রুটি আর গোলাপই নয়, শ্রমজীবী নারীর লড়াই নাগরিকত্বরও – ইতিহাস ফিরে দেখার মাসের বর্তমান


  • March 20, 2026
  • (0 Comments)
  • 56 Views
মার্চ মাস ফিরে দেখার নারী স্বাধীনতার আন্দোলনের একক বা জোটবদ্ধ লড়াইয়ের ইতিহাস। 


সুদর্শনা চক্রবর্তী

 

মার্চ মাস – আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবসের মাস। মার্চ মাস ফিরে দেখার নারী স্বাধীনতার আন্দোলনের একক বা জোটবদ্ধ লড়াইয়ের ইতিহাস। তবে সামাজিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে প্রত্যেক দশকেই তৈরি হয় নতুন বর্তমান।

 

রুটি আর গোলাপের জন্য নারীদের লড়াইয়ের ইতিহাস ফিরে দেখার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন ক্ষেত্রের শ্রমজীবী মহিলাদের জীবিকার জীবনের যে সমস্যা, লড়াই, আগামী দিনের জোটবদ্ধ লড়াইয়ের আশা তাই উঠে এসেছিল গত ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবসে কলকাতার থিওজফিক্যাল সোসাইটি হল-এ একাধিক মহিলা সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে। ফেমিনিস্টস ইন রেজিস্ট্যান্স, নারীচেতনা, শ্রমজীবী নারীমঞ্চ, আইপওয়া, এআইআরডব্লিউও সংগঠনগুলির আয়োজনে এদিনের অনুষ্ঠানে শ্রমিকের স্বীকৃতি, শ্রমের ন্যায্য মূল্য, নাগরিকত্ব, মর্যাদাপূর্ণ জীবনের দাবিতে – শ্রমজীবী মেয়ে ও প্রান্তিক লিঙ্গযৌনতার মানুষের আহ্বানে এদিনের অনুষ্ঠানে আওয়াজ ওঠে “ঘাতক মার্কিন-ইজরায়েল সাম্রাজ্যবাদী ফ্যাসিস্ট জোট ও ফ্যাসীবাদী ভারত রাষ্ট্রের আঁতাত নিপাত যাক”। আগামী দিনের জোটবদ্ধ লড়াইয়ের আশা তাই উঠে এল ৮ মার্চ কলকাতার থিওজফিক্যাল সোসাইটি হল-এ একাধিক মহিলা সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে। ফেমিনিস্টস ইন রেজিস্ট্যান্স, নারীচেতনা, শ্রমজীবী নারীমঞ্চ, আইপওয়া, এআইআরডব্লিউও সংগঠনগুলির আয়োজনে এদিনের অনুষ্ঠানে শ্রমিকের স্বীকৃতি, শ্রমের ন্যায্য মূল্য, নাগরিকত্ব, মর্যাদাপূর্ণ জীবনের দাবিতে – শ্রমজীবী মেয়ে ও প্রান্তিক লিঙ্গযৌনতার মানুষের আহ্বানে এদিনের অনুষ্ঠানে আওয়াজ ওঠে “ঘাতক মার্কিন-ইজরায়েল সাম্রাজ্যবাদী ফ্যাসিস্ট জোট ও ফ্যাসীবাদী ভারত রাষ্ট্রের আঁতাত নিপাত যাক”।

 

এদিনের অনুষ্ঠানের আলোচনায় বস্ত্রশিল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্র যেমন পুরুষদের শার্ট তৈরি,জরিশিল্প, তাঁতের শাড়িতে আঁকা, জিন্স কারখানায় কাজ করা শ্রমিক মহিলারা, মৎস্যজীবি ও ক্ষেতমজুর মহিলারা, গৃহশ্রমিক মহিলারা, বস্তিবাসী ও উচ্ছেদ প্রতিরোধে শামিল মহিলারা, খনি অঞ্চলে চুক্তিভিত্তিক মহিলা স্রমিকদের নিয়ে কাজ করা ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী, বেসরকারী স্কুলের শিক্ষিকা, চিকিৎসক, সাংবাদিক নারীরা অংশগ্রহণ করেন।

 

আলোচনায় অবশ্যই উঠে আসে এসআইআর প্রসঙ্গ এবং কীভাবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মহিলা বাদ পড়া, তাঁদের বেনাগরিকত্ব হওয়ার পরেও মহিলাদের বিচারাধীন থাকা বা তাঁদের বাদ পড়া নিয়ে আলোচনা সর্বস্তরেই কম পড়ে যায়। এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মহিলাদের যে এর মধ্যে দিয়ে আরো বেশি করে প্রান্তিকতার মধ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেই বিষয়টিও সামনে চলে আসে।

 

বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত মহিলা শ্রমিকেরা যেমন বলেন এখনো তাঁদের শ্রমের ঘণ্টা, কাজের সহায়ক পরিবেশ, শৌচাগার ইত্যাদির জন্য লড়াই করতেই হচ্ছে। সম কাজে সম বেতন আসেনি। আগের তুলনায় ইউনিয়ন তৈরির সুযোগ কমেছে। আগের তুলনায় মহিলাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এখন আরোও নিপীড়নমূলক, নেই মাতৃত্বকালীন ছুটি। স্থায়ীকরণের পরিবর্তে বাড়ছে চুক্তিভিত্তিক কাজ। যেখানে শোষনের মাত্রা বেশি। মহিলা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ নারী যেখানে অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন, সেখানে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই ছাড়া উপায় নেই। জরি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত একজন মহিলা শ্রমিক যেমন বললেন, যেহেতু তাঁদের সুনির্দিষ্ট কোনোও মালিক নেই, অথচ দাবি-দাওয়া রয়েইছে, তাই তাঁরা ইউনিয়ন তৈরি করে রাষ্ট্র্বের কাছেই নিজেদের অধিকারের দাবি পেশ করতে চান। কাজের সহায়ক পরিবেশ, শৌচাগার ইত্যাদির জন্য লড়াই করতেই হচ্ছে।

