স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দ, নদী আন্দোলনের বীর সন্ন্যাসীরা আর এক আত্মবিস্মৃত রাষ্ট্রের কাহিনি


  • November 2, 2018
  • (1 Comments)
  • 285 Views

বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে নদী আন্দোলনের রাজনীতি নিয়ে আমাদের মনের মধ্যে উঠছে নানা প্রশ্ন। গঙ্গা ও নদী আন্দোলন, স্বামী জ্ঞানস্বরূপের মৃত্যু, তার গভীর তাৎপর্য, রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং পরিবেশ ও নদী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এসব নিয়েই এই বিশদ আলোচনা।এই লেখাটি যৌথ প্রচেষ্টায় তৈরি করেছেন গবেষক, শিক্ষক ও পরিবেশকর্মী ডঃ অমিতাভ আইচ এবং নদী ও জীবন বাঁচাও আন্দোলনের পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রচারক ও কর্মী, মাতৃভবন আশ্রমের খুবই কাছের এবং নদী নিবেদিত প্রাণ তাপস দাস

 

চলে গেছেন স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দ, আমরা যাঁকে প্রফেসর আগরওয়াল বলেই বেশি চিনি। গঙ্গাকে বাঁচানোর জন্য তাঁর অসাধ্য পণরক্ষার ১১২ তম দিনে রাষ্ট্রশক্তি ছলনার আশ্রয় নিয়ে চিকিৎসার নামে তাঁকে মাতৃসদন আশ্রম থেকে বলপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার ২৪ ঘণ্টা পর হৃষিকেশে এক সরকারি হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তাঁর শরীরে চিকিৎসার কারণে পটাশিয়াম ইনজেক্ট করা হয়েছিল স্যালাইন মারফত। স্বাভাবিক ভাবেই এই মৃত্যু কতটা স্বাভাবিক এ নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেছে। প্রশ্ন উঠে গেছে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও গঙ্গা নদীকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে তাদের সদিচ্ছা সম্পর্কেও। স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দ’র মৃত্যু আমাদের এক বিরাট জিজ্ঞাসা চিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ভিড় করে আসছে অনেক প্রশ্ন, আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজা খুব দরকার। স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দ, তাঁর গঙ্গা-রক্ষার তপস্যা বা অনশন, হরিদ্বারের মাতৃভবন আশ্রম, সেখানকার সন্ন্যাসী গঙ্গা-যোদ্ধাদের নদী আন্দোলন এবং গঙ্গা নদীকে বাঁচানোর জন্য, নদী এবং জীবনকে বাঁচানোর জন্য তাঁদের যে বৃহত্তর আন্দোলন – সে সম্পর্কে আমাদের বস্তুবাদী গণবিজ্ঞান আন্দোলনের এবং পরিবেশ আন্দোলনেরও আপাত যোগাযোগহীনতা এবং বোঝাপড়ার অভাবটাই আজ সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রচারবাদী সমাজ ব্যবস্থায়, বৈজ্ঞানিক সত্য ও আধ্যাত্মিক চেতনা এবং ধর্মবোধ থেকে উঠে আসা এক অন্যরকম পরিবেশ ভাবনা এবং গঙ্গার ‘অবিরলতা ও নির্মলতার’ সবচেয়ে বড়ো মুখ ও মননকে আমাদের আপাত বোধগম্যতার অভাবের সূত্র ধরেই কর্পোরেট নির্ভর বর্তমান ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা ধ্বংস করে দিল কিনা, এই প্রশ্ন আমাদের এত সহজে পিছু ছাড়বে না। কিন্তু এই প্রশ্নগুলির উত্তর আমাদের এখনই পাওয়া দরকার।

 

নদী বাঁচাও এবং জীবন বাঁচাও

 

এই মুহুর্তে ভারতে সমস্ত নদী ও পরিবেশ কর্মীদের মন শুধু ভারাক্রান্তই নয়, তার চেয়েও বেশি চিন্তিত ও আতঙ্কিত। কারণ প্রফেসর জি ডি আগরওয়াল কোনও সাধারণ মানুষ ছিলেন না। অনেক এগিয়ে থাকা একজন মানুষ ছিলেন। বিখ্যাত বিজ্ঞানী, আই আই টি কানপুরের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন অধ্যাপক এই মানুষটি বিশাল ব্যক্তিত্ব এবং জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। যিনি কিনা প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি তে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করতে পারেন। সেই রকম মানুষকে যেভাবে মরে যেতে দেওয়া হল বা মেরে ফেলা হল, সেখানে অন্যান্য নদী ও পরিবেশ কর্মীদের কী হবে? তাদের সাথে কীরকম ব্যবহার করা হবে সহজেই অনুমান করা যায়।

 

২০১৪ সালে বর্তমান বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই একটি ঘোষণা করে। আর সেটা হল গঙ্গার উপর ১০০ কিমি অন্তর বাঁধ নির্মাণ করা হবে। অথচ তার কিছুদিন আগেই ভোটের প্রচারে বারাণসী এসে নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন, “আমি এখানে নিজে আসিনি বা কেউ আমাকে এখানে পাঠায়নি, স্বয়ং মা গঙ্গাই আমাকে এখানে তাঁর সেবার জন্য পাঠিয়েছেন।” যাই হোক নতুন কেন্দ্রীয় সরকারের এই ঘোষণার পর পরই কয়েকটি সংগঠন মিলে গোমুখ থেকে উত্তরকাশী হয়ে গঙ্গা সাগর পর্যন্ত একটি সাইকেল যাত্রা করে এই প্রকল্পের বিরোধিতা করে। এবং গঙ্গার অবিরল স্রোত ও বহমানতার দাবি জানায় এবং বাঁধ নিমার্ণের বিরোধিতা করে। এটা একটা আন্দোলনের রূপ নেয় যা মূল নদী আন্দোলনের সাথে মিশে যায়। যে মাতৃসদনে স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দ অনশনে বসেছিলেন, সেখান থেকেই এই সাইকেল যাত্রার সূত্রপাত হয় এবং মাতৃসদনের প্রধান স্বামী শিবানন্দজি এই অভিযানের উদ্বোধন করেন। এর পর পরই অনেকগুলি কনভেনশন হয় যেমন, কাহেলগাঁও কনভেনশন, বেনারস কনভেনশন, ভাগলপুর কনভেনশন, ইত্যাদি। এই ভাবেই বৃহত্তর নদী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়ে যায়। চাপে পড়ে ২০১৫ সালে, কেন্দ্রীয় জলসম্পদ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে নীতিন গডকড়ি বলেন, আপাতত এই পরিকল্পনা রদ করা হল।

 

গঙ্গা বাঁচাও আন্দোলন ও নদী বাঁচাও আন্দোলন কি এক নাকি পৃথক?

