবে আমাদের কেউ জিজ্ঞাসা করছে না কেন, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা কী মনে করছি?”

 

৩৭০ ও ৩৫এ ধারা রদ করা নিয়ে প্রতিক্রিয়া

  • অনন্তনাগ জেলার গুরি নামক এক গ্রামে একজন বললেন, “ওদের (ভারতের) সাথে আমাদের সম্পর্ক ছিল ৩৭০ আর ৩৫এ ধারার। ওরা নিজের পায়েই কুড়ুল মারল এই ধারাগুলি শেষ করে দিয়ে। সুতরাং এবার আমরা মুক্ত হয়ে গেছি।” এই লোকটিই শ্লোগান তুলছিলেন, “আমরা স্বাধীনতা চাই, ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা ফিরিয়ে আনা হোক।”
  • অনেকেই ৩৭০ আর ৩৫এ ধারাকে কাশ্মীরের ‘পেহচান’ বা আত্মপরিচয় মনে করেন। তাঁরা মনে করেন এই ধারা দুটি তুলে নিয়ে কাশ্মীরের সত্তা ও আত্মমর্যাদায় আঘাত হানা হয়েছে।
  • সবাই কিন্তু বলছেন না তাঁদের ৩৭০ ধারা চাই। বরং অনেকে আবার বলছেন, কেবল কিছু রাজনৈতিক দলই সান্ত্বনা দিয়ে এসেছে যে,  ভারত এই চুক্তি মেনে চলবে। ৩৭০ ধারা রদ শুধু সেই “ভারত-পক্ষের” দলগুলির মুখোশ খুলে দিয়েছে, আর যাঁরা কাশ্মীরের স্বাধীনতা চাইত তাদের পালে হাওয়া জুগিয়েছে। বাতামালু-তে একজন বললেন, “যারা ভারতের গুণ গাইতেন, ভারতের নিজের লোক, তাঁরাও আজ জেলে !” এক কাশ্মীরি সাংবাদিকের কথায়, “অনেকেই মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলির এই দশায় খুশি। যাঁরা এতদিন ধরে কাশ্মীরকে ভারতের আর এক রাজ্য হিসেবে পরিচয়ের পক্ষে ঢাক পিটিয়ে বেড়িয়েছেন, আজ তাঁদেরকেই হেনস্থা করা হচ্ছে।”
  • আরেক মত হল, “মোদি ভারতের নিজের আইন, সংবিধানকেই ধ্বংস করে ফেলেছেন।” তাঁরা মনে করেন, কাশ্মীরের ওপর অধিকারের মান্যতা পাওয়ার জন্য ভারতের কাছেই আদতে ৩৭০ ধারা বেশি জরুরি ছিল। কিন্তু মোদি-সরকার কেবল কাশ্মীরকে ধ্বংস করতে চেয়ে ভারতের নিজের আইন-সংবিধানকেই ধ্বংস করেছে।
  • জাহাঙ্গির চকের এক হোসিয়ারি ব্যবসায়ী বললেন, “কংগ্রেস পেছনে ছুরি মেরেছিল, বিজেপি সামনে থেকে মারল।” তিনি আরও বললেন, “ওরা নিজেদের সংবিধানের গলা টিপেছে, এটাই হিন্দুরাষ্ট্রের দিকে প্রথম পদক্ষেপ।”
  • একদিক থেকে দেখলে, মানুষ ৩৭০ ধারার চেয়েও ৩৫এ ধারা তুলে নেওয়া নিয়ে বেশি চিন্তিত। সকলেই মনে করেন ৩৭০ ধারা কেবল এক প্রতীকী, নামমাত্র স্বশাসনের অধিকার দেয়,  দিনের পর দিন যার লঘুকরণ করা হয়েছে। ৩৫এ ধারা উঠে যাওয়ার ফলে জনগণের ভয় এই যে, “রাজ্যের জমি জলের দরে বিক্রি হবে বিনিয়োগকারীদের কাছে। আম্বানি, পতঞ্জলি প্রমুখ ব্যবসায়ীরা আখড়া বসিয়ে কাশ্মীরের জমি আর প্রাকৃতিক সম্পদে দখল বসাবে। আজকের দিনের হিসাবে কাশ্মীরে শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি ভারতের মূল ভূখণ্ডের চেয়েও ভালো। কিন্তু এরপর কাশ্মীরিদের অন্য রাজ্যের লোকেদের সাথে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। পরবর্তী প্রজন্মের কাশ্মীরিরা আর কাশ্মীরে চাকরি না পেয়ে মূল ভূখণ্ডে আসতে বাধ্য হবেন।”

