১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে নির্বাচন। নির্বাচনে যে পার্টিই জিতুক, যারাই ক্ষমতায় আসুক রাজনৈতিক ধর্মের ক্ষমতায়ন এখন সময়ের অপেক্ষা। আজকের বাংলাদেশে রাজনৈতিক ইসলামের সামাজিকীকরণ প্রায় সম্পূর্ণ। সমাজমনকে উদীচী-ছায়ানট নয় প্রভাবিত করছে হেফাজতে ইসলাম, ইসলামি আন্দোলন ইত্যাদি রাজনৈতিক ইসলামের গোষ্ঠী।
শুভ প্রতিম রায় চৌধুরী
বিপরীত গণনা শুরু হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে নির্বাচন। নির্বাচনে যে পার্টিই জিতুক, যারাই ক্ষমতায় আসুক রাজনৈতিক ধর্মের ক্ষমতায়ন এখন সময়ের অপেক্ষা। ইসলাম যে দেশের মুখ্য ধর্ম সেখানে সমাজে তার প্রভাব থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে যা ঘটছে তা হল রাজনৈতিক ইসলামের সামাজিকীকরণ। ইসলামের যে লোকজ রূপ আমরা দেখেছি চিরায়ত বাংলায় এই ইসলাম তার থেকে ভিন্ন। বলা যায় আজকের হিন্দুত্ব যেভাবে পশ্চিমবাংলার সমাজমন ক্রমশ গ্রাস করছে তারই বাংলাদেশী সংস্করণ।
যে সূচকগুলি বাংলাদেশের সমাজে রাজনৈতিক ধর্মের আধিপত্যকে স্পষ্ট করেছে, দৃঢ় করেছে এখানে তা রাখা হল। বিভিন্ন সময়ে সেই দেশের মানুষের সান্নিধ্য, সমীক্ষা, স্মৃতি ও পাঠের নির্যাস বলা যেতে পারে।
[১]
হৃদপিণ্ডের চারটি প্রকোষ্ঠ, বাম অলিন্দ, ডান অলিন্দ ও বাম নিলয়, ডান নিলয়। ঠিক যেন উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমে ব্যাপ্ত অখণ্ডিত বাংলা। যার একটি প্রকোষ্ঠ ডিস্টার্ব হলে সারা শরীর ভারসাম্য হারায়, কেঁপে ওঠে। হয় রক্তাক্ত। আজও যা হয়ে চলেছে। অখণ্ড বাংলাভাষা-মানচিত্র ৪৭-এ রাজনৈতিকভাবে খণ্ডিত হয়েছে। প্রশ্ন হল, খণ্ডিত হওয়ার আগেও কি বিভাজিত ছিল না?
১২০৪ সালে বাংলায় প্রথম ইসলাম আসে। ভারত বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বে থাকা বাঙালি জনসংখ্যার মধ্যে মুসলমান ৭০%। আরবদের পর তারাই মুসলমানদের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী। কীভাবে এই ৮২২ বছরে বাংলায় তারা শূন্য থেকে সত্তরে উত্তীর্ণ হল তা নিয়ে মূলত দুটি আখ্যান আছে। গড় হিন্দু বয়ানে ‘জোরজবরদস্তি করে হিন্দুদের মুসলিম করা হয়েছে’ আর গড় মুসলিম বয়ানে ‘অন্ত্যজনেরা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছেন’। এই বিতর্কে একাধিক ন্যারেটিভ রাখা হয়। বিপরীতমুখী এই বয়ানগুলি বিভাজনের মূলে। এ ছাড়া বিভাজনের আর এক সূত্র, ইউরোপ-রচিত ভারত ইতিহাস, যাতে ভারতে মুসলিম শাসনকে ‘মধ্যযুগীয়’, ‘বর্বর’ বলে দেগে দেওয়া হয়েছে।
সমাজে হিন্দু মুসলমানের সামাজিক অবস্থানে (যার মধ্যে আর্থিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত ও সামগ্রিক ক্ষমতার নিরিখে) ফারাক প্রকট হতে থাকে ব্রিটিশ শাসনে। সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো থেকে বাবুসমাজে উত্তীর্ণ, ব্রিটিশ-কৃপাধন্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষা-লব্ধ উচ্চকোটির হিন্দুরা ছিল মুসলিমদের থেকে কয়েক গুণ এগিয়ে। পাশ্চাত্য শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, অর্থে, রাজবলে। ফলে পরে থাকলো ধর্ম, যা নিয়ে থেকে গেলো বাঙালি মুসলিম সমাজ। কিন্তু কেন? কেন তাঁদের পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রতি অনীহা ছিল?