 

এটি প্রকৃতপক্ষে সমার্থক। আসলে গঙ্গাকে বাদ দিয়ে তো কোনও নদী আন্দোলন হতে পারে না। ভারতের উত্তরভাগের জলপ্রবাহের পুরোটাই প্রায় গঙ্গার প্রবাহের মাধ্যমে সমুদ্রে বিলীন হয়। ভারতের প্রায় ২৬% ভূভাগ জুড়ে এই অববাহিকা। ৫০ কোটি মানুষ এই অঞ্চলে বসবাস করেন। আর ভারতের বোধহয় এমন কোনও গ্রাম নেই যেখানে গেলে আপনি গঙ্গা নামের একজন ব্যক্তিকে পাবেন না। আর আমাদের মিল্কিওয়েকেও ভারতে আমরা আকাশগঙ্গা বলি। এত নিবিড় গঙ্গা আর আমাদের সভ্যতার যোগসূত্র। তাই নদী আন্দোলন, জীবনের আন্দোলন এবং গঙ্গা নদীকে বাঁচানোর আন্দোলন সমার্থক। ভারতের অসংখ্য নদী আজকে জলহীন মৃত প্রায়, গাঙ্গেয় অববাহিকা থেকে সর্বত্র একই চিত্র। আবার বাঁধ, শিল্পের ও নানা প্রকার বর্জ্য ক্রমাগত মিশে যাওয়ার ফলে জলহীনতা থেকে নদী ভাঙন এবং জলদূষনের করাল গ্রাসে গঙ্গা সমেত সমস্ত নদী। এই নদ-নদীগুলি না-বাঁচলে বাঁচবে না জীবন, সভ্যতা, বাস্তুতন্ত্র। তাই নদীকে বাঁচিয়ে রাখার আন্দোলন জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার আন্দোলন এবং গঙ্গাকে বাঁচানোর আন্দোলন, ভারতের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার আন্দোলন।

 

গঙ্গা দূষন

 

প্রফেসর জি ডি আগরওয়াল, নদী প্রশাসন, সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড, সরকারি উন্নয়ন এবং দূষনরোধী চিন্তা, আপাত দায়বদ্ধতা এবং বিরোধের ইতিহাস

 

এক দীর্ঘ সময় জুড়ে প্রফেসর জি ডি আগরওয়াল – যাঁকে আমরা জি ডি বলেই এখানে বেশি সম্বোধন করব – ছিলেন ভারতের পরিবেশ কারিগরি বিদ্যার পথ প্রদর্শক। একাধারে শিক্ষক, গবেষক ও পরম আধ্যাত্মিক চেতনা মিশ্রিত তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল চরম ব্যতিক্রমী। আই আই টি রুরকি ও বার্কলে থেকে পড়াশোনা ও গবেষণা শেষ করে দেশে ফিরেই পঞ্চাশের দশকের প্রথমেই আই আই টি কানপুরের লেকচারার পদে যোগদান আর তারপর ১৯৭৮ পর্যন্ত সেখানেই তার শিক্ষকতা ও প্রফেসর হিসাবে বিশাল খ্যাতি অর্জন। আরও অনেক দিকপাল ছাত্রের মতোই সেন্টার ফর সায়েন্স আন্ড এনভায়রনমেন্টের অনিল আগরওয়ালও তাঁরই দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন। এহেন জি ডি কানপুরে আই আই টি’তে থাকার সময় তাঁর ছাত্রদের দিয়ে কিছু মৌলিক গবেষণা করান গঙ্গার জল নিয়ে। এবং তার গঙ্গা সম্পর্কে বক্তব্যগুলি বুঝতে গেলে এই বিষয়গুলিকেও বুঝতে হবে। তিনি বলেছেন এবং গবেষেণাপত্রেও বহু জায়গায় লিপিবদ্ধ করেছেন যে, গঙ্গাজলের এক আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য আাছে আর তা পচনরোধক, রোগনিরাময়কারী ও দূষণরোধী। জি ডি বলেছেন, আর এই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের উৎস হিমালয় হিমবাহ, হিমালয় থেকে উৎপাদিত পলি ও নদীর উৎস্য মুখের বাস্তুতন্ত্র। গঙ্গার জলে রয়েছে আশ্চর্য বিপুল পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া বা জীবানু ধ্বংসকারী ফাজ ভাইরাস বা ব্যাকটেরিও ফাজ। কিন্তু উচ্চচাপ ও তাপে বা অটোক্লেভ করলেও এই বৈশিষ্ট্য লোপ পেয়ে যায় না কিন্তু সেন্ট্রিফিউজ এবং আল্ট্রাফিল্ট্রেশন করলেই এই বৈশিষ্ট্যের বিলোপ হয়। এর অর্থ শুধু ফাজ নয়, জলে দ্রবীভূত বিপুল পলিজাতীয় মাইক্রোনিউক্লি এবং বিশেষ ধরনের অজৈব এবং রাসায়নিক উপাদানও এর জন্যে দায়ী। আর এটাই তাঁর মতে গঙ্গাজলের ‘নির্মলতা’। যার ফলে শত শত বছর ধরে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য গঙ্গার জলে পড়লেও, মানুষ বিশেষ করে ধর্ম প্রাণ হিন্দুরা এই জল পান করছেন, স্নান করছেন কিন্তু গঙ্গার জল থেকে কোনও মারাত্বক ত্বক এবং পেটের অসুখের মহামারী ছড়িয়ে পড়ছে না। তাই গঙ্গা জলের নির্মলতা জি ডি’র মতে সাধারণ পরিবেশ বিজ্ঞানের ভাষায় যা শুধু বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড বা বিওডি, ডিসলভ অক্সিজেন, পিএইচ, অ্যালক্যালিনিটি, হার্ডনেস, নিউট্টিয়েন্ট, ট্রান্সপারেন্সি এই সব কোয়ালিটি প্যারামিটারে সীমাবদ্ধ নয়। তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু এবং গঙ্গা জলের অক্সিজেন ধারণ ক্ষমতা পৃথিবীর যে কোনও নদীর চেয়ে তাই বেশি আর এই গবেষণা লব্ধ জ্ঞান থেকেই তিনি বলে গেছেন, গঙ্গার ‘অবিরলতা’র কথাও। আর তাঁর কথায় ‘অবিরলতা’ না- থাকলে গঙ্গা জলের ‘নির্মলতা’ও থাকবে না। কী এই ‘অবিরলতা’ সে কথা তিনি বার বার বুঝিয়ে দিয়েছেন।‘অবিরলতা’ অর্থ, উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত, নদীর দুই পাড়ে, প্লাবন ভূমিতে, নদীগাত্রের নুড়ি পাথর, বালি এবং জলের উপরের হাওয়ার সাথে নদীর সরাসরি বন্ধনহীন যোগাযোগের পথে কোনও বাঁধা থাকবে না। থাকবে না কোনও কংক্রিটের প্রাচীর, বাঁধ বা নদীকে নিয়ে যাওয়া যাবে না কোনও পাইপ বা নলের মধ্যে দিয়ে। আর এই কারণেই নীতিন গডকরি একসময় বলেছিলেন, আমি ‘নির্মলতা’ বুঝতে পারি কিন্তু ‘অবিরলতা’ বুঝতে পারছি না। প্রকৃত অর্থেই এটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কথা কারণ ‘নির্মলতা’ নিয়ে হয়তো হিন্দুত্ব রাজনীতি করা যায় কিন্তু ‘অবিরলতা’ মানতে গেলে তো করপোরেট উন্নয়নের মুনাফা আর রাজনীতির লাভে টান পড়বে। আর কে না জানে বড়ো বাঁধ এক সময় এবং এখনও পৃথিবীর তাবৎ নেতা, ডান, বাম, মধ্যপন্থী সবার কাছেই ছিল উন্নয়নের মডেল। যেখানে খালি মুনাফা।

