ভোট পরবর্তী সময়ে এ রাজ্যে একের পর এক ঘটে চলা সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান গীর্জার উপর হামলা, SIR প্রক্রিয়ায় ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি ও বেআইনি ভাবে সাধারণ মানুষদের সেখানে আটক করার বিরূদ্ধে ৩ নভেম্বর, মঙ্গলবার কলকাতার প্রেস ক্লাবে এক সংবাদিক সম্মেলন ডাকা হয়ে। মৈনাক দত্ত-র প্রতিবেদন।
কলকাতা, ৩ নভেম্বর ২০২৬
নতুন সরকার পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর কেটেছে মাত্র পাঁচ মাস। ভোট পরবর্তী সময়ে এ রাজ্যে ৪৮টি খ্রিষ্টান উপাসনালয়ে হামলা চালিয়েছে হিন্দুত্ববাদী দুষ্কৃতিরা। কিন্তু এফআইআর হয়েছে মাত্র ১৫ টি। এমনকি বহু জায়গায় পুলিশ এফ.আই.আর নিচ্ছে না। ‘কারওয়ানে মহব্বত’, ‘সবর ইনস্টিটিউট’ ও ‘আমরা এক সচেতন প্রয়াস’ নামক সংগঠনগুলির মিলিত তথ্যান্যসন্ধানে উঠে এসেছে এমনই বাস্তবচিত্র।
ভোট পরবর্তী সময়ে এ রাজ্যে একের পর এক ঘটে চলা সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান গীর্জার উপর হামলা, SIR প্রক্রিয়ায় ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি ও বেআইনি ভাবে সাধারণ মানুষদের সেখানে আটক করার বিরূদ্ধে ৩ নভেম্বর, মঙ্গলবার কলকাতার প্রেস ক্লাবে এক সংবাদিক সম্মেলনের ডাক দেয় এই সংগঠনগুলি। সংবাদিক সম্মেলনে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন আইএএস অফিসার জহর সরকার, প্রাক্তন আইএএস অফিসার ও সমাজকর্মী হর্ষ মন্দার, প্রাক্তন আইএএস ওয়াজাহাত হাবিবুল্লাহ, সংবাদিক আকার প্যাটেল, মানবাধিকার জন দয়াল এবং মানবাধিকার কর্মী বিদ্যা ডিঙ্কার।
জহর সরকার নিজের বক্তব্যে সরাসরি বলেন, “পাড়ার কিছু গুণ্ডারা পার্টির নাম ব্যবহার না করে ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’, ‘হিন্দু জাগরণ মঞ্চ’ এসব সংগঠনগুলোর নাম করে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে। চারিদিকে যেন একটা কম্পিটিটিভ কমিউনালিজম চলছে। এই নতুন নতুন গুন্ডারা এসব ঘটাচ্ছে পার্টির তরফ থেকে একটু নজর যাতে তাঁদের উপরে পরে।” SIR প্রসঙ্গে তিনি যোগ করেন “সারা ভারতে ১৩ কোটি ভোটার বাদ দিয়েছে। বাংলায় প্রায় ১ কোটি মানুষকে লাইনে দাঁড় করানোর পর সম্প্রতি একটি আরটিআই-এর জবাব দিতে গিয়ে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে মাত্র ১৬০০ জনকে তাঁরা বিদেশি হিসেবে সন্দেহ করছেন। মাত্র ১৬০০ জনকে খুঁজতে গিয়ে তাঁরা সারা ভারতবর্ষে তাণ্ডব চালিয়েছে।”
এদিনের সাংবাদিক সম্মেলনে স্পষ্ট করা হয় SIR প্রক্রিয়া যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, মুসলিম সম্প্রদায়কে বাদ দেওয়ার জন্য করা হয়েছিল তা সবর ইনস্টিটিউট তাঁদের প্রকাশিত রিপোর্টের মাধ্যমে প্রমাণ করে দিয়েছে। যেভাবে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ডিটেনশন ক্যাম্প গড়ে উঠছে এবং বিভিন্ন মানুষকে রাতের অন্ধকারে বেআইনিভাবে আটক করা হচ্ছে তাঁর বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তোলা হয়।
