এখন রাজার কাপড়ও নেই, পরার ভানও নেই


  • April 24, 2026
  • (0 Comments)
  • 137 Views

ট্রাম্পেশ্বর ও নন-বায়োলজিকালদের নিয়ে যে কাল্ট ফিগার তৈরির নিরন্তর এবং সচেতন পরিকল্পনা হয়েছিল, তা নিয়ে লেখাজোখাও হয়েছে। কিন্তু ওই যে — তাঁরা নগ্ন, কাজেই ধরা পড়ার লজ্জাহীন। এবং হাতেগোনা কয়েক জনের ওইসব শিক্ষা, সংস্কৃতি, যুক্তিবাদ ও নৈতিকতার পুঁথিগুলো স্রেফ এখানে অ্যাকাডেমিক ইন্টারেস্ট। এতে এদের কিচ্ছু এসে যায় না।

 

শুভদীপ মৈত্র

 

উলঙ্গ রাজা কবিতাটা আমরা সবাই জানি। নীরেন্দ্রনাথ লিখেছিলেন। কবিতার সেই ছেলেটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, যে প্রশ্ন করবে, “রাজা, তোর কাপড় কোথায়?” কথাটা বেশ সত্যিই ছিল, সে প্রশ্ন করার লোকের অভাব। কিন্তু রাজার একটা কাপড়ের ভান ছিল, তাই ছেলেটাকে দরকার পড়েছিল। এখন ভেবে দেখুন তো, রাজা যদি আর সেই ভানটুকুও না রাখে? ভাবছেন অসম্ভব? আজ্ঞে না, ঠিক তাই ঘটছে আমার-আপনার চোখের সামনে, পৃথিবী জুড়ে। রাজা ল্যাঙটো। আর বলছে – “দেখ কেমন লাগে! ডাক তোদের সেই ছেলেকে, আমার কিস্যু যায় আসে না।”

 

আজকের রাজারা তো তাই বলছে। এই ধরুন মাগা রাজা, ইয়াঙ্কি হৃদয় সম্রাট ট্রাম্পেশ্বর। তিনি কী কইলেন – ওসব ইনক্লুসিভিটি-টিটি অনেক হয়েছে, মাগা মানে সাদা চামড়া, বাকিরা তফাত যাও। তোমরা সব কালা, পিলা, যা যা আছো, তফাত যাও। অনেক হয়েছে, সবার জন্য সব কিছু নেহি চলেগা। সাদা পুরুষ অথবা নারী – ওইসবের বাইরে আবার পরিচিতি কী? এই বলে তিনি ভোট চাইতে বেরোলেন, এবং সুড়সুড় করে মার্কিন মুলুকে লিবার্টির স্ট্যাচু খাড়া করে রেখে তাঁর দিকে সব ভোট পড়ে গেল। মার্কিন মুলুক স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পীঠস্থান, বিশ্বের নিয়ামক – তার অধিশ্বর হয়ে তিনি বললেন, এবার শুরু হোক কালা-পিলা সাফাই। আইস বাহিনীকে লেলিয়ে দিলেন।

 

মজার বিষয়, এই আইস বাহিনী তৈরি হয় ২০০৩ সালে এবং ওবামা সাহেবের আমলে আড়াই লাখের কাছে ‘অনুপ্রবেশকারী’-কে তারা দেশ-নিকালা করে। হ্যাঁ, কৃষ্ণাঙ্গ পোটাস (প্রেসিডেন্ট অফ ইউনাইটেড স্টেটস) এই কম্মটি করেন – মাদকপাচারকারী, মাফিয়া, অসামাজিক লোকজন ইত্যাদি ইত্যাদি বলে। দুর্জনে তাঁকে ‘ডিপোর্টার-ইন-চিফ’ নাম দিলেও, ওই কাপড় পরার ভানটুকু টাল খায়নি। কিন্তু মাগা সম্রাট ওসবের পরোয়া করলেন না। যা চলছিল চুপচাপ ‘অপরাধ দমন’ বলে, তিনি একেবারে খোলসা করে ‘ভাগাও’ বলে দিলেন। তাণ্ডবটা শুরু হল, কারণ পারিষদ রাজার থেকে চিরদিনই বেশি বলে-কয়। যাকে পারল তাকে ধরল, খুলে আম পায়ে বেড়ি পরাল, এমনকি গুলি করে মেরেও দিল মার্কিন নাগরিককে।

