শুধু ভোটব্যাঙ্ক নয়, লড়াই চলবে অধিকারের – প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে আলোচনায় বামপ্রার্থী


  • May 8, 2019
  • (0 Comments)
  • 171 Views

ভোটের প্রচারে শুধু বিজ্ঞাপনের মুখ হয়ে থাকা নয়, এক দীর্ঘ অধিকার আন্দোলনের শরিক ভারতের প্রতিবন্ধী মানুষেরা চলতি সাধারণ নির্বাচনে সোচ্চার হচ্ছেন নিজেদের দাবি-দাওয়া নিয়েও। ‘পঙ্গু’ বা ‘দিব্যাঙ্গ’ হয়ে থাকা নয়, আইনত যে অধিকার তাঁদের প্রাপ্য সেই অধিকারের জন্যই আজও জারি তাঁদের অবিরাম লড়াই। পশ্চিমবঙ্গে এই প্রথম নির্বাচনের কোনও প্রার্থী আলাদাভাবে তাঁদের সঙ্গে সভা করলেন, উঠে এল প্রতিবন্ধী মানুষদের নানা বিষয় ।লিখেছেন সুদর্শনা চক্রবর্তী 

 

উত্তর কলকাতার মহাবোধি সোসাইটি হলে প্রবেশের মুখে একটি কাঠের পাটাতন দিয়ে র‍্যাম্প তৈরি করা। সাধারণত কোনও আলোচনাসভার হল-এই এ ধরনের উদ্যোগ চোখে পড়ে না। পড়ল, কারণ এই সভাটি দেশের সাধারণ নির্বাচন চলাকালীন বামফ্রন্ট-এর সিপিআই(এম) দলের উত্তর কলকাতার প্রার্থী কনীনিকা বোস (ঘোষ)-এর প্রতিবন্ধী মানুষদের সঙ্গে আলোচনার জন্য আহ্বান করা হয়েছিল। এবারের নির্বাচনের প্রচারে আলাদা করে স্থান করে নিয়েছেন প্রতিবন্ধী মানুষেরা, তাঁদের ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপনী প্রচার চোখে পড়েছে। বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধী, মানসিক প্রতিবন্ধীদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের প্রশিক্ষণের কর্মশালার কথাও জানা গেছে। তবে শুধু ভোট দেওয়া নয়, নিজেদের দাবি-দাওয়া নিয়ে তাঁদের যে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথাবার্তা চালানোর পরিসর তৈরি করাও প্রয়োজন এ কথা এতদিন বিশেষ ভাবা হয়নি।

 

কনীনিকা তাঁর প্রচারে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের সঙ্গে আলাদা করে দেখা করে কথা বলছেন, এই উদ্যোগ নির্বাচনে এর আগে চোখে পড়েনি। গত ৫ই মে রবিবার প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে সভা করেন তিনি। আগের সপ্তাহেই সভা করেছিলেন সমকামী-রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গে।  তবে এই উদ্যোগে শুধু আলাদা করে প্রার্থীর কথা নয়, বলা প্রয়োজন সিপিআই(এম) দলের প্রতিবন্ধী সচেতন ইশ্‌তেহারের কথা। এই প্রথম কোনও রাজনৈতিক দল তাঁদের ইশ্‌তেহারে প্রতিবন্ধী মানুষদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার প্রসঙ্গ এমন বিশদে উত্থাপন করেছে।  মোট ১৩ দফা দাবির উল্লেখ আছে এই ইশ্‌তেহারে।

 

