উচ্ছেদ মানে জীবনের অধিকার কেড়ে নেওয়া। শীর্ষ আদালতের রায়ে বিপন্ন লক্ষ লক্ষ বনবাসী


  • February 27, 2019
  • (0 Comments)
  • 718 Views

১৩ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের এক ডিভিশন বেঞ্চ ১৬টি রাজ্যকে এক নির্দেশে জানিয়েছিলরাজ্যগুলি তাদের হিসেব অনুযায়ী বন থেকে ১১. লক্ষ আদিবাসী এবং অন্যান্য বনবাসীদের উচ্ছেদ করার যে নির্দেশ জারি করেছে তা বাস্তবায়িত করুক এবং ২৪ জুলাইয়ের মধ্যে তা করতে হবে। ১২ জুলাইয়ের মধ্যে রাজ্যগুলিকে জানাতে হবে কেন তারা কাজ করে উঠতে পারেনি। যুদ্ধংদেহী পরিবেশ পরিস্থিতিতে এই ভয়াবহ নির্দেশ তেমন করে খবর হয়ে উঠতে পারেনি। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানিয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারিবৃহস্পতিবার এই আবেদন শুনবে শীর্ষ আদালত। লিখেছেন দেবাশিস আইচ

 

একটি রায় কেড়ে নিল মানুষের, লক্ষ লক্ষ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার। জীবনের অধিকার। না, কোনও স্বৈরতান্ত্রিক সরকার নয়, আমাদের দেশের শীর্ষ আদালত এমনই রায় দিয়েছে। আগামী পাঁচ মাসের মধ্যে দেশের ১৬টি রাজ্যের ১১.৮ লক্ষ বনবাসীকে তাদের ঘরবাড়ি, বনগ্রাম থেকে উচ্ছেদ করতে হবে।আমাদের রাজ্যের ক্ষেত্রে সংখ্যাটি ৮৬,১৪৬। এই সেই বন যা এই বনবাসীদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। “বনবাসী তফশিলি জনজাতি এবং অন্য পারম্পরিক বনবাসীদের বনাধিকার স্বীকার আইন”  বা  বনাধিকার আইন, ২০০৬ -এর প্রস্তাবনায় দেশের বনাঞ্চল এবং বনবাসীদের অধিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে, “যে সব বনবাসী মানুষের অস্তিত্ব বনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য জড়িত, যাঁদের ছাড়া বন এবং বনভূমির দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ সম্ভব নয়, নিজেদের আদি বাসভূমি এবং বাসস্থানের অরণ্যে তাঁদের অধিকারগুলি ঔপনিবেশিক সময় থেকেই ঠিকঠাক স্বীকার করা হয়নি। এমনকি স্বাধীন ভারতেও এই অধিকারগুলি স্বীকৃতি পায় না, এবং এর ফলে বনবাসী মানুষদের প্রতি এক ঐতিহাসিক অন্যায় সংগঠিত হতে থাকে।” (বনাধিকার আইন, ২০০৬ লড়াইয়ের হাতিয়ার, ২০০৯)।

 

