আলমা-আটার ৪০ বছর পরে ভারতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবায় এখন ফেলো কড়ি মাখো তেল নীতি


  • December 24, 2018
  • (0 Comments)
  • 405 Views

১৯৭৮ সাল। ৬-১২ সেপ্টেম্বর। বিশ্বস্বাস্থ্যসংস্থার (হু) আলমা-আটা সম্মেলন। মিলিত হয়েছে ১৩৪টি দেশের সরকার এবং ৬৭টি আন্তর্জাতিক সংস্থা। স্বাক্ষরিত হল সবার জন্য স্বাস্থ্যর ঘোষণাপত্র। সেই ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর ছিল ভারত সরকারেরও। ২০০০ সালের মধ্যে সমস্ত জনগণের কাছে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ারজন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিল ভারত। আলমা-আটার ৪০ বছরে ভারতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবার খণ্ড চিত্র: স্বাস্থ্য সকলের জন্য নয়, স্বাস্থ্যে এখন ফেলো কড়ি মাখো তেল নীতি। লিখছেন রুমেলিকা কুমার

 

 

২০১৮ শেষ হতে চলেছে। বিশ্বস্বাস্থ্যসংস্থা (হু)-র আলমা আটা সম্মেলনের ৪০ বছর কেটে গিয়েছে। এই ৪০ বছরে গঠিত হয়েছে প্রচুর কমিটি। পাতার পর পাতা ছাপা হয়ে গেছে প্রচুর কর্মনীতি। কিন্তু হিসেব নিতে গেলে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে এই পোস্ট আলমা আটা পিরিয়ডে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ থেকে ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’-এর দিকেই আরো বেশি করে মুখ ঘুরিয়েছে সরকার।
১৯৪৮-র আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিলেও ভারতের সংবিধান অনুযায়ী স্বাস্থ্য মৌলিক অধিকার হিসেবে এখনও স্বীকৃত নয়। যদিও পূর্বে জনকল্যাণকারী ভূমিকা রাখতে অনেক ক্ষেত্রেই সরকার স্বাস্থ্যপরিষেবার দায়িত্ব যৎসামান্য হলেও নিত।
১৯৯০-র পর থেকে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। ১৯৯৭ সাল থেকে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বদলে ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক এবং আই.এম.এফ. মুখ্য ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। নীতি অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের সাথে ভারতেও স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা কমতে শুরু করে (সরকারি ক্ষেত্রে ক্রসসাবসিডি)। পাল্লা দিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়তে দেবার সুযোগও করে দেওয়া হয় (পাবলিক প্রাইভেট ইনিশিয়েটিভ)। এর আগেই স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা খাতে বেসরকারি পুঁজির বিনিয়োগের রাস্তা অবাধ করে দিয়েছিল রাজীব গান্ধী কমিশন (১৯৮৬)। এরপরে সময়ের সাথে সাথে পরিকল্পনামাফিক বাইপাসের ধারে গজিয়ে উঠতেথাকে ঝাঁ চকচকে বেসরকারি হাসপাতালের বাজার।

 