গঙ্গার উপর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প

 

তবে জি ডি’র ‘নির্মলতা ও অবিরলতা’কে ভারতের আপামর গণবিজ্ঞান এবং পরিবেশকর্মীরা তাঁর জীবদ্দশায় কতদূর পুরোপুরি বুঝতে পেরেছেন সেটাও একটা বড়ো প্রশ্ন। অন্তত তাঁর সংগ্রাম ও মৃত্যু সে প্রশ্ন তুলছে।

 

১৯৭৮ সালে আই আই টি, কানপুর থেকে পদত্যাগ করার পর, ১৯৭৯ সালে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধি তাঁকে সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডের প্রথম মেম্বার সেক্রেটারি নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু সেখানে তিনি মাত্র একবছর ছিলেন। সে সময় রুরকিতে তিনি অতিথি অধ্যাপকের কাজ করতেন। তবে ওই অল্প সময়তেই সি পি সি বি’তে তাঁর নেতৃত্বে বায়ু, জল নিয়ে, ই আই এ রুল এসব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দূষণ সংক্রান্ত কাজ হয়। ছাত্রদের নিয়ে কানপুরে থাকতেই তৈরি করেছিলেন পরিবেশ বিষয়ক যন্ত্র নির্মাণের একটি সংস্থাও। অবশ্য জি ডি এই অতিমাত্রায় প্রশাসনিক এবং তাঁর কথায়, পরিবেশ রক্ষার এই হৃদয় ও দিশাহীন সরকারি কাজে নিজেকে বেশিদিন নিয়োজিত রাখতে পারেননি। পরবর্তী কালে এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি বুন্দেলখণ্ডের চিত্রকুটে মহাত্মাগান্ধী গ্রামোদয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁকে যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন তাঁরা বলেন, একটা ছোট ঘরে থাকতেন এই গান্ধিবাদী অকৃতদার সাধক। পড়তেন হাতে বোনা খদ্দর, রান্না করতেন নিজে আর মূল বাহন ছিল সাইকেল এবং চিত্রকুট থেকে বাইরে কোথাও যেতে হলে ট্রেনের দ্বিতীয় শ্রেণির টিকিট কেটে চড়ে বসতেন। কিন্তু গঙ্গার ‘অবিরলতা ও নির্মলতা’ ছিল তাঁর জীবনের ব্রত।

 