ব্রিটিশ আসার আগে তাঁদের স্বধর্মীরাই ছিলেন বাংলার তথা ভারতের শাসক, শাসকের বদল হওয়া মেনে নেওয়া কঠিন ছিল মুসলিমদের পক্ষে। সিপাহী বিদ্রোহের (১৮৫৭) পর ব্রিটিশ শাসনের প্রতি মুসলমানদের মধ্যে একটি গভীর অবিশ্বাস গড়ে ওঠে, তারা মনে করত ব্রিটিশরা তাদের শোষণ করবে। এছাড়া পাশ্চাত্য শিক্ষা ইসলাম বিরোধী, এই শিক্ষা তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে আঘাত দেবে, এই ধারণা। ফলে ‘প্রতিযোগিতা’-য় পিছিয়ে পড়লো তারা। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ‘যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে’।
পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হিন্দু সমাজে নবজাগরণের ফলে সমাজ-সংস্কার ঘটে। প্রতিবেশী মুসলিম সমাজে সংস্কার আসেনি। ভাষায়, খাদ্যে, লোকজ সংস্কৃতিতে তথা জাতিসত্ত্বায় মিল থাকলেও সামাজিক ও আর্থ-রাজনৈতিক কারণে বিভাজিত ছিল বাঙালি। দুই সম্প্রদায়েরই নেতৃত্বে ছিল এলিট শ্রেণী। সমাজকে তারাই বিষাক্ত করেছিল। শুধু ইংরেজদের দোষ দেওয়া ঠিক হবে না। অন্তরের বিভাজন না থাকলে শুধু রাজনৈতিক নেতাদের উস্কানিতে দাঙ্গা হয়না। পরবর্তীতে নোয়াখালী হয়না, হয়না ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’। শুধু উর্দুভাষী আর হিন্দিভাষীরা দাঙ্গা করেছে, এই বয়ানও একপেশে।
স্বাধীনতার পরে ইতিহাস রচনায় ভারতে মুসলিম স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ব্রাত্য রাখা হয়েছে। শুধুমাত্র মুসলিম লীগ বা জিন্নাহকে দেশভাগের জন্য দায়ী করা এক ‘খণ্ডিত সত্য’ এবং সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট ইতিহাস রচনা। বহু তথ্য আছে, যাতে জানা যায় বাঙালি হিন্দুদের দেশভাগের সমর্থনের কথা।
কোলকাতার ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ একটি ‘ভোট’ করেছিল। পত্রিকাটির পাঠক বেশীরভাগ ছিল শহুরে শিক্ষিত হিন্দু বাঙালি। পত্রিকাটি ১৯৪৭ এর ২৩ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত একটি প্রশ্ন ছাপে তাদের পত্রিকায়, ‘আপনি কি বাঙালি হিন্দুদের জন্যে স্বতন্ত্র দেশ চান?’ এর উত্তরে ৯৮.৩% বলে হ্যাঁ, চাই। ০.৬% বলেন না, প্রত্যাখান করেন ১.১%।
ঠিক একইভাবে পাকিস্তানে ইতিহাসের টেক্সট বুকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম সহ দেশভাগের জন্যে যে ন্যারেটিভ রাখা হয় তা’ও একপেশে। পদে পদে ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’-এর বন্দনা। একটা অন্য দৃষ্টান্ত এক্ষেত্রে হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না। গান্ধী হত্যার পরে পাকিস্তানে প্রকাশিত ‘দ্য ডন’ সংবাদপত্রে যে খবর ছাপা হয় তাতে উল্লেখ থাকে জিন্নাহের বয়ান। তিনি গান্ধীকে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা হিসাবে উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য এই পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন জিন্নাহ স্বয়ং।
সাধারণ হিন্দু মুসলমান কি চাইছিলেন তা অনাবিষ্কৃত, তবে যারা দেশভাগ চাইছিলেন তারা দুই সম্প্রদায়ের এলিটবর্গ, তাঁরাই দেশভাগ চেয়েছিলেন, এটা বাস্তব। এই প্রেক্ষিতে দেখা দরকার দেশভাগ, স্বাধীনতা-উত্তর দুটি রাষ্ট্রের কলহ ও যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের মুক্তিলাভ। ৪৭ থেকেই যুদ্ধে জড়িয়েছে ভারত ও পাকিস্তান, এই যুদ্ধ আদতে হিন্দু, মুসলমানের লড়াই, দাঙ্গারই রাষ্ট্রীয় রূপ।
[২]
আমার সোনার বাংলা
বাংলাদেশের ১৯৭১ থেকে ২০২৫-এর সফরকে আমরা কি চোখে দেখবো? সংক্ষেপে কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সরে এসে ইসালামিক রিপাবলিকের পথে যাত্রা বলা যেতে পারে? বিগত পঞ্চাশ বছরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে পাওয়া ধর্মনিরপেক্ষতা ক্রমশ আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পরে শুধু মুজিবর রহমানের পৈত্রিক বাড়ি নয় ধ্বংস করা হয় মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিবিজড়িত ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈর-শাসক হাসিনার পতনের পর দেড় হাজারেরও বেশি ভাস্কর্য-ম্যুরাল ধ্বংস করা হয়েছে। বাউল ফকিরদের ওপর আক্রমণ থেমে নেই। এ কি শুধু স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে লেলিহান ক্ষোভের আগুন?