কিন্তু এই স্বাস্থ্য ব্যবসার খদ্দের তো জমবেনা যদি সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের ভরসা থাকে। তাই পাল্লা দিয়ে কমতে থাকে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি খরচ, সময়ের সাথে দুর্বল হয়েছে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা আর পরিকাঠামো। ২০১০ সালে যোজনা কমিশন গঠিত কমিটি, সবার জন্য স্বাস্থ্যের লক্ষ্যে তৎকালীন স্বাস্থ্যব্যবস্থার হালহকিকত সম্বন্ধে পর্যালোচনা শুরু করে। শ্রীনাথ রেড্ডির পরিচালিত এই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী – জিডিপির মাত্র ৩ শতাংশ খরচ করলেই প্রতিটি মানুষের জন্য স্বাস্থ্যের অধিকার সুরক্ষিত করা সম্ভব। সেই সুপারিশে কর্ণপাত না-করেই আজকে স্বাস্থ্য খাতে খরচ হয় মাত্র ১.১৪ শতাংশের কাছাকাছি। কেন্দ্রে মোদী সরকার আসার পরে ২০১৭ সালে আসে নতুন জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি এবং এইবছর দেশব্যাপী ‘মোদীকেয়ার’ স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্প চালু করা হয়। এই প্রকল্প অনুযায়ী দেশের ১০ কোটি পরিবার চিকিৎসার জন্য বছরে পাঁচ লক্ষ টাকা বিমার সহায়তা পাবেন। এই ঘোষণা নির্বাচনী প্রচারে এক অন্যতম জ্বালানি জুগিয়েছে। কিন্তু প্রকল্প খাতে যে যৎসামান্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে তা যেমন হাস্যকর, অন্যদিকে বেসরকারি ক্ষেত্রকে স্বাস্থ্যব্যবসায় উপযুক্ত জায়গা করে দেওয়ার জন্য প্রশংসনীয়ও বটে। পরিকল্পিত ভাবে আস্তে আস্তে মেরে ফেলা সরকারি ব্যবস্থায় নিজের সুরক্ষার কারণেই কেউ যাবেন না, ছুটবেন বেসরকারি হাসপাতালেই। আর সেই চিকিৎসার খরচ (পরিবার পিছু পাঁচ লক্ষ টাকা) সরকারি বিমার মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেই তুলে দেবে সরকার। এই প্রকল্পে যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন তা যদি সরকারি পরিষেবা এবং পরিকাঠামোকে উন্নত করার ক্ষেত্রে ব্যয় করা হত তাহলে বিনা খরচে বেশি সংখ্যক মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হত। কিন্তু তাতে কর্পোরেটদের স্বার্থরক্ষা হবার আশা কম। তাই মুনাফা বাড়ানোর জন্য সাধারণের করের টাকা মাথার পিছন দিয়ে হাত ঘুরিয়ে বিমার মাধ্যমে তুলে দেওয়া হবে কর্পোরেটের হাতে। আর সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার অবস্থা হবে আরও করুণ, দুর্বল। সংক্ষেপে বলতে গেলে সরকারের চোখে স্বাস্থ্য পরিষেবা সাধারণ মানুষের অধিকার নয়, বরং বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্র। সমীক্ষা অনুযায়ী ২০২২-এর মধ্যে এই ব্যবসার মূল্য ৩৭২ বিলিয়ন ইউ এস ডলার পৌঁছবে। আর ক্রমশ ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যের’ লক্ষ্য পরিণত হবে সোনার পাথরবাটিতে।

 

২০১৭ সালে দেশব্যাপী ‘মোদীকেয়ার’ স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্প চালু করা হয়। ১০ কোটি পরিবার চিকিৎসার জন্য বছরে পাঁচ লক্ষ টাকা বিমার সহায়তা পাবেন। এই ঘোষণা নির্বাচনী প্রচারে এক অন্যতম জ্বালানি জুগিয়েছে। পরিকল্পিত ভাবে আস্তে আস্তে মেরে ফেলা সরকারি ব্যবস্থায় নিজের সুরক্ষার কারণেই কেউ যাবেন না, ছুটবেন বেসরকারি হাসপাতালেই। আর সেই চিকিৎসার খরচ (পরিবার পিছু পাঁচ লক্ষ টাকা) সরকারি বিমার মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেই তুলে দেবে সরকার। এই প্রকল্পে যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন তা যদি সরকারি পরিষেবা এবং পরিকাঠামোকে উন্নত করার ক্ষেত্রে ব্যয় করা হত তাহলে বিনা খরচে বেশি সংখ্যক মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হত। কিন্তু তাতে কর্পোরেটদের স্বার্থরক্ষা হবার আশা কম।

