পরিবেশ ধর্মযোদ্ধা স্বামী জ্ঞানস্বরূপ প্রয়াত। ফিরে এল স্বামী নিগমানন্দের অস্বাভাবিক মৃত্যুর স্মৃতিও।


  • October 12, 2018
  • (1 Comments)
  • 1343 Views

“অধ্যাপক আগরওয়াল চেয়েছিলেন কেন্দ্র এমন একটি আইন করুক, যে আইনের বলে গঙ্গোত্রী থেকে উত্তরকাশী গঙ্গা বাধা-বন্ধনহীন হয়ে ‘অবিরল’ ধারায় বইতে পারে এবং গঙ্গা নিষ্কলুষ হোক। তাঁর ক্ষোভ ছিল, গঙ্গার বাঁধন ও দূষণ মুক্তির প্রশ্নে কী কেন্দ্র কী রাজ্য কেউই আন্তরিক নয়। গঙ্গাকে ঘিরে যা হচ্ছে, যা করা হচ্ছে তা একেবারেই স্বৈরাচারী কার্যকলাপ।” লিখছেন দেবাশিস আইচ

 

পরিবেশবিদ অধ্যাপক জি ডি আগরওয়াল তথা স্বামী জ্ঞানস্বরূপের মৃত্যু আরও এক সন্ন্যাসীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর স্মৃতি ফিরিয়ে আনল। তিনি স্বামী নিগমানন্দ। তাঁর শরীরে পাওয়া গিয়েছিল অর্গানোফসফেট। প্যাথোলজি রিপোর্ট জানিয়েছিল, অর্গানোফসফেট বিষক্রিয়ার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। অভিযোগ উঠেছিল, এই মৃত্যুর পিছনে আরএসএস ঘনিষ্ঠ এক মাইনিং ব্যারন, রাজনীতিক, চিকিৎসকদের যোগসূত্র রয়েছে। স্বামী জ্ঞানস্বরূপরের মৃত্যুও কি অস্বাভাবিক? প্রশ্নটি তুলে দিয়েছে মৃত্যুর দিন সকালে তাঁরই স্বহস্তে লেখা চিকিৎসা সংক্রান্ত এক প্রেস বার্তা। যা, ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত। সেখানে তিনি লিখছেন, অনেক টানাপোড়েনের পর তিনি চিকিৎসকদের পরামর্শ মতো ‘পটাসিয়াম প্রয়োগে’ রাজি হয়েছিলেন।

 

স্বামী জ্ঞানস্বরূপের মতোই স্বামী নিগমানন্দকে অনশনরত অবস্থায় মাতৃসদন আশ্রম থেকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়েছিল উত্তরাখণ্ড পুলিশ। সেই সময়ও রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল বিজেপি। হরিদ্বারের এই আশ্রমের সাধু-সন্ন্যাসীরা দীর্ঘকাল ধরেই গঙ্গা দূষণ, গঙ্গার পাড় এবং অববাহিকায় বেআইনি পাথর-বালি খনন, বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছেন। ২০১১ সালে ১৯ ফেব্রুয়ারি হরিদ্বারের গঙ্গায় বেআইনি খননের বিরুদ্ধে অনশন শুরু করেছিলেন আশ্রমের প্রধান পুরোহিত স্বামী শিবানন্দ এবং আরও চার সন্ন্যাসী স্বামী নিগমানন্দ, দয়ানন্দ, যজ্ঞনানন্দ ও পূর্ণানন্দ। প্রায় ৭০ দিনের মাথায় ৩০ এপ্রিল স্বামী নিগমানন্দকে পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে। অভিযোগ, ৩০ এপ্রিল এক অপরিচিত নার্স তাঁকে একটি ইঞ্জেকশন দিয়েছিল। তার পর থেকেই নিগমানন্দের শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। ২ মে তিনি কোমায় চলে যান। ৪ মে দিল্লির ড. লাল ল্যাবরেটরির রিপোর্টে দেখা যায় স্বামীর শরীরে অর্গানোফসফেট বিষক্রিয়ার নিদর্শন রয়েছে। এর পর তাঁকে দুন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অনশন শুরুর ১১৫ দিনের মাথায় তাঁর মৃত্যু হয়। অভিযোগ, হিমালয়ান স্টোন ক্র‍্যাশার প্রাইভেট লিমিটেড-এর মালিক জ্ঞানেশকুমার আগরওয়াল রাজনীতিক এবং চিকিৎসকদের হাত করেই স্বামীকে খুন করেছে। পরবর্তীতে হাইকোর্টের রায়ে পাথর ও বালি খনন বন্ধ হয় বটে। কিন্তু, স্বামীর নিগমানন্দের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত হয়নি।

 