২০০৮ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত তিনি গঙ্গার উৎসমুখ থেকে ভাগীরথী এবং অন্যান্য জলধারাগুলির উপরে একের পর এক বাঁধ নির্মাণ, গঙ্গা বক্ষে বালি ও পাথরের খাদানের বিরুদ্ধে ও গঙ্গার রিজুভিনেশন (একটা শব্দ যার বরাবর বিরোধী ছিলেন তিনি, তিনি গঙ্গার প্রকৃত চেহারা ফিরিয়ে দেবার পক্ষে ছিলেন) এর নাম করে সরকারি অর্থ অপচয় (১৯৮৬ সালে চালু হয়ে গিয়েছিল গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান) এবং তার মাধ্যমে গঙ্গার কোনও উন্নতি না- হওয়ায়, ২০০৮, ২০০৯, ২০১০, ২০১২ ও ২০১৩ মোট পাঁচবার অনশন করেন (এবারেরটা তার ষষ্ঠ ও অন্তিম অনশন)। তখন ইউ পি এ আমল, ২০০৯ সালে গঙ্গারক্ষায় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ’র নেতৃত্বে গঠিত হয় National Ganges River Basin Authority (পরে এনডিএ আমলে National Council for River Ganga)। ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় সরকার ভাগীরথীর উপর তৈরি হতে যাওয়া লোহারিনাগ পালা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করে দেয় এবং গোমুখ থেকে উত্তর কাশী পর্যন্ত অঞ্চলকে ইকো সেনসেটিভ জোন ঘোষণা করা হয়। আর এই সবই হয় ওই পাঁচটি অনশনের চাপে এবং জি ডির প্রতি সামান্য হলেও তদানীন্তন সরকারের যে কিছুমাত্র সম্ভম বোধ ছিল তার ফলশ্রুতিতে। কিন্তু গঙ্গার ‘অবিরলতা ও নির্মলতার’ উদ্ধার তার পরেও করা যায়নি। এর পর ২০১৪ সাল আসবে। কোনও একজন নরেন্দ্র দামোদরভাই মোদী বারাণসীর ঘাটে নিজেকে ‘গঙ্গাপুত্র’ বলবেন, ভোটে জিতে প্রধানমন্ত্রী হয়ে কুড়ি হাজার কোটি টাকার ‘নমামে গঙ্গে’ প্রকল্প ঘোষণা করবেন এবং জি ডি’র জীবন ও সংগ্রাম এক আশ্চর্য সমাপতনের দিকে যাবে। এর মধ্যে ২০১১ সালে প্রথাসিদ্ধভাবে সন্ন্যাস নিয়ে জি ডি পরিচিত হয়েছেন স্বামী জ্ঞানস্বরূপ নামে।

 

মাতৃসদন আশ্রমের সঙ্গে যোগাযোগ

 

মাতৃসদন আশ্রম তৈরি হয় ১৯৯৭ সালে। শুরুর দিকে জনা দশেক সন্ন্যাসী, শিবানন্দজি, নিগমানন্দজি, যার মধ্যে ছিলেন অন্যতম। তাঁদেরকে নিয়ে এই আশ্রমের পথ চলা শুরু। এর মধ্যে নিগমানন্দজি একই কারণে ১১৫ দিন অনশন করেছিলেন এবং এরপর প্রশাসন তাঁকেও একইভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁরও হঠাৎ রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয়। এই মৃত্যু রহস্য এতটাই ঘনীভূত হয় যে, দু-দু’বার তাঁর মরদেহে পোস্টমর্টেম করা হয়। এবং সকলেই মনে করেন তাঁকেও হত্যাই করা হয়েছিল। এর পিছনে এলাকার খাদান মালিকদের হাত আছে এবং এই হত্যাকারীরা আজও চিহ্নিত হননি। এহেন মাতৃসদনের সন্ন্যাসীরা অনেকেই বিজ্ঞান স্নাতক ও উচ্চ শিক্ষিত এবং পরে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছেন। এঁরা সকলেই হিমালয় এবং গঙ্গার পরিবেশ রক্ষার নিবেদিত প্রাণ যোদ্ধা। শুরু থেকেই তাঁরা গঙ্গারক্ষার আন্দোলনে সামিল হয়ে যান। তাঁদের সবচেয়ে বড় লড়াই ছিল অবৈধ বালি ও পাথর খাদানের বিরুদ্ধে। পুরাণ বর্ণিত কুম্ভক্ষেত্র অর্থাৎ হরিদ্বার থেকে কঙ্খল পর্যন্ত অঞ্চল অবৈধ বালি ও পাথর খাদানের করাল গ্রাসে। এই অবৈধ খাদানগুলি বন্ধ করার জন্য চলে আসা আন্দোলন ও মামলার ফলে সাত সাত বার খাদানের পারমিট বাতিল হয়। ফলে বোঝাই যাচ্ছে কী পরিমাণ ব্যবসায়িক ও মুনাফার স্বার্থ এর ফলে বাধা প্রাপ্ত হয়। এই সময় একজন অনশনরত সন্ন্যাসী ব্রহ্মচারী গোকুলানন্দ হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যান এবং তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাই মাতৃসদন, তার গঙ্গা ও হিমালয়ের পরিবেশকে রক্ষার ও আত্মবলিদানের ইতিহাস দীর্ঘ দিনের। এঁরা একই সঙ্গে সন্ন্যাসী, পরিবেশ ও বিজ্ঞানকর্মী। হয়তো বাংলায় নাস্তিকতা ও বামপন্থা থেকে উঠে আসা বিজ্ঞান এবং পরিবেশ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে এটা আমাদের অদ্ভুত লাগবে।

 

২০১৩ সালে স্বামী জ্ঞানস্বরূপ অনশন করেছিলেন উত্তর কাশীতে। এই বার তার অন্তিম আন্দোলনে সাথি হয় গঙ্গা আন্দোলনের এই পীঠস্থান। সন্ন্যাসীর বিজ্ঞান মনস্কতার শেষ নিদর্শন হিসাবে মরণোত্তর দেহদান করে যান। অবশ্য সেই দানের সুযোগ নিয়ে যেভাবে তাঁর দেহের অন্তিম দর্শন থেকেও মানুষকে বঞ্চিত করে এইমস, হৃষিকেশ তা এককথায় ন্যক্কারজনক।

 

অন্তিম লড়াই

 

