নথির নিগড় নয়, স্মৃতির দেওয়ালেই থাকছে নাগরিকদের আখ্যান


  • March 13, 2026
  • (0 Comments)
  • 185 Views

রাষ্ট্র যত নির্দিষ্ট কাগজে বেঁধে ফেলতে চায় মানুষের নাগরিক হওয়ার অধিকার, ততই স্মৃতিতে জেগে ওঠে দেশের, পরিবারের, সমাজ-প্রতিবেশীর, বন্ধুর আখ্যান, যার মধ্যে জেগে থাকে নাগরিক হওয়ার অধিকারের যাবতীয় প্রমাণ।

 

সুদর্শনা চক্রবর্তী 

 

গত চার মার্চ থেকে ভোটাধিকার রক্ষা মঞ্চ থেকে কলকাতার পার্ক সার্কাস ময়দানে চলছে এসআইআর বিরোধী গণ অবস্থান। শুধুমাত্র মঞ্চের সদস্যরাই নন, এখানে আসছেন সমমনস্ক সহ-নাগরিকেরা। গড়ে তুলছেন প্রতিরোধ। দিন-রাত ব্যাপী এই অবস্থানে প্রতিদিন নেওয়া হচ্ছে বিশেষ কর্মসূচী। তার মধ্যে অন্যতম স্মৃতির দেওয়াল – ‘মেমোরি ওয়াল, বিয়ন্ড ডকুমেন্টস দেয়ার আর লাইভস’। এ যেন সিএএ-এনআরসি বিরোধী ‘হাম কাগজ নেহি দিখায়েঙ্গে’-রই আরেক রূপ। রাষ্ট্র যত নির্দিষ্ট কাগজে বেঁধে ফেলতে চায় মানুষের নাগরিক হওয়ার অধিকার, ততই স্মৃতিতে জেগে ওঠে দেশের, পরিবারের, সমাজ-প্রতিবেশীর, বন্ধুর আখ্যান, যার মধ্যে জেগে থাকে নাগরিক হওয়ার অধিকারের যাবতীয় প্রমাণ। এই দেওয়াল তাই তৈরি হয়েছে নাগরিকদের নিজেদের স্মৃতি রোমন্থনের জন্য, যে স্মৃতিই ইতিহাস, যে স্মৃতিই প্রতিরোধ।

 

 

গ্রাউন্ডজিরো স্মৃতির দেওয়াল নিয়ে কথা বলেছিল গণ অবস্থানে উপস্থিত কয়েক জনের সঙ্গে।

 

সইদুর রহমান, অধ্যাপক, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

  • মেমোরি ওয়াল, স্মৃতির দেওয়াল আপনার কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ?

 

এটা জরুরি এইজন্য যে, আমাদের যাঁরা পূর্বপুরুষ, দুই, তিন প্রজন্ম আগে, তাঁদের তো নথিপত্র আমরা পাচ্ছি না। সেগুলো আমাদের স্মৃতিতে রয়েছে। আমাদের পিতা, পিতামহ এবং তাঁদের মুখ থেকে শোনা গল্প। পিতামহ, তাঁর পিতা – তাঁদের ডকুমেন্টস তো নেই। আমার স্মৃতিতে আছে প্রায় কয়েক প্রজন্মের কথা। আমার কাছে এঁদের নথি নেই। সেই স্মৃতি থেকে, সেই স্মৃতিকে বর্তমানের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা।

 

  • এস আই আর-এর বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য এই স্মৃতির রয়ে যাওয়াটা প্রতিরোধ হিসাবে কেন গুরুত্বপূর্ণ?

 

এইজন্য গুরুত্বপূর্ণ, যে আমাদের অতীত থেকে কেটে দিতে চাইছে একটা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি বলুন বা প্রজিনি ম্যাপিং বলুন, ছোট ছোট ভুলের জন্য, আমাদের ডিসকানেক্ট করে দেওয়া হচ্ছে, আমাদের সন্দেহভাজন করে দেওয়া হচ্ছে। ২০০২-এর সাথে তো মিলছে না, তাহলে ভুলভাবে ২০০২-এ আপনার নাম চলে এসেছে। আপনার পিতার নাম ভুল আছে, তিনি আপনার পিতা নন, আরো ছয় জন ব্যক্তি তারা ক্লেইম করছে পিতা বলে – এইভাবে অতীত থেকে আমাদের কেটে দেওয়ার একটা ষড়যন্ত্র চলছে। সেইজন্য এইটা জরুরি যে, বিয়ন্ড ডকুমেন্টসও আমাদের অস্তিত্ব আছে, সেটা প্রমাণ করার কিছু নেই, সেটা আছেই।

 

  • এবং নাগরিকের যে স্মৃতি তা রাষ্ট্রের বিরূদ্ধে কতটা শক্তিশালী হবে?