 

রাজ্য সরকারের ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে যে খুব উজ্জ্বল এরকম বলা যায় না। রাজ্যে স্বাস্থ্যসাথি’র মাধ্যমে চালু করা হয়েছে মোদী কেয়ার। গত সেপ্টেম্বর মাসে মউ (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) স্বাক্ষরের মাধ্যমে একটি পুনর্নির্মিত সরকারি সুপার স্পেশ্যালটি হাসপাতাল একটি বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে একাধিক বার সমগ্র হাসপাতাল বেসরকারি পুঁজির হাতে তুলে দেওয়ার উদাহরণ পাওয়া যায়। ২০০১ সালে গুজরাতের কছ এলাকায় মারাত্মক ভুমিকম্পে এক সরকারি হাসপাতাল পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরে বাজপেয়ী’র উদ্যোগে প্রাইম মিনিস্টার রিলিফ ফান্ডের ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে ওঠে ৪০০ শয্যার এক সুপার স্পেশ্যালিটি ‘জি কে হাসপাতাল’। ২০০৯ সালে নরেন্দ্র মোদী আদানিকে ৯৯ বছরের লিজে দেন সেই হাসপাতাল। প্রাইম মিনিস্টার রিলিফ ফান্ডের টাকায় গড়ে ওঠা সেই হাসপাতাল এখন গুজরাত আদানি ইন্সটিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্স পূর্ণ মাত্রায় ব্যবসাচলছে তার। একই রাজ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং উপ মুখ্যমন্ত্রী ফ্রান্সিস ডি সুজা ২০১৬ সালে পুরো একটি সরকারি হাসপাতাল, খালি জমি, পুরানো বিল্ডিং এবং সমস্ত ইনফ্রাস্টাকচার সমেত এক এন.জি.ও.-কে লিজে দিয়ে দেন। বলা হয় সেই এন.জি.ও. নার্সিং ট্রেনিং ইন্সটিটউট খুলবে। এন.জি.ও.-টি’র পরিচালক – বিজেপি এম এল এ প্রমোদ সাওন্ত। ২০১৭ সালে গুজরাতেরই পালানপুরের এক ৩৫০ শয্যার জেলা হাসপাতাল রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শঙ্কর চৌধুরী নিজের মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের জন্য মাত্র একটাকা বাৎসরিক ভাড়ায় ৩৩ বছরের জন্য লিজে নিয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে যদিও তৃণমূল সরকারের জিন্দাল ফাউন্ডেশনের হাতে শালবনি হাসপাতাল তুলে দেওয়া প্রথম উদাহরণ, কিন্তু তা সরকারি পরিষেবার ভবিষ্যতের ব্যাপারে যে সংকেত জ্ঞাপন করে তা ভয়ঙ্কর।

 

শালবনিতে জিন্দালদের সাথে মমতা ব্যানার্জি। ফাইল ফটো।

 