২০১১ সালে সন্ন্যাস নেওয়ার পর প্রফেসর জি ডি আগরওয়াল, স্বামী জ্ঞানস্বরূপ হিসাবে পরিচিত হন। এর পর থেকেই তাঁর গঙ্গা রক্ষার লড়াই নতুন ভাবে শুরু হয়। ২০১৩ সালে তিনি উত্তরকাশীতে অনশন শুরু করেন। সে বার কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করেন গঙ্গার উৎসস্থলে নতুন করে কোনও বাঁধ নির্মাণ হবে না এবং উনি অনশন তুলে নেন। এ ব্যাপারে আমরা আরও বিশদে আগেও বলছি। বিজ্ঞানী হিসাবে ওঁর পর্যবেক্ষণ ছিল যে নদীর বিওডি (Biochemical Oxygen Demand), যা আসলে নদীর জলের স্বাস্থ্যর একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক, যদি সঠিক মাত্রায় রাখতে হয় তবে নদীর জলের তরলের মাত্রা বা dilution level’কে ঠিক রাখতে হবে আর সেটা করতে গেলে বজায় রাখতে হবে/ বাড়াতে হবে জলের প্রবাহ। আর একজন প্রথিতযশা পরিবেশবিদ হিসাবে এটা তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল এটা আগেই আলোচনা হয়েছে। কিন্তু যে ভাবে নদীর উৎসস্থলে ও উপরিভাগে একের পর এক বাঁধ তৈরি করা হয়েছে, হওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাতে এই প্রকার জলপ্রবাহ কোনওমতেই সম্ভবপর নয় আর তাঁর নিরন্তর বাধায় গঙ্গা নদীর মৃত্যু ঘণ্টা বেজে গিয়েছে। সরকারি তথ্য বলছে গঙ্গার উৎসস্থলের প্রায় ৫২ শতাংশ অংশ এই ভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে আছে। যাঁরা পাহাড়ে ট্রেকিং করেন তারা জানেন এই ভাবে মানেরি থেকে কোটেশ্বর পর্যন্ত দেবপ্রয়াগের কাছাকাছি অঞ্চলে মধ্যে নানাভাবে টানেলের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়ার ফলে মানেরি প্রভৃতি অঞ্চলে নদীতে দেহসংস্কারের জন্যেও লোকে সেচ দপ্তরে ফোন করে। নদীতে কোনও জলই থাকে না শুখা মরশুমে। আর এখানেই সংঘাত, এখানেই বিরোধ। না গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান (GAP) না নমামে গঙ্গে কোনোটাই এ বিষয়ে দৃকপাত করেনি। প্রায় চার বছর সময় দেওয়ার পর বারংবার বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে উনি বলেন যদি এসব বন্ধ না-করা হয় তাহলে উনি এবার আমরণ অনশন শুরু করবেন। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি লিখে পরিষ্কার চারটি দাবি পেশ করেন:

 

১) ২০১২ সালে ‘গঙ্গা মহাসভা’য় গৃহীত প্রস্তাব অনুসারে সংসদে একটি বিল পেশ করা হোক। ওই প্রস্তাবে গঙ্গাকে বাঁচানোর দিক নির্দেশ করা আছে। (এখানে দেখুন: http://www.gangamahasabha.org/)

২) গঙ্গা ও তার শাখানদী, যেমন অলকানন্দা, মন্দাকিনী, ধৌলীগঙ্গা, পিন্ডার ইত্যাদি জলধারার ওপর সমস্ত পরিকল্পিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করতে হবে।

৩) গঙ্গাবক্ষে বালি ও পাথর খাদান অবিলম্বে বন্ধ করা হোক।

৪) একটি ‘গঙ্গা ভক্ত পরিষদ’ গঠন করা হোক। এতে সরকারি, বেসরকারি, নাগরিক সংগঠন ও গঙ্গাকে অন্তরে স্থান দেন এমন ব্যক্তিরা থাকবেন আর এই পরিষদের ছাড়পত্র ছাড়া গঙ্গার ওপর কোনও নির্মাণ বা উন্নয়ন প্রকল্প করা যাবে না।

 

কোনও জবাব দেননি প্রধানমন্ত্রী। পরেও বারংবার চিঠি দেওয়া সত্ত্বেও না। জুন মাসের ২২ তারিখ জি ডি আমরণ অনশন শুরু করেন। তারপর অগস্ট মাসে উমা ভারতী ওঁর সঙ্গে দেখা করতে এসে নীতিন গডকরির সঙ্গে কথা বলান। জি ডি বলেন যা বলার একজনকেই বলেছি, যা করার তাকেই করতে হবে, এ বিষয়ে অন্য কারোর সঙ্গে উনি কথা বলবেন না। এর পর অগস্ট মাসেই ওঁর প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে উনি শেষবারের মতো ওই একই দাবিগুলো সামনে আনেন, যে চিঠি, সমাজ মাধ্যমে আপনারা অনেকেই দেখে থাকবেন। সেখানে উনি প্রধান চারটি দাবি এবং গঙ্গা মহাসভার যে কমিটি রিপোর্ট, সেই অনুযায়ী গঙ্গার অবিরল ধারাকে বহমান রাখার জন্য কী কী করা দরকার আবারও বলেন। ওই চিঠিতে এটাও লেখা আছে “যে এ কাজ না-করতে পারলে, গঙ্গাজি তোমাকে ক্ষমা করবে না।” চিঠিতে আছে যে এসব না করে আর যা হচ্ছে তা সবই প্রকল্প ভিত্তিক কর্পোরেট স্বার্থের কাজ এবং লিখেছেন যে “এর থেকে গঙ্গাজির কোনও লাভ হবে না।”

 

কোনও জবাব দেননি প্রধানমন্ত্রী। পরেও বারংবার চিঠি দেওয়া সত্ত্বেও না।

 

আর সত্যই তো যেভাবে গঙ্গার মূল স্রোতগুলি আটকে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প করার পরিকল্পনা করা হয়েছে তাতে ওই অঞ্চলের ৮০% ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক শোভা চিরতরে বিনষ্ট হয়ে যাবে।

 

হরিদ্বারের অন্যান্য আখড়ার সন্ন্যাসীদের এই আন্দোলনে কী ভূমিকা ছিল

 