  • প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত আইনের দ্রুত রূপায়ণ এবং তার জন্য বাজেট বরাদ্দ।
  • প্রতিবন্ধী সংক্রান্ত সমস্ত আইনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সনদ স্বীকৃত অধিকারের সঙ্গে সাযুজ্য বিধান।
  • জাতীয় প্রতিবন্ধী নীতির মূল্যায়ণ ও সংশোধন।
  • শংসাপত্র প্রদান পদ্ধতির সরলীকরণ। দ্রুততার সঙ্গে আধার কার্ড প্রদান।
  • সরকারি দপ্তরে দীর্ঘকাল পড়ে থাকা শূণ্য পদগুলি অবিলম্বে পূরণ করা। যোগ্যতা অনুযায়ী নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করা।
  • সমস্ত সরকারি গৃহ, প্রকাশ্য স্থান, যানবাহন ও অন্যান্য সমস্ত ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা করা।
  • মূক ও বধিরদের জন্য প্রকাশ্য স্থানে বিশেষ ধরনের ভাষা চিহ্ন এবং রেডিও টিভিতে শ্রবণগ্রাহ্য অনুষ্ঠান চালু করা।
  • প্রতিবন্ধীদের জন্য ন্যূনতম ৬০০০ টাকা পেনশনের বন্দোবস্ত করা এবং ভোগ্যপণ্য সূচকের সঙ্গে তাকে যুক্ত করা। দেখভাল করার মানুষের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা। সামাজিক সম্মান ও সুরক্ষার জন্য সমস্ত রকম ব্যবস্থা নেওয়া।
  • বিনামূল্যে সমস্ত রকম উপকরণ প্রদান, প্রতিবন্ধী মানুষের প্রয়োজনে লাগা সমস্ত ধরনের উপকরণ এবং বিশেষ ধরনের যানের উপর জিএসটি বিলোপ এবং উৎপাদকের ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিটের সুযোগ দেওয়া।
  • স্কুল পরিকাঠামো, সিলেবাসসহ প্রতিবন্ধী সহযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা। প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা রূপায়ণ করা।
  • এমপি ল্যাড (লোকাল এরিয়া ডেভেলপমেন্ট) তহবিল থেকে সমস্ত প্রতিবন্ধী সরঞ্জামের জন্য সাহায্য প্রদানের সুযোগ সম্প্রসারিত করা।
  • প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার আইন, ২০১৬ অনুযায়ী সমস্ত প্রতিবন্ধী মানুষের বিশেষ পঞ্জীকরণ।
  • সরকারী উদ্বৃত্ত জমি ও সিলিং বহির্ভূত জমি বিলির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী সদস্যযুক্ত পরিবারের অগ্রাধিকার।

 

উল্লেখ করা যেতে পারে, এই ইশ্‌তেহারটি দৃষ্টিহীন মানুষদের জন্য শ্রাব্য মাধ্যমে রয়েছে (অডিও ভার্শন) ও বধির মানুষদের জন্য রয়েছে সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ-এর ভিডিও-তে। এদিনের সভা শুরু হয় এই সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ-এর ভিডিওটি দেখিয়ে। এদিনের সম্পূর্ণ সভাটিও সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ-এ মূক ও বধির মানুষদের জন্য উপস্থাপিত করা হয় ও তাঁদের বক্তব্যও একইভাবে তুলে ধরা হয়।

 

এদিনের আলোচনা সভায় কনীনিকা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ কলকাতার সিপিআই(এম)প্রার্থী নন্দিনী মুখোপাধ্যায়, প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকার আন্দোলনের জাতীয় মঞ্চ “ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম ফর দ্য রাইটস্‌ অফ দ্য ডিসএবেলড্‌”-এর যুগ্ম সম্পাদক শম্পা সেনগুপ্ত, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রতিবন্ধী সম্মিলনীর তরফে অনির্বাণ মুখার্জী প্রমুখ। এই বক্তারা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতাসম্পন্ন মানুষেরা, অভিভাবকেরা হাজির ছিলেন প্রার্থীর বক্তব্য শোনার জন্য ও নিজেদের অভিযোগ, দাবি, বক্তব্য তুলে ধরার জন্য। উপস্থিত ছিলেন প্যারা অলিম্পিকস্‌-এ অংশগ্রহণকারী দু’জন খেলোয়াড় সুফিয়া মোল্লা ও আজিবুর রহমান মোল্লা।

 