২০১১ সালে পরিবর্তনের জোয়ারে ক্ষমতার রঙ বদলায়। কেন্দ্রীয় সরকার প্রকল্পাধীন ‘পশ্চাদপদ অঞ্চল উন্নয়ন’-এর জন্য বরাদ্দ অর্থে এই রাজ্যে ৪৩টি সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু রাজ্যে সুপার স্পেশ্যালিটি (নিউরোলজি, নেফ্রোলজি, কার্ডিওলজি ইত্যাদি) অভিজ্ঞ চিকিৎসক কম। ফলত কার্যত বিভাগগুলি চালু থাকে নামে মাত্রই। অব্যবহৃত অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিতে ধুলো জমে। কিছু চিকিৎসক এবং চুক্তির মাধ্যমে নিয়োজিত চিকিৎসক দিয়ে তাপ্পি মেরে চালানোর চেষ্টা করলেও কার্যত সুপার স্পেশ্যালিটি চিকিৎসা তো দূরের কথা, মহকুমা বা জেলা হাসপাতালের পরিষেবা দিতেও ব্যর্থ হয় এই হাসপাতালগুলি। সম্প্রতি শালবনিতে এরকমই একটি হাসপাতাল মউ স্বাক্ষরের মাধম্যে জিন্দালদের হাতে তুলে দেয় রাজ্য সরকার। বর্তমানেও পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ স্বাস্থ্যব্যবস্থা বহু ক্ষেত্রে চালু আছে, যা বাম আমলেও ছিল। সরকার উপযুক্ত টেকনোলজি বা দামি যন্ত্রপাতির অভাবে সরকারি হাসপাতালের কোনও কোনও অংশকে ব্যবহার করতে দিত বেসরকারি সংস্থাকে (এক্সরে বা সিটিস্ক্যান)। বেসরকারি সংস্থাটি প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য যা করণীয় (যেমন চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা অথবা যন্ত্রপাতির মেরামতি) সমস্ত দায়িত্ব গ্রহণ করত। পরিষেবার একটা অংশ চুক্তিমত ফ্রি হত ও বাকি আয়ের একটি অংশ জমা পড়ত কর হিসেবে। অর্থাৎ খানিক কম দামে পরিষেবা পেত রোগীরা। এই ব্যবস্থাতেই বহুদিন মেডিকেল কলেজে এম.আর.আই. বা সিটিস্ক্যান চালিয়েছে ইকো ডায়াগনস্টিক্স, এক্স রে পরিষেবা দিয়েছে স্পন্দন। মাথার সিটিস্ক্যান করাতে খরচ পড়ত ৬০০ টাকা কিংবা হাত বা পায়ের এক্সরে-তে ১০০ টাকা (সম্প্রতি সেটি বিনামূল্যে করে দেওয়া হয় )। এতে খরচ কম হলেও সেই পরিমাণটিও দেওয়া সম্ভব হয় না অধিকাংশ সাধারণ মানুষের পক্ষে (তাই এমার্জেন্সিতে মাথায় চোট পেয়ে আসা রোগীকেও বাধ্য হয় বলতে হয় — ডাক্তারবাবু এত টাকা পাব কোথায় এবং ফিরে যায় মাথার ভিতরে রক্ত জমে যাওয়ার রিস্ক হাতে নিয়েই।)

 

কিন্তু শালবনি হাসপাতালের ক্ষেত্রে যেভাবে সমস্ত আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি সমেত সরকারি জমিতে প্রতিষ্ঠিত একটি হাসপাতাল কর্পোরেট পুঁজির হাতে তুলে দেওয়া হল তা রাজ্যে প্রথমও বটে এবং এক ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের ইঙ্গিতবাহী। বিস্তারিত ভাবে চুক্তিটি পর্যবেক্ষণ করলে সমস্যার দিকগুলিকে খানিক বোঝা যেতে পারে —

১। স্বাক্ষরের পর সমস্ত হাসপাতাল চত্বরে শুধুমাত্র বি.এম.ও.এইচ-র অফিস অর্থাৎ বর্তমান গ্রামীণ হাসপাতালের অংশ ছাড়া বাকি কিছুতে স্বাস্থ্য দপ্তরের অধিকার থাকবে না। অর্থাৎ, বাকি হাসপাতালের পরিষেবা কর্মপদ্ধতি বা মুনাফা কিছু নিয়েই স্বাস্থ্য দপ্তরের বলার অধিকার নেই।

২। স্বাক্ষরের পর সমস্ত নতুন রোগী জে.এস.ডাব্লিউ. ফাউন্ডেশন (অর্থাৎ জিন্দাল ফাউন্ডেশন)-এর অধীনে ভর্তি হবে এবং তাদের দ্বারা নিযুক্ত চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য কর্মীরাই চিকিৎসা করবেন। (সরকারি কর্মরত চিকিৎসক বা কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলা নেই চুক্তিতে। এবং ভর্তি হওয়া রোগীদের চিকিৎসার ব্যাপারেও সরকারের কোনও রকম ভূমিকা থাকবে না)