অন্য আখড়া গুলির কাছে ধর্ম মানে পূজা বা ধর্মীয় বিধি পালন করা মাত্র। কিন্তু জি ডি বা মাতৃসদনের কাছে তা জীবনচর্চা, তাই চারপাশে ঘটে চলা ঘটনা নিয়ে তাঁরা ভাবিত এবং সেখানে ভুল বুঝলে তা বদলাতেও চেষ্টা করেন।

 

বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উপর জি ডি’র নির্ভরতা প্রসঙ্গ

 

 ২০১৩ সালে স্বামী জ্ঞানস্বরূপের অনশনের সময়, আজকের প্রধানমন্ত্রী, তখনকার গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী টুইট করেছিলেন এবং চিন্তা প্রকাশ করেছিলেন তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে, বলেছিলেন তাঁর দাবিগুলি মেনে নেওয়া উচিত। কিন্তু এবারের টুইট এল স্বামীজির মৃত্যুর পর। হ্যাঁ, স্বাভাবিক ভাবেই নিজেকে ‘গঙ্গার দ্বারা প্রেরিত’, নির্বাচনের প্রচার কালে একথা বলা প্রধানমন্ত্রীকে উনি ভরসা করেছিলেন এবং সময় দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ভুলেও ওঁর আশ্রমের পথ মাড়াননি বা চিঠির কোনও জবাব দেননি। আর এর নেপথ্যে ছিল যে রহস্য তার অনেকটাই আজ উন্মোচিত। ২০১৭ সালেও ক্যাগের (সিএজি) রিপোর্টে এই ভাবে নানা নাম বদলে বদলে চলা গঙ্গার নানান প্রকল্প (যেমন GAP বদলে Namame Gange, তারপর নানান নতুন সব দপ্তর যেমন GRRM, NMCG ইত্যাদি’র) খুবই কঠিন সমালোচনা করা হয়। বলা হয় প্রকল্পের কাজ সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে সমস্ত দিক থেকেই। এসবের ফলে প্রধানমন্ত্রীর কখনও সাহস হয়নি এত বড়ো মিথ্যা ধরা পরে যাওয়ার পর ওঁর সামনে আসার।

 

স্বামীজি’র মৃত্যুর পর মাতৃসদনের ও হরিদ্বারের পরিস্থিতি এবং হত্যার অভিযোগ

 

হত্যার অভিযোগ ওঠা স্বাভাবিক ছিল এবং তা উঠেছে। সি বিআই তদন্ত, ৩০২ ধারায় মামলা অনেক কথাই উঠেছে, মামলা হয়েছে, আরও হয়তো হবে, আর সেটাও স্বাভাবিক। তাঁর নিজের হাতে একটা প্রেস বিজ্ঞপ্তি লিখেছিলেন জি ডি, মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে। ওয়াকিবহাল মহল মনে করেন যিনি এতটা সজাগ তার রক্তের পটাসিয়াম স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে এত কম হতে পারে না। আর কীভাবেই বা পটাসিয়াম দেওয়ার পরই ওঁর হৃদযন্ত্র বিকল হয় আর তার দায় কেউ না নিয়ে ‘স্বাভাবিক পরিণতি’, ‘অনশনে মৃত্যু’ এসব কথা চট করে বলে দেওয়া যায়, সেটাও প্রশ্নের সামনে আসছে। এসব অভিযোগ যে অমূলক নয় তা জি ডি’কে কীভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যাঁরা দেখেছেন তাঁরাও প্রশ্ন তুলবেন ও তুলছেন। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়ে ছিল স্ট্রেচারে করে নয়, চেয়ার সমেত ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে। কাজেই এটা যে একটা গভীর ষড়যন্ত্র বোঝাই যায়। আর এটাই নদী ও পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীদেরও ব্যর্থতা, কারণ সেদিন যদি নদী কর্মী আর সাধারণ মানুষ মাতৃসদন ঘিরে রাখত প্রশাসনের অবশ্যই সাহস হত না একাজ এত সহজে করার। শিবানন্দজি প্রতিবাদ করেছিলেন, কিন্তু হরিদ্বারের এস ডি এম বলেন এটা ওঁদের দ্বায়িত্ব স্বামীজি’র সুরক্ষার। এখন প্রশ্ন হল তাহলে এস ডি এম ও হৃষিকেশ এইমস -এর সুপারকেও তো এর জবাব দিতেই হবে।

 

বিজ্ঞান, নাস্তিকতা ও ধর্ম প্রসঙ্গ ও অর্থহীন দ্বিধা

 