 

“স্বাভাবিকত্ব” না “শ্মশান-স্তব্ধতা”?

কাশ্মীরের পরিস্থিতি কি “স্বাভাবিক” বা “শান্তিপূর্ণ” ? উত্তর একটা জোরালো “না”

  • সোপোরের এক যুবক বলছিলেন, “এই শান্তি বন্দুকের নল দেখিয়ে আনা, এটা শ্মশানের স্তব্ধতা।”
  • গ্রেটার কাশ্মীর সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় ছিল দৈনিক খবর, শেষের পাতায় যথারীতি খেলার খবর, আর মাঝের দুটো পাতা জুড়ে ছিল কেবল বিবাহ বা অন্য প্রীতি-অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে যাওয়ার ঘোষণা।
  • ৫ থেকে ৯ অগস্টের মধ্যে মানুষ খাবার, দুধ সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাবে ভুগেছেন। এমনকী অনেককে অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও হাসপাতালেও যেতে দেওয়া হয়নি।
  • সরকার দাবি করেছে কেবল ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে, “কার্ফু” জারি হয়নি। কিন্তু বাস্তবে চারিদিকে পুলিশের গাড়ি টহল দিচ্ছিল, ঘোষণা করছিল লাগাতার, “বাড়ির মধ্যে সুরক্ষিত থাকুন, কার্ফু চলাকালীন বাইরে বেরোবেন না”, দোকানদারদের বলা হচ্ছিল দোকানের ঝাঁপ নামাতে।
  • সমগ্র কাশ্মীরে কার্ফু জারি। ঈদের দিনেও সব রাস্তাঘাট, দোকানপত্র শুনশান, পরিত্যক্ত। সারা শ্রীনগরে রাস্তায় চলাফেরা কনশার্টিনা তার দিয়ে নিয়ন্ত্রিত, রাস্তায় ব্যাপক আধা-সামরিক বাহিনী উপস্থিত। ঈদের দিনেও তাই। অনেক গ্রামে মসজিদে আধা-সামরিক বাহিনীর নিষেধে আজান করতে দেওয়া হয়নি। ঈদের দিনে লোকজন রীতি অনুসারে নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে সমবেত হন, এবার বাড়ির মধ্যে পড়েতে বাধ্য হয়েছেন।

 