 

এদিকে এপস্টিন নামের এক ইহুদি ছিল সাঙাৎ, কম বয়সের যেসব দোষ থাকে, সেসবের জোগাড় দিত। তা সে যে আবার শাইলকের মতো হিসেব রাখবে, বুঝবে কী করে? প্রথমত, ওসব দোষ কেনেডি থেকে ক্লিন্টন – কার না ছিল! নেহাত দেখতে শুনতে হলিউডি বলে তারা মাফ, আর মাগা-সম্রাটের বেলায় এমন অসাম্য! কাজেই ফাইল-টাইল যা বেরোল, তার জন্য কুর্সি ছাড়তে হবে? এ দোষ আমার-আপনার মতো আম-আদমির হলে জেল, হাজত, সমাজে ঝাঁটাপেটা হতে পারে, কিন্তু কর্তাদের ক্ষেত্রে নিয়ম আলাদা বলেই জানা ছিল। এমনকি চোমস্কির মতো স্বাধীনতার তাত্ত্বিকও যখন তামাক খেয়েছে সে হাতে, তখন পোটাসকে ঠেকায় কে? তোমরা ফাইল চাও না তেল চাও? ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধানটার বড্ড বাড় বেড়েছিল – অনেকদিন ধরেই নাকের ডগায় তেল রয়েছে, আমাদের কোম্পানিকে দিচ্ছে না। এ অনাচার সইবে কী করে? ট্রাম্পেশ্বর বললেন – ও লোকটা মাদকপাচার করে। রাতের অন্ধকারে সেনা পাঠিয়ে ধরে নিয়ে এলেন। তারপর মাদক-টাদকের গল্প ছেড়ে বললেন – এবার যাহা ভেনেজুয়েলার, তাহাই মাগার।

 

জাতিসঙ্ঘ-টঙ্ঘ, আন্তর্জাতিক আইন সংস্থা কিছু বলার আগেই অন্য দেশের প্রধানকে তুলে নিল, এবং ভয় দেখাল – এবার কিন্তু গ্রিনল্যান্ড। বাকি সাদা বিশ্ব মানে ইউরোপ ভয় পেয়ে গেল – ন্যাটো ইত্যাদি চুক্তি গেল কই? তা সে গ্রিনল্যান্ড, কানাডা বাঁচাতে গিয়ে ভেনেজুয়েলা নিয়ে কুলুপ। গণতন্ত্র স্রেফ মাঝেমধ্যে বার্নি বুড়ো আর কর্বিন-বুড়োর সাদা চুলের ফাঁকে ঝিলিক মারে। নিউ-লিবারাল, লেফট-লিবারাল, লেফট-ডেমোক্রেসি – যত সব বিশ্ববিদ্যালয়-প্রস্তুত পরিচিতি – সব মাথা চুলকোতে শুরু করল। এ যে সিলেবাসের বাইরে খেলছে। এতদিনের যে গণতন্ত্রের বোঝা সাদা চামড়া বয়ে বেড়াচ্ছিল পিঠে, তার কী হবে?