একথা অনেকেই বলেন ও বলছেন, বিশেষ করে বামপন্থী গণসংগঠন এবং বিজ্ঞান আন্দোলনের কর্মীরা যে, তাঁরা খুব দ্বিধাগ্রস্ত আছেন ও ছিলেন, যে জি ডি নিজেকে হিন্দু বলতেন এবং তাঁর সব লেখায় ও কথায় ধর্মীয় ভাবাবেগ স্পষ্ট, এমনকি গঙ্গাকে তিনি ‘মা গঙ্গাজি’ বলেন। এসব তাঁরা মেনে নিতে পারেন না। আসলে জি ডি যে অর্থে ধার্মিক এবং অধ্যাত্মবাদের ধারক ও বাহক ছিলেন ভারতের ধর্মীয় অধ্যাত্মবাদের এই ধারাটি বরাবরি প্রকৃতির সাথে জীবনের মেলবন্ধনের কথা বলে এসেছে। এই ধারণা থেকেই পুরাণের ঋষিরা শিষ্যদের প্রকৃতি পূজা শিখিয়েছেন, ভোগবাদ পরিত্যাগ করতেও। এই একই বোধ থেকে আদিবাসীরা মনে করেন পবিত্র বৃক্ষসমষ্টি বা Sacred Groves প্রকৃতিকে রক্ষা করে। একই বোধ থেকে মহামতি অশোক তাঁর শিলালিপি’তে প্রকৃতি রক্ষার কথা লেখেন কারণ তা সিদ্ধার্থ বুদ্ধের বাণী। আর মহামতি অশোকের সেই বাণী সম্বলিত শিলালিপি তো স্বাধীন ভারতের প্রতীক। সেই একই সনাতন প্রকৃতি প্রেম ও প্রকৃতিই ঈশ্বর এই কথা বলে রাজস্থানের বিশনই’রা রক্ষা করে নীলগাই ও অন্যান্য প্রাণী। চিপকোতে মহিলারা জড়িয়ে ধরেন গাছ, বাস্তারের আদিবাসীরা তাদের ঈশ্বর স্বরূপ পূজিত আকরিক বোঝাই পাহাড়গুলি বাঁচাতে বহুজাতিক সংস্থা ও রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, আর রবীন্দ্রনাথ করেন বনমহোৎসব, মহাত্মা গান্ধি চড়কা ঘোরান, যা ১৯৭২ সালে কোনও একজন ই এফ সুমাখারের এপ্রোপ্রিয়েট টেকনলজি’র কনসেপ্ট ঘুরে সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্টের সবচেয়ে বড় মাইল ফলক হয়ে যায়। আসলে এসব আপাত তুচ্ছ তর্কের বিষয়। কোনওকিছু বা কোনও ভাবনা যদি প্রকৃতি ধ্বংসকারী হয় এবং মানুষকে প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে থাকতে না-শেখায় সেটা বিজ্ঞান, ধর্ম, সমাজতন্ত্র কোনওটাই নয়। শেষ কথা জি ডি’ই বলে দিয়ে গেছেন, ‘অবিরলতা ও নির্মলতা’, যা কিছু এর বিরুদ্ধে তাই পরিত্যাজ্য। আর এটাই সবচেয়ে প্রাচীন ও সবচেয়ে আধুনিক কথা। এমনকি হলিউডের অস্কারবিজয়ী কল্পবিজ্ঞান কাহিনি ‘অবতার’-এর বিষয়ও একই। যেখানে মাদার ট্টি’কে রক্ষা করার জন্য কোনও এক অজানা গ্রহের সব আদিবাসী ও প্রাণীরা হামলাবাজ পৃথিবীবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, যারা মাদার ট্টি’কে উপরে ফেলে তার তলাকার দামি খনিজ পদার্থ দখল করতে চায়। হিন্দুত্ববাদীদের ত্রিশূল পূজা, ধর্মের রাজনীতি, শবরীমালা মন্দিরের নারীবিদ্বেষী পুরোহিতদের থেকে এ ভাবনা অনেক দূরে। এমনকি সাধারণ যে কোনও ধর্মাচারীদের থেকেও।

 

বৃহত্তর রাজনৈতিক তাৎপর্য, সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে সম্পর্ক, নদী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ ও পরবর্তী পরিকল্পনা

 

এটা ঠিক তখনকার ইউপিএ সরকারের প্রতিক্রিয়া জি ডি’র আগের অনশনের ক্ষেত্রে আর এখন বিজেপির সরকারের প্রতিক্রিয়া , দুটোর কোনও তুলনাই চলে না। জি ডি’র মৃত্যর পর প্রধানমন্ত্রীর কুম্ভীরাশ্রু শুধু বয়নি, নীতিন গডকরি বলেছেন, সব দাবি নাকি মেনে নেওয়া হয়েছিল। তা যখন মেনে নেওয়া হয়েই ছিল সেটা বলা হল না কেন? কেন ওঁকে জোর করে চলে যেতে দেওয়া হল এই ভাবে, যা প্রায় হত্যা বলেই সকলে মনে করছেন? আসলে গঙ্গাকে নিয়ে যারা আবেগমথিত রাজনীতি করে, তাদের যে গঙ্গাকে নিয়ে কোনও আবেগই নেই এটা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন জি ডি। তারা চায় গঙ্গার জল থেকে খালি লাভ করতে। এটা পুঁজি নির্ভর ফ্যাসিজমের আরেক অন্যরকম চেহারা। এই ঘটনার গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে। বিজেপি সরকার কর্পোরেট শক্তির কাছে সব কিছু বিকিয়ে দিয়েছে। ভারত এবং তার সভ্যতা কোনওভাবেই এ দলটি ক্ষমতায় থাকলে সুরক্ষিত নয় এটা আজ খুব পরিষ্কার। বিশেষ করে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে এই উপলব্ধি খুব জরুরি উপলব্ধি।

 

এটা ঘটনা যে জি ডি’র মৃত্যুর পর ভারতের নদী ও গঙ্গা বাঁচাও আন্দোলন আর কোনও সাধারণ নদী আন্দোলনে সীমাবদ্ধ নেই। আগরওয়ালজি’র মৃত্যুর ঘটনা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, কর্পোরেট শক্তি ও মুনাফালোভিরা তাদের মুনাফার স্বার্থে রাজনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে যে কোনও কাজ করাতে পারে। তাই শুধু নদী কর্মী নন, পরিবেশ কর্মীরা নন, সমস্ত সাধারণ মানুষকে আজ এগিয়ে আসতে হবে এবং প্রতিবাদে সামিল হতে হবে। আগরওয়ালজি’র মৃত্যুকে কোনওভাবেই ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। কারণ তা না-হলে ভারতবর্ষ আর তাঁর প্রাকৃতিক পরিবেশ শেষ হয়ে যাবে। মনে পরে একবার উনি এক বিজেপি কর্মীকে, যারা ওঁর অনশন ভাঙ্গানোর জন্যে দরবার করছিল, ঠাট্টার ছলে বলেছিলেন “ আর এখানে তো কিছু হবে না, মনে হচ্ছে আমাকে রামজি’র দরবারেই এর বিচার চাইতে হবে।” হয়তো সেটা ওনার বিশ্বাস ছিল কিন্তু আমরা ভাবতেই পারি, রামজি’র দরবারে কেন? মানুষের দরবারেই এই অপরাধের বিচার হোক। কারণ এটা নিশ্চিত যে ২০১৯-এ, যদি এই সরকার আবার ক্ষমতায় আসে তাহলে তারা গঙ্গাকে “ন্যাশনাল ওয়াটার ওয়ে” ঘোষনা করে এর মাধ্যমে পন্য পরিবহনের পথ তৈরি করবেন। জি ডি এর ভয়ানক বিরোধী ছিলেন। এই পথ তৈরি হলে গঙ্গা নদী আর তার উপর নির্ভরশীল ভারতের প্রাচীন সভ্যতা, বাস্তুতন্ত্র, প্রান্তিক মানুষদের জীবন জীবিকা এসবেরই মৃত্যু ঘটবে। এই ভয়ানক আগ্রাসন, যা শুধু গঙ্গা নয়, ভারতের সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদের উপর কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চাইছে, তাকে আমাদের থামাতেই হবে। মনে হতে পারে যে এটা কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে বা পক্ষে বক্তব্য, কিন্তু সত্য এটাই। গঙ্গাকে বাঁচাতে গেলে, ‘গঙ্গা মহাসভার’ যাবতীয় সুপারিশকে কার্যকর করা ছাড়া এবং আগরওয়ালজি’র কথা মতো ‘গঙ্গা ভক্ত পরিষদ’ গঠন করে একটি পৃথক গঙ্গা রক্ষার আইন প্রনয়ন করা ছাড়া পথ নেই। আর এটাই আমাদের এক মাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত।