শ্রীনগর শহরে সেনা চেকপোস্ট। সূত্র: বিমল ভাই।

  • অনন্তনাগ, সোপিয়ান এবং পাম্পোরে-তে ঈদের দিনে আমরা কেবল গুটিকয়েক ছোট বাচ্চাদের কেবল সুন্দর পোশাক-আশাকে দেখলাম। বাকি সবাই যেন শোকপালন করছিলেন। গুরিতে (অনন্তনাগ) একজন মহিলা বললেন, “আমাদের মনে হচ্ছে আমরা জেলের মধ্যে রয়েছি।” নাগবালে (সোপিয়ান) মেয়েরা বললেন, “আমাদের ভাইয়েরা সেনা-পুলিশের হাতে বন্দি, কীভাবে আমরা ঈদ পালন করি?”
  • ১১ আগস্ট, ঈদের দিনে সোপোরে-তে এক মহিলা আমাদের জানালেন, খানিকক্ষণের জন্য কার্ফু বন্ধ থাকায় তিনি ঈদের বাজার করতে আসতে পেরেছেন। তিনি বললেন, “আমরা নিজেদের ঘরেই ৭ দিন বন্দি হয়ে ছিলাম। আজও আমার গ্রাম লাঙ্গেটে দোকানপত্র বন্ধ, তাই শহর অব্দি আসতে হয়েছে বাজার করতে, আর আমার মেয়ে এখানে নার্সিং পড়ে, তার খবর নিতে।”
  • বন্দিপোরার কাছে ওয়াতপুরা এলাকার এক ছোকরা রুটিওয়ালা বললেন, “এখানে মোদির রাজ না, সেনার রাজ চলছে, এখানে সাধারণ মানুষের চেয়ে তো সেনাই বেশি।” তার বন্ধুটি আবার বললেন, “আমরা ভয় পাই, সামনেই সেনাদের ক্যাম্প, ওরা আমাদের ওপর অসম্ভব সব নিয়ম চাপিয়ে দেয়। ওরা জোর করে আমরা যেন বাড়ি থেকে বেরোনোর আধ ঘণ্টার মধ্যেই ফিরে আসি। আমার বাচ্চাটার আজ অসুখ হলে তাকে নিয়ে আমায় হাসপাতাল যেতে হবে, হতেই পারে তাতে আধঘণ্টার বেশি লাগল। কেউ যদি পাশের গ্রামে মেয়ের সাথে দেখা করতে যায়, তা আধঘণ্টার মধ্যে সম্ভবই না। আর দেরি হলেই ওরা আমাদের হেনস্থা করবে।” কাশ্মীরে সিআরপিএফ আধা-সামরিক বাহিনী চারিদিকে, প্রায় প্রতিটি ঘরের বাইরে বাইরে। সুরক্ষা নয়, সেনা উপস্থিতি কাশ্মীরি জনগণের মনে ভয় তৈরি করে।
  • ভেড়াপালক ও বিক্রেতাদের দেখা যাচ্ছিল বিক্রি না হওয়া ছাগল-ভেড়া নিয়ে ঘুরে বেড়াতে। এই ছাগল-ভেড়া তাঁরা সারাবছর ধরে পালন করেছেন, এবার বিক্রি না হলে তাঁদের প্রচুর লোকসান। লোকজনের রোজগার না থাকায় কেউ কুরবানি উপলক্ষে ছাগল-ভেড়া কিনতে পারেননি।
  • উত্তরপ্রদেশের বিজনোর থেকে আসা এক মিষ্টি বিক্রেতা দেখালেন তাঁর কত কত মিষ্টি এবং অন্যান্য উপাদেয় খাবার নষ্ট হচ্ছে, কারণ কেউ কিনতেই পারছেন না। বেকারি দোকানগুলো শুনশান পড়ে আছে তাদের লোভনীয় খাবার সামগ্রী নিয়ে।
  • শ্রীনগরের এক অ্যাজমায় ভোগা অটোচালক আমাদের তার শেষ স্যাল্বুটামল আর অ্যাস্থালিন ওষুধগুলো দেখালেন। তিনি অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করছেন আরও ওষুধ কেনার কিন্তু তাঁর এলাকার কোনো ওষুধের দোকান বা হাসপাতালে এই ওষুধের জোগান নেই। আরও বড়ো কোনও হাসপাতালে গিয়ে খুঁজতে পারেন, কিন্তু সিআরপিএফ আবার তাঁকে বাধা দেবে। লোকটি আমাদের খালি দুমড়ে দেওয়া একটা অ্যাস্থালিন ইনহেলারের কৌটো দেখালেন; যখন তিনি এক সিআরপিএফ-এর জওয়ানকে কৌটোটি দেখিয়ে বলেন যে, ওষুধ কিনতে তাঁকে আরও দূরে যেতে হবে, তখন নাকি ওই জওয়ান ওষুধের কৌটোটি পায়ে করে পিষে দেয় তাঁর সামনেই। অটোচালকটি বলে উঠলেন, “পিষে কেন দেবে? আমাদের ঘেন্না করে, তাছাড়া কী!”

