আণ্ডা সেলে জি. এন. সাইবাবার শারীরিক অবস্থার আশঙ্কাজনক অবনতি


  • January 30, 2019
  • (0 Comments)
  • 670 Views

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জি. এন. সাইবাবাকে মহারাষ্ট্র পুলিশ ২০১৪ সালে গ্রেফতার করে, “নকশাল ভাবাদর্শ”-এ বিশ্বাস করার “অপরাধে” এবং ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)-র সাথে সম্পর্ক রাখার অভিযোগে। ৯ই মে ২০১৪ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পথে সাদা পোশাকের পুলিশ সাইবাবার গাড়ির চালককে গাড়ি থেকে জোর করে নামিয়ে দিয়ে শারীরিকভাবে ৯০% অক্ষম সাইকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরদিন সকালে তাঁকে প্লেনে চড়িয়ে নাগপুর নিয়ে যাওয়া হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। গ্রেফতারির সঙ্গে সঙ্গে সাইবাবাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। ১৪ মাস জেলে থাকার পর জুলাই ২০১৫-এ বোম্বে হাই কোর্ট সাইবাবাকে ৬ মাসের জামিন দেয়, শারীরিক অসুস্থতার কারনে। ডিসেম্বর মাসে সাইকে পুনরায় জেলে যেতে হয়। ২০১৬-র এপ্রিল মাসে সুপ্রীম কোর্ট তাঁর জামিন মঞ্জুর করে। ২০১৭ মার্চে গঢচিরোলি জেলাকোর্ট সাইবাবাকে UAPA এবং ১২০বি ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। ভিড়ে ঠাসা কোর্টরুমে মুখ্য জেলা ও সেশন্স জজ এস.এস.শিন্দে বলেন, “শুধুমাত্র ৯০% শারীরিক অক্ষমতা সাইবাবাকে রেহাই দেওয়ার জন্য যথেষ্ট কারণ নয় … উনি শারীরিকভাবে অক্ষম হতে পারেন কিন্তু মানসিক ভাবে সক্ষম। উনি একজন ‘থিংক ট্যাঙ্ক’ এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রমুখ নেতা।” সাইবাবার সঙ্গে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় আরও ৪ জনের – ছাত্র রাজনীতির কর্মী হেম মিশ্র, মানবাধিকার কর্মী প্রশান্ত রাহী, এবং মহেশ তিরকি ও পাণ্ডু নারোতে নামের দু’জন আদিবাসীর। বিজয় তিরকি নামের অন্য আরেকজনকে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সেই থেকে সাইবাবাকে নাগপুর সেন্ট্রাল জেলের আণ্ডা সেলে আটক করে রাখা হয়েছে। গত বছর রাষ্ট্রসঙ্ঘের ৪ জন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞের একটি দল ভারতীয় রাষ্ট্রকে সাইবাবার শারীরিক অবস্থার সংকটজনক অবস্থার প্রেক্ষিতে তাঁর মুক্তির পরামর্শ দেয়। এর আগে সাইবাবার বিচারপর্ব নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে আপত্তি তোলা হয়েছে। পুলিশের সীজড সামগ্রীর সীলবদ্ধ অবস্থায় না থাকা, তা ছাড়াও সরকারী ‘মালখানা’র নিজস্ব নথি অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে সীজ হওয়া সামগ্রী বার করে নেওয়া, ভুল জায়গা থেকে গ্রেফতারি দেখানো, ‘ভুয়ো’ সার্চ ওয়ারেন্ট-এর ভিত্তিতে সাইবাবাকে গ্রেফতার করা, জোরপূর্বক আদায় করা ‘কনফেশন’ – এই ধরনের বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে। UPA সরকারের আমলে বস্তারের আদিবাসীর উপর চালান অপারেশন গ্রীন হান্ট-এর নৃশংসতা, মাওবাদী কর্মী এবং সাধারণ মানুষের উপর সেনাবাহিনীর অত্যাচার এবং পুলিশ-সমর্থিত সশস্ত্র মিলিশিয়া সালওয়া জুডুমের হত্যাকাণ্ড নিয়ে সাইবাবা অক্লান্ত কণ্ঠে প্রতিবাদ করেন। সাইবাবার উকিল অ্যাডভোকেট সুরেন্দ্র গাডলিং-কে গত বছর মহারাষ্ট্র পুলিশ ভীমা কোরেগাও জাতিবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে গ্রেফতার করে।