শম্পা সেনগুপ্ত তাঁর বক্তব্যে খুব সংক্ষেপে তুলে ধরেন প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকার আন্দোলন ও তাঁদের দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজ্যের শাসক দল, কেন্দ্র সরকার ও অন্যতম বিরোধী দলের মানসিকতা ও নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে তাঁদের প্রকাশিত বক্তব্য। রাজ্যের শাসক দলের ইশ্‌তেহারে আলাদা করে প্রতিবন্ধী মানুষদের কোনও উল্লেখ নেই, কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা দল যথারীতি ‘দিব্যাঙ্গ জন’ বলে উল্লেখ করে ফিক্সড ডিপোজিট-এ তাঁরা টাকা রাখলে সেখানে সুদের হার বাড়াবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। যেখানে প্রতিবন্ধী মানুষদের জীবন-জীবিকাই এখনও প্রশ্নচিহ্নের সামনে রয়েছে সেখানে এহেন বক্তব্য নিছকই অবাস্তব! শম্পা বলেন প্রতিবন্ধী উন্নয়নে বাজেট বৃদ্ধি, জীবিকার সংস্থান, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে গুরুত্বপ্রদান, প্রতিবন্ধী মহিলাদের উপর ঘটতে থাকা হিংসা কমানোর জন্য উদ্যোগ নেওয়ার কথা, উল্লেখ করেন ভারতে প্রতিবন্ধী আন্দোলনের কিছু ঘটনাও।

 

নন্দিনী মুখোপাধ্যায় উল্লেখ করেন, কীভাবে বামপন্থী দলগুলি শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, সারা দেশ জুড়ে প্রতিবন্ধী আন্দোলনে সর্বদাই শামিল হয়েছে এবং তিনি মনে করেন সংসদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসাবে প্রতিবন্ধী মানুষদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরা অন্যতম দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তিনি জানান, বাম প্রার্থীরা যদি সংসদে শক্তিশালী জায়গায় পৌঁছয় তাহলে বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রতিবন্ধী মানুষদের জীবনযাপন, শিক্ষা ও জীবিকায় যে উন্নতি ঘটানো সম্ভব তাতে তাঁরা বিশেষভাবে নজর দেবেন। তিনি বলেন, “দীর্ঘ বহু বছর ধরে আমরা যেভাবে এই আন্দোলনের শরিক, ভবিষ্যতেও একইভাবে তা বজায় থাকবে।”

 

উত্তর কলকাতার সিপিআইএম প্রার্থী কনীনিকা বোস (ঘোষ) এদিনের সভায় ছিলেন অন্যতম মূল বক্তা – সভার প্রচারেও বলা হয়েছিল –“প্রতিবন্ধকতার বিরূদ্ধে, প্রতিবন্ধীদের আগামীর লড়াই-এর অঙ্গীকারে”। নিজের বক্তব্যে তিনি মূলত জোর দেন সর্বস্তরে প্রতিবন্ধী মানুষদের ‘অ্যাকসেসিবিলিটি’-র উপরে। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের ‘ডিজিটাল ভারত’-এর প্রচারে প্রতিবন্ধীদের ‘অ্যাকসেসিবিলিটি’ বিষয়টি যেন নিখোঁজ হয়ে গেছে। বহুলপ্রচারিত ‘আচ্ছে দিন’ বাকি সকলের মতই তাঁদের জন্যও আসেনি। উন্নয়ন যে আসলে প্রতিবন্ধী মানুষদের বাদ দিয়ে সম্ভব নয় এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য-জীবিকা-খেলাধূলা-সংস্কৃতিচর্চা সবেতেই যে তাঁদের সমান অধিকার আছে ও সে বিষয়ে সরকারের নজর দেওয়া প্রয়োজন একথাই তুলে ধরেন তিনি। আশ্বাস দেন আগামী দিনেও প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার আইন (২০১৬) বাস্তবায়নের জন্য লড়াইতে তিনি ও দল শামিল থাকবেন এবং স্কুল-ব্যাঙ্ক-রাস্তাঘাট সহ সর্বত্র ‘অ্যাকসেসিবিলিটি’ রূপায়ণে নজর দেবেন।

 