৩। ফাউন্ডেশন চিকিৎসা পরিষেবা বাদে সেখানে নার্স ও প্যারামেডিকেল কর্মীদের ট্রেনিং দেবে। (অর্থাৎ শুধু স্বাস্থ্য নয়, শিক্ষা নিয়েও ব্যবসা চলবে শালবনিতে)

৪। হাসপাতালের ২৫ শতাংশ বেড হবে খরচসাপেক্ষ এবং ব্যয়ের ঊর্ধ্বসীমা ঠিক করবে সংস্থা। এই ২৫ শতাংশ বেড কর্পোরেট বডি এবং যাদের প্রাইভেট বিমা করানো আছে তাদের জন্যই উপলব্ধ। বাকি ৭৫ শতাংশ বেডে ফ্রি চিকিৎসা শুধুমাত্র তাদের ক্ষেত্রেই উপলব্ধ যারা সরকারি বিমা প্রকল্পের অধীন। সরকার দ্রুত চিকিৎসার খরচ সংস্থাকে দিয়ে দেবে। (ফেলো কড়ি মাখো তেল !!)

৫। স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে আয় ও ব্যয়ের ওপর সরকারের নজরদারি থাকা চলবে না। (যথেচ্ছ মুনাফা লাভ করার দিক থেকে কোনও বাধাই রইল না )

৬। সরকারকে তথ্য পেশ করার ব্যাপারে শুধুমাত্র ৭৫ শতাংশ ফ্রি বেডের রোগীদের ক্ষেত্রে তথ্য শেয়ার করবে সংস্থা বাকি নয়। (দুর্নীতির রাস্তা খোলা)

৭। স্বাক্ষরের পরে সমস্ত সম্পত্তি ফাউন্ডেশনের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। তারা সতর্কতার সাথে সেই সম্পত্তি ব্যবহার করবে (উল্লেখযোগ্য, ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে কোনও রকম ক্ষতিপূরণের কথা কিন্তু লেখা নেই )।

 

ভূমিকম্প বিধ্বস্ত ভুজ-এর সরকারী হাসপাতাল বর্তমানে আদানির স্বাস্থ্য-ব্যবসাকেন্দ্র (ইনসেট-এ), প্রাইম মিনিস্টার রিলিফ ফান্ডের ১০০ কোটি টাকার বদান্যতায়।

 

এছাড়াও বাকি শর্তাবলী এবং চুক্তি বাতিল হবার শর্তগুলিও জিন্দালদের পক্ষেই যায়। অর্থাৎ চুক্তিটি লক্ষ করলে বোঝা যায় এই চুক্তি কোনওভাবেই সাধারণ মানুষের জন্য নয়, উলটে তাদের বিরুদ্ধে। ভবিষ্যতে বাকি সুপারস্পেশ্যালিটি হাসপাতাল গুলির ক্ষেত্রেও এরকম চুক্তির প্রয়োগ ঘটলে তা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এক অন্ধকার দিকেই এগিয়ে নিয়ে যায় আমাদের।

 

কেন্দ্রের এবং রাজ্যের স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন পরিকল্পনা এবং ঘটনাবলীর কিছু উদাহরণ দেওয়া গেল। এবার আসা যাক বর্তমান দেশের স্বাস্থ্যের অবস্থায়। ২০১৮-র হেলথ স্ট্যাটাস ইনডিকেটর অনু্যায়ী – ভারতে প্রতি ১১০০০ জনগণ পিছু একজন ডাক্তার বর্তমান। স্বাস্থ্য পরিষেবায় প্রতি মানুষ পিছু দিনে বরাদ্দ মাত্র ৩ টাকা। ২০১৫-১৬ সালে জিডিপির মাত্র ১.০২ শতাংশ খরচ হয়েছিল স্বাস্থ্য খাতে। ভ্যাকসিন, সাধারণ স্বাস্থ্য নিয়ে বোঝাপড়া ইত্যাদি বিষয়ে জনসচেতনতার অভাব বর্তমান।