 

গতকাল ফেসবুকের মাধ্যমে সাইবাবার বর্তমান শারীরিক অবস্থার অবনতির বিবরনের সঙ্গে তাঁর ‘মেডিক্যাল জামিন’-এর দাবী তুলে একটি লেখা লেখেন তাঁর স্ত্রী এ. বসন্তকুমারী … “প্রায় ২ বছর হতে চললো সাই জেলে আটক এবং আমাদের মেডিকেল বেল চাওয়ারও প্রায় ১১ মাস হয়ে গেল। যত এই প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করা হচ্ছে, ওর শরীরের অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন প্রায়। লেখা, খাওয়া প্রায় কিছুই করতে পারছেন না। একজন শারীরিকভাবে ৯০% অক্ষম মানুষ হিসেবে ওনার সমস্ত অধিকারকে উল্লঙ্ঘন করা হচ্ছে। বাঁচা মরার মধ্যেকার ফাঁকটুকুতে লড়ছেন এখন উনি”। গ্রাউন্ডজিরোর পক্ষ থেকে বসন্তকুমারীর লেখা ইংরাজি থেকে অনুবাদ করে দেওয়া হল।

 

 

কোর্টের অর্ডার অনুসারে সাই-এর সাথে আমার শেষ দেখা হয় ২৬শে ডিসেম্বর ২০১৮ তে, তখন ওঁকে নাগপুরের গভর্ণমেন্ট মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ওঁর সঙ্গে ছিল ওঁর ভাই। জানলার একটা ফাঁক দিয়েই সেদিন দেখেছিলাম ওঁকে। স্বশরীরে দেখলাম বহুদিন পর এবং বুঝলাম যে ওঁর শরীর একেবারেই ভালো নেই। চলাফেরা প্রায় করতেই পারেন না বা করলে সেটা খুব কষ্ট করেই। হাত কাঁপছে দেখলাম এবং ওজন’ও অনেকটাই কমে গেছে। শরীরের অবস্থা বড়ই খারাপ ঠেকল। আগে যেমন নিজেই চেয়ার থেকে খাটে উঠতে নামতে পারতেন কোনরকমে, কিন্তু সেদিন দেখলাম এখন দু’জন লোক লাগে। ২৬ তারিখে দেখলাম কী একটা পরীক্ষার জন্য ওঁকে একবার তুলতে হলো। আমার জামাইবাবু এবং একজন পুলিশ ওঁর সঙ্গে ছিল। পুরোটাই তিনজন ক্যামেরাম্যান ক্যামেরায় তুলেছে। আমার অনুরোধ আপনারা পারলে ওই ভিডিও’টি একবার দেখবেন (মাননীয় জজ’দেরও দেখবেন তাতে)। ওঁর এই অবস্থা চোখে দেখা ভার। একরকমভাবে কোলে করে তুলে নিয়ে চেয়ার থেকে খাটে শোয়াতে হচ্ছিলো। হুইলচেয়ারে আর পারেন না এখন। কোর্টের অর্ডার অনুযায়ী-একটা সেকেন্ড ওপিনিয়ন নিয়ে আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার। সেগুলো সরকারের সামনে GSCH-এই হবে এবং তার ভিত্তিতেই রিপোর্ট আসবে। ডঃ গোপীনাথ বলে একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এই পরীক্ষাগুলো করছেন। কিন্তু ২৬ তারিখে কোর্টের দেওয়া সময় খুব বেশি ছিল না (৮’টা থেকে ৩:৩০’টে) এবং এই সব পরীক্ষাগুলি একজনের পক্ষে একার হাতে করা প্রায় অসম্ভব। ডাক্তারের সংখ্যা তিন হলেও খুব যে সুবিধা কিছু হতো তাও নয়।