বলা হয়, ৭১ ছিল বাঙালি জাতিসত্ত্বার মুক্তির সংগ্রাম, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে এই বাঙালি আইডেন্টিটি। পাকিস্তানী বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে ওপার থেকে হিন্দু-মুসলিম সকলেই পালিয়ে এসেছিলেন ভারতে, মুসলিমরা ফিরে গেলেও হিন্দুদের অধিকাংশ ফিরে যাননি। যারা ফিরে গিয়েছিলেন তারা আবার ফিরে আসেন, ইতিমধ্যে তাঁদের বাড়ি জমি হয়েছে বেদখল। স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁদের ঠাঁই হয়নি। এটাই কি ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? ৭৭-এ সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা মুছে দেওয়া হয়। হাইকোর্ট মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনতে বললেও, আনা গেলো না। ইসলাম ঘোষিত হল রাষ্ট্রধর্ম। সংবিধানের ওপরে লেখা হল, ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’। ক্ষমতায় যেই থাকুক, হাসিনা হোক বা খালেদা কারুর ‘ক্ষমতা’ হল না রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করার। কোন গণআন্দোলনও হয়নি দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে।
আদৌ কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে কিছু ছিল? থাকলেও, চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষতা বলে কিছু ছিল? ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ থেকে পাওয়া ‘বাংলাদেশ’, ৫২-র ভাষা আন্দোলন এবং তার আগে ৪৭-এর দেশভাগ থেকে পাওয়া ‘পূর্ব পাকিস্তান’- তো এক সূত্রে বাঁধা। ভারতের মুসলিমদের জন্য নিজস্ব হোমল্যান্ড, পাকিস্তান থেকে মুসলিম বাংলার জন্ম। এর মাঝে ধর্মনিরপেক্ষতা কোথায়? কোথায় বা লালন-হাছন-শাহ আব্দুল করীমের চিরন্তন বাংলা, রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের বাংলাদেশ? কীভাবে বদলে গেলো বাংলাদেশ? নাকি আদৌ কোন বদল হয়নি, মুসলমানের দেশ হয়েই ছিল ও আছে! যেমন ভারত আছে ডি-ফ্যাক্টো হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে।
[৩]
মারফতি নয় শরিয়তি বাংলা
২০১৩ সাল, একটি বেসলাইন সার্ভে করতে প্রায় ২৩ বছর পর আবার বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। ঢাকা থেকে রাত্রের বাসে রংপুর হয়ে লালমনিরহাট জেলার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলাম। গন্তব্য ছিটমহল। বাংলাদেশের উত্তর প্রান্ত। তখন ভোর, ৪ টা ৫৬। দ্রুতগতির বিদেশী বাসে মহাসড়ক ধরে যখন যাচ্ছিলাম তখন ফজরের আজান হচ্ছিল। নিরবচ্ছিন্ন সেই আহবান, ‘নিদ্রা থেকে নামাজ উত্তম’। বাস থামেনি কোথাও, থামবার কথাও নয়। আজানও থামেনি, বাসের সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে ছুটছিল সে। মুসল্লির আওয়াজ জানান দিচ্ছিল, ‘আল্লাহের সর্বশক্তিমানতা’। জানান দিচ্ছিল, মসজিদের সংখ্যা। কতগুলো মসজিদ থাকলে এইরকম একনাগাড়ে আজান শোনা যায় কিলোমিটারের পর কিলোমিটার?
কয়দিন বাদে রাজশাহীর এক গ্রামে এক বন্ধুর বাড়ি গিয়েছিলাম। বন্ধু নেই, সে বিদেশে সেটেল্ড। ছাত্রকালে প্রায় এক মাস ছিলাম তার গ্রামে। গ্রামের পুকুর, মসজিদ, মক্তব, কালীথান সব চোখের সামনে ভাসছে যেন! গ্রাম থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে এক ছোট্ট বাজার, গঞ্জের বাজার। বুধ আর শনিবার হাট বসতো সেখানে। তো সেই বাজারেই থামলাম, পরিচিত চায়ের দোকানে ঢুঁ মারবো বলে। চা পেলাম, পরিচিত মুখও পেলাম। ঢুঁ মাড়লাম একটু দূরের নিতাইয়ের সেলুনে। কিন্তু সেখানে নিতাই নেই, নেই সেলুনও। উত্তর দিকে কালীথানের পাশেই ছিল মাছের বাজার আর মাংসের দুটি দোকান। পাশাপাশি মুরগির আর ছাগলের মাংস বিক্রি হত। এখন দোকান দেখলাম বেড়েছে অনেকগুলো। বহরে ও বাহারে।