কথা ছিল এই আইন জল-জঙ্গল-জমি’র উপর বনবাসীদের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করবে। উন্নয়নের অছিলায় তাদের আর স্বভূমি থেকে উচ্ছেদ করে যাবে না। একদিকে তারা যেমন গৌণ বনজ সম্পদের উপর তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, তেমনই বন, বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করবে। না খুব সহজ পথে এই আইন বলবৎ হয়নি। গোড়া থেকেই এই আইনের বিরোধিতা করে এসেছে ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফার্স্ট’, ‘নেচার কন্সারভেশান সোসাইটি’ ও ‘টাইগার রিসার্চ এন্ড কন্সারভেশান ট্রাস্ট’ জাতীয় সংরক্ষণ লবি। এই আইনের বিরুদ্ধে এক রকম যুদ্ধ ঘোষণা করে বিভিন্ন এনজিও। এর সুরে সুর মেলায় বনকর্তারাও। মদত ছিল খনি মালিক এবং উন্নয়নপন্থীদের। বন সংরক্ষণের নামে, বড়ো বাঁধ, খনি, শিল্প, রাস্তা, সেনাছাউনি জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্পের জেরে লক্ষ লক্ষ মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। পরিকল্পনা পর্ষদের হিসেব অনুযায়ী ১৯৫১ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত উচ্ছেদ হওয়া মানুষের সংখ্যা দু’কোটির বেশি। এর মধ্যে ৮৫ লক্ষ আদিবাসী। যা মোট উচ্ছেদ হওয়া মানুষের ৪০ শতাংশের বেশি। এর পরও উচ্ছেদ থেমে থাকেনি। এর পরও বন-সম্পর্কিত মামলার প্রাথমিক শুনানির জন্য শীর্ষ আদালত বনদপ্তর এবং কর্পোরেট মদতপ্রাপ্ত “বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের” এনজিও নিয়ে যে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা সম্পন্ন কমিটি বা সিইসি গঠন করে দেয়, তাদের তত্ত্বাবধানেও উচ্ছেদ হয় লক্ষ লক্ষ বনবাসী। অর্থাৎ,আঘাতটা হঠাৎ করে আসেনি। এই আইনের বিরুদ্ধে শীর্ষ আদালতে বার বার মামলা হয়েছে।

 

বনবাসী হিসেবে যাঁরা তাঁদের অধিকার প্রমাণ করতে পারেননি তাঁদের উচ্ছেদ করার আবেদন জানায় ওয়াইল্ডলাইফ ফার্স্ট এবং আরও কয়েকটি সংগঠন।ঠিক কত মানুষ আবেদন জানিয়েছেন, কত জনের দাবি নসাৎ হয়েছে তার হিসেব নেই কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেও। কেন্দ্রীয় আদিবাসী বিষয়ক মন্ত্রকের সচিব দীপক খাণ্ডেকার জানিয়েছেন,সারা দেশে ১৯ লক্ষ জনকে তাঁদের দাবি মোতাবেক পাট্টা দেওয়া হয়েছে। এটুকু হিসেবই তাদের কাছে আছে। কত জন বাদ পড়েছেন রাজ্যগুলির কাছে তার হিসেব চাওয়া হয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশ জানিয়েছে ১.৪ লক্ষ হেক্টর জমি দখল করা হয়েছে এবং রাজ্য ৬৬,৩৫১টি আবেদন বাতিল করেছে। মধ্যপ্রদেশের দাবি, তারা ২,০৪,১২৩ জন আদিবাসী এবং ১,৫০,৬৬৪ জন অন্যান পারম্পরিক বনবাসীদের দাবি বাতিল করেছে। শীর্ষ আদালতকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার দাবি বাতিলের যে হিসেব দিয়েছে তার সংখ্যা হল, ৫০,২৮৮ জন আদিবাসী এবং ৩৫,৮৫৫ জন অন্যান্য।

 

এ কথা আমাদের বিশ্বাস করতে হবে যে, এই বিপুল সংখ্যক মানুষের উচ্ছেদে যাঁরা মরিয়া তাঁরা আদৌ প্রত্যেকটি দাবি ন্যায়সঙ্গত ও স্বচ্ছপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাতিল করেছেন? বিভিন্ন রাজ্যের বনদপ্তর, ভূমিদপ্তর যারা বনাধিকার আইনের ঘোর বিরোধী, বিভিন্ন সরকার যারা বনে তাদের মৌরসিপাট্টা কোনোভাবেই ছেড়ে দিতে রাজি নয়,তাদের কীভাবেই বা বিশ্বাস করা যাবে?  কেন্দ্রীয় সরকারের যেখানে নীতিই হল, যত বেশি সম্ভব বনাঞ্চলকে এক-বৃক্ষ বাগিচায় রূপান্তরিত করা, বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া কিংবা আদিবাসী প্রধান অঞ্চলের খনিজ সমৃদ্ধ পাহাড়-জঙ্গল বেচে দেওয়া তাদের বিশ্বাস করা যাবেই বা কী করে? একটি সমীক্ষা বলছে, ২০০০ সালে ইউক্যালিপটাস জাতীয় বাগিচা-বন ছিল ৩৪০ লক্ষ হেক্টর। ২০২০ সাল নাগাদ এই বাণিজ্যিক  বাগিচার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য হয়েছে ৬৫০-৭০০ লক্ষ হেক্টর। অতএব,বনবাসীদের যত বেশি বেশি সম্ভব উচ্ছেদ করাটা জরুরি হয়ে পড়েছে।