১০ অক্টোবর দুপুর একটা নাগাদ হরিদ্বার প্রশাসন অধ্যাপক আগরওয়ালকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে হৃষিকেশ এইমসে ভর্তি করে। ১১ অক্টোবর সকাল পৌনে সাতটায় তিনি একটি প্রেস বার্তা লেখেন। তিনি লিখছেন, “যাই হোক চিকিৎসার একটি পেশাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ওরা বলেছে, ওদের কাছে তিনটে পথ খোলা রয়েছে। (১) মুখ বা নাক দিয়ে জোর করে খাওয়ানো (২) জোর করে ইন্ট্রাভেনাস ইঞ্জেকশন দেওয়া (৩) হাসপাতালে ভর্তি না-রাখা। বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা গিয়েছে রক্তে পটাসিয়ামের মাত্রা অত্যধিক কম (মাত্র ১.৭ যেখানে ন্যূনতম ৩.৫ থাকা প্রয়োজন) এবং শরীরে জলের মাত্রাও কমে গিয়েছে। অনুরোধ-উপরোধের পর আমি একই সঙ্গে মুখ দিয়ে এবং ৫০০এমএল/প্রতিদিন ইন্ট্রাভেনাসের মাধ্যমে পটাসিয়াম প্রয়োগে রাজি হই।” এর মাত্র আট ঘণ্টার মধ্যেই বিকেল চারটের কিছু আগে তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, প্রায় নির্জলা শরীরে হাইড্রেট ও ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায়ের নাম করে পটাশিয়াম ইঞ্জেকশন দেওয়ার জন্যই এই পরিবেশ ধর্মযোদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে এই মৃত্যু কি স্বাভাবিক? কোথাও কোনও গাফিলতি কিংবা রহস্য নেই তো?

জি ডি আগরওয়ালের প্রেস বিবৃতি

 

ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি অধ্যাপক আগরওয়াল আই আই টি কানপুরের অধ্যাপনা করেছেন। এক সময় তিনি সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড-এর মেম্বার সেক্রেটারিও ছিলেন। এর আগেও ২০০৯ সালে তিনি ভাগীরথী নদীতে বাঁধ তৈরি বন্ধের জন্য অনশন সত্যাগ্রহ করেন। সেই সময় কংগ্রেস সরকার বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করেছিল। এই মুহুর্তে উত্তরাখণ্ডে ৯৮টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু রয়েছে। আরও ৪৫০টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়া হবে বলে সরকার স্থির করেছে। এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য যে বাঁধ নির্মিত হবে তা গঙ্গার স্বাভাবিক বহমানতা এবং নদী নির্ভর বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেবে বলেই পরিবেশবিদরা মনে করেন। অধ্যাপক আগরওয়াল চেয়েছিলেন কেন্দ্র এমন একটি আইন করুক, যে আইনের বলে গঙ্গোত্রী থেকে উত্তরকাশী গঙ্গা বাধা-বন্ধনহীন হয়ে ‘অবিরল’ ধারায় বইতে পারে এবং গঙ্গা নিষ্কলুষ হোক। তাঁর ক্ষোভ ছিল, গঙ্গার বাঁধন ও দূষণ মুক্তির প্রশ্নে কী কেন্দ্র কী রাজ্য কেউই আন্তরিক নয়। গঙ্গাকে ঘিরে যা হচ্ছে, যা করা হচ্ছে তা একেবারেই স্বৈরাচারী কার্যকলাপ। প্রধানমন্ত্রী কিংবা কেন্দ্রীয় জলসম্পদ মন্ত্রীকে নানা আবেদন-নিবেদন করা হলেও কেউ উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না।

 

২০১১ সালে ৭৯ বছর বয়সে অধ্যাপক আগরওয়াল সন্ন্যাস গ্রহণ করেন এবং মাতৃসদন আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত হন। ২০১৮’র ২২ জুন ‘অবিরল’ গঙ্গা প্রবাহের ডাক দিয়ে তিনি অনশন সত্যাগ্রহ শুরু করেন। গঙ্গা তাঁর কাছে ছিল ‘মা গঙ্গাজি’। নিজেকে মনে করতেন ভগীরথের বংশধর। আর মা গঙ্গার বন্ধন ও দূষণ মুক্তি ছিল তাঁর তপস্যা। ২২ জুন থেকে ১০০ দিন অনশন, বারবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রীদের লিখিত আবেদন, তথ্যপূর্ণ প্রতিবেদন পাঠিয়েও কোনও সুরাহা না হওয়ায় তিনি স্থির করেন – নির্জলা উপবাস করবেন। খুবই দুর্বল হয়ে গেলেও এই একশো দিন জল ও মধু তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। ১০৯ দিনের মাথায় পুলিশ তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করে এবং আমরণ অনশনের ১১১ দিনের মাথায় ১১ অক্টোবর ৮৬ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হল।

 