 

পরিশেষে

 

এই লেখা যখন তৈরি হচ্ছে তার মধ্যে তিনটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে। সেগুলি নানা সূত্রে আমরা জানতে পেরেছি। সেগুলি নীচে দেওয়া হল:

 

১) সরকার জি ডি. আগরওয়ালজি’র দেহের অন্তিম দর্শনের সুযোগ দেয়নি। অনেক বলা ও চাপসৃষ্টির পর মাত্র ৭৫ জনকে (অসমর্থিত সূত্র তাই অল্প কিছু বলাই ভাল) খালি দেখার সুযোগ দেওয়া হয়। পরে নৈনিতাল আদালতে এ নিয়ে মামলা হয় এবং শরীর দান করার জন্য হলেও মাতৃসদনে আনতে বলে কোর্ট। তার বিরুদ্ধেও সুপ্রিমকোর্টে মামলা হয়েছে এবং দেহ দেখা আটকানো হয়েছে “দেহ দান হয়ে গেছে, নষ্ট হয়ে যাবে” এই অছিলায়। এটা থেকে বোঝা যায় জীবিত জি ডি’ই নয় মৃত জি ডিও সরকারের কাছে, মুনাফালোভীদের কাছে আতঙ্ক।

২) হরিয়ানার সন্ত গোপাল দাস, যিনি মাতৃভবন আশ্রমের সন্ন্যাসী ও স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দের সাথেই গত ২৪ জুন থেকে অনশন করছিলেন, তাকেও জোর করে ধরে নিয়ে গেছে প্রশাসন ও হৃষিকেশের ওই এইমস হাসপাতালেই তাঁকে রাখা হয়েছে, যেখানে স্বামী জ্ঞানস্বরূপের রহস্য মৃত্যু ঘটেছে। সন্ত গোপাল দাসের শরীরে নাক দিয়ে তরল খাদ্য প্রবেশ করানো হয়েছে। সন্ত গোপাল দাস স্বামী জ্ঞানস্বরূপের মতো আশ্রমে ছিলেন না বরঞ্চ গঙ্গার এই ভয়ানক বিপদকে মানুষের সামনে তুলে ধরার জন্যে ‘গঙ্গা সদভাবনা যাত্রা’য় বেড়িয়ে পড়েছিলেন। ভয়ানক চাপে ও আতঙ্কে থাকা উত্তরখণ্ডের পুলিশ প্রশাসন তাঁকে মাতৃভবনে ফিরে আসার সাথে সাথে জোর করে ধরে নিয়ে যায়। এখনও পর্যন্ত গোপাল দাস সুস্থ আছেন। স্বামী শিবানন্দ, মাতৃসদনের প্রধান বলছেন, তিনি দেখতে চান, সরকার তার ভুল থেকে কোনও শিক্ষা নিচ্ছে কি না, না কি তারা একই ভুল বারংবার করবে। পরে গোপাল দাস’কে ছেড়ে দেওয়া হলেও পুনরায় গ্রেপ্তার করে খুব খারাপ রাস্তা দিয়ে মুখে নল লাগানো অবস্থায় হরিয়ানায় চালান করা হয়। পরে আবার তাকে হৃষিকেশে আনা হয়েছে। আমরা তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে গভীর চিন্তিত। কারণ এই সরকার সবই করতে পারে।

 

সন্ত গোপাল দাস, যিনি স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দের সাথেই গত ২৪ জুন থেকে অনশন করছিলেন

৩) একটি টুইট, যেটি ১৪ অক্টোবর করেছেন বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধি এবং সেটি রাজনৈতিক ভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি লিখেছেন, হিন্দিতে, আর তার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়: “সন্ত গোপাল দাসের ক্রমশ ভেঙ্গে পড়া স্বাস্থ্য ভারত রাষ্ট্রের পক্ষে গভীর চিন্তার বিষয়। তিনি ২৪ জুন থেকে গঙ্গার অবৈধ খনন বন্ধের জন্যে অনশন করছেন। সন্ত গোপাল দাস, স্বামী সানন্দের’ই ভাবশিষ্য ও তাঁর কণ্ঠস্বর স্বামী সানন্দেরই কণ্ঠস্বর। এই কণ্ঠস্বর আরও তীব্র ও শক্তিশালী হওয়া দরকার।”

 

এই লেখাতে ব্যক্ত মতামত লেখকদের নিজস্ব। গ্রাউন্ডজিরো থেকে আমরা পাঠকদের এই বিষয়ে মতামত ও লেখা দেবার আহ্বান জানাচ্ছি।

Share this
Recent Comments
1
Leave a Comment