“অন্য এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আমাদের গড়ে তুলতে হবে”: ফ্রান্সের ইয়েলো ভেস্টদের চিঠি লিখলেন রোজাভার কুর্দিশ বিপ্লবীরা


  • December 22, 2018
  • (0 Comments)
  • 508 Views

সিরিয়ার রোজাভা অঞ্চলের স্বশাসনের দাবীকে ঘিরে গড়ে ওঠা বৈপ্লবিক কুর্দিশ আন্দোলন থেকে সম্প্রতি একটি সংহতির চিঠি পড়ে শোনানো হয় ফ্রান্সের ইয়েলো ভেস্টস (জিলেঁ জুঁন) গণ উত্থানের উদ্দেশ্যে। “প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হিংসার বিরুদ্ধে যাঁরা রুখে দাঁড়িয়েছে তাঁদের সকলের প্রতি আমাদের সংহতি জানাই। আপনাদের প্রতিরোধ এই সুদূর উত্তর সিরিয়াতেও জিলেঁ জুঁন উত্থানকে জনপ্রিয় করে তুলেছে,” বলেন রোজাভার বিপ্লবীরা। মনে রাখা প্রয়োজন, ইয়েলো ভেস্টস আন্দোলনের একাংশের প্রতি অভিযোগ যে তাঁরা অভিবাসন বিরোধী, দক্ষিণপন্থী। সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্সে আশ্রয় নেওয়া রিফিউজিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সিরিয়ান, এবং সেখানকার শ্বেতাঙ্গ গ্রামীণ শ্রমিক-কৃষকদের একটি মূল অভিযোগ এই যে রিফিউজিদের কারণে কমেছে মজুরি, কমেছে খেটে খাওয়া ফরাসি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। “অন্য এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আমাদের গড়ে তুলতে হবে — সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি, যা নিয়ন্ত্রণ করবে জনগণ এবং তাদের থেকেই গড়ে উঠবে সেই অর্থনীতি। এর ভিত্তি হবে সমবায় উৎপাদন ব্যবস্থা, স্বশাসিত সরকার এবং বাস্তুতান্ত্রিক মূল্যবোধ। … গোটা পৃথিবীকেই এটা বুঝতে হবে যে এই আন্দোলনে ‘জয়’ বলতে নিছক কোনো মজুরি বৃদ্ধি বোঝায় না, এমনকি শুধু ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে যাওয়াও এর জিত নয়। এর জিত মানে এক পুনরুদ্ধারের পর্যায় যেখানে বর্তমান বিকল্প কাঠামোগুলোর ওপর স্বশাসনের একটা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। [এর] জেতা মানে বৈপরীত্যের মুখোমুখি হওয়া” – ফরাসি আন্দোলনকারীদের এক নতুন সমাজ, নতুন পৃথিবী গড়ার আহ্বান জানালেন রোজাভার আন্দোলনকারীরা, পৃথিবীজোড়া সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে। গ্রাউন্ডজিরোয় প্রকাশিত ইয়েলো ভেস্টস প্রতিরোধের উপর প্রতিবেদন পড়তে ক্লিক করুন: “The French Anger and the Yellow Vests Movement” এবং “ফ্রান্সের ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন: পৃথিবী জোড়া জনরোষের এক নতুন দিক”

 

 

 

“জিলেঁ জুঁন” (হলুদ জ্যাকেট) — যাঁরা প্রতিবাদ করছেন, রাস্তায় ব্যারিকেড গড়ছেন, অবরোধ ধর্মঘট করছেন এবং সংগঠিত হচ্ছেন, উত্তর সিরিয়ার কুর্দিস্তানের পশ্চিমভাগে আন্তর্জাতিক রোজাভা কমিউনের পক্ষ থেকে আপনাদের অভিবাদন জানাই।

 

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সে জনতার বিদ্রোহ আমরা মন দিয়ে লক্ষ করছি। প্রতিবাদীদের মনের জোর আর পুলিশ ও প্রশাসনের দমননীতি দুই-ই আমাদের অভিভূত করেছে। প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হিংসার বিরুদ্ধে যাঁরা রুখে দাঁড়িয়েছে তাঁদের সকলের প্রতি আমাদের সংহতি জানাই। আপনাদের প্রতিরোধ এই সুদূর উত্তর সিরিয়াতেও জিলেঁ জুঁন উত্থানকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। এমন এক সময়ে যখন তুর্কি রাষ্ট্র আমাদের যুদ্ধের ভয় দেখাচ্ছে, তখন এই উত্থান আমাদের সকলকে ভালো কিছুর আশায় অনুপ্রাণিত করেছে।

 

ফ্রান্সের প্রতিরোধ ও নাগরিক উত্থানের ইতিহাস সুদীর্ঘ। শুধু ফরাসী বিদ্রোহ আর ৬৮র মে-ই নয়, রয়েছে মধ্যযুগের গ্রামীণ বিদ্রোহগুলো, রাষ্ট্রীয় ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে স্থানীয় ও আঞ্চলিক বহু স্বতন্ত্র প্রতিরোধ, শ্রমিক আন্দোলন, অভিবাসী শ্রমিকদের লড়াই, সর্বহারা বস্তিগুলোর সংগ্রাম এবং পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ফরাসি মহিলাদের বহু শতাব্দীব্যাপী লড়াই।

 