 

এর পাশাপাশি দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে ডাক্তারদের প্রতি রোগীদের অসন্তোষের ছবি। পরিকাঠামোর বেহাল দশায় সর্বোচ্চ পরিশ্রম দিয়েও পেরে ওঠেন না সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বাস্থ্যকর্মী এবং চিকিৎসকরা। আগেরদিন মুর্শিদাবাদ, ক্যানিং থেকে এসে, রাতটা হাসপাতাল প্রাঙ্গনে উন্মুক্ত আকাশের তলায় শুয়ে কাটান রোগীরা। পরেরদিন সকাল ৬ টায় আউটডোরের লাইন জমতে থাকে। রোগীর অসুবিধা শুনতে, পরীক্ষা করতে, রিপোর্ট দেখে, রোগ নির্ণয়ে, এবং ওষুধ লেখা – প্রতি রোগী পিছু পাঁচ মিনিটও ব্যয় করা সম্ভব হয় না অনেক সময়। পিছন থেকে উঠে আসে অস্থির অসন্তোষ। সমস্যার মূলে সরকার এবং কর্পোরেট পুঁজির চক্রান্তকে দেখতে পান না সাধারণ মানুষ, অনুন্নত পরিকাঠামোকে দেখতে পান না – দেখতে পান শুধু ডাক্তারদের, স্বাস্থ্যকর্মীদের। কাজেই অসন্তোষের মুখে পড়ে নিগ্রহের শিকার হতে হয় তাদের। ২০১৮ সালেই বারংবার শিরোনামে এসেছে সরকারী হাসপাতালের ডাক্তারদের রোগী পরিবারের আক্রোশের শিকার হওয়ার ঘটনা। কোথাও মুখে গোবর মাখিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোথাও বা গণপিটুনির শিকার হয়েছেন। বিষিয়ে যাচ্ছে ডাক্তার রোগী সম্পর্কও। নিজেদের সুরক্ষা নিয়ে চিন্তিত ডাক্তাররাও পাড়ি দিচ্ছেন বিদেশে। ক্রমশ কমছে বিচক্ষণ এবং সমাজসেবী ডাক্তারের সংখ্যাও। যথেষ্ট সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ সরকার। বদলে পরিকল্পনা চলছে আজগুবি। পরিকাঠামোর উন্নয়ন, ডাক্তারদের সুরক্ষা দেওয়ার বদলে ডাক্তারি শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগশিক্ষার ক্লাস চালু করা হচ্ছে মেডিকেল কলেজগুলিতে। প্রতিবাদে সরব হয়েছেন মেডিকেল পড়ুয়ারা, সচেতন ডাক্তার এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা।

 

২০১৮-র হেলথ স্ট্যাটাস ইনডিকেটর অনু্যায়ী – ভারতে প্রতি ১১০০০ জনগণ পিছু একজন ডাক্তার বর্তমান। স্বাস্থ্য পরিষেবায় প্রতি মানুষ পিছু দিনে বরাদ্দ মাত্র ৩ টাকা। ২০১৫-১৬ সালে জিডিপির মাত্র ১.০২ শতাংশ খরচ হয়েছিল স্বাস্থ্য খাতে।

 