 

এই পোস্টের সাথে রিপোর্টগুলো পাঠালাম। যা মনে হয়, সাইবাবার জেলে অনেকরকমের শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। কোর্টেও বলছে গলব্লাডারে পাথর আছে। কিন্তু কোর্ট ঠিক করেছে এখন শুধুই ওর এই গলব্লাডারের অপারেশনটা করা হবে, বাকি সমস্যাগুলো ছেড়ে!

 

সাই-এর এই মুহূর্তে ১৯টি শারীরিক সমস্যা। মাথার বাঁ পাশে এক অদ্ভুত লাম্প মতন, ব্রেনে সিস্ট, কঠিন হৃদরোগ, কিডনিতে পাথর, মূত্রনালীতে একরকমের ইনফেকশন এবং আরও অন্যান্য সমস্যা। বাঁ হাতের ঘাড়ের দিকে নার্ভগুলো নষ্ট হয়ে এসেছে এবং তার থেকে একটা প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে। ডাক্তার ফিজিওথেরাপি করতে বলেছেন। ওর এখন ভালো করে একটা পুরোদস্তুর চিকিৎসার, থেরাপির এবং পরিবারের সাহচর্য প্রয়োজন। GMCH-এ অনেক পরীক্ষাই হয় না। তাই বড়ো কোন হাসপাতালে ওকে নিয়ে যাওয়া দরকার। সবথেকে খারাপ হচ্ছে ওর খোলা সেল, যেখানে ভয়ংকর শীতের প্রকোপ। পা প্রায় জমে যাওয়ার অবস্থা ওর! হাতে পায়ে টান লাগলে তো ওঁর অবস্থা আর বলার নয়। সেল-এর ভিতরে তো আরও ভয়ংকর ঠাণ্ডা। ওঁর বাঁ হাতের নষ্ট হওয়া পেশীগুলো এখন প্রায় জমে গেছে। নিউরোলজির বিভাগীয় প্রধান অবিলম্বে বলেছেন থেরাপির কথা। পরিবারের সাহায্য ছাড়া ফিজিওথেরাপির আয়োজন সম্ভব নয়। সাই এখন এত কষ্ট আর সহ্য করতে পারছেন না।

 

২৪শে জানুয়ারি ২০১৯-এ, ডিফেন্স-এর চূড়ান্ত বক্তব্য জানানো হবে। ১১ই ফেব্রুয়ারি আবার পরের হিয়ারিং। প্রায় ২ বছর হতে চললো সাই জেলে আটক এবং আমাদের মেডিক্যাল বেল চাওয়ারও প্রায় ১১ মাস হয়ে গেল। যত এই প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করা হচ্ছে, ওর শরীরের অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন প্রায়। লেখা, খাওয়া প্রায় কিছুই করতে পারছেন না। একজন শারীরিকভাবে ৯০% অক্ষম মানুষ হিসেবে ওনার সমস্ত অধিকারকে উল্লঙ্ঘন করা হচ্ছে। বাঁচা মরার মধ্যেকার ফাঁকটুকুতে লড়ছেন এখন উনি। মাননীয় আদালতের কাছে আমাদের দাবী যে ওনার প্রাথমিক মানবিক অধিকারগুলি মানা হোক এবং একজন শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি হওয়ার দরুন ওঁকে মেডিকেল-বেল দেওয়া হোক, পরের হিয়ারিং-এর মধ্যেই। নাহলে ওনার পক্ষে বেঁচে থাকাই অসম্ভব হয়ে উঠবে।

 

অনুবাদ: আকাশনীল আলম ঘটক।

Share this
Leave a Comment