 

হ্যাঁ, শক্তিশালী তো হবেই। মানুষ তো আর আকাশ থেকে নামে না, বা কোনো উদ্ভিদের মতো জমি থেকে তো গজায় না, মানুষের জন্মসূত্রে তাঁর পিতা-মাতা আছে, তাঁর পিতামহ আছে – এই যে একটা প্রজিনি, একটা সিস্টেম, আমরা সেই সিস্টেমের মধ্যেই আছি। সেটা আমাদের কাছে ডকুমেন্টস নেই, পুরাতন ডকুমেন্টস নেই। কিন্তু দেয়ার আর আওয়ার মেমরিজ। আমাদের হিস্ট্রি, কালচার, রীতি সব আমাদের মুখস্থ আছে, আমাদের খাদ্যাভ্যাস, আঞ্চলিকতা সব স্মৃতির মধ্যে আছে, সেই স্মৃতি থেকেই এগুলো আসছে, স্মৃতির সঙ্গেই কানেক্ট করছে।

 

আসিফ রেজা আনসারি, আইনজীবী, কলকাতা হাইকোর্ট

 

  • নথির বাইরে বেরিয়ে যে নাগরিক অস্তিত্ব, মানুষের স্মৃতি তা এস আই আর বিরোধী আন্দোলনে কতটা ফলপ্রসূ প্রতিরোধ বলে আপনি মনে করেন?

 

দেখুন, আইন-আদালতে এর কতটা গুরুত্ব আছে বা নেই, এর বাইরে গিয়ে, যে জিনিসটা আছে, একটা শুধুমাত্র ডকুমেন্টস বা এই তেরোটা ক্যাটাগরির ডকুমেন্টস কখনোই একটা মানুষের নাগরিকত্বকে ঠিক করে দিতে পারে না। তার কারণ, আমাদের দেশে যদি আমরা সার্বিক সামাজিক কাঠামো দেখি, তাহলে দেখব যে পাসপোর্ট দুই থেকে তিন শতাংশ মানুষের কাছে আছে, জন্ম সার্টিফিকেট এখন যাঁদের বয়স মোটামুটি ২০-২২-এর মধ্যে তাঁদের হয়তো আছে, তার বাইরের কারোরই নেই। আমাদের জন্ম-নিবন্ধন আইন অনেক পুরনো হলেও, নিবন্ধিত করতেই হবে, তা বাধ্যতামূলক ছিল না। ফলে বহু মানুষের জন্ম সার্টিফিকেট নেই। মাধ্যমিক পাশ মানুষও আগে কম ছিল। আমরা যদি গ্রামীণ এলাকায় দেখি, পৌরসভা এলাকাতেও দেখি, অনেকে কাউন্সিলার আছেন যাঁরা হয়তো মাধ্যমিক পাশ করেননি, পঞ্চায়েত আছে, যেখানে হয়তো টিপসই দিয়ে প্রধান হয়েছেন। ফলে যিনি টিপছাপ দেন তাঁর কাছে মাধ্যমিকের সার্টিফিকেট নেই, অথচ কমিশন বলছে, মাধ্যমিক বা ম্যাট্রিকুলেশন দেখাতে হবে। তাহলে এটা কোথাও গিয়ে অযৌক্তিক। তাহলে ১৩টা ডকুমেন্টস নাগরিকত্ব ঠিক করে দিতে পারে না। পারিপার্শ্বিক বিষয় ঠিক করে দিতে পারে, মানুষটার অস্তিত্ব আছে কি না, বা তিনি এখানে বসবাস করছেন কি না। আমাদের যে পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো আছে, সেই জিনিসটাকে আমরা তুলে ধরতে চাইছি।

 

  • এই যে স্মৃতি, তা নিয়ে আমরা খুব একটা ভাবি না, সবাই যেন মুহূর্তে বাঁচি, শুধু দেখতে থাকি এখন কী ঘটছে। সেই প্রেক্ষিতে এই মেমরি ওয়াল, স্মৃতিকে ফিরে দেখা একজন নাগরিকের কাছে কেন জরুরি?

