চলবে পশ্চিমবঙ্গের আশাকর্মীদের কর্মবিরতি, ২১ জানুয়ারি ফের স্বাস্থ্যভবন অভিযান


  • January 7, 2026
  • (0 Comments)
  • 357 Views

৭ জানুয়ারি, মঙ্গলবার স্বাস্থ্যভবন অভিযানের কারণ ছিল স্বাস্থ্য আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করে সমাধান সূত্র বের করা, প্রাপ্য অধিকার আদায় করা। কিন্ত প্রথম ও প্রধান দাবি – আশাকর্মীদের জন্য রাজ্য সরকারের নির্ধারিত ন্যূনতম (মিনিমাম ওয়েজ) ১৫,০০০ টাকা দিতে হবে – তা অমীমাংসীত রয়ে যায়। ২১ জানুয়ারি এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে। তাই ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ওই দিন ফের স্বাস্থ্যভবন অভিযানের ঘোষনা করা হয়ে।

 

সুদর্শনা চক্রবর্তীর রিপোর্ট

 

পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত জেলা থেকে প্রায় ৭০ হাজারেরও বেশি আশাকর্মী ৭ জানুয়ারি কলকাতায় পূর্ব নির্ধারিত স্বাস্থ্যভবন অভিযানে শামিল হয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ আশাকর্মী ইউনিয়ন-এর সঙ্গে এদিন যোগ দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ পৌর স্বাস্থ্যকর্মী কন্ট্র্যাক্টচুয়াল ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন-ও। নিজেদের ন্যায্যা দাবি-দাওয়া নিয়ে তাঁদের দীর্ঘদিনের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে যুক্ত হয়েছে অনির্দিষ্টকালের জন্য লাগাতার কর্মবিরতি।

দীর্ঘ কয়েক বছর ধরেই ন্যায্য দাবিতে তাঁরা বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের প্রতিবাদ আন্দোলন করছেন। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫ সালে তাঁরা স্বাস্থ্যভবন অভিযান, কলকাতার বুকে ঐতিহাসিক জমায়েত সহ বিভিন্ন কর্মসূচী নিয়েছিলেন। সেইসঙ্গে বারেবারে রাজ্য সরকার ও প্রশাসনকে এই বার্তাও দিয়েছেন যে, তাঁদের ন্যায্য দাবি পূরণ না হলে তাঁরা কর্মবিরতির পথ বেছে নিতে বাধ্য হবেন। তাঁদের উপরে গ্রাম ও শহরের এক বিরাট অংশের মা ও শিশুর স্বাস্থ্য পরিষেবা নির্ভরশীল থাকা সত্ত্বেও সরকারি স্তরে, আশাকর্মীদের দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়া বা কোনোও সমাধান সূত্র বের করার প্রতি কোনোও আগ্রহ দেখানো হয়নি। যার ফলশ্রতিতেই এই কর্মবিরতির পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন রাজ্যের ২৯টি জেলার আশাকর্মীরা।

 

পরিশ্রমের নিরিখে ন্যায্য ভাতা বাড়ানো (ন্যূনতম ভাতা ১৫ হাজার টাকা করা), সমস্ত বকেয়া মেটানো, কর্মক্ষেত্রে কাজ্যের অন্যায্য চাপ, হয়রানি কমানো – এই যুক্তিসঙ্গত দাবিগুলি নিয়েই চলছে আন্দোলন। স্বাস্থ্যদপ্তরের প্রতিটি বিভাগে ও প্রত্যেক আধিকারিকের কাছে তাঁরা নিজেদের দাবি সম্বলিত চিঠি পাঠিয়ে তবেই এই লাগাতার কর্মবিরতির ডাক দিয়েছেন। অথচ প্রশাসনিক সূত্রে এখনোও পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গে কোনো রকম আলোচনার কথা জানানো হয়নি।

 

৭ জানুয়ারি, মঙ্গলবার স্বাস্থ্যভবন অভিযানের কারণ ছিল স্বাস্থ্য আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করে সমাধান সূত্র বের করা, প্রাপ্য অধিকার আদায় করা। সেই মতো আগের দিন দুপুর থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে আশাকর্মীরা কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সকাল থেকেই জমায়েত শুরু হয় স্বাস্থ্যভবনের সামনে। দাবি আদায়ের শ্লোগান উঠতে থাকে, বিভিন্ন সমর্থনকারী সংগঠনের তরফ থেকে বক্তব্য রাখা শুরু হয়। ঘোষিত সময় দুপুর সাড়ে এগারোটার আগেই হাজার হাজার আশাকর্মী জমায়েত-অবস্থান শুরু করেন। প্রশাসনিকভাবে প্রচুর পুলিশ, র‍্যাফ মোতায়েন করা হয়েছিল। শুরুতেই তাঁদের জমায়েতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হলে ব্যারিকেড ভেঙে আশাকর্মীরা জায়গা দখল করেন।