৪০ বছর পর দাঁড়িয়ে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’র অঙ্গীকার থেকে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছি আমরা। অথচ এই স্লোগান যে আকাশকুসুম কল্পনা নয়, বরং বাস্তবে অর্থপূর্ণ, তা প্রমাণিত বিভিন্ন দেশে বহু আগেই। আজকে আমাদের সেই লক্ষ্যে এগিয়ে চলার আশু প্রয়োজন। ডাক্তার বনাম রোগী নয়, ডাক্তার-রোগী-স্বাস্থ্যকর্মী-সাধারণ মানুষ, সবাইকে একসাথে এই সরকারি পরিকাঠমো উন্নয়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে। ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনে পা মিলিয়েছেন বিভিন্ন ডাক্তারদের সংগঠন এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা। এসোশিয়েসন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টরস, ডক্টরস ফর ডেমোক্রাসি, ডক্টরস ফর পেশেন্টস, শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ, ওয়েস্ট বেঙ্গল ডেন্টাল সার্ভিস এসোশিয়েসন এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরামের ইত্যাদির উদ্যোগে গত ১১মে মিছিলে পা মেলান ৫০০-র কাছাকাছি ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, সাধারণ মানুষ। স্লোগান ওঠে – ‘স্বাস্থ্য কোনো পণ্য নয়, স্বাস্থ্য আমাদের অধিকার’। সম্প্রতি শালবনি হাসপাতালের বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন তারা।

 

কলকাতার বি সি রায় হাসপাতালের শিশু বিভাগের সামনে অপেক্ষারত রোগী পরিবার। সৌজন্যঃ সামি সিভা, পুলিতজার সেন্টার।

 

১৯৭৮-র সেই সম্মেলনে স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা নির্ধারিত হয় — state of complete physical, mental and social well-being and not mere absence of diseases। সংজ্ঞা অনুযায়ী স্বাস্থ্যপরিষেবার ভিত্তি শুধুমাত্র রোগী, ডাক্তার, ওষুধ এবং ইনভেস্টিগেশন নয়, তার সাথে জড়িত রয়েছে প্রতিটি মানুষের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থান। তার থাকা, খাওয়া, জীবন ধারণের প্রশ্নগুলি অত্যাবশ্যক ভাবে জড়িয়ে পড়ে স্বাস্থ্যের প্রশ্নটির সঙ্গে। সামাজিক জীবন, বেঁচে থাকার পরিস্থিতি, দৈনন্দিন চাহিদাগুলি, অর্থনৈতিক সংস্থান, চাকরি না-পাওয়া, ঘন জনবসতি, নিম্নমানের জীবন, পুষ্টিকর খাদ্য না-পাওয়া, সুরক্ষিত পানীয়, শিক্ষার প্রসার, লিঙ্গবৈষম্যের আবহাওয়া — সমস্ত আঙ্গিক গুলোই। তাই ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’-র লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে সামাজিক সচেতনতা এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ বোঝাপড়া এবং ভূমিকা নেওয়া জরুরি। তাই অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে রয়েছে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক আন্দোলনের আঙ্গিক গুলিও। তাই আজকে লড়া প্রয়োজন স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির জন্য, সরকারি পরিকাঠামোর উন্নতির জন্য, সরকারি পরিষেবার প্রসার জন্য, লড়া প্রয়োজন মুনাফালোভী কর্পোরেটদের বিরুদ্ধে, নতুন সমাজের উদ্দেশ্যে — যেখানে ফেলো কড়ি মাখো তেলের স্বাস্থ্য নয় – সবার জন্য স্বাস্থ্য, ভিক্ষা নয় – মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত স্বাস্থ্যের অধিকার হবে প্রত্যেকটা মানুষের। এই পশ্চিমবঙ্গকে, এই ভারতকে, এই বিশ্বকে, শিশুর বাসযোগ্য করবার জন্য পথে নামতে হবে – লড়াই করতে হবে নিজের অধিকারের জন্য।

 

 

লেখক একজন রাজনৈতিক কর্মী ও চিকিৎসক। ছবি: ইন্টারনেট। ফিচার ছবি: বিশ্বস্বাস্থ্যসংস্থার (হু) আলমা-আটা সম্মেলন, ১৯৭৮।

Share this
Leave a Comment