সভার শেষে সংক্ষিপ্ত কথোপকথনে তাঁকে প্রশ্ন করি – এই যে বিভিন্ন প্রান্তিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনাসভা,এ কি দলের নির্দেশ না তাঁর নিজস্ব পরিকল্পনা? উত্তরে বললেন, “উত্তর কলকাতার দলীয় সংগঠকদের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা এই পরিকল্পনাটা নিয়েছি। কারণ বিশ্বাস করি ম্লান মূঢ় মূক মুখে দিতে হবে ভাষা। যাদের নিয়ে কেউ ভাবে না, আমাদের তো তাঁদের কথাই ভাবা দরকার। সিপিআইএম ইশতেহারেও সেই কথা বলেছে। আমিও তাই সেই বিষয়গুলিকেই গুরুত্ব দিতে চেয়েছি।” কিন্তু কেন এমন ভাবনা? “মহিলা ও প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে লড়াই করি সব সময়ে। তাই না পাওয়া, সুযোগ না পাওয়া, নিপীড়ন, শোষন, বঞ্চনা এগুলো মর্মে মর্মে উপলব্ধি করি। তাই আমি মনে করি তাদের জন্য তাদের নিয়ে লড়াই করাটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ,”বক্তব্য তাঁর। প্রতিবন্ধী মানুষদের ভোটের সময় সবচেয়ে বড় সমস্যা কী বলে মনে করেন তিনি? স্পষ্ট জানালেন, “নিঃসন্দেহে অ্যাকসেসিবিলিটি এক নম্বর সমস্যা। এখন নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের আগে ভাবছেন। কিন্তু সরকার কেন ভাববে না বলুন তো? সমস্ত জায়গায় এটি থাকা দরকার। আমি সুযোগ পেলে অবশ্যই করব।” প্রতিবন্ধী মানুষদের নানা অসুবিধার জন্য তাঁদের ভোট অন্যে দিয়ে দেওয়া… প্রশ্ন শেষ করতে দিলেন না, “হ্যাঁ অনেক বেশি হয়। সেইজন্য অ্যাকসেসিবিলিটি-তে ও তাঁদের বুথ পর্যন্ত পৌঁছানো ও নিজের ভোট নিজে দেওয়ার উপর সর্বতোভাবে নজর দিতে হবে।”

 

এদিনের আলোচনায় বিভিন্ন মানুষ তাঁদের মতামতই পেশ করেন প্রার্থীদের সামনে। কেউ যেমন বলেন – মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে আরও বিশদে আলোচনার পরিসর তৈরির কথা, কেউ বলেন প্রতিবন্ধীদের শুধু খেলাধূলা সংক্রান্ত কোনও প্রকল্প এলে সুবিধা হয়, কেউ মনে করিয়ে দিলেন নিজেরা প্রতিবন্ধী হয়ে এই সম্প্রদায়ের অন্য মানুষদের জন্য অনেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে শিক্ষা, জীবিকা ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করেন যেখানে আর্থিক সমস্যা অনেক সময়েই বড় হয়ে ওঠে, এক্ষেত্রে সরকার সাহায্য করলে বিশেষ সুবিধা হয়।

 

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রতিবন্ধী সম্মীলনীর পক্ষ থেকে অনির্বাণ মুখার্জী তাঁর বক্তব্যে বলেন, প্রতিবন্ধকতা “জয়” করে নয়, প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গে করেই তাঁদের এগিয়ে চলতে হয়। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিবন্ধী মানুষদের ‘দিব্যাঙ্গ’ বলায় তীব্র প্রতিবাদ জানান, উঠে আসে প্রধানমন্ত্রীর গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড-এ নাম তোলার জন্য আশি হাজার প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দেওয়ার প্রসঙ্গ, যেখানে তাঁদের আসতে হয় অথচ তাঁদের কাছে এগুলি পৌঁছে দেওয়া হয় না। প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার আইন (২০১৬) থাকা সত্ত্বেও তার বাস্তবায়ন না হওয়ার কথাও তুলে ধরেন তিনি। রাজ্য সরকারের দায়িত্বপূর্ণ মন্ত্রীর কাছে অন্যদিকে প্রতিবন্ধী মানুষদের সঠিক সংখ্যা না থাকার কথাও মনে করিয়ে দেন। অনির্বাণ তুলে ধরেন অসম্মানজনক ভাষা প্রয়োগের দিকটিও যেখানে মন্ত্রী ব্যাঙ্গার্থে ‘কানা, খোঁড়া’ শব্দগুলি প্রয়োগ করেন, স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মানবিক ভাতা দেওয়ার প্রসঙ্গে ব্যবহার করেন ‘পঙ্গু’ শব্দটি। তিনি যথাযথ বলেন যে এই নির্বাচনে ‘পঙ্গু’ বা ‘দিব্যাঙ্গ’ হিসাবে বেঁচে থাকার জন্য ভোট দেবেন না প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তি। যাঁরা প্রতিবন্ধকতা নিয়েই সম্মান ও অধিকারের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে চান সেই হিসাবে ভোট দেবেন তা প্রতিবন্ধী মানুষদেরই বেছে নিতে হবে।