বাস স্টপেজ থেকে আমাকে আনতে গিয়েছিল বন্ধুর ছোট ভাই, মজিদ। সেদিনের শিশু এখন যুবক, রীতিমত সংসারি। এই ২৩ বছরে খুব কি পাল্টে গিয়েছে আমাদের গ্রাম? বাড়ির পথে যেতে যেতে মজিদ জিজ্ঞেস করলো, কি রকম দেখলেন দাদা? বললাম, ‘হ্যাঁ, বেড়েছে তোমাদের গ্রামের বাজার’, বলতেই আবার মজিদের প্রশ্ন, ‘শুধুই কি বেড়েছে? দেখেননি, হিঁদুদের দোকান মাত্র দু’টিতে ঠেকেছে’। ‘নাপিত নিতাইকে দেখতে পেলাম না’, জানাতেই মজিদের উত্তর শুধু কি নিতাই, নাপিত পাড়ায় কেউ নাই। আর মাংসের দোকানের রমরমা দেখলেন? আগে প্রকাশ্যে বাজারে গরুর মাংস বিক্রি হত কি? এখন কালীথানের পাশেই গরু কাটা হয়।’ অবাক বিস্ময়ে শুনছিলাম মজিদের কথা, ওর বেদনা।
[৪]
কুড়িগ্রামে হাতিয়া গণহত্যার স্থলে গিয়ে যা শুনেছিলাম
হাতিয়া গণহত্যা, পাকিস্তানি সেনা ও জামাত-রাজাকার দ্বারা গঠিত শান্তি বাহিনীর এক নারকীয় হত্যাকাণ্ড। কুড়িগ্রাম জেলার হাতিয়া ইউনিয়নের শান্ত, নিভৃত দাগারকুটি গ্রাম। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ৩২ দিন আগে, ১৯৭১ সালের ১৩ নভেম্বর, সেদিন ছিল ২৭ রমজান। সেহেরি খেয়ে দোয়া-দরুদ পড়ছিলেন রোজাদাররা। মসজিদে হচ্ছিল আজান। কোথাও শুরু হয়েছিল নামাজ। কোথাও ক্ষেতের কাজে বা মাছ ধরতে নেমেছিলেন মানুষ। হটাৎ সমস্ত নীরবতা ভেঙে বন্দুকের আওয়াজ। আগুনের ফুলকি আকাশছোঁয়া, লেলিহান আগুনে পুড়ছে বাড়িঘর, গরু-ছাগল, মানুষ। পালাতে গেলেই বিদ্ধ হচ্ছে পেন্টাগন আর বেজিং প্রেরিত বুলেটে। হানাদার পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে ছিল জামাত ও মুসলিমলীগের নেতারা। তাঁদের দেওয়া সুন্দরী মেয়ে ও বউয়ের তালিকা অনুযায়ী গণধর্ষণ চলছিল। এরপর হাতিয়া ইউনিয়নের নীলকণ্ঠ, বাগুয়া, অনন্তপুর, রামখানা, নয়াডোরা থেকে ধরে আনা হয় মানুষদের। সকলকে নিয়ে যাওয়া হয় অনন্তপুর বাজারের পূর্বদিকে। পাশেই ধরলা নদী। সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয় হাজারের কাছকাছি মানুষকে, তারপর গর্জে ওঠে আগ্নেয়াস্ত্র, লুটিয়ে পরে নিরীহ গ্রামবাসী।
এই ইতিহাস অনেকের জানা, ২০১৪-র শীতে আমরা যখন সেখানে পৌঁছয় তখন পড়ন্ত বেলা। শহীদ পরিবারের সঙ্গে কথা শুরু হতেই বেশকিছু মানুষ বলতে লাগলেন কর্কশ স্বরে। ‘মিথ্যা সংখ্যা বলা হচ্ছে, এতজন মারা যায়নি এখানে।’ আমরা জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই প্রশ্ন, ‘কেন মেরেছে জানেন? আপনারা জানেন কি এর আগে এই জেলাতেই পাকিস্তান বাহিনীর বাঙালি সেনারা পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাদের হত্যা করেছিল?’ আমরা বিনীতভাবে জানাই, ‘হ্যাঁ, বাঙালি সেনারা বিদ্রোহ করেছিল, ক্যাপ্টেন নওয়াজেশের নেতৃত্বে’। ‘শুধু বিদ্রোহ নয়, খুন করেছিল বাঙালিরা, পাকিস্তানী বাহিনীর কাছে কি আশা করেন?’, সদম্ভে বলেন সেই ব্যক্তি। ব্যক্তিটি একা ছিলেন না, আরও কয়েকজন মাঝবয়সী ও যুবা ছিলেন ওনার সঙ্গে। শহীদ পরিবার ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিল ওদের সামনে। ওরা সজোরে বলতে লাগলো, ‘এসব আওয়ামী লীগ এবং ভারতের প্রচার’। আমরা নির্বাক হয়ে যায়ি, শহীদ পরিবারগুলির বিপন্নতা বাড়তে পারে বলে আর কথা না বাড়িয়ে ফিরে আসি। তাঁদের কথায় অনেকে সায় দিচ্ছিলেন, আমাদের সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগের উপজেলা পর্যায়ের নেতা, তিনিও। আমরা বুঝেছিলাম বাংলাদেশ এখনও পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়নি, অন্তত পাকিস্তানী মানসিকতা থেকে।