 

পুলওয়ামায় ঈদ। সূত্র: কবিতা কৃষ্ণান।

প্রতিবাদ, দমন-পীড়ন, নিষ্ঠুরতা

  • শ্রীনগরের সৌরা গ্রামে প্রায় ১০০০০ জন বিক্ষোভ জানায় ৯ অগস্টের দিন। সেনাবাহিনী পেলেট গান দিয়ে জবাব দেয়, বহু লোকজন গুরুতরভাবে আহত হয়। আমরা ১০ তারিখ সৌরা যাওয়ার চেষ্টা করি কিন্ত সিআরপিএফ -এর ব্যারিকেড আমাদের আটকে দেয়। আমরা সেদিনও কম-বয়েসি কিছু আন্দোলনকারীদের রাস্তা-আটকে বিক্ষোভ জানাতে দেখতে পাই।
  • আমরা শ্রীনগরে পেলেট গানে আহত দুজনকে দেখতে যাই। ওই দুই যুবক ওয়াকার আহমদ আর ওয়াহিদের মুখ, পেট, হাত পেলেটের আঘাতে ভর্তি। তাঁদের চোখগুলো রক্তাক্ত, দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। দেখা যাচ্ছে ওয়াকারের ক্যাথিটারের মধ্যে দিয়ে প্রস্রাবের সাথে রক্ত আসছে, তার ইন্টারনাল ড্যামেজ হয়েছে। তাদের আত্মীয়স্বজন রাগে-দুঃখে কান্নাকাটি করতে করতে বললেন, ছেলে দুটি পাথর ছোড়েনি, তারা তো শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছিল।

 