 

একজন নাগরিকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে আমার মনে হচ্ছে, কারণ, ধরুন, আমার কাছে কোনোও ডকুমেন্টস নেই, কিন্তু আমার তো অস্তিত্ব আছে। আবহমান কাল ধরে আমি এই আবহাওয়ায় বড় হয়েছি, আমি এখানে জন্মেছি, খাওয়া-দাওয়া করছি, আমি এখানে মরে যাচ্ছি। ফলে একটা প্রজন্মের পর আরেকটা প্রজন্ম, আবহমান কাল ধরে আমাদের যে এই প্রবাহটা চলে আসছে, আমার এই প্রবাহটাকে তো অস্বীকার করা যায় না। ঠিক এই জায়গাটা গুরুত্বপূর্ণ যে আমার অস্তিত্ব আছে, আমার এই অস্তিত্বকে আমি জানান দিচ্ছি, আমার এই অস্তিত্বকে সরকার স্বীকার করুক।

 

এম মেহেদী সানি, সাংবাদিক

এম মেহেদী সানি ও আসিফ রেজা আনসারি

 

  • এই যে স্মৃতিকথা তুলে আনার চেষ্টা, প্রক্রিয়া কী মনে হয়, সরকার, রাষ্ট্র কী আদৌ তাতে কান দেবে?

 

যদি আমরা ভেবে দেখি, তাহলে এসআইআর হল মানুষের তৈরি পরিকল্পনা, যা দিয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষকে সমস্যার মধ্যে রাখা যায়, এবং সেই সমস্যার মধ্যে তাঁরা ডুবে থাকেন ও তার অন্তরালে সরকার তাদের স্বার্থসিদ্ধি করবে বা যে পুঁজিপতি আছে তারা স্বার্থসিদ্ধি করবে আর মানুষ সেদিকে চোখ ঘোরাতে না পারে। মানুষ কাগজ নিয়ে জেরক্স-এর দোকান, সেখান থেকে বিএলও অফিস, এইআরও অফিস, বিডিও অফিস ছোটাছুটি করবে, তাঁদের কাজকর্ম নেই, সংসার নেই, অবসর নেই। তাঁদের একটাই কাজ কাগজ খুঁজে বের করতে হবে, কাগজ গোছাতে হবে, কাগজ দেখাতে হবে। অনেক কিছুই ঘটে গেল, যা তাঁদের অজানা থেকে গেল এবং সেই কার্যসিদ্ধি সরকার সুপরিকল্পিতভাবে করছে বলেই হয়তো, এসআইআর, সিএএ, এন আর সি-র অবতারণা তাঁরা করতে চেয়েছিল। শুরু হল এসআইআর-এর মধ্যে দিয়ে, হয়তো এর মধ্যে দিয়েই এন আর সি, আরো সব কিছুই হয়ে যাচ্ছে, মানুষের অগোচরে।

 

  • কাগজ না থাকার মতোই স্মৃতিহীনতার অসুখও একজন মানুষের থাকতে পারে। সেখানে এই যে মানুষের একসঙ্গে, যৌথ যাপন কতটা গুরুত্বপূর্ণ? যেখানে একজন মানুষ স্মৃতি হারালেও তাঁর পাশের মানুষটি যেন বলতে পারেন স্মৃতি হারানো মানুষটির কথা।

 

অবশ্যই। আমাদের সঙ্ঘবদ্ধভাবে বেঁচে থাকা, আমাদের ঐক্যবদ্ধতা, আমাদের একসঙ্গে পথ চলা অবশ্যই তো একটা দিশা দেখায়। প্রতিটা সময়েই, প্রতিটা যুগ ধরেই কিছু মানুষ, কিছু স্মৃতি, কিছু ঐক্যবদ্ধতা সফলতা এনে দিয়েছে। আগামী দিনেও আমাদের ঐক্যবদ্ধতা, জোটবদ্ধ সংগ্রাম নিশ্চয়ই সফলতা এনে দেবে। এবং আগামী দিন হয়তো এই দেশ সমস্যামুক্ত হবে, এসআইআর হয়রানি মুক্ত হবে সাধারণ মানুষ, ততদিন হয়তো আমাদের অনেক কষ্ট করে পথ চলতে হবে। তবে সব সময়েই পথ সুন্দর হবে না। কিন্তু আমাদের একসঙ্গে সেই কঠিন পথ পেরিয়েই যেতে হবে।