গণহত্যায় প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন ডাঃ বাবর আলী, আব্দুল মজিদ, মাওলানা আকবর আলী সহ মুসলিম লীগ- জামাতি রাজনীতির স্থানীয় অনেক কেষ্টবিষ্টু। এরা স্বাধীনতার পরে কিছুদিন চুপচাপ ছিলেন, ৭৫-এ মুজিব হত্যার পর চিত্র পাল্টায়। ডাঃ আলী জামায়েতে ইসলামের হয়ে হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হন। আকবর আলী একটি মাদ্রাসায় পড়াতে শুরু করেন, পুরোদমে জামায়েতের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ওনার ছেলেরা এলাকায় ক্ষমতাবান, বাকিদের ক্ষেত্রেও প্রায় একই চিত্র। যারা আমাদের চ্যালেঞ্জ করে তারা কারা স্পষ্ট হয়।
উল্লেখ্য সম্প্রতি, ওসমান হাদির মৃত্যুর পর, ‘গণহত্যা ১৯৭১: রংপুরের হাতিয়া গণহত্যা’ নামে একটি ফেসবুক পোস্টে প্রচুর কমেন্ট আসে, এখানে কয়েকটি-
তিনটা কথা এই দেশের তরুন প্রজন্ম কে বিশ্বাস করতে হবে। তাহলেই হাদী শান্তি পাবে।
১. আওয়ামী লীগ এবং ভারত আমাদের জাতীয় শত্রু। আওয়ামী লীগ ভারতীয় আধিপত্য বিস্তারের একটা মিশনের নাম।
২. যেখানে আওয়ামী লীগ বা শাহবাগী বামদের পাবে সেখানেই মুজিবের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। (মানে হত্যা করা হবে)
৩. গণহত্যা ও গণধর্ষণ নিয়ে অতিশয়োক্তি বরদাস্ত করা হবে না।
[সূত্র- ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘন্ট গ্রন্থমালা: ১১; মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর, বাংলাদেশ]
[৫]
আক্রান্ত বাউল-ফকির, আক্রান্ত চিরায়ত বাংলা
২০১৬-র অক্টোবরে কুষ্টিয়ার লালন মেলা। আমাদের কাজ ছিল আক্রান্ত বাউল-ফকিরদের সঙ্গে কথা বলা, কয়েকটি আখড়ায় গিয়ে আক্রমণের বাস্তব চিত্র দেখা। যশোর, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর বাউল-ফকিরদের সঙ্গে আমরা কথা বলতে পেরেছিলাম।
ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসনামলে বাউল, ফকির, বয়াতি, লালন অনুসারী এবং স্বভাবকবিরা বহুবার আক্রান্ত হয়েছে। আগে হিন্দু ও মুসলিম সামন্ত ও পুরোহিতদের দ্বারা আক্রান্ত হত। কিন্তু বিগত প্রায় চার দশকে তারা শুধু শরিয়তপন্থীদের দ্বারাই আক্রান্ত হচ্ছে। এখন তার মাত্রা বহুগুণে বেড়েছে। তেমনই জানিয়েছিলেন বাউল জুলমত শাহ। চুয়াডাঙ্গার গোবিন্দপুরে সে বছরের জুলাই মাসে তিনটি আখড়ার মধ্যে দু’টিতে আগুনে পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। প্রতি বছর ১৫ বৈশাখ, ৫ আষাঢ় ও ২৫ ফাল্গুন সেখানে যে বাউল গানের আসর বসে, ভারত থেকেও বহু বাউল-ফকির তাতে অংশ নেয়।
এর আগে জুলাইয়ের ১৯ তারিখে চুয়াডাঙারই জীবননগর উপজেলার একতারপুর গ্রামের আখড়ায় বাউলদের ওপর হামলা চালিয়েছিল মুখোশপরা দুষ্কৃতীরা। দুই মহিলা-সহ তিন জন এই হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তাঁদের লোহার রড ও লাঠি দিয়ে মারার পরে ধারালো অস্ত্রে কোপানো হয়। একতারপুরের আখড়াটিও পুড়িয়ে দেয় দুষ্কৃতীরা। তদন্তে নেমে জামাতে ইসলামি ও তাদের ছাত্র শাখার কয়েক জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
বাউল-ফকিররা কেন আক্রমণের শিকার? পশ্চিমবঙ্গে আক্রান্ত বাউল-ফকিরদের সংগঠনের সচিব আকবর খান জানালেন, ‘মুসলিম পরিবারে জন্মেও আমরা নামাজ পরিনা রোজা রাখিনা, আমরা শরিয়তকে মানিনা। আমরা বলি ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’। তাই এই আক্রমণ, দুই বাংলাতেই। বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে ইসলামিকরণ হয়ে গেছে, গান হারাম বলছে তৌহিদপন্থীরা, জামাতিরা’। মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়ার আখড়ায় কথা হয় আমানত ফকিরের সঙ্গে। তিনি বলেন,‘শরিয়তপন্থীদের দেখাদেখি এখানে নেমেছে সংঘ পরিবার, তবে আক্রমণ করতে নয়, গ্রাস করতে। বাউল-ফকিরদের, কীর্তনিয়াদের সংগঠন করেছে আরএসএস, প্রলোভন দিচ্ছে। গান গাওয়াচ্ছে ওদের লাইনে’।