প্রাক্তন আইএএস অফিসার ও ভারতের সংখ্যালঘু কমিশনের চেয়ারম্যান ওয়াজাহাত হাবিবুল্লাহ বক্তব্যের শুরুতেই মনে করিয়ে দেন – ভারতের সংবিধানের ধারণা কেবল একটি লিখিত দলিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক ধারণা, যার শিকড় হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে বিস্তৃত।
আলোচনায় যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তিনি তোলেন তা হল – “ভারতের সংবিধান কেবল একটি সাংবিধানিক দলিল নয়। এটি আমাদের কাছে ভারত নামক দেশটির অস্তিত্বের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। ভারত কী? এর উত্তর হল— ভারতের সংবিধান। এই রাষ্ট্র কি এখনও ভারতের সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে পরিচালিত হচ্ছে? যখন আমরা লিখিতভাবে ভারতের সংবিধানকে সংজ্ঞায়িত করেছি, তখন একজন ভারতীয় হিসেবে, আপনাদের সকলের মতো আমিও এই প্রশ্ন তুলতে বাধ্য— যাঁরা আমাদের দেশে ক্ষমতায় নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁরা কি সেই সংবিধানকে রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করছেন? তাঁরা কি ভারতের এই ধারণাটিকে সুরক্ষিত রাখছেন?”
তিনি তুলে আনেন আরটিআই প্রসঙ্গ। ভারতের সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বাক্স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, যা বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হল তথ্যের অধিকার আইন বা RTI Act। এই প্রসঙ্গেই তিনি বলেন, “তথ্যের অধিকার আইনকে কি যথাযথ সম্মান জানানো হচ্ছে? আইনটি মেনে চলা তো দূরের কথা, তাকে কি আদৌ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে? সম্প্রতি SIR-সহ বিভিন্ন ঘটনাবলি নিয়ে আমরা যে অনুসন্ধান করেছি, তার উত্তর হল— না।”
বেআইনি নির্বাসন নিয়ে তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশি হিসাবে চিহ্নিত করা ব্যক্তিদের শনাক্ত করার জন্য যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে, তার কোনও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। বাস্তবে কোনও প্রমাণ ছাড়াই দাবি করা হচ্ছে, তাঁরা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। এক্ষেত্রে যে জরুরি প্রশ্নগুলো উঠে আসে তা হল – কীভাবে তাঁদের বাংলাদেশ সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে? তাঁদের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য কি কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে? সংবিধানের অংশ হিসেবে আমাদের যে দায়িত্ব রয়েছে, তার ভিত্তিতে কি তাঁদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে?”