 

অনির্বাণের কাছে জানতে চাইলাম এই ইশতেহারের ফলে নির্বাচনে কতটা প্রভাব আশা করছেন – বললেন,“এখনও প্রতিবন্ধী মানুষেরা অনেক ক্ষেত্রেই ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। পরিবারের চাপ থাকে। সেক্ষেত্রে সরাসরি ভোটের ফলাফলে কী প্রভাব পড়বে এখনি বলতে পারব না। তবে এর একটা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব অবশ্যই তৈরি হবে। এবং এধরনের সভা নির্বাচন পরবর্তী সময়েও লাগাতার চালিয়ে যেতে হবে।” কীভাবে নির্বাচনের পরে কাজ করা দরকার? “দেখুন প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই তো পলিটিক্যাল অ্যাজেন্ডা বা বৃহত্তর রাজনৈতিক কর্মসূচী থাকে। সেখানে প্রতিবন্ধকতার বিষয়গুলিকে অর্ন্তভুক্ত করতে হবে। যেমন যখন সকলের জন্য ৬০০০ টাকা পেনশনের কথা বলা হচ্ছে তখন কৃষক, শ্রমিকদের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী মানুষদের উল্লেখটাও থাকুক। মানে শুধু নির্বাচনের সময়ে আলোচনায় ডাকলাম তারপর তাদের নিয়ে কথা বললাম না, তা নয়। নিয়মিত কাজ চালিয়ে যেতে হবে,” জানালেন তিনি। অনির্বাণ দৃষ্টিশক্তিজনিত প্রতিবন্ধী। ভোটে কী কখনও অসুবিধায় পড়েছেন? উত্তরে বললেন, “একেবারে শুরুতে ২০০৩-এ যখন সঙ্গী নিয়ে ভোট দিতে হত, তখন  প্রিসাইডিং অফিসার আমার পছন্দের সঙ্গী নিয়ে ভোট দিতে দিচ্ছিলেন না। আর ২০০৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে প্রথম ব্রেইল ব্যালট আসে। আমি ভোট দিতে গিয়ে সেটি চাওয়াতে বুঝতে পারি প্রিসাইডিং অফিসার-ই বিষয়টি নিয়ে জানেন না।” প্রতিবন্ধী মানুষদের ক্ষেত্রে কী ছাপ্পা ভোটের আশঙ্কা বেশি থাকে? অনির্বাণ বললেন, “বলা শক্ত। তবে যেটা হয়, তাঁদের অ্যাকসেসিবিলিটি-র ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত বাধা তৈরি করা। যেমন ২০০১৪-তে হয়েছিল। একটি বুথ দখল হয়ে যাওয়ার পর হুইল চেয়ারে থাকা এক মহিলা ভোটার বুথে ঢোকার চেষ্টা করলে তাঁকে হুইল চেয়ার থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। তাছাড়া প্রতিবন্ধী বয়স্ক ভোটার, দৃষ্টিশক্তিহীন ভোটারদের ভোট দিয়ে দেওয়ার ঘটনার কথাও জানতে পারা যায়।”

 