বাংলাদেশের বদলে যাওয়া সমাজ ও রাজনীতি এই বাংলায় কতটা প্রভাব ফেলে তার বড় নজির বোধহয় এইটি। ইতিমধ্যে সারা রাজ্যে সদস্য সংগ্রহ করেছে সংঘ-পুষ্ট ‘ভারতীয় কীর্তন, বাউল ও ভক্তি গীত কল্যান সমিতি’। তাদের পক্ষ থেকে ২০১৯ সালে কোলকাতার শহীদ মিনার ময়দানে বড় সভা ডাকা হয়।
[৬]
দুটি গণআন্দোলন ও গণমানুষের বদলে যাওয়া মুখ
১৯৯০ সালে ঢাকায় গণ অভ্যুত্থান হয় স্বৈরশাসক হুসাইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে। ৭ দলীয় বিএনপি জোট, ৮ দলীয় আওয়ামী লিগ জোট আর ৫ দলীয় বাম জোট ছিল এই গণআন্দোলনে। গণতন্ত্রের দাবিতে এই আন্দোলনের ফলে এরশাদের পতন ঘটে। বাংলাদেশে ৯ বছরের সামরিক শাসনের পর সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনা বিন্দু হিসেবে চিহ্নিত হয় এটি, যা ১৯৯১ সালে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করেছিল। দুটি বড় জোটের নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা। ঢাকার রাস্তায় ঐতিহাসিক মিছিলের কিছু ছবি আজও থেকে গেছে আমার মানসপটে। সেই মিছিলের সঙ্গে কোলকাতার রাস্তার মিছিলের ফারাক খুঁজে পাওয়া ছিল মুশকিল। মুখের আদল, বেশবাস, শ্লোগানের উচ্ছলতা প্রায় এক।
কিন্তু আজ যে কোন ভীর হোক বা মিছিল, স্পষ্টত দ্রশ্যমান যে এটি প্রধানত মুসলিমদের মিছিল, সে মিছিলের দাবি যাই হোক না কেন! দেশটা ৯৫% মুসলমানের এই বিজ্ঞাপন যেন প্রতিটি উপস্থিতিতে। সাধারণ মানুষের কথ্যে স্বাভাবিক আরবি-ফার্সি শব্দের অতিরিক্ত আরবি শব্দের আধিক্য। ভালো কিছুতে ‘আলহামদুল্লা’, মৃত্যু সংবাদে ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নালিল্লাহে রাজিউন’-এর ব্যবহার। ‘আজানের সময় মাথার ঘোমটা খুলে গেলে’, ‘রমজান মাসে রোজা না রাখলে’, ‘মসজিদে না গেলে’ তুমি সাচ্চা মুসলমান নও, বাতাসে শাসন শোনা যায়।
[৭]
হিন্দু বাংলা, মুসলিম বাংলা
ঢাকায় ২০১৩ তে ছিলাম দুই পর্বে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি হোক বা শাহবাগ চত্বরে বা খাবার হোটেলে কথা হয়েছিল ক্রেতা-বিক্রেতা, ছাত্র, যুব, অধ্যাপক সহ বহু মানুষের সঙ্গে। লালমনিরহাটের প্রেসক্লাবের বন্ধুদের সঙ্গে। কুড়িগ্রামে বা পঞ্চগড়ে চায়ের দোকানে। একটা ট্রেন্ড দেখেছিলাম। ব্যাপক হাসিনা বিরোধিতা। ‘শেখের বেটি’ বলে কিছুটা শ্লেষের সঙ্গে তার নাম উল্লেখ করা হচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম স্বৈর-শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের বিক্ষোভের আগুন জ্বলছে ধিকি ধিকি।
ঢাকায় গড়পড়তা একটা ন্যারেটিভ শুনেছিলাম, ‘৪৭ না হলে ৭১ হত না’। প্রথমে বুঝতে পারিনি কথাটা। কেন বলছে এই কথা? পরে মনে হল, কথাটা তো ঠিক, ৪৭ মানে দেশভাগ, দেশভাগ না হলে তো বাংলাদেশের জন্ম হত না। প্রায় একমাস ঢাকার বাইরে ছিলাম। ‘৪৭ না হলে ৭১ হত না’, আমাকে তাড়িয়ে বেড়াতো। দেশভাগকে এরা তাহলে মেনে নিচ্ছে, তার মানে মেনে নিচ্ছে দ্বিজাতিতত্ত্বকেও। দেশভাগ দিয়েছে স্বতন্ত্র মুসলিম হোম ল্যান্ড, ৭১ দিল স্বতন্ত্র মুসলিম বাংলা। তাই তো!
এক মাস বাদে যখন আবার ফিরে এলাম তখন আবারও মুখোমুখি হলাম। মুখোমুখি হলাম কথাটার সঙ্গে, মানুষগুলোর সঙ্গে। বিনীত বয়ান (প্রশ্ন নয়) রেখেছিলাম, ৪৭ না হলে ৭১ হত না যেমন সত্যি, ৫২ না হলেও তো ৭১ আসতো না। ভাষা আন্দোলন না হলে বা যে কারণে ভাষা আন্দোলন সেই পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু চাপিয়ে দেওয়া, তা যদি চাপিয়ে দেওয়া না হত, তাহলে কি হত? ৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের রায় যদি মেনে নেওয়া হত, তাহলে কি হত? ৫২ হত না, ৭১ও আসতো না। আপনারা পূর্ব পাকিস্তান হয়েই থাকতেন অখণ্ড পাকিস্তানে, তাই তো?