 

সেটা বুঝতে বুঝতেই আবার করে গাজায় স্যাঙাতের ধর্ম-ভাইয়েরা নেমে পড়ল। ট্রাম্পেশ্বর হিন্দুস্তান-পাকিস্তান যুদ্ধ থামিয়ে সদ্য নিজেকে গান্ধী ভেবে ফেলেছেন, নোবেলটা চাইছেন। তিনি গাজাও সামলে দেবেন ঘোষণা করলেন। কিন্তু বিবি নেতানিয়াহু শুনবেন কেন? রাশিয়া, ইউক্রেন যদি চলতে পারে, তাঁর যুদ্ধই বা চলবে না কেন? কাজেই সে একেবারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে নামিয়ে দিল। দু’দিনে ভেনেজুয়েলা ঠান্ডা হয়েছে, আর ওই এশিয়ার এক দেশ হবে না? আর হলেই তার অপর্যাপ্ত তেলের ভাণ্ডার হাতের মুঠোয়। এইসব লোভ দেখিয়ে ঠেলে দিল। ব্যাস। না কোনও আন্তর্জাতিক আইন, না কিছু। সমস্তকেই বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নেমে গেল আংকল স্যাম।

 

প্রতিক্ষেত্রে যা হয় – আংকল স্যাম হলিউডে দেখে র‍্যাম্বো একাই একশো, আর বাস্তবে ল্যাজে-গোবরে। ভিয়েতনাম থেকে আফগানিস্তান — এক হাল। (এই রোগ ভারতের হয়েছে, ধুরন্ধর আগামী দিনে কাল হয়ে দাঁড়াবে)। এবারও তাই ঘটছে। তার মধ্যে ইস্কুলে ফুলের মতো শিশুদের মেরে ফেলল বোমা ফেলে, তবু আন্তর্জাতিক আইন চুপ। লেবানন থেকে গাজা — এত বড় নরমেধযজ্ঞ চলছে, তাতে কোথায় গেল শ্বেত সভ্যতার নৈতিকতা?

 

ওবামার আমলে সবচেয়ে বেশি মিসাইল, বোমা ইত্যাদি ফেলেছে আমেরিকা। কিন্তু সবই ছিল মানব ‘মুক্তি’র জন্য। ভেনেজুয়েলা ও ইরানে সে ন্যারেটিভ দুদিনেই সরিয়ে স্রেফ ‘মাইট ইজ রাইট’ চলে এল। ট্রাম্প বলেই দিলেন — “উইনার টেকস স্পয়েলস অফ ওয়ার।” যদিও হেরে গেলে কী হয়, তা তাঁর ধারণা নেই। এবং তিনি যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই পাড়ার আদরে-বাঁদর বাচ্চার মতো বললেন — “আমিই জিতেছি!”

 

এই যে গত শতাব্দীতে ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অফ হিউম্যান রাইটস হয়েছিল, তার সমস্তটাই একশো বছর যেতে না যেতেই জলাঞ্জলি দিল বিশ্ব, বা যাকে বলে নাকি ‘উন্নত বিশ্ব’। কারণ ও জিনিস নব্য-উদারপন্থার মানবতা ও নৈতিকতা — অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গেই হাওয়া হয়ে গেল। এ বিষয়ে মার্ক্স সাহেব অনেকদিন আগে সতর্ক করেছিলেন — ওসব নৈতিকতা, সংস্কৃতি, সভ্যতা সুপারস্ট্রাকচার; মিনস অফ প্রডাকশন বদলালে, সেসবও বদলে যায়।

 

এই যে প্রযুক্তিগত বিপ্লব গত তিরিশ বছরে ঘটেছে, তার ধাক্কায় এই মানুষ বস্তুটাই উদ্বৃত্ত হয়ে যাচ্ছে — উদ্বৃত্ত শ্রম শুধু নয়। তাই কালকের আইটি কর্মী আগামীতে গিগ শ্রমিক হবেন — এ নিয়তি। আর তাই লুকোছাপার প্রয়োজন পড়ছে না। ওরাকল আর কর্মীর চাকরি খাওয়ার সময় বলে না যে মুনাফায় ঘাটতি বা আন্ডার-পারফরম্যান্স — বলে, দরকার নেই তোমাদের। অর্থাৎ রাজা এবার ল্যাঙটো, এবং সে সগর্বে তা ঘোষণা করছে।