 

নিশা বিশ্বাস, সামাজিক অধিকার আন্দোলন কর্মী

 

  • সবচেয়ে বেশি নাম বাদ যাওয়া, নথিপত্র না থাকার সমস্যায় পড়তে হয় মেয়েদের। সেখানে মেয়েদের স্মৃতিকথা, তাঁদের স্মৃতির অংশ এই স্মৃতির দেওয়ালে উঠে আসা নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার বিরূদ্ধে কীভাবে কাজে আসবে বলে আপনার মনে হয়?

 

আসলে মেয়েদের কথা, মেয়েদের স্মৃতি তো সেভাবে বের হয় না, বাড়ির মধ্যেই থাকে। মা থেকে বড়জোর মেয়ে পর্যন্ত পৌঁছায়। আসলে আজোও পর্যন্ত তাঁদের কেউ জিজ্ঞাসাও করে না। এই যে ওরাল হিস্ট্রি ট্র্যাডিশন, দ্যাট ইজ নট ভেরি ওল্ড ট্র্যাডিশন। এখন গ্র্যাজুয়ালি উওমেন আর স্পিকিং, উওমেন আর টকিং, দে আর ট্রায়িং টু রাইট, ট্রাইং টু ডু থিংস লাইক দ্যাট, কিন্তু আগে তো ছিল না। কিন্তু মেয়েদের যে ডকুমেন্টস নেই তা তো শাশ্বত ব্যাপার। আজকেও কার কাছে কী ডকুমেন্টস আছে? ধরো আজ কোনো মেয়ে চাকরি করছে একটা তাহলে তাঁর ডকুমেন্টস চাকরিতে লাগবে বলে থাকত। কিন্তু যাঁর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, সার্টিফিকেটস মনে করা হচ্ছে আর দরকার নেই তাহলে তাঁর বাবা বা মায়ের বাড়িতে রয়ে যেত। সেগুলো পরে ফেলেও দিতে পারত। কোনো মহিলা যদি মারা যান, তাঁর স্বামীও যদি মারা যান, তাঁদের সন্তানের দায়িত্ব নয় সেই সার্টিফিকেটস যত্ন করে রাখা। এক সময় না এক সময় তাঁকে ফেলে দিতে হয়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তোমাকে প্রচুর কাগজ জড়ো করতে হবে। বাক্স বাক্স কাগজ জমা রাখতে হবে। আমার কাছে যেমন, আমাদের বাড়িতে আমাদের মা-বাবার কিচ্ছু নেই। কয়েকটা ছবি আছে। সেগুলোই প্রমাণ যে ইনি আমার মা ছিলেন, ইনি আমার বাবা ছিলেন। এরা আমার দিদি-বোন। এর বাইরে তো কিছু নেই। বাকি সবটাই মুখে শোনা, মৌখিক। তার মধ্যে দিয়েই বোঝা যাবে যে – আচ্ছা, ঠিক আছে এরা ভাইবোন, এরা মা-বাবা। আর মা-বাবা কী পড়াশোনা করেছেন, তা আমাদের জানাই নেই। তাঁরা তাঁদের সার্টিফিকেট দেখাননি, আমরা দেখতে চাইনি, আমরা জানিও না। আমার বাবা আমাকে বলেছিলেন তিনি ক্লাস টেন পাশ। আমরা কোনোদিন তাঁর কোনো সার্টিফিকেট দেখিনি। তিনি ব্যবসা করতেন। উর্দু শায়েরি পড়তে, বই পড়তে ভালোবাসতেন। ইংরাজি পড়তে পারতেন, ইংরাজি গল্প পড়তেন। আমরা জানি আমার বাবা পড়াশোনা জানেন, কালচার্ড পার্সন, বাঁশি বাজান। আমি তো কোনোদিন বাবার কোনো সার্টিফিকেট দেখিনি, দেখতে চাইওনি। আজকে এই পরিস্থিতিতে আমার সন্তান আমাকে বলছে,”তোমার সার্টিফিকেটগুলো আছে তো? ঠিক করে রেখো।“