প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। বলা যায়, ‘পূর্ব পাকিস্তান হয়ে থাকাটা [শোষণ ও ভাষা আধিপত্য না থাকলে] অর্থাৎ অখণ্ড পাকিস্তানে থাকাটা’ গ্রহণযোগ্য এই মত ছিল বেশ কয়েকজনের। সেটা কোন সমীক্ষা ছিল না, তবে সমাজ মনের কথার কিছুটা হলেও আঁচ যেন পাওয়া গিয়েছিল। আঁতকে উঠেছিলাম। শুধু হাসিনা বিরোধিতা বা ভারতের আধিপত্যের বিরোধিতা এ নয়। তাহলে কি? ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার জন্যে প্রাণ দেয় বাঙালি, উল্লেখ্য এইসময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং পুর্ব বাঙলার প্রাদেশিক গভর্নর দু’জনই ছিলেন পূর্ব বাঙলার মানুষ।
বাংলাদেশ থেকে ফিরছি যেদিন সেদিন ছিল কালীপুজো। পেট্রাপোল থেকে বনগাঁ হয়ে বারাসাতে ঢুকতেই শব্দের আর আলোর রোশনাই। প্রায় নিঃশব্দ এক বাংলা থেকে যখন কালীর বাংলায় ঢুকলাম তখন মনে হল এই কথা, ‘মুসলিম বাংলা থেকে হিন্দু বাংলা’-য় এলাম। ২০১৬ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে রামনবমী শোভাযাত্রার ব্যাপ্তি নিয়ে একটি সমীক্ষা থেকে জানা গেছে এক ভয়ঙ্কর চিত্র। বড় শহর, মহকুমা শহর সহ রামনবমী এখন গ্রামেও বিস্তৃত। মোট ১৬ টি শোভাযাত্রার সমীক্ষালব্ধ রিপোর্ট জানাচ্ছে মুসলিম বিরোধী ঘৃণা শ্লোগান, ব্যানার, উত্তেজক ডিজের সংখ্যাগত মাত্রা। এই বাংলা আজ হিন্দুত্বের সামাজিকীকরণের পথে, আর ওপারে ইসলামিকরণ সম্পূর্ণ।
বাংলাদেশে ভারতের হিন্দুত্ব রাজনীতি নিয়ে বহুল চর্চা। চর্চায় ভারতে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, বাবরি মসজিদ, মুসলিমরা বিপন্ন, গুজরাট গণহত্যা আসে বারবার। আর পশ্চিমবাংলায় বাংলাদেশ ক্রমশ হিন্দু শূন্য হয়ে যাবে সেই আশঙ্কা। তারা ৪৭-এর আর আজকের হিন্দু জনসংখ্যার তুলনা টানে। বলে, ‘বাংলাদেশে দাঙ্গা কীভাবে হবে, ওখানে প্রতিরোধ করার মত হিন্দু আছে নাকি?’
ভারতীয় আধিপত্যবাদ হল বাস্তবতা। তবে বাংলাদেশের ভারত-বিরোধিতার মধ্যে হিন্দু-বিরোধিতাও প্রকট। ঠিক যেমন ভারতের ক্ষেত্রে পাকিস্তান-বাংলাদেশের প্রতি এক নীতি, অন্য প্রতিবেশীদের প্রতি ভিন্ন। মূলে মুসলিম-বিরোধিতা। বিএসএফ আছে শুধু পাকিস্তান-বাংলাদেশ বর্ডারে। সীমান্তে নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণে তাদের ‘সুনাম’। কট্টর মুসলিম বিরোধিতা এদের বৈশিষ্ট। অন্য দেশের সঙ্গে সীমান্তে বিএসএফ নেই, আছে অন্য রক্ষী বাহিনী। সেই সীমান্তে যেহেতু মুসলিম দেশ নেই তাই নির্যাতন, হত্যা প্রায় নেই। সেইজন্যেই ভারতকে ডি ফ্যাক্টো হিন্দু রাষ্ট্র বলা যায়।
[৮]
ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও সমাজমনে তার প্রভাব
ঢাকার রাজপথ হোক বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতা সেখানে ইজরাইলের জিওনবাদ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সমোচ্চারে উচ্চারিত হয়। কেন হয়?