পেলেট গানের শিকার। সূত্র: বিমল ভাই।

  • ৬ আগস্ট “রাইজিং কাশ্মীর” সংবাদপত্রের এক গ্রাফিক ডিজাইনার সমীর আহমদের (বয়স কুড়ির) সাথে –তার বাড়ি, শ্রীনগরের মান্দেরবাগ এলাকার কাছে — এক বৃদ্ধ মানুষকে যেতে দেওয়া নিয়ে এক সিআরপিএফ-এর সাথে বচসা বাঁধে। খানিক পরে, ওই একই দিনে, সমীর যখন ঘরের দরজা খুললেন, তখন কোনও উস্কানি ছাড়াই সেই সিআরপিএফ-ই তাঁর দিকে পেলেট গান তাক করে দাঁড়িয়ে। হাতে আর চোখের কাছে মোট ১৭২ টি পেলেটের আঘাত পেয়েছেন সমীর আহমদ। তাঁর দৃষ্টিশক্তি বেঁচে গেছে কিন্তু আমরা বুঝতেই পারছি কীভাবে নিরস্ত্র, শান্ত সাধারণ মানুষের মুখে চোখে, তাঁদের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পেলেট গান ছোঁড়া হচ্ছে।
  • কম করে হলেও প্রায় ৬০০ রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী, সামাজিক কর্মী গ্রেফতার হয়েছেন। কোন আইনে তাদের গ্রেফতার করা হল, তাদের কোথায়ই বা রাখা হচ্ছে এর কোনো হদিশ নেই।
  • একটা বড় সংখ্যক রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী গৃহবন্দি হয়ে রয়েছেন, এই সংখ্যাটা যে কত তা জানার উপায় নেই। আমরা সিপিআইএম-এর বিধায়ক মহম্মদ ইউসুফ তারিগামির সাথে দেখা করার চেষ্টা করলাম কিন্তু তার শ্রীনগরের বাড়িতে আমাদের ঢুকতেই দেওয়া হয়নি। ওখানেই ইউসুফ গৃহবন্দি আছেন।
  • যেই গ্রামেই আমরা গেছি, এমনকী শ্রীনগরের শহরতলিতেও দেখছি কমবয়েসি স্কুলপড়ুয়া এবং কিশোরদের ইচ্ছামতো পুলিশ বা সেনা ধরে নিয়ে গিয়ে বেআইনি হেফাজতে রেখে দিচ্ছে। আমাদের পাম্পোরের এক ১১ বছর বয়েসি ছেলের সাথে দেখা হয়। তাকে ৫ থেকে ১১ আগস্ট এক পুলিশ থানায় আটকে রাখা হয়। তাকে মারধোর করা হয়েছে, সে বলছে আশেপাশের গ্রামের থেকে তার চেয়েও কিছু কমবয়েসিদের ধরে হেফাজতে রাখা হয়েছে।
  • শয়ে শয়ে কিশোর-যুবকদের মধ্যরাতে রেইড করে বিছানা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই রেইডগুলোর একমাত্র উদ্দেশ্য হল ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা। মেয়ে-মহিলারা এইসব রেইডের সময় সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত হওয়ার ঘটনা আমাদের বলেছেন। অভিভাবকরা আমাদের সাথে দেখা করতে বা তাঁদের ছেলেদের গ্রেফতারের ব্যাপারে কথা বলতে চাইছেন না পাছে পাবলিক সিকিউরিটি অ্যাক্ট-এ অভিযোগ দায়ের হয়ে যায়। তাঁদের অন্য বড়ো ভয় হল তাঁদের ছেলেদের হেফাজতেই খুন করে গুম করে দেওয়া হতে পারে, কবর দিয়ে দেওয়া হতে পারে। গণকবরের ভয়ানক ইতিহাস রয়েছে কাশ্মীরের। একজন গ্রেফতার হওয়া ছেলের প্রতিবেশী জানালেন, “এই গ্রেফতার গুলোর কোনো নথি নেই। এসবই বেআইনি। ফলে যদি ছেলে হেফাজতে খুন হয়ে নিরূদ্দেশ হয়ে যায় তাহলে পুলিশ বা সেনাকে কোনও জবাবদিহি করতে হয় না, তারা বলবে গ্রেফতারই করা হয়নি।”
  • তবে জনগণের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ থামবে বলে মনে হয় না। সোপোরের এক যুবক বললেন “যত জুলুম করবে, আমরা ততই বেড়ে উঠব।” একটা কথা মুখেমুখে প্রায়ই শুনতে পেলাম, “নেতারা গ্রেফতার হয়েছে তো কী? আমাদের নেতা চাই না। যতক্ষণ অবধি একজনও কাশ্মীরি শিশু বেঁচে আছে ততক্ষণ আমরা লড়াই করব।”

 

সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ

  • এক সাংবাদিক আমাদের বললেন, “এতকিছু সত্ত্বেও খবরের কাগজ ছাপা হচ্ছে। ইন্টারনেট ছাড়া আমরা এজেন্সিগুলো থেকে কোনো খবর পাচ্ছি না। এমন অবস্থা যে আমাদের খালি সংসদে জম্মু-কাশ্মীর সংক্রান্ত আলোচনা হলে তার খবর ছাপতে হয় তাও আবার এনডিটিভি-তে দেখে! এটা অঘোষিত সেন্সরশিপ জারি করা। সরকার পুলিশকে ফোন, ইন্টারনেট দেবে কিন্তু সাংবাদিকদের দেবে না, এর অর্থ কী দাঁড়ায়? আমাদের অফিসে খালি সেনা-পুলিশের কিছু লোক এসে জবাব চাইছেন আমরা কার্ফুতে থাকা রাস্তাঘাটের ছবি কেন ছাপছি?”
  • কাশ্মীরি চ্যানেলগুলো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ এবং অচল।
  • যে কাশ্মীরি সংবাদপত্রে খানিক হলেও আন্দোলনের খবর ছাপা হয়েছে তাদের কর্তৃপক্ষের ধমকানি শুনতে হচ্ছে।
  • বিদেশি সাংবাদিকরা আমাদের বলেছেন, তাঁদেরও চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। আর ইন্টারনেটের অভাবে তাঁরা তাঁদের মুখ্য কার্যালয়গুলোর সাথে যোগাযোগও করতে পারছেন না।
  • আমরা ১৩ তারিখে যখন শ্রীনগরে সাংবাদিকদের ছাউনিতে এসে উপস্থিত হই তখন সেখানে সব সংবাদপত্রেরই কার্যালয় বন্ধ। কিছু সাংবাদিক আর সিআইডির লোক এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করছে। তাঁদের মধ্যেই একজন সাংবাদিক আমাদের বললেন ১৭ তারিখের আগে কাগজ ছাপা অসম্ভব। ছাপার জন্য যে কাগজ লাগে সেটা শেষ, দিল্লি থেকে কাগজ এলে তবেই ছাপা হবে।
  • আগেও উল্লেখ করা হয়েছে, সংবাদপত্রে কাজ করা এক গ্রাফিক ডিজাইনার কোনোরকম উস্কানি ছাড়াই সিআরপিএফ-এর পেলেট গানের গুলিতে আক্রান্ত।

 

গ্রেটার কাশ্মীর-এ বিয়ের অনুষ্ঠান বাতিল হওয়ার সারি সারি বিজ্ঞাপন। সূত্র: কবিতা কৃষ্ণান।

কাশ্মীরে কি উন্নয়নের অভাব?

টাইমস অফ ইন্ডিয়া (৯ আগস্ট, ২০১৯)-র এক প্রবন্ধে প্রাক্তন বিদেশ সচিব এবং দূত নিরূপমা রাও লিখেছেন, “এক কমবয়েসি কাশ্মীরি এক লেখককে বলছেন তার জন্মস্থান কয়েক মাস আগেও প্রস্তর যুগে ছিল, আর্থিক উন্নয়নের খাতে কাশ্মীর সারা ভারতের তুলনায় দুশো বছর পিছিয়ে আছে।”