 

  • একজন মায়ের ক্ষেত্রে  এই বিষয়গুলি বোধহয় আরোও জটিল…

 

আমার মায়ের তো কোনো সার্টিফিকেটই নেই। আজ যদি আমাকেই বলা হয়, আমার তো বাড়িতে জন্ম হয়েছিল, তাই কোনোও জন্ম সার্টিফিকেট নেই। আমরা অনেক বোন ছিলাম, মা তাড়াতাড়ি করে স্কুল পাঠিয়ে দিতেন। যে প্রাইমারি স্কুলে আমরা গেছি, জানিই না তারা সেই বছরের কোনোও রেকর্ড আদৌ রেখেছেন কি না। ৫৮-৫৯ বছর আগের রেকর্ড আছে কি না, থাকলেও কার কাছে? বা তারপর আমি যখন হাইস্কুলে ঢুকেছি, ক্লাস টেন পাশ করার পর ঐ সার্টিফেইকেট পাওয়া গেল, তা হল আমার জন্ম সার্টিফিকেট। সেইটা দেখিয়েই আমি চাকরি, পাসপোর্ট, রেশন কার্ড করেছি, যা কার্ড দরকার পড়েছে তা ঐ কার্ড দিয়েই হয়েছে। মৌখিক ইতিহাস (ওরাল হিস্ট্রি) মানে কত কিছু! আমার কত গল্প বলার আছে। কত কিছু বলার আছে। কিন্তু সেটা তো ওরাল হিস্ট্রি। এখন আমার মনে হয়, আমি কিছুটা লিখি, কিছুটা ভাবি, কিছু হয়তো কল্পনাও থাকে। আমি ঠিক জানি না হয়তো যে একটা নির্দিষ্ট কিছু হয়েছিল কি না, কিন্তু আমার ভাবনা হল যে, তেমনটা ঘটেছিল। ওরাল হিস্ট্রি তো মেয়েদের কাছে কেউ কখনো জিজ্ঞেস করত না। আমি আমার মা-কে কখনো কিচ্ছু জিজ্ঞেস করিনি তাঁর বিষয়ে। একবার যখন জানতে চেয়েছিলাম তাঁর কোনোও দুঃখ আছে কি না, তখন তিনি দু’চার কথা বলেছিলেন। ব্যস ঐটুকুই। মানে আমাদের তো এই ট্রেনিং-ই ছিল না। মানে তিনি শুধুই আমাদের জন্য করে যাবেন, আমরা কিছু জানতে চাইব না। দরকারই মনে করতাম না কেউ।

 

সাজিদুর রহমান, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র, এসআইআর বিরোধী আন্দোলনের কর্মী

 

 

  • এস আই বিরোধী আন্দোলনে ভোটাধিকার রক্ষা মঞ্চের স্মৃতির দেওয়াল, নথির পরিচিতি পেরিয়ে, প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কতটা শক্তিশালী হতে পারে বলে আপনার মনে হয়?

 

আমরা দেখছি ২০০২-এ ভোটার লিস্টে নাম থাকা সত্ত্বেও এবার অনেকের নাম নথিভুক্ত হয়নি, বিচারাধীনের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অনেক সংগ্রামী আছেন, দেশের জন্য লড়াই করেছেন, অনেককে দেখেছি আর্মিতে কাজ করেছেন, তাঁদেরও ‘বিচারাধীন’ করা হয়েছে। ওদের তো কাগজ দেখানো হয়েছে, তারপরেও ওরা তিন মাস ধরে খেলা করেছে, মানুষের আবেগ নিয়ে। কাগজ দেখার পরেও যখন ওরা ভারতীয় নয় বলে আখ্যায়িত করছে, তারপর উপায় না দেখেই আমাদের স্মৃতির দেওয়াল তৈরি করতে হয়েছে।

 