 

আমাদের রাজ্যের দিকে যদি তাকাই তবে দেখব, প্রথম থেকেই এই আইনটিকে পঙ্গু করে দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়েছে তৎকালীন বাম সরকার। ২০০৮ সালের মার্চ মাস থেকে বনাধিকার আইন চালু হয়। রাজ্য সরকার বনাধিকার আইন অনুযায়ী ‘গ্রামসভা’র যে সংঙ্গা মানতে চাইল না। সম্পূর্ন বেআইনি ভাবে এক নির্দেশিকা জারি করে রাজ্য পঞ্চায়েতি আইন অনুযায়ী স্বীকৃত যে গ্রাম বা গ্রামসংসদ এবং রাজনৈতিক দল শাসিত গ্রাম উন্নয়ন সমিতিকে গ্রামসভার বন অধিকার সমিতিতে পরিণত করল। অথচ, আইন মোতাবেক ‘গ্রামসভা’ বা ‘গ্রাম’ বলতে বোঝায় বনগ্রামের বাসিন্দারা যাকে গ্রাম বলেন তা-ই গ্রাম আর যেখানে যাঁরা বসবাস করে আসছেন শুধুমাত্র তাঁদের নিয়েই তৈরি হবে গ্রামসভা।

 

বাম সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সেই সময় যেখানেই বনবাসীরা গ্রামসভা তৈরি করে তাঁদের অধিকার সুনিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন সেখানেই নেমে এসেছে হুমকি,নির্যাতন, মিথ্যা মামলা, গ্রেফতার। যে মামলাগুলি আজও চলেছে। বর্তমান সময়েও সরকারের ভূমিকা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। কালিম্পঙের  রংপো গ্রামসভা বনাধিকার আইন মোতাবেক নিজেদের অধিকার দাবি করেছিল। সেই দাবি স্রেফ নসাৎ করে দেওয়া হয়নি, দার্জিলিং জেলা প্রশাসন ও পুলিশ এই আন্দোলন ভেঙে দিতে সব ধরণের পদক্ষেপ করে। শেষ পর্যন্ত কলকাতা হাইকোর্ট সাম্প্রতিক রায়ে জানিয়ে দেয়, গ্রামসভা গঠনের আগে ওই অঞ্চলে সরকার কোনোভাবে কোনো নির্মাণ কাজ বা উচ্ছেদ করতে পারবে না। বনাধিকার আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কীভাবে পাহাড়-বন ডুবিয়ে উন্নয়ন করা যায় তার একটি প্রচেষ্টা হচ্ছে অযোধ্যা পাহাড়ে তুর্গা পাম্প স্টোরেজ প্রকল্প। দেশের বনাঞ্চলের সাম্প্রতিক হালহকিকত সম্পর্কিত ফরেস্ট সার্ভে অব ইন্ডিয়ার সমীক্ষা জানাচ্ছে, বিগত দু’বছরে এ রাজ্যে বনাঞ্চল কমেছে ২ শতাংশ। জঙ্গলমহল বলে কথিত পশ্চিম মেদিনীপুরে এই বনহ্রাসের পরিমাণ ১৯ শতাংশ এবং দার্জিলিঙে ১১ শতাংশ।

 

এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকার বর্তমান উচ্ছেদ রায়ের উপর স্থগিতাদেশ চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে ফের আবেদনে জানিয়েছে। নির্বাচন বড়ো বালাই। ২৮ ফেব্রুয়ারি,বৃহস্পতিবার তার শুনানি।

 

লেখক স্বতন্ত্র সাংবাদিক এবং সামাজিক কর্মী।

 

ফিচার ছবি: সূর্য দাশের ফেসবুক টাইমলাইন থেকে নেওয়া।

 

Share this
Leave a Comment