আমরা এই ‘পিছিয়ে পড়া’, ‘প্রস্তর যুগে’র কাশ্মীর কোথাও খুঁজে পাইনি।

  • অবাক করার মতো ব্যাপার হল কাশ্মীরের প্রতিটি গ্রামে আমরা কমবয়েসি ছেলে-মেয়ে পেয়েছি যারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, সাবলীলভাবে কাশ্মীরি, হিন্দি, ইংরেজি বলতে পারে, কাশ্মীর বিতর্ককে জুড়ে সাংবিধানিক বা আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে সঠিক তথ্য এবং জানাবোঝা সহকারে আলোচনা করতে পারে। আমাদের দলের চারজন সদস্যই উত্তর ভারতের রাজ্যের গ্রামগুলোর পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত। এরকম উচ্চশিক্ষার হার উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ বা ঝাড়খণ্ডের কোনো গ্রামে দেখা যায় না।
  • কাশ্মীরের গ্রামে প্রায় সবই পাকা বাড়ি। আমরা গ্রামীণ বিহার বা উত্তরপ্রদেশে যেমন খুপরি ঘর দেখি তা কাশ্মীরে কোথাও দেখলাম না।
  • অবশ্যই কাশ্মীরে গরিব মানুষ আছেন। কিন্তু উত্তরভারতের রাজ্যগুলোতে যে পর্যায়ে দৈন্যদশা, ক্ষুধা এবং শোচনীয় দারিদ্র্য দেখা যায়, তা গ্রামীণ কাশ্মীরে একেবারেই অনুপস্থিত।
  • আমাদের সাথে উত্তরভারত, পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা অভিবাসী শ্রমিকদেরও দেখা হয় বিভিন্ন জায়গায়। তাঁরা বললেন জাতপাত নিয়ে যেসব হিংসা মহারাষ্ট্র বা গুজরাতে ঘটে থাকে তা এখানে সহ্য করতে হয় না। দিনমজুরি করা অভিবাসী শ্রমিকেরা বললেন, “কাশ্মীর হল আমাদের দুবাই। আমরা প্রতিদিন প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা রোজগার করি, আমাদের নিজেদের রাজ্য থেকে তিন-চারগুণ বেশি।”
  • কাশ্মীরকে আমরা স্বস্তিকরভাবে সাম্প্রদায়িকতার সমস্যা মুক্ত একটা জায়গা হিসেবে দেখতে পেলাম। আমরা এমন কাশ্মীরি পণ্ডিত পেলাম যাঁরা বললেন এখানে থাকতে তাঁরা সুরক্ষিত বোধ করেন, কাশ্মীরিরা তাদের সমস্ত উৎসব একসাথেই পালন করে। এক যুবক কাশ্মীরি পণ্ডিত জানালেন, “আমরা ঈদ, হোলি, দীপাবলি সব একসাথে মিলেই পালন করি, এটাই আমাদের কাশ্মীরিয়াত কাশ্মীরি সত্তা, এটা একটা আলাদাই ব্যাপার।”
  • ‘পিছিয়ে পড়া’ কাশ্মীরি নারীর গল্পটা বোধহয় সবচেয়ে বড়ো মিথ্যে। কাশ্মীরি মেয়েরা উচ্চশিক্ষার সুবিধা পান। তাঁরা স্পষ্টবক্তা এবং বক্তব্যে অটল। তবে অবশ্যই তাঁদের নিজেদের সমাজেও পিতৃতন্ত্র এবং লিঙ্গ-বৈষম্যের বিরূদ্ধে লড়াই করতে হয়। কিন্তু বিজেপির মতো দল, যাদের নেতা হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী এবং মুজফফরনগরের বিধায়ক “কাশ্মীরি বউ” আনার কথা বলেন — যেন কাশ্মীরি মেয়েরা কোনও বৈষয়িক সম্পত্তি যা লুঠ করা যায় — তাদের কাশ্মীরকে নারীবাদ শেখানোর অধিকার নেই। কাশ্মীরি মেয়ে-মহিলারা আমাদের বলেছেন, “আমরা আমাদের নিজেদের লড়াই লড়তে জানি। আমরা চাই না আমাদের যারা অত্যাচার করছে তারাই বলে বেড়াক যে তারা আমাদের স্বাধীন করেছে !”

 

বিজেপি মুখপাত্রের ‘সতর্কবার্তা’

কাশ্মীরি সংবাদপত্র ‘রাইজিং কাশ্মীর’-এর অফিসে আমাদের বিজেপি’র কাশ্মীর বিষয়ে মুখপাত্র অশ্বিনী কুমার ছ্রাঙ্গুর সাথে দেখা হয়ে যায়। কথোপকথন প্রথমে সৌজন্যপূর্ণই ছিল। উনি আমাদের জানান যে, উনি জম্মু থেকে কাশ্মীর এসেছেন মানুষকে বোঝাতে যাতে তাঁরা সরকারের ৩৭০ ধারা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানায়। তাঁর একটাই বক্তব্য — বিজেপি যেহেতু জম্মু-কাশ্মীরের ভোটের ৪৬ শতাংশ পেয়েছে তাই ৩৭০ ধারা তুলে নেওয়াটা তাদের কেবল অধিকারই না, তাদের দায়িত্ব ৩৭০ ধারা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি মেটানো। তিনি বললেন, “৪৬ শতাংশ ভোটটাই তো ছাড়পত্র!”