 

বিশ্বজগতের এক অংশ আমাদের দেশ। সেও বা পিছিয়ে থাকবে কেন? তারও অনেক ভান খসছে। বছর পাঁচেক আগে এক প্রাক্তন নকশাল বিপ্লবী আমায় প্রশ্ন করে বিপদে ফেলেছিলেন — “আচ্ছা, আপনারা যে এই ইউএপিএ নিয়ে কথা বলছেন, নেহরুর আমলে ডিফেন্স অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট চালু ছিল জানেন? তাতে কতজন বন্দী হয়েছিল স্বাধীনতার পর?” আমি নিরুত্তর।

 

সত্যিই তো— মিক্সড ইকোনমি আর নেহরুভিয়ান সোশ্যালিজম-এর উল্টো দিকে প্রদীপের তলার অন্ধকারের খবর কী জানি? স্ক্রূ টাইট দিতে গেলে জানতে হয় — বেশি জোর দিলে প্যাঁচ কেটে যায়। ডিমনিটাইজেশন, বাবরি রায় কী সেই প্যাঁচ কাটল? আগে পুঁজিবাদ আর প্ল্যানড ইকোনমি — দুই চলত। ইউপিএ আমলে এসইজেড ও প্রান্তিক শ্রেণীর জন্য উন্নয়নমূলক আইন — অর্থনীতির একটা সেফটি-ভালভ থাকত।

 

যেভাবে লিঙ্গ ও দলিত পরিচিতি ও শ্রমজীবীদের জন্য নানা আইন, স্কিম ইত্যাদি আনা হয়েছিল, এখন নিও-লিবারাল সেইসব পন্থা আর প্রয়োজন নেই। তাই পরপর শ্রম আইন, সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য আইনগুলো বদলে ফেলা হচ্ছে। এমনকি নাগরিক অধিকার ও ভোট দেওয়ার অধিকারও কলমের খোঁচায়, ও পরিভাষার ধোঁয়াশায় হাপিশ করে দেওয়া হচ্ছে।

 

এভাবে পৃথিবী জুড়ে সংবিধান ও আইনের মানে বদলে, তারই সাহায্যে চলছে ‘ডান্স অফ ডেমোক্রেসি’, আর মানুষ সেই তুর্কি নাচনে নাজেহাল। প্রধানমন্ত্রীর প্রিয় ‘বঙ্কিমদা’ কিন্তু বন্দে মাতরম শুধু লেখেননি — তাঁর কমলাকান্তর মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন, আইন এমন এক তামাশা, যা পয়সা থাকলেই বড়লোকরা দেখতে পারে। ঋষি বচন সত্যি হয়েছে।

 

একদিকে এই হাতেগোনা বড়লোক, আর অন্যদিকে অগণিত সম্মোহিত জনতা। ট্রাম্পেশ্বর ও নন-বায়োলজিকালদের নিয়ে যে কাল্ট ফিগার তৈরির নিরন্তর এবং সচেতন পরিকল্পনা হয়েছিল, তা নিয়ে লেখাজোখাও হয়েছে। কিন্তু ওই যে — তাঁরা নগ্ন, কাজেই ধরা পড়ার লজ্জাহীন। এবং হাতেগোনা কয়েক জনের ওইসব শিক্ষা, সংস্কৃতি, যুক্তিবাদ ও নৈতিকতার পুঁথিগুলো স্রেফ এখানে অ্যাকাডেমিক ইন্টারেস্ট। এতে এদের কিচ্ছু এসে যায় না।

 

কাজেই আর উলঙ্গ রাজাদের এখন পোশাক নিয়ে প্রশ্ন করার দিন নেই — আগামী পৃথিবীতে তাদের আটকানোর চেষ্টাই মানুষের বেঁচে থাকার খোঁজ।

 


শুভদীপ গল্প লেখক ও কবি।

 

 

 

Share this
Leave a Comment