আর স্মৃতি তো অবশ্যই জড়িয়ে থাকবে। আমাদের দেশ, ভারতকে স্বাধীন করার যে ইতিহাস রয়েছে, ব্রিটিশের হাত থেকে দেশকে স্বাধীন করতে এ দেশের মানুষ লড়াই করেছেন, রক্ত দিয়েছেন। সেই সংগ্রামের ইতিহাসও যদি আমরা স্মরণ না করি, তাহলে তো দেখাই যাচ্ছে, ব্রিটিশদের দালালি সেই সময় যারা করেছিল, বর্তমানে ভারতের শাসন ব্যবস্থায় তারাই রয়েছে। আজকে তারা দেশের নাগরিককে বেনাগরিক বলে ঘোষণা করছে। বাংলা বলার জন্য বাংলাদেশী বলছে। তাদের মুখে তো ইতিহাস ছুঁড়ে মারা দরকার।

 

যে বাড়িতে দু’জন বাচ্চা আছে, তার বাড়িতে নোটিস যাচ্ছে, বাবাকে ছ’জনের পিতা বলে নোটিস দিয়ে। নির্বাচন কমিশন এখনো তা প্রমাণ করতে পারেনি কিন্তু!

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের ইমোশন। উনি যদি আজ থাকতেন, ওঁনাকেও হয়তো আজ নাগরিকত্বের প্রশ্নের সামনে পড়তে হত। নেতাজী সুভাষচন্দ্রকেও হয়তো দেশভক্তের প্রমাণ দিতে হত। দেশের নাগরিক কি না, এই বিজেপি সরকারের কাছে তার প্রমাণ দিতে হত। নজরুলকেও হয়তো প্রমাণ দিতে হত। সুতরাং তাঁদের কাছে কাগজ দিয়েও কাজ যখন হচ্ছে না, তখন আমাদের স্মৃতিচারণ ছাড়া আর উপায় কি!

 

  • এই মঞ্চে, অবস্থানে অনেক তরুণ প্রজন্ম আসছেন। তাঁরা কতটা স্মৃতি তৈরি করে উঠতে পারেন, আজকের প্রেক্ষাপটে?

 

তরুণ প্রজন্মের পথ চলা শুরু হবে এই স্মৃতি থেকেই। কারণ আমি যদি রবীন্দ্রনাথ, নেতাজী, নজরুল, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, গান্ধীজীকে না জানি, তাহলে আমি দেশের ইতিহাসকে পাব কোথা থেকে? তাঁরা আমাদের দেশ গড়ে দিয়েছেন। ভগত সিং, রামপ্রসাদ বিসমিল, আসফাকউল্লা খানের ইতিহাস, তাঁদের বন্ধুত্বের সম্পর্কের কথা না জানলে হবে কী করে! সেই ইতিহাসকে তো আমরা নিয়ে চলবই। সেই ইতিহাসই তো আমাদের এখানে হিন্দু-মুসলিমের নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করেছে।

 

আরোও একটা বিষয় – আমাদের বাংলা, বাংলার মাটি, তার আবহাওয়া, তার গন্ধটাই আলাদা। এখানে আপনি বুঝতেই পারবেন না কে মুসলিম, কে হিন্দু। হিন্দুকে তাঁর নামও নয়, তাঁর পদবী জানতে চাওয়ার পর বোঝা যাচ্ছে সে হিন্দু। এখানে একসঙ্গে ইফতার হচ্ছে, হিন্দু বন্ধুরা ইফতারের ফল কেটে থালা সাজিয়ে দিচ্ছেন, একসঙ্গে ইফতার করছেন – এই সম্পর্ক মাটির সম্পর্ক, রক্তের সম্পর্ক। এই যে আমাদের বন্ধুত্ব এটা কেউ ভাঙতে পারবে না।

 

আজকে বিজেপি নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে বাংলা দখলের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সেটা কিন্তু হতে দেওয়া যাবে না। আমাদের স্মৃতি আমদের বাঁচিয়ে রাখবে। আজকে আমাদের স্মৃতিচারণটা খুব দরকার। রবি ঠাকুর, নজরুল, রাজা রামমোহন রায়, গান্ধীজী, মৌলানা আজাদ, আসফাকউল্লা খান, ভগত সিংয়ের স্মৃতি আমাদের জীবিত রেখেছে।

 

বিজেপি পারে কখনো এগুলো ভুলিয়ে দিতে! বাংলায় হিন্দু-মুসলিম-শিখ-ইসাইয়ের যে নিবিড় সম্পর্ক তা কখনো নষ্ট হবে না। আমরাই এই বন্ধনকে টিঁকিয়ে রাখব স্মৃতির হাত ধরে।

 

Share this
Leave a Comment