৭১ এর পরে যে কয়েকটি ঘটনা বাংলাদেশের মানুষের মনে ভারত বিরোধিতার ভিত্তি দৃঢ় করে তার সংখ্যা একাধিক। যেমন ফারাক্কা ব্যারেজ, সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর নির্যাতন, ছিটমহল ইত্যাদি। বড় প্রতিবেশি হিসাবে ভারতের যতটা ‘উদারতা’ দেখানো উচিত ছিল বা যতটা মর্যাদা প্রাপ্য ছিল বাংলাদেশর তা কি দেওয়া হয়েছে? এক ফেলানি খাতুনই যথেষ্ট, হৃদপিণ্ডের রক্ত ক্ষরণ অব্যাহত রাখতে।
ফেলানি খাতুন
২০১৪-র ২৪ নভেম্বর কুড়িগ্রামে ফেলানির বাড়িতে আমরা যখন মুখোমুখি হই তখন এক অপরাধবোধ কাজ করছিল। এই প্রথম ‘ভারতীয়’ হওয়ার শ্লাঘা ভেঙে খান খান হয়ে গেলো এক কিশোরীর মা-বাপের সামনে। কিশোরীর নাম ছিল ফেলানি খাতুন, ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসছিল সে। বাপ-বেটি একসাথে। ঠিক যেভাবে স্থানীয় দালাল, বিএসএফ, বিজিবি, পুলিশ, পাচারকারীর চক্রের মাধ্যমে শয়ে শয়ে মানুষ ভারতে যায় কাজ করতে ফেলানির বাবা, মহম্মদ নূর ইসলামও সেইরকম গিয়েছিলেন। মেয়ের বিয়ে দেবেন বলে ফিরে আসছিলেন।
‘তখন ফজরের আজান সবে শুরু হয়েছে। আমাদের দালাল বলল কাঁটাতার পার করেই সীমান্ত অতিক্রম করতে। মেয়ে খুব ভয় পেয়েছিল। আমি পার হতেই গুলির শব্দ। আমি হতচকিত, আবার কাঁটাতার পেড়িয়ে ওপারে যাওয়া সম্ভব ছিল না। আশেপাশের গ্রামের মানুষকে ডেকে যখন গেছি মেয়ে তখন বেঁচে নেই। যে ছবি সারা বিশ্ব দেখল কাঁটাতারের ওপরে ফেলানির লাশ, ওখানে কিন্তু ও মরেনি। ওকে ভারতের মাটিতেই মেড়ে টাঙিয়ে দিয়েছিল তারে। বিএসএফ আর দালাল মিলে আমার মেয়েকে মারলো।’
মা-বাপের ওই কান্নার সামনে দাঁড়াতে পারিনি, দাঁড়ানো যায় না। ফেলানি হত্যার পরে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রে শিরোনাম ছিল এইরকম-
‘ফেলানি নয় ঝুলছে আমার বাংলাদেশ’। ‘ওটা কার লাশ? ফেলানি নয়, বাংলাদেশের লাশ’।
১২ বছর অতিক্রান্ত, আজও হত্যাকারী বিএসএফ আধিকারিকের কোন শাস্তি হয়নি, সুপ্রিম কোর্টে ফেলানি মামলা (Writ petition (Criminal) number 141/2015)-র শুধু তারিখ পরে, বিচার হয়না। ‘ট্রিগার হ্যাপি’ বিএসএফ-এর হত্যালিলা কিন্তু অব্যাহত। গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে কিশোরী স্বর্ণা দাস (১৪) নিহত হয়। এর আগে ২৮ জানুয়ারি লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম আঙ্গরপোতা সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন বাংলাদেশি তরুণ রবিউল ইসলাম। বাস্তবে পাকিস্তানী বাহিনীর পরে বাঙালির (এক্ষেত্রে দুই বাংলা) রক্ত যদি কেউ ঝড়িয়ে থাকে তবে সে বিএসএফ।
গত ১৬ জানুয়ারি, ২০২৫-এর কথা। জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক ও জুলাই অভ্যুত্থানকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেছেন, ‘কাঁটাতারে শুধু ফেলানীর লাশ নয়, আজ ৫৩ বছর ধরে ভারতের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ঝুলে আছে। কুড়িগ্রামে ‘মার্চ ফর ফেলানী’ পদযাত্রা শুরুর আগে ব্রিফিং করছিলেন তিনি।
[৯]
অবশেষে
আমার বিভিন্ন সময়ের বাংলাদেশ সফরে লেখা ডাইরির পাতা থেকে এই লেখা। বাংলাদেশ নিয়ে স্বাভাবিক কারণেই এপারের মুক্তচিন্তার মানুষদের আবেগ আছে। মার্জনা করবেন, আমার মূল্যায়ন তাঁদের হয়তো আশাহত করবে। আমার আবেগ ছিল, এখন তা দুশ্চিন্তায় পরিণত হয়েছে। জুলাই গণআন্দোলনের ইসলামি ঝোঁক, ‘ছায়ানট’ আক্রমণ, বাউল আখড়ায় আক্রমণ নিয়ে তারা হয়তো দুঃখ পাচ্ছেন। আমার ভাবনায় এসব আকস্মিক নয়। বাংলাদেশে ছায়ানট, উদীচী আক্রান্ত হয়েছে পাকিস্তানী আমলেও। রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয়। ঘটনাস্থলেই নয়জন নিহত হন। পরে হাসপাতালে মারা যান আরও একজন। এতদিন সেসব বলা হত সন্ত্রাসী কাজ, বিচ্ছিন ঘটনা। ভুল ভাবা হত। ইসলাম বনাম ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ চিরকালই ছিল, যদি সেই চেতনায় আদৌ বাঙালি জাতীয়তাবাদ আর ধর্মনিরপেক্ষতা বলে কিছু থেকে থাকে। এখন সমাজমনের ইসলামিকরণ প্রায় সম্পূর্ণ। সমাজমনকে উদীচী-ছায়ানট নয় প্রভাবিত করছে হেফাজতে ইসলাম, ইসলামি আন্দোলন ইত্যাদি রাজনৈতিক ইসলামের গোষ্ঠী। এই প্রেক্ষাপটে জামাতে ইসলাম হয়ে উঠেছে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি।
লেখক একজন সমাজকর্মী। মতামত ব্যক্তিগত।