“পারি কমিউন” দেখিয়ে দেয় যে জনগণের পক্ষে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়া সম্ভব, যা পৃথিবীজোড়া বিপ্লবীদের কাছে এক চিরকালীন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থেকে গেছে। সেদিক থেকে কমার্সির জিলেঁ জুঁনদের আহবান অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে আমরা মনে করি। আমরা আশাবাদী যে এই আন্দোলন সব জায়গায় সবরকম চেহারায় অর্থপূর্ণ হয়ে উঠবে, এমনকি ক্রয়ক্ষমতার প্রশ্নেরও ঊর্ধ্বে গিয়ে পৌঁছতে পারবে ক্ষমতার সেই সংজ্ঞায়: মানুষের জন্য, মানুষের দ্বারা, মানুষের হাতে ক্ষমতা।

 

রোজাভাতেও এ বিষয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে, যেখানে জাতিরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে গিয়ে বহু মানুষ সংগঠিত হতে চেষ্টা করছেন। তাদের সংগঠনের ভিত্তি হল গণতান্ত্রিক যৌথ এক সমাবেশ যেখান থেকে যাওয়া হবে ডেমোক্রেটিক কনফেডারেলিজম নামে এক ব্যবস্থার দিকে। আমরা জানি, সমাজ পুনর্গঠন সোজা কাজ নয়। অনেক সময় দিতে হবে, অনেক শ্রম আর অনেক শিক্ষার প্রয়োজন। কিন্তু কাজটা অত্যন্ত আনন্দেরও বটে।

 

একটা সমাজ হিসেবে স্বাধীনভাবে একসাথে থাকার একটা রাস্তা আমাদের খুঁজে বার করতেই হবে। হাজার হাজার মানুষ চৌমাথার, রাজপথের আর অবরুদ্ধ স্কুলের দিনগুলোর কথা উজ্জ্বলভাবে মনে রেখেছে। এসব অভিজ্ঞতার কাহিনী নিয়ে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর তারা কথা বলবে। কারণ, এসব কাজ আর গল্পের মধ্যে দিয়ে সমাজ সমষ্টিগতভাবে উত্থিত হয়। মানুষ যৌথ জীবনের মানে পুনরাবিষ্কার করে।

 

যৌথজীবন পেতে গেলে প্রথমেই মিথ্যে প্রজাতান্ত্রিক একতার জাতিরাষ্ট্রিয় মিথটাকে আমাদের ভেঙে ফেলতে হবে। পরস্পরকে আলাদা করে রাখা সীমারেখাগুলো মুছে ফেলতে হবে এবং আমাদের বহুবিচিত্র স্বতন্ত্র আত্মপরিচয়ের পুনরুন্মেষ ঘটাতে হবে, পুনরুত্থান ঘটাতে হবে বিবিধ সংস্কৃতি এবং “আঞ্চলিক” ভাষা সমূহের। মেয়েদের ফিরিয়ে নিতে হবে সেই সবকিছু যা তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, সবার কানে পৌঁছে দিতে হবে তাদের স্বর, এবং সমাজের সর্বত্র তাদের জায়গা করে নিতে হবে।

 

অন্য এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আমাদের গড়ে তুলতে হবে — সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি, যা নিয়ন্ত্রণ করবে জনগণ এবং তাদের থেকেই গড়ে উঠবে সেই অর্থনীতি। এর ভিত্তি হবে সমবায় উৎপাদন ব্যবস্থা, স্বশাসিত সরকার এবং বাস্তুতান্ত্রিক মূল্যবোধ। সবশেষে, প্রতিরোধের আত্মা হিসেবে যৌবনকে আন্দোলনের আপসহীন চালিকাশক্তির ভূমিকা পালন করতে হবে। গোটা পৃথিবীকেই এটা বুঝতে হবে যে এই আন্দোলনে ‘জয়’ বলতে নিছক কোনো মজুরি বৃদ্ধি বোঝায় না, এমনকি শুধু ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে যাওয়াও এর জিত নয়। এর জিত মানে এক পুনরুদ্ধারের পর্যায় যেখানে বর্তমান বিকল্প কাঠামোগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে স্বশাসনের এক নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। জেতা মানে বৈপরীত্যের মুখোমুখি হওয়া। চেষ্টা, ব্যর্থতা, আবার চেষ্টা। অস্তিত্বশীল রাষ্ট্র এবং শোষণমূলক যন্ত্রগুলো থেকে মুক্ত হবার আশা কখনোই ছাড়া চলবে না। আমরা স্বাধীনভাবে বাঁচব।

 

জিলেঁ জুঁন এবং ফ্রান্সের অন্যত্র যাঁরা প্রতিরোধ গড়ছেন এবং সারা পৃথিবীর যেখানে যেখানে মানুষ লড়ছেন, তাঁদের সবার সংহতিতে।
তুর্কি সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক।

 

 

অনুবাদ: গ্রাউন্ডজিরো।

রোজাভার মূল ইংরাজি চিঠিটি পড়তে হলে ক্লিক করুন: “Comrades from the Internationalist Commune of Rojava express their solidarity with the Gilets Jaunes in France”। রোজাভার ইন্টারন্যাশনাল কম্যুনের ব্যাপারে বিশদে জানতে ক্লিক করুন: https://internationalistcommune.com/

 

Share this
Leave a Comment