দুপুর আড়াইটা নাগাদ পশ্চিমবঙ্গ আশাকর্মী ইউনিয়ন-এর রাজ্য সম্পাদিকা ইসমাত আরা খাতুন সহ ১৫ জনের প্রতিনিধি দল স্বাস্থ্য সচিব সহ স্বাস্থ্য বিভাগের উচ্চ পদস্থ সরকারি আধিকারিকদের সঙ্গে ১০ দফা দাবি সম্বলিত ডেপুটেশন দেওয়ার পাশাপাশি সেগুলি নিয়ে বৈঠকে বসেন। দীর্ঘ প্রায় দেড় ঘন্টার বৈঠক শেষে ছুটি ও বকেয়া মেটানোর বিষয়ে দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে চলেছে বলে তাঁরা প্রতিনিধি দলকে প্রতিশ্রুতি দেন।

 

কিন্ত প্রথম ও প্রধান দাবি – আশাকর্মীদের জন্য রাজ্য সরকারের অন্যান্য শ্রমিকদের ন্যায় নির্ধারিত ন্যূনতম (মিনিমাম ওয়েজ) ১৫,০০০ টাকা দিতে হবে – তা অমীমাংসীত রয়ে যায়। স্বাস্থ্য সচিব জানান এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত যেহেতু তিনি একা নিতে পারবেন না, তাই তাঁর আরো সময় প্রয়োজন। তিনি আশাকর্মীদের কর্মবিরতি প্রত্যাহারের অনুরোধ করেন। ২১ জানুয়ারি এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য তাঁদের স্বাস্থ্যভবনে আশার দিন উভয় পক্ষের সম্মতিতে স্থির হয়। এরপর প্রতিনিধি দল বৈঠক শেষে বেরিয়ে এসে উপস্থিত আশাকর্মীদের সব তথ্য জানানোর পর ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত জেলায় জেলায় ব্লকে ব্লকে নানা কর্মসূচী চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি টানা কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পশ্চিমবঙ্গ আশা কর্মী ইউনিয়ন ও আশা কর্মী আন্দোলনের সর্বভারতীয় নেত্রী ইসমাত আরা খাতুন গ্রাউন্ডজিরো-কে জানালেন, “ভাতা চার মাস, পাঁচ মাস বাকি থাকে। ইন্সেন্টিভ গত দেড় বছর ধরে বাকি। কোনোও উৎসব অনুষ্ঠানের আগে টাকা দেওয়া হয় না। তারসঙ্গে রয়েছে অসম্ভব কাজের চাপ। পাশাপাশি চাপ দেওয়া হয় দাবি না করার জন্য, আন্দোলন না করার জন্য। আশাকর্মীরা কি শুধু সমাজসেবা করার জন্যই নিয়োগ হয়েছি? যাঁরা স্বাস্থ্য দপ্তরের এত গুরুত্বপূর্ণ একটা পরিষেবা দিচ্ছেন, মা-বাচ্চার স্বাস্থ্য ঠিক রাখছেন, নিরাপদ মাতৃত্ব সুনিশ্চিত করছেন, অন্যের বাচ্চার লালন-পালন করছেন, তাঁদের স্বাস্থ্য, সংসার, বেঁচে থাকার দায়িত্ব কি কোনোভাবে সরকার নেবে না?”

 

নেতৃত্ব থেকে আহ্বান জানানো হয় ২১ তারিখ শুধু আশাকর্মীরা নন, যেন তাঁদের পরিবারের সকলকে নিয়ে সবাই শামিল হন স্বাস্থ্যভবন অভিযানে এবং সেদিন নিছক আশ্বাস বা প্রতিশ্রুতি নয়, সরকারের কাছ থেকে নিজেদের ন্যূনতম প্রাপ্য বরাদ্দ ১৫ হাজার টাকা করার দাবি পূরণের পরেই স্বাস্থ্যভবন ছাড়া হবে বলে স্থির হয়। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে বাজেটে কেন্দ্রীয় কোর বরাদ্দ সাড়ে তিন হাজার টাকা যাতে রাজ্যে মঞ্জুর হয় সে বিষয়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।

 

আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষিতেও এদিনের পর আশাকর্মী আন্দোলনের চিত্রটি নতুন মাত্রা পেল।

 

 

Share this
Leave a Comment