নরেন্দ্র মোদীর ‘ননামি গঙ্গা’ প্রকল্প, গঙ্গা আকশন প্ল্যান নিয়ে বার বার তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। গঙ্গা আকশন প্ল্যানে ৫০০ কোটি টাকা খরচ হওয়ার পরও দূষণের মাত্রা কমেনি। ২০ হাজার কোটি টাকার নমামি গঙ্গা পরিকল্পনার ৭০০০ কোটি টাকা ইতোমধ্যেই খরচ হয়ে গিয়েছে কিন্তু এতটুকু স্বচ্ছ হয়নি গঙ্গা। সমালোচকদের মতে দেশে আরও বহু নদ-নদী থাকলেও নরেন্দ্র মোদীর এই ননামি গঙ্গা আসলে হিন্দু ভাবপ্রবণতাকে সুড়সুড়ি দেওয়া। যে বারাণসী থেকে প্রার্থী হওয়ার পর মোদী বলেছিলেন, গঙ্গা মায়ের ডাকেই তিনি বারাণসীতে এসেছেন। সেই শহর দিনে ৪০০ মিলিয়ন লিটার তরল আবর্জনা উৎপাদন করে। শহরের এই তরল আবর্জনা পরিশোধন কেন্দ্রটি মোট তরল বর্জ্যের চার ভাগের এক ভাগ পরিশোধন করে গঙ্গায় ফেলে। শহরের বরুণা ও আসি নদী এখন নিছক দুই নালা। পুরসভার ডাম্পিংগ্রাউন্ড। এই দুই নদী প্রতিদিন মোট ১৬০ থেকে ১৭০ মিলিয়ন লিটার তরল বর্জ্য বয়ে নিয়ে আসে। যার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ অপরিশোধিত অবস্থায় গঙ্গার সঙ্গে মিশে যায়। এই দূষনের বিরুদ্ধেও ছিল অধ্যাপক জি ডি আগরওয়ালের লড়াই। যদিও তিনি লড়াই না বলে গঙ্গার পুনরুজ্জীবনের জন্য তপস্যা বলেই মনে করতেন।

 

যে গঙ্গা ও পরিবেশ তপস্বীর শত আবেদনেও কান দেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ট্যুইট বার্তায় শোক জ্ঞাপন করতে ভোলেননি। মাতৃসদনও ভুলছে না এই কুমীরের কান্নায়। আমরণ অনশন শুরুর আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে তিনটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। প্রথম চিঠি পাঠিয়েছিলেন আমরণ অনশনের চার মাস আগে ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮। কোনও উত্তর না পেয়ে দ্বিতীয় চিঠি লেখেন ১৩ জুন। জানিয়ে দেন কোনও পদক্ষেপ না করা হলে ২২ জুন থেকে অনশন ছাড়া পথ নেই। এর পরেও প্রধানমন্ত্রী কিংবা তাঁর দপ্তর কোনও উচ্চবাচ্চ না করায় শেষ চিঠিটি লেখেন ২৩ জুন, ২০১৮। এই চিঠিতেও তিনি গঙ্গার ‘অবিরল’ বহমানতা বজায় রাখা, গঙ্গা ও তার শাখা নদী অলকানন্দা, ধৌলিগঙ্গা, মন্দাকিনী, পিন্ডারি নদীর উপর নির্মীয়মাণ প্রকল্প এবং প্রস্তাবিত প্রকল্প বন্ধ করা এবং সার্বিক দূষণ থেকে গঙ্গাকে বাঁচানোর জন্য ‘গঙ্গা প্রোটেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’ গ্রহণ করার আবেদন জানান। ক্ষোভের সঙ্গে এও জানিয়ে দেন বিগত চার বছরে গঙ্গাকে বাঁচাতে কোনও ফলপ্রসূ পদক্ষেপ করা হয়নি। যা হয়েছে তাতে লাভ হয়েছে করপোরেট এবং বাণিজ্যিক সংস্থাগুলির। প্রথম চিঠিতেই তিনি জানিয়ে রেখেছিলেন, যদি অনশনরত অবস্থায় তাঁর কিছু হয়ে যায় তবে মা গঙ্গার কাছে প্রার্থনা থাকবে তার জন্য যেন প্রধানমন্ত্রীকেই দায়ী করেন। এর ১০০ দিন পরেও কোনওরকম প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। ৯ ফেব্রুয়ারি জলত্যাগ করেন স্বামী জ্ঞানস্বরূপ তথা অধ্যাপক আগরওয়াল। জলত্যাগ করার সিদ্ধান্তের পর পর আশ্রমের প্রধান স্বামী শিবানন্দ প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন অধ্যাপকের প্রাণসংশয়ের কথা। এবারও চরম উপেক্ষা।

 

শেষ চিঠিটি লেখেন ২৩ জুন, ২০১৮।

 

না, লড়াই থামছে না। গঙ্গার জন্য পরিবেশের জন্য এক ধর্মযোদ্ধার আত্মবলিদানকে মনে রেখে এবার আমরণ অনশনে সামিল হচ্ছেন স্বামী শিবানন্দ।

 

লেখক স্বতন্ত্র সাংবাদিক এবং সামাজিক কর্মী ।

Share this
Recent Comments
1
  • comments
    By: Amitava Aich on October 13, 2018

    না লড়াই থামবে না
    আরও জোরাল হবে। বড় দেরী হয়ে গেছে সকলে বুঝতে, বোঝাতে।

Leave a Comment