তিনি এটা মেনে নিতে রাজি নন যে কেবল তিনটি লোকসভা আসনে (জম্মু, উধমপুর, লাদাখ) জিতে তারা যে ৪৬ শতাংশের কথা বলছেন তা সম্ভব হয়েছে কারণ বাকি তিনটি আসনে (শ্রীনগর, অনন্তনাগ, বারামুল্লা) দেশের মধ্যে সবথেকে কম সংখ্যক ভোট পড়েছে।

প্রশ্ন করা হল, একটা সরকারের কি বন্দুকের নল দেখিয়ে কাশ্মীরের জনসাধারণের অপছন্দের একটা সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দেওয়া উচিত হল? যে সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তারা কিন্তু ভোট দেননি। ছ্রাঙ্গু উত্তর দিলেন, “বিহারে নীতিশ কুমার যখন মদ্যপানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন তখন কি তিনি মাতালদের অনুমতি চাইতে গেছিলেন? এখানেও একই ব্যাপার।” কাশ্মীরের মানুষকে তাচ্ছিল্য করাটা তার এই তুলনাটা থেকেই বোঝা যায়।

কথাবার্তার শেষের দিকে তাঁকে যুক্তি-তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে চেপে ধরা হলে তিনি বেশ চটে যান। তিনি উঠে গিয়ে জ্যঁ দ্রেজের দিকে আঙ্গুল তুলে বলেন, “আমরা তোমার মত অ্যান্টি-ন্যাশনালদের এখানে কাজ করতে দেব না, সাবধান করে দিলুম।”

 

উপসংহার

সমস্ত কাশ্মীর এই মুহূর্তে সেনার ঘেরাটোপে থাকা একটা কারাগার। জম্মু-কাশ্মীর বিষয়ে মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত অনৈতিক, অসাংবিধানিক এবং বেআইনি। কাশ্মীরিদের বন্দি করে, তাদের অসন্তোষের আওয়াজ দমিয়ে রাখার যে পন্থা সরকার নিয়েছে সেটাও অনৈতিক, অসাংবিধানিক এবং বেআইনি।

  • আমরা চাই অবিলম্বে ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা পুনর্স্থাপিত হোক।
  • আমরা গুরুত্বসহকারে বলছি জম্মু-কাশ্মীরের পরিস্থিতি বা ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তই জনগণের মত না নিয়ে নেওয়া উচিত হবে না।
  • আমরা দাবি করছি অবিলম্বে ফোন, ইন্টারনেট সহ যাবতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হোক।
  • আমরা দাবি করছি অবিলম্বে কাশ্মীরের মানুষের কথা বলার, মতপ্রকাশের, আন্দোলন করার অধিকারের কণ্ঠরোধ করা বন্ধ হোক। জম্মু-কাশ্মীরের মানুষ অসন্তুষ্ট। সংবাদমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়ায়, প্রকাশ্য জমায়েতে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের সেই অসন্তোষ প্রকাশের, প্রতিবাদ জানানোর অধিকার দিতে হবে।
  • আমরা চাই জম্মু-কাশ্মীরে সাংবাদিকদের বিবিধভাবে কণ্ঠরোধ অবিলম্বে বন্ধ হোক।

 

জ্যঁ দ্রেজ, অর্থনীতিবিদ

কবিতা কৃষ্ণান, সিপিআই (এমএল) ও এআইপিডব্লিউএ

মৈমুনা মোল্লা, এআইডিডব্লিউএ

বিমল ভাই, এনএপিএম

Share this
Recent Comments
1
  • comments
    By: Kamal on August 16, 2019

    Why indian govt. Doing all this in a very undemocratic way.Give them democrecy ,easy life style .India, pakistan,chaina –1 all 3 please left kashmir and give them peace. What UN is doing.Thanks.

Leave a Comment