এদিনের সভায় চোখে পড়ার মতো উপস্থিতি ছিল মূক ও বধির সম্প্রদায়ের প্রতিবন্ধী মানুষদের। সভাশেষে সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ ইন্টারপ্রেটার রজনী ব্যানার্জীর মাধ্যমে তাঁদের সাথে কথা বলা গেল। বাদল কুমার মুখার্জী গত ৪৮ বছর ধরে ভোট দিচ্ছেন। তিনি বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যকলাপে একেবারেই খুশি নন। বামফ্রন্টের এই সমর্থক জানালেন বামফ্রন্ট নেতৃত্বকেই পাশে পেয়েছেন। তবে কখনও ভোট দিতে গিয়ে কোনও সমস্যায় পড়েননি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রেস-এর প্রাক্তন এই কর্মচারী। প্রতিবন্ধী ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন-এর সঙ্গেও যুক্ত এই প্রাক্তন ক্রিকেটার। এসেছিলেন হ্যান্ডিক্যাপড্‌ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন-এর সম্পাদক সুমন্ত ঘোষ, তিনি নিজের উদ্যোগে ইন্টারপ্রেটার জোগাড় করে বিভিন্ন জায়গায় উপস্থিত থাকেন। তিনি এছাড়াও নিজে ব্যক্তগতভাবে মূক ও বধির এবং নানা প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মহিলা, শিশুদের নানাভাবে সাহায্য করেন। নির্বাচনে প্রতিবন্ধীদের অংশগ্রহণে অসুবিধা প্রসঙ্গে জানালেন তাঁর বক্তব্য। রজনী অনুবাদ করে বললেন, মুক ও বধিররা শুধু দেওয়াল লিখনটুকুই দেখতে পান। ভাষার সমস্যার জন্য অনেকেরই সংবাদপত্র পড়তে অসুবিধা হয়। টিভি বা রেডিওর খবর শুনতে পারেন না। ইন্টারপ্রেটার নেই। এই যে প্রথমবার তাঁরা ইন্টারপ্রেটার পেলেন, বুঝলেন এতে তাঁদের বিশেষ সুবিধা হল। যদিও ভোটের দিন আলাদা করে কোনও অসুবিধা হয় না। যদিও বধিরদের চাকরির সুযোগ প্রায় নেই, কোথাও আবেদন করলেও সুযোগ আসে না। কেন্দ্রীয় সরকার ‘দিব্যাঙ্গ’ বলাতেও যেমন সুবিধা পাননি, তেমনি রাজ্য সরকারের মানবিক প্রকল্পের টাকাও মূক ও বধিররা পাচ্ছেন না। রজনী জানালেন, মূক ও বধির যেসব মেয়েরা সাধারণ স্কুলে পড়েন, হয়তো ভাষা সমস্যার কারণে এক বছর বাদ দিতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁরা পরের বছর মাধ্যমিক পাশ করলে কন্যাশ্রীর টাকা পাচ্ছেন না। অথচ সাধারণ মেয়েরা এরকম একই ঘটনায় টাকা পাচ্ছেন। সুমন্তকে জিজ্ঞেস করলাম কেন্দ্রে সরকারের বদল চান কি না। সুমন্ত ও সঙ্গে বাদলও এক বাক্যে জানালেন অবশ্যই বদল চান।

 

রজনী একজন সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ ইন্টারপ্রেটার হিসাবে জানালেন, “এর আগে আমাদের রাজ্যে ভোটের প্রচারে বা রাজনৈতিক মঞ্চে সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ ইন্টারপ্রেটার আসেননি। এ রাজ্যে গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর পরে রাজ্যপালের ভাষণেও এর ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে। স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, রাজ্যপালের বক্তব্য কিছুই তাঁরা জানতে পার‍ছেন না। আমাদের রাজ্যে প্রচুর সংখ্যায় “স্পেশাল এডুকেটর” নিয়োগ হওয়া প্রয়োজন যা আদপেই হচ্ছে না। সর্বশিক্ষা মিশনে একটা জেলায় বড়জোর দু’জন নিয়োগ হচ্ছেন। এতগুলো ব্লক তাঁরা কীভাবে সামলাবেন? কোনও ইন্টারপ্রেটার নেই। মাধ্যমিকে ইন্টারপ্রেটার বাধ্যতামূলক, অথচ সেসময় ইন্টারপ্রেটার খুঁজে পাওয়া যায় না। তাহলে রাজ্য সরকারের তো কয়েক জন ইন্টারপ্রেটার রাখা প্রয়োজন যাতে তাঁরা বিনামূল্যে পান। এবং প্রতিটি স্কুলে অবশ্যই অন্তত একজন স্পেশাল এডুকেটর রাখা দরকার। প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষাক্ষেত্রে এটুকু সরকারকে করতেই হবে। প্রতিবন্ধী মানুষদের শুধু ভোটব্যাঙ্ক ভাবলে চলবে না। ভোট চাইলে তাদের অধিকার রক্ষায় কাজও করতে হবে।”

 

প্রতিবন্ধী মানুষদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের প্রশ্নে নানাভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রইল এই সভা।

 

লেখক সাংবাদিক এবং ডকুমেন্টারি নির্মাতা। ছবির সুত্রঃ লেখক। 

 

 

Share this
Leave a Comment