প্রাক্তন আইএএস অফিসার ও সমাজকর্মী হর্ষ মন্দার তাঁর বক্তব্যে এই বিষয়ের উপরেই জোর দেন যে প্রত্যর্পণ একটি আইনি প্রক্রিয়া, যারজন্য অন্য দেশটির সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করতে হয়। সরকার দাবি করছে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দেশ থেকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। “অথচ এখানে যা ঘটছে, সেই মানুষগুলির বাংলাদেশি হওয়ার কোনও প্রমাণ সরকারের হাতে নেই। আপনাকে অন্য দেশের সরকারের কাছে নিজের প্রমাণ পেশ করতে হবে। তারপর সেই সরকার ওই ব্যক্তিকে নিজেদের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করে ফিরিয়ে নেবে। এখানে তেমন কোনও আইনি প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া নেই। যা চলছে, তা সম্পূর্ণ বিচারবহির্ভূত একটি ব্যবস্থা। এমন অসহায় মানুষদের সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যাঁরা হয়তো প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেখাতে পারেননি।
এখান থেকে বন্দুকের মুখে তাঁদের সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। আর ওপারেও তাঁদের দিকে তাক করা রয়েছে বন্দুক। চারদিকে শুধুই আতঙ্ক। গভীর রাতে মানুষকে সীমান্তের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তাঁরা জানেন না, কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাঁদের। একের পর এক ভয়াবহ ঘটনার কথা সামনে আসছে।
মানুষ নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের কাছে খাবার নেই। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে কোনওরকমে সীমান্ত পেরিয়ে অন্য পারে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। অথচ বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীদের বন্দুক তখন তাঁদের দিকে তাক করা।”
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের উপর ক্রমাগত আক্রমণ প্রতিহত করা ও গণতন্ত্র রক্ষায় নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার কর্মী, সমাজ কর্মী ও রাজনৈতিক কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ লড়াই দীর্ঘস্থায়ী ও দৃঢ় হবে বলেই এদিন বক্তারা জানান।
গত ১৮-২০ অক্টোবর, দুর্গা পূজা চলাকালীন সময়ে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার চন্দ্রকোনায় তিনটি খ্রিষ্টান পরিবারের উপর বজরং দলের সদস্যরা আক্রমণ চালায়। শারীরিক হেনস্থার পাশাপাশি তাঁদের তথাকথিত শুদ্ধিকরণ করা ও পুষ্পাঞ্জলি দিতে বাধ্য করা হয়।
ঘটনার সূত্রপাত ১৮ তারিখ, যেদিন বাড়িতে হামলা চালিয়ে বজরং দলের সমর্থকেরা খ্রিষ্টান পরিবারগুলির সদস্যদের মারধোর, মহিলাদের পোশাক ছিঁড়ে দেওয়া, টাকা লুট করে। চলে শুদ্ধিকরণ। ১৯ তারিখ পুজা মন্ডপে টেনে নিয়ে গিয়ে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ানো হয়। ২০ তারিখ পুরুষদের ভয় দেখানো হয় এই ঘটনা পুলিসে রিপোর্ট না করতে এবং পরিবারগুলিকে চাপ দেওয়া হয় খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করার জন্য। পরবর্তী সময়ে এই ঘটনায় এফ আই আর দায়ের হয় ও ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
গত ২ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর ক্রমবর্ধমান হিংসা, নিপীড়ন ও বৈষম্যের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে কলকাতায় দু’দিনের গণশুনানি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২ ও ৩ নভেম্বর কলকাতার মুসলিম ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে আকক্রান্ত পরিবারগুলি, তথ্যানুসন্ধানী দল, আইনজীবী, গবেষক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞ ও ছাত্র-ছাত্রীরা অংশ নেন। এই গণশুনানিতে ২০২৪ সাল থেকে রাজ্যে বিজেপির ক্ষমতায় আসার পর গত ছয় মাসে এবং ২০২৫ সাল জুড়ে বিভিন্ন জেলায় ঘৃণাজনিত অপরাধ, যৌন নিপীড়ন, গণহিংসা ও লক্ষ্যভিত্তিক হয়রানির অন্তত ৬০টি ঘটনার সাক্ষ্য নথিবদ্ধ করা হয়। সাক্ষ্যগুলিতে গির্জার প্রার্থনা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান ব্যাহত করা, উপাসনালয়ে ভাঙচুর, যাজক ও পুরোহিতদের উপর হামলা, হুমকি, সামাজিক বয়কট এবং জোর করে ধর্মীয় আচার পালনে বাধ্য করার অভিযোগ উঠে আসে।
দু’দিনের এই কর্মসূচিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর লক্ষ্যভিত্তিক হিংসা বন্ধ করা, অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং সংবিধান-প্রদত্ত অধিকার, সমান নাগরিকত্ব ও আইনের শাসন সুনিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই এবং প্রান্তিক সম্প্রদায়ের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় তথ্য নথিবদ্ধকরণ, জনপরিসরে আলোচনা ও সম্মিলিত উদ্যোগের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়।