 

সুন্দরবনের ক্ষেত মজুর নারী যেমন জানালেন ৪০ টাকা দৈনিক মজুরিতে কাজ শুরু করে, আজ তা ৩৫০-৪০০ টাকাতে পৌঁছালেও, ধান রোয়া, কাটা, বোওয়া, ভানার মতো কাজ নারী, পুরুষ উভয়েই করলেও আজও সম কাজে সম বেতন তাঁরা পান না। ৫০-১০০ টাকার মজুরির তফাৎ রয়েই গেছে। ক্ষেত মজুর মায়ের মেয়ে স্কুল থেকে ফিরে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে কীভাবে কুমিরের মুখ থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসে, শোনা যায় সেই কাহিনী।

 

ফরেস্টারদের শোষনে (জরিমানা, ডোঙা ভেঙে দেওয়া, ডোঙা আটকে রাখা, অশালীন ভাষা ব্যবহার, সামাজিক সম্মনাহানি) ক্ষুদ্র ডোঙা মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকা কীভাবে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা জানাতে গিয়ে যেমন কান্ন্যায় ভেঙে পড়েন সুন্দরবনের মৎস্যজীবী নারী, তেমনি এই শোষনের বিরূদ্ধে যে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে উপস্থিত সকলেই সে বিষয়ে একমত হন।

 

গ্রাম থেকে শহর সমস্ত জায়গায় পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় মহিলারাই যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত সে বিষয়টিই আরোও একবার স্পষ্ট হয়ে যায় কলকাতার টালা ব্রিজের বস্তির বাসিন্দা নারীর কথায়। রাতারাতি উচ্ছেদের পর বছর পেরিয়ে গিয়েও প্লাস্টিকের আশ্রয় পাকা বাড়ি হয়ে ওঠেনি। এখনোও স্নান, শৌচকাজের জন্য খোলা জায়গাতেই আড়াল খুঁজতে হয়। এই উচ্ছেদ, নিরাপত্তাহীনতা, ভবিষ্যতের আশঙ্কা যে ট্রমা তৈরি করে তার থেকে বেরোনোর জন্যও জোট বাঁধা ছাড়া উপায় থাকে না।

 

মিথ্যে চুরির অপবাদ থেকে বিনা নোটিসে কাজ হারানো সাপ্তাহিক বা মাসিক ছুটির কথা না শোনা, শ্রেণীগত বৈষম্য – ইত্যাদি বিষয়গুলির বিরূদ্ধে আজও গৃহশ্রমিক মহিলাদের  লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। ইউনিয়ন, মঞ্চ ইত্যাদি তৈরি করে, এলাকায় কর্মর‍ত গৃহ পরিচারিকা মহিলারা জোট বেঁধেছেন কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায়। একজনের জীবিকার সমস্যায় যেমন সকলে পাশে দাঁড়াচ্ছেন, তেমনি নিজেদের সমবেত দাবি আদায়ের লড়াইও চলছে।

 

কর্মরত মহিলাদের জীবিকা, পরিবার, সমাজ সর্বত্রই নিত্য যে বৈষম্যের শিকার হতে হয় তা উঠে আসে বেসরকারী বিদ্যালয়ের শিক্ষিকার আলোচনায়। বাস্তব চিত্রটি এখনো এই যে অত্যন্ত কম বেতনে মহিলাদের এই স্কুলগুলিতে নিয়োগ করা হয়। অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষকের ভূমিকায় মহিলারা থাকলেও এই বিদ্যালয়গুলির নীতি নির্ধারণ কমিটিতে কখনোই মহিলাদের দেখা যায় না, ফলে বিদ্যালয়ের মহিলা শিক্ষকদের সমস্যা, দাবি-দাওয়া রয়ে যায় তিমিরেই।

 

সাংবাদিক নারীর বক্তব্যে উঠে আসে কীভাবে নিউজিরুম-এ ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে একজন নারীর প্রতি অসম্মান দেখানোকেই ‘নর্ম্যাল’ করে তোলা হয় এবং ধীরে ধীরে তাতেই অভ্যস্ত করে দেওয়া হয়। আগ্রাসী পৌরুষের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন তিনিও। পুঁজিবাদ, ধর্মীয় সমীকরণ সবকিছু কাজ করে এখানে। এবং সংবাদমাধ্যমে যেভাবে শ্রমজীবি নারীর শ্রমিকের পরিচিতি মুছে ফেলে তাঁকে কেবলই নারী হিসাবে দেখানো হয়, নারী, শ্রমিক নারী ও তার সঙ্গে তার পরিচিতির যাবতীয় আন্তঃসম্পর্ক ভুলিয়ে দেওয়া হয়, অদৃশ্য করে দেওয়া হয়, তার বিরূদ্ধে দাঁড়ানোর দায়ও নিতে হয় সেই কোনোও নারী সাংবাদিককেই।

 

আসলে, প্রতিদিনই নারীদিবস হয় না। প্রতি বছর আটই মার্চ এই কথাটি মনে করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি মহিলাদের লড়াইয়ের ইতিহাস ফিরে দেখার এই মার্চ মাসে ইতিহাসের ধারা বয়ে নিয়ে শ্রমজীবী মহিলাদের আন্তঃপ্রজন্ম লড়াই, বর্তমান আন্দোলনগুলি নিয়েও চর্চা এভাবেই চালিয়ে যেতে হবে – মনে করিয়ে দিয়েছিল এই অনুষ্ঠান।

 

Share this
Leave a Comment